১০
2 of 4

৮২. রাজবন্দীদের মুক্তি নিয়ে গান্ধীজির মধ্যস্থতা। ফলে স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চে ইনফর্মার প্রথা চালু।

৮২. রাজবন্দীদের মুক্তি নিয়ে গান্ধীজির মধ্যস্থতা। ফলে স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চে ইনফর্মার প্রথা চালু।

১৯৩৭-এর নভেম্বর বাংলার ছোটলাটগিরি শেষ করে দেশে ফিরে যাওয়ায় স্যার জ্যাক অ্যানডারসনের বেশ কেরামতি আছে। তিনি ভাইসরয়ের কাছে তাঁর শেষ গোপন চিঠিতে লিখেও ছিলেন, ‘প্রদেশটাকে একটু ঠান্ডাই রেখে যাচ্ছি।’

তাঁর রেটকার্ডটা এরকম দাঁড়াতে পারে।

৩৫ সালের নতুন ভারত শাসন আইন, নতুন ভোটারলিস্ট, জাতপাত অনুযায়ী আসন, ভোটের পর দল ভাগাভাগি—এই সব গোলমাল সত্ত্বেও তিনি বেয়াক্কেলে কিছু করেননি। লিগকে বাধ্য করেছেন, হিন্দু মন্ত্রী বাড়াতে। হিন্দু মন্ত্রীরা এখন স্বস্তিতেই আছেন। রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন এখানেই সবচেয়ে বেশি হয়েছে। গান্ধীর সাহায্য নিয়ে আন্দামানবাদে ১১০০ বন্দীকে ছেড়ে দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা যাতে না-লাগে তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেননি, কারণ সে-দাঙ্গায় ‘রাজ’-এর কোনো ক্ষতি নেই। টেররিজমে ‘রাজ’-এর ক্ষতি, সে-আন্দোলনের শিরদাঁড়া তিনি বিষিয়ে দিয়েছেন।

টেররিস্টদের গুলি তিনি খেয়েছেন, দার্জিলিঙে লেবঙের রেসকোর্সে। একটা গুলি ডানদিকের পাঁজরায় ঢুকে আছে। বের করা যায়নি। তা থেকে তাঁর একটা খিঁচুনিরোগ ধরে গেছে। হঠাৎ-হঠাৎ সেটার আক্রমণে জায়গা, সময়, প্রসঙ্গ গোলমাল করে মৃগী রোগীর মত হয়ে যান। তার সঙ্গে মনের ভিতরে একটা ত্রাস স্থায়ী হয়ে গেছে—দেশী মানুষের ভিড়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না, ঘামতে থাকেন। বিপ্লবীদের গুলি না-খেলে হয়ত টেরস্টিদের সম্পর্কে এমন নির্ভুল অনুভব তাঁর হত না ও সেই অনুভব থেকে তৈরি অ্যান্টিটেররিস্ট পলিসিও কার্যকর হত না। ঠিক পলিসি না, কোনো কৌশলও না, বরং বলা যায় অ্যাপ্রোচ। যদি মাঝে-মাঝে মৃগীরোগীর খিঁচুনি না উঠত, যদি পাঁচ-সাত জন দেশি লোক তাঁর কাছে এলে তিনি ঘামতে শুরু না-করতেন ভয়ে, তাহলে স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ থেকে যে হত্যা-তালিকা, টেররিস্টরা যাদের মেরেছে তাদের আর যাদের মারবে বলে ঠিক করেছে, তাদের, তাকে পাঠিয়েছে সেই কাগজগুলির দিকে তাকিয়ে থাকা অত ভাবলেশহীন হত না। এটা সম্পূর্ণতই আইজির বিষয়। তিনি এটাকে তাঁর ভাবার বিষয় করেননি। একজন নতুন ডিআইজি স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ নিযুক্ত হয়েছে। সরাসরি তাঁরই বিষয় এটি। মহাত্মা গান্ধী যখন কলকাতায় এসেছিলেন বন্দীমুক্তির ব্যাপারে আর সরকারের শর্ত অনুযায়ী সব জেলখানা ঘুরে-ঘুরে রাজবন্দীদের সঙ্গে দেখা করে জানতে ও সরকারকে জানাতে চাইছেন—যাঁরা বা সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন তাঁদের বিশ্বাসের কোনো বদল ঘটেছে কী না—তখন এই ডিআইজি ছিলেন গান্ধীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অফিসার। গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক হত লিস্ট ধরে-ধরে। সেই ডিআইজি অফিসার গান্ধীর চক্করটা সবচেয়ে আগে ধরতে পেরেছিলেন। সেবার গান্ধী খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডক্টর জীবরাজ মেহেতা টেলিগ্রাম করে লাটশাহেবকে জানান, উনি যেন কিছুতেই না ফেরেন, ওঁকে যেন কলকাতায় আটকে রাখা হয়, দরকারে হাউস-অ্যারেস্ট করে। গান্ধী কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, শেষে একদিন রাজি হয়ে গেলেন। থাকতেন, যেখানে তিনি উঠেছিলেন শরৎ বোসের সেই বাড়িতে। মাসখানেক ছিলেন গান্ধী। একদিন লাটশাহেবের ঠাট্টার উত্তরে প্রাসঙ্গিক হেসে সেই ডিআইজি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, স্যার, গান্ধী আর শরৎ বোসকে পাহারা দেয়া, এমন অসম্ভব একটা কাজ যে এরকম কোনো কাজ থাকাই উচিত নয়। আমাকে যখন বলেছিলেন গান্ধী, ‘যতক্ষণ আমার বিবেক শিবের জটার পানির মত এত স্বচ্ছ না-হয় যে একআঁজলা জলে নবগ্রহের প্রতিবিম্বন ঘটে, ততক্ষণ আমি ইংরেজ সরকারকে এই রাজবন্দীদের মতপরিবর্তন সম্পর্কে কোনো গ্যারান্টি দিতে পারি না। অথচ তাঁরা বলেছেন—আমার কথাই চূড়ান্ত। প্রেসিডেন্সি আর হিজলি জেলে, রাজবন্দীরা তাঁদের মনের কথা আমাকে অকম্পিত স্বরে জানিয়েছিলেন যে কোনোরকম মুচলেকা না দিয়ে তাঁরা শর্তহীন মুক্তি চান। আমিও তাঁদের কথা দিয়েছি-বন্দীদের পক্ষ থেকে কোনো আপোশপ্রস্তাব দেয়ার অধিকার আমার নেই। গবমেন্টের সঙ্গেও বন্দীমুক্তি ব্যাপারে আমার মত মেলেনি। তাঁরা বলছেন—প্রত্যেকটি ঘটনাকে স্বাধীন ঘটনা হিশেবে বিবেচনা করতে হবে। আর আমি বলছি—এগুলো সব একটাই ঘটনা, মত ও পথ যদি বদলাতে হয়, সবাইকেই বদলাতে হবে। তবু আমি সরকার ও রাজবন্দীদের উলটো কথা মেনে নিয়েছি, আমার স্বচ্ছতার জন্য।’

এমনিই স্যার গান্ধীজির কথা বোঝা শক্ত। তার সব কথাই শাদাসিধে, সরল। কোনো প্যাঁচঘোঁচ নেই, কোনো গিঁট নেই। সেই ঢঙেই যখন এমন কথা বলে যান যে সরকার ও রাজবন্দীরা উলটো কথা বলছে। তিনি সেটা মেনে নিয়েছেন—এই দুই পক্ষের কাছেই তাঁর নিজের পরিচ্ছন্নতা প্রমাণের জন্য। একথার মানে বোঝা, স্যার, আমার কথা? আমি পুলিশ, আমাকে ধরে আনতে বললে ধরে আনতে পারি কিন্তু ছাড়তে পারি না। অথচ স্যার, ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রত্যেকটি কেসের খুঁটিনট দেখছেন, জিজ্ঞাসা করছেন, এফআইআর-এর সঙ্গে চার্জশিটের অমিল বের করছেন। একদিন অনেকগুলি স্পাইমার্ডার কেস ছিল। আসল আসামীকে তো কবেই লটকে দেয়া হয়ে গেছে। দলের লোকরা কয়েদ খাটছে। গান্ধীজি কাগজের দিকে মুখ রেখেই বললেন, ‘গুপ্তচরবৃত্তি চিরকাল একটা অসৎ কাজ। সেই অসুস্ততার ফলে কারো যদি ক্ষতি হয়, তাহলে সেই ক্ষতিগ্রস্ত তো ঐ গুপ্তচরকে হত্যা করতে প্ররোচিত হতে পারে। আইনত এগুলিকে প্ররোচিতহত্যা ধরা উচিত। অথচ তাদের বিচার হয়েছে ইচ্ছাকৃত খুন হিশেবে।’

গান্ধীজির এই কথাতে সেই ডিআইজি (স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ) স্বপ্নলব্ধ ওষুধ পাওয়ার পর জেগেওঠার মত বুঝে ফেললেন—গান্ধীজির আগের একদিনের দুর্বোধ্য কথাটা—দুই শত্রুপক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচ্ছন্নতা রক্ষাই যদি গান্ধীজির প্রধান কাজ হয়, তাহলে, ডিআইজি (স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চ)-র প্রধান কাজ হওয়া উচিত টেররিস্টদের ভড়কি দেয়া। ডিআইজি (স্পেশাল ব্যাঞ্চ)-র তো কোনো মাঝখান নেই। তিনি তো একপক্ষের লোক। মাঝখানের, দুইপক্ষের মাঝখানের জায়গাটা খালি পড়ে আছে। দিনের-পর-দিন গান্ধীজিকে দু-হাজারের ওপর (আন্দামানসহ) রাজবন্দীদের ফাইল দেখাতে না-হলে, গান্ধীজির কথা থেকে এই মাঝখানের জায়গাটা ডিআইজি দেখতে পেতেন না। তিনি ছোটলাট অ্যান্ডারসন-এর পূর্ণ সম্মতিতে স্পেশ্যাল ব্র্যাঞ্চে ইনফর্মার পদ্ধতি চালু করে দিলেন। আগে ছিল ‘অ্যাপ্রুভার’, রাজসাক্ষী, দলের ভিতর থেকে। এখন শুরু হল দলের বাইরে থেকে, পাড়া থেকে, বাড়ি থেকে, স্কুল থেকে, আত্মীয়দের মধ্য থেকে ইনফর্মার খোঁজা। খুঁজে বের করে অফিসাররাই। ইনফর্মার ঠিকঠাক খবর দিলে, সেই অফিসাররাও বেশ বড় দরের নগদ পুরষ্কার পায়। অফিসার মানে থানার সেকেন্ড অফিসার পর্যন্ত। মুফতে এত নগদ টাকা বাঙালি, শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত হিন্দুদের বাড়িতে আয়ের একটা পথ খুলে দিয়েছিল। এরা একটুআধটু সম্পন্ন পরিবার, ডার্বি ঘোড়দৌড়ের টিকিটও কাটত। তিরিশ সালের পর কোনো বড় রকমের বিপ্লবী ঘটনার হদিশ ইনফর্মারদের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া যায়নি। বেশির ভাগই পারিবারিক ইনফর্মার। তখনো তো একান্নবর্তী বাড়িই বেশি। এক ভাই যদি সরকারি চাকরি করে, আর-এক ভাই যদি বাড়িতে বসে সম্পত্তি দেখাশুনো করে, আর-এক ভাই হয়ত বিপ্লবী দলে গিয়ে জুটেছে, আরো এক ভাই হয়ত পার্টটাইম ইনফর্মারের কাজ শুরু করল। বিপ্লবী ভাইয়ের কথাবার্তা থেকে আঁচ করে খবরটা পৌঁছে দেয়া। তারপর তো আর তার কোনো দায়িত্ব নেই। ব্যক্তিগত বা দলগত টেররিজম ৩৮-৩৯ সালের পর ক্রমেই কমে যেতে লাগল তার আসল কারণ বড়-বড় বিপ্লবী নেতা, যাঁরা সারা জীবনই ছেলে-দ্বীপান্তরে কাটাচ্ছিলেন, তাঁরা সন্ত্রাস-বিপ্লবে বিশ্বাস হারিয়ে, নতুন বিশ্বাস খুঁজে পেয়েছেন শ্রেণিবিপ্লবে। অ্যানডারসন শাহেবের আমলে বন্দীমুক্তি আন্দোলন প্রধান আন্দোলন হয়ে উঠল আর ৩৭ সাল থেকে গান্ধীজি প্রদেশগুলির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলেন, বিশেষ করে বাংলায়, নিজে এসে। অ্যানডারসনশাহেব চলে যাওয়ার আগে ১১০০ রাজবন্দী ছাড়া পেয়েছিলেন। এটা একটা বাহাদুরি তো বটেই—সে-বাহাদুরি আমলাতান্ত্রিকই হোক, সাম্রাজ্যবাদীই হোক, প্রশাসনিক হোক। বিপ্লবীদের খবর জানতে ইনফর্মার ব্যবস্থা চালু করা, তাদের ধরা, বিচার করা, শাস্তি দেয়া ও ছাড়া যদি একটা লোকই করে মাত্র দু-চার বছরে, তাহলে সেটা তার বাহাদুরি নয়?

তার চাইতেও বড় বাহাদুরি—একটা খিচুড়ি সরকারকে চালানোর কৌশলে। ফজলুল হকের মত প্রধানমন্ত্রী—তার কোনো পার্টি নেই, শুধু সে নিজে আছে। কিন্তু নিজে সে এমন সব হয়ে আছে ও নিজে ছাড়া তার কাছেও আর-কেউ এতটাই নেই যে অ্যানডারসন শাহেবকে কত গোপন নোট, ‘টুবি ওপনড বাই অনলি হিজ মেজেস্টি,’ বলে মার্কা দিয়ে ভাইসরয়কে পাঠাতে হয়েছে সেসব তো এখন বেরুেচ্ছে, আর্কাইভ থেকে, সরকারি ফাইল থেকে, তাছাড়াও বড়-বড় লোকদের ‘পেপার্স’ থেকে। ‘না, না, ফজলুল হক শাহেব যুক্ত প্রদেশে মুসলমানদের বলেছেন—এখানে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে, তার বদলা বাংলার হিন্দুদের ওপর নেয়া হবে—এই বলে যে খবর বেরিয়েছে সেটা একেবারেই তাঁর মনের কথা নয়। এ নিয়ে আমার সঙ্গে ওঁর কথা হয়েছে। উনি ওরকম মানুষই নন। হিন্দুরা তো ওঁকেই বিশ্বাস করে সবচেয়ে বেশি।’ আপনি এ নিয়ে কিছু ভাববেন না।’

‘হ্যাঁ, আপনি মদের ব্যাপারে যা শুনেছেন, কথাটা ঠিকই, তাতে বাকি অর্ধেকটা হয়ত আপনাকে এখনো জানানো হয়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী হকশাহেব একটু বেশি রকম আবেগপ্রবণ ও একই সঙ্গে শেয়ালের মত ধূর্ত। উনি এক জায়গায় ঘোষণা করে দিয়েছিলেন—মদ্যপানবিরোধিতা কী করে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয় হয়? মদ্যপান তো আর শাহেবরা শেখায়নি। আমরা নিজ গুনেই শিখেছি। যদি বন্ধ করতে হয়, আমাদেরই করতে হবে আর সেটা করার জন্য সারা দেশ জুড়ে স্বরাজ-আন্দোলনের দরকার হয় না। এই আমি আপনাদের সামনে ঘোষণা করছি—আজ সন্ধে থেকে বাংলা প্রদেশের সীমার মধ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ। সমস্ত মদের দোকান বন্ধ থাকবে। কাউকে যদি খেতে হয় তাহলে তাকে হয় বিহার, না-হয় আসামে, না-হয় উড়িষ্যায় যেতে হবে। সোনার বাংলায় বসে রসের মদ-খাওয়া নিষিদ্ধ। এই ঘোষণার একটি কপি সহ আমার আবগারি মন্ত্রী মন্ত্রিসভায় এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলেন আর অর্থমন্ত্রী বলে দিলেন, ‘দি ইকনমি অব দি প্রভিন্স উইল ক্র্যাশ লাইক এ পাঁইট, ডিউ টু দি লস অব এক্সাইজ ডিউটি।’ অনেক আলোচনার পর ঠিক হল—পরীক্ষা করার জন্য যে জেলায় সবচেয়ে কম মদ বিক্রি হয় অর্থাৎ সবচেয়ে কম আবগারি শুল্ক আদায় হয়, সেই জিলায় মদ্যপান নিষিদ্ধ হোক। মদের দোকানগুলিকে সেটা জানিয়ে দেয়া হোক। কিন্তু কোনোভাবেই যেন জিলাটিকে ভাগারের হাড়ের মত খটখটে করা না হয়। ওষুধ হিশেবে এর ব্যবহার চালু থাকবে। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমরা যখন কথা বলছি, হকশাহেব একটিও আওয়াজ করেননি। সিদ্ধান্তের পর তাঁর সম্মতি চাইলে, তিনি কথা না বলে ঘাড় হেলালেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক প্রাচীন। অর্থমন্ত্রী ওঁকে বললেন, ‘তোমার মাথায় হঠাৎ মদ্যপান ঢুকল কেন।’ প্রধানমন্ত্রী জবাব দিলেন—’মিটিঙে গান্ধীবাদী হিন্দু বেশি ছিল, তারা আমাদের নিন্দে করল, আমরা জাতীয় নীতি মানছি না বলেই স্বরাজ আসছে না। আমি কথাটা চ্যালেঞ্জ হিশেবে বলেছি।’

‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কাগজ বা অন্য কোনো সূত্র থেকে কোনো খবর পেয়ে আপনি নিজেকে উদবিগ্ন করবেন না। ওঁর ধরণটাই একটু এলোমেলো। বাইরের লোকরাও তার সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে তাই বানায়। আপনাকে একটা ঘটনা জানাই, তাহলে হয়ত আপনার ধারণা করতে সুবিধে হবে। কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম শহরতলিতে সাবেকি ভাইসরিগ্যাল প্রাসাদের কাছাকাছি, বেহালা বলে একটি পুরনো গ্রামে একটা ডগরেস শুরু হয়েছে। জমিটা খাশ। একজন উদ্যোগ নিয়ে সেখানে বসবার গ্যালারি বানিয়ে ডগরেস শুরু করেছে। এখন সরকার থেকে তাদের বেটিঙে আপত্তি করায়, তারা উকিলের চিঠি দিয়ে মামলার ভয় দেখাচ্ছে। মামলা হলে হত—তা নিয়ে মন্ত্রিসভার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মামলায় তো হকশাহেবকে অস্বস্তিকর সব প্রশ্ন করে একটা রসালো কুৎসা পাকানো হবে। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু দিন আগে কে-একটা চেনা লোককে ওখানো ডগরেসের অনুমিতসহ একটা চিঠি দেন। খাশজমিতে ওরকম রাইট দেয়া যায় না। তারপর লোকটির সঙ্গে আর কোনো দেখাই হয়নি। লোকটি এখন তার হাতের ঐ প্রমাণগুলি দিয়ে একটা মামলার হুমকি দিচ্ছে। ক্যাবিনেটের প্রতিটি সদস্য যে-সমবেদনা ও ভালবাসায় বিপদ থেকে হকশাহেবকে বাঁচাতে চেষ্টা করছিলেন, তা দেখে আমার সত্যি নোবিলিটি অব দি হিউম্যান কাইন্ডের কথা মনে এল। ঠিক হল যে এটা মিনিট হবে না। লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা বলে একটা নিষ্পত্তি করা হবে। বিষয়টা প্রমোদকরের আওতায় সুতরাং অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে।’ ১৯৩৭-এর এপ্রিল থেকে ১৯৩৯-এর আগস্ট পর্যন্ত ২৮ মাসে চার-চার জন ছোটলাট—অ্যান্ডারসন, ব্রেবোর্ন, রেইড ও উডহেড—ভাইসরয়কে তাঁদের গোপন পাক্ষিক চিঠিতে বেহালার এই ডগরেসের কথা জানিয়েছেন। ভাইসরয় লিনলিথগো ছুটিতে গেছেন। অস্থায়ী ভাইসরয়গিরি করে ব্রেবোর্ন কলকাতায় ফিরে এসে অস্থায়ী গভর্নর রেইডকে দায়িত্ব মুক্ত করেন। কিন্তু তারপর অসুস্থ হয়ে পড়েন ও রেইড আবার অস্থায়ী হন। ব্রেবোর্ণ ৩৮-এর জুনে মারা গেলে অপ্রস্তুত ভাইসরয় সাততাড়াতাড়ি উডহেড বলে একজনকে দার্জিলিঙে গভর্নর করে পাঠিয়ে দেন। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারও তাকে দেয়ার সময় পাওয়া যায়নি। ৬ জুন দার্জিলিঙে পৌঁছুল, বোধহয় নিজেই গভর্নর্স প্লেসে গিয়ে নতুন লাটশাহেব বলে পরিচয় দিতে হয়েছে। নইলে তার শপথ গ্রহণ ১২ জুন পর্যন্ত পেছিয়ে যাবে কেন। শপথ নেয়ার এক সপ্তাহ পরে বেচারা নতুন লাট ভাইসরয়কে লিখছে, ‘চাকরিতে কোন জাতের জন্য কত শতাংশ রাখা হবে, তা নিয়ে মন্ত্রিসভায় পুরো দমে আলোচনা হয়েছে, ভালই হয়েছে, সব জানতে-বুঝতে পারলাম। কিন্তু সত্যি বলতে প্রথমে আমার একটু মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল—আমাকে তো ক্যাবিনেট মিটিঙে থাকতে হচ্ছে ইনফর্মালি আর প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র দেখে মত দিতে হচ্ছে তৎক্ষনাৎ।’ এমন করুণ চিঠিতেও সেই ডগরেস। আর মাত্র মাস চোদ্দ কাটতে-না-কাটতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবে অথচ তখনো গোপন খবর ডগরেস। এমন কি ৩৯ সালের ৬ আগস্ট গোপন চিঠিতে ডগরেস, যুদ্ধ শুরু হতে তখন ২৫ দিন মাত্র বাকি। সাম্রাজ্যের যুদ্ধ প্রস্তুতি এতটা আত্মসন্তুষ্ট? এতটা অপ্রস্তুত? ব্রিটিশরা সত্যি বিশ্বাস করেনি যে সারা পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবে, কয়েক মাসের মধ্যে-সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী থেকে গভর্নরদের গোপন রিপোর্টের পৌনঃপুণিক বিষয় ডগরেস, ডগরেস কি আবগারি শুল্কের আওতায় পড়ে, লোকটা গবমেন্টকে মামলা দেখাচ্ছে আর মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসানো থেকে বাঁচাচ্ছে। অথচ মন্ত্রিসভার মধ্যে তো তাঁর চরম বিরোধীও আছেন। তারাও যে হকশাহেবকে ফাঁসাতে চান না তার এক ও একমাত্র কারণ হকশাহেব আছেন বলেই মন্ত্রীরা আছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *