৭৭. পদ্মায় ভাসমান যোগেনের এমএলএগিরি ডেপুটির সঙ্গে
সেই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট লঞ্চের ছাদের কেবিনটিতে পৌঁছে দিয়ে ‘আসছি স্যার’ বলে নেমে যাওয়ার পরও যোগেন নদী দেখতে পায় না-ভদ্রলোক আবার ঠেলা দরজাটাকে ঠেসে দিয়ে গেছেন। সুতরাং যোগেন কেবিনটাই দেখে–ক্যামবিশের চেয়ারে বসে। আরে, এ তো বড় জাহাজের কেবিন থেকেও ভাল। এসডিও এই নিয়ে এত ভাবছিল? শোয়ার জায়গা তাকবন্দি—তাও চওড়ায় আঠার ইঞ্চির বেশি আর ওপরের তাকটাও এক-পা উটকোলেই ওঠা যায়। বেশ চওড়া তো—এতটা জায়গা বড় জাহাজের কেবিনে নিশ্চয়ই মেলে না। সিলিংটা কী দিয়ে তৈরি যোগেন বুঝতে পারে না। বুঝতে হলে আরো কাছ থেকে দেখতে-ছুঁতে হয়। তাহলে তো একটা চেয়ার, কাঠের, চাইতে হয়। ক্যাম্বিশের চেয়ারে তো আর দাঁড়ানো সম্ভব নয়। দেখাচ্ছে কাঠের মতো, কাঠ নয়, আর, এত ছোবড়া-ছোবড়া দেখাচ্ছে কেন।
একটু-আধটু দুলছিলই লঞ্চটা, দু-একবার একটু বেশিই। কোনো ভারী মাল পাটাতনের ওপর ফেলায়। যোগেনকে ডাকতেই বোঝা গেল, লঞ্চটা এবার ছাড়বে। যোগেনকে একটা চওড়া জেটি পেরিয়ে, আর একটা জাহাজের প্যাসেজ-ওয়ে দিয়ে লঞ্চটায় উঠেই সোজা ধাপ ভেঙে ছাদে আসতে হল—তাতে তো তার মনে হল, সে ঢোকার পরই ব্রিজ তুলে দিয়েছে, দড়ি খুলে দিয়েছে। কিন্তু এসডিও তো নামবেন, ‘স্যার, এদিকে এলে কিন্তু একটা খবর দেবেন, আমি নামছি, নইলে আপনারই দেরি হবে,’ নমস্কার করে এসডিও বিদায় নিলেন, যোগেন কেবিনের ভিতরে পা রাখতেই তার পেছনের দরজাটা বন্ধ করার সামান্য আওয়াজের সঙ্গে, ‘আসছি স্যার।’
যোগেন বুঝতে পারেনি, লঞ্চ ছেড়ে দিয়েছে। যোগেন তো বাইরেটা দেখতে পাচ্ছে না—ফলে পাড় থেকে সরে আসাটা বোঝেনি। লঞ্চের বাঁশি বেজেছিল কী বাজেনি, বুঝতে পারেনি। দুলুনিটা বরং থেমে গেল একটু, বাইরের মানুষের গলার আওয়াজ কমে আসায়, তাহলে কি লঞ্চ ছেড়ে দিল, সন্দেহবশে দরজা খোলার জন্য যোগেন না-উঠতেই দরজা খুলে গেল আর দরজা জুড়ে দাঁড়ানো ডেপুটিকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুড়মুড়িয়ে কেবিনে ঢুকে পড়ল পদ্মার হাওয়া, ‘স্যার, দেরি হয়নি তো!’ ডেপুটির এক হাতে একটা লম্বা হাঁড়ি–হয় গুড়ের নয় জিয়ল মাছের। আর-এক হাতে একটা ছালা—সেটাতে হাতে-ঝোলাবার জন্য নারকেল দড়ির পাকানো হ্যান্ডেলও আছে। ডেপুটির ঠোঁটে হাসি, মুখে ঘাম, ‘আসছি স্যার, এগুলো রেখে, বলে দরজাটা হাটখোলা রেখেই সরে গেলেন। বাইরে পদ্মার বিস্তার সেই দরজার চৌকাঠ উথলে উঠল। এতটা জলের এমন গতি দেখে যোগেন আর ভিতরে বসে থাকতে পারল না, বেরিয়ে এসে রেলিং ধরে দাঁড়াতেই তার কোঁচার কাপড় তার পেছনে দরজার ফাঁক দিয়ে কেবিনে ঢুকে নৌকোর পালের মতো উড়তে লাগল।
‘কী আহাম্মুকি’, যোগেন কোঁচার কাপড় টেনে ফিরিয়ে তার চশমাটা খুলে রেখে আসে, ‘নদীর হাওয়ারে বিশ্বাস নেই।’
‘ডেপুটি এসে পাশে দাঁড়ান। যোগেন জিজ্ঞাসা করে, ‘কী বাজার কইরলেন, বাড়ির লগে?’
ডেপুটি রোগা, যোগেনের চাইতে লম্বা। ধুতিপাঞ্জাবি পরেছেন, মাথা পুরোটাই টাক—সেই কারণে দু-তিন লাছি চুল বাঁ থেকে ডাইনে এনে যতটা পারেন, ঢাকার চেষ্টা করেছেন, সরু কাঁচাপাকা গোঁফ, পাতলা ঠোটে ছোট-ছোট দাঁত, ঠোঁট খুললে বোঝা যায় পান খান
‘বাড়িতে তো একলা মানুষ আমি, এক-একটা প্রমোশন আর এক-একটা বদলি। মনে তো পড়ে না স্যার কোনোদিন বাড়িতে বসে সংসার করছি।’
যোগেন একটু সাবধান হয়—বদলি চাইবে না কী?
ডেপুটির গলাটি চাপা, পাতলা। দেখে বেশ খুশি লোকই মনে হয়। ডেপুটি বলছিলেন, ‘সে স্যার কী করা যাবে? করব সরকারি চাকরি, তাও ডেপুটিগিরি আর সদরে-সদরে বদলি হব না—এ তো আর বলা চলে না।’
‘আপনার দেশ কোথায়?’
‘আপনার কি এদিকটাও চেনা আছে, স্যার?’
‘না-চেনার মতো বৃহৎ ব্যাপার না কী?’
‘না স্যার, এত বেশি চেনা স্যার যে কাউকে হদিশ দেয়া যায় না। ঢাকা জিলাতেই স্যার। আপনি তো টুঙ্গি থেকে ডাইনে ঘুরবেন, রেলে, আমি সোজা গিয়ে টুঙ্গির দুই স্টেশন পরে নামব।’
‘বাবা। রেলস্টেশনে বাড়ি। আমাগ বরিশালে তো স্টিমার স্টেশনও নাই। কী স্টেশন?’
‘পুবিয়ালি। তবে আমার বাড়ি স্যার সেখানে না। পুবিয়ালি থেকে ঘণ্টাখানেক হাঁটা—পুবে।’
‘দ্যাহেন, আপনি কিন্তু কিছুতেই জায়গার নাম ভাঙলেন না। প্রথমে কইলেন ঢাকা। তারপর কইলেন টুঙ্গি। তারও পর কইলেন পুবিয়ালি। নিয়ম-অনুযায়ী এরপর তো আমারে থানা আর পোস্টাফিস জিগ্যাইতে হয়।’
‘কী যে বলেন স্যার। থানা গাছা।’
‘গাছা তো আমি চিনি। সেহান থিক্যা উত্তরে না পশ্চিমে? দক্ষিণেও না, পুবেও না।’ তাই তো?’
‘আপনি তো সবই চেনেন স্যার। উত্তর-পশ্চিমই বলা যায়—রেললাইন পার হলেই। পোস্টাফিস কেউ লেখে গাছা, কেউ বলে বাড়িয়া। বাড়িয়ার সাব পোস্টাফিসটা নতুন। তাই লোকজনের ভরসা হয় না।’
‘ধরেন, গাছা-য় গিয়্যা আপনার নাম বললে সবাই আপনার গ্রামের হদিশ দিব্যার পারব?’
ডেপুটি একটু চুপ করে থেকে বলেন, ‘তা হয়ত পারবে স্যার। আমার সুবাদে না। আমার চাকরির সুবাদে।’
‘আরে, তাই তো, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কি থানাপিছু পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামের নামটা তাও কইলেন না, ঠিকানা তো কয়্যা দিলেন।’
‘স্যার, আমাদের গ্রামের নামটা এত খারাপ যে ভদ্রলোকের সামনে বলা যায় না। চেষ্টা হচ্ছে নামটা বদলানোর। ইউনিয়ন বোর্ড যদি বদলায়। তবে সে-বদলানো নিয়েও স্যার, দলাদলি।’
‘আরে, আপনে বরিশালের ছাওয়ালরে খারাপ-নাম শুন্যাবার লজ্জা পান? আমি এড্ডা নাম বলি, তাও আসল নামডা তো মনে-মনেও মুখে আনা যায় না। উকিলমোক্তার আর দারোগাসেপাই মিল্যা নামডা লেখাজোখায় বদলাইয়া দিচ্ছে। এহন লেহা নয়, গড় মাইদ্যান কাঠি। ইংরাজিতে লেখার সুবিদা আছে—জি-এ-আর—এইচে ‘গড়’ হইল আর ‘এম-ওয়াই-ডি-এ-এন’ –এতে হয়ে গেল ময়দান বা মাইদ্যান, যাই বলেন। কিন্তু এই নামডা ইংরাজিতে লিখতে বা বইলতে তো ইংরাজি জানা লাগে—অন্তত লিটারেট কনস্টেবলের মত বিদ্যাখান তো দরকার। যাগো গ্রাম, তারা ‘জি-এ-আর-এইচ’ যে-শব্দের ইংরাজি সেই শব্দটাই বলে ‘জি’-এর সঙ্গে একটা চন্দ্রবিন্দু আর আকার দিয়্যা। মাইদ্যানেরও মূল শব্দটাই বলে। দুইডা মিল্যা যা খাড়ায়, সেডার দুর্গন্ধ তো পদ্মার হাওয়াতেও উইড়ব না।’
ডেপুটি চশমার ওপর বাঁহাত রেখে চোখ ঢাকেন—লজ্জায়। পাতলা ঠোঁটে হাসিটা ছিল।
‘না স্যার। আমাদের বিপদ অতটা নয়। হাজইদ্যা।’
‘হাজইদ্যা? এ তো ঋগবেদের মন্ত্রের মতো শুনায়। এডা বদলাইবার কারণডা কী?’
