১০
2 of 4

৭৪. যোগেনের এমএলএগিরি : বড়বাবুর সঙ্গে

৭৪. যোগেনের এমএলএগিরি : বড়বাবুর সঙ্গে

শাদা লংক্লথের ফুলশার্ট, হাতায় বোতাম আঁটা, মালকোঁচা ধুতি ও কাবলি স্যান্ডালে যিনি এলেন তিনি পালিতবাবু ছাড়া কেউ হতেই পারে না। পালিতবাবু বসেন না। হোম যোগেনের দিকে হাত দেখিয়ে বলেন, ‘মিস্টার জে এন মণ্ডল এমএলএ। উনি আজ সন্ধ্যার কোনো ট্রেনে সিলেটের জন্য রওনা হবেন। মানে; আমরা ওঁকে অনুরোধ করেছি। উনি সঙ্গে-সঙ্গে দয়া করে রাজি হয়েছেন। ওঁকে পৌঁছুতে হবে হবিগঞ্জে অত্যন্ত দরকারি সরকারি কাজে—আসাম ও দিল্লিও জড়িয়ে আছে। এত কথা বলছি এই কারণে যে, এমএলএদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের এখনো হয়নি বলে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়ে যায়। এটা যেসব এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এরিয়ার মধ্য দিয়ে উনি যাবেন, মানে ওঁকে যেতে হবে সেসব জায়গার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেডকে জানিয়ে দেবেন আমার নামে।’

পালিতবাবু যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোন্ ট্রেনে যাবেন স্যার?’

‘দেখুন, কোন্ ট্রেনে যাওয়া যায়? ঢাকা মেল হলেই ভাল।’

‘ঢাকা মেলেই হবে স্যার। এ তো আমাদের রিকিউজিশন।’

হোম বললেন, ‘একটা গাড়ি নিয়ে ওঁর বাড়ি হয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেয়া যাবে না?’

নিজের ক্ষমতার ভিতর থেকে পালিতবাবু বলেন, ‘নিশ্চয়ই হবে স্যার। টেলিগ্রামগুলো পাঠিয়ে আমি ওঁকে নিয়ে বেরব।’ যোগেনকে বলেন, ‘আপনি তাহলে চলুন, আমাদের ওখানে—’ যোগেন অপ্রস্তুত উঠে পড়ে বেরিয়ে আসে, ‘এটা স্যার কী বলছেন? ঢাকা মেল ধরতে সঙ্গে লোক?’

হোম হেসে হাত নাড়ান আর পালিতবাবুর পেছন-পেছন যোগেন শাহেবের পি-এর ঘরের ফালিতে ঢুকে দোলাদরজা ঠেলে রাইটার্সের বিখ্যাত দোতলার বারান্দায় পড়ে। সামনে ডালহৌসি স্কোয়ারের জল পাড়ের গাছের ছায়ায় সবুজ হয়ে আছে আর দক্ষিণে আরো নানা সবুজে যোগেন চিনে ফেলে ইডেন। একটু হাসেও—চিরকাল ঐ জায়গাগুলিতে দাঁড়িয়ে রাইটার্স দেখেছে, আজ রাইটার্স থেকে ঐ জায়গাগুলি দেখছে। যোগেনের বাঁয়ে একটার পর একটা সিংদরোজার পাশে দেয়ালে ঝকঝকে পিতলের নেমপ্লেটে ইংরেজি হস্তলিপির লতানে বাহার। নামগুলি পড়া যায় না, শুধু ‘সেক্রেটারি’ আর ‘আইসিএস’ পড়া যায়। দুটোতে দেখল অতিরিক্ত বিএ (ক্যান্টার) আর বিএ (অক্সফোর্ড)। একটা নামের শেষটুকু পড়তে পারল ‘উল্লা’।

‘এখানে কি সেক্রেটারিরা বসেন?’

‘কমিশনাররাও বসেন। মন্ত্রীরা ঐ দিকের শেষে আর পেছন দিকের শেষে। তবে মন্ত্রীদের নেমপ্লেটগুলো পিতলের নয়, কাঠের।’

‘কেন?’

‘বদলায় তো!’ পালিতবাবু গলাটা নামিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘এইটা মিস্টার সিম্পসনের ঘর ছিল, আইজি অব প্রিজনস, তিনজন টেররিস্ট সোজা ওর ঘরে ঢুকে গুলি করল—না, বছর সাত আগে? এই করিডর দিয়েই দৌড়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্টের ঘরে ঢুকেছিল। টেগার্ট ছিল না ঘরে, বেঁচে গেল। একজন টেররিস্ট এখানেই মরে গেল। আর-একজন শুনেছি হাসপাতালে। একজনেরই ফাঁসি হল।’

যোগেন যেসব কথা শুনতে পেল, তা নয়। আর রাইটার্সের সেই বিপ্লবী যুদ্ধের কথা সে এতটা জানেই না যে-যেটুকু জানে না, সেটুকু ভরে নিতে পারবে। সেদিনকার বিক্ষোভ তাহলে ছিল যে-বিপ্লবীদের ফাঁসি না দিয়ে আন্দামানে পাঠানো হয়েছে। এসবও তার অর্ধেক শোনা কথা। কিন্তু সেদিনের বিক্ষোভের লক্ষ তো ছিল সে-ও। সে জেনে নিল না কেন? চোখের সামনে সেই ঘরগুলো দেখে যোগেনের চোখের সামনে বিপ্লব ও যুদ্ধ ধারণাটা সত্য হয়ে উঠল।

পাশের একটা প্যাসেজে দুই রাইফেলধারীর মাঝখান দিয়ে পেছনের একটা সরু বারান্দায় পড়ে ওদের বাঁয়ে ঘুরতে হল। পালিতবাবুর গলাও একটু উঁচু হয়, ‘শাহেবরা খুব ভয় পেয়ে গেছে তখন থেকেই। ভাব দেখায়—এসব কেয়ার করে না। কিন্তু কোনো এদেশী ভিড়ের কাছাকাছিও যায় না। কাল লোক দেখলেই যেন ভূত দেখে। ভূতই তো। কার ওপর টেররিস্ট কখন ঝাঁপাবে কিছু ঠিক আছে? মরতে ভয় পায় না, এমন ভূত দেখে কে আর ভয় না পাবে?’

‘সে তো বটেই। প্রাণের ভয় আর কার নেই। তাও সেগুলো তো জানা ভয়—এই নদীতে এইখানে ডাকাতি হয়, এই রাস্তার ঐ মাঠে একটা ব্রহ্মদৈত্য থাকে। কিন্তু কে কোথায় আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে—এমন আন্দাজি ভয়ে তো ভয় পেতে-পেতে মরেই যেতে হয়’। যোগেন আচমকা থেমে গেল। মনে হল সে তার অজ্ঞানতা ঢাকতে পারছে না। এমন অজ্ঞানতা অপরাধ কী না, যোগেন জানেই না। ৩০ থেকে ৩৫ তো সে কলকাতাতেই থাকে—আইন পড়তে, আর্টিক্লড থাকতে। সে যে-সমাজে বাস করে, প্রতিদিন চলাফেরা করে সেই সমাজের কারো কাছ থেকেও তো সে শোনেনি।

‘তিরিশ-একত্রিশ থেকে শাহেব-মারার ধুম লেগে গিয়েছিল। চট্টগ্রাম। আলিপুরের সেসনজজ গার্লিক। মেদিনীপুরের ডিএম, ডগলাস। গভর্নর স্যাকশন—মরেনি অবিশ্যি। এই গভর্নর অ্যানডারসন-

‘এই, আমাদের লাটশাহেব?’

‘হ্যাঁ―আ। লেবঙে। দার্জিলিঙে গুলি মারল না? বছর তিন আগে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, লোকে তো বলে ডান পাঁজরে নাকী একটা গুলি বিঁধে আছে। বের করতে পারেনি। খুব ভয় পায়। এখনো।

‘এই লাটশাহেব? এই-যে আমাদের অ্যাসেম্বলিতে স্পিচ দিলেন? এই গভর্নর?’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। আপনি জিজ্ঞাসা করছিলেন না কে কোথায় বসে। সেসব রাইটার্সে আর ঠিক নেই। একজনের নেমপ্লেটে আর-একজন বসে। নতুন সব দরজা বসেছে। আগে তো রাইটার্স গমগম করত। কত লোক আসত। এক শাহেবের গল্প আছে, কী নাম ঠিক জানি না। বদলাতে-বদলাতে এখন মুলাশাহেবে দাঁড়িয়েছে। চিফ সেক্রেটারি ছিলেন, উনি নাকী শীতকালে রাইটার্সের ঐ বারান্দায় রোদ পোয়াতে-পোয়াতে অফিস করতেন। একদিন নাকী ওপর থেকে দেখেন ড্যালহৌসি স্কোয়্যারে বাঁদর নাচ হচ্ছে। সঙ্গে-সঙ্গে দুই বেয়ারা পাঠিয়ে বাঁদরওয়ালাকে ওপরে আনান। তারপর রাইটার্সের বারান্দায় সেই বাঁদরওয়ালার ডুগডুগিসহ বাঁদর নাচ। সারা রাইটার্স ভেঙে পড়েছে দেখতে—’

‘কদ্দিন আগের কথা?’

