৭৬. যোগেনের এমএলএগিরি : রাজবাড়ির এসডিওর সঙ্গে
গোয়ালন্দ ঘাটে ট্রেন থামতেই রাজবাড়ির এসডিও কামরায় উঠে নমস্কার করে বললেন, ‘স্যার, রাস্তায় কোনো কষ্ট হয়নি তো? বাঙালি ও কমবয়েসি। বাঙালিদের ভিতর যাদের মহকুমার দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদের রিট্যায়ার করার দু-চার বছর মাত্র বাকি থাকে। এমন কম ৭৬ বয়সে এসডিও?
‘না, না। এ তো আরামে আসা। আপনার নাম কী? এত কম বয়সে এত উচ্চপদে—?’
‘আমার নাম স্যার, সুজা আলম।’
যোগেন স্বভাব-অনুযায়ী বিস্ময় গোপন করল। মুসলমান বলেই কি প্রমোশন দেয়া হয়েছে? তেমন কথা যে হোম-মিনিস্টারের বিরুদ্ধে উঠছে না, তা নয়। বিশেষ করে হিন্দু প্রেসে। তারা আবার সব বিষয়েই এত মুসলমান স্বার্থরক্ষার কথা রটায় যে বিশ্বাস করা শক্ত। আবার, এর মধ্যেই গ্রামের দিকে যে নতুন সব পদ তৈরি করে অল্পশিক্ষিত মুসলমানদের সরকারের সঙ্গে ও লিগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নিয়ে আসা হচ্ছে, প্রধানত সারওয়াদি শাহেবের নেতৃত্বে, তিনি প্রাদেশিক মুসলিম লিগেরও সম্পাদক, সেটা তো বেশ পরিষ্কার, সকলের কাছে। এ নিয়ে হিন্দু-কংগ্রেসি প্রেসও কোনো শোরগোল তোলেনি। গ্রাম-মহকুমার অল্প শিক্ষিত মুসলমানরা, ওপরের ও পরের চৌদ্দ-চৌদ্দ আটাশ পুরুষে চাকরি যে-করা যায়, তা কখনো জানেনি, চাকরি তো করে হিন্দুরা, তারা সত্যি করেই একটা নতুন রকমের জীবনের আঁচ যেন এতে পায়। সেই মুসলমানদের মধ্যে তো কংগ্রেসের ভোটারও আছে। সেই মুসলিম-ভোট এখন কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ। সুরাবরদি শাহেব জিলাগুলিতে মোট ২৭-জন গ্রাম-উন্নয়ন অফিসারের ও ২৬জন প্রচার-অফিসারের পদ ও থানাগুলিতে মোট ২৫০ অর্গানাইজারের পদ ঘোষণা করে দিলেন ও এটাও বলে দিলেন যে সামনের বাজেটে অর্গানাইজারের পদ ৬০০-তে উঠবে। কংগ্রেস এটার বিরোধিতা বেশি করলে লিগের কথাই সত্য প্রমাণিত হবে যে কংগ্রেস হিন্দুদের পার্টি। ফলে, কংগ্রেসের চোরের মা-র পুত্রশোকের দশা।
‘স্যার, আপনার ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা কি এখানেই করব?’ এসডিওর কথায় যোগেন বলে ওঠে, ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসেন,’ একটু সরেও যায় যোগেন জায়গা দিতে, ‘এখানে তো ব্রেকজার্নি, ব্রেকফাস্ট হবে কী করে?’ এসডিও যথোচিত হাসলেন। যোগেন নিজেই জানত না কথাটা এইভাবে বলবে। হিন্দু বা সরকারি অফিসারদের মধ্যে নিজেকে জাহির করতে যোগেন এমন সুরে কথা সাজায় বটে কিন্তু এখানে তো তেমন দরকার কিছু ছিল না। কমবয়েসি মুসলমান এসডিও দেখে যোগেনের তো বেশ ফূর্তি করে বলার কথা—যাক বাবা, একটু চোখ বদলাল, বামুন-কায়েত এসডিও দেখতে হল না। সে তেমন একটা ভাবেনি কেন—যোগেন যখন ভাবতে শুরু করে, তখনই শোনে, এসডিও বলছেন, বলছিলাম, এখানেও ব্যবস্থা রেখেছি, আর স্টিমার সার্ভিসে তো থাকেই।’
যোগেন নিজের কাছে নিজের সম্মান উদ্ধারের জন্য একটু নিম্নস্বরে বলে, ‘এত সকালে কিছু খেতে ভাল লাগবে না। বরং একটু চা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করি না? স্টিমার নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবে না?’