‘কারণ যে খুব আছে, তা না। তবে লোকজন একটা নাম চায় শুনতে-বলতে ভাল–’
‘এত লোকজন আইল কোত্থিক্যা, নতুন-নতুন কান লইয়্যা? তাগো হঠাৎ কইর্যা গ্রামের নামে গোসা?’
‘গ্রামে চাকুরের সংখ্যা তো বেড়েছে। ডেইলি প্যাসেঞ্জার না-থাকলেও উইকলি বা ফর্টনাইটলি প্যাসেঞ্জার তো দু-একজন আছে। দুই বাড়ির বড় ছেলেরা কলকাতার হস্টেলে থাকে—তারা ছুটিছাটাতে এসে বলে, কী একটা নাম, লোককে বলা যায় না।’
‘তাগো তো পুবিয়ালি রেলস্টেশন আছে—’
‘ঐ আর কী। নিজের গ্রামের নামটা ভাল হলে বলতে ভাল লাগে।’
‘এরা নিশ্চয়ই বামুনবাড়ির পোলা। নাইলে গাঁওয়ের নাম নিয়া এত মাথাব্যথা?’
‘আমাদের গ্রামটা ব্রাহ্ম-প্রধান স্যার। একটা পুরনো নিয়োগীবাড়ি আছে, বিরাট বারদুয়ার, খুব নামকরা দোলমঞ্চ হয় প্রতিবছর, ধামরাইয়ের রথের মতো বড় না-হলেও আশপাশে নেগিপাড়ার দোলের মেলার খ্যাতি আছে। এঁরা বাদে যারা নিচুবর্ণের তারা গ্রামের একেবারে সীমায় থাকে।’
‘নামডা তো হইয়্যাই আছে। নেগিপাড়াই তো কয়, লোকে মুখে?’
‘সবাইই বলে স্যার। কিন্তু ইউনিয়ন বোর্ডের তালিকায় নেগিপাড়া নাম দিলে বামুন–অবামুনে দাঙ্গা বেঁধে যাবে।
‘বামুনদের হাজইদ্যাতে আপত্তি কী? চন্দ্রবিন্দু আছে, য-ফলা আছে—’
‘ওই দুটোতেই তো আপত্তি—নইলে শুধু হাজই বলতে আপত্তি ছিল না। হাজই তো ছোট নাম আর চেনা নাম—অ্যামাই, খাগড়াই, জামনা, গোরাই। কিন্তু স্যার, সে-কথা উঠতে না-উঠতেই ঐ নিচু হিন্দুদের ভিতর থেকে দল বেঁধে কথা তুলল যে দুশ বছর আগে ওখানে নাকী একটা হাজোবসতি ছিল। তারা ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। তারপর, ইংরেজরা তাদের গারো পাহাড় পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এখন তারা সেখানেই থাকে।
‘গারো-হাজংরা?’
‘হ্যাঁ, স্যার—’
‘এতটা নীচে ছিল? ওরা তো পাহাড়ি।’
‘সে তো আজকের হিশেবে নীচে। তখন আর ময়মনসিং দিয়ে কতটুকু? হতেও পারে-বা। এ আর আমাদের হাজো-রা জানবে কোত্থেকে। প্রমথ সান্যাল নামে এক রাজবন্দীকে দেউলি থেকে সরিয়ে এনে ঐ স্যার পুবিয়ালি থেকে মাইল খানেক উত্তরে, আমাদের গ্রামের দিকে, ডেটিনিউ করে রেখেছিল। উনিই এই হাজোবিদ্রোহের কথা এখানকার হাজোদের জানিয়ে দেন। হাজো-ভাষায় নাকী ‘ধাং’ বলতে বোঝায় যে-জায়গা আমাদেরই ছিল কিন্তু ছেড়ে এসেছি। সুতরাং ধাং-টা বদলানো যাবে না। আমার সঙ্গে স্যার একদিন প্রমথ সান্যালের কথা হয়েছিল—উনিই বাড়িতে এসেছিলেন, ওঁর ডায়েরি সই করাতে, আমি এসেছি শুনে গাছা পর্যন্ত আর হাঁটেননি। আমি বললাম, ‘আপনি আসাতে তো আমাদের গ্রামের নাম ইতিহাসে উঠে গেছে। আপনি এত খবর কোথায় পেলেন?’ উনি বললেন, একদিন গাছাথানার ইনস্পেকটিং অফিসারের টেবিলের পাশের তাকে ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার দেখে উনি পড়তে চান। তাতে নাকী এইসব কথাই আছে। ইতিমধ্যে ইলেকশন এসে পড়ায় কোনো পার্টিই আর এ নিয়ে কথা তোলেনি –কথা তুললে হয় হিন্দুভোট হারাতে হবে না-হয় হাজো-ভোট হারাতে হবে।’
‘আপনাদের এমএলএ কে?’
‘ঢাকা সেন্টাল নর্থ। ফাকিরশাহেব।’
‘আপনারা তো নিশ্চয়ই বামুন।
‘হ্যাঁ স্যার, কিন্তু নিশ্চয়ই কেন?’
‘বামুন-কায়েত-বৈদ্য ছাড়া ডেপুটি হওয়া যায় না কি! শতকরা হিশাব দেখছেন?’
‘দেখেছি, অতটা বলা যাবে না। তবে জানি, স্যার।’
‘আপনারা ভাইবোন কী?’
‘চার ভাই তিন বোন।
‘দেশের বাড়িতে আর-কেডা থাকে?’
‘বোনদের সকলেরই ভাল বিয়ে হয়ে গেছে স্যার।’
‘বিষয়সম্পত্তি কি বাবার আমলে না তারও আগে?’
‘ঠাকুরদা একটু-আধটু করেছিলেন, তবে বাবাই বাড়িয়েছেন। ঠাকুরদা পৌরোহিত্য করতেন মুন্সিগঞ্জের জমিদারবাড়িতে।
‘ওদিকে তো ঢিল মাইরলেই কোনো জমিদারের গায়ে লাগব। কাদের জমিদারি?’
‘ঐ মুন্সিদেরই। ঠাকুরদার আমলে একটা তরফই ছিল, তারপর, যা হয়, ভাগাভাগি হয়েছে। বাবাকে ওঁরাই পড়িয়েছেন।’
‘ও। বাবাও চাকরি করতেন?’
‘ইচ্ছে করলে করতে পারতেন। কিন্তু বাবার বোধহয় দেশ ছেড়ে থাকতে ভাল লাগত না। উনি কলেজের পড়া ছেড়ে দেন। তারপর মোক্তারি পরীক্ষা দেন। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর মুন্সিবাবুরা বাবাকেই পৌরোহিত্য দিলেন। কিন্তু বাবার নেশা ছিল জমিজমায়। উনিই ঘুরে-ঘুরে জমিজায়গা দেখে সম্পত্তি বাড়িয়েছেন। চার ভাইকে পড়াশুনো করিয়েছেন।’
‘চারভাইই ডেপুটি এক বাড়িতে?’
‘অতটা না স্যার। মেজভাই বংশের কাজটা করে—’
‘কোন্ কাজডা? পৌরোহিত্য না সম্পত্তিরক্ষা?’
‘দুটোই। আসলে তো একটাই—’
‘অ্যাহনো একডাই আছে? জমিদারি কিনছেন নাকী? নাকি বাপেই কিন্যা রাইখছেন?’
‘ইচ্ছা করলে পারতেন না, তা নয়। মুন্সিবাবুরাও চেয়েছিলেন। বাবা রাজি হননি। বাবা বলতেন—জমিদারের অবস্থা মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো। একে নিজের অতগুলি স্বামী, তার ওপর খুড়তুতো একশ দেওরও ভাবত তারাও কেন তার স্বামী না। তার ওপর এক থুথুরে শ্বশুর, চোখে দেখতে পায় না অথচ কামনাবাসনা ষোল আনা, পাঁচ-পাঁচটা সতীর মধ্যে দ্রৌপদীর শাশুড়িরাই দুটো, তারও ওপর কেষ্ট ঠাকুর—শ্বশুরও বটে, ভাসুরও বটে, দেওরও বটে, তার ওপর বর পিছু গড়ে চারটা-পাঁচটা সতিন—কাকে কখন খুশি রাখবে সেই দুশ্চিন্তা দুই চোখের পাতা এক করার উপায় নেই। তার চেয়ে এই ভাল-নিজের জমির সঙ্গে রায়তি।’
‘মহাভারতের এমন ব্যাখ্যা এর আগে কহনো শুনি নাই। তারপওর এিক্কেবারে পয়লা মরণ। আমার লগে তো বেঙ্গল টেনান্সি অ্যাক্টের প্রথম খশড়া নিয়্যা আসছি।’
‘স্যার, কোনোদিন কি এমন ছিল যে কোনো টেন্যান্সি অ্যাক্টই নেই, যার যেমন ইচ্ছে আইন বানাচ্ছে?’
‘ওকালতির অভিজ্ঞতায় দেখছি—সে আপনার আঠারশ বারই হোক, আঠারশ পঞ্চাশই হোক, আঠারশ পঁচাশিই হোক আর উনিশ শ আটাশই হোক টেন্যান্সির কোনো এমন অর্থ নাই, যার অদলবদল চলে না। স্থানীয় প্রথা, চাষ-আবাদের স্থানীয় রীতি, জমিদারের আদায় দেয়ার ভাগ, তার ওপর জমিদার-প্রজার সম্বন্ধ, আর সবার ওপরে কোনো মহাশক্তিধর জমিদারের সামাজিক প্রভাব—এইসব দেখাশুইন্যা ম্যাজিস্ট্রেটকে রায় দিতে হয়। আপনি তো রায় দেন। বলেন, ঠিক কি বেঠিক?’
‘সে তো বটেই, স্যার। মুর্শিদাবাদ-নদিয়া-বর্ধমানের সব জায়গাজমি যখন চাষে এসে গেছে, তখন স্যার শুরু হল বরিশাল-নোয়াখালি-ফরিদপুরের বন্দবস্ত। আর পাট চাষ শুরু হওয়ার পরই তো চাষটা বাণিজ্য হল।’
‘তাতে কী প্রমাণ হয় ডেপুটিবাবু? কী যে প্রমাণ করতে চান, তাও বুঝি না। মানে কী যে চাষবাস বদলাইয়্যা গেল, খারাপ হইয়্যা গেল। কিন্তু যা বদলায় নাই সেইডার কথা ক্যান কন না? এক মামলায় দেখব্যার হইছিল কইল্যা দেখি—সব থিক্যা বেশি জমিদারির সংখ্যা কোথায়—মৈমনসিঙে। সব থিক্যা কম জমিদার রাজস্ব কোথায়—ওই মৈমনসিঙে। কত? বিঘা প্রতি পাঁচ আনা তিন পয়সা। আর যে-বেটা চাষ করে তার খাজনা বেশি কোথায়? ঐ মৈমনসিঙেই। বিঘা প্রতি গড়ে তিন টাকা। রাজস্ব আর খাজনার মইধ্যের ২ টাকা ১০ আনা ১ পয়সা ফাঁকড়া কিন্তু কমে না। খায় কে সেডা? খাওয়ার মুখ তো আছে একই জনার।’
কথা বলতে-বলতেই দুজন টের পান—হাওয়াটা যেন দিক বদলাল, যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, পদ্মা লম্বালম্বি খুলে যাচ্ছে—বহু দূর পর্যন্ত ঘোলাটে সফেন স্রোতে ঢেউভাঙা শাদা ফেনার চমক আর ঠিক অতদুর পর্যন্তই যেন আকাশবিস্তার। যোগেন আরো নীচের জায়গার লোক, বলা যায় সমুদ্রের ভিতর মাথা তুলে থাকা কিছু ডাঙার মানুষ, বা অজস্র অজস্র জলে ডুবেথাকা মানুষ। বরিশালের কী কি বড় নদী নেই, কীর্তনখোলা, আড়িয়ালখাঁ, মেঘনা, তেঁতুলিয়া, লোহালিয়া, পাঙাসিয়া, রাজগঞ্জ, বোহালিয়া, গলাচিপা, বারণাবাদ-নামের কি আর শেষ আছে আর নদীর মত বিস্তারের কত খালের যে নামই নেই—যোগেনের এখন মনে হয়, প্রায় দুপুরে পদ্মার এমন ছড়িয়ে থাকায় মনে হয়—বরিশালে নদীর এই জলময় বৈভব নেই। নেই কি—চাঁদপুরের দিকে শাহাবাজপুর নদীতে বা আরো নীচে মেঘনায়? যোগেন জানে—এসব তুলনা তাৎক্ষণিক। আবার সে-মুগ্ধতা থেকে যদি এমনই তুলনা ঝলসে না ওঠে, তাহলে সেই মুগ্ধতা ছেয়ে দেবে কী করে অন্তরবাহির। যোগেন এমন একটা মুহূর্তে পৌঁছে ছিল যেমন মুহূর্তে সে কিশোরবয়সে কখনোসখনো পৌঁছে যেত কেষ্টযাত্রায় রাধার পদ গাইতে গাইতে—
‘সখী রে, আমারে কালার ছায়া দেখা
একা এ নদীর জলে দেখা
নদীর টান সেই ছায়ারে ভাসায় না,
নদীর গহিন সেই ছায়ারে ডুবায় না,
সখী রে, অথির এ জলে মোর থির-ছায়া দেখা।’
সুরটা গুনগুনিয়েও উঠল যোগেন।
লঞ্চটা বাঁয়ে মাথা ঘোরাল কেন, সেটা বোঝা গেল লঞ্চের মাথাটা আবার সোজা হওয়ার পর—একটা বেশ বড় চর থেকে সরে যাচ্ছে, চরের কাছাকাছির কোনো নদীর তলের মাটিতে যদি লঞ্চ ফেঁসে যায়। আরো একটু এগনোর পর যোগেন ডেপুটিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘এত বড়! কায়েমের সঙ্গে লাগা না কী?’ তাহলে তো চর হবে না, পাড় হবে, স্টিমার হয়ত আরো ভাঁটিতে যাবে।
‘না স্যার, চরই। দখলও শুরু হয়েছে—’
‘কাগো দখল? জমিদারগো?’
পদ্মা-মেঘনায় নতুন চর জেগে উঠলে সব জমিদারই দাবি করে—ওটা তাদের খতিয়ানভুক্ত। তারপর চলে খুনোখুনি। তেমন খুনোখুনিতে বরিশালের ফরাজিদের ডাক পড়ে। ওঝা দেখলে যেমন সাপ ফণা নোয়ায়, ফরাজি দেখলে চর না কী ফরাজির নৌকোয় ওঠে।
চর দখলে আনা হয়ত সহজ, আবাদে আনা খুব কঠিন। সাপখোপ বাঘভাশের কথা যদি বাদও দেয়া যায়, শুধু চরে পড়ে থাকার খাওয়া জুটবে কোথা থেকে? তখনই ঢোকে—জমিদার জোতদার আর মহাজনতবিলদার। তাদের ঢোকার আগে তিন-চার বছর শুধু মরতে হয় চরে। সে-মরণের হিশেব কেউ জানে না, রাখেও না। তিন-চার বছর ধরে মরার পর চরের মাটির দোষগুণের খবর জমিদার জোতদার—তবিলদারের কাছে পৌঁছয়—জমি কী রকম, কী চাষ হতে পারে, ফলন কী, খরচা কত।
‘আপনারা স্যার অ্যাসেম্বলিতে এখনো মুখই খোলেন নাই কিন্তু কথাটা স্যার, হাওয়ার আগে ছড়িয়ে পড়েছে যে ২০ বছরের পুরনো চর আবাদে আনা হবে। পদ্মার এদিকে স্যার, ইছামতী—ধলেশ্বরীতেই বেশি, একটু-আধটু চরদখল শুরু হয়েছে। দাঙ্গাটাঙ্গা না-বাঁধে! ‘কোন্-কোন্ পার্টির মইধ্যে দাঙ্গা হওয়া সম্ভব চরজমি আবাদে আনার বিষয়ে?’
‘স্যার, একটা কথা আপনাকে জানাতে চাই, যদি অভয় দেন তো বলি-–’
‘সে আবার কী? আপনারা না কইলে জানার আর কী উপায় খোলা?’
‘এই ডেপুটিগিরি করতে-করতে স্যার আমি বহুবার দেখেছি গবমেন্ট স্যার বর্গাদারের পক্ষে। সে তো স্যার, স্বাভাবিক। বর্গাদার আর আন্ডার-রায়তই জনসংখ্যায় বেশি। যদি স্যার প্রজা আর কৃষক বেশি হয়, তাহলে, যে-কোনো গবমেন্টই তো চায় তারা যেন কোনো গণ্ডগোল না পাকায়। এদিকে স্যার জমির মালিকের কাছে খাশ বলে যে-জমি দেখানো হচ্ছে, তার চাইতে অনেকগুণ বেশি জমি লুকনো থেকে যাচ্ছে। আমি স্যার ফরিদপুরে সেটলমেন্টে ছিলাম। সেখানে স্যার ২৭ পারসেন্ট জমির কোনো হিশেব নেই। এখন গবমেন্ট একরকম করে হিশেবটা জানে। ল্যান্ড হোল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন আর-একরকম করে হিশেবটা জানে। ৩৫-এর আইনে ভোট এসে গেলে স্যার পার্টিগুলিও আরো একরকম হিশেব জানে। পার্টিদের জানা নির্ভর করে স্যার তাদের স্থানীয় নেতাদের ওপর। এই জায়গাতেই গোলমাল। স্থানীয় নেতা মানে স্যার বেশির ভাগ জায়গাতেই জোতদার বা বড় রায়ত। তার স্বার্থ ষোল আনা স্যার জমিতে। এমনি একটা ছোটখাটো গোলমাল জমির আল নিয়ে, এমনিই মিটে যেত, কিন্তু স্থানীয় নেতা জড়িয়ে পড়ে চট করে তাকে স্যার কমিউন্যাল চেহারা দিয়ে ফেলল। এই কথাটুকুই স্যার বলার ছিল—বেশির ভাগ কমিউন্যাল দাঙ্গাই কমিউন্যাল নয়। তার ওপর স্যার মিনিস্ট্রি হওয়ার পর কলকাতার কাগজগুলিই যেন দাঙ্গা লাগাতে চায়।’
‘আপনার কথাডা ঠিক ধইরতে পারছি না। আমাদের তো কথা হইছিল চরের জমির দখল নিয়্যা দাঙ্গা লাইগতে পারে কি পারে না। আর আপনার কথাখান শ্যাষ হইল পার্টিগুল্যার নির্ভরতা লোক্যাল লিডারদের উপর। আপনার আগের কথা আর শেষের কথার মিলডা কোথায়?’
‘খুব একটা মিল হয়ত নেই। আমি স্যার থার্টিতে কিশোরগঞ্জে ছিলাম। আমি ঠিক কিশোরগঞ্জে ছিলাম না—ছিলাম, পাশেই নালিতাবাড়িতে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মিস্টার ব্যারোজ। ঐ রায়ট সামলাতে—পাশাপাশি জায়গা থেকে কয়েকজন অফিসারকে এনেছিলেন। আমার নিজের চোখে দেখা স্যার, মিস্টার ব্যারোজের খাওয়া নেই, ঘুম নেই, রায়ট ঠেকাতে আর রায়ট বোঝাতে। বার লাইব্রেরিতে মিটিং করছেন, স্কুলকলেজের টিচারদের নিয়ে মিটিং করছেন, ব্যায়াম সমিতির ছেলেদের নিয়ে মিটিং করছেন আর আমাদের সঙ্গে তো করছেনই। একটাই ওঁর কথা স্যার–এটা হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা না। এটা মহাজনদের বিরুদ্ধে খাতক প্রজাদের বিদ্রোহ। খাতকদের প্রায় সবাই মুসলমান। মহাজনদের প্রায় সবাই হিন্দু। কিন্তু মহাজনছাড়া কাউকে আক্রমণ করা হয়নি, কোথাও। মুসলমান-মহাজনদের বিরুদ্ধেও আক্রমণ হয়েছে। শাহেব স্যার পরিষ্কার বলেছিলেন—আপনারা যদি কৃষি—অর্থনীতির জোয়ারভাটাকেও হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গায় বদলে যেতে দেন, তাহলে আর রক্ষা নেই। এরপর থেকে সব দাঙ্গাই হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়ে যাবে। কৃষক-রায়ত—প্রজা-জমিদার আর কৃষক-রায়ত-প্রজা-জমিদার থাকবে না। তারা হয় হিন্দু, না-হয় মুসলমান হয়ে যাবে। বা, স্যার, মিস্টার ব্যারোজ বলেছিলেন স্যার, অর দি ওয়ার্স, কৃষির সঙ্গে যুক্ত যে-কেউ হয় হিন্দুবিরোধী, না-হয় মুসলিম-বিরোধী হয়ে যাবে। শাহেবের সেই কথাটাই বলছিলাম স্যার, এখন থেকে রায়ট ছাড়া দাঙ্গা নেই স্যার। ইলেকটোরাল পলিটিক্সই শুরু হওয়া মানে তো—একই ফ্যাক্টের কতগুলি ভার্সন একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে স্যার—এভাবে কি স্যার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চলে? জমিজমার ব্যাপার স্যার আইনের আওতায় থাকবে আর ডে-টু-ডে প্রবলেম স্যার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আওতায়। তাহলেই স্যার এই ধর্ম থেকে লোককে সরিয়ে আনা সম্ভব।’
‘আপনার যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাতে আপনার সঙ্গে তর্ক করা কঠিন। আচ্ছা, এডডা কথা কি বুঝা যায়? সংখ্যায় মুসলমান খাতক বেশি আর হিন্দু-মহাজন বেশি, তাই এই ঋণ-খালাসি মুভমেন্টের একটা কমিউন্যাল চেহারাও কারো কাছে ধরা পড়তে পারে। এইডা আমার জানার ইচ্ছা—দাঙ্গা মানে তো দুই দঙ্গলে মারামারি। মুসলমান দঙ্গল না-হয় বুঝা গেল। কিন্তু হিন্দুদঙ্গল কাগো নিয়্যা হইত?’
‘মহাজন-জমিদারদের তো নিজেদের পাইক-লেঠেল থাকে, তারাই—’
‘সে পাইকলেঠেল তো ব্যাবাক হিন্দু হবার পারে না, ডেপুটি শাহেব, মুসলমানও থাকার কথা। মহাজন-জমিদারের মুসলমান লাঠ্যাল পাইকরা কোন পাকে যাইত?
‘ঋণখালাশির পক্ষে। মুসলমানদের পক্ষে। কিশোরগঞ্জে তো জমিদার গুলি চালিয়ে ছ-জন কৃষককে মেরে দিয়েছে। কৃষকরা ফিরে আসছিল স্যার। এমন সময় জমিদারবাড়ির এক বাচ্চা চাকর স্যার দৌড়ে এসে কৃষকদের খবর দেয়—তোমরা ফেরো, কর্তার গুলি শেষ। সেই কৃষকরা ফিরে এল, আগুন লাগাল, অন্তত চারজনকে মার্ডার করল। জমিদারবাড়ির বাচ্চা চাকরটি কিন্তু স্যার হিন্দু ছিল। পরের দিকে এরকম ঘটনা কমই ঘটেছে। ততদিনে হিন্দু-মুসলমান ভাগটা বেড়ে গেছে।’
‘তহন, হিন্দু হইল কারা?’
‘প্রধানত নমশূদ্ররা। পাইক-মাল্লারাও।’
‘তা–ই কন। শুদ্দুর—হিন্দু ছাড়া বামুন-হিন্দুগ বাঁচাইব কেডা? ঐ যে কিশোরগঞ্জের জমিদার কেষ্ট রায়ের বাড়ির বাচ্চা চাকরডার কথা কইলেন-না, যে, দৌড় প্যারা মুসলমানগ খবর দিল কর্তার গুলিগোলা শ্যাষ, ওডা জাতে ছিল চাঁড়াল। তারে ষোল আনা হিন্দু বানাইয়্যা নিছেন আপনারা? চাঁড়াল-নেড়া মিলে তো এড্ডা সমাজ। এই কথাডা আপনারা ক্যান স্বীকার যান না ডেপুটি শাহেব?’
‘সে কী করে হবে স্যার। ডিপ্রেসড ক্লাশের লোকরা তো আর মুসলিম ল-এর আন্ডারে না স্যার।’
‘হিন্দু ল-এরও পুরোপুরি না। তাগ সম্পত্তিভাগ কি অ্যাজ পার হিন্দু ল হয়? তহন তো ‘অ্যাজ পার ট্র্যাডিশন।’ চণ্ডাল তখন হিন্দু, যখন সে দাস। চণ্ডাল আর মুসলমান যখন সামাজিক তখন এক। নিজের নিজের পেশায়, দ্যাশে ঘোরাফেরা করে, সেহানে তো সে দাস না। স্বাধীন। স্বাধীন শুদ্দুর আর স্বাধীন মুসলমান মিল্যা এক আলাদা সমাজ—যোগেন হো হো’ দুর্বোধ্য হেসে ওঠে।
‘একটু ধাঁধাঁ লাগছে স্যার—মানে, আপনি কি যেসব জাতের নাম শিডিউলে আছে, তাদের সবাইকে নন হিন্দু বলছেন স্যার?’
‘তেমন সব জাতের নাম তো শিডিউলে নাই। যাগো নাম আছে আর যাগো নাই—সেই বেবাকই তো নন হিন্দু হওয়ার লাগে। এরা সগগলে তো হিন্দুগ বর্ণভেদের ফল। তাইলে কি আপনে রেজাল্টকেই, কজ কবেন ডেপুটি স্যার? ভিকটিমরেই আসামি কবেন?’
‘স্যার, এটা তো আইনের ব্যাপার। আইন কি স্যার আমাকে অধিকার দিয়েছে—এদেরকে নন হিন্দু ধরে নেয়ার? মানে, স্যার, এরা, এই শিডিউলভুক্ত জাতের মানুষজন হিন্দু আইনের আওতায় পড়বে না?’
‘হিন্দু আইন আবার কী আইন। এক হিন্দু আইনে কয়—মামাতো-পিসতুতো ভাইবোন হতেছে উত্তমোত্তম দাম্পত্যসম্বন্ধের পাত্রপাত্রী। কয় না?’
‘হ্যাঁ স্যার, সে প্রভিশন তো হিন্দু ল-তেই আছে স্যার-দেশাচার মানতে হবে। সেটাই তো হিন্দু পার্সন্যাল ল।’
‘নিশ্চয়ই। আমি স্যার অত কঠিন কথার মধ্যে যাচ্ছি না। আমি তো জজকোটের উকিল। তাই মফস্বলের ঘটনাই বেশি মনে পড়ে। যদি কর্ণাটকের মামাতো-পিসতুতো বিহারে এসে বিয়ে করে তাইলে কি সে-বিয়া আইনত সিদ্ধ?’
‘হ্যাঁ সার। সিদ্ধ। যাদের নিয়ে কথা, তাদের দুইজনই বিউ কর্ণাটকি। তাদের দেশাচার—‘দেশাচার মানে তো স্যার একডা দেশ লাইগব, অ্যান আয়ডান্টিফায়েবল টেরিটারি। স্যায় টেরিটরির বাইরে তো ঐ দেশাচার চইলবে না। এদিকে প্লেস অব অকারেন্স ইজ বিহার। সেহানে এই বিয়া শুধু অচল নয়—নিষিদ্ধ। তাইলে হিন্দু পার্সোন্যাল ল দিয়্যা কী বিচার হবে স্যার?’
‘এতদিন তো হয়ে এসেছে স্যার। সে না-হয় আপনি সে-আইনের নাম না-হয় হিন্দু ল নাই দিলেন। ব্রিটিশ আইনে যাকে বলে কমন-ল।’
‘মানে, আপনি তো বলছেন হিন্দুটিন্দু দিয়্যা কাম নাই। আইন তো একডা লাগবই—যারে কয় ‘ল ইন ফোর্স।’ তাইলে আমি যদি কই যাগো শিডিউলে নাম করা হইছে, তারা অহিন্দু, তাইলে তাগো বেলায় কোন্ ল ব্যবহার করা হবে?’
‘হ্যাঁ স্যার, এটাই তো মূল কথা। আইন তো চাই একটা ‘ল ইন ফোর্স’–
‘কিন্তু আইন যদি না থাকে কোনো তাইলে ম্যাজিস্ট্রেট কেন মামলা খারিজ করব্যার পারব না?’
‘সেটা কি হয় নাকী স্যার। তাহলে তো হাকিমদের ভাঙা বেড়া দেখানো হবে।
‘না, আমি আপনারে কর্ণার কইরতে চাই না। কথায়-কথায় বললাম—আইন অমান্য করা যদি দেশাচার হয় তাইলে সে-আইন যে শুধু লবণের আইন হওয়া লাগব—তাও তো না। অপরাধের শ্যাষ লিস্টি তো অ্যাহনো তৈয়ার হয় নাই। তাইলে আইনের শ্যাষ লিস্টি কী কইর্যা হব? হাকিম তো কইবারই পারে যেসব আইন লাগু আছে, লজ ইন ফোর্স, তার কোনোডা দিয়্যা এ মামলার নিকাশ নাই।’
‘স্যার—আপনি আমাকে ডুবজলে ছেড়ে দিয়েছেন শিডিউল্ড কাস্টস আর নন হিন্দুজ বলে। এখন স্যার জুরিসপ্রুডেন্সের কথা তোলা থাক।’
‘আচ্ছা তাই সই, তোলা থাক। মানে, কথাডা গোচর হইছে। মানে কিন্তু এডা না যে অ্যাহন আবার এইসব কথা ক্যা। কথাডা আছে। আর আমার কথাডা এডডু শুধরা নেন। আমার কথা হইল—শিডিউল্ড কাস্টস মাত্রেই হিন্দু না। আর নট নেসেসারিলি হিন্দুস।’
‘আপনি বললেও শিডিউল্ড কাস্টরাই এ-কথা মানবে না। তারা তো কাস্ট হিন্দুই হতে চায়, তাহলে তারা হিন্দুগ-হতে চাইবে কেন। কিন্তু সে থাক স্যার। আমাকে স্যার একটা দিশা দিন। ম্যাজিস্ট্রেট হিশেবে আমরা কি তাহলে যে-শিডিউল্ড ক্লাশ নিজেকে হিন্দু বলবে, তাকে হিন্দু পার্সন্যাল ল অনুযায়ী বিচার করব? আর যে-শিডিউল্ড কাস্ট নিজেকে মুসলিম বলবে, তাকে মুসলিম পার্সন্যাল ল অনুযায়ী বিচার করব? এ তো স্যার সিরিয়াস ব্যাপার।
‘আচ্ছা ডেপুটি স্যার, আমি তো বলছি শিডিউল্ড কাস্ট ও যারা শিডিউল ভুক্ত নয়—তারা সকলেই হিন্দু ধইর্যা নেয়ার কোনো পরিস্থিতি নাই। ধরেন, জোলারা কি হিন্দু? তেমনি তাদের মুসলমান বল্যাও ধরার কোনো পরিস্থিতি নাই।’
‘সেসব নিয়ে আমার কোনো জিজ্ঞাসা নেই। আমি স্যার জানতে চাইছি কোন্ আইন অনুযায়ী মামলা হবে?
‘সে তো আপনাদের স্মৃতিশাস্ত্রেও বলা আছে, শাহেবদের কোডেও বলা আছে। যাজ্ঞবল্ক্যই তো, না কী জৈমিনী, যে, শাস্ত্র যাই বলুক, যে-বিধান মান্য করলে লোকজন রেগে যাবে, বা পরে তোমার দুঃখ হবে সে-বিধান মাইনব্যা না। অস্বর্গ্যাম লোকাবিদ্বিষ্টং ধর্মম্ অপি আচারেন নতু। আর মেইনও তাঁর হিন্দু-লতে বলেছেন, I think it is impossible imagine that any body of could have obtained genyral acceptance through out India merely because it was inculcatad by Brachman writens?
‘স্যার, আপনার স্মৃতিশক্তি তো…’
‘পড়ছিলাম। ভাল লাগছিল। মনে থাইক্যা গিছে। তবে অ্যাহন তো মেইন-এর বইয়েও এডা পাবেন না। সপ্তম সংস্করণ পর্যন্ত পাবেন—ঐ সংস্করণ পর্যন্ত মেইন নিজে সংশোধন করছিলেন তো। তারপরে আমাগো বিশ্ববিখ্যাত ইন্ডিয়ান বিচারকরা সম্পাদনা কইরতে বইস্যা এই জায়গাগুলা বাইছ্যা বাইছ্যা কাইট্যা দিছেন।’
‘সত্যি স্যার? আপনি মিলিয়েছেন নাকী?’
যোগেন বেশ জোরে হেসে ওঠে, ‘আমার মিলান দিয়া আপনার কাম চইলব? আমার তো আইনবিভাগ সম্বন্ধীয় কোনো বিশেষজ্ঞতা নাই। আমি তো মফস্বল কোর্টের উকিল।’
‘এর আবার সদর-মফস্বল কী স্যার? এটা তো পড়াশুনোর ব্যাপার।’
‘কী যে বলেন ডেপুটিস্যার? মেইন-এর বই এডিট কইরছেন প্রাতঃস্মরণীয় আইনকরা, আমার—আয়েঙ্গাররা। ঘটনাক্রমে তাঁরা সকলেই আবার উচ্চশ্রেণীর হিন্দু। মেইন-এর অরিজিন্যাল সেভেন্থ্ এডিশন করে বারাইছিল জানি না। আমি এইটিন-নাইনটি সিক্সের ফিফ্থ এডিশন পড়ছিল্যাম।’
‘আপনার কি স্যার মনে হয় হিন্দু ল এখন প্রধান পলিটিক্যাল ইস্যু হয়ে উঠবে?’
‘নিশ্চয়ই। কিন্তু এই প্রথম কোশ্চেনডা উইডবে উলটা দিক থিক্যা—ফ্রম দি মুসলিমস অ্যান্ড নন-কাস্ট হিন্দুস?। আরে, যারে জাতীয়তাবাদ বইল্যা ফাল পাড়ে, সেডা তো উঁচা হিন্দুগ জাইন বা, বইলব্যার পারেন, পোস্ট-খিলাফৎ।’
‘শেষ পর্যন্ত স্যার ঐ কমন-লতেই আসতে হবে। প্রবাদে বলে না—যস্মিন্ দেশে যদাচার?’
‘আরে এডা প্রবাদ না।’
‘সে কী স্যার, প্রবাদও ভুল জানি?’
‘প্রবাদ ভাইবলে ভুলই জানেন। এডা যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতিসূত্র। বেবাগ হিন্দুগ বাঁচাইয়্যা দিছে। এর সঙ্গে যোগ কইর্যা নিব্যার পারেন—যাবৎ চণ্ডাল : ন বর্ততি।’
‘এটাও যাজ্ঞবল্ক্য, স্যার?’
‘না, না। এডারে কইব্যার পারেন যোগেন্দ্রসূত্র। আমি কিন্তু আপনি বামুন বইল্যা এইসব শুনাই নাই।’
ডেপুটি শোভন হাসে। সে হাসিতে তার বুদ্ধির ঝিলিক পাওয়া যায়।
‘পৈত্যা আছে তো?’ যোগেন হো-হো হাসে ‘আইয়্যা গেল না কী ওপার?’ যোগেন দরজার ফাঁকে দেখে, তার বাঁয়ে পদ্মার তীরে-তীরে দৈনন্দিনের কিছু দূর চিত্র। নানা আকারের নৌকোর অসমতলে নদীতল ভেঙে-ভেঙে যায়। একটা ছিপ নৌকো উলটো দিক থেকে চোখ না-ফেলতেই লঞ্চ ছাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। বেগটা যে নৌকোর না, তার লঞ্চেরই, সেটা জেনেও এই তঞ্চকতাটুকু খেলতে যোগেনের ভাল লাগে।
‘হ্যাঁ, তবে এখনো দেরি আছে স্যার। উত্তরপারে এসে গেছে তো, এখন কিনারা ধরেই যাবে। আরচা আর হরিরামপুরের মাঝখান দিয়ে মাণিকগঞ্জের দক্ষিণ দিয়ে স্যার, কালীগঙ্গায় ঢুকবে। কালীগঙ্গা তো স্যার কার্তিকে ঠিক নেভিগে থাকে না। তবে এবার লেট মনসুন তো, হয়ত ওপরের দিকে ফিরতি মনসুনে কিছু ঝড়বৃষ্টি হয়েছে।’
‘এদিকে কাতার ধান হয় না নাকী?’
‘হয় স্যার, মৈমনসিং শুরু হলেই দেখবেন—দুই পারেই আউশ। তার মধ্যে কাতারই তো আগে পাকে।’
‘তাহলে তো এই সময় বৃষ্টি হইলে আপনার-আমার না-হয় সুবিধা হইল লঞ্চে, চাষির তো মাথায় হাত।’
‘তেমন কিছু হলে কি আর খবর হত না স্যার? মৈমনসিং, কিশোরগঞ্জ, সিলেটের নদীর ওঠানামা দেখে চাষবাসের জল বোঝা যায় না। এদিকে স্যার, নদীনালায় জল বাড়লে বরং বোঝা যায়, ডাঙা এখন শুকনো।’
‘এডা কী কইলেন? আমাগো ভাটিবাংলায় কি বৃষ্টির জল নদীখাল দিয়্যা না-নাইম্যা, সূর্যের তাপেই বেবাগ উইড়া যায়।’
‘তা হয়ত যায় না, স্যার, এদিককার নদীনালায় একসঙ্গে অনেকটা জল নেমে যায়। আর কোস্ট্যাল বাংলায় স্যার এত বেশি খাল বিল জোলা ছোট নদী যে মোট জল এদিককার চাইতে যত বেশিই হোক জলের জায়গা কম পড়ে না। জোয়ারভাটা খেলে তো—সবসময়। একটু আসছি, স্যার, সারেঙ আবার শীতলখ্যায় ঢুকিয়ে না দেয়।’
ডেপুটি চলে যাওয়ার পর লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজে জলের কল্লোল চাপা পড়ে যায়। বরাবরই চাপা ছিল কিন্তু জলের জায়গার লোক বলে যোগেনের কানে স্রোতের নানা ধ্বনি পৌঁছে যায় একটু আড়াল থেকে। যখন সে-আড়াল ঘুচে যায় তখনই স্রোতের বিরুদ্ধ কোনো আওয়াজ প্রধান হয়ে ওঠে, সে যদি টিন বাজিয়ে কোনো ভিখারির গান হয়, তাহলেও। নৌকোয় এটা হয় না। নৌকোতে যাওয়া মানে জলের মধ্য দিয়ে যাওয়া, ভেসে, নিজেকে ঘেরা দশদিকের মধ্যে ন-দিকে ছোট একটা কানা তুলে পথ তৈরি করা। ছিপ নৌকো লম্বা ও চাপা বলে যে-গতি পায়, তাতে যোগেনের মনে হয়, যেন স্রোত কেটে চলে যাচ্ছে।
ডেপুটির সঙ্গে কথা বলে যোগেনের খুব ভাল লাগেনি। দুটো-একটা কথায় অবিশ্যি মনে হচ্ছিল—মানুষটি শাদাসিধে ও নির্ঝঞ্ঝাট, যেমন হয় আর কী। চাকরি বাঁচাতে ঘর্মাক্ত নয় হয়ত, চাকরি না-থাকলেও দেশে বসে চাষ-আবাদ করতে পারবে। এই নিরাপত্তা হয়ত ভদ্রলোককে সহাস্য ও নিরুদ্বেগ রেখেছে। যোগেন এই উঁচু চাকুরে হিন্দু-মুসলমানদের খুব ভিতর থেকে সন্দেহ করে। মুসলমান অফিসার আর ক-জন। যা আঙুলে গোনা যায়। থানা লেভেলে ও তার নীচে কিছু আছে। এই চাকুরে হিন্দুরা এখন মহকুমা পর্যন্ত রাজনৈতিক মত তৈরির প্রধান উপায়। কলকাতাতেও রকমফেরে তাই—পাড়ার মোড়ে, রকে, চায়ের দোকানে, অফিসকাছারিতে কলকাতার চাকুরেরা রাজনীতির শোনা কথা ও সম্ভাব্য কথা বয়ে নিয়ে যায় ও বয়ে নিয়ে ফেরে। যোগেন এদের পছন্দ করে না—হিংসুটে, তালেবর, ছুঁকছুঁকে, সবজান্তা, গোঁড়া, হাফ-স্বদেশী, অ্যান্টি-মুসলিম কিন্তু ক্বচিৎ-কদাচ চাকরিতে উঁচু পদের কোনো মুসলিম অফিসারের তুষ্টির জন্য হিন্দুদের ক্ষতি করতে হলে তাও করে দেয়—একটুও চিহ্ন না রেখে, তার মানে চাকরির সুবাদে অ্যান্টিহিন্দুও, নিঃসংশয়ে ঘুষখোর। এরাই সেই নতুন শ্রেণী কী না, যাদের ওপর বাংলার রাজনীতি নির্ভর করছে বা করবে—এটা যোগেন এখনো ঠিকঠাক জানে না, তবে তার সন্দেহ সেরকমই, আর ভোটে টাউনে এরাও যোগেনকে জিতিয়েছে। তা সম্ভব হয়েছিল—যোগেনের আসনটা সংরক্ষিত নয় বলে, যোগেন ওকালতি পাশ করে ওকালতি করছে বলে, যোগেন ভাল স্পিচ দেয় ইংরেজিতে, আর যোগেনকে স্বভাবচরিত্রে অনেকটা নন-চাঁড়াল মনে হয় বলে। কিন্তু যোগেন সন্দেহ করে—যোগেনকে সমর্থনের প্রধান কারণ—কাস্টহিন্দুদের হিংসাহিংসি গাছের ও খাবে তলারও কুডুবে এই নিয়ে কাস্টহিন্দুরা কংগ্রেসের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। কার মুখ, কার মত, কার জবাব—এ-সবই অজানা। বরিশাল শহরে আরএসপিও হয়েছে, সতীন সেনও আছেন, বাড়ছে। কাস্টহিন্দু বাবুদের বাড়ির ছেলেরা সেখান থেকেই হয়ত এত চড়া কথা বলতে শিখছে। তারাই হয়ত এই বাবুদের মুখে ঐ রাগী-রাগী কথাগুলি জুটিয়েছে। তাহলে দাঁড়াল কী—এরা দুমুখো, আবার সমাজতন্ত্রী, নিজের কথা ছাড়া এরা নিজের ছেলের কথাও ভাবে না।
ডেপুটিবাবু ফিরে আসায় যোগেন আবিষ্কার করে খোলা দরজা দিয়ে সে নদীর ওপরে চোখ মেলে আছে, রোদের ঝাঁঝে তার দুই চোখ কুঁচকে গেছে, ও তার একটু ঝিমুনিও এসেছে। খুনের আসামি গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর হাকিমকে যোগেন বুঝিয়ে যাচ্ছে, খুনের যে-সোপ রিপোর্ট জমা পড়েছে, তার সঙ্গে ঐ আসামির কোথায় কোথায় অমিল আর নিজেই নিজের গলার আওয়াজটা বিশ্বাস করছে—সত্যি এই লোকটির পক্ষে গোটা একটা খুন করা সম্ভব নয়—ডেপুটিকে ফেরত দেখে যোগেনের মনে হয়—এই ভদ্রলোক হয়ত সেরকম নয়।
‘কী, লঞ্চের হাল ঘুরয়্যা দিলেন?’
‘না স্যার, রিস্ক নেয়নি। এদের তো স্যার মন্ত্রী-মেম্বার পার করার এক্সপিরিয়েন্স হয়নি এখনো, না-হলে কোনো মহাজনের হয়ত জাহাজভর্তি মাল, সে দুটো টাকা ধরিয়ে দিয়ে লঞ্চ ঢুকিয়ে দিল শীতলখ্যায়। মাল খালাশ করে নিল। আড়াইহাজার হল শীতলখ্যার পুব পারে। মহাজন এ সুযোগ ছাড়ে? এগুলো তো স্যার রুটের লঞ্চ না, সিজন্যাল লঞ্চ। বললেই হল যে কালীগঙ্গায় জল ছিল না। তাই একটু বলে এলাম, ওসব করো না, এমএলএ যাচ্ছেন।
‘মানে, মহাজনের দুইটাকার বদলি পাঁচটাহা দিলেন তো?’
‘সে স্যার, যত বড় মহাজনই হোক, সরকার তো মহাজনেরও মহাজন। আগে সরকারকে পথ দাও, তারপর, দুটাকা-পাঁচটাকা কামাই করো’।
‘এ তো সবই আপনার সন্দেহ, কোনোটাই প্রমাণিত সত্য নয়।’
‘কোটা স্যার?’
‘এই, দু-পাঁচ টাকার ঘুষে কালীগঙ্গা ছেড়ে দেয়া আর শীতলখ্যায় ঢুকে পড়া—’
‘সন্দেহ কেন স্যার। এই লাইনের সবার কাছেই শুনতে পাবেন। এটুকু না-জেনে কি ডিস্ট্রিক্টে কাজ করা যেত?’
‘উপরে পিঞ্জরাবদ্ধ ডেপুটি ক্রোধে পায়চারি করিতেছে জানিয়াও সারেঙরা এতটা দুঃসাহসী হইবে কেমন করিয়া’, কথা বলার ঢঙেই বোঝা যাচ্ছিল যোগেন কোনো নাটক থেকে পার্ট বলছে।
‘আপনার সঙ্গে কথা বলা স্যার, রিগরাস পানিশমেন্ট, কখনো প্রিভি কাউন্সিলের ইংরেজি, কখনো যাজ্ঞবক্ষ্যের সংস্কৃত, কখনো কোনো নাটক…’
যোগেন খোলা গলায় হেসে ওঠে। জলের ঐ বিস্তার, লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ, জলের আকাশে কিছু-কিছু পাখির সঙ্গে যোগেনের সেই হাসির সততা একেবারে এমনই মিশে গেল, যেন সে কোনো আলাপে এ হাসি হাসেনি, যেন তার হাসি এই জল-মাটি আকাশে মাখা।
যোগেন বলে উঠল, ‘ধইর্যা ফেললেন?’
‘কী স্যার? আমি তো কিছু ধরিনি।’
‘মোক্ষম ধইরলেন—গর্তে হাত ঢুক্যায়া শোল মাছ আর কন ধরেন নাই?’
‘শোলমাছ স্যার? না স্যার?’
‘তাইলে কালাবাউশ-–’
‘না স্যার। ও নামে কোনো মাছ আছে নাকী?’
‘ইয়েস স্যার। এবং সে-মাছ বর্তমানে আপনার চোখের সম্মুখে অবস্থিত। মিলাইয়া লউন—কালা এবং বাউস সমানচিহ্ন যোগেন মণ্ডল।’
ডেপুটি এত জোরে হেসে ফেলেন যে তাড়াতাড়ি ডান হাতে ঠোঁট চাপা দেন। সে-চাপাতেও হাসি ঠেকে না। যোগেনের সামনে এভাবে হাসা তার উচিত হচ্ছে না। কিন্তু উনি তো কথাটা শেষ করেননি, সে ঘরই বা ছাড়ে কী করে। যোগেন একটু নিঃশব্দে কিন্তু বড় হাসি হেসে তাকে আশ্বস্ত করেন, ‘আরে ডেপুটি স্যার, এই ইংরাজি-সংস্কৃত লেকচারল্যারে আমাগো দ্যাশে কয় ঢপ, আপনাগ দ্যাশে কয় কাকতাড়ুয়া, শাহেবগ দ্যাশে কয় স্কেয়ারক্রো। বেগুনখেতে খাড়া থাহে না ক্রশ করা কাঠির মাথায়, হাঁড়ি মাথায় কইর্যা? শীতকালের পাখিগ ভয় ডর— খাওয়াইতে? তেমনি। আমি এড্ডা সংস্কৃত, এড্ডা ইংরাজি, আর দুইডা-একডা ল্যাটিন প্রবাদ, যা কলেজে পড়াইছিল, ল-কলেজে, এইসব নতুন জায়গায় সুযোগ বুইঝ্যা ছাইড়্যা দেই। ব্যস, নাম ফাটে—স্কলার লেজিসলেটার বইল্যা। কিন্তু ক্যালকুলেশনডা খুব কঠিন, খুবই কঠিন স্যার। ভুল হইলেই কট্। ধরেন আপনার সঙ্গে আমার নিকট ভবিষ্যতে আবার দেখা হওয়ার কোনো দুর্ভাবনা নাই। সেকেন্ড, পরের সাক্ষাৎ কোনো কালে হইলেও এইবার যে-কোটেশনগুলা দিছি, সেগুল্যা আপনার মনে থাকার কথা না। থার্ড, যদি পুনসাক্ষাৎ হয় তালি আপনিই আমার কাছে আইস্যা মনে করাইবেন তো, তহন সব কথা আমার মনের ভিতর থিক্যা ঢ্যাপের মোয়ার মতো ছিটকাইয়্যা নাও বারাইতে পারে। এত গুল্যা গ্যারান্টি সত্ত্বেও যে ঢপ দিবার পারে না, স্যায় আর যাই হোক, বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির মেম্বার হইবার পারবা না।
লঞ্চের গতি যেন কমে আসছে। ইঞ্জিনের আওয়াজটাও। যোগেন বাইরে তাকিয়ে দেখে, প্রায় কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে লঞ্চ, প্রায়, কিন্তু পুরোটা নয়। পাড় থেকে কেউ লঞ্চে উঠতে পারবে না, লঞ্চ থেকেও কেউ নামতে পারবে না। ‘খাইছে-চড়ায় ঠেইকল না কী?’
ডেপুটি মুগ্ধ হয়ে যোগেনের কথা শুনছিলেন, কথাটা শেষ হওয়ার পর লঞ্চ চড়ায় ঠেকা নিয়ে যোগেনের উদ্বেগে ডেপুটি একটু চমকে ওঠেন। বাইরে তাকান, ‘না, স্যার, এটা তো স্যার বাঁচামারা, মাণিকগঞ্জে। স্টিমার রুটে পড়ে না। না, রুটে পড়ে কিন্তু স্টিমার থামে না। ক্রিশক্রশে ফাঁক পড়ে গেছে। এরা হয়ত কিছু প্যাসেঞ্জার নিয়েছে।’
‘আপনারে একবার বরিশাল—বাখরগঞ্জ দ্যাখানো দরকার।’
‘আমাকে কেন স্যার?’
‘প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিঙ। এডা তো একডা খিটক্যাল বানাইয়া থুইছেন। যদি সিলেটের চা-বাগানের শাহেবের সুমতি আর ম্যাঘবৃষ্টির দ্যাবতার সুমতি মিল্যা যায় তাইলে কালীগঙ্গা লাইন খোলা থাইকব, আর রুটের ইস্টিমার যে-যে জায়গায় খাড়ায় না, সেই সব জায়গায় লোক তোলানামা নামাতোলা কইরতে-কইরতে যাইব। সে তো হাঁটনের চায়্যা জিরান বেশি। বরিশালে তো আমাগ খালের থিক্যা নৌকা বেশি। আ-হা-হা-রে, দ্যাহেন, মাইনষের দুর্গতি দ্যাহেন-
ডেপুটি পাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে একের পর এক লোক মাথায় মাল নিয়ে লঞ্চ থেকে জলে নেমে সাঁতার কেটে পাড়ের দিকে যাচ্ছে।
যারা সাঁতার কেটে পাড়ে উঠছে আর যারা লঞ্চ থেকে দেখছে—সকলেই হাসছে।
‘স্যার, সবার তো ফূর্তি। দুর্গতি কোথায়?’
‘হ। তাই তো। আমার বিভ্রম ঘটছিল। গুলাইয়্যা ফেলছিল্যাম। দুর্গতি আর ফূর্তিতে।’
.
টুঙ্গিতে ডেপুটি যোগেনকে কাছেই ডাকবাংলোতে নিয়ে চা-টা খাইয়ে আনার চেষ্টা করেছিল কিন্তু যোগেন রাজি হল না—’ধুত মশাই, এডা তো হাজতখাটা। রেলের কামরায় একা, লঞ্চের ছাদে একা, অ্যাহন প্ল্যাটফর্মেও একা। বরং এই হানে বসি।’
হবিগঞ্জের ট্রেন টুঙ্গী থেকে ছাড়ে বেলা দেড়টা নাগাদ। ডেপুটি বিপদে পড়েছিল যোগেনের লাঞ্চ নিয়ে। হবিগঞ্জের ট্রেন মিটার গেজের। কোনো প্যানট্রি কার নেই। আর এই রুটে এমন কোনো স্টেশন নেই যেখানে রেলের টেলিগ্রাফে খবর পাঠালেও কোনোরকমের একটা লাঞ্চ ট্রেনে যোগেনকে পৌঁছে দিতে পারে।
যোগেন প্ল্যাটফর্মেই বসে থাকে। চাওয়ালাকে ডেকে নিজেও এক ভাঁড় নেয়, ডেপুটিকে ও এক ভাঁড় দেয়। সেই সুযোগে ডেপুটি বলে, ‘স্যার, অন্তত ওয়েটিং রুমে চলুন। দাঁড়ান, আমি পরিষ্কার করিয়ে রাখছি।’
‘আরে, ওহানেও ওয়েটিং, এহানেও ওয়েটিং।’
‘প্রায় ঘণ্টা দুই সময় তো হাতে, স্যার। এই স্টেশনের পাশেই স্যার, ডাকবাংলো, আপনার কোনো অসুবিধে হবে না, স্যার। স্নান করে লাঞ্চ সেরে আরামে ট্রেন ধরতে পারবেন। স্যার—’
‘শুনেন ডেপুটি সাহেব। সবে তো সব মেম্বার হইছে, মন্ত্রী হইছে—তারা আসাযাওয়া শুরু কইরলে তাগ স্যাবা দিতে-দিতে শ্বাসকষ্ট উইঠবে আপনাগ। আমারে ছাইড়্যা দ্যান। আমি ঠিক সেবাযোগ্য মানুষ না।’
‘সে তো স্যার বুঝতেই পারছি। কিন্তু আপনি কি একটা বেঞ্চ থাকলে চেয়ারে বসে রাত কাটাবেন, স্যার?’
যোগেন কোনো আওয়াজ না করে মুখটা হাসিতে ভরিয়ে ডেপুটির দিকে তাকায়। একটু পরে বলে, ‘আপনে তো জবর আরগুমেন্ট দিছেন! এমন শত্রুর নিকট পরাজয় স্বীকার করাও গৌরবের। না স্যার, এডা আমার স্বভাববিরোধী। আমি নিজেকে বোকা প্রমাণ করতে পারি না। চলেন, ডাকবাংলাতেই চলেন। কিন্তু আমারও অ্যাডডা শর্ত আছে।’
‘বলেন, স্যার—’
‘এইখান থিক্যা আপনি আর আমারে এসকর্ট করবেন না। আমি এক ঘুমে দিন পোহাইয়্যা সন্ধ্যারাত্তিরে পৌঁছায়্যা যাব। আর আপনিও এহান থিক্যা ট্রেন ধইরা হাজইদ্যার বাড়ি পৌঁছায়্যা যাবেন। কী? রাজি?’
‘সে দেখা যাবে ট্রেন এলে—এখন চলুন স্যার।’ ডেপুটি বোধহয় একটু বাড়িয়েই বলে ছিল—দু-ঘণ্টা বসে থাকতে হবে প্ল্যাটফর্মে। যোগেন ও ডেপুটি হেঁটে ডাকবাংলোতে গেল, তাতে লাগল সাত-আট মিনিট। রেলের কোয়াটার, মাঠ এসবেই রাস্তা ভরা। তারপরই ডাকবাংলো—সামনে অনেকটা মাঠের শেষে চারচালা টিনের বাড়ি—লম্বাটে। কাঠের রং সবুজ, টিনের রং লাল। ঘরে গিয়ে, প্রাতঃকৃত্য সেরে, বালতির গরম জলে স্নান করে, গরম বালাম চালের ভাত, গরম মটর ডাল, একটা মাছভাজা সহ আর দুই পিস বাঘের জিভের সাইজের রুইমাছের গাদা আর পেটি দিয়ে লাঞ্চ সেরে ডেপুটির সঙ্গে আবার সেই সাত-আট মিনিট হেঁটে যোগেন প্ল্যাটফর্মে ফিরে এল মাত্র চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিটে।
‘আপনে তো মাথায় জলস্পর্শ কইরলেন না।’
‘না স্যার, হাতমুখ ধুয়েছি, স্নানটা করিনি।’
‘খাওয়াডাও তো খুব প্যাট ভইরা খাইলেন না। বাড়ি গিয়্যা নিজের পুকুরে সাঁতার কাইট্যা, নিজের বাড়ির বউগ রাঁধা নিজের ক্ষ্যাতের ভাত খাওয়ার স্বাদ আলাদা।’
‘সে তো স্যার দেরি হবে।’
‘এইডা কইরবেন না, ওয়ার্ড যখন দিচ্ছেন, সে-ওয়ার্ড রাইখবেন। আপনি আমারে আর এসকট কইরবেন না।’
‘আমাকে তো স্যার নেক্সট পারসনকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে হবে। নইলে তো স্যার ডেরেলিকশন অব ডিউটি হবে।’
‘সাক্ষী তো একা আমি। যদি কই আপনে আমার কাজে বাধা দিচ্ছেন?’
ট্রেন এসে গিয়েছিল। একটাই ফার্স্টক্লাশ। সেটায় উঠে যোগেনকে যতটা আরাম দিয়ে বসানো সম্ভব বসিয়ে ডেপুটি বলে, ‘আমার সারা সার্ভিস-লাইফে স্যার এমন ডিউটি কখনো করিনি স্যার। যাঁর ডিউটি তিনিই বলছেন-ডিউটি করলে ডেরেলিকশনের চার্জ দেবেন।’
ট্রেন ছাড়ার লম্বা ঘণ্টা বাজে। ‘স্যার, কোনো দোষত্রুটি ঘটে থাকলে ক্ষমা করবেন, স্যার।’
গার্ডের হুইসল বাজে।
‘আপনারে কী কষ্টটাই না দিল্যাম—কন। কত আবোলতাবোল কথাই যে অফিসারগো শুইনতে হয় ঠোঁট চিপ্যা। আমারে ক্ষমা দিবেন।’ ট্রেনের লম্বা হুইসল বেজে উঠতেই যোগেন ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘আরে নামেন, নামেন–।’
‘হ্যাঁ, স্যার’, ডেপুটি নমস্কার করে কামরা থেকে নামে, যোগেন দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে হাত নাড়ে। ট্রেনের চাকা প্রথম ঘোরার একটা যান্ত্রিক আওয়াজ উঠতেই থাকে। ডেপুটি হাত নাড়ায় যোগেন হাত নাড়াতে গিয়ে ট্রেনের চলার প্রথম ধাক্কায় একটু দুলে ওঠে, তাড়াতাড়ি হ্যান্ডেলটা ধরে, ডেপুটি হাত নাড়ায়। যোগেন আর দেখতে পায় না তাকে, তবু হাতটা নাড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বার্থে বসে জানলা দিয়ে তাকায়।
যোগেনের কেমন ধারণা হয়েছিল—ডাকবাংলোটা দেখা যাবে। প্ল্যাটফর্মের পর খানিকটা জায়গায় বাজারের পেছন দিকের মত টিনের ছাপড়া পেরতেই, দেখে মনে হয় পাথুরে, আসলে অ্যাসিডহীন জমির অসমতল বিস্তার। বরিশাল-নোয়াখালি-ফরিদপুরে এতটা সবুজহীন ঊষরতা ভাবাও যায় না। মৈমনসিং আর সিলেটের উত্তরে তো পাহাড়।
আর-একটু গড়াতেই শীতলখ্যার নীল বিস্তার থেকে ওঠা হাওয়া ট্রেনের হাওয়ার সঙ্গে মিশে যোগেনের ওপর এমন ঝাপটে পড়ে যে তার চোখ জড়িয়ে আসে।
যোগেন ইচ্ছানিদ্র মানুষ। সময় নেই, অসময় নেই, সে যদি বোঝে তার জেগে থাকার কোনো কারণ নেই, তাহলেই সে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। তার ঘুম এমন মটকামারা না যে ঘুম ভেঙে গেলে তাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে। বরং সে যেন একটু মুক্ত মনেই ঘুমুতে পারে হবিগঞ্জের ট্রেনে। কাল ঢাকা মেল থেকে শুরু আর চলছে তো চলছেই। মনে হচ্ছে সেই ঢাকা মেলের বাবুর্চি, গোয়ালন্দের এসডিও, লঞ্চের ডেপুটি এদের সঙ্গে দিতে-দিতে এল। কিন্তু মজা হচ্ছে, যোগেনের এদের সঙ্গ ভালও লাগছিল। কত দায়িত্ব নিয়ে এরা সব কাজ করছে একেবারে চষামাটির লেভেলে। একেই বলে ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন …
এইসব মনে-মনে নাড়াচাড়া করতে-করতেই যোগেন তার নিজস্ব ঘুমের গভীরতায় ঢুকে ডুবে যেতে পারে ও সেই ঘুমের মধ্যে কখনোসখনো সে ট্রেনের লাইন বদলাবার আওয়াজ বুঝতে পারে, কোনো ক্যালভার্ট পেরনো বুঝতে পারে, এমনকী কোনো-কোনো স্টেশনে গাড়ি দাঁড়ানোও বুঝতে পারে। বুঝতে পারতে-না-পারতেই আবার ঘুমে ডুবে যায়।
ঘণ্টা তিনেক পরে যোগেন চোখ মেলে জেগে উঠে আশুবাবুর ঘড়িতে দেখে বেলা তিনটে পঁচিশ। আরে, তার মানে তো টুঙ্গীতে ট্রেন ছাড়ার পর থেকেই সে এতক্ষণ ঘুমিয়েই আছে। এতডা টানা ঘুমের তো কারণ নাই। অতিরিক্ত কারণ আর কী দরকার? ছুটন্ত ট্রেনের মতো সুখশয্যা আর কী হয়। তাদের খুলনা মেল—ঢাকা মেল সবই ছাড়ে দুদিক থেকে সন্ধের পর। ফলে, ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়া তাদের একটা বদভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়েছে। তার থার্ডক্লাশে মানুষের ঠেলাঠেলিতে, নামাওঠায়, প্ল্যাটফর্মগুলির চেঁচামেচিতে মাঝমধ্যে জেগে উঠতে হয়। এ তো একেবারে স্বর্ণলঙ্কা, একালঙ্কেশ্বর, কাকপক্ষীও নেই। গভীর নিদ্রা ছাড়া করণীয় কিছু নেই। তবু তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা তো কম সময় নয়—তাও দিনদুপুরে যোগেন জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়।
শায়েস্তাগঞ্জে তো গাড়িবদল করতে হবে—পার হয়ে যায় নি তো? যোগেন যেন এটুকু অনিশ্চয়তা উপভোগ করে। গতকাল রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে এই এখন হবিগঞ্জে পৌঁছুবার ট্রেন পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় যোগেনের জানা হয়ে গেছে—সে যদি চায়ও তাহলেও শায়েস্তাগঞ্জ পার হয়ে যেতে পারবে না। হবিগঞ্জের এসডিও হোক, জিলার ম্যাজিস্ট্রেট হোক আর ঢাকা ডিভিশনের কমিশনার হোক—কেউ-না-কেউ তাকে গ্রেপ্তার করে হবিগঞ্জে নিয়ে যাবেই। যদি তাকে নাও পায়, তাহলেও তারা একটা যোগেন মণ্ডল জোগাড় করে নেবে। তার হিশেব মত, বা, শোনা-কথা মত, বা, সিলেট-ময়মনসিঙে আগে যে একটু এসেছে সেই চেনাজানা মত পাঁচটার আগে ট্রেন শায়েস্তাগঞ্জে পৌঁছুবে না।
জানলা দিয়ে তাকিয়ে যোগেন দেখতে চায়—সে আগে দেখেনি এমন কিছু দৃশ্য। সে ঠিক জানেও না—লাইন কোথা দিয়ে গেছে। আর যদি জানতও তাতেও বাইরের দৃশ্য কিছু বদলাত না। যোগেন একটু হেসে ফেলে—সে তাকিয়ে ছিল নতুন দৃশ্যের আশায় কিন্তু বাইরে ট্রেনের জানলায় সে দেখে রাবণবধ নদীর পারে আমতলি। বরিশাল-পটুয়াখালির তো খালের প্যাঁচ-পায়জার নেই কিন্তু অনেকটা জায়গা জুড়ে খালই হোক আর বিলই হোক তার ভঙ্গিটা বড় সুন্দর লাগে চোখে।
যোগেন বুঝতে পারে—কেন আমতলির কথা মনে এল। বরিশাল-পটুয়াখালি-যোলকাঠি- ভোলা—প্রভৃতি সব জায়গায় তো তাদের নৌকোয়-নৌকোয় ঘুরতে হয়। খাল তো আর নদী না যে ছাদের কেবিনে বসে পদ্মা দেখতে-দেখতে ডেপুটিবাবুর সঙ্গে গল্প করা যাবে আর চোখ একটু সরালেই জলবিস্তার দেখা যাবে। খাল তো দুই পারে আটকা, কোথাও বড় জোর ডাইনে আড়াআড়ি পাঁচ বাঁশ, বাঁয়ে আড়াআড়ি পাঁচ বাঁশ, আবার কোথাও দুই পাড়েরই ঘাস ছেঁড়া যায়। যেন দুই দিক আটকানো, সামনে-পিছনে খোলা। নৌকার ছেয়ের মতো।
