১০
2 of 4

৮০. শিমূলগড়ে যোগেন তর্কলঙ্কারের তর্কযুদ্ধ

৮০. শিমূলগড়ে যোগেন তর্কলঙ্কারের তর্কযুদ্ধ

যোগেন গাড়ি থেকে নামার আগে এসডিওকে বলল, ‘নানারকম কথা উইঠবে, নানা ভাষায় গালাগালি হব, আপনি ভদ্দরলোকের ছেলে, ইংরাজের অফিসার, আপনার পক্ষে দুঃসহ হব্যার পারে।

‘কিন্তু আমার তো ডিউটি, স্যার, আপনার সঙ্গে এই মিটিঙ করা—’

‘তা তো কইরব্যানই। আপনি যে আমারে পৌঁছায়্যা গেলেন সেইডা দেইখ্যাই বামুনগো কানে জল গিছে। ঘণ্টাখান পরে আপনি ঘুইরা আসেন।’

এসডিও গাড়ির ভিতর থেকে দেখে, যোগেন নেমে পায়ের জুতো খুলল, তারপর জুতোজোড়া বাঁহাতের আঙুলে ঝুলিয়ে ধুতিপাঞ্জাবিতে হেলেদুলে হাঁটতে-হাঁটতে সেই মন্দিরের দিকে যায়। এসডিও তার গাড়ি ঘুরিয়ে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যায়।

যোগেন সেই চাতালের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শতরঞ্চির ওপর সারি দিয়ে বসে আছেন বামুনরা—প্রত্যেকের গলাতেই পৈতে। দু-একজনের গলায় উত্তরীয় ছিল, তারাও সেটা একটু সরিয়ে রেখেছে পৈতে দেখাতে। যোগেন সকলের ওপর দিয়ে যখন চোখ বোলায়, বামুনরা সকলে তখন এক যোগেনকেই দেখে।

যোগেন তার বাঁহাতের আঙুলে ঝোলানো জুতো জোড়া একটু সামনে এনে, ফিরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘জুতা রাইখব কোনখানে? এইখানে?’ সে চাতালের নীচটা দেখায়। তারপর যেন নিজের মনেই বলে, ‘কুত্তা নাই তো?’ সে ঘাড় ঘুরিয়ে যেন কুকুর খোঁজে।

বামুনরা রেগেই ছিল। তারা জানতই না মিটিঙটা যোগেনের। তার ওপর জুতো নিয়ে যোগেন যা করল, তাতে তাদের ন্যায়ত রেগে যাওয়ারই কথা।

এক বুড়ো বামুন কপালে অনেকগুলি ভাঁজ ফেলে যোগেনকে বলে উঠল, ‘সেডা তো তুমি বাড়িতে রাইখ্যা অ্যালেই পারতা। এহানে হাতে ঝুল্যাইয়া আইস্যা আমাগো জিগাও—জুতা কোথায় রাইখব্যা। আমাগো কাজ তোমার জুত্যা পাহারা দেয়া?’

যোগেন চুপ করে থেকে একঝলক ভেবে নেয়—সে কি একটু বেশি করে ফেলল? তেমন কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে মনে হল সে জুতো জোড়া খুলে হাতে ঝুলিয়েছিল। সে ভেবেছিল—তার অনুগত্যে বামুনরা খুশি হবে। খুশি নাও হতে পারে—এমন ভয়ও তার একেবারে হয়নি, তা নয়। কিন্তু ততক্ষণে তো বামুনরা তাকে দেখেই ফেলেছে—সে জুতো হাতে ঝুলিয়ে এগচ্ছে। তখন তো আর হাত থেকে ফেলে জুতো পায়ে পরা যায় না। ‘ছি ছি বড় সিদ্ধান্তবাগীশ কর্তা, রাগের বশে নিজেরে এতখান ছোট কইরবেন না। আমাগো তাইলে সাহস বাইড়্যা যাবে। য্যান, আপনাগো অতডা ছোট করাডা অপরাধ না তত।’

‘অ্যাদ্দিন যহন তোমার বিধান ছাড়া আমাগো চইলছে, বাকি কয়ডা দিনও কাটব।’

যোগন একটু সাবধান হয়—এরা কি তাকে বসতেও বলবে না। যদি এরা সত্যিই তেমন কিছু করে, তাহলে যোগেনকেও তো গলা তুলেই কথা বলতে হয়।

যোগেন বলে ওঠে, ‘আমি বিধান দিলেও শোনার লোক কই? হাকিম না যে জুত্যা না পইর্যা সাক্ষাৎ কইরতে পারি। দেইখলেন তো হাকিমের লগে সাক্ষাৎ ছিল। সরকারের বিধান—কালাকোট আর জুত্যা না পইরলে হাকিম কথা শুইনব না। আর আপনাগো বিধান—চাঁড়াল জুইত্যা পইরা কথা কইলে আপনারা কথা শুইনবেন না। দুই বিধানের টানাটানিতে জরাসন্ধ বধ তো হয় চাঁড়ালরাই। দ্যাহেন-না, নিজের জুইত্যা নিজে মাথায় কইর‍্যা রাখছি। আপনার খড়মজোড়া মাথায় নিলে তো তাও অন্তত কিছুড়া পুইন্য জমত।’

‘তোমার যা কওয়ার আছে, কও-না—’ কেউ একজন বলে।

‘আমার তো কওয়ার খুব একটা কিছু নাই। শুনার আছে। আপনাগো কাছ থিক্যা। আমার মাথা তো বামুনের মাথা না, তাই শুইনতে-বুইঝতে টাইম লাগে। যদি কন জুতা-হাতে খাড়াইয়্যা বেবাক কথা শুনা ও বুঝা যাবে—তাহাইলে তাই করব। কিন্তু আমারে তো পাঠাইছেন গভর্নর। আমারে তো রিপোর্ট দিবার লাগব। সেহানে তো আমারে কইতে হবে কোন্ সিচুয়েশনে কীভাবে আমারে খবরডা দেয়া হইছে। আই ওয়াজ নট ইভন অ্যালাউড টু সিট অ্যান্ড টক। আই হ্যাড টু টক স্ট্যান্ডিং। কথাডা কিন্তু ফৌজদারির, ক্রিমিন্যাল অ্যাকটিভিটি এগেইনস্ট পিস অ্যান্ড মার্ডার অব টু নমশূদ্রস।’

যোগেন ইচ্ছে করেই ইংরেজিতে বলল। এতক্ষণ তো বুড়ো বামুনরা টিকি নাড়াচ্ছে। কিন্তু এতগুলো বামুনের ঘরে কি পড়াশুনো জানা ছেলে কেউ নেই। আজকালকার ছেলে? স্বদেশী? ডেটিনিউ? যে ঐ বামুনের দঙ্গলে বসে যোগেনের যুক্তি বুঝবে? আর যুক্তিই-বা কেন শুধু? বামুন-শূদ্র এইসব বিভাজনের বিরুদ্ধে যেতে যার যুক্তি দরকার হয় না? যোগেনের আরো একটা লক্ষ ছিল—বামুনদের এই ভিড়ে কি দু-একজন সরকারি অফিসার নেই, অন্তত রিটায়ার্ড, যারা ফৌজদারি কেস বোঝে, যারা ক্রিমিন্যাল অ্যাকটিভিটি এগেইস্ট ল অ্যান্ড অর্ডার কথাটিতে ভয় পাবে? যদি এই বামুনের গুষ্টিতে এমন দ্বিভাজন বা ত্রিভাজন না-ঘটে, তাহলে যোগেন জুতো হাতে ঝুলিয়েই ফিরে যাবে। এতক্ষণে তাকে বসতে পর্যন্ত বলল না।

যোগেন চুপ করে দাঁড়িয়েছিল ও ভিতরে-ভিতরে ফুঁসছিল। নিজের মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টাও যে সে করছিল না, তা নয়। কিন্তু সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল—বামুনগো বেয়াড়া সামলানোর কথা একটু সময় দিয়ে ভাবতে হবে। সেটা আরো কঠিন ও জটিল কাজ। লিগ বা প্রজা পার্টির লোক্যাল লিডারদের সঙ্গে কথা বললে, কাল বিকেলেই পৈতে ফেলে দিয়ে সব বামুন ছুটবে নমপাড়ায়—’বাঁচা বাবা, হিন্দুদের মান বাঁচা’–তাহলে তো বামুন-শূদ্র দাঙ্গা বদলে দিতে হয় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায়। নমশূদ্র ছাড়া হিন্দুগো মুসলমানের সঙ্গে কোনো দাঙ্গা হতে পারে?

