৭৫. যোগেনের এমএলএগিরি : ঢাকা মেলে
ঢাকা মেল রানাঘাটে পৌঁছুবার অনেক আগেই যোগেন একেবারে গভীর ঘুমে নাক ডাকছে। ট্রেনের আওয়াজ সত্ত্বেও তার নাকডাকার আওয়াজ, কামরায় কেউ শোনার থাকলে, শুনে যেতে পারত। যোগেন তার সেই ওকালতির ব্যাগটাতে দুটো ধুতি আর পাঞ্জাবি ঢুকিয়ে নিয়েছিল আর ভাল করে পড়ার জন্য বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট অ্যামেন্ডমেন্টের একটা কপি। এখন অ্যাসেম্বলিতে তর্কবিতর্ক চলছে। সে তর্কবিতর্ক ধাঁধার চাইতে কঠিন। যে-বলছে, তার জমিদারি না জোতদারি, সে বড় জমিদার না ছোট জমিদার, সে বড় জোতদার না ছোট জোতদার, তার ভূসম্পত্তির জন্য সে কি সরাসরি ট্যাক্স আদায় করে, নাকী দখলিদারের আর তার মধ্যে আরো সব নানারকমের স্বত্বভোগী আছে সেই সব ব্যক্তিগত খবর না জানলে, সে-মেম্বারের কোনো কথার মানেই বোঝা যাবে না। সে কোন্ পার্টি আর সেই পার্টি কী বলে—সেসবের কোনো যোগাযোগই নেই। যোগেনের এ নিয়ে খুব স্বচ্ছ ধারণাই থাকা উচিত ছিল, কারণ, লোকে যেমন নির্বংশ হয়—তারা, সে ও তার পরিবার, সেইরকম নিজমি। এমন কী তাদের বাড়িতে জমিজমা নিয়ে কোনো পুরনো গল্পও নেই।
কিন্তু ঢাকা মেলের ফার্স্ট ক্লাশে স্প্রিঙের ওপর কয়েক তাক গদিবসানো সোফায় বসে, সে-ক্যুপে দ্বিতীয় কেউ নেই, দ্বিতীয় কারো জায়গাই নেই, বসে, আরাম করে পা-দুটো সোফায় তুলে কাগজটা চোখের সামনে ধরে বড়জোর খড়দা-সোদপুর পার হয়েছে কী হয়নি—কাগজ তার হাত থেকে খসে পড়ল মেঝেতে। যোগেন জেগে থাকার কোনো চেষ্টাই করল না—সে সোফায় এলিয়ে পড়ল, তারপর ঘুমের নিয়মেই তার শরীর ছড়িয়ে গেল ও কিছু পরে নাকও ডাকতে লাগল।
রানাঘাটে ঘুমটা হয়ত একটু চটেছিল, বা, হয়ত খিদেই পেয়েছিল, গার্ড এসে, ‘স্যার, স্যার’ বলে দু-একবার ডাকতেই যোগেন প্রথমে চোখ খুলল, গার্ডকে দেখে অবাক হল, একই দৃষ্টিতে সিলিঙের দিকে তাকাল ও তারও পর একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে কামরার দরজাটাও দেখতে হয়—সে কোথায় ও কেন সেটা মনে করলে। মনে করার পর যোগেন শান্তভাবেই উঠে বসে গার্ডের দিকে তাকায়। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, লম্বা, চোয়ালভাঙা লোকটি একটু নিচু হয়ে যোগেনের দিকে, ‘বেঙ্গল টেন্যাখি অ্যাক্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’–এর কাগজগুলো এগিয়ে দেয়। যেন যোগেন তাকে কাগজগুলো আনতেই বলেছিল, এমন ভঙ্গিতে যোগেন কাগজগুলো নিয়ে, কী কাগজ একবার দেখে নিয়ে পাশে রেখে দিল। গার্ড তখন তাকে বলে, ইংরেজিতেই, ‘স্যার, আপনার ডিনার কি সার্ভ করবে?’
যোগেন যেন সেই প্রশ্নের জবাবেই জিজ্ঞাসা করে, ‘এটা কোন্ স্টেশন?’
‘রানাঘাট স্যার। নৈহাটিতেও এসেছিলাম স্যার। আপনাকে ডিসটার্ব করিনি। রানাঘাটের পর কোনো স্টেশনে তো রেলওয়ে ক্যাটারিং সার্ভিস নেই। তাই…।’
‘হ্যাঁ। দিতে বলুন,’ যোগেন পা দিয়ে তার স্যান্ডেল খুঁজছিল।
‘এনি ড্রিঙ্ক স্যার?’
‘নো’, বলে যোগেন উঠে দাঁড়ায়—বাথরুমে যেতে। গার্ড দু-পা পেছিয়ে ঘুরে, ভিতরের একটা দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। যোগেন একটু অবাক হয়। ওদিক দিয়ে কোথায় গেল। ওখানে যে একটা দরজা আছে—যোগেন তা দেখেইনি। সে গার্ডের পিছু-পিছু গিয়ে বন্ধ দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে দরজাটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে। একটু সরু। এটা নিশ্চয়ই বাথরুমের দরজা হতে পারে না। যদি বাথরুমই হয়, তাহলে গার্ড এই দরজা খুলে যাবে কোথায়? গার্ডের বাথরুম পেতে পারে—এমন কিছু ভেবে যোগেন একটু অপেক্ষা করে হ্যান্ডেলটায় হাত দেয়। নিঃশব্দেই খুলতে চেয়েছিল যোগেন, দরজাটা নিঃশব্দেই খুলল কিন্তু রেলের ভারী দরজাটাকে টানতে হল। আর-একটা সরু ফাঁকা কামরা—রেলের যে-কামরা যোগেন চেনে। আর, চেনার পর যোগেন, কামরাটাকে আরো নির্ভুল চেনে—’অ্যাটেনড্যান্ট’ লেখা কামরা, প্ল্যাটফর্ম থেকে বরাবর দেখেছে, বড়-বড় মেল ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাশের সঙ্গে লাগানো থাকে।
যোগেন মাত্র এক পা পেছিয়ে তার কামরায় ঢুকে যায় ও ঐ দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
বাথরুমেই যেতে চাইছিল যোগেন, সেটার আন্দাজও পায়, ডানহাতি দরজাটাই হবে। কিন্তু বাঁদিকেও একটা দরজা দেওয়া। সেটা একটু খুলে কোনো কিছু ঝুলিয়ে রাখতে—পর্যন্ত বুঝে যোগেন নিশ্চিত হয়, শাহেবদের সুটটুটের জন্য।
এবার যোগেন বাথরুমে ঢোকে ও তাকে দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
তার সামনের উলটো দেয়ালের তলাটুকু জুড়ে ধবধবে শ্বেতপাথরের বাথটাব। তার মাথায় একটু উঁচুতে ভাঁজ করে রাখা ধবধবে কিছু তোয়ালে। একটা সাবানবাক্স। ঝকঝকে রুপোর দুটো কল। কলের মাথায় ইংরেজি হরফে ‘এইচ’ ও ‘সি’ পড়তেই যেন যোগেন ভিতরে ঢুকে দেখে, তার ডানহাতে শাদা শ্বেতপাথরের মুখধোয়ার জায়গা—ওপরে সেই ‘এইচ’ ও ‘সি’। আর বাঁয়ে, ওরকমই কিছু ঢাকনা ফেলা, জিনিশটার নাম ভুলে যাচ্ছে কিন্তু সেই আসনের পাশেই গোলাপি কাগজের একটা চাকতি—শাহেবদের হাগামোতার জায়গা—’কমোড’–মনে পড়ে যোগেনের।
যোগেনকে সেটা একটু ব্যবহার করতে হয়। সে মুখধোয়ার জায়গায় চোখেমুখে জল দেয়, সাবান দিয়ে হাত ধোয়, কুলকুচি করে ও মোছার জন্য কোঁচা তুলতে গিয়ে পাশের রেলিঙে ঝোলানো তোয়ালেটাই টেনে নেয় ও বেশ শুকনো করে মুখহাত মুছে সে তোয়ালেটা রেলিঙে আগের মতই ঝুলিয়ে রাখে—যাতে কোনো চিহ্ন না থাকে তার ব্যবহারের। দরজা খুলে বেরবার আগে, সে একটু অগোছালো করে দেয় তোয়ালেটাকে—সে যে ব্যবহার করেছে সেটা জানাতে।
হকশাহেবের সঙ্গে তো ফার্স্টক্লাশেই এসেছিল যোগেন, তখন দেখেনি এসব? কী করে দেখবে—সে তো সিঁটিয়ে ছিল বলির পাঁঠার মত। একবার বাথরুমে যেতে হয়েছিল, তাই কমোডটা চেনে। তাও বড় কর্ম হলে না-হয়, ঠেসে বসে দেখা যেত। ছোট কর্মে নিজের জলছাড়াটুকু দেখে কোনোরকমে বেরিয়ে এসেছিল।
যোগেন দেখে—একটা টেবিলে ধবধবে চাদরের ওপর ধবধবে চিনে মাটির বাটিগুলিতে তার ডিনার ঢাকা, টেবিলের সামনে একটা সোজাপিঠ কাঠের চেয়ার, নানারকমের চামচ একটা ছোট চৌকো ডালার ওপর সাজানো, একটা কাচের গ্লাশে একটা শাদা রুমাল ফুলদানির ফুলের মত। দু-জন পাগড়িপরা বেয়ারা একটু পেছনে দাঁড়িয়ে। এগুলো যে সুখাদ্য-সে-বিষয়ে মুহূর্তে নিশ্চিত হয়ে যায় যোগেন। টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থায় সে খুশি হয়—গদিতে এলিয়ে এগুলো খাওয়া যেত না। খাদ্যের দিকে তার মন চলে যাওয়ায়, এই সব অচেনা সাজসরঞ্জামের ব্যবহার নিয়ে তার সংকোচ যোগেনের মাথা থেকে একেবারে বেমালুম উপে যায়। সে দরজাটা খুলতেই এক বেয়ারা তার হাত থেকে নিয়ে সেকেন্ড-ব্র্যাকেট ঝোলানো ঘরে ঝুলিয়ে রেখে এল। যোগেন চেয়ারটা একটু কোনাচে করে নিয়ে বসে।
বেয়ারা তার সামনে একটা ছোট জামবাটি, পাশে একটা বড়গর্তের চামচ, সামনে তিন-চারটি ফুটোদানি সাজিয়ে একটা ফ্লাস্ক থেকে ধোঁয়াওঠা তরল ঢেলে বলে, ‘সুপ, স্যার’।
দু-চার চামচ খেতেই আরাম লাগে যোগেনের। সে বলে, ‘গোলমরিচ আছে না কী তোমাদের। একটু নুন দাও।’ একজন এগিয়ে এসে সামনের ফুটোদানিগুলো থেকে একটা তুলে সুপের ওপর ঝাঁকায় কিন্তু ফুটো দিয়ে কিছু পড়ে না। বেয়ারা তাড়াতাড়ি দানির পেছনটা খুলে সুপের ওপর এনে জিগগেস করে—’কতটা দেব স্যার?’
‘ওভাবে তো আন্দাজ পাইবো না। বেশি পইড়্যা গেলে নুনে পোড়া হয়্যা যাবে। দুই চিমটি দাও তো আগে’, বাঁহাতের দুটো আঙুলে যোগেন চিমটি বোঝায়। একটা লম্বা হুইসলের শেষ দিকে ট্রেনটা ধীরে-ধীরে নড়ে উঠে চাকার আওয়াজ তোলে। ছোট একটি চামচের হাতলের গোড়াটুকু দিয়ে নুন তুলে বেয়ারাটি যোগেনকে দেখায়, ‘স্যার, দিব?’