‘সে বলা মুশকিল। শাহেবের নামটাই বদলে গেছে। এই ঘরে স্যার’, বলে বাঁদিকের ঘরটাতে ঢুকলেন। এটা যোগেনের চেনা—এরকম ঘর। তিনটি আলমারির পেছন দিয়ে একটা আড়াল। আলমারির মাথায়, টেবিলের ওপর, মেঝের ওপর শুধু কাগজ, শুধু কাগজ, ধুলোপড়া ছাইরঙা কাগজ।

‘চা খাবেন, স্যার?’

‘না থাক–’

‘এ স্যার সেক্রেটারির ঘর না যে পরের ভিজিটার এসে আগের ভিজিটারের জন্য বলা চা খাবেন। তাও ঠান্ডা। এটা স্যার, রাইটার্সের পাবলিক এরিয়া। বলা মাত্র ধোঁয়া বেরনো চা। ল্যাংচার সাইজও স্যার, স্পেশ্যাল। বলে আসছি, স্যার।’ পালিতবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর যোগেন যেন একটু থিতু হতে পারে। হোমের ঘরে তার হঠাৎ মনে হয়ে গিয়েছিল, তাকে ইচ্ছে করেই নিজের সঙ্গে নিয়ে এলেন পালিতবাবু, হোমকে রিলিফ দিতে। কিন্তু তখন পালিত, তাকে ‘স্যার’ বলেনি। সে মণ্ডল বলে? পরে অবিশ্যি ‘স্যার’, ‘স্যার’ করেছে এতবার যে ঐ সন্দেহটা আর ঢেঁকানো যায় না।

ঐ শাহেব খুনের গল্প শুনতে-শুনতে আরো একটা কারণে মনে হয়েছিল যোগেনের যে সে মণ্ডল বলেই এই বীরত্বের অংশ তো নয়ই, এমনকী সেই ইতিহাসের শ্রোতাও নয়। নিজেকে তার নিরবলম্ব ঠেকা থেকে বাঁচাতে পারছিল না।

একেবারেই আচমকা লাটশাহেব অ্যানডারসনের গুলিখাওয়া ও ভয়পাওয়ার ঘটনা জেনে ফেলায় যেন মাসখানেক-মাসদেড়েক আগের ২৯ জুলাইয়ের ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’–ধ্বনিত চেম্বারে শান্ত বক্তৃতার শেষে হঠাৎ সদস্যদের দিকে পেছন ফিরে লাটশাহেবের অবোধ্য ও চিৎকৃত ভয়ের অন্ধকার যোগেনের চোখে বিদ্যুদাঘাতে চিরে যায়। যোগেন স্বস্তি পায় কেন যে লাটশাহেবের ভয় পাওয়ার কারণের মধ্যে সেও আছে। ‘মণ্ডল’ বলে সে অচ্ছুৎ নয়, শাহেবের ত্রাস হিশেবে। পালিতবাবু ফিরে আসতে-আসতে যোগেন স্বস্থ হয়।

‘নতুন ‘রুলস অব বিজনেস’

‘তো এসে গেছে। আপনারা পেয়েছেন তো?’

‘পেয়েছি তো। রুলস অব বিজনেসের খোঁজ পড়ে তো গোলমালের সময়। বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়্যালের সময় রুলস দেখে কে?’

‘আমার তো স্যার, পঁচিশ বছর হল সার্ভিস, তার মধ্যে সেক্রেটারিয়েটে সাত বছর। আমাদের এতরকম কাজ, এতরকমের অর্ডার, এত আইনকানুন, দিনেদিনেই বাড়ছে, তাছাড়া কোর্ট এখন স্টে-অর্ডার দিচ্ছে ঘনঘন, যে, বিজনেস ইউজুয়্যাল বলতে কিছু আর নেই। সবই আনইউজুয়্যাল। তাছাড়া কাজের এফিসিয়েনসিও কমে যাচ্ছে, স্যার।’

পালিতবাবু একটা শাদা কাগজে কালি দিয়ে লিখতে লাগলেন, হ্যান্ডেল কলমের নিব দোয়াতে ডুবিয়ে-ডুবিয়ে। যোগেন বসে থাকল। লেখা শেষ করে পালিতবাবু বললেন, ‘টেলিগ্রামটা একটু শুনুন স্যার। মিস্টার যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, মেম্বার, বিপিএলএ, ইজ অন ট্যুর ইন সিলেট, হবিগঞ্জ অ্যান্ড নেইবারিং এরিয়াজ টু রেসটোর কমিউন্যাল হার্মনি। গবমেন্ট কনসিডারস ইট এ ভেরি ইমপট্যান্ট ইভেন্ট। মিস্টার মণ্ডল বি রিসিভড ইন কিশোরগঞ্জ অর হবিগঞ্জ অ্যান্ড হি বি গিভন ভেহিকলস, অ্যাকোমেডেশন, অ্যান্ড অল সাচ আদার হেল্প অ্যাজ হি আসক্স ফর…’

‘এর আর ঠিক-বেঠিক কী? গবমেন্ট অর্ডার-

‘সেটাই তো বলছিলাম স্যার। এটা গবমেন্ট অর্ডার। কিন্তু আপনি ধরুন কিশোরগঞ্জ বা হবিগঞ্জে না নেমে সিলেটে নামলেন এবং কোনো অফিসার সেখানে আপনাকে রিসিভ করার জন্য থাকল না। পরে, আমরা যখন এখান থেকে জানতে চাইব—কেন ছিল না। সঙ্গে-সঙ্গে ওদিক থেকে জবাব আসবে-অর্ডারে সিলেটের নাম ছিল না।’

পালিতবাবু একজনকে ডেকেছিলেন।

সে এলে তাকে কাগজটা দিয়ে বললেন, ‘সুখময়, এটা একটু টরেটক্কা করে দাও ভাই। একটু জানিয়ে যেও। অ্যাঁ?’

‘এই টেলিগ্রামটা চলে গেছে জেনে আমরা বেরিয়ে যাব স্যার। শেষে দেখলেন, আপনি পৌঁছুলেন কিন্তু টেলিগ্রাম পৌঁছুল না। সু—খ—ম—য়।’

সুখময় কাগজটা হাতে ঝুলিয়েই ঢোকে।

পালিতবাবু বললেন, হাত বাড়িয়ে, ‘এইখানে একটু যোগ করে দাও ভাই, ভেহিক্‌ল-এর পর অ্যান্ড প্যাসেজেস ইন রেলওয়েজ অ্যান্ড রিভারওয়েজ।

পালিতবাবু নিজেই লিখে দিলেন। সুখময় চলে যাওয়ার পর যোগেন একটু সশব্দ হেসে বলেন, ‘আপনাদের এখানে তো দেখছি উকিলমোক্তার ছাড়া কেউ চাকরি পাবে না—’

‘দিনে-দিনে এরকম হচ্ছে স্যার। একেকটা প্রেসিডেন্স তৈরি হয় আর কাজ বাড়ে। আগে তো সুখময়কে ডেকে বললেই হত—এই ব্যাপারে একটা টেলিগ্রাম পাঠাও। ও নিজেই ড্রাফট করে পাঠিয়ে দিত। এ তো বাঁধা লব্‌জ, পারবে না কেন? আমাদের ডিপার্টমেন্টেই একটা খুব খারাপ ভুলের ফলে খুব গোলমাল বেধেছিল। তাতে অপারেটার বলল, ড্রাফটে ছিল না। দেখাও ড্রাফট। তখন আর ড্রাফট কোথায়? ব্যস, রুল হয়ে গেল, অপারেটারকে যিনি বলবেন তিনিই সই করে ড্রাফটটা দেবেন। তিনমাস পর্যন্ত ড্রাফট থাকে এখন। শাহেবরা এখন সবকিছুতেই পলিটিকস আর টেররিজমের ভয় পায়। রিজার্ভেশন কোটায় চাকরি হওয়ার পর এই ইনএফিসিয়েনসি বেড়ে গেছে স্যার।’

‘এটা বোধহয় ভুল ধারণা আপনাদের। শতাংশের অনুপাতে মুসলিম বা তপশিলিরা যে-চাকরি পান, সেখানে জিওফিও যায় না।’

‘ওদের কোনো ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন নেই তো স্যার। আমরা তো জন্মের পর থেকেই শিখি— অর্ডার, সার্কুলার, স্টেটমেন্ট, অন অ্যাকাউন্ট—এইসব।’

‘মানে—আপনারা এখন গবমেন্ট ছাড়া চাকরি করতে পারবেন না। আর ঐ কোটার প্রার্থীরা কোনো গবমেন্ট চাকরি পাবে না।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *