৭৮. সিলেটমুখী যোগেন, শায়েস্তাগঞ্জে
যোগেনকে আর-একবার হাসতে হয়। হামাগো বরিশাইল্যাগো তো র্যালে উইঠলেই মনে হয় গাঙচিলের মতন পাখা মেইলছি। র্যালগাড়ি তো লাইন ছাড়া চলে না আর লাইন পাতার লগে তো র্যালের উঁচা বাঁধ দিব্যা লাগে। র্যালের বাঁধের লগে তো অন্তত টানা বড় আইলের নাগাল জমি চাই। বরিশালে ঐ টানা আইল কোথায়? পায়ে হাইটব্যার গ্যালেই তো দশ পায়ে এক খাল। বরগুলা-আমতলির কথা স্মরণ হইছে—জুতা পাইয়্যা ঘোরা গিছিল বইল্যা।
যোগেনের আন্দাজ ঠিকই ছিল—শায়েস্তাগঞ্জে গাড়ি পৌঁছল সাড়ে পাঁচটার পর শায়েস্তাগঞ্জের স্টেশনটা ঝলমলে—ইলেকট্রিক লাইট আছে। রেলের লোকজনের নীল ওভারল বা কোট পরে ছোটাছুটিও আছে। একজন বেশ হেলেদুলে লাল চিনে লণ্ঠন দোলাতে-দোলাতে পার হয়ে গেল। তারপর আর-একজন সবুজ চিনে লণ্ঠন দোলাতে-দোলাতে উলটো দিক থেকে এল। যোগেন নিজে ট্রেন থেকে নামার কোনো ভঙ্গিই করল না বরং জানলা দিয়ে তার মুখটা যতটা বাইরে ঠেলা সম্ভব, ঠেলল। সে নেমে গিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করলে, যারা তাকে খুঁজে বের করে হবিগঞ্জের ট্রেনে তুলে দিতে এসেছে—তারা আবার তাকে খুঁজে পাবে না। এমএলএ হয়ে তো এই উন্নতি হল–কলকাতা থেকে হবিগঞ্জ হয়ে গেল যেন মহাপ্রস্থান।
হঠাৎ একটা বেঁটে শাহেব হ্যান্ডেল ধরে, যেন একটু কষ্ট করেই কামরায় উঠে যেন হাঁফ ছাড়ে। যোগেন বুঝতে পারে না, দাঁড়িয়ে ওঠাটা ঠিক কী না। সে তার বার্থটা হাত দিয়ে দেখিয়ে বলে, ‘দয়া করে বসুন।’
যোগেন কোনোদিন এত বেঁটে, হাঁফধরা, কী করতে হবে তা নিয়ে অনিশ্চিত শাহেব দেখেনি। যোগেনের কথায় শাহেব মুখ ভরে হাসল—দাঁতগুলো ঝকঝকে ও বড়-বড়। একটু বেশিক্ষণ হাসি ধরে রাখছে দেখে যোগেনের সন্দেহ হয়—দাঁতগুলো কি বাঁধানো?
শাহেবটা হাসি শেষ করে বাজখাঁই গলায় জানতে চাইল—সে কি মিস্টার মণ্ডল এমএলএ-র সঙ্গে কথা বলছে?
এবার যোগেন উঠে দাঁড়ায়, শাহেবকে দেখে যতটা অবাক হয়েছিল, শাহেবের গলা শুনে সে চমকে ওঠে। এইটুকু হাইট থেকে এমন মেঘগর্জন?
‘হ্যাঁ, আমি কি জানতে পারি আমার কার সঙ্গে কথাবলার সৌভাগ্য হচ্ছে।
‘সিওর। অ্যাম হিয়ার টু রিসিভ ইউ। হ্যাপন টু বি দি সুপারইনটেনডেন্ট অব কাছার ডিসট্রিক্ট।’
‘আপনি আবার কষ্ট করতে গেলেন কেন। আমি ঠিকই পৌঁছে যেতাম হবিগঞ্জে।’
ছিপছিপে এক লম্বা যুবক কামরায় ঢুকে নমস্কার করে বাংলায় বলে, ‘চলুন স্যার, নামি। ‘ আমি হবিগঞ্জের সাব-ডিভিশন্যাল অফিসার, স্যার।’
‘এ হানে তো চেঞ্জ কইরবার লাগব? চলেন’—যোগেন এসডিওকে নিয়ে দরজার দিকে এগতেই দেখে, শাহেব ততক্ষণে দু-দিকের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে নামছে। এসডিও চট করে দরজার সামনে উটকো হয়ে বসে তার হাতটা শাহেবের দিকে বাড়িয়ে দেয়। যোগেন এসডিওর পেছনে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে বুঝতে পারে—হ্যান্ডেল শেষ হয়ে যাচ্ছে অথচ শাহেবের পা মাটি পায়নি। বেঁটে লোকদের এমন অসুবিধে হয়। এসডিও এটা জানে নিশ্চয়ই।
শাহেব নামার পর এসডিও দাঁড়িয়ে সরে যায় ও যোগেনকে নামার সংকেত দেয়। যোগেন নেমে যাওয়ার পিছু-পিছু এসডিও নেমে এসেছে।
ইতিমধ্যে তো রটে গেছে—এসপি ও এসডিও দু-জনই এসেছেন একজনকে রিসিভ করতে।
ঘটনাটা কী?
শায়েস্তাগঞ্জের স্টেশন মাস্টার, অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার, টিকিটবাবু সকলেই এসে এদের ঘিরে দাঁড়ায়।
‘আপনারা কেন?’ এসডিও জিজ্ঞাসা করে।
‘আমি তো স্যার, আমার টেরিটরিতেই আছি। এহান্তে তিনবজ্র সম্মিলন দেইখ্যা জিগ্যাইব নি-ব্যবস্থার কুনু দোষত্রুটি—’
শাহেব বলে ওঠে, ‘উইল বি মুভিং। নাথিং টু ডু উইথ ইউ।’
মাস্টার কোমর ঝুলিয়ে শাহেবের কানের কাছে মুখ নাবিয়ে বলেন—’স্যার, আমার ঘরে বইস্যা শলাপরামর্শ করলে হয় না, স্যার?’
শাহেবের মেঘগর্জন শোনা যায়, ‘নো, নো, ইয়োর চেয়ার্স কালটিভেট বেডবাগস–
‘স্যার, ইস্টিশনে—কাছারিতে তো বেবাগ লোগই আসে—বামুন-শাহিব-হাকিম-হেকিম মগগয়া আসে। অগো পরনের বস্ত্র থিক্যা ছারপোকা চেয়ারে ডিম পাড়ে। স্যার এত্তালা পাঠাইলেন না ক্যান? চেয়ার গরমজলে ধুইয়া রাইখতাম। স্যার, চলেন, চলেন।
শাহেব বলে ওঠেন, আমাদের হবিগঞ্জে যেতে হবে এঁকে নিয়ে।
মাস্টার জবাবে বলে, ‘সে তো স্যার দুই ঘণ্টা পর ছাইরব। মাঝহানে তো চাইড়া ইস্টেশন। ঐ ছাড়া আর পৌঁছাতে যা টাইম লাগে। লেট কইরব্যার লাগব স্যার?’ তাহালি লেট কইর্যা ছাড়ব। কতডা লেট স্যার? এক ঘণ্টা না আধা ঘণ্টা?
শাহেব, এসডিওকে আঙুল তুলে বলে, সমস্যাটা বোঝাতে।
‘শুনুন মাস্টারমশায়, আমরা তো গাড়ি নিয়ে এসেছি। রাস্তার যা অবস্থা তাতে তো ওঁর হাড়গোড় ভেঙে যাবে।’
‘রেইল থাইকতে রাস্তা ক্যান?’
‘হিশেবটা হচ্ছে—ট্রেন ছাড়তে এখনো দুই ঘণ্টা। পৌঁছুতে আরো ঘণ্টা দেড়। মানে এখন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে পৌঁছুব। আর এখনই গাড়িতে যদি রওনা দেই, তাহলে এই রাস্তাতেও ঘণ্টা দুয়ের বেশি লাগবে না। মানে গাড়িতে গেলে দেড় ঘণ্টা সময় আমরা বাঁচাচ্ছি। অন্তত।’
‘যদি-না চাকা ফাটে?’
‘সে তো বটেই। আপনার সিগন্যালও তো ডাউন হতে না পারে।’
‘এই রাস্তাডা, এই শায়েস্তাগঞ্জ থিক্যা হবিগঞ্জ—এই রাস্তাডা তো আপনাদের তিনজনের কথাবার্তা কইব্যার লাগে? উনি তো কোনো কাজে আইসেন?’
‘হ্যাঁ। সে তো লাগবেই—’
‘মোটর গাড়ির ভিতরে তো আটা মাটির যেমন, তেমন গড়ান খাইতে হব, একবার বাঁয়, একবার ডানে। কথা কবেন কখন?’
‘সে তো ঠিকই। কিন্তু স্যার তো আপনার এখানে ট্রেনছাড়া পর্যন্ত বসতেই চাইছেন না। বলছেন—ঐ দুই ঘণ্টায় ছারপোকা আমাদের সব রক্ত শুষে নেবে।’
‘বড় শাহেব এড্ডু বেশি-বেশি ডর খাউছছেন। হয়, ছারপোকা এড্ডু আছে কিন্তু আপনারাও তো মানুষ তিনজন। ভাগাভাগি কইর্যা কামড়াইলে আর পার পাছা কয়ডা পড়ে?’
যদিও যোগেন বা এসডিও কেউই হাসেনি তবু একটা ছোট্ট হাসি চাপা পড়ার আওয়াজ শাহেব পেয়ে যায়। এরা নিশ্চয়ই নিজেদের ভাষায় তাকে নিয়ে মজা করছে। ওদের মুখের ভিতরে দুর্বোধ্য আওয়াজগুলি যেন কুকুরের মাঝরাতের হাড়চিবুনোর মতো।
শাহেব এসডিও কে বলে, ‘দেরি করলে তো দেরিই হচ্ছে। মিস্টার মণ্ডল তো প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা রাস্তায়!
যোগেন জিজ্ঞাসা করল, ‘হোয়াট ওয়াজ দি অরিজিন্যাল প্ল্যান? আর ইউ চেঞ্জিং ইট ডিউ টু রোড-কনডিশন।
জবাবটা সাহেব দিলেন, সত্যি কথা বলতে কী, তেমন কোনও প্ল্যান করার সময়ই তো পাইনি। ডিএম কাল প্রায় মাঝরাতে জানান আপনি আসছেন ও আমাকে রিসিভ করতে হবে, ডিস্ট্রিক্ট লেভেলের আর-কোনো অফিসার নেই। আমার হেডকোয়াটার থেকে বাই রোড আসতে হয় না। রোড কনডিশন জানা ছিল না। আর ওকে যখন হবিগঞ্জে ওর অফিসে পৌঁছে বলি শায়েস্তাগঞ্জ যেতে হবে, ও সাততাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, রাস্তার কথা ওর বোধহয় মনে ছিল না।
যোগেন পালটা জিজ্ঞাসা করে বসে, ‘আপনারা তো হবিগঞ্জেই আমাকে রিসিভ করতে পারতেন!’
শাহেব—’বাট হাউ কুড ইউ অ্যালাও অল এলোন টু মেক ইট টু হবিগঞ্জ আফটার এ চেঞ্জ অব ট্রেন।’
যোগেন—’সে তো বোঝা গেল। এখন সমস্যা হল হবিগঞ্জের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা অথবা সড়ক ধরে যাওয়া। যাই করেন, কোনোটাতেই আমার কোনো অসুবিধ নাই, ছারপোকাতেও না।
মাস্টার—’স্যার, আমি ট্রেন লেট কইরা ছাইড়তে পারি, এইখান থিক্যাই তো অরিজিনেট করে। লেট-করার আর হাঙ্গাম কী? অ্যাহন ইনকামিং ট্রেইনরেও বিফোর টাইম সিগন্যাল দিয়া ঢুকাইতে পারি। কিন্তু বিফোর টাইম ডিপার্চার তো স্যার হয় না।’
যোগেন সিদ্ধান্ত নেয়ার ভঙ্গিতেই এসডিওর দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বলে এসপি-র জন্যই—দেখুন, আপনাদের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারছি ট্রেনে যেতেই আপনারা স্বস্তি পাবেন। তাহলে তো ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে ছারপোকা আর নো ছারপোকা। আসুন না, হাঁটি, আপনাদের কথা শুনি।
যোগেন পা বাড়িয়ে দেয়। এসপি আর এসডিও তার পেছন-পেছন চলে।
ধীর পায়ে প্ল্যাটফর্মে তাদের তিনজনের হাঁটায় প্ল্যাটফর্মটা ধীরে-ধীরে খালি হয়ে যায় –ভয়ে।
যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘হোয়াট ইজ ইয়োর এস্টিমেট অব দি সিচুয়েশন—’
এসপি বলতে না-বললে তো এসডিও কথা বলতে পারে না। ফলে, তিনজনই চুপ করে থাকে। এসপিই কয়েক পা গিয়ে বলে, ‘ভেরি ব্যাড সোস্যাল পোলারাইজেশন লিডিং টু সাডন ভায়োলেন্স।’
যোগেন জিজ্ঞাসা করে, রাজনীতি কিছু নেই?
এসপি—সৌভাগ্যবশত এখনও নেই কিন্তু হতে কতক্ষণ? বা, ইতিমধ্যে হয়েছে, আমরা খবর পাইনি এখনো।
যোগেন—এটা অদ্ভুত না? একবছর ধরে একটা রায়ট চলছে, দু-একজন মারাও যাচ্ছে, অথচ কেন হচ্ছে—বোঝা যাচ্ছে না?
এসপি—উচ্চবর্ণের হিন্দুদের গোঁড়ামি ও একগুঁয়েমি।
তারা প্ল্যাটফর্মের শেষে এসে গিয়েছিল। এমনিই ঘুরত। পেছন থেকে একটা ভয়খাওয়া চিৎকারে তারা ঘুরে দাঁড়ায়, ‘স্যার, স্যার, স্যার।’ স্টেশন মাস্টার দৌড়ে আসছে। তার পেছনে আরো কয়েকজন।
তাদের সামনে এসে স্টেশন মাস্টার একটু দম নেয়ার পর বলতে পারে, ‘শায়েস্তাগঞ্জ কখনো স্যার ফেইল করতে পারে না। আপনাগো ভেলুয়েল্ টাইম নষ্ট হবে স্যার, হয় হাঁইট্যা-হাঁইট্যা না-হয় ছারপোকার খাদ্য হইয়্যা? আমারে সার্ভিসে থাইক্যা এই দৃশ্য দেইখতে হবে? এর চায়্যা মৃত্যু ভাল।’
‘আপনার বেঁচে থাকার কি কোনো বুদ্ধি বেরল?’–এসডিও জিজ্ঞাসা করে।
‘হ্যাঁ স্যার, আমাগো ইনস্পেকশন ট্রলি আপনাগ তিনজনরে হবিগঞ্জে পৌঁছায়া দিবে, ট্রেন ছাড়ার টাইমের আগেই। ফর্টি ফাইভ মিনিটস, স্যার। নো-স্টপ তো। অ্যাহন আপনাগো অনুমতি হইলে ট্রলিডা লাইনে ফেলতে কই?’
‘আমাগো সঙ্গে কেউ থাইকব তো, রেলের?’
‘সে কী কথা? চালাইব কেডা, লোক না থাইকলে! টু হ্যান্ডলার্স অ্যান্ড ওয়ান সিগন্যালার, তিনজন স্যার তিনজন, ওরা স্যার, নিজেগো মইধ্যে কাজ ভাগাভাগি কইর্যা নিবে। ব্রেকডা স্যার, আপনাগো কারো পায়ের কাছে থাকবো, আপনারা তিনজন তো? অ্যাকোমোডেশন হবে না। ব্রেক আর লাগব কখন?’
এসডিও অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। এসপি আর এমএলএ থাকতে তার হ্যাঁ-না করার অধিকার নেই। এসপিও চুপ করে থেকে জানিয়ে দেন—যোগেন যা বলবে, তাই হবে। ওদের যদি আপত্তি থাকত, তাহলে অবিশ্যি ‘না’ ‘না’ করে উঠত। যোগেন বলে, ‘কোথায় আপনার ট্রলি।’
‘এই-যে স্যার, রেডি,’ তারপর পেছনের লোকদের হুকুম করে, ‘এই ট্রলি লাগাও!’
সবই তৈরি ছিল–হাঁকটা শোনার অপেক্ষায়। লাইনের ওপর দিয়ে একটা ট্রলি ঠেলে নিয়ে আসে দু-জন। আর-একজন পেছন-পেছন দৌড়াতে-দৌড়াতে আসে, লাল একটা লণ্ঠন নিয়ে। যোগেন খুশি হয়ে বলে, ‘আরে নদীর য্যামন ডিঙ্গা, রেলের তেমনি ট্রলি। চইড়ব ক্যামনে? এহান থিক্যা ফাল দিয়া?’
ট্রলিটা প্ল্যাটফর্মের অনেক নীচে।
‘ফাল পাইড়বেন ক্যান স্যার! এই ঢাল দিয়্যা লাইনে নাইম্যা ধীরে সুস্থে আরাম কইর্যা বসেন,’ আবার পেছন ফিরে বলে, ‘এই ছাতা লাগাও নাই? ছাতা লাগাও, ছাতা লাগাও।’ প্ল্যাটফর্মের একটু ভিতরে ভিড় জমে ওঠে, তারা দেখতে চায়, ঘটছেটা কী, একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়ানোর সাহস পায় না।
এরা তিনজন দাঁড়িয়ে ট্রলিটাকে একবার দেখে নেয়, হাসি-হাসি মুখেই।
‘উঠেন স্যার, উঠেন।’
সৌজন্যবশে শাহেব যোগেনকে হাত দেখান উঠতে। যোগেন সামনের বেঞ্চিটাতে বসে, একেবারে ডান ধারে। তারপর একবার তার সহযাত্রী দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসে, প্ল্যাটফর্মে যেই জটলা বাড়ছিল তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে হাসিমুখেই। একেবারে শেষে স্টেশন মাস্টারের দিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে যেন—’আরে, এই রেল থাইকতে লোকে রেলগাড়িতে উঠে ক্যান? মাস্টারমশায় দেখালেন যা—’
এর মধ্যে কেউ এসে একটা গার্ডেন আমব্রেলা লোহার নলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে স্ক্রু এঁটে দেয়। মাথার ওপরে শাদা-কমলা-সবুজ ছাতায় মাথার ওপরের আকাশটা ঢাকা পড়ে কিন্তু আলোটা ছাতার কাপড় গলে নানা রঙে ঝরে পড়ে। যোগেন সেই নানা রঙে মাখা নিজের জামাকাপড় দেখে বলে ওঠে, ‘আরে মাস্টার, বিয়ার আর বাকি রাইখলেন তো এক কইন্যা –’
যোগেন ডান ধারে যে বসেছিল আর সরেনি। এসপি আর এসডি. ওকে ঘুরে বাঁদিক দিয়ে উঠতে দেখে, ‘আরে আরে, আমি সইরা বসি।’
শাহেব বলল–আপনি ঠিকই বসেছেন কারণ ওকে তো ব্রেকে বসতে হবে। আর আমার সাইজের সুবিধে এই যে, যে-কোনো জায়গায় সেঁটে যেতে পারি।
যোগেন আগেই লক্ষ করেছে, এখন নিশ্চিত হয়ে গেল, শাহেবের গলার একটাই স্বর—ঐ একই মেঘগর্জন।
জ্যৈষ্ঠ আর আষাঢ় আর আশ্বিনে কোনো হেরফের নেই।
‘স্যার, আপনাগো কোনো অসুবিধা তো হওয়ার কথা না। ট্রায়াল রান দিবেন নাকি অ্যাডডা?’
‘আর ট্রায়ালের কাম কী? ফাইন্যালই ছাড়েন, কী? ঘন্টি দিবেন তো? না কী হুইসল?’
‘ঘন্টি তো স্যার এক ট্রেন ইন-আউটের টাইমে দেয়া যায়। হুইসল বাজানো চইলব্যার পারে কিন্তু হুইসল তো গার্ডের লগে, আমার লগে না।’
‘দুইডা আঙ্গুল ঠোটে পুইর্যা মায়ের দুগ্ধ পানের নাগাল টান মারেন, দ্যাহেন, ক্যামন হুইসল বাজে।’
‘সে কি আর বাজব স্যার, পাঁচ বছর বয়সে মায়ের দুধু ছাড়ছি আর অ্যাহন তো রিট্যায়ারের আর বছর-পাঁচ বাকি। চল্লিশ বছর পার হইয়্যা গিছে স্যার। মায়ের বুকেও দুধ নাই, আর আমারও তো স্যার বত্রিশ পাটি দাঁত-মায়ের ব্যথা লাইগব। বেল একখান চান তো—এই বেল বাজা।’
পেছনের বেঞ্চে তিনজন কুলি বসেছিল, একজনের মাথায় লাল ফেট্টি—আর দুইজনের ঘাড়ে গামছা ঝোলানো। তাদের কেউ লোহায় লোহা মারতেই ঢংঢং করে উঠল আর ট্রলি গড়াতে শুরু করে—রঙিন ছাতায় প্রায় নিঃশব্দ গড়িয়ে যাওয়ায় রথের মত লাগে—ধামরাইয়ের বিখ্যাত রথ।
পেছনের দুই কুলি দু-দিকে দুটো হ্যান্ডেল ঠেলছিল আর টানছিল। তাতেই চলছিল ট্রলিটা। সেই ঠেলা আর টানার যে একটা তাল ওঠে ও আওয়াজও ওঠে, সেটা বোঝা যায় শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে জংলা মাঠ আর মাঝেমধ্যে খাল ডোবার ভিতর দিয়ে যেতে-যেতে। ভাদ্রমাস—তাই এখনো সূর্যাস্ত হয়নি বা সূর্যাস্তের পরের আলো মাঠ-ঘাট-আকাশে ছড়িয়ে কিছুক্ষণ এই ট্রলিযাত্রার নতুনত্বে তিনজনই অভিভূত। যোগেন বলে ওঠে, ‘হবিগঞ্জে আগমন সারাডা জীবনে আমার অবিস্মরণীয় হইয়্যা গেল-আনফরগেটেবল। এই তো শুরু হইয়্যা।
স্যার, হাইলের সাউথ। এটা ঠিক হাইল না স্যার, এটা খোয়াই’–এসডিও একটু ব্যাখ্যা করেন।
‘আমি তো বরিশালের পোলা—হাওড় বুঝি, আমাগ হাওড় আর সিলেটি হাওড় এক না। এহানে তো ছোট বিল্যা জায়গারে হাওড় কয়। আমাগ দ্যাশে বড় নদী ছাড়া হাওড় নাই। সে নদীর জল এগগরে সোতে-সোতে ধাক্কা খাইয়া পাক খাইয়া মাথায় উঠে, কমলে কামিনী দেহায়। হাইলডারে আমরা কী কই?’
‘এইটা কিন্তু স্যার, খোয়াই—নদীর বা জলের স্রোতে শক্ত মাটি ক্ষয়ে গেছে। কুমিল্লাতেও আছে স্যার।’
‘দ্যাহেন, এসডিও শাহেব, বরিশালে কুনো মাটিই নাই, জলে কি আর জল ক্ষয় হয়? ‘ শাহেব সেই একই মেঘগর্জনে বলে ওঠেন, আপনি তো নিশ্চয়ই সেক্রেটারিয়েট থেকে সব জেনে এসেছেন। তবু স্থানীয় অবস্থাটা কি শুনে নেবেন। তাহলে ও বলতে পারে।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খানিকটা তো শুনল্যাম। একবছর ধইর্যা একডা দাঙ্গা চলে কী কইর্যা? পলিটিকস তো নাই। তাইলে ইন্টারেস্ট গ্রুপ কিছু পাইছেন? সে যে দিকেই হউকগ্যা—’
এসডিও একটু চিন্তিত মুখে বলে, ‘ইনটারেস্ট গ্রুপ? তেমন তো কিছু শুনিনি স্যার?’
‘আপনে তো এহানেই আছেন এই একবছর?’
‘একবছরের বেশি, স্যার?’
যোগেন এবার ইংরেজিতে বলে শাহেবের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে, আবার এসডিওর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে, একটা বছর তো কম সময় না। এর মধ্যে আপনাদের কাছে কোনো খবর আসেনি, যে দাঙ্গাটা চালিয়ে লাভটা কার হচ্ছে। মানে, এমন আকাট পাগলও তো থাকতে পারে—কিছুদিন পরপর দাঙ্গাহাঙ্গামা না হলে যার ভাল লাগে না। আপনাদের ইনফর্মার স্পাইরা কোনো খবর দেয়নি?
এসডিও শাহেবকে দেখায়।
শাহেবের গলা ট্রলির হ্যান্ডেলের চাইতে উঁচু শোনায়–আমার কাছ পর্যন্ত আসেনি, হয়ত ওখানকার ডিএসপি-ও জানেন।
এটা কি স্থানীয়ভাবে দেখা হচ্ছে, ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে আপনারা ইনভলভড না?
না, না, মিস্টার মণ্ডল। পুরো অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইনভলভড। কিন্তু ঘটনা যখন ঘটে, তখন তো সামলাতে হয় লোক্যাল অফিসারদেরই। আমাদের যেটা এখন সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা—এ থেকে আবার পাশাপাশি জায়গাগুলিতে উত্তেজনা না ছড়ায়।
নমশূদ্রদের জুতো পায়ে দেয়া চলবে না—এডাই তো আসল কথা?
‘হ্যাঁ স্যার, ঠিকই। কিন্তু একটা পার্টিকুলার গ্রাম তো, ইনটিরিয়ারে, শিমূলঘর, খুব পুরনো মন্দির, কেউ-কেউ তো বলেন এক হাজার বছর আগের, পাঁচশর নীচে কেউ নামেন না। সেই মন্দির বেশ বড় ল্যান্ডলর্ড। সেই মন্দিরের আশপাশের সব জমিই দেবত্র, প্রায় গোটা গ্রামই বলতে পারেন। সুতরাং সেখান দিয়ে কেউ জুতো পরে যেতে পারবে না।’
‘কেউ পারবে না? না কী শুধু নমশূদ্রেরা পারবে না? বামুন-কায়েতরা পরে? মুসলমানরা?’
‘এভাবে ঠিক বলা যাবে না। ব্যাপরাটা ঘোরালো হয়ে উঠেছে। হায়্যার কাস্টরা ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রশনের সঙ্গে মিটিঙে জোর দিয়ে বলেন যে তাঁরাও না কী জুতো পরেন না। কিন্তু আমরা জানি—ওঁরা ঠিক কথা বলছেন না।’
পেছনে সিগন্যালার কখন দাঁড়িয়ে লাল লণ্ঠনটা ঘোরাতে শুরু করেছে, ওরা কেউ বোঝেনি। হঠাৎ ট্রলির সামনের রেললাইনে লাল আলোর প্রতিফলন ও লাইন ধরে ছুটছে দেখে, ওরা ঘিরে ধরা অন্ধকারটা দেখে।
‘তাহলে কাল বেলা দুটো-আড়াইটে নাগাদ সবাইকে মন্দিরেই ডাকেন’ দুই কুলির শ্বাসের আওয়াজ পাওয়া যায়।
যোগেন বলেই দিয়েছিল, সে কোনো ডাকবাংলো বা সারকিট হাউসে উঠবে না, তার আত্মীয়বাড়িতে উঠবে। এসডিও যদি বাড়িটা চিনে রাখেন তাহলে কাল মিটিঙের আগে এসে তাঁকে নিয়ে যেতে পারবেন।
আত্মীয়বাড়ি বলেই যে হবিগঞ্জে তুলসীমালা বৈষ্ণবের বাড়িতে উঠল যোগেন তা নয়। নয়ই-বা কেন? সব চাঁড়ালই সব চাঁড়ালের আত্মীয় না-হলে একা-একা কোন্ চাঁড়াল বাঁচে। সহোদর ভাইদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ নেই অথচ জাতভাইরা সহোদরাধিক। সিলেটে এসে তুলসীমালাকে সেবা না দিয়ে যে যাবে সে আর যাই হোক নমশূদ্র না। ভক্ত বৈষ্ণব বলে সারা সিলেট-কুমিল্লাতেই তুলসীমালাকে সব জাতের মানুষই সম্মান করে, ওঁর শিষ্যও আছে অনেক। তুলসীমালার বাড়িতে গেলেই সব খবর পাওয়া যাবে, জাতভাইরাও সংবাদ পাবে, তাদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটা ঠিকঠাক জানা যাবে, কী করণীয় তাও স্থির করা যাবে। তাছাড়া ভোটে জেতার পর এদিকে আসা হয়নি—গবর্মেন্টের দূত হিশেবে যোগেন দাঙ্গাবন্ধের মিটিঙে হাজির হতে চায় না। সে তার আপন জাতের বিপদে তাদের কাছে এসেছে এটা জানাতে যে এখন তারাও সরকারের অংশ। তার জাতভাইরা যদি নিজেরা নিজের চোখে দেখে ও বোঝে যে যোগেনের কথা ডিসি, এসপি কেমন মান্য করে, তাহলে এদের গর্ব অনেক বেশি হবে। যাই ঠিক হোক, তাতে তুলসীমালার মত আছে—এটা জানাজানি হলে যোগেনের কাজও অনেক সোজা হবে।
