৮৬. ফেরার পথে যোগেনের কিছু ভাবনা
ঠিক এভাবেই যে সে কথা বলেছিল তা নয়। কিন্তু এখন সুভাষবাবুর বাড়ি থেকে হেঁটে-হেঁটে ফিরতি পথটাকে ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যহীন করতে—যোগেন যেন নিজের সম্পর্কে নিজেরই করা এমন বিশদ ব্যাখ্যায় পৌঁছুতে চাইছিল।
ব্যাখ্যাটা আছে, অন্য কারো করা, কোনো মুনি-ঋষির, দার্শনিকের, গুরুর করা, অনেক আগেই হয়ত, বা না-হয় এখানকারই কেউ, ব্যাখ্যাটা করে রেখে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, আমার, বা আমাদের মত সবার জন্য—আমার বা আমাদের মত সবাইকে সেই ব্যাখ্যা পর্যন্ত পৌঁছুতে হবে, তার পর কী সেটা তো ঠিক করতে হবে ঐ ব্যাখ্যার সূত্র ধরে-ধরেই—যোগেন এমন একটা পদ্ধতি তার বা তাদের বেলায় যথাযথ বলে মেনে উঠতে পারেনি, পদ্ধতিটা বর্জন যে করতে পেরেছে—তাও নয়। ‘আমার’ বা ‘আমাদের মত সবারকে’ মানে কোন্-আমার বা কোন্-আমাদের, সেটা একটু ঝাপসাই ছিল, তবু, এত কথা ওঠার উপলক্ষ তো এই ভোট, ভোট থেকে তৈরি আইনসভা, আইনসভার মেম্বাররা, তাদের ভিতর থেকে তৈরি মন্ত্রিসভা-তারাই না-হয় হোক। এই ব্যবস্থাগুলি তো জানা, তৈরিও অনেকটা। ‘আমাদের মত সবাইকে’ সেই পর্যন্ত পৌঁছুতে হবে। তার পর ব্যবস্থা চলবে ব্যবস্থার নিয়মে।
কিন্তু যোগেন নিজেকে সেই ‘আমাদের’ মধ্যে ধরেও ‘তার বা তাদের বেলায়’ বলে কাদের সে আলাদা করে? নিশ্চয়ই শূদ্রদের, যারা আর-একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা, হিন্দু বর্ণভেদ, তার আবর্জনা। নিশ্চয়ই বাঙালি মুসলমানরা, যারা আর-একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা, মুসলিম বর্ণভেদ, তার আবর্জনা।
তারা কি নতুন কোনো ব্যবস্থার ভিতর নিজেদের জায়গা বের করতে পারে যেখানে এই পুরনো বর্ণভেদব্যবস্থাগুলি নেই?
এখন, যোগেন হেসে ফেলে হাঁ-মুখে বাদাম ছোঁড়ে। শূদ্র ও মুসলমান হওয়ার সুবাদে এই আইনসভার ব্যবস্থায় তারা ঢুকতে পেরেছে। অথচ এই ব্যবস্থার ভিত্ বর্ণভেদহীন এটা মেনে নিতে হয়েছে।
এই ছলনা, ব্যবস্থার এই ছলনা, যোগেনের কাছে ধরা পড়ে গেছে। তাহলে, শূদ্র বলতে সে আর প্রসন্নদের বা মুকুন্দবিহারী আর মুসলমান বলতে ঢাকার নবাব?
তাহলে বর্ণভেদ কি থাকল না ভাঙল?