যোগেন দেখতে পাচ্ছিল, দু-একজন কানাকানি করছে, একজন হাফ-হাতা-পাঞ্জাবি পরা বাবু- বামুন গিয়ে গরদের পাঞ্জাবি আর চশমা পরা এক জমিদার-বামুনের পাশে বসে, কানে-কানে কিছু বলল ও তাঁর বলা কিছু কথাও শুনল। তাহলে কি বামুনগো কানে জল ঢুকল?

‘আমি কিন্তু একডা কথা বুঝব্যার চাই কিন্তু পারি না যে, সেডি যে আমার বুদ্ধির অভাবের কারণেই ঘঠছে, সে-বিষয়ে আমার সন্দ নাই। আপনাদের কারো থাইগলেও সংশুধোন কইর‍্যা নিবেন।’ কথা বলছেন খাদিমবাড়ির ছোট ভাই। বিলেতফেরত। খুব বড় চাকরি করে দিল্লির দিকে। ‘এই মিটিঙটা যে ডাকা হইছে সেইডা তো আমাগো কারো অবগতির বাইরে না। এই মিটিঙে যে মিস্টার মণ্ডল আইসবেন সেডাও এগগেরে কারো অবগতি ছিল না তাও না। তালে তারে এতডা সময় খাড়া কইর‍্যা রাখার কী অর্থ? যে আপনারা তারে বহিরাগত মনে করেন?’

‘মিটিং তো আমরা ডাহি নাই। আমরা জাইনব কী কইর‍্যা কে অভ্যাগত আর কে বহিরাগত?’

‘ছোড়ঠাউর কত্তা, আমরা যহন এই মিটিঙটাত আসি, তহন তো এইসব কথা উঠে নাই। আমরা তো দিব্বি গটগটাইয়্যা আল্যাম।’

‘উনিও তো গটগট্যায়াই আইলেন, কথাও কইলেন—’

‘উনি তো জুইত্যা হাতে জুলাইয়্যা আইসছেন। তাতেই কি পরিষ্কার না—এহানকার জুতা পরা না পরার হাঙ্গামার সব বার্তা উনার জানা আর উনি সেই বিষয়েই এই মিটিঙে আইসছেন। একোমোডেট হিম।’

মিটিং একটু চুপ করে থাকে। ছোট ভাইও চুপ করে থাকে। তারপর গলা নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলেন, ‘দেন বেটার আই লিভ দি মিটিং। আই ক্যানট বি এ পার্ট অব দিস ভায়োলেশন অব ম্যানার্স। মাই ফোরফাদার্স ওয়্যার পায়াস মেন অ্যান্ড দে হ্যাভ টট্ মি দ্যাট এ ব্রামহিন ইজ ব্রামহিন টু হিমসেলফ ফার্স্ট।’

‘এইডা তো মন্দিরের পার্ট। আমরা এখানে একজন আনটাচেবলকে বসার অনুমতি দিতে পারি না।’

‘বাধাও দিব্যার পারেন না। যদি মনে করেন এতে শাস্ত্র লঙ্ঘন ঘটিছে, তাইলে আপনাগো প্রায়শ্চিত্য বিধান খুইল্যা প্রাচিত্তির কইর‍্যা নিবেন।’

‘বাঃ। দোষকারক উনি আর প্রাচিত্তির কারক আমরা।’

‘এডা তো গোঁশাইজি আপনাগো সুয়ো মোটো ফাইন্ডিং যে মিস্টার মণ্ডল এইখানে বইস্যা দোষ স্পর্শ করলেন। তাইলে তো প্রাচিত্তিরও তো আপনাগোই করা লাগে—’

‘এডা ভালো কইছ ছুডো ভাই। নববিধান। শূদ্রের অপরাধে ব্রাহ্মণের প্রায়শ্চিত্ত। মরার সময় কেউ কি পাঁজি পুথি দেইখে মরে যে কী কী দোষ স্পর্শ হইছে। মরার পর তো সেইসব বাহির হয়। এহানেও তাই। যোগেনবাবুরে বইসতে কন,’ বলল হাফ-পিরান পরা, ত্রিবেদী বাড়ির স্বাদেশী ছেলে।

‘তুমারে ছাইড়ল কবে?’ খাদিম জিজ্ঞাসা করে ত্রিবেদীকে।

‘ছাড়া বইলতে সরকার যা বোঝে, তাতে অ্যাহনো তো ছাড়ে নাই। নিজ গৃহে নজরবন্দি। এর আগে মাস সাতেক রাখছিল কুষ্ঠিয়ার ডেটিনু।’

‘শরীরডা ঠিক আছে তো?’

জেলখানায় তো শরীরের মাত্র দুইডা হাল হব্যার পারে। নো থার্ড চয়েস। হয় মুড়াইয়া ভীমভবানী, না-হয় শুষ্কং কাষ্ঠং। না, না, বলা ভাল, দগ্ধম্ চিতাকাষ্ঠম্‌’।

খাদিম আর ত্রিবেদীর কথায় বামুনরা চুপ করেই ছিল, তাদের কেউ-একজন, নিজেকে না দেখিয়ে আঙুল নাড়িয়ে মণ্ডলকে ইশারা করে বসে পড়তে। তার ইশারা যোগেন দেখল কী করে। অথচ সে অনুমতি পেয়েছে ধরে নিয়েই জুতোজোড়া দাওয়ার নীচে রেখে পা গুটিয়ে দাওয়ায় বসে। তার সামনের দাওয়াটুকুতে শতরঞ্চি ছিল না। শতরঞ্চিতে বসতে হলে দু-পা উত্তরে যেতে হত। যোগেন শতরঞ্চি ছাড়া মেঝেতেই বসে পড়ল।

‘মণ্ডল বিবাদডা কুতায় কও তো! তোমাগো মন্দির তোমরা জুত্যা পইর্যা, ধুতি পইর্যা, না পইরা তোমরা যাও গিয়া। আমাগো মন্দিরে আমরা কী পইরা আইসব সেডা তো আমাগো ব্যাপার। তোমরা ক্যান বামুন মন্দিরে হাত বাড়াও?’ কথাটা বললেন সামনের সারির কেউ—খালি হাত মাথার ওপর লম্বা তুলে ও নির্দেশক আঙ্গুলটা নাচিয়ে।

যোগেন একেবারে নিচু গলায় বলে, ‘স্যারম কিছু ঘইটছে বইল্যা তো শুনি নাই। আমরা তো এইডাই জিগ্যাবার চাই। মন্দিরডা তো আপনাগো। আমাগো নিয়্যা ট্যানটুনি কিতা, ঠাউর।’

‘ও। তোমাগো তাইলে ভাগাভাগি শ্যাষ? এডা তোমাগো মন্দির না, এডা আমাগো মন্দির। যাউক গ্যা, তাও মন্দির বইল্যা স্বীকার দিছ!’

‘ঠাউর কত্তা। অনেকডা সময় বৃথা যায়। এবার কাজের কথাডা তোলা হউক,’ যোগেন গলা তুলে সবার মাথার ওপর দিয়ে দৃষ্টি ভাসিয়ে গম্ভীর গলায় বলল। সভার থমকে যাওয়াটা বোঝা গেল, যেমন বোঝা গেল সেই থমকে যাওয়া বদলাতে এক চ্যাংড়া বামুনের গলা, ‘সময়ের সার্থব্যর্থ তো আমাগোও আছে।’ যোগেন এই কথার কোনো পাত্তা না দিয়ে সভার ওপর দৃষ্টি ভাসিয়ে বলে, ‘এই মন্দিরে বইস্যা নমশূদ্রগের জুত্যা পরায় বাধা দেয়া হইছে, একবছর ধইর্যা নমশূদ্রগো মারা হইত্যাছে। দুইডা শুদ্দুর মার্ডার হইছে। গবর্মেন্ট এডাকে ইনট্রা হিন্দু রায়ট, হিন্দুগ নিজেগো ভিতর দাঙ্গা বইল্যা মনে করে। আপনারা কী মনে করেন সেডা কন?’

‘এইডা তুমি কী লিড কোশ্চেন কইরল্যা যোগেন, দ্যাশজোড়া তোমার নাম, তোমার আর্গুমেন্ট শুইনবো বইল্যা আসছি, আর তুমি ওপেনিং কোশ্চেন কইরল্যা—গবর্মেন্ট এইভাবে আপনারা কী ভাবেন? ডিফেন্সের সাক্ষী তো তোমারে পালটা কইব, সে কথাডা আপনারে কব ক্যান? তোমার পালটাপক্ষের উকিলরে এমন ভাঙা বেড়া দেখাইয়ো না। বি অ্যালার্ট টু দি প্রসিডিয়োর।’

‘স্যা–র’, বলে যোগেন জোড় হস্তে উঠে দাঁড়ায়, ‘আপনি আইসছেন স্যার?’ এহানে কয়-পা যাওয়ার রাইট আমার, তা তো জানি না। দূর থিক্যা পদসেবা দিল্যাম, স্যার, আপনি আইসছেন স্যার?’ সিলেটের সবচেয়ে বড় উকিল, গোবিন্দ পুরকাইত, কলকাতা হাইকোর্টেও দাঁড়ান। ল-পয়েন্টে যেন কশাইয়ের মত ছুরি চালান। কশাই আর ডাক্তারে তফাত কী? কশাই ছুরি চালায় মড়ার ওপর আর ডাক্তার ছুরি চালায় জ্যান্তের ওপর। এদিককার উকিল মহলে, কলকাতাতেও, একটা কথা চালু হচ্ছে—পুরকাইতস ডিফেন্স।

‘তুমি তো আসল কথাডা ধইরছ, মনি, রাইট অব প্যাসেজ’, তোমার কি আমার কাছে আইসব্যার রাইট, রাইট অ্যাজ পার ল, আছে কি নাই। কোশ্চেনডারে রিফাইন করো, মানে অ্যাবস্ট্রাক্ট করো। পদসেবাই হোউক আর চপেটাঘাতই হোউক, হোয়াট এভার বি মাই পারপাজ দ্যাট ডাজ নট অ্যাফেক্ট মাই রাইট। অ্যাজ় পারল এ রাইট ইজ অলওয়েজে উইদাউট কনডিশন। বাট উইথ কনডিশন ইট বিকামস এ পারমিট। দিইজ আর টু ডিফারেন্ট এরিয়াজ অব ল। হোয়েদার ইট ইজ মাই রাইট টু ওয়াক আপটু পুরকাইত অর নট। এবং তুমি যদি আমারে আঘাত করো দেন ওপেনস্ দি সেকেন্ড এরিয়া—ইউজ অব রাইট।’

যোগেন জোড় হাতেই দাঁড়িয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে, ‘স্যার, আমি স্যার সেকেন্ড মুনসেফের কোর্টে গরু খোঁয়াড়ে দেয়ার মামলার উকিল। আমারে স্যার ছাইড়্যা দ্যান।’

‘নো। আইভ হার্ড অব ইউ। ওপেন উইথ দি কোশ্চেন অব রাইট,’ সিট ডাউন—যোগেন যেন সত্যিই ইস্কুলের ছাত্র—ধপ করে বসে পড়ে বলল, ‘আপনারা নিজ কর্ণেই শুইনলেন স্যার প্রথমেই অধিকারের কথা তুইলতে বললেন। তো আপনাগো তাইলে তো কওয়া লাগে আপনাগো অধিকারটা কী আর আমাগো শুদ্দুর গো অধিকারইবা কদ্দূর?’

কমবয়েসি এক যুবক বেশ রেগে গিয়ে বলে—’মন্দিরে জুত্যা পরার অধিকারডা কে কারে দিব? আমরাও তো বেবাকই খালি পায়ে আসি মন্দিরে। কেউ যদি ভুল কইর‍্যা আইস্যা পড়ে, তাইলে তাগো শিক্ষা দেয়া যাবে না? এর মইধ্যে আবার অধিকার-মধিকার কোথন আসে?

‘আপনি যা কইল্যান, ঘটনাটা স্যাটুক হইলে তো কুনো বিবাদই নাই। বামুনঠাকুরের পোলাও যদি জুইত্যা পইর্যা ঠাকুরঘরে ঢুকে তারে তো শিক্ষা দিব্যার লাগবই। তয় যে ডেপুটি কমিশনার, এসপি, এসডিও হগলেই কয়—বামুনে-শুদ্দুরে রায়ট চইলতেছে এহানে একবছরের উপর? দুইজন খুনও হইল। যদিও তারা নমশূদ্র। দুইজনই।’

‘কে কারে কী বইল্যা বেড়ায় সেই দায়িত্ব এই শিমূলগুড়ির নতুন মন্দিরের সংলগ্ন অধিকারী বামুনগোক নিবার লাগব? এ তো বেশ ভালা কথা।’

‘কথাডা ভালই তুইলছেন। শিমূলগড়ে তো এই মন্দিরডা নতুন—

‘নতুন? আরে কও প্রাচীন। শ্রীহট্টরাজের তাম্রপণে ভূমিদান লেখা!