‘হ্যাঁ, দ্যাও, বাঃ, তোমার তো বুদ্ধি আছে।’
সুপ পুরোটা খেল না যোগেন। সে চামচেটা বাটিতে রেখে দিতেই বেয়ারা সরিয়ে নিয়ে গেল, আর-একজন একটা ডালার ওপরের কাগজের ঢাকনা খুলে নতুন ডিশ এগিয়ে দিল। চাচার জোড়া কাটলেট। প্রায় উলটোদিকেই, প্যারী ডাক্তারের বাড়ির। ইচ্ছে করলে উলটোদিকের ফুটে গিয়ে গন্ধও টানা যায়। চিরকালের সেই আকাঙ্ক্ষা মিটছে আজ, ঢাকা মেলের ফার্স্ট ক্লাশের সুবাদে। কিন্তু চাচা তো ফার্স্ট ক্লাশের নয়, বড়জোর ইনটার ক্লাশের। ফার্স্ট ক্লাশের কাটলেটের গন্ধও যোগেন শুঁকেছে, সেটা সবটা কাটলেটেরই গন্ধ কী না, তা যোগেন বলতে পারবে না। বরং এইটুকু বলা যায়, যেসব গন্ধের সঙ্গে ভাল পাউরুটি, টোস্ট, মাখন, বিস্কুট, চপ, কাটলেট জড়ানো, সেসব গন্ধ যোগেনের নাকে এসেছে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলকে বাঁ হাতে রেখে ঘুরলে আর ফারপো-র পাশ দিয়ে যেতে। সেগুলোই তো ফার্স্ট ক্লাশের হওয়া উচিত।
অথচ যোগেন নিজের সম্মানের খাতিরেই তার সামনের এই ডিশজোড়া কাটলেটদুটিকে কিছুতেই চাচার কাটলেটের ওপরে তুলতে চায় না। ঢাকা মেলের ফার্স্ট ক্লাশে দিয়েছে বলেই শাহেবসুবোদের হোটেল থেকে আসতে হবে? চাচা নয় কেন? হেদোয় বলে?
এই কাটলেটটার একটুও তো সে এখনো মুখে দেয়নি। তবু যে নিজের সঙ্গে তর্কবিতর্কে জুড়ে যায় তার কারণ যোগেন এমন একটা অনুচ্চারিত, বাড়তি অথচ আসল যুক্তিটা শুনতে পাচ্ছিল—খেয়েছে তো বড়জোর চাচার হোটেলের কাটলেট, ও কী করে কাটলেট বুঝবে?
বেয়ারাটিকে যোগেন জিগগেস করে বসে, ‘ভাই এডডু কাসুন্দি দিবা? এত সুন্দর কাটলেটটার অযত্ন ইচ্ছা করে না।’
বেয়ারা বলে ওঠে, ‘কাসুন্দি তো আমরা রাহি না। শাহেবরা তো কাসুন্দি জানেই না। তবে স্যার শাহেবগোর কাসুন্দি আছে, মাসটার্ড। মাসটার্ড স্যার?’
‘তুমি তো রোজই কত শাহেবসুবারে খাওয়াচ্ছ। তোমার কথা ভুল হওয়ার না। হ্যাঁ, আনো দেখি।’
‘আপনার ঝাল বেশি না তো স্যার? তাইলে ভাল সস আছে হল্যান্ডের—’
‘হল্যান্ডের?’ যোগেন অন্য কোনো দেশের নাম করতে চায়, কিন্তু মাস্টার্ড, হল্যান্ড—এমন কোনো নাম তার মনে এল না। সে বলল, ‘আমি তো বরিশালের পোলা। তার থিক্যাও ঝা-ল? এডডু বেশি কইর্যা আনো—মাস্টার্ড।’ বেয়ারাটি বেরিয়ে গেল!
আর-একজন যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকেই বলে, ‘আমার স্যার ফেনি।’
‘দেহ কাণ্ড! ফেনির পোলা জাহাজে না-ভাইস্যা রেলের চাকায় গড়গড়ায় ক্যান?’
‘জাহাজ ধইরলে অনেক দিন দ্যাশে আসা যায় না, স্যার। আপনারে দেইখ্যা স্যার আমাগো খুব ভাল লাইগছে।’
‘খাইছে। জামাই করবানি? মাইয়া কত বড়?’
মাস্টার্ড ঢোকে। বেয়ারাটি তখন বলে যাচ্ছে, ‘না, স্যার, সেইসব কথা না। ধুতিপরা বাবুরা তো কেউ ফার্স্টক্লাশে যায় না।’
‘স্যার, আলাদা ডিশে দেই। আগে আঙ্গুলে, লাগাইয়্যা চাইখ্যা নেন। শ্যাষে আপনার কষ্ট হবে নে।’
যোগেন এক আঙুলে খানিকটা মাস্টার্ড নিয়ে চাখে। স্বাদটা ঠিক বুঝতে না পেরে আবার একবার চাখে। তারপর হেসে বলে, ‘তুমি নি মাস্টার্ড আনার নামে পোড়াবাড়ির চমচম আইনছ?’
বেয়ারাটি হাসিমুখে কাটলেটের ডিশটা টেনে নিয়ে বলে, ‘আমি মাখাইয়্যা দেই স্যার! আপনি আবার চ্যাটাইয়া ফেইলবেন। তারপর আবার সেই আঙ্গুল চোক্ষে দিবেন।’
‘দিব্যার চাহ তো দ্যাও! তবে তুমি বাবা অ্যাডডু বেশি ডর খাওয়াইল্যা—তোমার মাস্টার্ড নিয়্যা।’
‘কইল্যাম—না, স্যার আপনারে ফার্স্টক্লাশে দেইখ্যা আমাগো খুব ভাল লাইগছে। ধুতিপরা কেউ তো উঠে না।’
‘ফার্স্টক্লাশের টিকিডের দাম জানো? ‘ধুতিতে কুলায় না?’
‘যতই দাম হোক। আমাগো বামুন-কায়েতগো মইধ্যে তো কত জমিদার। তা না স্যার। রেইল কোম্পানিই টিকিট দ্যায় না, কয়—যে সব ভর্তি।’
কাটলেটটাতে একটা কামড় দিয়ে বড় স্বাদ পায় যোগেন। সেই স্বাদটা সে মুখের ভিতরে মাখিয়ে নিতে চায়।
‘রেলকোম্পানিরে না-বেচা টিকিটের উপর চক্রবৃদ্ধি দেয় কেডা? টিকেট না বেচলে ক্ষতিডা কার?’
‘লাভক্ষতির কথা না স্যার। এই ট্রেনডায় তো কাছার-সিলেটের চা-বাগানের শাহেবরাই বেশি যাতায়াত করে-বর্ষার কয়েকমাস বাদ দিলে। শাহেবরা স্যার কোনো বাঙালির সঙ্গে যাব্যার চায় না।’
‘ডরও খায় বুঝি, শাহেবরা।’
‘বাঙালি যদি বোমা মারে কী গুলি করে। পিট্যাইবারও পারে। বাঙালি জমিদারবাবুরাও তাই এই গাড়িতে স্যার সেকেন্ড ক্লাশেই যায়। খুইলন্যা লাইনে স্যার এই সব ঝামেলা নাই।
‘ঝামলা কও কোনডারে? শাহেবরে না জমিদাররে?
‘ঐ লাইনে স্যার জমিদারবাবুরা ফার্স্টক্ল্যাশেই যান। শাহেব নাই তো। খুইলন্যা লাইনে।’
‘তাইলে তো মাস্টার্ডও নাই। তোমরা কিন্তু খাওয়াইল্যা ভাল। এমন কাটলেট কি খুলনা লাইনে হয়? তাই শাহেবরা আইস্যা তোমাগো এই ট্রেনে ভিড় করে। কাটলেটটা কীসের ছিল?’
‘মাটন স্যার। আমাগো কি ধর্মবুদ্ধি নাই যে বামুন-কায়েতগো ফাউল দিব?’
‘আরে, আমারে তোমরা বাউন ঠ্যাওর্যালা? আমি তো নমশূদ্র।’
এরমধ্যে এক বেয়ারা লম্বা-লম্বা আলুভাজায় ঢাকা একটা ডিশ নিয়ে এল। ওপরে গাওয়া-ঘি-র রঙের কিছু লেপা। খুব লোভনীয় একটা গন্ধ বেরোচ্ছিল, ‘স্যার, মাখাইয়্যা দিল্যাম স্যার হল্যান্ড সস। দ্যাহেন টেস্ট ক্যামন?
‘বস্তুডা কী সেইজ কও, শ্যাষে তোমাগো হাতে জাইত খোয়াই? এর মধ্যেই সে-কৰ্ম্ম হইয়্যা গেল নাহি কে জানে?
‘এডা স্যার, রাইস উইথ ফেরেঞ্চ ফিগার—
‘ও। রাইস তো। জাইত কইল্যা না?
‘আমি তো স্যার ফরিদপুরের। ও স্যার ফেনি-র।’
‘সে তো দুইডা জায়গার নাম। ফরিদপুর আর ফেনি বইল্যা কুনো জাইত আছে বইল্যা তো শোনা নাই।’
‘জায়গার নাম শুইনলেই তো স্যার জাইত জানা যায়। ফেনির লোক হইলেই মুসলমান। আর ফরিদপুর হইলে কায়েত।’
ফেনির লোকটি বলে, ‘হিন্দুই যহন সাইজলি, আধাআধি হবি ক্যা। তার থিক্যা বল্–বামুন।’ যোগেন ফরিদপুরের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার বাপও তো কায়েত ছিল? নিয়মমত তো তাই হব্যার লাগে। কায়াতের পোলা না হইলে তো কায়েত হয় না।’
‘আমার বাবার যে মাথাগোনা হইছিল, ধরেন, বছর পাঁচ-সাত আগে, তাতে বাবা কায়েত লেখায় নাই। কিন্তু তার বছর-দশ আগে যে মাথাগোনা হইছিল, তাতে আমার ঠাকুরদাদা কায়েতই লিখাইছিল। কায়েতের নাতি হইলে তো স্যার কায়েত হবার পারে। এই, সুইটডিশটা আন্। স্যার, হাতড়া ধুইয়্যা আইসবেন-না?’
‘হয়। ধুই। মিষ্টি তো চামুচেই খাওয়া যায়, যোগেন বাথরুমের দিকে পা-বাড়াতেই এক বেয়ারা দরজা খুলে ধরে থাকে। দরজাটা আর বন্ধ করে না যোগেন। সে ভাল করেই হাতমুখ ও মুখবিবর ধুয়ে তোয়ালেটা দিয়ে মুছতে-মুছতে বেরিয়ে আসে—একেবারে শেষে—সে নাকও ঝাড়ে তোয়ালেটায়। তোয়ালেটা এক বেয়ারার হাতে দিয়ে দেয়।
যোগেন দেখে টেবিলে একটা গর্তওয়ালা ডিশে দুটো রসগোল্লা—বড় সাইজের। আর-একটা হাতের তেলোর সাইজের লম্বা ডিশে হলদে মিষ্টি একটা, শোয়ানো।
‘কোন্ডা আগে খাব, কয়্যা দ্যাও’–
‘রসগোল্লাডাই আগে খান স্যার, নাইলে তো সরপুইর্যার বাদে মিষ্টি কম লাইগবার পারে।’
‘ও! এইডাই সরপুরিয়া। জগৎবিখ্যাত। দ্যাহ, ধরো, আমার বরিশাল, কী তোমাগো ফেনি-ফরিদপুরের এই এমন অমৃতের নাগাল মিষ্টি কেউ বানাবার পারে।’
‘ক্যা স্যার? পোড়াদার চমচম?’
‘এর কাছে?’
‘ক্যা স্যার? নাটোরের কাঁচাগোল্লা।’
‘এইডা কইব্যার পার—সমানে-সমানে।’
‘ঈশ্বরদির দই’–
‘ক্ষেমা দ্যাও ভাই। তোমাগ জিভ আমার জিভের নাগালই, ঠাকুরদাদার ঠাকুরদাদার টাইম থিক্যা শুখাইয়া গিছে। ঐ জিভে এই মিষ্টির স্বাদ পাওয়া যায়?’
যোগেনের মিষ্টি খাওয়া শেষ হতে-না-হতেই ওরা ক্ষিপ্র হাতে যোগেনের বিছানা পেতে দেয়। চাদর পাতার ভাজাভাজি আছে। এক ভাঁজ না-ভেঙে, আর-এক ভাঁজের ভিতরে ঢুকে যেতে হবে।
‘স্যার, যহন যা দরকার ডাইকবেন। আমরা পাশের ঘরেই আছি। নাহি দরজা আগলাইয়া রাইখবেন?’
‘শাহেবরা কী করে?’
‘পাইরলে আরো দুইডা দরজা বসায়—কত গুলান ভয়—বোমা, গুলি, পিটাইনি।’
‘তাইলে আলগাই থাক—তোমাগোর মইধ্যে একজন তো আবার কুলীন-কায়েত—তারও তো ডর আছে–দ্যাহ সে কী কয়। আর-একজন, মুসলমান আর আমি নমশুদ্দুর। আমাগ ডর নাই।’
গাড়ি গোয়ালন্দে এল সকাল সোয়া ছটায়। যোগেনের ঘুম ভেঙেছে সাড়ে পাঁচটায়। বাথরুমটাথরুম সেরে, চুলটা আঙুলে আঁচড়ে, স্নান করবে কী করবে না দ্বিধা করে। কেন খামোখা স্নান করবে রাত না-পোহাতেই? সেরকম করে না যে কখনোসখনো, তাও তো নয়। গরমজলের কলটা খুলে জল সত্যিই গরম কী না পরীক্ষা করে। গরম। তাহলে তো স্নানের বিপক্ষে কোনো যুক্তিই নেই। কেন, যোগেন আবার গরমজল ধরল কবে?
চলাফেরার সময় সকালে স্নান সেরে বেরলে শরীর মন ভালও থাকে। জল যখন গরমই।
যোগেন এখান থেকে উলটো কথা ধরে।
জল যখন গরম তখন তো স্নানের কথা আসেই না—এত কিছু করে ও ভেবে ও না-করে যোগেন তার আসনে এসে বসে-পা-দুটো সামনে ছড়িয়ে। তার বাঁ-হাতি জানলাটা খুলতে থাকে—প্রথমে কাচেরটা, তারপর জালেরটা, তারপর কাঠেরটা খুলতেই হু হু বাতাস যেন ঝড় তোলে—পদ্মার দিক থেকে। যত গরমই পড়ুক, নদীর পাড়ে, বিশেষ করে পদ্মার মত বড় নদীর পাড়ে ঠান্ডা বাতাসে শিউরে যেতেই হবে। যোগেন কাচের জানলাটা নামাতে গিয়ে কাঠের জানলাটা নামিয়ে ফেললে কামরাটা আবছা আঁধার হয়ে যায়। যোগেনের অস্বস্তি হয়—তাহলে তার ঘুম থেকে জেগেওঠাটা বৃথাই গেল। সে তখন বাঁ-হাঁটুটা গদির ওপর ভেঙে এবার দু-হাতে কাঠের জানলাটা তুলে কাচের জানলা নামিয়ে তার সাপ্লিমেন্টারি বাজেটটা চোখের সামনে মেলে ধরে। আগেও দেখেছে, এ নিয়ে কথাবার্তাও হয়েছে কিন্তু পুরো প্রদেশে তপশিলিদের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। এ তো নামরক্ষা মাত্র। গ্রামের স্কুলে তপশিলি ছাত্রদের মাইনে মকুব করার জন্য যোগেন প্রস্তাব দিয়েছিল। তর্কাতর্কিতে সবাইই বলল—যে পারে সে কেন মাইনে দেবে না। আবার, পুলিন মল্লিক বক্তৃতা করল—এরকম ফ্রি করে দিলে তো যাঁরা মাইনে দিতে চান ও পারেন তাঁরা অপমানিত বোধ করবেন। পুলিন মল্লিক মোক্ষম যুক্তিটা দিয়েছিল যে, কতকগুলি জনগোষ্ঠীকে একটা লিস্টে ঢোকানোর অর্থ তো এটা নয় যে, সেই জাতের সবাই অশিক্ষিত, বন্য, জংলি বা বর্বর। শিডিউলের অর্থ—যোগ্যতা সত্ত্বেও তারা চাকরিবাকরিতে কী লোক্যাল বোর্ডে নিযুক্ত হতে না-পারার বাধা দূর করা।
ব্যস, সবাই পুলিন মল্লিকের কথায় সায় দিল। ঠিক হল—ছাত্রের পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যোগেন চিৎকার করে বলে—তাহলে নতুনটা কী হল, এখনো তো তাই হয়। সবার কানেই কথাটা যে পৌঁছুল সেটা বোঝা গেল বটে, কিন্তু সেটা যোগেনের গলার জোরে।
