৭৯. হবিগঞ্জে তুলসীমালা
তুলসীমালার বাড়ি বা মণ্ডপ বা মন্দির বা আখরা বা ঠাঁট—একটা গলির মধ্যে, গলিটা বেরিয়েছে উত্তরের আর-একটু চওড়া রাস্তা থেকে, সেটা আবার বেরিয়েছে কয়েক পা পশ্চিমের আর একটু বড় রাস্তা থেকে। সেটা হবিগঞ্জের বাজারের পেছন পাড়া তুলসীমালার বাড়ি থেকেই শুরু বলতে হয় দক্ষিণ পাড়া বা নমপাড়ার। আগে বলা হত, ঐ বাড়িতে নমশূদ্র পাড়া শেষ, তখন দক্ষিণ থেকে একটা রাস্তা ধরে তুলসীমালার বাড়ি বা মন্দিরে এসে পেছন পাড়ায় চলে যেত তখন এটা ছিল দক্ষিণপাড়া বা নমপাড়ার শেষ। তুলসীমালার যখন খুব নামডাক আর তুলসীমালার রাসমেলা যখন হয়ে উঠেছে—এই পুরো মহকুমার তো বটেই, মহকুমার বাইরেরও বড় মেলা, ঠিক তখনই সেই সাবেকি দক্ষিণ পাড়ার ক্ষীরোদ সাহা তার বাড়ির পাশে রাস্তাটা দিল আটকে। রাতারাতি একেবারে মূলি বাঁশের বাতা দিয়ে। কোনো ফাঁক নেই কোথাও। কী? না, ক্ষীরোদ সাহা ওখানে টিউবঅয়েল বসাবে। বসাবে মিউনিসিপ্যালিটি। সরকারই না কী মিউনিসিপ্যালিটিকে দিয়েছে—বিলাতের কোনো রাজা-রানীর রাজত্বের ২৫ বছর উপলক্ষে। ক্ষীরোদ সাহার ওঠাবসা, ব্যাবসাবাণিজ্য আছে বাবুদের সঙ্গে, তার অবস্থাই দক্ষিণ পাড়ায় তখন উঠতি, শোনা যায়—সুদের কারবার করে। বাবুরা না কী তাকে বলেন, জমি ঠিক করে আলাদা বেড়া দিলে তারা টিউবঅয়েলটা দেবে। তাই বেড়া।
এই নিয়ে কোনো গোলমাল হয়নি কারণ দক্ষিণপাড়ায় একটা টিউবঅয়েলে পাড়ার সম্মান বাড়ে। বেড়া থাকল, টিউবঅয়েল বসল, ক্ষীরোদ সাহা তলাটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়েও দিল। দেবেই-বা না কেন? কলটা তো তার বাড়ির কলই প্রায়। কিন্তু সারা দক্ষিণপাড়া তখন টিউবঅয়েলের গৌরবে গর্বে মাতাল। টিউবওয়েল বা ক্ষীরোদ সাহার নিন্দে করলে সঙ্গে-সঙ্গে কেউ পালটা বলে, ‘ক্যা রে’ তুই হ্যান্ডেল মারলে কি জলডা কম উঠে?’
ঐ রাস্তাটায় চলাচলের পথ না–থাকায় দক্ষিণ পাড়ার লোকদের বাজারের পেছন-পাড়ায় যাওয়া-আসার বদল হয়ে গেল, চেনামুখগুলিও বদল হয়ে গেল। এক টিউবওয়েলে যেন দক্ষিণপাড়া বা নমপাড়াটাকে টাউনের ভিতর থেকে বাইরের দিকে ঠেলে দিল। তবে মানুষজনের গতায়াত ঘটলে নতুন পথ পুরনো-চেনা পথ হয়ে যেতে আর কদিন?
আইলে-গেইলে। জলও পথ দেয়-
না-আওয়া না-যাওয়ায় স্বামীস্তিরির মধ্যেও চর জাগায়। তবে, এই এক টিউবঅয়েলে যে তুলসীমালাকে দক্ষিণপাড়া থেকে আলাদা করে পেছনপাড়ার ভিতরে নেয়া হল আর সেই মন্দির বা ঠাঁট বা আখরা হয়ে গেল ওগো, বামুন কায়েতগো মন্দির—সেখানে রাসের মেলা দিনদিনই বাড়ছে, তেমন সন্দেহ কারো কারো মনে উঠতে দুই রাস কেটে গেল।
মন্দিরের সামনে বাঁশের তোরণে সবদিক থেকে মাধবীলতা আর একদিক থেকে মালতী লতা লতিয়ে উঠেছে। দুই সারির ফুল ও পাতাগাছের শেষে ছোট ধাপের ওপর একটা বেশ বড় দাওয়া; অনেকে একসঙ্গে বসতে পারে। দাওয়ার পুবে ফুলে-আলোতে সাজানো রাধামাধব, কষ্টিপাথরের বলেই সবার জানা, যদিও কষ্টিপাথরটা কী তা ঠিক জানা নেই, নবদ্বীপ থেকে এনে দিয়েছিলেন মৈমনসিং-এর ধনবাড়িয়া নবাবশাহেব। একজন ব্রাহ্মণের হাত দিয়ে পাঠিয়ে খবর দিয়েছিলেন, ‘যবনস্পর্শমুক্ত এই যুগলমূর্তি গ্রহণ ও স্থাপন করিয়া খোদাতালার ইচ্ছা পূরণ করিবেন দোয়া করি। কৃষ্ণনগরে এক শাদিতে গিয়াছিলাম। ফেরার সময় এই মূর্তিটি দেখিয়া বড় ভাল লাগিল। আপনি ভক্ত, মরহুম, তাই আপনি এর প্রকৃতরস সোয়াদ করিতে পারিবেন। সেলাম আলে কুম…
তারপর থেকে এই রাধামাধব যুগলমূর্তি তুলসীমালার আখরার প্রধান বিগ্রহ হয়ে উঠেছে। লোকের মুখে-মুখেও একটা নতুন নাম তৈরি হয়েছে, রাধামাধব মন্দির। বর্ণহিন্দুরাই এই নাম বেশি বলে। একজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত বিগ্রহের নিত্য পূজা সেরে দিয়ে যান।
নমশূদ্ররা অবিশ্যি তাদের পুরনো নামেই ডাকে, নামতলা বা ঠাট! তাদের দেবতা বলতে তো এক গৌর, আর তাদের মন্ত্র তো মুখে নাম, হাতে কাম।’ গৌরাঙ্গ ও জগদ্বন্ধু প্রভুর দুটি ছবি আলাদা জায়গায় পূজা হয়। তুলসীমালার বয়স হয়ে গিয়েছে। এখন শয্যাসায়ী। মুখের কথাও বোঝা যায় না। এখন তাঁর বংশগত গুরুগিরি ও এই মন্দির নামতলার দায়িত্ব পড়েছে তাঁর বড় ছেলে প্রভুদয়া বৈষ্ণবের ওপর। তুলসীমালা যতদিন সুস্থ ছিল ও নিজেই সব করত, তখনো সে কখনো রাধামাধব মন্দিরের দাওয়ায় ওঠেনি। বলত, ‘গেরস্তবাড়ি আর বাবুর বাড়ি থিক্যা মা-বৌ-মাইয়্যারা পূজা দিব্যার আসে, স্নান কইর্যা, শুদ্ধ হইয়া, ভক্ত মনে। আমার মত শূদ্রকে মন্দিরে দেইখলে তাগো ভক্তিতে চোট লাইগবে। আমার রাধামাধব যদি তাগ পূজা-ভক্তি নেন, তা হাইলেই তো তুলসীমাল ধইন্য, ধইন্য। রাধামাধব যারে যেহানে বহাইছেন—বামুনরে বসাইছেন নিকড়ে, মা-জননীগো বসাইছেন দাওয়ায় আর তাঁর দাসস্য দাস তুলসীমালরে বসাইছেন দাওয়ার তলায়, মাটিতে। রাধমাধব যদি কন আমি ঐ পিছনপাড়ার মোড়ে গিয়্যাও বয়্যা থাইকবার পারি।’
রাজারানীদের বংশের পঁচিশ বছরের পার্বণী টিউবওয়েল একটা দক্ষিণপাড়ার গলিতে টেনে এনে গেড়ে দেয়া কম ক্ষমতার কাজ? ক্ষীরোদ সাহা বলেই পারল!
তারজন্য বেড়া দিতে হলে, বেড়া দিতে হবে।
প্রথম ক্ষমতাটা কাজে লাগাতে হলে, দ্বিতীয় কাজটারও ক্ষমতা থাকা চাই।
রাস্তার মধ্যে বেড়া দিলে রাস্তা তো আটকাবেই। এইটুকু ঘুরে যাওয়ায় ক্ষমতা নেই?
নমশূদ্র হয়ে বৈষ্ণবগুরু তো হওয়াই যায়। গৌরই তো চণ্ডালের উদ্ধার-’আচন্তালে দেহ কোল।’ সে গুরুগিরির ক্ষমতা তো তুলসীমালা দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আর কেউ কি এমন ক্ষমতা রাখে যে বামুন-কায়েতদের রাধামাধব যুগলে হেঁটে চাঁড়ালের মন্দিরের বিগ্রহ হন?
ক্ষমতা কোন্টা—নিজের বাড়ির নামতলার মাটিতে বসে থেকে বামুন-কায়েতদের দাওয়া ছেড়ে দিয়ে বলা যে আমি চাঁড়াল, চাঁড়ালই আছি, আপনাদের স্পর্শদোষ ঘটবে না। নাকী, রাধামাধবের পাশে দাঁড়িয়ে জমিদারদের মত চিৎকার করে বলা— ঠাকুর মানতে চাও তো চাঁড়ালকে আগে মানো।
তুলসীমালা রাধামাধবের মন্দির সাজিয়ে, বামুন-কায়েতদের সেবা দিয়ে শুদ্দুরের গুরুগিরি করেও সারাটা দেশের শূদ্রদের কাছে মান্যগণ্য হন? হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের পরই তো তুলসীমালার প্রতিষ্ঠা।
নামতলায় ঢুকতে-ঢুকতে যোগেন চেঁচায়—’আরে, বড়গোঁসাই না পৌঁছাতেই সন্ধ্যারতি শ্যাষ?’
যোগেন যে আসবে সে-কথা কারোই জানা ছিল না। ফলে ঠাহর করে নিতে যা একটু সময় যায়। তারপরই বোঝা যায় ভিতর দুয়ারে সন্ধ্যার ছায়ায় কত মানুষ ছড়িয়ে ছিল। মেয়েরা ফূর্তিতে উলু দিয়ে ওঠে, সে উলু যেন শ্রীখোলের বাদ্য হয়ে আকাশের দিকে উড়ে যায়। উলু থামতেই নারী-পুরুষের মিলিতস্বরে পরিত্রাণের প্রার্থনা ওঠে, ‘গৌর হে, বন্ধু হে, গৌর হে।’
কে একজন হস্তদন্ত হয়ে দবদবিয়ে দুয়ারে ঢুকে চেঁচায়, ‘আরে, হইলডা কী, ডাকাইত পইড়ছে না কী?’
‘ডাকাইত যদি পইড়তই তা হাইলে কি তুমি অ্যাহনো নিজের স্কন্ধে নিজেরই মস্তক বহন করিতে? জানো না কী তাতার বালক মাতৃক্রোড় হতে ছুটে যায় ব্যাঘ্র সনে করিবারে রণ?’
যে এসেছিল সে যোগেনের কথা থেকে বোঝে, যোগেনই এসেছে। বোঝার পর এক লাফে সে যোগেনের সামনে এসে পড়ে হাঁকার দেয়, ‘আরে, আরে, আরে, দেখছনি বড় ভগ্নীপতি বাড়িত্ ঢুইক্যা পইড়ছে একখানও আওয়াজ না-তুইল্যা? হালা, ভগ্নীপতিগ চরিত্তির চিরকালই খারাপ!’
এরমধ্যে দুয়ারে একটা ঝকঝকে লণ্ঠন আর গোটা কয়েক কুপি এসে গেছে। সেই আলোতে আলো পেয়ে যোগেন তাকে জবাব দেয়, ‘আরে, তোর না-হয় ভগ্নীপতি, তোর বাপের তো জামাই!’
লোকটি একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে ওঠে, ‘অ্যাঁ?’
আর মেয়েদের ভিতর থেকে এক বেশ বয়স্কা বলে, ‘দিছে তো জব বন্ধ কইর্যা? বলদের বুদ্ধি নিয়্যা গিছ মণ্ডলরে খোঁচাইতে। তাও তো অ্যাহনো ইংরাজি খোলে নাই। ঠাউরজামাই এন্ড্রু শুনাও।’
‘থামো তো! শাহেব যে এমন বাঁইট্যার বাঁইট্যা হয়! সারাডা রাস্তায় বাঁইট্যা ইংরাজি কইতে কইতে তো জিভে মইরচ্যা ধরল-
‘ঠাকুরজামাই, ঐ দিকে যে ডাক পাইড়্যা-পাইড়্যা শ্বাস উইঠল। যাও, এডডু মুখড়া দেখাইয়া আইগ।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোন ঘরে?’
লণ্ঠন নিয়ে একজন দুয়ার পেরিয়ে পথ দেখায়—যোগেন সেদিকে যায়। সঙ্গে সেই ‘শ্যালক’ সেই শ্যালকের বৌ, যে যোগেনকে ঠাকুরজামাই ডাকে, আরো কেউ-কেউ। যোগেন শয্যাশায়ী তুলসীমালার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে।
ঘরটা বড়, কাঠের সিলিং, ওপরে টিন। একটা বড় আলো জ্বলছিল ঘরে, লম্বা চিমনির। তুলসীমালার বুকেপিঠে রসুনভাজা সর্ষের তেল মাখানো হচ্ছে—কোনো বৌ মাখিয়ে দিচ্ছিল। তুলসীমালার স্ত্রী তো কয়েক বছর আগে গত হয়েছে। যে-বৌটি তেল মাখাচ্ছিল, সে ঘোমটা টেনে সরে যায়। নতুন বিয়ে হয়ে এসেছে হয়ত। যোগেনকে চেনে না।
যোগেনকে দেখে তুলসীমালা দু-হাত তুলে হাউ মাউ করে কথা বলে ওঠে—যতটা উঁচু গলায় সম্ভব।
পেছন থেকে যোগেনের শ্যালক-বৌ বলে ওঠে, ‘ঠাকুরজামাই, যাও, বিছানায় বইস্যা হাত ধরো। জিগ্যায়—তুই ক্যান হঠাৎ, কুনো দুঃসংবাদ না কী?’
যোগেন জানত যে তুলসীমালা অসুস্থ। কিন্তু এতটা, তা আন্দাজ করতে পারেনি। নমশূদ্রদের যা খাওয়াপরার হাল, তাতে সব বাড়িতেই দুই-একজন নুলো ছেলেমেয়ে আর শ্বাসওঠা বুড়োবুড়ি থাকে। পরস্পরের খবরাখবরে তাই কে কেমন আছে—এইসব কুশল জিজ্ঞাসার কোনো জায়গাই নেই। অসুখ বুঝলে তো অসুখ। না-বেঁচে থাকলে যেমন মরণ।
শ্যালক-বৌয়ের কথামত যোগেন বিছানায় গিয়ে বসে, তুলসীমালার হাত ধরে তাকে শুইয়ে দেয়, তারও পরে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘আমার আবার দুঃসংবাদ কী? আপনেই তো দুঃসংবাদ হইয়্যা পইড়্যা আছেন।’
তুলসীমালা দু-হাত তুলে আবার হাউমাউ করে কিছু বলে। শ্যালক-বৌ বলে, ‘চক্ষু দুইডা দ্যাহো মাটি থিক্যা সূঁচ খুঁজব্যার পারে। তোমারে জিগায়, ঠাকুরজামাই, মুখডা মলিন দেহি ক্যা?
যোগেন একটু আত্মচেতন হয়ে পড়ে। সে তুলসীমালার ঘরে ঢুকে তার অবস্থা দেখে একটু অপ্রস্তুতই হয়ে গিয়েছিল। তাদের সমাজের আত্মীয়জনদের মধ্যে এমন কেউ অপ্রস্তুত হয় না। যোগেনও যে হয়েছে তার কারণ যোগেন এখন তার সমাজের মধ্যে বাস করে না। হিশাব মত করে বৈকী, প্যারি ডাক্তারের বাড়ি কি তার সমাজের মধ্যে পড়ে না? আইনে নিশ্চয়ই পড়ে। বেআইনে পড়ে না। যোগেন এ-বাড়িতে ঢুকতে-ঢুকতেই যে হৈহৈ বাধিয়ে দিয়েছে, সেটা এ-বাড়ির বেটাছেলে মেয়েছেলেদের চেনা। যদি সেই চেনাটা না দিত, সেটা তো বরং এ-বাড়ির লোকদের কাছে অচেনা ঠেকত। যোগেন তাই নিজের স্বভাবের নকল করেছে। এ-ঘরে এসে সে ভুলে গেছে, তার কাছে কী রকম কথাবার্তা শুনতে চাওয়া হতে পারে। তুলসীমালার চোখে সেটাই ধরা পড়ে গেছে।
‘হাজারবার কইছিল্যাম না, তা ঐ মশায়, তুলসীমালা তো স্ত্রীলিঙ্গ, ওডারে পুংলিঙ্গ কইর্যা ন্যান। শুইন্যা আমার উপরে কী চোটের চোট—হ, তুলসীমালা শুইনতে ভাল, তুলসীমাল শুইনলে মনে লয় সিলেটি বামুন, মন্ত্র কইলে দেবতা বোঝে না। ক্যা? দেত্তা তো আর সিলেটি না। অ্যাহন, কি দেতা পাইছেন? সেডা নারী-পুরুষ বুঝে তো?’
তুলসীমালার ঐ শরীরে যতটা জোরে হাসা সম্ভব, সে তত জোরেই হাসে, তার ঐটুকু শরীর কেঁপে ওঠে হাসিতে। সেই হাসিটা দেখে, যোগেনও হেসে ওঠে আর মুহূর্তে তার অপ্রস্তুতিটা কেটে যায়। মরণরোগীও যদি হাসতে পারে এমন, তাহলে যোগেনের হাসাটা কেন বানানো হবে?
হাসি থামিয়ে তুলসীমালা আবার সেই দুর্বোধ্য উচ্চারণে কিছু বলে। যোগেন এবার বুঝতে পারে—তুলসীমালার জিভ নড়ে না, সে শুধু গলা আর ঠোঁট দিয়ে কথা বলছে।
শালাবৌ আঁচলে ঠোঁট ঢাকে।
‘কী কইল? কইলডা কী?’
‘ঐ সব আগড়বাগড় কথা আমি কইব্যার পারব না। আমি তো মাইয়াছাওয়াল। আমার তো লজ্জা লাগে।’
তুলসীমালা এ-কথাতে যোগেনের শালাবৌকে ধমকে কিছু বলে। শালাবৌ তাতে ঝামটা দিয়ে ওঠে, ‘আ হা হা রে। জিভ নাই তবু ছুকছুক আছে বুড়ার। নাক দিয়্যা কি আর গুড় চাটা যায়? হুনো, ঠাকুরজামাই, তোমার তাঐয়ে কয়—দ্যাবতা চিনলেও চিনব্যার পারে। কিন্তু তোমার তাঐয়ের শরীলে স্যায় চিহ্ন থাকলে তো খুঁইজ্যা পাব। বেবাক চিহ্ন গোবরলেপা।’ শুনতে-শুনতে তুলসীমালাই সবচেয়ে আগে হেসে ওঠে, কিন্তু হাসিটা চেপে রাখে যোগেনের শেষ কথাটা শুনতে। শালাবৌ আর যোগেনের হাসি একসঙ্গে চলে।
এই হাসিতে যোগেনের আত্মসচেতনতা, খালের জল যেমন ভাটির টানে নেমে যায়, সেই রকম ভেসে যায়। তাদের সমাজে সব কথাতেই স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের যৌনতা আসবেই। বয়সের তফাত নেই, সম্পর্কের তফাত নেই, সময়-অসময় নেই। যে যত ঘুরপথে সেই যৌনতায় ঢুকতে পারে, তার তত বাহাদুরি। তুলসীমাল্য-র নাম যে তুলসীমালাই থেকে গেল, যোগেন সেই কথা তুলে একটু আলগা টোকা দিতেই তুলসীমালা সেই ভাঙাবেড়া দিয়ে ঢুকে পড়ল।
এদিকে এ-ঘরে বেশ উঁচু গলায় কথা হচ্ছে শুনে—একে-একে সবাই ঘরে এসে ঢোকে। তার মধ্যে তুলসীমালার নাতিরাও আছে, ছেলেরাও আছে, ছেলেবৌরা তো আছে, সম্ভবত নাতবৌও দু-একজন থাকতে পারে। যোগেন এদের সবাইকে চিনবে-জানবে কী করে। বিএ পাশের পর শ্বশুর আর তার কলকাতা গিয়ে ল-পড়ার খরচা দিতে রাজি ছিল না। সেই সময়ই তার বড়দিদি বিধবা হল। তখন বড়দিদির দেখাশোনা করতে যোগেনকে প্রায় বছরখানেক থাকতে হয়েছিল জামালপুরে। ওকালতি পড়তে না-পারার দুঃখ, দিদির বাড়িতে শোকতাপ। দিদির সম্পত্তি ছিল একটু—সেটা যাতে বেহাত করে না নেয় সেটা সামলাতেই যোগেনের আসা। যোগেন আসার ফলে দিদিকে অন্তত কেউ অসহায় ভাবার সাহসে করেনি। যোগেন বুঝেছিল—দিদি, জামাইবাবুর কাছ থেকে কাজকর্ম শিখে নিয়েছিল। সেটাই যোগেনের জীবনের সবচেয়ে দুর্বৎসর। মা মারা গেছে—সে শোক যোগেনের খুব লাগেনি। তার তো যোগামা ছিল। কিন্তু যোগেন কেন জামালপুরে থাকে? না, তার কাছে জামালপুরও যা, মৈস্তারকান্দিও তা—কোনো জায়গাতেই তো তার কোনো কাজ নেই। বিএ পাশ করে সে কি অবরেসবরে কাকা-বাবার বরাত-আনা নৌকা বানানোর মিস্তিরি হবে? বরং জামালপুরে তার কাজ না-থাকাটা মানায় বেশি। দিদির দুঃসময়ে ভাই এসেছে।
জামালপুরে এসে জামাইবাবুর কাজকর্ম সম্পত্তির যা একটু আন্দাজ পেয়েছিল যোগেন, তাতে তার মনে হয়েছিল দিদি তাকে কলকাতায় পড়ার জন্য মাসে দশ-পনের টাকা পাঠানোর ক্ষমতা রাখে। যোগেন চেয়েওছিল বলতে। বলে ফেলতও, কাজটা বেঠিক জেনেও। কোথায় তাদেরই উচিত দিদিকে সাহায্য করা, তা না, জামাইবাবু চোখ বুজতে-না-বুজতেই দিদির ঘাড় ভাঙা। তাদের সমাজে পুরনো বিয়াতী মেয়ের সঙ্গে বাপের বাড়ির সম্পর্ক খুব ঘন হয় না, তাও যদি কাছাকাছি হয়, তাহলে একরকম, শারদার সঙ্গে যেমন। কিন্তু কোথায় গৌর নদী আর কোথায় জামালপুর।
শেষ পর্যন্ত যে দিদিকে এটা বলে উঠতে পারল না, তার কারণ, এই কথাটাই ভাবতে-ভাবতে নিজের মনেই যোগেন বুঝে ফেলে, দিদির পক্ষে কথাটা বোঝাই সম্ভব না। কলেজে পড়াটাই দিদির কাছে এক অদ্ভুত ঘটনা; কিন্তু কলেজের পরে কলকাতা গিয়ে আইন পড়াটা শুধু অদ্ভুত না, রহস্যমাখা। যোগেন তাকে ঠকিয়ে টাকা নিচ্ছে ভেবে সে বড়জোর পাঁচটা টাকা ধরিয়ে তাকে দেশে চলে যেতে বলবে। যোগেন যে কী করে ভাবল, দিদি একটা দু-বছরের মাসিক খরচের মধ্যে ঢুকতে রাজি হবে—এটা ভেবেই যোগেন নাকখত দেয়।
সেই সময়, সেই ২৯ সালে, বছর নয় আগে, যোগেন মাঝেমধ্যে হবিগঞ্জের এই তুলসীমালার বাড়িতে আসত। তাদের সমাজে সবাই সবার জ্ঞাতি। তাই সম্বন্ধ দিয়ে সম্পর্ক থাকে না। তবু, নামতলার সঙ্গে জামালপুর আর যোগেনের শ্বশুরবাড়ি খাগবাড়ির বারুইদের সঙ্গে সম্বন্ধও একটা ছিল।
যোগেনের জামালপুরের জামাইবাবুর বড় দিদি, মানে ক্ষীরোদার, ননাসের সঙ্গে এ-বাড়ির এই নামতলার, বড়ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল। জামাইবাবুর মায়ের বয়সি দিদি, কিন্তু বাবার আগের পক্ষের স্ত্রীর মেয়ে হলেও দিদি তো দিদিই। যোগেনের জামাইবাবু যদি তুলীমালার বড়ভাইয়ের শ্যালক হয়, তাহলে সে-শ্যালকের বয়স যদি উনিশকুড়িও হয়, তাকেও তো তুলসীমালাকে দাদা বলেই ডাকতে হয়। তাকে তুলসীমালা চিরকাল বলরাম-দাদা বলে ডেকে এসেছে। বলরামদাদার শালা যোগেন, তাহলে দাঁড়ায় তুলসীমালার দাদার শালার শালা। আবার, আর-একদিক থেকে যোগেনের শ্বশুরের বড়ভাইয়ের বড় মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তুলসীমালাদের মামাতো বড় ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে। তাহলে, যোগেনের বড় ভায়রা দাঁড়ায় তুলসীমালারও জামাই। যোগেন একই সঙ্গে, তুলসীমালার দাদার শালার শালা আবার আর-এক দাদার (মামাতো) ছেলের ভায়রা। মানে, তুলসীমালা দাঁড়ায় যোগেনের শ্বশুর। তুলসীমালার সঙ্গে যোগেনের বয়সের তফাত বাপছেলের চাইতেও বেশি। দু-জনের সম্পর্ক বরাবরই সমবয়স্ক বন্ধুর চাইতেও ঘনিষ্ঠ ও নিবিড় তুলসীমালাকে যোগেন ডাকে তালই বলে আর যোগেনকে তুলসীমালা ডাকেন ভাইগনা বলে। সেই ডাকাডাকি নিয়েও গল্প আছে। কোন্ পুরাণে নাকী বলা আছে—দেবতাদের পুরুত নারদের এক ভাগ্নে ছিল, তার নাম পর্বত। এক রাজকন্যাকে, তার নাম দময়ন্তী, নারদ আর তার ভাগ্নে পর্বত—দুজনই খুব বিয়ে করতে চাইত। রাজকন্যা দময়ন্তীও তাদের দু-জনেরই বীণা বাজানো খুব ভালবাসত। এর মধ্যে একদিন দময়ন্তীর বাবা, রাজা ঘোষণা জানালেন যে, তাঁর মেয়ে স্বয়ম্বরা হবে, সুতরাং দেব-মানব-দানব, যারই ইচ্ছে সে ঐ নির্দিষ্ট দিনে এসে লাইন দিতে পারেন। দুপুরের ভোগের জন্য ঘণ্টা দেড় বাদ দিয়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সভা চলবে। পাত্র-মনোনয়ন হওয়া মাত্রই স্বয়ম্বর অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে। নারদ সঙ্গে-সঙ্গে ঠিক করে ফেলল যে, সে স্বয়ম্বরে যাবে। ভাগ্নে পর্বতকে কোনো খবরই সে জানাল না, উলটে দৌড়ে গেল, দেবতাদের তিন কর্তা-দেবতার একজন, বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণুকে নারদ সব জানিয়ে অনুরোধ করল, তিনি এমনই কিছু বর দিন বা শাপ দিন যাতে পর্বতকে মুখপোড়া হনুমানের মত দেখতে লাগে। স্বয়ম্বর সভার খবর পর্বতও পেয়েছিল, সে-ও নারদকে কিছু না জানিয়ে ঐ বিষ্ণুকেই গিয়ে ধরল একটা কিছু বর বা শাপ দিয়ে নারদের মুখটা পুড়িয়ে দেয়া হোক, সঙ্গে গুহ্যদ্বারটাকে আগুনে পুড়ছে, এমন টকটকে করে দেওয়া হোক। বিষ্ণু দু-জনকেই খুব প্রশংসা করলেন ও দু-জনের প্রার্থনাই মঞ্জুর করলেন। স্বয়ম্বরের দিনে নারদ দেখে, তার ভাগ্নে পর্বতের মুখটা পোড়াকাঠের মত পোড়া। আর পর্বত দেখল, তার মামা নারদের মুখটা তো পোড়াই, তার ওপর তার বাহ্যদ্বারটা পোড়া বেগুনের মত ঝুলছে, আর যেন তখনো পুড়ছে এমনই লাল। ওদের দু-জনের কারো কাছেই আয়না ছিল না, সুতরাং তারা দু-জনই নিশ্চিত ছিল যে তার প্রতিপক্ষ হারবে ও সে জিতবে। এদিকে রাজকন্যা যেই বর খুঁজতে বেরিয়েছে, অমনি গরুড় পাখির পিঠে চড়ে বিষ্ণু মারল এক গোত্তা, আর চামচিকে যেন পাখাগজানো উইপোকা খাচ্ছে এমন সহজে, গরুড়রাজকন্যাকে ঠোটে তুলে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘আরে, এমন লম্পট ভগবান থাকতে, পর্বত, মেয়েছেলে পাবি তুই?’ তুলসীমালা বলে।
‘আরে তালই, ভাগ্নের মেয়েছেলে ছাড়া তোমার মেয়ে জোটে না? তোমার আর থাইকলডা কী?’
‘তু-ল-সী মা-লা—’
‘নিজের লিঙ্গটাও বদল্যায়া দিছ নিজের নামে?’
‘সে তো তোগো শুদ্দুরগো জিভে মরচ্যা। তোরা য-ফলা বলব্যার পারিস না—মাল্য-রে বলিস মালা।’
এইসব পারস্পরিক সম্ভাষণ শোনার লোভেই ঘরে ভিড় বেড়ে যেতে থাকে—যারা আগে শুনেছে তারা তো এলই—যারা এসবের গল্প শুনেছে কিন্তু নিজেরা দেখেনি, তারাও ছুটে আসে।
তখন, সেই বছর দশ আগে, জামালপুর থেকে নামতলা যাতায়াত করতে-করতে যোগেনের একসময় এমনও মনে হত যে নামতলার বাড়ি তাকে কলকাতার মাসখরচটা দিতে পারত। যদি এবাড়ির কোনো মেয়ের সঙ্গে সে বিয়া বসত। এবাড়িতে তো গণ্ডায় গণ্ডায় মেয়ে। যোগেন তেমন একটা বৌ কি জোটাতে পারত না, যার সুবাদে তার কলকাতায় গিয়ে ল-পড়াটা হয়! বছর দেড়-দুই আগে বিয়ে করা এক-বৌ তার না হয় খাগবাড়িতে আছে। তার মুখও তো যোগেনের মনে নেই—তার বয়সও তো এগার-বার এখন। তাদের সমাজে এটা চলে, না বামুন-কায়েতদের সমাজে তো চলে পাড়গড়ানো ভেলার মত, খুঁটো না ঠেকালেই ভেলা জলে ভাসে।
ল-পড়ার জন্য মাথা খারাপ হলেও আর এরকম করে ল-পড়ার তেমন কোনো সমাজিক দোষ না থাকলেও, শেষপর্যন্ত যোগেন কথাটা তুলতেও পারেনি। বিয়েটিয়ের কথা না তুলেও তো বলা যেত, তাও পারেনি। একটা লেনদেনের প্রস্তাব না-হয় বলা যায়—খেটে শোধ করব, এসব লেনদেন তাদের সমাজে চলে না। জামাই হিশেবে নিজেকে বন্ধক দেয়া ছাড়া আর কোনোরকমের লেনদেনের উপায় যোগেনের হাতে ছিল না। নিজের বিয়ে করা বৌকে নিয়ে কোনো অনুভবও তার বাধা হয়ে ছিল না।
তবু যে সে বলে উঠতে পারেনি। তার কারণ হয়ত ছিল অনেক গভীর সাগরজলের তলার উদ্ভিদগুলির প্রলম্বিত নিরলম্ব জড়িয়ে যাওয়া দেখে, ধূসর আবছা অচেনা নানা জলজীবের অদৃশ্য সব গতির উপথায়। যোগেন তো চাইছিল—নমশূদ্র হতে, ল-পড়ার জন্য তাহলে সে ভদ্রসমাজের ছেলেদের মত করে ভাবছে কেন?
তুলসীমালা সেই জিভহীন গলায় কিছু বলে ওঠে। কী, জানতে যোগেন ভিড়টার দিকে তাকায়। তুলসীমালার সেজছেলে বসেছিল মেঝের ওপর, যোগেনের থেকে অন্তত দুই-তিনজনের বড়, ডাকে, ‘কী কয় শুইন্যা দ্যাও।’
সেই প্রথম বৌটি প্রায় ছুটেই আসে—এখানকার বেশি আলোতেও তার শাড়ির ডুরেগুলির রং আর তার চাঁছালো চিবুক ও নাকের ডগা চকচকিয়ে ওঠে।
‘ক্যা? এই হানে কি ভাষাড়া শিখ্যা ন্যাওনের আর কোনো পুরুষ নাই?’ সে তুলসীমালার মুখের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী জিগ্যাও, জিগ্যাও।’
তুলসীমালা সেই আওয়াজটা করে। আর শুনে, ঠোঁটে আঁচল চাপা দিয়ে বৌটি তুলসীমালাকে বলে, ‘রসের মানুষরে পাইয়্যা রস তো এগবারে উথাল দিছে।’ তুলসীমালা মাথাটা নাড়িয়ে মন্তব্যটা মেনে নেয়। সেই বৌটি তখন যোগেনকে বলে, ‘তোমারে জিগায়, এইহানে কার মোক্তারি লইয়্যা আইল্যা?’
‘আপনে ছাড়া আর কোন্ মক্কেল আছে আমার? গোলমাল বাধ্যায়া রাখছেন শিমূলগড়ে। তুলসীমালা ওরকম আওয়াজে কথা বলছে, তার কথা আবার বড় করে বলে সবাইকে জানানো হচ্ছে। তার টানে যোগেনও গলা উঁচিয়ে ফেলছিল। সেই বৌটি যোগেনকে বলে, ‘কান ঠিক আছে। তোমাকে গলা তুইলতে লাগব না।’
‘হাঙ্গাম কীসের? মামলাডা কী?’
‘বামুনরা আপনাগ পিট্যায়, নাহি আপনারা বামুনগ পিটান—’
‘পিটাপিটির কামডা কী? পিট চুলক্যায় কার?’
একটু পরেই ঘরের ভিতরে এতজনের নানা কথাবার্তায় যেন একটা সুর তাল এসে যায়। যোগেনের গলা, তার জবাবে তুলীমালার আওয়াজ, তারপরে মেয়েদের গলায় তুলসীমালা যা বলেছে তার পুনরুদ্ভাবণ। আবার একজনের গলা।
‘অ্যাগো গিয়্যা বামুন পিটাইব্যার কামডা কী?’
‘বামুন পিডাইল ক্যাডা? তারাই-না আমাগো পা থিক্যা টাইন্যা জুতা খুলায়?’
‘সামাল দিয়া কথা কইয়ো মাইঝ্যা কর্তা। জুতা খুইল্যা হাঁটতে কইছে সেডা একডা কথা, আর বামুন হইয়া তোমাগো পদধূলিসহ জুত্যা খুইল্যা দিচ্ছে, সেইডা আর-এক কথা। বামুন আদেশ মাইনব্যার বাধা কী? ‘আদেশ’ পর্যন্ত বামুনগ যাইব্যার দেওয়া হইল ক্যা। আদেশ দিবার আগেই আদেশ মাইন্যা নিলে আদেশ তো তৈরি হইব্যার টাইমও পায় না।’
‘আপনি এইডা পাবলিকের সামনে কইবেন তালে?’
‘মানে, আমাগ ভগবান কোমরের তলায় দুইখান কইর্যা নাম্বা ঠ্যাং দিছে কি মাথার চুলের মতন—শুধু শোভাবৃদ্ধির লগে? কামের লগে না?’
‘তা তোমাগ পায়ের কাম একটাই—এইখান থিক্যা শিমূলগড় গিয়া আইন অমান্য
‘এডা কী কইলেন, তালৈ। নমশূদ্র বইল্যা জুতা পরা নিষেধ?’
‘জুতা যদি পরোও এহ্যান থিক্যা শিমূলগড় পৌঁছাইতে-পৌঁছাইতে কয়বার নি তোমার জুত্যা খুইলব্যা? নদীর জল, খালের জল, জঙ্গল, বালু, কাদা—এইসব কি জুতা-পইর্যা পার হওন যায়, না জুত্যা বগলে দিয়া পার হওন লাগে?’
‘কয় কী মানুষড়া? এক সাল ধইর্যা মামলা চইলছে, দুই-দুইডা হইয়্যা গেল চাড়ালখুন, অ্যাহন আধগণ্ডা ব্রহ্মহত্যা না কইরলে তো সমান-সমান হইব না।’
‘তাইলে তোমাগ মতডা কী খাড়াইল?’
‘খাড়াইল—শিমূলগড়ের বামুনগ নাকখৎ দিয়্যা স্বীকার দিতে অইব—এমন অন্যায্য কাজ তারা আর কইরব্যান না।’
‘ব্রহ্মহত্যা হওনের লগ্নখান কী স্থির হইল? নাকখতের পূর্বে না নাকখতের পর?’
সকলে হেসে ওঠায় বোঝা গেল, যোগেন যে সকলের মতটা মেনে নিয়েছে, তা তারা বুঝেছে। এই কথাবার্তা যে শুরু হয়েছে তার খবর নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে রটে গিয়েছে। ফলে, বাইরে থেকে সমাজের ক-জন মাতব্বরও এসে গেছে—যোগেন একবার উঠে গিয়ে জগমোহন ডাক্তারকে সেবা দিয়ে এসেছে, আর-এক তেলতেলে কাল পেশিতে কোঁদা কোঁকড়া চুলের এক যুবকের দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘এডা কার বেটা।’
‘সুধইন্যা, সুধইন্যা’–সমস্বরের পর কেউ একজন বলে, ‘শিক্ষিত ছাওয়াল, সিলেট কলেজে পড়ে।’
যোগেন তাকে বলে ‘সুধইন্যা—’
একজন সংশোধন করে, ‘সুধইন্যা ওর বাপ, অ তো মুকুইনদ্যা।’
‘অ, মুকুন্দ, তোমাগ কী মত?’
মুকুন্দ একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়—এতসব লোকজনের মথ্যে তাকেই আলাদা জিজ্ঞাসা করায়। সে যত তাড়াতাড়ি সেটা সামলে নেয়, তাতে বোঝা যায়, তার আলাদা মত আছে। যোগেনের মনে পড়ে গিয়েছিল আগৈলঝরা প্রজা সম্মিলনীর কথা, তার বক্তৃতা, বক্তৃতার শেষে ভেগাই হালদারের বিরাশি সিক্কার একখান চড়।
‘আমরা তো বুইঝতে পারি না বিবাদটা কী?’
‘এই, শিমূলগড়ে যা চইলতেছে, বামুনগ সাথে, হাঙ্গামা।’
‘আমাগ তো হাঙ্গাম নাই—’
‘আমাগ দুই জন মানুষ যে বলি হইয়্যা গেল—’
‘এডা কি একখান কথা অইল, কাহা? বলি হইল্যাম আমরা আর হাঙ্গামও আমাগ?’
যোগেন যেন মুকুন্দের গলায় তার নিজের দশ-বার বছর আগের গলা শুনতে পায়। আর, কথাও তো বানাতে পারে—হাঙ্গাম আর খুনটাকে কেমন আলাদা করে নিল।
যোগেনের ইচ্ছে হল—মুকুন্দের সঙ্গে আর-একটু কথা বলার।
‘সে বাবা তুমি চক্ষু বন্ধ কইর্যা চালায় মাছ গুইজ্যা রাইখলে তো দুনিয়া জাইন্যাই যাইব কোথায় রাইখল্যা, তোমার চোখ তো দুনিয়ার চক্ষু না।’
মুকুন্দ কথাটা ধরতে পারেনি। সেই শিমূলগড়ের ঘটনা থেকে কাকপাখির মাছগোঁজা, তার চোখ আর দুনিয়ায় চোখ—তাদের এই আড়ে আড়ে ঠারে-ঠারে দূরে-দূরে কথা কওয়ার অভ্যাস মুকুন্দের এখনো আয়ত্ত হয়নি। হয়ত, কখনো হবেও না। দশ-বার বছর আগে যোগেন নিজে কথা বলত সোজাসাপ্টা কিন্তু তাদের সমাজের কথাবলার এই রীতও সে এতই ভাল জানত যে সভাসমিতি মিটিং কমিটি, কোর্টকাছারিতে কথাবলার ঐ রীত্ ব্যবহার করে সে বেশ সুযোগ বাড়িয়ে নিতে পারে। মুকুন্দ যে তার কথার ভাও বুঝল না—এতে যোগেন যেন খুশিই হয়, যেন ঐ-রীত্ ব্যবহারের মধ্যে কৌশল আছে। মুকুন্দ যদি চায় তাহলে, সেই কৌশল তার অপছন্দের হতে পারে। যার সঙ্গে তার কথা, তার ভাষাতেই মুকুন্দ কথা বলতে চায়।
‘হাঙ্গাম যারা বাধাইছে, মিটাইব্যার দায় তো তাগ। বামুনগ এই হুকুমজারির দখল আইল কোথ্ থন? আমাগ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল তো আবার অর্ডার দিছেন জুতা না-পইর্যা কলেজে গেলে পার্সেন্টেজ নাই। তা কোন্ বামুনের কথা শুনব? শিমূলগড়ের না কলেজের?’ কথাটির সোজা সরল গতিতে চমৎকৃত সবাই হেসে উঠে হাতে তালি দেয়। যোগেনও।
‘আরে, এ ছাওয়াল তো আমাগরে চাকরি খাইব। কাইল তো আমি শিমূলগড়ে মিটিং ডাকছি বাবা। সেই হানে আমাগো পক্ষ থিক্যা কী কব।’
আবার তুলসীমালার গলার আওয়াজ ওঠে। নারীস্বরে সেটা শোনায়, ‘কইব্যা যে আমরা জুত্যা পরা আসব না। কিন্তু একডা সীমা-সরহদ্দ থাকব তো। সেই সীমাখান ঠিক কইর্যা দ্যাও। বিবাদ মিটাও।’
‘এই-যে মুকুন্দ, তালই-এর চায়্যা উঁচা গলা তো আর আমাগ মইদ্যে কারো না। কও এবার। ‘আমাগ জুতাপরার সীমা মাপার বামুনরা কে?’ আমরা কি তাগ জমিদারি ভিতর জুতাপায়ে ঢুকি? তার থিক্যা কাইল আপনার মিটিঙে বেবাক মানুষ জুত্যা পইর্যা যাই। একা-একা জুত্যা পইরলে বামুনরা তার জুতা খুলাইতে পারে। বেবাক মানুষ জুত্যা পইরা গেলে কার জুতা খুলাবে?’
মুকুন্দের কথায় যোগেন একটা সম্ভাবনার আঁচ পায়। বামুনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটা সমাবেশ যেন তৈরি হয়ে যেতে পারে। যোগেন ততক্ষণে তার একটা পা ভাঁজ করে বিছানায় তুলেছে আর মুদ্রাদোষে আর-একটা পা দোলাচ্ছে। তার ঠোঁটে হালকা হাসিটা লেগে আছে, কোনো একটা অবস্থা, সে বাইরেরই হোক, আর কোনো মামলারই হোক, মাপজোখ করে নেয়ার সময় অনেকক্ষণ যে-হাসিটা তার ঠোঁটে লেগে থাকে। যোগেন সবার মুখের ওপর দিয়ে তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনে। বেবাক মানুষে জুত্যা পইর্যা কাইলকার মিটিঙে হাজির হওয়ার কথায় যে-হাসাহাসি ওঠা স্বাভাবিক ছিল তা ক্যান উইঠল না? বরং সবাই য্যান চুপ মাইরা গেল। ডর খাইল? না, যোগেনরে ভাবার সময় দিল? নাকী, অন্য একটা কিছু আছে, যার সঙ্গে মতামতের কোনো সম্পর্ক নাই। যোগেন একটু যাচাই করতে চায়।
‘এই কথাডা ষোল আনার উপর আঠার আনা ঠিক যে, সরকার-লাটশাহেব-আইনসভা সবাই চায় সিলেটের এই দাঙ্গাহাঙ্গামা যত্ তাড়াতাড়ি হয়, মিট্যা যাক। এই কথাডাও আঠারো আনার উপর এক সিকা ঠিক যে, এনারা সগ্গলে মনে করে—দোষ উচ্চ বর্ণের, বামুন-কায়েতগো। তার এক নম্বর প্রমাণ—তা না হইলে সরকার আমারে তাগো প্রতিনিধি না পাঠাইয়্যা, কুনো বামুন-কায়েতরে পাঠাইত। দুই নম্বর প্রমাণ—সেক্রেটারির থিক্যা রাজবাড়ির এসডিও, আমারে লঞ্চ পারাইল যে স্যায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সিলেটের এসপি আর হবিগঞ্জের এসডিও আমারে শায়েস্তাগঞ্জে লাইন বদল কইর্যা হবিগঞ্জ পর্যন্ত আইল—তারা প্রত্যেকড়া মানুষ কইছে, দোষ উচ্চবর্ণের। তিনি নম্বর প্রমাণ—নমশুদ্দুরদের যদি এক পয়সা দোষও থাইকত, তাহাইলে দারোগা পুলিশ আইস্যা আমাগো ঘাড় মটকাইয়া হাজতে ঢুকাইত। দুইডা নমশূদ্রের বদলে যদি দুই বামুন খুন হইত, তাহাইলে দ্যাখত্যা কাণ্ডটা কী বাঁধে। সেদিক থিক্যা মুকুন্দর কথাডা ঠিক। অ্যাহ যহন সরকার আমাগ পক্ষে, তহন সমাজের বেবাক মানুষ এক হইয়া জুতা পইর্যা উচ্চবর্ণের হিন্দুগো বুঝান দেয়া যায়—আমরা তাগো হুকুমের দাস না। সরকার-পুলিশের আমাগো পাশে-পিছনে থাহার মতন অবস্থা ভবিষ্যতে নাও আইসতে পারে। এইডা যে আমাগো জোর দেখাইব্যার সুযোগ এড্ডা, তাই নিয়্যা তো সন্দ নাই।’
সবার ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে যোগেন তার কথাটা থামিয়ে দেয়। যোগেন টের পায় সবাই-ই এটা চায় কিন্তু অন্য কোনো অস্বস্তি হচ্ছে।
যোগেন এবার হেসে বলে, ‘কিন্তু বাবা মুকুন্দ, আমাগো এড্ডা অসুবিধা তো আছে। আমাগো সগ্গলের তো জুতা নাই’, যোগেন সারা শরীর দুলিয়ে হেসে ওঠে, মুহূর্তে সেই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের নিয়ে ঠাট্টাতামাশায় ঘরের গুমোট কেটে যায়। কেউ একজন গলা তুলে বলে, ‘যাগো আছে তাগো আবার পরার অভ্যাস নাই। পুরান শক্ত জুত্যা পায়ে পড়লেই ফোস্কা।’ আরো একজন বলে ওঠে, ‘পুরান জুতার দোষ দ্যাও ক্যা? কাইল সকালে নতুন একখান জুত্যা কিন্যা পইরলে পায় ফোস্কা পড়ব না?’
যোগেন আবার একচোট হাসে। হাসির মধ্যে ইঙ্গিত ছিল, নতুন একটা কিছু তার মনে এসেছে। সেই কথাটা শুনতে সবাই একটু চুপ করে থাকে।
‘আরে সিলেটি বামুনগোর তো মাথার পিছনে টিকি নাই যে বুদ্ধিশুদ্ধি ঢুইকব্যার ফুটা পাবে। অগো তো টিকি আছে গুয়ায় আনারসের নাগাল। কাঁটা উঁচ্যাইয়া গুয়ার বুদ্ধির উপর বইস্যা থাহে। আমাগো জুতাই নাই, তা বিধান দিল চাঁড়ালগো জুতো পরা চইলবে না। বুদ্ধি কিছু থাইকলে তো বিধান দিত—সব চাঁড়ালরে জুত্যা পরনের লাগবই।’
যোগেনের এই কথায় একেবারে গড়াগড়ি শুরু হয়ে গেল, হাসির। কেউ কেউ তালিও দিয়ে উঠল।
তুলসীমালা আবার একটা আওয়াজ করল, যার শব্দগুলো দাঁড়ায়, ‘বেবাক খালি পায়েই যাও।’
যোগেন তুলসীমালার হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, ‘গুরুরে, তুমি কি সাধে গুরু? অ্যামন বুদ্ধি না-ইলে কি তুমি আমার গুরু? নিজের নাম থুইলা তুলসীমালা, যত কই, তালই, মালা তো স্ত্রীলিঙ্গ, ওডারে মাল্য করো, তত কয় মাল্য নিয়া তো সবাই গুরু হয়, মালা নিয়া এক তুলসীমালা। মুকুন্দ—তোমার কথা থাকল, সবাই মিল্যা যাত্রা আর তালই-এর কথাও থাইকল—সীমা মাপেন, বামুনঠাকুর। সবাই সকাল-সকাল যাবে, আলগা-আলগা থাইকবে কোনো সন্দ য্যান তৈরি না-হয়। বেলা দুইডায় মিটিঙ ডাইকব্যার কইছি। এসডিও আমারে নিয়্যা পৌঁছাইলে তোমরা একে-একে আইস্যা জড়ো হইবা, যেহানে মিটিঙ সেহানে। বইব্যা না। সবাই মিল্যা খাড়াইয়্যা থাকবা-–’
‘বোবার নাগাল?’
‘ক্যা? কালার লাগান না? এগগেবারে বোবা-কালা। বলদের নাগাল। কেউ কিছু কইলেও কানে যায় না। সবাই গায়ে গা লাগায়্যা থইকো, গায়ে গা লাগায়্যা—’
দেবেন হঠাৎ বলে ওঠে, ‘মাইয়া-ছাওয়ালরাও যাইব নি?’
‘হঠাৎ মাইয়া-ছাওয়ালের কথা ক্যা?’
‘ঐ যে কইলেন, গায়ে গা লাগাইয়া থাহার কথা। মাইয়া-ছাওয়াল না থাইকলে গাও পাব কোথথন?’
‘অ হ হ রে ধর্মের ষাঁড় হইছেন বলদ আর দিব্যার চান পাল! ক্যা? পুরুষের কি ভাঙ্গা গতর যে ঠেকনা দিয়া সিধা হবার লাগব? প্রায় নিজে-নিজে খাড়ায় না, অরে খাড়া কইরব কেডা? যে যার নিজের গায়ে সাঁইট্যা থাইকো, লাগাইবার জইন্য আর-এক গাও খুঁইজো না— তীক্ষ্ম স্বরে কথাগুলি বলল দেবেনের নিঃসন্তান বৌ।
.
এসডিও গাড়ি নিয়ে এলেন ঠিক দেড়টায়। এসডিও শাহেব এসেছেন—তাঁকে আপ্যায়ন করা হবে না? নামতলা-র বাড়িতে এটা কোনো আয়োজনের ব্যাপরই নয়। এবাড়ির সকলেই, দশ-বার বছর বয়স হয়েছে এমন সব ছেলেমেয়েরাও মানুষজনকে অভ্যর্থনার রীতিনিয়ম জেনে যায়। বাড়ির পুরুষদের কথাই নেই—তারা সকলেই যেন জ্যান্ত গুরু। লালপাড়ের ধোয়া ধুতি পরনে, সেটার মতই একটা উত্তরীয় গলায় ঝোলানো। যিনি এসেছেন, তাঁর অভ্যর্থনা যদি রাধামাধবের দাওয়ায় হয়, তাহলে ব্রাহ্মাণ পুরোহিত চরণামৃত দেন, আশীর্বাদী ফুল দেন, রাধামাধবের সামনে অহর্নিশ শিখায়িত বড় প্রদীপ থেকে নেয়া তাপে হাতের তেলো গরম করে, সেই তাপ অভ্যর্থিতের কপালে, মাথায় ও কণ্ঠদেশে ছুঁইয়ে দেন। এরা কেউ দাওয়ায় উঠবে না। কিন্তু ঐ ধুতিতে উত্তরীয় সেজে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যে-করেই হোক অভ্যর্থিত অতিথি এটা জেনে যান—’রাধামাধব আমাদের ঘরে আইস্যা উঠছেন বইল্যা তারে আমাগো জাতে নামাতে পারি না। আমরা চণ্ডাল, চণ্ডালই থাকব। আমাগো অধিকার নামকেত্তন পর্যন্ত—গৌর যা দিয়া গিছেন। তার বেশি আমরা চাইব্যার পারি না।’
এমন মানুষ, যে আচমকা হবিগঞ্জে এসে পড়েছে আর তাকে নিয়ে আসা হয়েছে নামতলার রাধামাধবের মন্দিরে, এসে, যখন সে দেখে বা, বোঝে এই মন্দিরের কর্তৃত্ব এক নমশূদ্র পরিবারের ও সেই পরিবার শাস্ত্রীয় বর্ণভেদ অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলে, এমন কী দাওয়াতেও ওঠে না—তারা তখন অভিভূত হয়ে যায়। এও কি সম্ভব? এ কি সত্য?
কোনো-কোনো অভ্যর্থিতের হাতে কখনো-কখনো একটা ছোট পাতলা বই তুলে দেয়া হয়। খুব পাতলা লাল মলাটে, ইংরেজি ও বাংলায় মলাটে লেখা—’দি মিস্ট্রিজ অব রাধামাধব’স অ্যারাই ভ্যাল ইন দি নামতলা মন্দির অব গুরু তুলসীমালা বৈষ্ণব’, ‘নামতলায় গুরু তুলসীমালা বৈষ্ণবের মন্দিরে রাধামাধবের অবির্ভাব রহস্য।’ চারপাতা বাংলা ও চারপাতা ইংরেজি। তাতে এই কাহিনী আছে যে গুরু তুলসীমালা বৈষ্ণব একদিন শেষরাতে স্বপ্নে দেখেন, রাধাকে সঙ্গে নিয়ে মাধব এসে দাঁড়িয়ে, তুলসীমালাকে জিগগেস করছেন—তোমার ঘরে কি আমাদের দু-জনের জায়গা হবে? ‘গৌর গৌর’ বলে তুলসীমালা জেগে উঠে দেখেন, পশ্চিমের আকাশে শুকতারায় নীল আকাশ, ‘প্রভু, আমি যে শূদ্র’ বলে কেঁদে উঠে তুলসীমালা বোঝে—সে স্বপ্নে ছিল, ও তার কথাটি যদিও তার জাগরণে বলা, তবুও সেই চেতন কথাগুলিতে স্বপ্ন মাখা ছিল।
এই স্বপ্ন দেখার পর চার বার রাসমেলা হয়। তারপরে মৈমনসিং-এর ধনবাড়ির নবাবশাহেব এক ব্রাহ্মণের হাত দিয়ে রাধামাধবসহ এই চিঠিটি পাঠান। সব মিলিয়ে অভ্যাগতের কাছে নামতলার এক বিরল নিজস্বতা তৈরি হয়ে যায়।
অভ্যর্থনা যখন মেয়েরা করে, বয়স্ক নারী থেকে বালিকা সকলে মিলে মাধবীমালতীর গেট দিয়ে অভ্যাগতকে নিয়ে আসে। সেই নিয়ে-আসার যে কোনো বিশেষ আকার আছে তা নয়। কিন্তু এত বছর ধরে একটা এমন জায়গাকে তীর্থস্থানের সমতুল্য করে তুলতে একটা কোনো আচারের নকশা তো তৈরি হয়ে ওঠে। যারা সামনে থাকে সেই ছোট মেয়েরা যেমন বাঁ গালের পাশে ঘাড় হেলিয়ে একটা তালি বাজিয়েই ঘাড় ডাইনে হেলিয়ে তালি বাজায় তা, পেছনের মা-মাসি-বৌমারা নকল করে নেয় কিন্তু তাদের সাবালক শক্ত আকারে ভঙ্গি আর কত চঞ্চল হবে। গান তো সকলেরই জানা—গৌরবন্দনা—’গৌর আইল নদীয়ায়—’। দলে যে-মেয়েরা গুঁড়িও নয়, বুড়িও নয়—বাড়িরই বৌ কিংবা মেয়ে, তারা তাদের কোমর ভেঙে আবার ভেসে উঠতে পারে। গুঁড়িরা এটা নকল করতে পারে না আর বড়রা কোমর ভাঙতে গিয়ে হাঁটু ভেঙে যেতে পারে—এমন কোনো ভয়ে থাকে।
অভ্যর্থনার এই পুরো রেওয়াজ থেকে এসডিও শাহেবের কোনো রেহাই ছিল না। কিন্তু মিটিঙে যাওয়ার তাড়ায় বন্দনাটা বাকি থাকল। এসডিওশাহেব যে সত্যিই নামতলা—মাহাত্ম্য জানতেন না, এটা বোঝাই গেল তাঁর খেদে, ‘আমার সাব-ডিভিশনে, অথচ আমিই জানি না! আশ্চর্য। এরকম একটা ইনস্ট্যান্স থাকতে এই জায়গাতে ইনট্রা-হিন্দু রায়ট চলছে কী করে?’
যোগেন সেটুকু দেরি করে মিটিঙে পৌঁছুঁতে চেয়েছিল, যেটুকু সময়ের মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা মিটিঙের জায়গায় জড়ো হতে পারে। যোগেনের নামে মিটিং ডাকা হলে, ওঁরা দেরি করে তো আসতই, কেউ-কেউ আসতই না। কিন্তু এসডিও শাহেবের ডাকা মিটিঙে অতটা বেয়াদপির সাহস হবে না। যোগেন মাত্র সেইটুকু দেরি করতে চেয়েছিল, যার মধ্যে সবাই এসে বসে থাকে আর তার দলবল জড়ো হয়ে যেতে শুরু করে।
ঘড়ি ধরে একেবারে তাই-ই ঘটল। শিমুলগড়ের সবচেয়ে পুরনো মন্দির, এর কাছাকাছি একটা তাম্রলিপিও মাটি খুঁড়ে বেরিয়েছিল। সেই তাম্রলিপির সঙ্গে যে এই মন্দিরের কোনো সম্পর্ক নেই—তা কালক্রমে প্রমাণও হয়েছে! সেসব গবেষণা, প্রতি-গবেষণা অনেক পরের ব্যাপার। মানুষজন যখন প্রথম এই লিপির কথা জানল, তখন সিলেটসহ আসাম ও পূর্ববঙ্গ আলাদা এক প্রদেশ হয়ে গেছে। তার অনেক আগে থেকেই মন্দিরটা মাটির ওপরে বনজঙ্গলে ঢাকা ছিল, ভিতরে কোনো দেবতাও ছিল না। জঙ্গলটা বা মন্দিরটাতে চুরি করার মতও কিছু ছিল না। এমনকী এই মন্দিরটাকে বোঝাবার জন্য কোনো নামও দরকার হয়নি কারো—তেমন বোঝানোর দরকারই হয়নি। ১৯১০-এ তাম্রলিপি পাওয়া মাত্র এমন একটা হৈহৈ উঠল যেন সকলেই মন্দিরটার ওপর দখল চায়। মালিকানা কেউ চাইল না। মালিকানা চাইল এক-এক সম্প্রদায়। মৌলভিবাজারের ও নবীগঞ্জের মুসলমানরা বললেন—ওটা মৌলভিবাজারের সবচেয়ে বেশি তাম্রলিপি পাওয়া গেছে যেখানে এটাও সেখানে পেতে বাধা কোথায়? বাধা তেমন ছিল না বলেই মুসলমানরা এও বললেন—এটা এত পুরনোও নয়, মন্দিরটা মশজিদ ছিল, তার দরজা তাই পশ্চিমদিকে খোলা, হিন্দুদের কোনো দেবতা কোনোকালে পশ্চিমদিকে মুখ করে দাঁড়ায় না। কথাটাতে একটা আচমকা যুক্তি আছে। সেই যুক্তিতে ধাঁধায় পড়ে গেলে— চোখের দেখাও গুলিয়ে যায়। মন্দিরের চার দেয়ালে এত বড়-বড় গোলাকার ফাঁক যে, সব দিকের ফাঁকটাকেই দরজা বলা যায়। যা হোক, কারো দায় পড়েনি পুব-পশ্চিম খোঁজার।
বছর তের আগে, ১৯২৪-এ ঢাকা-সিলেটের দাঙ্গা বেঁধে যায়। সে-দাঙ্গাতেই প্রথম কারা কোন জায়গার প্রাচীনতর অধিবাসী এই প্রশ্নটা উঠে পড়ে, যেন যে-নতুন চর উঠেছে, সেটা কার পুরনো জমি এই নিয়ে দখলের লড়াই। সেই দাঙ্গাতেই হঠাৎ ‘হিন্দু মিশন’-এর সিলেটি নেতারা হাটে-মাঠে-ঘাটে প্রচার শুরু করে দিলেন—শ্রীহট্ট বরাবরই হিন্দু রাজ্য, তার শেষ হিন্দু রাজার নাম গৌড়গৌবিন্দ। তখন এক ‘হট্টনাথের পাঁচালী’ শ্রীহট্টের প্রাচীন গৌরবের বিবরণ দিয়ে সর্বত্র পড়া হত। এই গোলমালে রটে গেল—যে-তাম্রলিপিটি ঐ মন্দিরের কাছে পাওয়া গিয়েছিল, তার আগের পাঠ ভুল, কারণ যে-পণ্ডিতজন ঐ লিপিটির পাঠোদ্ধার করেছিলেন, তাঁরা কেউই শ্রীহট্টে প্রচলিত ভাটেরা বর্ণমালা পড়তে পারতেন না। এখন সেটা ঠিকঠাক পড়ে জানা গেছে—ঐ তাম্রলিপিটিতে রাজা আদেশ দিয়েছেন, জয়রথ নামে কোনো এক ব্রাহ্মণের আবেদনে রাজা তাঁর প্রতিষ্ঠিত অনন্ত-শয়নে বিষ্ণু মূর্তি সমন্বিত মন্দিরটির ভরণপোষণ বাবদ ঐ মন্দিরের সংলগ্ন ১১১ একর জমি দান করলেন।
তাতেও কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।
কিন্তু ‘হিন্দু মিশন’-এর ব্রাহ্মণ নেতারা রাতরাতি শ-শ লোক লাগিয়ে জঙ্গল সাফ করে, মন্দিরটির যেটুকু সংস্কার না করলে নয়—সেইটুকুমাত্র মেরামত করে সেখানে জীবন্ত বিগ্ৰহ প্রতিষ্ঠা করলেন। বিগ্রহটি কীসের সেটা কারো কাছেই স্পষ্ট ছিল না। কেউ বললেন—ঐ শয়ন মন্দির, কেউ বললেন শ্যামা শিব—মানে মা-কালী শিবের মত বাঘছাল আর কোমরের ওপরটায়, অর্থাৎ ঊর্ধাঙ্গে মা-কালীই থেকে মানুষের গলা কাটছেন। পৃথিবীতে নাকী আর কোথাও মা-কালী ও মহাদেবের, শিবের ও শ্যামার, এমন অদ্বৈত মূর্তি নেই।
ব্রাহ্মণরা কোনো কথাতেই আপত্তি করেনি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে মন্দিরটাকে ঘিরে তৈরি হয়ে গেল বামুনদের কলোনি। এরা সকলেই না কী সেই জয়রথের বংশধর। সেটাই শিমুলগড় বলে নাম করেছে। তারাই এ হুকুম জারি করেছে যে শূদ্ররা পায়ে জুতো পরতে পারবে না। হুকুম বহাল রাখতে এক বছরে দুই-দুই জন নমশূদ্র খুন হয়েছে। এই শিমুলগড়ের মন্দিরেই মিটিং ডাকা হয়েছে।