‘আমি তো কই নাই। আপনারাই তো কইলেন। প্রাচীনে আমর আপত্ত নাই। কিন্তু অন্তত এমন কোনো সাক্ষীরে পাওয়া যাইব না য্যায় তার বৃদ্ধ প্রপিতামহস্য বৃদ্ধপ্রপিতামহস্য মুখাৎ শুইনছে যে এডা একখান মন্দির আছিল –’

‘যহন ছিল না তখন আর থাইকব কী কইর‍্যা? তাম্রপত্রে যহন আছে, তহনই-বা না থাহে কী কইর‍্যা?’ বেশ বুড়ো একজন কথাটা বলে খুব খুশি হয়ে শতরঞ্চির ওপর তাঁর ডানহাতের তেলো থাবড়ালেন দুইবার।

‘আমিও তো তাই কই ঠাকুরমশায়—যা ছিল না, তা ছিল না। যা আছে, তা আছে। মন্দিরডা থাহার সময় যদি হাজার দেড় হাজার বছর আগে হয় আর ফিরা যদি দু-চার বছর হয়—তাইলে না-থাকার টাইমটাই তো হাজারগুণ বড়।’

‘আরে, না-ছিলডা কী? আমাগো জ্ঞান ছিল না এইডা দেবতার মন্দির। মন্দির তো মন্দিরই ছিল। ঘুম থিক্যা প্রভাতকালে উইঠলে কি জাগ্রত ব্যক্তির পূর্ব অস্তিত্ব লোপ হয়’-এবারও সেই বুড়ো পণ্ডিতমশাই বলে ও বলে, খুশি হয়ে শতরঞ্চির ওপর হাতের তালু ঘষে।

‘পণ্ডিতমশায়, মন্দিরডা নিয়্যা অজ্ঞান ছিলেন কিন্তু এই জায়গাডা নিয়্যা তো সগলেরই একডা জ্ঞান ছিল—এটা জংলা জায়গা, পায়ে হাঁইট্যা রাস্তা কমানো যায়, বড়ইগুল্যা খুব মিষ্টি, বড়ই পাইকলে মাঘ-ফাল্গুনে ঝাঁক ঝাঁক টিয়াপাখি। আসে—এই জ্ঞানটা তো হাজার বছরের উপুর ন্যায্য।’

‘ন্যায্য করো না। কও প্রচল।’

‘আরো ভাল। তাইলে কথাডা কি জমির দখল আর মন্দিরের এক্তিয়ার নিয়্যা বামুনগ সাথে শুদ্দুরগ বিরোধ। না কী প্রাচীন প্রচলের জ্ঞানের সঙ্গে নতুন তাম্রলিপির জ্ঞানের বিরোধ। আপনারা হয়ত ঐ তামার পাতখান পড়ছেন। বামুনগো অপাঠ্য আর কী আছে। আমাগো নমশুদ্দুরগো ভিতরে আধা-মানুষও একখান্ পাবেন না য্যায় ঐডা পইড়বার পারব। তাগো তো প্রচল দিয়াই চইলবার লাগব। চাঁড়ালরে যদি গোপেটান পিটান তাইলেও তো তার জিভের কথাডা সে তামার পাতে চিনব্যার পাইরব না।’

‘ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল, যোগেন, তুমি তো বোয়ালমাছের প্যাট থিক্যা আংটি বাইর কইর‍্যা ফেলছ মনি। কাস্টমারি ল অ্যান্ড টেক্সুয়্যাল ল।’ পুরকায়েত চাপা গলায় বলে ওঠে—পাছে যোগেনের আর্গুমেনটেশনে বাধা ঘটে। যোগেন কোনো দিকে না তাকিয়ে তখন বলছে—’আমরা আমাগো হাত-পা-শরীরের জ্ঞানের রাইট চাই।’

‘রাইট চাও, তো রাইট ন্যাও। আমাগো জড়াও ক্যান,’ সেই কমবয়েসি ছোকরা বলে বসে। যোগেন রুখে উঠে বলে, ‘আপনারা দুইডা মিছা সাক্ষ্য দিচ্ছেন। একনম্বর—আপনারাও খালি পায়ে আসেন। দুই নম্বর—যার পায়ে জুত্যা আছে তারেই এক আপনারা নিষেধ করেন। এত বড় মিছা সাক্ষ্য এক বামুনরাই দিব্যার পারে—গঙ্গাজল আর গীতা ছুইয়্যা। খাড়ান—আমি প্ৰমাণ দেই। এ-ই এদিক আয়,’ যোগেন তার দলবলকে ডাকে। তারা সব দৌড়ে এসে দাওয়ার নীচে যোগেনের পেছনে দঙ্গল বেঁধে দাঁড়ায়। মাথা থেকে পা ধুলোয় ঢাকা। বেশিরভাগেরই উদোম গা। একজনের পায়েও কোনো জুতো বা স্যান্ডেল নেই।

‘দ্যাহেন, এতগুলা মানুষ, একজনের পায়েও জুতা খুঁইজ্যা পাবেন না। আর, আপনারা নাকী জুতাপরা শুদ্দুর ছাড়া শুদ্দুর দ্যাহেন না।

‘আমাগো সাইডের শ্যাষ কথাডা আমি কয়্যা দিচ্ছি। বামুনগো থিক্যা আমরা শিক্ষা নিচ্ছি। আপনারা তো শুদ্দুরগো মাইরতেছেন—এই জায়গার উপর আপনাগো দখল কায়েম রাইখতে। যাতে বেবাক সম্পত্তি দেবোত্তর হিশাবে সরকার মাইন্যা নেয়। আর-একডা উদ্দেশ্য আপনাগো আছে—যাতে আর্কিওলজিক্যাল প্রোপার্টি অ্যাক্টে এই মন্দিরডারে ধরা না-হয়, তাই এভাবে জ্যান্ত মন্দির বইল্যা এসট্যাবলিস কইরবার চান। এ দুডাই বেআইনি মতলব। কিন্তু আমরা এই নিয়্যা কুনো মাথাব্যাথা কইরব না। জ্যান্ত মন্দির হইলে হোক, মানুষজন আইসবো, আমাগোও দুইডা পয়সা আইসে। কিন্তু কয়্যা রাইখল্যাম এডা জানান দিতে যে শুধু আইনের জোরে প্রিভি কাউন্সিলে যাওয়ার রাইট শুদ্দুরগো আছে। আমরা তা যাব না। আপনারা মন্দির নিয়্যা নিরাপদে বংশানুক্রমে জমিদারি করেন গিয়্যা। কিন্তু শুদ্দুরের প্রচলের রাইট বহাল থাকবে। আজ থিক্যা যদি কোনো শুদ্দুরের গায়ে কোনো বামুনের হাত পড়ে, তা আইলে মুসলমানগো সঙ্গে নিয়্যা আমরা হবিগঞ্জ থিক্যা সব বামুনগো ঐ তাম্রশাসনের নাগাল মাটিচাপা দিব। মুখাগ্নিও জুইটবে না।’

পুকাইতের গলা শোনা গেল, ‘যোগেন, এবার আমি যাই, তোমাগো তো অ্যাহন পলিটিক্স অইব। আই অ্যাম নো পার্টি টু দ্যাট। ইউ হ্যান্ডলড দি ল পয়েন্ট মাস্টারলি। ডোন্ট লিভ দি প্রফেশন। ও-য়ে-ল।’

যোগেনের হুংকার ও পুরকাইতের কথায় যেন বোঝা যায়—মিটিংটা শেষ হয়ে গেছে। খাদিম বাড়ির বিলেতফেরত ছোটভাই দুই হাত মাথার ওপর তুলে বলে ওঠেন, ‘শুনেন, শুনেন, কথাডা ভাল কইর‍্যা শ্যাষ কইরবার দ্যান। যদিও মিস্টার মণ্ডলের শেষ কথাটা আমার ভাল লাগে নাই—তবু উনি যে-কথা দিয়েছেন সেটা খুব ভাল কথা। এখানে এই মন্দির নিয়ে কোনো কমিউনিটি কোনো প্রশ্ন তুইলবে না, আর, কোনো কমিউনিটি অন্য কমিউনিটিকে অপমান কইরবেন না। এই অ্যাসিওরেন্স তো আমাগো দিতে হবে।’

‘আমরা সেই কথা দ্যাওয়ার কেডা?’

‘আপনারা যে-সুবাদে এই সভায় হাজির হইছেন সেই সুবাদেই কন, উই সাম পিপ্‌ল বিলঙ্গিং টু দি হায়ার কাস্টস অব হিন্দুস অ্যাসিওর দি পিপ্ল অব আদার কাস্টস অব দি হিন্দুস দ্যাট দেয়ার উইল বি নো কেস অব অ্যাগ্রেশন এগেইনস্ট দেম…’

‘এডায় সই করবে কেডা?’

‘কেন? নিশ্চয়ই মন্দিরের কোনো বডি আছে।’

এইসব কথাবার্তায় আরো কিছু সময় কাটে। তারপর লেখা হয়। ছোটভাই যোগেনকে দেখতে দিয়ে বলে, ‘আর কিছু কি লিখব্যার লাগব?’

‘না। এডাই তো যথেষ্ট। দু-দিনের জইন্য বাড়ি আইস্যা ঝামেলায় পইড়লেন।’

‘বলেন কী? বিলাতই হোক, দিল্লিই হোক, দ্যাশ তো হবিগঞ্জ। দাঙ্গাড়া তো থামান্ লাগে। এডা কি আপনারে দিব?’

‘আমাকে কপি দিব্যার পারেন। আমারে তো পাঠাইছে গবর্মেন্ট। তাগো রিপোর্ট কইরব্যার লাগব। কিন্তু ওরিজিন্যাল শুড গো টু দি এসডিও।’

ছোটভাই কপি করা, সই করানো সারতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যোগেন দাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে দু-একজনের সঙ্গে কথা বলছে। হেডলাইট জ্বালিয়ে দুটো গাড়ি পরপর এসে দাঁড়ায়।

গাড়ি থেকে নেমে একজন এসে বলে, ‘আমি জেলার চার্জে আছি। কাল আপনাকে রিসিভ করতে যেতে পারিনি। তার পরে তো শুনলাম, আপনারা জয় রাইড করে এসেছেন।

যোগেন ঠোঁট খুলে হাসল। এসডিও এসে ডি-সিকে ডাকে, ‘স্যার’। ওরা একটু একটেরে হয়ে কথা বলে। এসডিও গাড়ি থেকে নেমেই গিয়েছিল মিটিঙে কী হল জানতে। এরকম একটা বোঝাপড়ার শুভ সংবাদ ডিসিকে জানাল। ডিসি প্রায় ছুটে এসে যোগেনের হাত ধরে ঝাঁকায়, ‘এত বড় একটা মিটমাট একটা মিটিঙে কী করে করলেন মিস্টার মণ্ডল? ব্রাহ্মণরা তো সব মনে হচ্ছিল—গোর্খা রেজিমেন্টের লোক। আপনি মিরাল্ করেছেন সত্যি!’

কেবল আমি না। এখানকার স্বনামখ্যাত কিছু সন্তান পরিস্থিতিটা তৈরি করে দিলেন। মিস্টার পুরকাইত—’

‘ব্যারিস্টার?’

‘হ্যাঁ’

‘উনি এসেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। বললেন অবিশ্যি আমার আরগুমেন্ট শুইনব্যার আইসছেন। আমার চোদ্দ পুরুষের ভাইগ্য। উনিও এই রায়টে খুব ডিস্টার্বড ছিলেন। সেইজন্যই এসেছিলেন। আর খাদিমদের ছোট ভাই—তিনি তো আপনাদের সার্ভিসেই, দাঁড়ান, আয়্যা পড়বেন।’

‘আপনি আমার জন্য এত ভাল খবর নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মিস্টার মণ্ডল—এর চাইতে বড় খবর অ্যাট দি মোমেন্ট আর কিছু নেই। কিন্তু আমি আপনাকে তার চাইতেও একটা ভাল খবর দিচ্ছি। গভর্নর আমাকে টেলিগ্রামে জানিয়েছেন তাঁর পক্ষ থেকে আপনাকে এই খবর দিতে যে, আপনি কাল রাতে একটি পুত্ররত্ন লাভ করেছেন। হিজ এক্সেলেন্সি আপনাকে কনগ্র্যাচুলেট করেছেন ও আমাকে বলেছেন আপনাকে আরলিয়েস্ট আপনার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে। সুতরাং আজ আপনি আমাদের সঙ্গে এখন সিলেট যাচ্ছেন।’

‘আমার ছেলে? হিজ এক্সেলেন্সি?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *