৮৮. শূদ্র জাত নিয়ে সুভাষ বোসের সঙ্গে যোগেনের একটু-আধটু তর্কবিতর্ক
১৩ তারিখ রাতে বাড়ি ফিরে ডাক্তার আর বোনের সঙ্গে গল্প ও হাসিঠাট্টা করতে-করতে তার মনে হল, সে ঠকে যায়নি, ঠকানো হয়েছে তাকে।
কিন্তু নিজেই বুঝতে পারে না, ঠকানোটা হল কোথায়? সে-ই তো সুভাষবাবুর কাছ থেকে মিটিং-করার নির্দেশ এনে সবাইকে জানাল। মিটিং ডাকলেন সুভাষবাবু, গুরুচাঁদ ঠাকুর যোগেনের ঠাকুরদাদা নয়, পি আর ঠাকুরের ঠাকুরদাদা। মল্লিকভাইদের একটু ল্যাং দেয়া গেল—সেটা তো যোগেনেরও লাভ। রসিক কাকা তো বলেই দিলেন—এটা তমলুক সম্মিলনে তোলা হবে। কী তোলা হবে? যোগেনও জানে না।
মিটিঙের শেষে পনের নম্বরের ঐ ছোট আড্ডায় যোগেনের এটা বলার কোনো দরকার ছিল না যে সুভাষ বোস আর জে সি গুপ্ত শিডিউলদের কংগ্রেসের তলায় নিয়ে যেতে চায়। কারণটা অবিশ্যি অদ্ভুত—উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ মিলেই হিন্দুধর্ম ও ভারত, কংগ্রেসে এ সবই আছে, সুতরাং শূদ্রদের কংগ্রেসে আসা উচিত। তার, যোগেনের, কথা শুনে পি আর ঠাকুর সাততাড়াতাড়ি তার ঠাকুরদার নীতি–কংগ্রেসে যাইবা না/বন্দেমাতরম্ কইবা না/শাহেবগো বিপক্ষে থাইকবা না/স্বরাজ-ফরাজে ভুইলবা না— বদলে দিয়ে বলল কী করে— সময়ের বদলের সঙ্গে-সঙ্গে আমাদেরও তো বদলাতে হবে দৃষ্টি, আমরা আমাদের রাইট ছাড়ব কেন। এইটাই যোগেনের গেড়োর জায়গা। কোন রাইট ছাড়ব-না আমরা, কোন রাইট কায়েম করব আমরা—উঁচুজাত-নিচুজাত মেশানো হিন্দুর রাইট? নাকী শিডিউল—অশিডিউল মেলানো রাজনীতির রাইট? সবে তো একটা ভোট হল—তাতে তো তারা খারাপ করেনি। তাহলে পরের ভোটের সঙ্গী তো এখনই বাছা দরকার। যোগেনেরও। তাহলে, যোগেনকে ঠকানোই বা হল কোথায়, ঠকালই-বা কে? যোগেন মিছি মিছি ভূত দেখছে।
১৩ তারিখের রাত কাটলে যোগেন বোঝে—সে নিজেকে যা বোঝানোর চেষ্টা করেছে, সে-কথা সে বোঝেনি। ওটা তো বোঝার ব্যাপার না, বিশ্বাসের ব্যাপার। ১৩ তারিখের মিটিংটা থেকে যা বেরল, তাতে তার বিশ্বাস নেই। অথচ মিটিঙে তো সকলেই দেখল, জানল, তার বিশ্বাস আছে— সুভাষ বোসের কথায়। ভারত এক, হিন্দু এক, কংগ্রেস এক, তাই এখন বর্ণভেদ নেই, সবাইকে কংগ্রেসে মিলতে হবে।
জে সি গুপ্তের কথার সঙ্গে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সম্বন্ধ নেই। বঙ্কিমবাবু ও নীহারেন্দুবাবুর কথাতেও না। ওঁরা ওঁদের চিন্তাদুশ্চিন্তা জানিয়েছেন। কংগ্রেসের ভোট কমবে কী না। তপশিলরা আলাদা পার্টি করবে কী না। মন্দিরে যদি শূদ্রদের ঢুকতে দেয়, তাহলেই অস্পৃশ্যতা আর থাকবে না। অস্পৃশ্যতা যদি না-থাকে তাহলে বামুন বামুনের মতো থাকারও অসুবিধে নেই, শূদ্রেরও শূদ্র থাকার অসুবিধে নেই। এ কথা নিয়ে হাসাহাসি করা চলে। মাদ্রাজ প্রদেশে রাজাগোপালাচারির মতো বড় নেতা ও বড় হিন্দু, ব্যবস্থা করেছিলেন, এক-এক জায়গায় ভোট নেয়া হবে, তারপর ভোটের রায় অনুযায়ী সেখানকার মন্দিরে অস্পৃশ্যদের ঢুকতে দেয়া হবে, বা হবে না। এই ভোটাভুটিতে গোলমাল আরো বাড়ল দেখে রাজাগোপালচারি ইনডেমনিটি বিল আনলেন। যদি কোনো মন্দিরের ট্রাস্টিরা অস্পৃশ্যদের মন্দিরে ঢোকার অধিকার না দেন, তাহলে, সেখানকার সরকারি অফিসাররা কোনো ব্যবস্থা নিলে, তিনি সাধারণ আচরণবিধি লংঘনের দায়ে দোষী হবেন না। তাছাড়াও, রাজাগোপালচারি সত্যি-সত্যি বলেছিলেন, আরে বাবা, মন্দিরে ব্রাহ্মণরা ঢুকতে পারেন বলে কি সব বামুন মন্দিরে ঢুকছে? সময়-অসময়, পুজোআর্চা, ভোগের সময়টময় দেখে দু-জন একজন হরিজন গেলেন, দেখলেন এই তো ব্যাপার। এ নিয়ে আপনারা এমন তোলপাড় শুরু করেছেন কেন। স্যার শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার শাস্ত্রীর মতো আইনজ্ঞ আপত্তি করে বললেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস দল যেন খুব সাবধানে ভেবেচিন্তে দেখে যে অস্পৃশ্যতা দূর করার মতো মহৎ একটা কাজ করার জন্য তারা ভুল সব পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের কতটা বিপদে ফেলছে। শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারও তো কংগ্রেসকে ভোটের ভয়ই দেখালেন। এটা তো কৌশল নিয়ে কথা, ধর্ম নিয়েও কথা না, সংস্কার নিয়েও কথা না। বঙ্কিমবাবু—নীহারেন্দুবাবুর নিজেদের মতটা বলতে পারলেই হল—অং বং টং। জাতপাত কিছু না। এগুলো সব শ্রেণীদ্বন্দ্বের ফল। যেন নিচুজাতের লোক মানে ওঁদের প্রলেতারিয়েত। প্রলেতারিয়েত তো বটেই। প্রলেতারিয়েত হলে সে নিচুজাত হতে পারে না? বরং সে তো ডবল-প্রলেতারিয়েত। ওঁদের শ্রেণী হিশেবে আবার জাতে নিচু বলে। নীহারেন্দুবাবুর দেয়া ‘মেনিফেন্টো’ যোগেনের মুখস্ত হয়ে গেছে। ওরকম লেখা মুখস্ত না হয়ে পারে? ‘মেনিফেস্টো’র প্রত্যেকটি কথাই চমকে দেয়। প্রলেতারিয়েতের কিছুই হারাবার নেই। মুগ্ধতা থেকেও তো মজা আসে। এই কথাটিতে যোগেন মজা করে ভাবে—তাহলে তাদের, শূদ্রদের, কিছু হারাবার না-থাকাটাও ডবল না-থাকা, ট্যাকেও কিছু নেই, জাতেও কিছু নেই। না-থাকার ডবল। সেটা মাপা যায় কী ভাবে। ওঁদের মতো একটা না-থাকা বাদ দিয়ে না। নীহারেন্দুবাবুদের ভাষণ শুনলে বিদ্যাসুন্দর-পালা মনে আসে। কাক তাড়ানোর ছলে সুন্দরকে সংকেত দেয় বিদ্যা—’পশ্চিমে কাউয়া উড়ে/পুবে বিদ্যা ঢিল ছোঁড়ে।’
কিন্তু সুভাষবাবু কৌশলও করলেন না, কোনো মৌলিক তত্ত্বকথাও বললেন না। একটা লাগসই কথা বলে চমকে দিলেন। ‘সারা দেশটাই পরাধীন, অপ্রেসড, ডিপ্রেসড, সাপ্রেসড। তাহলে কয়েকটি জাতের লোককে এইসব নাম দিয়ে আলাদা করা কেন। এখন আবার হয়েছে শিডিউল্ড। ভারতীয়মাত্রেই তো শিডিউল্ড ফর ফাঁসি, শিডিউল্ড ফর জেলখাটা, শিডিউল্ড ফর শাহেবের লাথি খাওয়া। যতদিন পরাধীনতা, ততদিন এসব থাকবে। পূর্ণ স্বাধীনতা না পেলে এগুলো দূর হবে না। একই হিন্দুধর্মের মধ্যে উঁচুনিচু ভেদ তো আর হিন্দুধর্মের অখণ্ডতা ও সমগ্রতা ভাঙতে পারে না। সেই সমগ্রতার কথা বলেছেন রামানুজ, শ্রীচৈতন্য, বিবেকানন্দ।’
যোগেন কোনো কিনারা করতে পারে না, মেনে নিতেও পারে না। শুধু কথা সাজানোর জন্য সুভাষ বাবু কি অপ্রেসড-ডিপ্রেসড-সাপ্রেসড এই ইংরেজি শব্দগুলি নিয়ে মজা করলেন। এগুলো তো শাহেবদের বানানো। সুভাষবাবু সেই খাঁটি বাংলা শব্দগুলি বললেন না কেন, যা চিরটা কাল বলে আসা হচ্ছে— চাঁড়াল, শুদ্দুরনি, মেথর, চামার, ধাঙর, দুলে, জোলা। সুভাষবাবু কি বলতে পারতেন, আমরা পরাধীন, আমরা সবাই চাড়াল, আমরা অতিশূদ্র।
এই, এই, এই জায়গাটাতেই যোগেনের দুঃখ। সে নিজেই জানত না—কখন সে ভেবে নিয়েছিল, সুভাষবাবু এই কথাটা বলতে পারেন। সুভাষবাবুরও তো গ্রাহক আছে। সে-গ্রাহক এটা সহ্য করত না, ‘আমরা সবাই চাঁড়াল।’
সুভাষ বোস কি কোনোভাবে পাশ কাটাতে চাচ্ছিলেন জাতপাতের ব্যাপারটা। তাঁর ইচ্ছে হলে তিনি তা করতে পারেন। কিন্তু তার জন্য কেন গুরুচাঁদ ঠাকুরের মৃত্যুবার্ষিককে বা যোগেনের মতো কর্মীনেতাকে ব্যবহার করবেন? যোগেন গুরুচাঁদ ঠাকুরে বিশ্বাসী নয়। এই ঠাকুররা সুদে টাকা খাটায় আর টোটকা দিয়ে ভেলকি দেখায়। তার নাতি পি আরও তা জানে বলেই আধুনিক রাজনীতির সঙ্গে মতুয়া ধর্মকে মেশাতে চাইছে। যোগেন মনেপ্রাণে জানে—হরিচাঁদ-গুরুচাঁদরা হিন্দু উচ্চবর্ণ রাজনীতির পালটা নিজেদের একটা গোঁড়ামো খাড়া করেছিল। কিন্তু সুভাষবাবু যদি তাঁর সম্পর্কে ভাল করে না জেনে তাঁকে জাতীয়তা-ভূষিত করতে হিন্দু বর্ণভেদের সাহায্য নেন, তাহলে যোগেন নিশ্চয়ই বলবে, ওঁরা শূদ্র ও শূদ্রতা দিয়েই ওঁদের চিনতে হবে। যোগেন পড়াশুনো করেই জানে, বামুনরা দরকার মতো ব্রাহ্মণ-বিরোধীদের কেমন আত্মস্যাৎ করতে পারে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, শাস্ত্র কী বদলায়নি। ব্রাহ্মণ্যবাদের চরম বিরোধী গৌতম বুদ্ধকে দশম অবতার বানিয়েছে, মেরেওছে। শ্রীচৈতন্যকে অবতার বানিয়েছে, মেরেওছে।
অনিদ্র যোগেন ট্রামের তারের ঘর্ষণের সঙ্গতে ভাবতে থাকে—চাড়াল জন্মের কী ভার, কী ভার মুসলমান জন্মের যে যাকে আমি মনে করি না চাঁড়াল বা মুসলমান, তাকেই আমার নেতা করে তুলতে হয়, চাঁড়ালের নেতা, মুসলমানের নেতা। ভুল নেতার কাছে কোরবানি দেয়া—কপাল, কপাল।
ঘুম না-হওয়ায় যোগেনকে বাথরুমে যেতে হয়। আলো জ্বালতে হয় না, বাইরের আলোই আসে। ঘরে, মেঝেতে, তার মাদুরে ফেরার সময় যোগেন শোনে উদ্দুর-খুদ্দুরের মায়ের ডাক, ‘ভাই—’।
কিছু না বলে যোগেন তাকায়। রাস্তার আলোতে সে তাকানো বোঝা যায়। ‘ভাই।’
‘কী কও বোন, ঘুমাও নাই?’
‘তোমার মনে কী দুঃখ ভাই?’
‘না। দুঃখ কুথায় দেহো।’
‘তোমার খাওয়াতে নাই মন, ভাই, তুমি ঘুমাও না।’
‘হ্যাঁ। দুঃখ একখান হইছে বোন। সে তো জন্মেরই দুঃখ। কপালও কব্যার পারো।’
‘তোমার মতো আর-কেডা জন্মের দোষ কাট্যায়া নিজের খাড়া করছে?’
‘বোন, তুমিও সেই ভুলই কইরল্যা। কেডা কইছে আমি নমশূদ্র হইয়্যাও বড় মানুষ হবার চাই। বোন, আমি যে বড়মানুষ হইয়্যাও শূদ্রই থাকব্যার চাই। এরা আমারে শূদ্র থাকব্যার দিতে চায় না কেন বোন? আমি শুদ্দুর। ওরা আমারে হিন্দু বানায় ক্যান?’
‘সে কী কথা ভাই? তুমি তো হিন্দু বইল্যাই শুদ্দুর। নিজের ধর্ম ছাইড়ো না ভাই।’
‘হিন্দু-হওয়াডা নিজের ধর্ম ছাড়া না? আমি তো চাঁড়ালের বংশের চাঁড়াল। তোমাগো হিন্দুধর্মে তো পূর্বজন্ম আছে। কতগুলা পূর্বজন্মের চাঁড়াল আমি তার হিশাব কেউ জানে না— তাইলে আমি হিন্দুডা কোন পূর্বজন্মে ছিল্যাম, বোন।
বোন কোনো কথা বলে না। তাদের জাগরণ ও নীরবতার মধ্য দিয়ে কলকাতার শেষ রাত রাস্তার নেড়ি কুকুরের মতো মাঝেমাঝেই খেঁকিয়ে ওঠে। যোগেন নিজেই টের পায় না—কখন্ সে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। যোগেনের ঘুম দেখে বোন উঠে চলে যায়।
পরদিন, ১৫ই সকালে, ঘুম থেকে উঠেই যোগেন ফোন করে সুভাষকে।
‘আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা বলা দরকার।’
‘ফোনে? বলুন—’
‘না। ফোনে হবে না। আপনার ওখানে গেলে কি অসুবিধা?’
‘কখন আসতে চান?’
‘অ্যাসেম্বলি থিকে।’
‘তাহলে, মেজদার সঙ্গেই তো আসতে পারেন। তাই আসুন। রাতে খেয়ে যাবেন।’
‘খাওয়াটা আজ মুলতুবি থাক। তাইলে কথা হবে না।’
একটু চুপ করে থেকে সুভাষ বলেন, ‘ঠিক আছে, আসুনতো।’
যোগেনের মনে হয়, সে বোধহয় তৎপরতা ফিরে পাচ্ছে। অ্যাসেম্বলিতে আজ জরুরি কোনো বিজনেস নেই। সে দুটোর মধ্যে পৌঁছে যায়।
লবিতেই শরৎ বোস তাকে ধরেন, ‘মিস্টার মণ্ডল, কাল সন্ধেয় তো আমার ওখানে একটু আসতে হয়। একটু চা খাবেন, কয়েকজন নন-কংগ্রেস লিডারকে বলেছি। অ্যাসেম্বলি পলিটিক্স নিয়ে কথাবার্তা হবে।
‘আমি তো আজ আপনার সঙ্গেই আপনার বাড়ি যাব।’
একটুও অবাক না হয়ে শরৎ বোস বললেন, ‘আরে, সে তো ন্যাশন্যাল পলিটিকস। আমার তো একেবারে হাউসপলিটিকস। আজ তো তেমন কোনো বিজনেস নেই। যখন যাবেন, বলবেন। শরৎ বোস ভিতরে ঢোকার একটু পরে যোগেন ঢোকে। পাঁচ মিনিট যেতে-না-যেতেই মার্শাল তাকে একটা শিল্প ধরিয়ে দিল-তমিজুদ্দিন পাঠিয়েছে, ‘তাহলে গুজব এখন স্বর্ণডিম্ব প্রসব করিতেছে!’ লিখতে গিয়ে যোগেনকে একটু থমকাতে হল। তার অবসাদ-উদ্বেগ-অনিশ্চয়তায় সে ভেবে উঠতে পারে না, তার কাছ থেকে তমিজুদ্দিন যে-সরস জবাব আশা করে, সেটা মাথায় আসছে না। একটু সামলে যোগেন জবাব দিল, ‘ডিম্ব পাকিল কবে?’ সেটা নিয়ে মার্শাল গেল, ফিরল সড়েগ্রামের হরেন্দ্র দোলুইয়ের স্লিপ নিয়ে—’নো কনফিডেন্স না রি অর্গানাইজেশন? যোগেন জবাব দিল—’বাই হাডুডু গেমস’। আবুল হাশেম একটা স্লিপ পাঠালেন, ‘যদি একটু লবিতে আসেন, বধিত হব।’ যোগেন উঠে পেছনের দরজা দিয়ে লবিতে গিয়ে দেখে আবুল হাশেমশাহেব দাঁড়িয়ে। যোগেন নমস্কার করে দূর থেকেই বলতে-বলতে তাঁর কাছে আসে, ‘হাশেমশাহেব, শেষ পর্যন্ত আপনেও আমারে বামুন বানাইলেন।’ হাশেমশাহেব খুব শিষ্ট মানুষ, ‘বামুন ছাড়া কি বামুন বানাতে পারে?’
‘আমি সেই ক্লাশ সেভেনে সংস্কৃত বইয়ে পড়া বামুনের কথা বলতেছি— হাট থিকে পাঁঠা কিনে ঝুড়িতে নিয়্যা বাড়ি ফিরতেছিলেন। পর-পর দশটা লোক তাকে বলে, ‘একী ঠাকুরমশায়, মাথায় কইর্যা কুকুর ন্যান ক্যা?’ দশজনের পর বামুন নিশ্চিত হয়্যা গেল ওড়া পাঁঠা না, কুকুর। ঝুড়িসহ ফেলাইয়া বাড়ি ফিরল খালি হাতে।’
‘হাশেমশাহেব গল্পের মজাটায় খুব হেসে বললেন, ‘যোগেনবাবু, মুশকিল হচ্ছে সব দলেই বামুনও থাকে আর পাবলিকও থাকে। জনসমর্থনে পাঁঠা হয়ে যায় কুকুর। আমাকে এইটুকু আশ্বস্ত করেন যে অনাস্থা প্রস্তাব কি আজই তোলা হবে?
‘আপনে আমাকে বিশ্বাস করেন হাশেম ভাই, অনাস্থা প্রস্তাব নিয়্যা কোনো কথা হয় নাই, অন্তত আমার সঙ্গে কারো হয় নাই। শরৎদা আমার কাছে ওঁর একটা কথা বলতে আসছিলেন।
‘সে তো কালকের সন্ধ্যার টি-পার্টি, শুধু তপশিলিদের জন্য।’
‘আপনি তো তালি সবই জানেন হাশেমশাহেব।
‘আমি তো যোগেনবাবু প্রত্যক্ষ সোর্স ছাড়া কোনো খবর বিশ্বাস করি না। এই কানাকানি, গোপনতা, ফিসফিসানি –এই পলিটিক্যাল কালচার ভাঙা দরকার। আমাদের সব মেম্বার তো হাজির নেই। চিফ হুইপ এসে বারবার বলছেন—শরৎবোস আর যোগেন মণ্ডলের মধ্যে কথা হয়ে গেছে, আপনি মেম্বারদের তলব করুন। শেষে আমি বললাম, আমি জেনে আসছি।’
‘শরৎদারে জিগাইলেন না ক্যান?’
‘সবকিছুর তো একটা তরিকা আছে। উনি লিডার অব দি অপোজিশন। আমি রুলিং পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি হয়ে তাঁকে কি বলতে পারি—আপনার ট্যাকটিকস কী বলুন। আপনার কাছে জানতে চাইতে পারি। তবে আরো একটা কারণ আছে। আমার প্রশ্ন থেকে শরৎবাবু ঠিক করে ফেলতে পারেন যে আজই মুভ করবেন। আমাকে মিথ্যে করে বলবেন, না।’
‘আমি মিথ্যা কব না, এই গ্যারান্টি কে দিল?’
হাশেমশাহেব ভক্ত মুসলমানের মত দুই হাত ওপরে তুলে আল্লাকে নির্দেশ করে বললেন, ‘আরে, শরৎবাবু হচ্ছেন সিজন্ড পার্লিয়ামেন্টেরিয়্যান। ওঁর উচিত-অনুচিত সব ঠিক হয় পার্লামেন্টের কৌশল হিশেবে। আমি কিন্তু তাহলে আপনার নাম করে বলব যে যোগেনবাবু বলেছেন, তিনি অন্তত জানেন না।’
‘নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করার কারণ কী, আপনার পার্টির?’
‘হিশাব। আপনার ৩০ + ১ ভোট ছাড়া কোনো অনাস্থা হতে পারে কী?’
‘তাইলে তো আমি অ্যাহন চইল্যা গ্যালে সবাই নিশ্চিত হবে।’
‘তা হবে।’
‘ঠিক আছে?’ বলে যোগেন দরজার দিকে ঘোরে।
নিজের আসনে ফিরে এসে যোগেন একটু দম নেয়।
চৈত্র-বৈশাখেও তো বরিশালে এরকম আগুন লাগে না যে নেবানোর কোনো উপায় নেই। জলের, খালের, পুকুরের, নদীর তো আর অভাব নেই। কিন্তু এ-গুজব তো কলেরার মত—একের পর এক গ্রামে ঢোকে, সাফ করে দিয়ে আর-এক গ্রামে। তবু, কেন যেন, বোধহয় এত জল বা এতরকম জল বা এত জোয়ার ভাঁটার কারণেই কলেরাটা বরিশালে কম। টাইফয়েডটা বেশি। আন্ত্রিক জ্বর।
কিন্তু গুজবের জ্বর তো একই সঙ্গে আগুন লাগা, ওলাউঠা আর টাইফয়েড।
কয়েকদিন ধরেই রটছে—মন্ত্রিসভার রদবদল হবে বা তপশিলমন্ত্রীদের অদলবদল হবে। যোগেন শুনেছে কিন্তু পাত্তা দেয়নি। নানা লোকের নানা কারণ থাকে নানা গুজব রটানোর। এই মন্ত্রিসভা কংগ্রেসের দু-চোখের বিষ। যত দিন যাচ্ছে হিন্দুরা কংগ্রেসের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। সুতরাং কংগ্রেস চাইতেও পারে—একটা বদল। কিন্তু চাইলেই কি হয় না কী? হয়ত কাল শরৎবাবুর বাড়িতে সন্ধেবেলায় সেসব ঠিক হতে পারে। তাও তো কেমন অসম্ভব ঠেকে। এমন ঢাকঢোল বাজিয়ে অনাস্থা জানানো। তাও হয় বা হতে পারে। সেটা তো ‘অনাস্থা’র ভয় দেখিয়ে সরকারকে ব্ল্যাক মেল করা। শরৎ বোস তার সঙ্গে কথা বলেছেন বলেই আজই ‘অনাস্থা’ আসবে? এখন সে আর শরৎবাবু যদি একসঙ্গে শরৎবাবুর গাড়িতে বেরিয়ে যায়, তাহলে আর দেখতে হবে না, গুজবের জোয়ারের ধাক্কায় ঘরবাড়ি গাছপালা সব ভাসবে।
তেমন কোনো বিজনেসও নেই হাউসে। সব ডিপার্টমেন্টাল ব্যাপার, বেশিরভাগই ইপসো ফ্যাকটো স্যাংসন, দু-চারটে কোশ্চেন— ডিপার্টমেন্টের লোকরাই এমএলএ বেছে বুঝিয়েসুজিয়ে কাগজপত্র দিয়ে যায়। যোগেন শরৎবাবুকে একটা শিল্প পাঠায়— রিউমার মেশিন উইল গ্রিন্ড ইন টপ স্পিড ইফ উই লিভ ইন এ কোম্পানি। আই অ্যাম মেকিং ইট অ্যালোন। স্লিপটা শরৎবাবু পড়লেন কিন্তু যোগেনের দিকে ফিরে তাকালেন না। যোগেন বেরিয়ে গেল।
বড় দরজাটা বন্ধ ছিল। যোগেন জানে না, কী করতে হবে। খুঁজে দেখে পাশে একটা ছোট দরজাও আছে। যোগেনের এই সব চেষ্টায় একটু আওয়াজ উঠে থাকবে। একজন ছুটে এল আর দরজা খুলে সুভাষও এলেন বেরিয়ে। যোগেনের একটু অশোভনই লাগছিল—সুভাষ তার জন্য দাঁড়িয়ে।
সুভাষ ‘আসুন’ বলে এগিয়ে যায়। বাইরের এই বড় ফাঁকা ঘরটা ভুলেই গিয়েছিল যোগেন।
সুভাষ যোগেনকে বললেন, ‘এত কী জরুরি কথা যে খেতে গেলেও গুলিয়ে যাবে।’
যোগেন হেলান দেয় না। বসেও সোজা থেকে বলে, ‘আপনাকে কে কী বলছেন, জানি না, কিন্তু আমি আপনাকে স্বমুখে ও সজ্ঞানে জানাই যে আমার কিন্তু কোনো পার্টি নাই, কোনো পলিটিক্সও নাই। মানে, পার্টি পলিটিক্স নাই।’
‘বাঃ, কংগ্রেসের অফিসিয়্যাল ক্যানডিডেটকে হারিয়ে জিতে এখন বলছেন আপনার পার্টি নেই, পলিটিক্সও নেই। আপনি তো প্রমাণিত অ্যান্টিকংগ্রেস।’
‘বেশ। মাইনলাম। তাতে একটা প্রমাণ হইল। কিন্তু আরো কত দল আছে অ্যান্টিকংগ্রেস—আমি কিন্তু তাদের কোনো দলেও নাই। আমি শুধু শিডিউল কাস্টদের নিয়ে আছি, আরো ঠিক করে বললে বলব নমশূদ্রদের নিয়েই আছি। যেসব শিডিউল সংখ্যায় কম ও আমাদের দিকে আরো কম—তাদের কথা আমি জানি না। এমন কী বরং বড়-বড় শিডিউল জাতের বড় বড় লোকজনের সঙ্গেও আমার সম্পর্কটা সবে তৈরি হচ্ছে। এই কথাটাই আপনাকে প্রথম জানাতে চাই। আমাকে কংগ্রেসি ভেবে নিলে ঠিক করা হবে না।’
‘সে তো আপনি কংগ্রেস হননি বলে। হতে তো আর আপত্তি নেই?’