হ্যাঁ—তাদের, মানে শূদ্রদের তো ভোট আছে। সুতরাং,
গান্ধীজি বললেন—বর্ণভেদ হিন্দুধর্মের অংশ কিন্তু অস্পৃশ্যতা নয়, মন্দিরে শূদ্ররা ঢুকুক হিন্দুধর্ম বলতে কী বোঝায় সেটা বদলে গেল। আগে ছিল—বামুন-কায়েত বৈদ্য এরা। এখন হিন্দুধর্ম বলতে তো বর্ণভেদের সবগুলি ভাগসহ গোটা হিন্দুধর্মকেই বোঝায়, মানে—দুটো পুরনো ব্যবস্থা, হিন্দু-মুসলমানের আলাদা-আলাদা বর্ণভেদ ও মিলিত ধর্মভেদ, এই নতুন আইনসভার ব্যবস্থার সঙ্গে এসে মিশেছে। যোগেন জানে না—পুরনো ব্যবস্থার কিছু উপাদান থেকেই যায় কীনা সব নতুন ব্যবস্থাতেই। এটা জানা কোনো ইচ্ছেও তার নেই। সে যদি মনে করত, নতুন ব্যবস্থাটাই সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে, একমাত্র তাহলেই সে তল্লাশ চালাত, কোন্-কোন্ লুকানো ফাঁকফোকর দিয়ে পুরনো ব্যবস্থাটা কোনো-না-কোনো আকারে নতুন ব্যবস্থায় জায়গা করে নেয়। কংগ্রেসের ভিতরে ও বাইরে ‘স্বরাজ’, ‘স্বাধীনতা’, ‘স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ এসব নিয়ে মারামারি কাটাকুটির দশ বছরের ইতিহাস যোগেনের জানা। খুব সূক্ষ্মভাবে না হলেও জানা। মাথার ওপরে শাহেব আছে কী নেই—এই প্রশ্নের চাইতেও গুরুতর প্রশ্ন যোগেনের তৈরি হয়ে গেছে—মাথার ওপরে ব্রাহ্মণ-কায়েত-সৈয়দ-মৌলানারা থাকবে কী থাকবে না? তাহলে যোগেন কি এই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশানে থেকে স্বায়ত্তশাসন যেতে চায় না? সেটা কী করে বলবে যোগেন, না জেনে যে স্বায়ত্তশাসনে শূদ্ররা কি স্বায়ত্ত না শাসিত,’ পূর্ণ স্বাধীনতায় নমশূদ্ররাও কি পূর্ণ ও স্বাধীন? যোগেন জানে—যোগেনের জন্য নতুন ব্যবস্থায় জায়গা আছে—মন্ত্রী-টন্ত্রী হয়ে যাবে। কিন্তু নমশূদ্ররা?
নীহারেন্দুবাবু পরে তাঁকে ছোট্ট দুটি বই দিয়ে বলেছিলেন—আপনি যে প্রশ্ন করছেন, দেখুন তো এই বইদুটিতে সেই প্রশ্নগুলি আছে কী না। আপনি পড়ে নিন, তার পরে কথা হবে। বইদুটো মলাট দিয়ে রাখাই ভাল। রাশিয়ান বলশেভিজম, কমিউনিজম, রিভলিউশনারি ট্যাকটিক্স—এই সবে শাহেবদের এখন জলাতঙ্ক।’ বইদুটি—’কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ আর ‘ক্লাশ-স্ট্রাগল ইন ফ্রান্স।’ বইদুটো মুখস্ত হয়ে গেছে যোগেনের, এতবার পড়েছে। এ বই ভাললাগা খারাপলাগার বই না। নিজেকে চেনার বই, নিজের জীবন তৈরির বই। যোগেনের সব প্রশ্নই তো ওঠে—তার শূদ্র অস্তিত্ব থেকে। কোনো প্রশ্ন বা বিষয় যদি বর্ণভেদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদ বা শূদ্রতার সঙ্গে কোনো একরকমে বাঁধা না যায়, তাহলে বই থেকে যোগেন কিছুতেই বের করতে পারে না—তার প্রশ্নটা কী?
গুরুচাঁদ ঠাকুর যখন মারা গেলেন, গত বছর, তখন তাঁর কোনো শোকসভা হয়নি আর এ-বছর তাঁর মৃত্যুর বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অ্যালবার্ট হলে?
কেন? গুরুচাঁদ ছিলেন নমশূদ্রদের জাতীয় আন্দোলনে ঢোকার প্রধান বাধা। তিনি কংগ্রেসকে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রধান বাধা দূর হয়েছে। এখন নমশূদ্র বলতে তো বোঝায় একটা জনগোষ্ঠী। শিডিউল বানিয়ে বা শিডিউলের বাইরে এই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বাছাইয়ে একমত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এমন একটা উপলক্ষ খুঁজে বের করা হয়েছে।
কিন্তু সে কেন? সে, যোগেন মণ্ডল, কেন। রসিক কাকা পুরনো কংগ্রেসি, এখনো কংগ্রেসি, বিরাট কাকা পুনা প্যাক্টে সই করেছিলেন। তাঁদের বাদ দিয়ে যোগেন কেন? নতুন বলে? পি আর ঠাকুর নন কেন? গুরুচাঁদের নাতি বলে? আর যোগেনের ঠাকুদার নাম সে নিজেই সব সময় মনে করতে পারে না বলে? নতুন নেতৃত্ব? উত্তরাধিকারহীন ও পূর্বপুরুষহীন বলে? না। যোগেন তপশিলি সংরক্ষণের বাইরে বর্ণহিন্দুদের দ্বারা সমর্থিত বলে?
যোগেন এলগিন-চৌরঙ্গি থেকে হাঁটছিল। থিয়েটার রোডে ঢুকে পড়ে। সুরাওয়ারদির বাড়ির সামনে দিয়ে, বাঁয়ে ঘুরে পার্ক স্ট্রিটের কবরখানার পাশ দিয়ে মল্লিকবাজারে পৌঁছয়। সে কোনো একটা ঠিকানার দিকে হাঁটছিল না। তবু তো দক্ষিণ থেকে উত্তরেই আসছিল। যোগেনের কাছে কলকাতার কোনো জায়গাই অচেনা নয় আর সবটাই হাঁটাপথ। বাস-ট্রাম ভাড়া বাঁচিয়ে, টিউশন করে, প্রুফ দেখে সে কলকাতায় তার জীবন কাটিয়েছে। সেটা তার অভ্যেসে ঢুকে গেছে—একা-একা হাঁটতে-হাঁটতে ভাবা। সে কিছু ভেবে থিয়েটার রোড দিয়ে পার্ক স্ট্রিট কবরখানার ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে মল্লিকবাজারে বাঁ মোড় নেয়নি। সে যে ভাবনায় ঢুকে পড়েছিল, তাতে একটু নিরালা-নীরবতা দরকার ছিল। সারা দেশে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে শুধু একটা মিটিঙে যেতে বলেছেন। সে নিজেই সে-মিটিঙে যেত। না-যাওয়া অসম্ভব। এখন তাকে যেতে হবে সুভাষের লোক হিশেবে? যোগেন যদি সুভাষের লোক বলে পরিচিত হতে না চায়, তাহলে, ব্যস, দেখা হল কথা হল, মিটে গেল। আর ওমুখো না-হলেই হল। কিন্তু সুভাষের চিকিৎসা? সে তো উপযাচক হয়ে সুভাষকে চাঁদসীর কথা বলল। হ্যাঁ, তার ইচ্ছে করেছিল বলতে। এত নয়নমনোহর একটি মানুষের শরীরের কষ্ট দূর করার ইচ্ছে হয়েছিল যোগেনের। অর্শ-ভগন্দর-নালীঘা তো বটেই যোগেন কপাল টিপে-টিপে আটকপালি, খেঁড়ি ও ঘাড়-আটকা ব্যথা সারাতে পারে, সারিয়েছেও অনেক। কিন্তু সে আন্দাজ করতেই পারেনি যে তার কথাটুকু মুখ থেকে বেরতে-না-বেরতেই সুভাষ জেলখানার কথা এত খোলাখুলি বলতে শুরু করবেন। কথাটা তো ছিল তাঁর শরীরের স্থায়ী অসুস্থতা নিয়ে। তার বিবরণে তো ময়দানে ও আলিপুরে পুলিশের মারের কথা আসবেই।
