৬৮. বন্দীমুক্তি আন্দোলনে যোগেন পথ পায় না
নোটিশে লেখাই ছিল—২৯ জুলাই গভর্নর বেলা দুটোতে আইনপরিষদ ও আইনসভার সম্মিলিত অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেবেন ও সদস্যদের নিশ্চয়ই পনের মিনিট আগে নিজেদের আসনে বসতে হবে, কারণ একটা পঁয়তাল্লিশের পর হলে কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না। যোগেন এসে গিয়েছিল দেড়টার আগেই। সাধারণত যোগেন বাড়ির সামনে থেকে ট্র্যামে কার্জন পার্কে নেমে হেঁটে আইনসভায় আসে। কাল শেষ রাত থেকে শ্রাবণের ঢল নেমেছে, মাঝে-মাঝে থেমে-থেমে। যখনই নামচ্ছে তখন একেবারে আকাশ উপুড় করে নামচ্ছে। ফলে, ছাতা নিয়েই বেরতে হল। ঠনঠনেতে বেশি জল জমে গেলে ট্র্যাম চলবে না—এ-ভয়ও ছিল। ভায়া বৌবাজার-ডালহৌসি একটা ট্র্যাম এসে গেলে যোগেন সেটাতেই উঠে পড়ে। ছাতা নিয়ে বাসে উঠতে হলে নিজেও ভিজতে হয়, অন্যকেও ভেজানো হয়। যোগেনের ধারণা হয়েছে, পাঞ্জাবি কনডাকটাররা ছাতাওয়ালা লোক দেখলে বৃষ্টির মধ্যে বাস থামায় না। ট্র্যাম সেদিক থেকে অত্যন্ত ভদ্র। পাদানির চওড়া জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্বিঘ্নে ছাতা বন্ধ করা যায়।
বৌবাজারে ডানদিকে ঘুরতেই মনে হল বৃষ্টিটা ধরে এসেছে। যোগেনের ল-কলেজ ধরলে তো কলকাতায় টানা থাকা তো প্রায় বছর সাতেক। তাকে হেঁটেই ঘুরতে হত, ট্র্যাম বা বাসে চড়ার পয়সা ছিল না। নানারকম ঠিকে কাজ—টিউশনি, প্রুফ দেখা, নোটবই লেখা, শেয়ালদা কোর্টের বাইরে বসে নানারকমের দরখাস্ত লেখা—তাকে সারা শহর হেঁটে-হেঁটে করতে হত। দক্ষিণে কালীঘাট-ভবানীপুর আর উত্তরে আলমবাজার-বরানগর। শহরটাকে সে তাই তন্নতন্ন চেনে। বরং হাঁটলেই তার সুবিধে লাগে। মনে হয়, এ-গলি ও-গলি দিয়ে নিজের মত শর্ট কাট করে নিতে পারত। কলকাতার যেটাকে সে জুত করতে পারেনি, সেটা হল বর্ষা। বরিশালের ছেলে সে। বরিশালে যদি কেউ বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করে, তাহলে তাকে খেপানো হয়—’এই এই এই চ্যাংড়া, তোর একখান পাও যে ভিজ্যা গেল।’
যোগেনের বাড়ির অবস্থা যা, তাতে ছাতা কেনার কথাই ওঠে না। যদি পয়সা জোগাড় করা যেত, তাহলেও সম্ভব ছিল না। হালুয়া নমশূদ্রের বাড়ি, হালের জমির কোনো নিশ্চয়তা নেই, সে যাবে মাথার ওপর ছাতা মেলে? মৈস্তারকান্দিতে কোনো জমিদার-ইজারাদারের বাড়ি ছিল না। থাকলেও মৈস্তারকান্দিতে ছাতামাথায় হাঁটার কোনো রাস্তা নেই। বেবাক খাল। নৌকোতে যাওয়ার সময় তাদের সমাজের কেউ ছাতা মাথা রোদজল ঠেকাবে? দেশে কি বামুন-কায়েত সৈয়দ-আসরফ উঠে গেল? নমরাও মাথায় ছাতা দেবে? ছাতায় মাথা ঢাকে এক বাবুরা আর সৈয়দরা–বার মাস তিরিশ দিন।
বরিশালে যোগেনের কখনো মনেই আসে না—বৃষ্টির জন্য ছাতা দরকার। ছোটবেলায় তো অত বড় আকাশের কোথায় মেঘ ভাঙছে দেখে আর এক গাঁয়ে পৌঁছুনোর জন্য দৌড়ত—বৃষ্টিকে হারাতে। বৃষ্টি তাকে ধরার আগে সে পৌঁছে যাবে। বেশি বয়সে দৌড়ত না বটে কিন্তু আকাশে একটু চোখ বোলালেই বর্ষবাদল বুঝে ফেলত। বৃষ্টির জন্য কোথাও আটকে পড়া যায় না কী?
কলকাতায় বৃষ্টির জন্য আটকা পড়তে হয় কেন—এটা যোগেনকে বিরক্তি করত বটে, তবে, সে খুব একটা ভাবেনি এই নিয়ে, কারণ, ছাতা থাকলেই তাকে আটকে পড়তে হত না—এই সহজ সমাধানটাই তার মাথা জুড়ে ছিল। তবু, বাড়ি থেকে বেরল শুকনো, বেলেঘাটায় দেখে ঝড়বৃষ্টি। শহরের আবহাওয়ার এমন অনিশ্চতা থেকেই যোগেন এক সময় বুঝে যায়—কলকাতা বড় শহর বলে কোথাও রোদ, কোথাও জল হয়—এমন হয় না। কলকাতার আকাশটা বরিশালের মত বড় না। তাই রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের আন্দাজ আসে না।
ডালহৌসি স্কোয়্যারের পুব-দক্ষিণ কোণে নামার জন্য যোগেন ব্যাগ আর ছাতা হাতে পাদানি পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়েছিল। তার আগে দু-জন আর তার দু-হাত আটকা। ট্র্যামটা পুরো না-থামলে তার পক্ষে নামা সম্ভব নয়। তার সামনে যারা ছিল তার চলন্ত ট্র্যাম থেকেই টুপটাপ নেমে গেল। যোগেনকে খাড়া থাকতে হয়, র্যাংকিনের উলটো ফুটে ঘোড়ার-জিন তৈরির বিরাট দোকানটার স্টপের জন্য।
বেশ হেলেদুলেই রাস্তা পেরল যোগেন, এক হাতে ছাতা ও আর-এক হাতে তার পোর্টফোলিয়োটা ঝুলিয়ে। তার উলটোদিক থেকে অসমবয়সী দুই মেমশাহেব আসছিলেন। মেমশায়েবদের বয়স বোঝার বিশেষ উপায় যোগেনর জানা নেই কারণ তেমন বিশেষ সুযোগই তার কখনো ঘটেনি। কিন্তু এদের বয়সের পার্থক্য বুঝতে কোনো পারদর্শিতা দরকার ছিল না। একটা বেশ বড় ছাতার নীচে দু-জন হেঁটে আসছে। ছাতাটা রঙিন বলেই মেঘলা আকাশের নীচে ছবির মত লাগছিল। যোগেন যখন তাদের ক্রস করল, দুজনই খুব জোরে হেসে উঠল। যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে, যেন সেভাবে দেখা যায়, মেমশাহেবরা তাকে দেখেই হাসল কী না। তবে, হেসেই তো থাকে—এমন ফাঁকা রাস্তায়, অকৃষ্ঠসংরম্ভ মেঘের তলায়, রঙিন ছাতার ঢাকনিতে, যদি এক কালো, মোটা, একটু লম্বা বাঙালিবাবুকে এক হাতে ছাতা ও আর-এক হাতে পোর্টফোলিয়ো নিয়ে হেলতে-হেলতে দুলতে-দুলতে এগতে দেখেও যদি তারা না হাসে, তাহলে—এইসবই তো বৃথা। তবে ওরা এমন হাসে, প্রায় মুখের ওপরেই হাসে, যদি রাস্তায় খুব ভিড় না থাকে। এমন কী, তার ছাত্রজীবনে যখন টিউশনি করতে যেত, তখন পামার-বাজারের ঐ সব মিস্তিরি গোছের শাহেব মেমরাও হাসত, দু-হাতই ছাতা ও পোর্টফোলিয়োতে আটক না-থাকলেও হাসে, হেলেদুলে না হেঁটে যোগেন গটগটিয়ে হাঁটলেও, হাসে। হাসিই, হাসির বেশি কিছু নয়। হাসিই কী না, তাও তো ঠিকঠাক জানা নেই, তবু এমন বিদেশী-অধ্যুষিত নির্জনতায় যোগেন এমন অশনাক্ত হাসির মুখোমুখি হতে চায় না।
যোগেন যেই বাঁ-হাতের কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটে ঢোকার জন্য ঘুরেছে, একদল ছুটন্ত মানুষ যেন প্রাণভয়ে তেড়ে আসে তারই দিকে। মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার পেছনে রাস্তাটায় জনমনিষ্যি নেই। ততক্ষণে সেই তেড়ে-আসা বা তাড়া-খাওয়া ভিড়টা কাছাকাছি এসে পড়তেই সে দেখে নিতে পারে—তাদের লক্ষে সে নেই আর খবরের কাগজের ওপর লাল কালিতে লেখা পড়ে ফেলে সে জেনে গেছে—রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ছাত্ররা এসেছে, দু-একটি নিশান দেখে কংগ্রেসি চেনা গেল—কিন্তু দু-তিনটি লালঝাণ্ডাও ছিল ও অন্তত একটি চাঁদ-তারা আঁকা, মুসলিম লিগেরই মত কিন্তু নিশ্চয়ই ‘প্রগতিশীল’ কিছু ও তারও পর শাড়িপরা কিছু মহিলা ছুটে আসে।
যোগেন কয়েক পা পেছিয়ে যে-ডালহৌসি স্কোয়ার নর্থ দিয়ে এসে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটে ঢুকেছিল, টাউন হলের পাশ দিয়ে আইনসভায় পৌঁছুতে, সেখানেই দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ঘাড় বাঁ-দিকে ফেরানো। সেই রাস্তা দিয়ে লোকজন ছুটতে ছুটতে আসছে আর যোগেন শিউরে-শিউরে উঠছে, তারা তো জানেই না, যোগেনের মত কেউ অমন দেয়ালের খিলানে ঢুকে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে, শুধু তার ডান-বাঁ-সম্মুখের রাস্তা তিনটি, দরকার হলে অন্য কোর্ট হাউস লেন, ওল্ট কোর্ট হাউস রাস্তাটিও। এমন কী ওদিকে ফেয়ারলি প্লেস দিয়ে স্ট্র্যান্ডেও চলে যাওয়া যাবে। সবগুলো পালানের পথ নিজের সামনে-পিছনে খোলা রেখে যোগেন ঢুকে ছিল এক বহির্দেয়ালের খিলানে।
সেখান থেকে, যেন আত্মগোপনের কোনো কুঠুরির গোপন ঘুলঘুলি দিয়ে, যোগেন লাল কালিতে লেখা পোস্টারগুলি পড়ে জেনে গেছে—এরা রাজবন্দীদের মুক্তি চাইছে ও বিশেষ করে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত রাজবন্দীদের। ভোটের পর কলকাতায় এত পার্টির এত মিটিং করতে-করতে যোগেন বুঝে গেছে, রাজবন্দীদের মুক্তি বাংলার রাজনীতির একটা খুব কঠিন বিষয়। কংগ্রেসের এটাই সবচেয়ে বড় আন্দোলন।
রাজবন্দীদের মুক্তি আর জমিদারি উচ্ছেদ—এই দুটোর মধ্যে কর্মসূচেিত কোনটা এক নম্বরে যাবে এই নিয়ে প্রজাপার্টির সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে দিল কংগ্রেস। আবার লিগ-প্রজাপার্টির কর্মসূচিতে এর কোনোটাই এক নম্বরে থাকল না। কারা কোথায় কেন বন্দী হয়ে আছে, কতদিন ধরে বন্দী হয়ে আছে—এ নিয়ে আইনসভাতেও দু-একবার কথা উঠেছে কিন্তু যোগেন এই বিষয়টির ভার ও জট কিছুই জানে না। ছাত্র থাকার সময়ই হক আর কাজকর্মের সময়ই হক, যোগেনকে এটা জানতে হয়নি। সে এটার বিরোধী বলেই যে জানতে হয়নি—তাও নয়, কারণ যোগেন এই প্রশ্নটার মুখোমুখিই কখনো হয়নি যে সে এই ঘটনাগুলি তার পক্ষে কতটা প্রাসঙ্গিক। তার পক্ষে মানে একজন শিক্ষিত নমশূদ্রের পক্ষে। তার নিজের সমাজের উন্নতিই তার প্রধান কাজ—এ নিয়ে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। এই নির্দ্বিধা তৈরি হয়েছিল—সেই বালক বয়স থেকে উচ্চবর্ণের কাছ থেকে পাওয়া শান্তিহীন অপমানের, নমশূদ্র-সমাজের প্রধান ব্যক্তিদের বামুন-কায়েত সাজার চেষ্টায় আর-একদল সম্পন্ন মানুষজনের উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে অন্ধ স্বার্থপরতায়। যোগেনের তাই নিজের ভিতর থেকে কোনো তাড়া ছিল না—ইংরেজ দখল থেকে দেশকে স্বাধীন করার। বরং শাহেবদের কাছ থেকে নমশূদ্র বলেই কোনো বিশেষ ধরণের অপমান তাদের জুইত না বলেই তাদের কাছে স্বাধীনতা কোনো কর্মসূচি বা জীবনকৃত্য হয়ে ওঠেনি। ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ এমন স্লোগান শোনামাত্র সে আত্মরক্ষায় আড়াল খোঁজে।
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল।
বোধহয় সেই কারণেই রাস্তাটা খালি হয়ে গেল। দেয়ালের সেই খাঁজটায় যোগেন ভিজে যাচ্ছিল—সে তাড়াতাড়ি ছাতাটা খোলে।
ঘড়িতে দেখে—তার হাতে সময় নেই, তার ওপর তার ঘড়িটা ফাস্টও তো হতে পারে। পৌনে দুটোর মধ্যে নিজের-নিজের চেয়ারে বসে পড়তে হবে। পৌনে দুটো। লাটশাহেব ঢুকবেন দুটোয়। যোগেন বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়ে। সে আর ওল্ড কোর্ট হাউস লেনে ঢোকে না। রাস্তা পেরিয়ে যায়—কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটের দিকে যায়। কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটে ঢোকার সময় যোগেন দেখে, ফাঁকা ও ভেজা রাস্তায় বৃষ্টির জল কয়েকটা পড়েথাকা পোস্টারের ওপর দিয়ে লাল হয়ে বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে, রক্ত মনে হতে পারে। তাহলে কি এ রাস্তাতেও গোলমাল হয়েছে। গোলমালের ম্যাপটা ছকতে না পেরে যোগেন এগিয়ে যেতে থাকে। কী করবে? তার তো তাছাড়া কোনো উপায়ও নেই। এক এখন পেছন ফিরে আবার ট্র্যাম ধরে বা হেঁটে ইডেনের দিক দিয়ে আইনসভায় ঢোকা। ততক্ষণে সোয়া দুটোর অনেক বেশি বেজে যাবে। যোগেন এগুতে থাকে।
টাউন হলের রাস্তাটা পেরতে গিয়ে যোগেন বোঝে—রাজবন্দীদের মুক্তি নিয়ে মিটিংমিছিল হচ্ছে টাউন হলেই। ভিতরের উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতা বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে—’প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সরকার আর এই প্রদেশের প্রত্যেকটি ঘরের অন্তত এক পুত্র যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বন্দী ও নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে, রাজপুতানার দেউলি-তে, এই রাজ্যের সমস্ত সেন্ট্রাল জেলে। এটা তো কোনো বিনিময়চুক্তির বিষয় নয়। আমাদের, বাংলার, সৰ্বশ্ৰেষ্ঠ সন্তানদের ও নেতাদের জেলে আটকে রেখে কোনো সরকার তো এখানে চলতেই পারে না।’
কথাগুলি শুনতে-শুনতে যোগেন এগতে থাকে। শোনা ও এগনো—এই দুটি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে যদিও যোগেন দেখে টাউন হলের লম্বা শাদা সিঁড়ির ওপরের একটা ধাপ জুড়ে কলকাতার পুলিশ লাল পাগড়িতে সেজে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে, লাঠি কাঁধে, যোগেন বুঝতে পারে না—দুটো একটা বন্দুকও আছে কী না। আর দুই অফিসার—একজনকে এত দূর থেকে শাহেব বলেই মনে হচ্ছে, ফিরিঙ্গিও হতে পারে। টাউনহলের ভিতর থেকে ভাষণ-স্লোগান ভেসে আসছে কিন্তু টাউনহলের সিঁড়িতে বা বারান্দায় বা রাস্তায় ঐ দু-তিনজন অফিসার ছাড়া কেউ নেই। যোগেন বুঝে ফেলতে পারে—পুলিশ হলের ভিতরে মিটিং চালাতে দিচ্ছে কিন্তু বাইরে—বারান্দায়, সিঁড়িতে, রাস্তায়—কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। যারা জমা হয়ে গিয়েছিল, পুলিশ তাদের সরিয়ে দিয়েছে। তাদেরই যোগেন রাস্তায় অমন পালাতে দেখেছে।
এসব দেখতে-দেখতে ভাবতে-ভাবতে ছাতা মাথায় এগিয়েই যাচ্ছিল যোগেন, খেয়াল করেনি তার সামনে বা পেছনে আর একটি লোকও নেই, বৃষ্টিতে ধোয়া কাল রাস্তায় রাস্তার পাশের বাড়িঘর গাছপালার একটু ছায়াও পড়ছে। খেয়ালই করেনি যোগেন যে সে এতটা একা একা যাচ্ছে।
মুখোমুখি রাস্তার উলটো সীমা থেকে একটা মোটর সাইকেল কর্কশ আওয়াজ তুলে যোগেনের দিকে ছুটে আসছে দেখে, যোগেন লাফিয়ে ডান ফুটে ওঠে। যেন, চাপা পড়ার ভয়ে। অত চওড়া রাস্তায় তা সম্ভব নয় বুঝেও যোগেন ফুটে উঠে পড়ে আর মোটর সাইকেলটা তারই পাশে জোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে যায়।
শাহেব কী জিজ্ঞাসা করল, প্রথমে তা বুঝতে পরে না। পরে, পারে—শাহেব জানতে চাইছে সে কে ও কোথায় যাচ্ছে। যোগেন আইনসভার সদস্য ও এখন সে আইনসভাতেই যাচ্ছে শুনে শাহেব তার পাশ দেখতে চায়। পাশ একটা তো যোগেনকে ও সবাইকেই দিয়েছে। সেটা আছে তো পোর্টফোলিয়োর ভিতরে। এখন ব্যাগ খুলে, কাগজ হাঁটকে সেটা বের করা…?
তেমন অনিচ্ছে থেকেই তার মনে পড়ে যায়, আজকের মিটিংয়ের নোটিশটা তার বুকপকেটে। কাঁধ হেলিয়ে ছাতার বাঁট কাঁধের ভাঁজে রেখে যোগেন সেই নোটিশটা বের করে শাহেবকে তাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘দেখু-ন, এটাতে হবে?’
ঐ কাগজটুকু পড়তে এতটা সময় লাগার কথা নয়, শাহেব একবার চোখ তুলে যোগেনকে দেখেও নিয়েছে। তাতে যোগেন আন্দাজ করে—শাহেব মনে-মনে মাপছে যোগেনের পোশাক-আশাক ও চেহারার কেউ কি এই নোটিশের সঠিক প্রাপক হতে পারে। মাপুক।
কিন্তু এ তো একজন অফিসার। না কি সার্জেন্ট? বিশেষ করে আইনসভায় যদি এ একদিনও ডিউটি করে থাকে, তাহলে তো এর জানার কথা যে আইনসভার মেম্বারদের চেহারা ও পোশাক দেখে মাপা যাবে না। লুঙি পরে কেন যে কেউ আসে না? তাছাড়া কত রকমেরই যে পাজামা আর পাঞ্জাবি। কারো কারো হয়ত নিজের পছন্দমত পোশাক আছে—হকশাহেবের, খাজার, সুরওয়ার্দির হবিবরের, নলিনী সরকারের, শরৎ বোসের, তুলসী গোস্বামীর—। বড়লোক ভদ্রলোকদের যেমন সামাজিক পোশাক হয় তেমন। শেরওয়ানি হক, ধুতিপাঞ্জাবি হক আর শাহেবদের মত সুটই হক—যাই হক পোশাক, সেটা বেছে পরা। বাকিদের জামাকাপড়ে কোনো ঠিকঠিকানা নেই। যা পেল, তাই পরল। যদিও এমন বাছাই ও ঢালাইয়ের মধ্যে একটা ভাগ থাকে। কোনো মুসলমান এমএলএ, যে-পার্টিরই হক, খদ্দর পরবে না। খদ্দর হিন্দুদের। তারা হয়ত লংক্লথের পাঞ্জাবি পরে। বা, এমনকী, ছিটের। কিন্তু খদ্দরের নয়। তেমনি কোনো হিন্দু-মেম্বার, যে-পার্টিরই হোক, কিছুতেই পাজামা পরবে না। পাজামা মুসলমানদের। বরং তারা ধর্মতলার চার-পাঁচ টাকা দামের ফুলপ্যান্টে একটা ফুলশার্ট গুঁজে পরে। একজন মুসলমান এমএলএ-ও এটা পরে। কিন্তু এই একজনই। হিন্দুরা কেউ-কেউ পরে, একটু কমবয়েসি হলে।
সার্জেন্ট চোখ তুলে জিগগেস করে, তুমি কি এই মিটিংয়ে যাবে। বলতে-বলতেই সে কাগজটা ভাঁজ করে ফেরত দেয়। সার্জেন্টের প্রশ্নে যোগেন মনে-মনে বরিশালি তরিকায় পালটা প্রশ্ন করে, না-যাওয়ার কোনো কারণ আছে কি?
কিন্তু মুখে বলে, আমার তো এতক্ষণ পৌঁছে যওয়ার কথা।
শাহেব তার পেছনের সিটটা দেখিয়ে যোগেনকে বলে, বসো, আমি তোমাকে পৌঁছিয়ে দিচ্ছি।
যোগেন ছিল ফুটপাতে আর শাহেব ছিল রাস্তায়—মুখোমুখি। মোটরসাইকেল চড়া দূরের কথা, খুব কাছে থেকে মোটরসাইকেল সে কোনোদিন দেখেনি। সে দাঁড়িয়েছিল শাহেবের বাঁয়ে। সেদিক দিয়েই সে বাইকের পেছনের সিটে উঠতে যায়, সিটের ওপর দিয়ে ডান পা-টাকে আড়াআড়ি ফেলে। তার দু-হাতে ছাতা ও ব্যাগ থাকায় ও তার ধুতির কাছিটা সিটে আটকে যাওয়ায় তার ওঠা হয় না। শাহেব ততক্ষণে তাকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে বলেছে, শাহেবের ডান দিক দিয়ে উঠতে।
যোগেন ঘুরে শাহেবের ডানদিকে গিয়ে দাঁড়াতেই শাহেব হাত বাড়িয়ে তার ব্যাগটা নিয়ে পেট্রলট্যাঙ্কের ওপরে রাখে। ছাতাটাও শাহেবকে দিতে হবে কী না, বুঝতে না পেরে যোগেন একটু ইতস্তত করে। ততক্ষণে শাহেব তাকে বলেছে, নীচের দিকে দেখো একটা পাদানি আছে, সেটার ওপর ভর দিয়ে ওঠো, আমার মত ঘোড়ায় চড়ার মত করে নয়, মেয়েদের মত, দুপা একদিকে ঝুলিয়ে।
ছাতাটায় ভর দিয়ে যোগেন উঠতে পারল সহজে, কিন্তু নৌকোর কিনারায় বসে জলে পা রাখার ভঙ্গিতে থিতু হতে-না-হতেই সার্জেন্ট বাইক চালিয়ে তো দিয়েইছে, তার ওপর বাইকটার মুখ উলটোদিকে ঘুরিয়ে নেয়। যোগেনের মনে হয়, পিছলে পড়ে যাবে। কিন্তু পড়ে না—না-পড়ার জন্য ছাতায় গোড়াটা সে পাদানির ওপর চেপে ধরে টাল সামলায়। টাল তো সামলায় কিন্তু তার ধুতির কোঁচাটা ফুলে উঠে তার পেছনে নৌকোর পালের মত হয়ে যায়। কোঁচটা গুছোতে হলে তাকে ডানহাতটা দিয়ে উড়ন্ত কাপড়টাকে গুটিয়ে আনতে হয়। ডান হাতে তো ছাতা তা স্থিতিস্থাপকতা সামলাচ্ছে। ছাতাটা বাঁ-হাতে চালানের চেষ্টাও সে করতে পারছে না।
ফলে, তাকে চেষ্টাহীন দেখে যেতে হয় যে তার পরনের ধুতির একটি অংশ, পরনে থেকেও বাতাসে উড়ছে। শাহেব ঘ্যাঁচ করে তার বাইক থামায়। যোগেন প্রথমে বুঝতে পারেনি সে অ্যাসেমব্লি হাউসে পৌঁছে গেছে। সে ঢোকে তো অন্য গেট দিয়ে।
যোগেন এক লাফে নেমে পড়ে, ততক্ষণে গুটিয়ে আসা কোঁচাটাকে আবার কুঁচিয়ে গোঁজে ও দেখতে পায় তার ধুতির নীচের পাড় বরাবর রাস্তার কাদা লেস্টে আছে, ছিটিয়ে গেছে। শাহেবের বাড়িয়ে দেয়া ব্যাগটা নিয়ে একটু হেসে ঘাড় হেলাতেই বিকট আওয়াজ তুলে শাহেবের প্রস্থান।
হাউসের বারান্দায় উঠতে-উঠতে যোগেন ঠিক করে ফেলে, আগে বাথরুমে ঢুকে ধুতিটার অবস্থা দেখবে। সে ছাতা আর ব্যাগটা জেনিটরের ডেস্কে রেখে বাথরুমের দিকে যেতে-যেতে আরো ভেবে নেয়—যদি বোঝে ধুতির পায়ের ঝুলটা উলটে কোমরে নিয়ে এলে, কাদাটা পাঞ্জাবিতে ঢাকা পড়ে যাবে, তাহলে ধুতিটা গিঁঠ পালটে পরে নেবে। কিন্তু ধুতির কাদাটা তো ভেজা। চেয়ারে বসলে তো সেই কাদায় পাঞ্জাবিটা বিশ্রী ভিজে উঠবে। বাথরুমে ঢোকার আগেই যোগেন বুদ্ধি পেয়ে যায়, তাহলে, চেয়ারে যখন বসবে, তখন পাঞ্জাবির পেছন-ঝুলটার ওপর চেপে বসবে না, বরং ঝুলটা ঝুলিয়ে দেবে।
বেশ এতটা বদলাতে একটু সময় তো লাগবেই। এর মধ্যে বাথরুমের ভিতরে ধাতব বৈদ্যুতিক কলিংবেলটা প্রথম থেকেই সবচেয়ে জোরে ক্রি-ই-ইং বাজতেই থাকে। সেসনে ভোটাভুটি হওয়ার আগে এই বেলগুলো বাজানো হয়। যোগেন ধরেই নেয়, কোনো কারণ ছাড়াই ধরে নেয়, এটা ফার্স্ট বেলই হবে। কিন্তু বেল যখন বেজেই চলে, থামে না তখন সে ভেবে নিতে চায়, তাহলে সেকেন্ড বেলই হবে, কিন্তু তার ধুতিপরা তখনো শেষ হয় না। ততক্ষণে বেলটার ক্রেংকার যেন যোগেনের সারাটা শরীর এত কাঁপিয়ে দিচ্ছে যে সে আঙুল চালাতেও পারছে না। ঐ ক্রেংকার থেকে বাঁচতে যোগেন দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে আসে।