‘হ্যাঁ, আছে। আমার কাছে সবার উপরে শূদ্র। হাজার-হাজার বছর ধরা উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যাদের সবসময় একেবারে ধ্বংসের কিনারায় ঝুল্যায়্যা রাইখছে, পশুদের মতন।’
‘বটেই তো। আপনি কি এই কথাগুলি শুনিয়ে দিয়েই চলে যাবেন ভেবেছিলেন। আর সেই জন্যই খাবেন না? উচ্চবর্ণের অত্যাচার তো ভারতেরই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। মাদ্রাজে, বম্বেতে, গুজরাটে এই অত্যাচার তো সবচেয়ে বেশি।
‘আপনার মতো বড় নেতার পক্ষেই এমন নির্ভুল অনুমান সম্ভব। আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়গুলি তো সাফসুরত না। কতজনকে দেখবেন লিগও করে, কংগ্রেসও করে। মুক্ত রাজবন্দীরা তো আপনাকে ঘিরে জমা হচ্ছেন। কংগ্রেসে কমিউনিস্টরাও আছে, সোস্যালিস্টরাও আছে। তাদের ভরসাও আপনি। তাই, আপনার পক্ষে এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমিও কংগ্রেসে থাকতে পারি।’
‘পারেনই তো। আপনার মত নেতাকে কংগ্রেস যদি জায়গা করে না দিতে পারে, তাহলে কংগ্রেসেরই ক্ষতি। আপনি সতীন সেনের চেনা তো, পিরোজপুরের?’
‘ওনাকে কে না চেনে? কিন্তু মনে হয় না উনি আমাকে চেনেন।’
‘কেন, বলুন তো।’
‘মনে হয় তপশিল নিয়ে আন্দোলনে ওঁর কিছু বাধা আছে।’
সুভাষবাবু, এই তুলনাটাই কি উচ্চবর্ণের মন বোঝার পক্ষে যথেষ্ট নয়? যখন কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ড অনুযায়ী অনুন্নত জাতের সিট কোথায় কত হবে, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, অন সব বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর বৈজ্ঞানিকরা বললেন—অন্য প্রদেশের সঙ্গে তুলনা করলে এটা বলা যায় না যে বাংলায় বর্ণভেদপ্রথা ও অস্পৃশ্যতা আছে। বলাবাহুল্য তারা সবাই কাস্ট হিন্দু। আর, আমাদের সমাজের লিডার বিরাটচন্দ্র মণ্ডল, তিনি এদের কারো থিক্যা কম পণ্ডিত না, গোলটেবিল— আলোচনার প্রস্তাব সমর্থন করা টেলিগ্রাম পাঠাইয়্যা জানালেন, ‘অস্পৃশ্যতা সম্পর্কে ও নিম্নবর্ণের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচারের প্রতিবিধান না করা স্বরাজ বা স্বাধীনতার আলোচনা হতে পারে না।’ আপনিও সেই তুলনা দিলেন অন্য প্রদেশের সঙ্গে। এটা কংগ্রেসের নীতি, উচ্চবর্ণের হিন্দুর নীতি, মহাত্মা গান্ধীর নীতি ও সুভাষচন্দ্রেরও নীতি। এ তো ব্রিটিশদের নীতি, খ্রিস্টানদের নীতি, হিন্দুদের নীতি-অন্যের যা নেই তার সঙ্গে তুলনা করে দেখো তোমার কত বেশি আছে। একটা ঘটনা বলি। বানানো গল্প না। কিন্তু এটা তো ইতিহাসে পাবেন না। আমাদের তো কাস্ট হিন্দু হিস্টরিয়্যান নাই। পাবনার এক বামুন জমিদার তার এক প্রজার, শুদ্দুর প্রজার, ডাইন হাতটা একেবারে বগল থিকে পুরা কাইট্যা দিয়া, পুরাটা হাত কাইট্যা দিয়া, তাকে বলছিল, ‘যা, বাড়ি যা, তোর মত শুদ্দুরের দুইডা হাত দিয়্যা কী হইব। তোর যা জীবন, তাতে একডা হাতই তো বেশি।’ সেই শূদ্রচাষী কিন্তু মাইন্যা নিল কথাটা মাথা হেলায়া। বামুন—জমিদার যখন বলে, ‘যা! চইল্যা যা!’ সে চলে যেতে শুরু করে। দুই পা যাতেই জমিদারের গর্জন, ‘হেই চাড়াল, তোর কাটা হাত তুইল্যা নিয়্যা গেলি না, তোর রক্ত ছুঁব কেডা।’ সেই শূদ্র দুইপা পিছায়া হাঁট্যা, মাটিতে পইড়্যা থাকা তার ডাইন হাতটা তুল্যা নিয়্যা চল্যা গেল। তুলছিল কাটা-ডানহাতের আঙুলগুল্যা ধইর্যা। হাত তো মানুষ তেমনি ধরে। তার কাটাহাতের উলটা বগল থিক্যা বড়-বড় ফোঁটায় রক্ত পড়ছিল, জমিদারের কাছারি থিক্যা তার বাড়ি পর্যন্ত তিন মাইলের কাঁচা রাস্তায়, আইলে, ক্ষেতের উপড়ানো মাটিতে, ঘাসে, খালের জলেও। দোষ কিন্তু ঐ শূদ্র একটা করছিল। জমিদারের তো এটা সদর ছিল না, কাছারি ছিল। নায়েব-সেপাইরাই রাজ্য চালায়। এই লোকটার বাড়ি ছিল যেখানে, সেখানে একটা টানা আইল বান্ধা ছিল— আইলের ভিতরের দিকের একটু ঢাল-জমিটাকে বাঁচাতে। ঐ আইল বা ঐ জমি কিছুই ঐ চাঁড়ালের সম্পত্তি না। কিন্তু চাঁড়ালদের তো নিজেদের মতো করাই নিজের থাকার স্থানটা বানায় নিতে হয়। এ চাড়াল ঐ বড় আইলে লাইন দিয়্যা কয়েকটা সুপুরি গাছ লাগাইছিল। বছরে দুইবার বেইচা নগদ টাকা পাত। কোনো বাধা হয় নাই। সে-বছরই প্রথম কাছারির বরকন্দাজ আসা হুকুম দ্যায় সবগুল্যা গাছ থিক্যা সুপুরি নামাইয়্যা তাদের সঙ্গে গিয়া কাছারিবাড়িতে পৌঁছায়া দিতে। সেই চাঁড়াল, তার বউ, তার ছেলেমেয়েরা বরকন্দাজদের হাতে পায়ে ধরে কান্নাকাটি জুড়ে—এ মালেক, জমিদারবাবুর কি সুপুরিগাছের অভাব আছে, এই কয়টা ছাড়া দ্যাও। সেই প্রার্থনার জবাবেই জমিদার ওকে বলছিলেন—তোর কি আর হাতের অভাব আছে, দুইট্যা নিয়া কী করবি, একটা কাট্যা দেই। তবে জমিদারের কথার পিছনেও রাজনৈতিক কারণ ছিল। বেশিদিন আগের কথা না, বছর দশেক, ধরেন সাতাশ-আটাশ সাল। তখন কাউন্সিলে, স্বরাজ পার্টির কাউন্সিলে খুব তর্ক বাধছিল যে রায়তপ্রজার জমিতে বা আলের উপরে যেসব গাছ, তার উপর রায়তপ্রজার কোনো দখল আছে কি নাই? কী করা থাকব? কাউন্সিল ভর্তি তো হিন্দু আর মুসলমান রাজাগজা, নবাব-জমিদার। অনেক তর্কাতর্কির পর সাব্যস্ত হয়—রায়তপ্রজার একটা কাঁঠাল পাড়ারও দখল নাই। পাবনার সেই হাতকাটা চাঁড়াল আইলংঘন করছিল। জমিদারবাবু তাই আইনপ্রয়োগ করলেন। এটার একটা সহজ, ফাঁকির পথও ছিল। সেপাইরা যদি গাছে উইঠ্যা সুপুরি নামাইয়া বস্তায় নিয়্যা য্যাত। তার নায়েববাবুকেও জানাত না। বেমালুম চুরি। কিন্তু তাদের কোমর এতই ভারী হয়্যা গিছে যে সুপুরিগাছে উঠতে পারে না। ওদের মোটা কোমরের দাম শূদ্রের হাত।’
যোগেন এই কথাগুলি বলছিল, একটানা, একটু-আধটু দম নিয়ে বা এমনি একটু চুপ করে থেকে। একবারের জন্যও সে হেলন দেয়নি, এমনকী, সে বসেওনি পুরো আসনটা জুড়ে। দুই হাঁটুতক দুই হাতে শুইয়ে চাপা স্বরে যোগেন কথা বলছিল। তার চশমাটা একটু নেমে এসেছিল। তখন সে চশমার ওপর দিয়ে সুভাষবাবুকে দেখছিল।
সুভাষ ঠিক বুঝতেই পারেননি, তাঁকে কি যোগেনের কোনো অভিযোগ শুনতে হবে, কোনো সমস্যা, তারপর কোনো সমাধান দিতে হবে। একটু এগনোর পর তাঁর প্রথম সন্দেহ হয়–হয়ত যোগেন কিছু কথা বলতেই এসেছেন। নালিশ বা সমস্যা তেমন কিছু যোগেনের নেই। সেই নমশূদ্র চাষীর হাতকাটার কথার সময় সুভাষ তাঁর বাঁ পাঞ্জাটা দিয়ে চশমাটা ঢাকেন ও খুলে দেন। যোগেন লক্ষ করে, সুভাষবাবুর আঙুলগুলি রোগা, তাঁর কবজিটাও। যোগেন যখন থেমে যায় আচমকা, সুভাষ তখন বুঝতে পারেননি থামাটা। শোনার সময় যেমন তিনি তাকিয়েছিলেন একদৃষ্টিতে যোগেনের দিকে, যোগেন থামার পরও তেমনি তাকিয়েছিলেন। একটু পরে তিনি নিজের পায়ের পাতার দিকে চোখ ফেরালেন। তিনি বসেছিলেন, ডান হাঁটুর ওপর বাঁ পাটা তুলে। তাই অমন চোখ ফেরানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সুভাষ তখনো যোগেন কী বলছে, তা বুঝতে পারছিলেন না।
বাধ্য হয়ে সুভাষ জিগগেস করলেন, ‘ঐ জায়গায়, মানে গ্রামে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি।’ সুভাষ বুঝেই বলেছেন যে এটা নেহাৎই একটা কথার কথা হল—বীভৎস এই ঘটনা শোনার পর। আর যোগেনও সেই জায়গাটাই রগড়ে দিল—’প্রতিক্রিয়া? কীসের? প্রতিক্রিয়াটিয়া তো হয় কিছু আচমকা ঘটলে, যা ভাবা যায় নাই এমন কিছু ঘটলে। এটা তো তেমন কিছু না। রোজই তো হয় এমন—এইখানে-ঐখানে।
‘এখন একটু কমেনি? এই ভোটটোট হওয়ার পর?
‘কমছে বললে মিথ্যা বলা হয়, কমে নাই বললেও মিথ্যা বলা হয়। আমি যা বুঝছি সেটাই আপনাকে বলি। আপনি আমাকে বেঠিকও ভাইব্যা নিতে পারেন। একটু-আধটু কমছে সেই সব জায়গায়, যেগুলা মুসলমান প্রধান আর যে-যে খানে দাঙ্গা হইছে। অন্তত সেইসব জায়গায় মুসলমান বা শুদ্দুর প্রজাদের হাত-পা-জিভ কম কাটা হচ্ছে।’
‘দাঙ্গা? মানে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা?’
‘তাছাড়া আবার কী?’
‘সে কী করে হয়, যোগেনবাবু? দাঙ্গা মানে তো দল বেঁধে আক্রমণ, তা থেকে দুই পক্ষের যুদ্ধ। যুদ্ধে কি হিংসা কমে না কী?’
‘তা কমবে ক্যান? বাড়ে তো বটেই। একা যে দুষ্কর্ম করা যায় না, দঙ্গল বাঁইধলে সেটা করা ফ্যালা যায়। আমাকে তো আলাদা কইর্যা কেউ চিনে না। বিশেষ ক্ষেত্রে তো এমন দাঙ্গা একটা সমবেত অভিযানের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, এসবও দেয়। বেবাক জমিদার হিন্দু আর বেবাক চাষি মুসলমামান হইলে হিন্দু জমিদার তাঁর বড় মিয়াশাহেব প্রজার মাথার চুল অর্ধেক চ্যাছা দিতে, একদিকের কান কাইট্যা দিতে বা একটা হাত ভাইঙ্গ্যা দিতে—দুইবার তিনবার ভাবে। চণ্ডালদের থিকে অমন কিছু তো ঘটে নাই, তাই তাদের থিকে ভয়ডরও নাই। তাদের হাত-পা- মাথা কাটা চলছে তো চইলছে আগের মতো। দাঙ্গার একটা ভাল দিক এটা—গরিব মানুষজনের জোর বাড়ে। দঙ্গল না বাঁধলে কাস্ট হিন্দু জমিদারগো সাথে পারা কঠিন।’
‘তাহলে এটা কি হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, না, জমিদার-কৃষকদের দাঙ্গা?’
‘দুটাই। একটা সদর কাছারির গ্রামে এমন আর কয়জন থাকে, যারা জমিদারির খায় না, পরে না? আত্মীয়স্বজনও থাকে, বামুন-পুরুত থিকে কায়েত গোমস্তাও থাকে আর পাইক-বরকন্দাজ, সব শূদ্র তো থাকেই। মুসলমানরা যখন দঙ্গল নিয়্যা ঢোকে তখন তো এই বেবাক হিন্দু ভয় পাবেই। ভয় না-পাওয়ার তো কিছু নাই। আবার হিন্দু হিশাবে তো এই পাইক-লাঠ্যাল—সর্দাররাই তো মুসলমানগো ফেস করে। বাবুরা তো করে না। ফলে সব দাঙ্গাই হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়ে যায়।’
‘শূদ্ররা তো হিন্দুই। না হলে তারা চতুর্থ বর্ণ হবে কোন সুবাদে? ধর্ম তো একটাই। গান্ধীজি তো বলছেন, বর্ণভেদও থাকবে, কিন্তু সব বর্ণই সমান হবে। উনি তো অস্পৃশ্যতা দূর করার জন্য আন্দোলন করছেন। কংগ্রেস-মন্ত্রিসভাগুলো থেকে তো আইন পাশ হয়েছে। আরো হচ্ছে।’
‘আপনি কি তাই মনে করেন—অস্পৃশ্যতা আর বর্ণভেদ এক? পংক্তিভোজনে শুদ্দুরকে ডাকলেই শূদ্র আর শূদ্র থাকবে না?’
‘অস্পৃশ্যতাকে যদি ধর্মাচরণের অংশ করে ফেলা হয়, তাহলে তা দূর করতে বলা তো সকলেরই উচিত।’
‘আপনি কি জানেন, সুভাষবাবু, শূদ্রদের মধ্যে অস্পৃশ্যতা আছে আর তারা সেগুল্যা খুব কঠিনভাবে মানে। ধোপারা নমশূদ্রদের কাপড় কাচে না। মাত্র শ-খানেক বছর আগে নমশূদ্রদের বলা হত চণ্ডাল। তারা ছিল জেলখানার মেথর। তারপর এই নমশূদ্র নাম হয় কিছু সমাজ-নেতার দাবিতে সেনসাস-কমিশনারের দয়ায়। তাদের যে ঐ বৃত্তি থিক্যা সইর্যা আসা সম্ভব হয়, তার কারণ, আমার মনে হয়, বিহার থিক্যা এমন মানুষজনের কইলকাতায় আসা যারা নিজেদের এই পেশার অধিকারী বলে দাবি করে। সেই নমশূদ্ররা কোনো ধাঙরের ছোঁয়া খাওয়া খায় না। আবার, ধাঙররা চামারের ছোঁয়া খাওয়া খায় না। অস্পৃশ্যতা একটা রিলিজিয়াস কালচার, সুভাষবাবু। উঁচু জাতগুলার উচ্চতা রক্ষার জইন্য তৈরি। তাদের নকলে নিচা জাতগুলাও যদি সেটা প্র্যাকটিশ না করে, তাইলে তাগো তো আর উঁচু হওয়া হয় না। তাছাড়াও এটা একটা ক্ষমতার ও একটা কৌশলের ব্যাপার। একটা হিন্দুধর্মের ছাতার নীচে যদি শূদ্র বা নীচজাতীয়দের রাখা যায়, তাইলে তারা মুসলমানগোর দাঙ্গারও মহড়া নিতে পারে আর উচ্চবর্ণের মানুষদের একটা হাইটও দিতে পারে। আপনি দেখছেন তো কংগ্রেসের প্রদেশগুলির আইনসভায় অস্পৃশ্যতা নিষিদ্ধ করার আইন নিয়্যা কত বড়-বড় পণ্ডিত কত কথা বলতিছেন—’
‘আপনি এইসব কাগজ পান কোথায়?’
‘অ্যাসেম্বলি লাইব্রেরিতে তো সব প্রদেশের কাগজ আসে। বিলাতের কাগজও আসে—।’
‘এআইসিসিতে তো রাখে। থাকি তো কলকাতায়। দেখি, বিপিসিসিকে বলব। কিন্তু তারা তো ইনটারেস্টেড ড্রিস্ট্রিক্ট বোর্ড, স্কুল বোর্ড, মিউনিসিপ্যালিটি নিয়ে। তার বাইরে যে—দুনিয়া আছে, তাও তাদের মনে থাকে না। আপনি কী বলছিলেন যেন, আমি বাধা দিলাম।’
‘আমি এই কথাটা আপনাকে বলতে ছটফট করছি যে গুরুচাঁদ ঠাকুরের স্মরণ মিটিঙে আপনেও সেই একই কথা বললেন। আমি ভাবছি সুভাষচন্দ্র কী কইর্যা এই কথাডা কইলেন যে ধর্মও একডা, দেশেও একডা—তাতে আবার জাইতের ভাগ কেন? আপনিও হিন্দুধর্মকে ছাতা কইলেন, আপনিও তার সঙ্গে দেশ মিলাইলেন?’
‘হ্যাঁ, আমি তো সেরকম একটা কথাই বললাম। সেটা বলা আসলে জাতিবৈরিতার বিরুদ্ধে। যারা এসব মানেন, তাদের সঙ্গে কথাবলার একটা জায়গা তৈরির জন্য। যাতে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা করতে আমরা ব্রাহ্মণ্যদের অস্পৃশ্য করে না ফেলি। আমাকে তো অল ইনডিয়া ইমপ্যাক্টের কথা ভেবে কথা বলতে হয়।
‘তাইলে শূদ্রদের কথাডা কে বলবে। দেশের সব থিক্যা উঁচা আসন থিক্যা কে কবে—ঢাকার তাঁতিগো বুড়া-আঙুল কাটায় যদি জাতীয় প্রতিবাদ হবার পারে, তাইলে বরিশালের শূদ্রদের হাত কাইট্যা দেয়ায়, কান কাইট্যা দেয়ায় জাতীয় প্রতিবাদ হবে না কেন।’
সুভাষবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। বোঝাই গেল, তিনি এই বিষয়ে কথা বলবেন না।
‘আপনে যাতে আমারে ভুল না বুঝেন, তাই আপনাকে জানানোর জন্য আসছি—আমি কোনোভাবেই নিজেকে হিন্দু ভাবি না।’
‘সামাজিক বা পারিবারিক ভাবেও না?’
‘সেইসব ছোটখাটো কথা ছাইড়্যা দ্যান–বিয়া কি শ্রাদ্ধ কি এড্ডু-আধডু পূজাপার্বণ। আমি বিশ্বাসের কথা বলছি। আমার বিশ্বাস দিনে-দিনে গভীর হইছে যে শূদ্ররা এইসব শিডিউল-টিডিউল দিয়্যা যেটুকু খাড়াব্যার জায়গা পাইছে, সেই জায়গা অতলে ভাসাইয়্যা দিয়্যা শূদ্রদের গ্রাস করার জইন্য কংগ্রেস আর গান্ধীজি কর্মসূচি বানাবার লাগছেন। আমার বিশ্বাস, তপশিলদের স্বাভাবিক বন্ধু মুসলমানরা, কারণ, তারাও হিন্দু-অত্যাচারের শিকার। আমার কথায় আপনার মত মানুষ চিন্তা বদলাইতে পারেন না। কিন্তু আমার মত ক্ষুদ্র মানুষও তো আপনার মত মানুষকে আমারে নিয়্যা কোনো ভুল ধারণা পুষব্যার দিব্যার পারি না।
আমার কথাডা আপনাকে বলা থাইল। আপনে আমারে যহন যে-কাজে ডাইকবেন, আমারে পাবেন। আপনার মতো নেতার সঙ্গে কাজ করা আমার মহাভাগ্য। তা থিক্যা আমাকে বঞ্চিত রাখবেন না। আপনার কাছে, আপনার নির্দেশে কাজ করলে আমি রাজনৈতিক নেতৃত্ব শিক্ষা করতে পারব। সে শিক্ষা তো আমার একেবারেই নাই। অথচ, আমার ভিতরে একটা নেতৃত্ব যে তৈরি হচ্ছে, সেটা আমি নিজেই বুঝতে পারি।’
‘সেটাই কি আপনার প্রধান ভয় যে সমবেত কাজে আপনার আলাদা চিন্তাভাবনাগুলি আপনার কাছে অপরিষ্কার হয়ে যেতে পারে।’
একটু চুপ করে থেকে যোগেন কথাটা বুঝে নিতে চায়। বুঝতে না পেরে সুভাষকে বলে, ‘ঠিক বুঝলাম না। প্রত্যেকের ধারণা তো আলাদা হইতেও পারে। কিন্তু সেই পার্থক্য নিয়াও সবাই মিলে, সমবেত কাজ না-করলে আমার চিন্তা ভাবনার পরীক্ষাই-বা কী করে হবে?
‘আপনি তো বললেন, কোনো পার্টির হয়ে, বা নেতার হয়ে আপনি কোনোদিন রাজনীতি করেননি। বলতে গেলে আপনি রাজনীতি শুরুই করলেন, এমএলএ হয়ে।
‘এটাই ষোল আনা ঠিক কথা।’
‘আপনার রাজনীতিতে তাহলে কোনো বংশ-পরিচয় নেই। আপনিও কোনো পার্টিকে আপনার জন্মমৃত্যুর সাক্ষী হওয়ার অধিকার দেননি। দিতে চানও না। নিজের স্বাধীনতা রাখতে চান।’
‘একটু বেশি ঠিক শোনালেও, এটাই ঠিক কথা। আমার মনে হয়—আমার অভিজ্ঞতা বলতে তো বরিশাল ডিস্ক্রিক্ট বোর্ড আর গত বার-চোদ্দ মাসের অ্যাসেম্বলি। তাতেই মনে হইছে— কী করা হবে সেটা ঠিক হয় ঝোঁকে বা প্রতিক্রিয়ায় বা একজনের লাভালাভ ভাইব্যাও।’
‘কিন্তু আপনাকে যদি প্রত্যেকদিনই রাজনীতির মধ্যেই থাকতে হয়, কাজ করতে হয়, কাজ তৈরি করতে হয়, তাহলে তো সবসময়ই ঝোঁক-নেয়া বা প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য ফ্রন্টের সৈনিকের মতো খাড়া থাকতে হয়। খুব একটা ধীরস্থির হওয়ার সময় থাকে না সব সময়।’
‘তাইলে তো মাছ ধরার মত মানুষরেও টোপ দিয়্যা রাজনীতি কইরতে হয়।’
‘হ্যাঁ, তাই তো। আমাদের দেশের রাজনীতি তো সব সময়ই মাস-পলিটিকস। জনসাধারণকে নিয়ে। গান্ধীজির আগের কংগ্রেসে হয়ত শুধু নেতাদের রাজনীতি হত। কিন্তু পূর্ণ স্বাধীনতা যদি লক্ষ হয়, তাহলে মাস-মোবিলাইজেশন ছাড়া সম্ভব নয়। গান্ধীজির স্বরাজের মানে কী, উনি একবছরের মধ্যে স্বরাজ এনে দেবেন বলার পর তো প্রায় কুড়িটা বছর কাটতে চলল, আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা চাই তাও তো সাত-আট বছর হল—কিন্তু স্বরাজের অর্থ তো এখনো পরিষ্কার হল না। ছোট দেশে বিপ্লবী দলরা নিজস্ব ও গোপন কর্মীদের নিয়ে সংগ্রাম করতে পারে—যেমন ডি-ভ্যালেরা বা হিটলারও অনেকটা’
‘তাইলে একডা জাইতের মানুষের উপর হাজার-হাজার বছরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কিছু করা হবে না কারণ তাদের কষ্ট সারা দেশের কষ্ট হিশাবে স্বীকার হয় নাই।’
যোগেন সুভাষবাবুর সঙ্গে তার উত্থাপিত বিষয়টা নিয়েই কথা বলছে—এটা সে বুঝতে পারে, এটাও বুঝতে পারে, সেই নিহিত বিষয়টিকে স্পষ্ট করলে এই কথাবার্তা থেমে যাবে।
‘হ্যাঁ, হয়ই তো, অজস্র হয়। হওয়ার আরো সব কারণ থাকে। ধরুন—কোচিনের মোপলা বিদ্রোহ তো জাতীয় বিদ্রোহ কিন্তু সেটা এখন হয়ে গেছে, আমাদের কাছে, মুসলমানদের নিজেদের ভিতরকার দাঙ্গা।’
‘এ কী কথা, সুভাষবাবু। ধরেন, আগের একটা ব্যবস্থা, খুব খারাপ, খুব সংকীর্ণ, মানুষকে ছোট করে রাখা ব্যবস্থা বদল্যা যে-নতুন ব্যবস্থাটা আনলেন সে-ব্যবস্থারও মাথায় থাকল সেই খারাপ, সংকীর্ণ, গোঁড়া গুষ্ঠি। তাইলে বদলডা হবে কোথায়। হইল কোথায়।’
‘একটা বদল তো হয় যোগেনবাবু। যদি নতুন ব্যবস্থাটা ঐ জনগোষ্ঠীর পক্ষে থাকে, তাহলে সেই-যে বড় গুষ্টির কথা বলছেন, তারাও সেটা বুঝতে পারে। মানে—আগে ছিল গুষ্টির অধিকার, নতুন, হল বেশি মানুষজনের অধিকার। এর চেয়ে আর বেশি বদল কী হতে পারে?
যোগেন মাথা নিচু করে, দুই হাঁটুর ওপর হাতদুটোর ফেলে রেখে বসে থাকে। বোঝা যায়—সে উৎসাহী হতে পারেনি। বোঝা যায়—একটা সমাজের একটা টুকরো যদি তার জাতের বাইরে শরিক খোঁজে, তাহলে, তাকে তা খুঁজতে দেয়া হবে না।