কিন্তু সুভাষ যে যোগেনের মুখে শুনেই যোগেনকে নির্ভর করে ফেললেন, তাতেই যোগেন এই প্রথম, এই প্রথম স্মৃতি আর কল্পনার এক আকস্মিক মিশ্র স্রোত তার শরীরে অনুভব করে। ভাসমান তার শরীরের পিঠের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঠান্ডা, ঠান্ডা জলস্রোত আর তার দুই হাত ও বুক ভেঙে চলে উষ্ণ জলস্রোত। সে কল্পনা করে নিতে পারে, সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, আপাদশির নিরস্ত্র একটা মানুষেরা ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কিছু উর্দিপরা মানুষ, আপাদশির সশস্ত্র। তারা যে অতটা প্রকাশ্যতায়, অতটা সশস্ত্র হয়ে, অতটা নির্ভয়ে পাকা বাঁশের শক্ত ও পোক্ত লাঠি দিয়ে মেরে লোকটার মৃত্যু ঘটাতে পারে, তার একটি কারণ তো ওটা একটা জেলখানা যেখানে পুলিশের উর্দি নীতি বা নিয়মের শেষ নির্ণায়ক, আর আরো একটি কারণ তো আক্রান্ত লোকটির সামনে কোনো প্রস্থান পথ নেই, যেমন সেই ছেলেটির ছিল না, তারই বয়সী সেই ছেলেটিরও ছিল না, তেঁতুলকাঠির হাটে, লোভ সামলাতে না পেরে সে, সেই ছেলেটি, ঘোষমশায়ের দোকানে সাজানো জিভে গজার স্তূপ থেকে একটা গজা চুরি করেছিল ও একটি কামড় দেয়ার আগে ধরা পড়েছিল। সঙ্গে-সঙ্গে ঘোষমশায়ের দোকানের লোকজন হাতের কাছে যা পায় তাই নিয়ে ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লোহার লম্বা-লম্বা কাল হাতা, শিক, ডান্ডা নিয়ে ও শেষ পর্যন্ত মিষ্টির দোকানের বড় আখার জ্বলন্ত খড়ি নিয়ে। ছেলেটাকে আর দেখা যাচ্ছিল না। সেই কালো, লম্বা লোহাগুলো ও খড়িগুলো বাতাসে উঠছিল আর নামছিল। যোগেন দাঁড়িয়ে দেখছিল, তখন ক্লাশ সেভেনে, আর সবার মত দাঁড়িয়ে দেখছিল, ছেলেটিকে বাঁচাতে সে কিছু করতে পারে—এমন কোনো চিন্তা পলকের জন্যও তার মনে আসেনি যেমন যারা দেখছিল তাদের কারোই আসেনি। ঘোষমশায়ের লোকগুলো যখন কাজ শেষ করে খালের জলে তিন ডুব দিয়ে উঠে এল আর ঘোষমশায় যখন সেই জিভেগজার স্তূপটার নীচের বারকোষটা উলটে দিলেন মাটিতে আর তার ওপর হামলে পড়ল যত শুদ্দুরের ছেলেমেয়ে হাটে ছিল তারা সব, তখন, তখনই দুই হাতের মুঠোতে গোটা তিন-চার গজা নিয়ে খাড়া হওয়ায় ঘোষ মশায়ের গর্জন শুনে জানতে পেরেছিল, ছেলেটি ছিল শূদ্র, সে যদি একটা মিষ্টি চাইত ঘোষমশায় ওকে দুটো মিষ্টি দিতেন, তাই বলে ছুঁয়ে দিবি, এ-ঘোষকে সে-ঘোষ পাওনি, চাঁড়ালের ছোঁয়া মিষ্টি আমি খদ্দেরদের বেচতে পারব না, লাঠি কাঠি যা দিয়েই হোক চাঁড়ালের ছোঁয়া যার-যার লেগেছে, তারা তিন ডুব না দিয়ে দোকানে ঢুকতে পারবে না।
যোগেন শুনেছিল, যেমন আর-সবাই শুনেছিল। দু-হাতের দু-মুঠো ভর্তি কয়েকটা গজা নিয়ে যোগেন সেই ছেলেটিকে দেখতে মাটিতে পড়ে আছে যেখানে সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, খুব নজর করে তারও মনে হয়েছিল, ও কি মইর্যা গিছে—যেমন আরো সবার মনে হয়েছিল কিন্তু কিছু বলেনি, যেমন আর কেউও বলেনি। গজাগুলো যোগেন খেয়েছিল কী না-স্মৃতি থেকে এই তথ্যটা সে মুছে দিতে চেয়েছে।
যোগেন সুভাষের কথা থেকে কল্পনা করছিল, চোখে দেখার মত দেখছিল—আপাদমস্তক নিরস্ত্র একটি মানুষকে লাঠি পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে যেহেতু এ-হত্যা আইনসঙ্গত ও লোকটি আইন-অসঙ্গত।
তার বয়সী সেই ছেলেটিকে মারা শুধুই দেখেছিল যোগেন, তার স্মৃতিকে চিরকালের জন্য বন্ধক দিয়ে। এখন, এত বছর পর, তারই বয়সী-প্রায় আর-একজন তার সামনে—তাকেও অচ্ছুৎ বলে মারা হয়েছে। তিনি ছুঁয়ে দিয়েছিলেন, দেশের শাসনতন্ত্র। ঠিক মিল নয়, কিন্তু যোগেন একটা কিছু ছায়া পায়, পারা-ওঠা আয়নায় যেমন ক্ষতলাঞ্ছিত ছায়া পড়ে তেমনি। সুভাষবাবুকে তো ইংল্যান্ডের কলেজটলেজে গিয়ে শাহেব হতে হয়েছিল শাহেবদের বিরুদ্ধতার প্রস্তুতিতে। এর ভিতর কি একটা বৈষম্য ঘটে যায় না? যোগেন-কে যে বর্ণহিন্দুর মত শিক্ষিত ও সফল হতে হয় বর্ণভেদের বিরুদ্ধতা করার অধিকার অর্জনের জন্য। একটা কি ফাঁকে পড়ে যাচ্ছে না সেই মানুষটি যে শূদ্র অথচ বর্ণহিন্দুর সমতুল্য নয়।
এমন একটা গোলমালে পড়ে যোগেন সুভাষবাবুর সঙ্গে একাত্ম বোধ করে ফেলেছে, তাঁর শরীরের সেবা করতে চেয়েছে, যেন কোথাও একটা সমতা তৈরির দায় আছে—বিদেশীরা যে- মার মেরেছে, তা থেকে সম্পূর্ণ দেশী চিকিৎসায় তাঁকে নিরাময় করে তোলার দায়। বৈঠকখানার মোড়ে পৌঁছুতে যোগেন এই পর্যন্তও ভাবতে পারে—গান্ধীর অনশন, পরোক্ষ প্রতিরোধন মে দিবস, ছাগদুগ্ধও কি সেই দেশীয় সমতার সন্ধান।
যোগেন যে এর পরে আর ভাবে না তার কারণ কি বৈঠকখানা বাজারে ঢোকার পথে ঠেলা ও রিকশর ভিড় ঠেলে তাকে এগুতে হচ্ছিল বলে, নাকী সে সেই ছুতোয় তার ভাবনা থামিয়ে দিতে? যোগেন জানে—এভাবে ভাবনা থামানো যায় না, বরং ভাবনাটাকে বিপুল শক্তিতে ফিরে আসার সুযোগ দেয়া হয়, তেমন প্রত্যাঘাত আরো বিপদের
এলগিন রোডের মোড় থেকে হাঁটতে-হাঁটতে যোগেন যে বৈঠকখানা বাজারেই টুকবে এটা কি সে জানত। জানত অথচ মানতে চাইছিল না যে জানে? তাই এমন আত্মছলনা তৈরি করতে হয় যে যদি গুরুচাঁদ স্মরণ সভার খবর নিতে হয়, তাহলেও ১৫ নম্বর হ্যারিসন রোডে যেতে হবে, রসিকলাল বিশ্বাসের বাড়িও ১/২ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট। কাকার সঙ্গেও কথা বলা যাবে।
বৈঠকখানা বাজারের এক তেতলা বাড়ির একতলার একটা ঘরে বরিশালের একজন লোক থাকে যে চাঁদসীর চিকিৎসার জন্য দরকারি ওষুধপত্র, তেলমালিশ তৈরি করে দেয়। এটাই তার জীবিকা। কলকাতায় তো চাঁদসীর ডাক্তার নেহাৎ কম নয়। তাদের রোগীও সব মিলিয়ে কম নয়। ফোড়া, শূলবেদনা, শরীরের অব্যবস্থায়, ঘামাচি থেকে হওয়া ঘায়ে, হাজায়, বদহজমে, অগ্নিমান্দ্যতে, অনিদ্রায়, শ্বেতস্রাবে, স্তনে দুধ না-আসায়, অন্ডকোষবৃদ্ধিতে, অর্শ-ভগন্দরে চাঁদসী কাজে লেগে যায়। এক ডাক্তারের কাছে না লাগলে আর-এক ডাক্তারের ওষুধ কাজে লাগে। অথচ দুই ডাক্তারকেই ওষুধ বানিয়ে দেয় এক ও অদ্বিতীয় অভিমন্যু বারুই।
অভিমন্যুকে পাওয়া গেল না। যোগেনেরই ভুল। এটা তো তার ডেলিভারি টাইম। অভিমন্যুর বৌ এক গলা ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে। এর সঙ্গে আর কী কথা বলবে?
‘বড় ছেলেডা কই’ যোগেনের প্রশ্নের উত্তরে বৌটি তারই পাশ দিয়ে বাইরে গেল। বাইরে মানে রাস্তা থেকে একটা প্যাসেজ এসেছে এই বাড়ি পর্যন্ত। সে-প্যাসেজও বাজার ঢুকে গেছে।
একটা বাজখাঁই বরিশালি হাঁক শুনে যোগেন চমকে যায়। ঘোমটা গলা পর্যন্ত। ঘোমটার আড়ালে এমন বজ্রনিনাদ। এক যোগেনই সেই ডাকের অর্থ বুঝল—হে বোগদার বেটা বাজার মারানো ছাইড়্যা এডডু গোয়ালে মুখ দেখাও। এমন করে ছেলেকে কি পৃথিবীর আর কোনো লোক ডাকতে পারে? একটা মাত্র ডাক দিয়ে গলা পর্যন্ত ঘোমটায় যোগেনের পাশ দিয়ে ভিতরে ঢোকে আর ছেলেটিও এসে হাজির।
‘তুই আমার লগে পনের নম্বরে যাবি, সেখানে আমি একটা কাগজ লিখ্যা তোকে দিলে তুই বাড়ি ফিরে আসতে পারবি তো?’
ছেলেটির বয়স মনে হয় বার-র মত। প্রশ্নের জবাবে সে কোনো জবাব না দিয়ে ঠোঁটের ডানকোণে একটু ভাঁজ ফেলে একপা এগল, মানে, চলেন।
সুভাষের জন্য অভিমন্যুকে একটা তেল বানাতে বলবে। চাঁদসী চিকিৎসায় খুব নাম-করা তেল-স্নেহতৈল। স্ট্যান্ডার্ড ফরমুলার হলে অভিমন্যুর কাছে রেডিস্টকই পাওয়া যেত। কিন্তু যোগেন অনুপাত একটু বদলাতে চায়। রাস্তাতেই তার সেই বিচার হয়ে গেছে—কোন্ অনুপাত কী হবে।
পনের নম্বরে এসে একটা কাগজ টেনে খশখশ করে লিখে ফেলে। ছেলেটিকে ডেকে বলে, ‘তোর বাবাকে বলবি, যেমন লেখা আছে, তেমন অনুপাত দিতে হবে।’ কাগজটি ছেলেটির হাতে দেয়ার পর তার মনে পড়ে যায়, ‘তোর বাবা তো পড়তে পারে না। তালে লিখ্যা দিয়া কী হব? এহানে আমি রাত নয়টা পর্যন্ত আছি। অভিমন্যুরে দেখা করতে বলিস। দেখা না হইলে কাইল সকালে বাড়িতে যাবার কবি।’
স্লিপটা ফেরত দেয়ার পর ছেলেটি বলে, ‘এহানে পইড়্যা দিবার মানুষ আছে।’ অভিমন্যু তার খদ্দেরদের সমস্ত প্রয়োজন মনে রাখতে পারে। কী যে ক্ষমতা ওর। যোগেন স্লিপটা ছেলেটিকে ফিরিয়ে দেয়।
পনের নম্বরে পাড়ার নেতারা এলে যোগেন তাদের খবর দেয়, মিটিঙের। সবটা বলেনা। শুধু এইটুকু বলে যে সুভাষ বোস জানিয়েছেন—শিডিউলরা সবাই মিলেমিশে যদি করে তাহলে তিনি আসবেন। ছেলেরা তো আনন্দ লুকতে পারে না, তারা যেন মনে-মনে চিৎকার করে উঠল, ‘সু ভা ষ বো স?’
পি আর-কে যোগেন সবটাই বলতে পারে—উনি এলেনও দেরিতে, অফিসও তখন ফাঁকা।
সমস্যার কথাটাই বলে যোগেন— ‘সুভাষবাবু আসতে চান, মিটিং তো তালি করতেই হবে। ‘ক্যালক্যাটা শিডিউল ক্লাশ লিগ’-এর নামেই হোক। প্রসন্নদাস তো আবার ওনাকে স্থানকাল কয়্যা থুয়্যা আইসছে। সুভাষবাবুকে তো আর নিজেদের কথা বলা যায় না। ১৩ মার্চ অ্যালবার্ট হল তো প্রসন্নের বুকিং। তাহলে কী করা হবে?’
ঠাকুর বলে, ‘ও কিছু ঠেকবে না। প্রসন্নর সঙ্গে কথা বলে নেব। লিগের নামেই মিটিং ডাকা হোক।’
পি আর-এর মুখ দেখে তার মনের ভাব বোঝা যায় না। যোগেনের মনে হল, পি আর সব ঘটনাই জানে কিন্তু তাকে বলল না। সেটা জিগগেস করে জানতে তার মানে লাগে।
পি আর বলেন, ‘সুভাষবাবু এলে তো মিটিংটা বড় করেই করতে হয়। জানাতে হবে সবাইকে। জানলে সকলেই আসবে। একটা নামের লিস্ট করবেন নাকী।’
যোগেন একটা লম্বা কাগজ কোর্টের ডেমি পেপারের মত খাড়াখাড়ি ভাঁজ করে বলে, ‘অ্যাসেম্বলির পার্টি ধইর্যা বলবেন? এটা তো একটা সামাজিক ব্যাপার। পার্টি বাদ দিলে হয় না? বিশিষ্ট গণ্যমান্যদের ডাইকলে হয় না?’
পি আর একটু ভেবে সামান্য হেসে বলেন, ‘পার্টির বাইরে মান্যগণ্য পাবেন?’
যোগেনও একটু হেসে ও ভেবে বলে, ‘এইভাবে খাড়া হয় একডা—পার্টি ছাড়াও স্বীকৃতি পরিচয় খ্যাতি আছে। যেমন ধরেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বা ডাক্তার বিধান রায়-
‘বেশ তাই করুন, দেখা যাক কী দাঁড়ায়। একটা হ্যান্ডবিলও করুন সব জায়গায় বিলির জন্য।’
অ্যালবার্ট হলের গুরুচাঁদ স্মরণ সভার কাজের তোড়ে নাকানিচোবানি খেতেখেতেই যোগেনকে জেনে ফেলতে হয়—এসবই একটা প্ল্যানের অংশমাত্র। আর, মিটিঙের দিন আসতে-আসতে যোগেন বোঝে, নেতাগোছের এমন কেউ নেই যে এই সব জানে না। তবে এক যোগেন আর পি আরই পুরো ঘটনাটা কালক্রমিক ভাবতে পারে—দুজনের দুটো আলাদা ফাঁক সত্ত্বেও। পি আর-এর ফাঁক—সুভাষ বোসের ভূমিকা। আর যোগেনর ফাঁক—অ্যালবার্ট হল বুকিংটা কে করল? প্রসন্ন দাস ঐ মিটিঙের কথা সুভাষবাবুকে বলতে গিয়েছিল—মল্লিকদের লোক হিশেবে। চারদিকে গুজব রমরম করছে যে মন্ত্রিসভার অদলবদল হবে, শিডিউল কাস্ট মন্ত্রীদের অন্তত একজনকে ছাড়ানো হবে ও নতুন একজনকে নেয়া হবে। মুকুন্দবিহারী যাতে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত না হন তার অনুকূল অবস্থা তৈরি করার জন্য সুভাষবাবুকে নিয়ে একটা সভা করার বুদ্ধি খেলে পুলিন মল্লিকের মাথায়। উপলক্ষটা কী হবে সেটাই বের করা যাচ্ছিল না।
এমন সময় মুকুন্দবিহারীর লোক, অ্যালবার্ট হলের প্রসন্ন দাস, ওঁকে জানান—১৩ মার্চ অ্যালবার্ট হল বুক করা হয়েছে গুরুচাঁদ ঠাকুরের স্মরণসভার জন্য কিন্তু কারা বুক করেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। মুকুন্দবিহারীই পরামর্শ দেন—যারাই বুক করে থাক, বিষয়টা তো গুরুচাঁদ ঠাকুর, তাহলে হলের পক্ষ থেকে প্রসন্ন দাস দেখা করে সুভাষকে আমন্ত্রণ জানাক। সুভাষ অনুরোধের জবাবে প্রসন্নকে বলে এমন অনুষ্ঠানে না-যাওয়ার তো কোনো কারণ নেই, যদি সে কলকাতায় থাকে। শরৎ বোসের কাছে সুভাষ ঘটনাটা বললে, শরৎ বোস কোনো প্ৰসন্ন দাসকে চিনতে পারেন না। বলেন, অ্যালবার্ট হলই কি করছে? তাহলে তারা লাইব্রেরিয়ানকে তোমার কাছে পাঠাবেন কেন। তিনি তো ওখানে চাকরি করেন। তাহলে তো কর্তাব্যক্তিরা কেউ আসতেন। তারপর শরৎ বোসই উপায় বাতলে দেন— গুরুচাঁদ ঠাকুর মানে তো বরিশাল-ফরিদপুরের নমশূদ্রদের ব্যাপার। তাদের তো অনেক নতুন-পুরনো বড়-বড় নেতা আছে। পি আর ঠাকুর গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাতি, ব্যারিস্টার হয়ে এসেছে। যোগেন মণ্ডল কংগ্রেসের ক্যানডিডেটকে হারিয়ে জিতেছে। এদের যার সঙ্গেই দেখা হোক, আমি বলব তুমি ডেকেছ। তারপরে ঠিক করো।’