‘সে কী স্যার? একমিনিট’, এসডিও ত্বরিত নেমে যায়। দেখতে ভাল লাগে। যোগেন এবার নিজেকে বুঝতে পারে-মুসলমান বলেই ভাল লাগছে। নমশূদ্র হলে আরো ভাল লাগত। বৰ্ণহিন্দু হলে সন্দেহ লাগত।
ট্রেন দাঁড়িয়েই ছিল। গোয়ালন্দ থেকেই পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র বাংলাপ্রদেশকে দুইভাগ করে দিয়েছে। উঁচু বাংলা আর নিচু বাংলা। উত্তরে রাজশাহি ডিভিশন-রাজশাহি, পাবনা, মালদা, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি আর দার্জিলিং। ঢাকা-মৈমনসিং-ত্রিপুরা গিয়ে ঠেকেছে আসামে। আর, দক্ষিণে—বর্ধমান আর প্রেসিডেন্সি ডিভিশন। মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান, মেদিনীপুর, চব্বিশ পরগণা, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, হাওড়া-হুগলি-কলকাতা। ১৯০৫-এ শাহেবরা যে কী বুদ্ধিতে পূর্ববঙ্গ আর আসাম প্রদেশ তৈরি করেছিল! তা থেকেই পূর্ববঙ্গ একটা ধারণা হয়ে গেছে। ধারণা একবার তৈরি হয়ে গেলে আর মোছা যায় না। পূর্ববঙ্গ তেমনি একটা ধারণা। পুব থাকলে তো তার একটা পশ্চিমও থাকতে হয়। বাংলাপ্রদেশের পশ্চিমটা কোথায়? আর পূর্ব বাংলার জমিদারদেরও পুলকের শেষ নাই—কীসের মধ্যে কী, এক ফুটবল ক্লাব বানাল, তার নাম দিল ইস্টবেঙ্গল। শাহেবদের দেয়া নামে তো আর ভূগোল বদলায় না। চোখে কি দেখে না-পদ্মা-মেঘনা—ব্রহ্মপুত্র দিয়েই বাংলার জল সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে!
গোয়ালন্দ থেকে এই তিন নদীর অববাহিকা ধরে নৌকো, লঞ্চ, স্টিমারে বাংলার উত্তর-দক্ষিণের সব জায়গাগুলিতে মানুষ চলে যায়। পদ্মার ওপর ব্রিজ বলতে তো এক সাঁরা ব্রিজ–সে তো শাহেবদের চা-তামাক-কাঠের ব্যাবসা আর দার্জিলিঙের পাহাড়ের শীতে আরামের জন্য। পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের আর কোথাও ব্রিজ আছে? ব্রিজ দিয়া করবডা কী? হাঁসরে নি কহা যায়, বাড়ির হাঁসরেও, রোজ বারমাস তোগো খাল-পুকুর থিক্যা বাড়ি ফিরার কষ্ট দেইখ্যা পরান ফাটে—তোরে দেই অ্যাডডা ব্রিজ বানাইয়া? হাঁস কি বুঝবে নি সদুপদেশডা? নাহি ঠ্যাঙা বগের একখান পাওয়ের নীচে অ্যাড়া পিঁড়া দিলে বগের পায়ের ব্যথার আরাম হয়? জলের মানুষ জ্বলে থাইকব—এর মইধ্যে কথা কীসের?
সে ট্রেনের কামরায় বসে আর মানুষজন ঘাটের দিকে ছুটছে, গোয়ালন্দের বিখ্যাত হোটেলের ছোকরারা কত ভাষায় চেঁচাচ্ছে—’হিন্দু হোটেল’, ‘পবিত্র হোটেল’, গরম ভাতে ইলিশের ঝোল-অ্যাহনো কড়াই নামানো হয় নাই’, ‘মাণিকগঞ্জ হোটেল’, ‘টাঙ্গাইল-টাঙ্গাইল’, ‘বামুনঠাকুরের হোটেল—হিন্দু ব্রাহ্মণদের জন্য’, ‘ধলেশ্বরী হোটেল’, ‘বিখ্যাত চাঁদপুর হোটেল।’
এসডিও ফিরে আসেন, তাঁর পেছনেই এক বেয়ারা, নেহাৎই লুঙ্গিপরা, কাঁধে গামছা—শাহেবদের চা-খাওয়ার নানা উঁচুনিচু বাটি নিয়ে কামরার সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ায়। সে ঐ ডালা নিয়ে উঠবে কী করে। অগত্যা এসডিওই নিচু হয়ে তার হাত থেকে ডালাটা নিয়ে টেবিলে রাখেন। যোগেন হে-হে করে দাঁড়িয়ে পড়ে, ‘আরে, আপনি একডা এসডিও শাহেব হইয়্যা নিজের হাতে আমার জইন্যে চা আইনলেন। ক্যা? আমারে ডাইকলেই তো আমি ব্যাগডা নিয়্যা আপনার লগে যাইত্যাম।’
‘সে কী কথা, স্যার! আপনাকে দেখাশোনা করাটা আমার ডিউটি অ্যাজ পার গবমেন্ট অর্ডার। তাছাড়া, এটা কি একটা কাজ হল?’
বাইরে পায়ে-পায়ে বালি উড়ছিল। যোগেন ইচ্ছে করেই জানলা নামায়নি। এসডিওর চোখে হয়ত দু-এক কণা ঢুকে গিয়েছিল। উনি তাড়াতাড়ি রুমাল বের করে চোখে দেন।
যোগেন বলে ওঠে, ‘আপনি ঐ স্নানের ঘরে যান, ভাল কইরা চোখ ধুইয়্যা আসেন। খোলা চোখে জলের ঝাপটা নিতে পারেন তো?’ তার পেছন-পেছন গিয়ে যোগেন বলতে থাকে, ‘না পাইরলে চোখের পাতাখান উলটাইয়্যা নিবেন। ঐ পিছনে তোয়ালা—’
যোগেন নিজেই বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর চাটা ছেঁকে নিতে বসে।
বাথরুম থেকে এসডিও ফিরে আসতে-আসতে যোগেন চা ছেঁকে ফেলেছে।
‘দেহি, চোখদুইডা বড় কইর্যা তাকান।’
‘ও ঠিক আছে স্যার—’
‘বসেন। চা খান।’
কাপটা তুলে নিতে-নিতে এসডিও বলেন, ‘দেখুন স্যার, কোথায় আমি আপনাকে চা করে খাওয়াব, না, আপনি
‘বসেন, বসেন। আপনি একটা এসডিও। সেপাই শাস্ত্রী সঙ্গে নাই ক্যামন?’
‘না, আছে। ওঁদের একজন আপনার সঙ্গে যাবে। আমার একটা এনকোয়ারির অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে—ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে। এক বৃদ্ধ মুসলমানের উইল সরেজমিনে দেখতে হবে। আপনার কোনো আপত্তি নেই তো স্যার?’
‘কী সে?’
‘আপনাকে এসকর্ট’ করতে আমি যাচ্ছি না, আর-একজন যাচ্ছেন। কিন্তু উনি ঐ দিকটা খুব ভাল চেনেন স্যার। আপনার কোনো অসুবিধে হবে না।’
‘মানে? আমার পিছনে কি পুলিশ লাগাইবেন?’
‘না, না স্যার। উনি স্যার এখানকার সিনিয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সার্টিফিকেট অফিসার। ‘সে-ব্যাচারেরে মিছামিছি ফেউয়ের খাটানি ক্যান?’
‘ওঁর ভালই লাগবে, স্যার। বাড়িতেও ঘুরে আসতে পারবেন।’
‘সেডা তো ভাল কথা। আপনার বাড়ি কোথায়?’
‘আমরা স্যার নদীয়ার।’
‘নদীয়া? তাই কও? না হইলে এমন মধুঝরা কথা?’
‘কেন স্যার, সব ভাষাই তো মধুঝরা।’
‘তা বটে। যার-যার ভাষা তার-তার কাছে। নদীয়ার কুথায় আপনার বাড়ি? এইডা কি প্ৰথম পোস্টিং?’
‘শান্তিপুরও বলতে পারেন, কৃষ্ণনগরও বলতে পারেন—’
‘বুঝছি, প্রাচীন পরিবার, বটগাছের ঝুড়ি, তালে বটগাছডার এড্ডু পরিচয় দিবেন। মানে, আপত্তি যদি না থাকে। এই বয়সে একটা সাব-ডিভিশনের চার্জে! জানতে ইচ্ছা হয়। তার উপর, যদি বামুন-কায়েত হইতেন, বুইঝ্যা নিতাম।’
‘না স্যার। আইসিএসে তো স্যার জাতপাতে চলে না। কঠিন পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হয়।’
‘বটেই তো। শাহেবরা ও-ব্যাপারে কোনো খাতির করে না। সাম্রাজ্য চালাতে হয় তো—আপনি কোন ইয়ারের ব্যাচ?’
‘২৮ স্যার।’
‘মাত্র নয়-দশ বছরে এসডিও। চাড্ডি কথা?’
‘স্যার, আমার থানা-লেভেলে পোস্টিং ছিল, আরো দু-বছর ছিলাম স্যার চিটা গং-বার্মা বর্ডারে।’
‘কিন্তু এতক্ষণেও ফ্যামিলি-ট্রিটার আভাস দিলেন না স্যার! আরে এইডা কটুনি দ্যাশ যে কোন্ বাড়ির পোলা এসডিও হইছে জানা যাবে না। সে-জানা তো মিনিট পাঁচের ব্যাপার। জাহাজের সিঁড়ি থিক্যা চিল্লাইব–রাজবাড়ির এসডিও কুন বাড়ির পোলা? বেবাক জাহাজ গলা মিল্যাইয়্যা জবাব দিবে। তবু আপনার মুখে শুইনলে এড্ডা আত্মীয়তা হইতে পারত।’
‘সে কী স্যার, তা বলব না কেন, আমি তো স্যার নদীয়ার ছেলে, কেষ্টনগর থেকে বিএ পাশ করি। আমার বড় মামাও তাই স্যার-সেটা তো আমার জন্মবছর।
‘বড়মামাডা কেডা?’
‘আজিজুল হক, স্যার।’
‘কেষ্টনগরের আজিজুল হক?’
‘হ্যাঁ, স্যার।’
‘আমাদের স্পিকার অ্যাসেম্বলির?’
‘হ্যাঁ, স্যার।’
‘আরে কও কী? তুমি না আমাগ ঘরের ছাওয়াল।
এসডিও মুখ নিচু করে।
‘আরে, হকশাহেবরে তো আমি দাদা ডাকি। তাইলে তোমারও তো আমি মামা খাড়াই।’
‘আমার পোস্টিং কিন্তু স্যার বড়মামা ভোটে জেতার আগে—’
‘আরে ছি ছি, এইডা তোমারে কইত হব? আজিজুল হকের পক্ষে তাঁর ভাইগন্যারে এমন শিক্ষিত করা সম্ভব যে সে তিরিশ বছরে পা না-দিতেই এসডিও হয়। কিন্তু তাঁর পক্ষে মুরুব্বি ধইর্যা এসডিও বানানো সম্ভব নয়। তালি সূর্যচন্দ্র উইঠত না। অ্যাহন তো ভাবছি—জাহাজে তুমি সঙ্গে গেলেই ভাল হইত, মামা-ভাইগন্যা সুখদুঃখের কথা কইতে-কইতে পদ্মা পাইড়্যাত্যাম। ‘তাহলে স্যার আমাকে ঐ অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ক্যানসেল করার খবর দিতে হবে। আপনি যদি চা–ন’।
‘না, না, আমি চাইলেও হবে না। এডা আমার পক্ষে অন্যায় তোমার পক্ষেও অন্যায়—’
‘অন্যায় কেন বলছেন। গবমেন্টই তো আমাকে আপনার চার্জ দিয়েছে।’
‘তোমার কোনো কাজ নষ্ট না কইর্যাই তো তুমি সেই চার্জ পালন কইরছ। অ্যাহন কি ধামায় বসাইয়্যা আমারে নদী পাড়াব্যা?’
‘স্যার, আপনার যাওয়াটা তো ফাইন্যাল করতে হয়। এখান থেকে চাঁদপুর হয়েই তো সিলেট যায়, সেসব রিজার্ভেশন হয়ে আছে স্যার। মানে, কাল সকাল দশটা নাগাদ সিলেট পৌঁছে যাবেন। আর-একটা ফেয়ার ওয়েদার রুট এখন খোলা আছে স্যার, মানে, কালীগঙ্গা নদীতে লঞ্চ যাওয়ার মত জল আছে। লঞ্চ সার্ভিসও চলছে। এখান থেকে সেই সার্ভিসে আপনি যদি দৌলতদিয়া হয়ে টুঙ্গি স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারেন, তাহলে টুঙ্গি থেকে আসাম রেলের লাইনে হবিগঞ্জ পৌঁছে যেতে পারবেন, মনে হয়, আজ রাতেই। তাহলে আপনার সময় বাঁচে।
‘এত ভাল একডা বিকল্প ব্যবস্থায় তোমার গলায় যেন কিন্তু-কিন্তু আছে, ভাইগন্যা, সেটার কারণটা কী?’
‘দুটো বিষয়ে কিন্তু আছে। এক—কালীগঙ্গা লঞ্চ সার্ভিসে ফার্স্টক্লাশ নেই।’
‘থার্ডক্লাশ আছে তো?’
‘না, না, অতটা খারাপ হলে কি আমি আপনাকে পাঠাতে পারতাম?’
‘তুমি এসডিও হইলেও নদীয়ার লোক। আর আমি এমএলএ হইলেও বরিশাইল্যা। সুতরাং জল ও জলযানের ব্যাপারে আমার অগ্রাধিকার। কোনো-কোনো ছোট লাইনে লঞ্চ সার্ভিসে থার্ডক্লাশও নাই—নৌকার খোলের মইধ্যে গাদাগাদি কইরা বইসতে হয়।’
‘না, না, ও-ভাবে যাবেন কেন? লঞ্চটা ছোট, দোতলায় একটা কেবিন আছে।’
‘তালে বইল্যা যে ফার্স্টক্লাশ নাই?’
‘লঞ্চ কোম্পানির খাতিরের জমিদার আর চা-বাগানের শাহেবদের জন্য ওটা দেয়। স্পেশ্যাল ক্লাশ।’
‘তাইলে আর কিন্তু কী?’
‘আপনার তো ব্রেকফাস্টও হয়নি। সেসব ব্যবস্থা ওদের আছে। লাঞ্চও করে দেবে চাঁদপুর লাইন থেকে ভাল। কিন্তু আমরা তো কেউ স্যার টুঙ্গি থেকে হবিগঞ্জের ট্রেনের টাইমটা জানি না। শেষে আপনাকে যদি টুঙ্গিতে ঠেকে যেতে হয়?’
যোগেন একটু চুপ করে থেকে রাস্তাঘাটটা ভেবে নিল, ‘চাঁদপুর লাইনে জাহাজ তো এ-ঘাট ও-ঘাট করতে-করতে যাবে-
‘হ্যাঁ স্যার—’
‘ঐ জলে বরফি আঁইকতে-আঁইকতে—’
‘হ্যাঁ স্যার। ওতেই তো সময় যায়। কালীগঙ্গা লাইনে সেটা নেই স্যার, গোয়ালন্দ ঘাট থেকে সোজা পদ্মা পেরিয়ে কুতুবদিয়ার ঘাট। আপনার সঙ্গে তো আমাদের সার্টিফিকেট অফিসার থাকছেনই। ওসব ওঁর নখদর্পণে। ঘাটে তো আমার কাউন্টারপার্ট আপনাকে রিসিভ করবে। হবিগঞ্জের ট্রেন না-পেলেও আপনার অসুবিধে নেই। চাঁদপুরের স্টিমারে না-ঘুমিয়ে গবমেন্ট বাংলোতে ঘুমুবেন। তবু স্যার এটা তো রেগুলার লাইন না, ফেয়ারওয়েদার লাইন। কিছু হলে তো স্যার গবমেন্ট আমাকে বলতে পারে—তুমি এই সিজন্যাল লাইনে ওঁকে কেন পাঠালে।’
‘তুমি জবাব দিব্যা, উনি এই লাইন ছাড়া যাইতে অসম্মত হইছেন।
‘সে তো স্যার মিথ্যে কথা বলে চাকরি বাঁচবে—দায়িত্বটা তো আমার।
যোগেন চুপ করে এসডিওর দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু অপ্রস্তুতও বোধ করে। চশমাটা খুলে একবার ধুতির খোঁটে মোছে। এগুলো যোগেনের ব্যবহারিক মুদ্রা—যখন তাকে কোনো জেদ থেকে সরে আসতে হয়। এটা যোগেনের বড় গুণ যে সে কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজের মানসম্মান জড়িয়ে ফেলে না। কিন্তু এটাও যোগেনের চেহারা ও কথাবার্তার মস্ত সুবিধে যে তাকে খুব জেদি ও রাগী মনে হয়। তার পেছিয়ে আসাটাকে কেউ কৌশল ভাবে না।
যোগেন বলে, ‘আমি আমার কথাটা এড্ডু অ্যামেন্ড করতে চাই। সরকার যখন আমার টুরের এই অংশের দায়িত্ব তোমাকে দিয়েছেন, তুমি যা বলব্যা, একজন আইসিএস হিশাবে যা তোমার করণী কর্তব্য মনে কর, আমি তার অন্যথা করব না। দশ-বার ঘণ্টা আগেপরে পৌঁছানোর খুব একডা কিছু আসে যায় না।’ যোগেন থামে, এসডিও তাকিয়ে থাকেন—এটা বুঝে যে যোগেনের * কথা শেষ হয়নি।
‘কিন্তু অফিসার হিশাবে এডাও তো তোমার কাছে আমাগো প্রত্যাশা যে পুরানা কাউন্সিলের নমিনেটেড মেম্বার সব খানবাহাদুর—রায়বাহাদুর থিক্যা আমরা আলাদা রকমের পোলিটিক্যাল ওয়ার্কার। তুমি যে আমার তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর দরকারটাকে প্রায়োরিটি দিচ্ছ—সেডাই নিৰ্বাচিত শাসনের মূল কথা।’
স্টিমারঘাটায় নানা সাইজের লঞ্চ, বোট, গাদাবোট, দোতলা-তিনতলা স্টিমার যেন নদীটাকে আড়াল করে রাখে। নৌকোর জন্য আলাদা জেটি আছে—একটু দক্ষিণে। কিন্তু গহনার নৌকোগুলো সেখানে ভেড়ানো যায় না। গহনার নৌকো মানে তো এক গাদাবোট—রেলের স্টেশনের প্লাটফর্মের মতো। স্টিমার-লঞ্চকে তো আর পাকা রাস্তার গাড়ির মতো এক পাঁতিতে পাড় মুখো দাঁড় করানো যায় না। সেগুলোকে পাশাপাশি সার দিয়ে রাখতে হয়—নদীমুখো। গোয়ালন্দঘাটের পাড় থেকে আর নদী দেখা যাবে কী করে।
