৬৯. আইনসভায় গভর্নরের ভাষণ
শেষপর্যন্ত যোগেন দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই ঢুকতে পারে। তারপরও কেউ-কেউ ঢুকেছে। নিজের জায়গা খুঁজে বসতে-বসতেই সে হাঁফ ছাড়ে। অন্যদিন কেমন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আসে, আর আজই কী না বৃষ্টি, রাজবন্দী, পুলিশ, ধুতিতে কাদা, যা হোক, শেষ পর্যন্ত তো পৌঁছে যেতে পেরেছে। অ্যাসেম্বলির আলোগুলো একটু অন্যরকম—এখন সেটা অভ্যেস এসে গেছে। এই যুক্ত অধিবেশনেরা আলোগুলো আরো অন্যরকম। আলোছায়ার একটু ব্যবধান আছে। স্পিকারের শূন্য চেয়ারটার ওপর, যেখানে দাঁড়িয়ে লাটশাহেব তাঁর ভাষণ পড়বেন ফাঁকা সেই লেকটার্নটার ওপর উজ্জ্বল আলো। বাকি ঘরটাতে সমান মাপের আলো ছড়ানো। যোগেন দেখে ফেলে, ট্রেজারি বেঞ্চে শ্রীশ নন্দী আর প্রসন্নদেব মাথায় কী একটা পাগড়ির মত পরেছে, একটু ঝলমল চকমক করছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি ঢাকার নবাবশাহেব কোথায়, উনি খুব একটা হালকা রঙের শেরোয়ানি পরেছেন, সেই কারণে একটু আড়ালে পড়ে গেছেন। উনি আড়ালে থাকার জিনিশ নয়, কোনো একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে। নলিনী সরকার, স্যার বিজয় যেমন রোজ আসেন, ধুতি পাঞ্জাবিতে, তেমনি। খাজা আর সুরাওয়ার্দি দু-জনেই সুট-টাই পরেছে, তুলসী গোঁসাইও তাই, শরৎ বোস খদ্দরে। গভর্নরের বক্তৃতা তো আইনসভার সবচেয়ে বড় আচার, যেমন বাজেটও। অ্যান্ডারসন শাহেবও আর থাকবেন না। শোনা যাচ্ছে, এই বছরই তাঁর শেষ বছর। তাঁর আমলেই ভোট হয়েছে, তাঁর হাতেই মন্ত্রিসভা তৈরি হয়েছে, তিনিই মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক সভায় সভাপতিত্ব করেন—সেটা করার কথা প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু প্রথম বৈঠকই মন্ত্রিসভা তাঁর সভাপতিত্বের শেষ বৈঠক, এ-কথা ঘোষণার পর, সমস্ত মন্ত্রিসভা একজোট ও একমত হয়ে তাঁকে অনুরোধ করে, তিনি তাঁর সৎ বুদ্ধি ও সুপরামর্শ দিয়ে যদি মন্ত্রিসভাকে পরিচালনা করেন, একমাত্র তাহলেই মন্ত্রিসভার পক্ষে ঠিক পথে চলা সম্ভব। অ্যান্ডারসন শাহেব আর আপত্তি করেননি। তিনিই মন্ত্রিসভার বৈঠক পরিচালনা করেন।
একটা প্রদেশের ভালমন্দ ও প্রতিদিনের সঙ্গে এতটা জড়িয়ে থাকলে, লাটশাহেব হলেও, একটা মানুষের মনে এই জায়গাটি ও তার লোকজনকে নিয়ে কিছু মমতা তো থাকতেই পারে। তাঁর প্রথম বক্তৃতাই যদি শেষ বক্তৃতা হয়—তাহলে সে-মমতা আরো বেশি করে তাঁর নিজেরই হতে পারে।
সব মিলিয়ে উপলক্ষটিকে বেশ বড় করে তোলা হয়েছে। সকলেই তাঁদের পছন্দের ভাল পোশাক-আশাক পরে এসেছেন। যোগেনের পোশাকের আর ভালমন্দ কী? সেই ধুতি পাঞ্জাবি। তাতেও কাদা লেগে গেল। যোগেনের পেছনে ঠান্ডা বোধ হয়—তাহলে কাপড়টা ভিজেও গেছে।
প্রথমে একজন সান্ত্রী ঢুকল। পাগড়ি থেকে পায়ের নাগরা পর্যন্ত লালে মোড়া। তার ওপর জরির কাজ। কোমরবন্ধ জরির। তার হাতে একটা দণ্ড, মেজ, যোগেন জানে, এটা রাজদণ্ড। সে সেই রাজদণ্ডটা বসিয়ে দিল। সেনাবাহিনীর পোশাকে দু-জন মার্চ করতে-করতে ঢুকল। সেই দু-জনের মাঝখানের ফাঁকাটাতে পেছনে আইনসভার স্পিকার আজিজুল হক। এই মিছিলে একমাত্র চেনা লোক। তাঁর পেছনে গভর্নর অ্যান্ডারসন। তাঁর পেছনে তাঁর এডিকংরা, সামরিক পোশাকে। যোগেন আর-একটু স্পষ্ট করে দেখতে পাবে ভেবেছিল। যোগেন জানে, পড়েওছে, ছবিও দেখেছে, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে এসব আচার-আচরণ কেমন। সেসব থেকেই এগুলো নেয়া। সেটা জানে বলেই যোগেনের কাছে এই অনুষ্ঠান, আসলের নিকটতম প্রতিবিম্বন। লাটশাহেব এসে তাঁর বক্তৃতার জায়গায় দাঁড়াতেই স্পিকারের আসনের পেছনে ওপরে একটা ব্যালকনি আলোকিত দেখা গেল। শাদা পোশাকে একদল কিন্নর-কিন্নরী গেয়ে উঠল, ‘লং লিভ দি কিং’। প্রত্যেকে তাদের চেয়ারের সামনে উঠে দাঁড়াল। ইয়োরোপিয়ান ব্লকের কেউ-কেউ গানে যোগ দিয়েছেন বোঝা গেল তাদের ঠোঁটনড়া দেখে। লাটশাহেব মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলেন। গানটা যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ থেমে গেল। সবাই বসে পড়ল।
.
লাটশাহেব খুব খাদে পড়ছিলেন। যাঁরা জানেন, তাঁদের কথাই শোনা হচ্ছে, তাঁরা খাদেই বলেন। লাটশাহেবের সঙ্গে যোগেন কথা বলেছে, ছোট মিটিংয়ে ওঁর কথা শুনেছে, বড় হলভর্তি ভিড়ে ওঁকে মন্ত্রিসভা ঘোষণা করতেও তো দেখেছে। গলার স্বরটা তার চেনা হওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও যোগেন কিছুতেই চেনা ঠেকাতে পারল না। সে এমনও ভাবল–হয়ত এই হল, আলো, দাঁড়াবার জায়গা—এইসব কারণে সে চিনে উঠতে পারছে না।
তাই সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করেও শুনল। তাতেও কোনো ইশারা পেল না এমন, যা থেকে চেনা ঠেকে। গলা আলাদা, বলা আলাদা, একটা গুরুগুর আওয়াজও আছে। শুনলে মনে হয়, গলাটা ঝেড়ে নিলে পারে। যোগেন বেশ মন দিয়েও কিছুই বুঝতে পারে না। তারপর দুটো-একটা শব্দ থেকে আন্দাজ করতে পারে, বোধহয়, ১৯৩৫-এর আইনটা ব্যাখ্যা করছেন। তারও পর, হ্যাঁ, যোগেন ধরতে পারে, বলছেন গভর্নর ও আইনসভা, আইনসভা ও মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিসভা ও গভর্নর—এদের ভিতরকার ক্ষমতার বিলি-বন্দরবস্তের ব্যবস্থাটা বিশদে বলছেন-
সাংবিধানিক ক্ষমতা ছড়িয়ে দেয়া, অথচ সেই ক্ষমতা যাতে সব সময় প্রস্তুত থাকে ও প্রশাসনসহ সরকারের অন্য সব বিভাগকে সচল রাখে—যে-কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের এটাই একমাত্র লক্ষ। কেন সেই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছে বা নানা বিকল্পের মধ্যে এই পরিবর্তনটাই কেন গৃহীত হল—সেটা নিশ্চয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসকি প্রশ্ন। কিন্তু এ-প্রশ্নের কোনো অব্যবহিত জবাব হতে পারে না ও প্রতিদিনের প্রশাসন এমন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুবিকল্পসমন্বিত সাংবিধানিক পরিবর্তনের কারণ খোঁজায় ব্যস্ত থাকতে পারে না। সে-দায়িত্ব ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য মজুত রেখে, আমরা, যারা এই পরিবর্তনের ফলভাগী ও এই পরিবর্তনকে ফলপ্রসূ করার দায়িত্বে আছি, তাদের এই মুহূর্তের কর্তব্য, গভর্নর, আইনসভা, মন্ত্রিসভা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এই প্রত্যেকটি ক্ষমতাংশের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ।
যোগেন মন দিয়ে ফেলেছে।
প্রদেশের গভর্নরের বিশেষ ক্ষমতা ও সেই ক্ষমতা ব্যবহারের উপায় আর মন্ত্রিসভার ক্ষমতা ও সেই ক্ষমতা-ব্যবহারের উপায়গুলির মধ্যে কোনো সংঘাতের জায়গা নেই, যদিও কোনো রাজনৈতিক শক্তি মনে করেন যে এমন একটা সন্দেহক্ষেত্র আছে। এ-বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই যে সংবিধান অনুযায়ী তার নিজস্ব এলাকায় আইনরচনার অধিকার আইনসভা ছাড়া আর কারো নেই। এ-বিষয়ে আইনপরিষদ ও গভর্নরের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। প্রশাসনের ওপর জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতিনিধি যে-মন্ত্রিসভা, তাদের কর্তৃত্বও নির্দিষ্ট। আবার, প্রশাসনের নিজস্ব সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কর্তৃত্বও নির্দিষ্ট। আমাদের অফিসাররা অত্যন্ত উচ্চ শিক্ষিত, যাঁরা ইংল্যান্ড থেকে এখানকার সিবিল সার্ভিসে এসেছেন তাঁদের অনেকরই সম্মুখে অন্য অনেক লোভনীয় চাকরি ছিল। সেগুলি ছেড়ে তাঁরা যে এই দেশে এসেছেন তার কারণগুলি মধ্যে একটি একটি কারণ নিশ্চয়ই এই দেশ সম্পর্কে কোনো টান। যে-ভারতীয়রা প্রধানত এ-দেশের স্কুলকলেজে পড়াশুনো সেরে সিভিল সার্ভিসের যোগ্যতার পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, তাঁরাও হয়ে উঠেছেন এ-দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের সুফলের প্রতীক ও এই চাকরি বেছে নেয়ার অজস্র কারণ তাঁদেরও থাকতে পারে কিন্তু একটি কারণ নিশ্চয়ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক দক্ষতা ও শৃঙ্খলার প্রতি তাঁদের টান। এ বিষয়ে আমরা গৌরববোধ করতে পারি যে ভারতীয় সমাজের বহু প্রশংসিত ও বহু নিন্দিত বর্ণভেদ ও সম্প্রদায়ভেদ আমাদের প্রশাসক নির্বাচন পদ্ধতিতে কোনো প্রভাব ফেলেনি। গভর্নরের বিশেষ ক্ষমতাপ্রয়োগের বিষয় হিশেবে ডেটিনিউদের মুক্তি দেয়ার কথাটি সম্প্রতিকালে বারবার উঠছে। এই বিষয়টি আইনসভা-মন্ত্রিসভার অন্তর্গত নয় অথচ সংবাদপত্রে ও অন্যান্য সব উপায়ে আমার মন্ত্রীদের নানাভাবে দায়ী করা হচ্ছে। এই নিয়ে নানা ধরণের সমাবেশ নাগরিক জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলছে। আজ, এখন, আমি আপনাদের সামনে আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে বক্তৃতা দিচ্ছি। আর, ঠিক এখনই, এই বাড়ি থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে টাউনহলে ডেটিনিউদের বিনাশর্তে মুক্তির দাবিতে কয়েকশ মানুষ তাঁদের একাধিক নেতার আহ্বানে সমাবেত হয়ে সভ্যতা-ও আইন বহির্ভূত সব দাবিদাওয়া করছেন। সেগুলি যে মেনে নেয়া অসম্ভব সে-কথা যে-কোনো লোকই বুঝতে পারবেন। দেশের আইনে এই কথাগুলি বলাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
