১০
2 of 4

৬৭. যোগেনের কবিগান : শেখশুদ্দুর মিলন

৬৭. যোগেনের কবিগান : শেখশুদ্দুর মিলন

বিলের মানুষ যদি সমাজ পায়, মহোচ্ছব পায়, সে একটুও ছাড়ে না। এদের মধ্যে টাকাপয়সার ব্যবধান, কম হলেও, তো আছে। মহোচ্ছবে সেসব মাটির ডেলার মত ভেঙে শুকিয়ে ঝরে যায়। জমির খাজনাদার আর গতরদার পাশাপাশি, বসে বা দাঁড়িয়ে হাপুসহুপুস মহাপ্রসাদ খেতে থাকে, বারবার নেয় সেই নারকেলের মালাই ডুবিয়ে, আর শপ শপ আওয়াজ তুলে খেতে যায়, যেন, খেয়ে না-নিলে ফুরিয়ে যাবে, বা এমন মহোচ্ছব ভেঙেও যেতে পারে, বা কেড়েও নিতে পারে কেউ। সেই একরকম ভয়, এতগুলি মানুষের সঙ্গে মিলে হাত পুড়িয়ে, জিভ পুড়িয়ে প্রসাদ-খাওয়ায় উৎসবটাকে এতটা তাতিয়ে দেয়। সেই তাপে বছরের বাকি সব দিনগুলির একাকিত্বও কেটে যায়।

যেখানে খাওয়া হচ্ছিল, সেখানেই কোনো এক সময় গানবাজনা শুরু হয়ে যায়। তেমন ব্যবস্থা করা থাকে বা তেমনই হয়ে আসে—এমন কোনো কারণে না। সে হয়ত কোনো-কোনো বছর ঢাকা থেকে কোনো নাট্যকোম্পানি আসে, সেসব হয় সন্ধের পর। এবার গুরুদশার বছর বলে তেমন দল আসেনি। না-এলেও হ্যাজাক-ডেলাইট জ্বলবেই। কিন্তু জ্বলার আগেই এই মাঠে কত-যে গান শুরু হয়ে যায়, জমে যায়, ভেঙে যায়। দুটো-একটা গান তো সকলের জানা। তাদের ধরে-ধরে এনে গাওয়ানো হয়। তারপর সে যখন আর কিছুতেই থামে না তখন আবার জোর করে থামাতেও হয়। এই গানের আসরগুলোতে যেসব গান কোনো-এক সময় খুব চলত, সেসব গান শোনা যায়। গায়করা গোপনে কোনো একটা গান জোগাড় করে রাখে হয়ত—প্রথম গায় এই মেলায়। খুব নামডাক যাদের তেমন কবিরা অনেকে আসে—বিজয়কৃষ্ণ সরকার, নিশ্চিন্ত সরকার, রাজেন সরকার, নকুল দত্ত, হরিবর সরকার, মহিমাচরণ সরকার। এবার রাজেন সরকার, নিশিকান্ত, বিজয় সরকার কলকাতার বিড্‌ স্ট্রিটে থেকে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কাজি নজরুল ইসলাম এঁদের সাহায্যে কবিগানের প্রচারের কাজে ব্যস্ত বলে আসতে পারেননি।

কাছাকাছির এক আসরে এক বাবড়িওয়ালা চ্যাংড়া গান গাইছিল—’পোষা পাকি উড়ে যাবে সজনি।’ শুরু শুনেই প্রহ্লাদ বলে উঠল, ‘আর রে! বড় মরমি গান-খান ধইরছে রে। কেডারে পোলা?’

তখন গায়ক গাইছে, ‘আগে তো ভাবি নাই জীবনে।’

প্রহ্লাদ রেগে ওঠে, ‘দিল কাঁচাইয়া। আরে এতো বিজয় সরকারের গান, ওর প্রথম বৌ গত হওয়ার পর লেখা। লোকের গলায়-গলায় ফিরত। তুমি তো জানো, যোগেন?’

তখন গায়ক আবারও গাইছে, ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনি/আগে তো ভাবি নাই জীবনে।

‘দিল গানটারে খুন কইরা। পদ মুখস্ত করে নাই? ‘সজনি’র সঙ্গে কি ‘জীবনে’ মেলে?’ প্রহ্লাদ গুনগুনিয়ে শুদ্ধ স্বরটা গায়, ‘আগে তো জীবনে ভাবি নি’, ‘সজনি—ভাবিনি।

যোগেন বলে, ‘যাও-না, গাইয়্যা দ্যাও।’

মাঠের যেখানে বসে ওরা গান শুনছিল, সেখানে আরো অনেকে ছিল। এক রোগা লম্বা বৌ উঠে গটগটিয়ে গায়কের কাছে গিয়ে বলে, ‘আর গাইব্যার কাম নাই। পদ ভুইজা তো উঠো।’

‘আমি বুইঝছি তা। এইবার ঠিক হব,’ বলে সে আবার গেয়ে ওঠে একটু তাড়াহুড়ো করে ‘পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনি’–এই প্রথম লাইনটা। তারপর একটু হেসে তাল রেখে—’আগে -তো ভাবিনি জীবনী।

এরপর আর উঠে না গিয়ে সে কী করে?

কোথা থেকে একটা মেয়ের তীক্ষ্ম গলা শোনা যায় আচমকা, ‘আমার দ্যাহ রাজ্য হইল পরাধীন।’ যেদিক থেকে গানটা উড়ে আসছিল সেই দিকের আকাশে সবাই তাকায়। সবাই কান খাড়া থাকে সুরটা আবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু হল না। গানটা বোধহয় শুরু হয়েছিল, এখানে যখন ‘ভারি নি জীবনী’ এইসব নিয়ে কেরামতি চলছিল।

চারদিকে যে এই নানারকমের সুর-বেসুরের হাওয়া উঠছিল, তাতেই যোগেনও গুনগুনিয়ে ওঠে।

এমন সময় একেবারে যাত্রার কনসার্ট বাজিয়ে বৈরাগী এসে তার দলবল নিয়ে গাইতে থাকে—

যত নমশূদ্রে ভাব সমুদ্রে করে সন্তরণ যোগেন খুব হেসে উঠে, নিজের হাসি হাতের তেলো দিয়ে ঠেকায়। প্রহ্লাদকে বলে, ‘আরে, হারামজাদা তো নাচেও দেহি। আবার দ্যাহো ধুয়ার জন্য পোলাপান জুটাইছে কত।’ সেই ধুয়োর দল তখন একসঙ্গে গাইছিল ‘করে সন্তরণ’। সঙ্গে বাজে একটা ছোট ঢোল আর কাঁশি।

‘কও কি যোগেন। ওর ঠিকঠিকানা নিয়া রাইখো। ও তো কইলকাতায় প্যাকটিস করে। তোমার আবার কবে কোন্ লাটশাহেবরে ফরিদপুরের কবি শোনাইবার ডাক আসে।’

‘হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ সূর্যচন্দ্রে করেন বিচরণ’

ধুয়োরা গেয়ে ওঠে, ‘করেন বিচরণ।’

যোগেন জিজ্ঞসা করে, ‘কইলকাতায় হরিচাঁদ গুরুচাঁদ গায়? শোনে কেডা?’

‘আরে, মেলায় আইছে, হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ না গাইলে চলে? কইলকাতার গান আলাদা।’

‘না, প্রহ্লাদদা, তা না। কইলকাতায় ভক্ত নাই? তারা শোনে। আর যারা নাম শোনে নাই, তারা ভাইব্যা ন্যায় কিছু

‘ও তো থাহে মুসলমান পাড়ায়। বেবাকই মুসলমান। বই বান্ধায়। মুসলমানগ মইধ্যে যশোর-খুলনার মানুষ অনেক। তারা তো হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ জানে। তারাও আবার বৈরাগীরে তাগ গুরুসাঁইয়ের গল্প কয়। বৈরাগী তাই নিয়্যাও তো গান বান্ধে।’

‘শুইনছি। সেইগুলা আরো ভাল গান। আমি গ্যান শুইনছিল্যাম লায়লা-মজনু। সেইগুল্যা গাউক-না!’

‘হ্যাঁ? আইছে ওড়াকান্দির স্নানযাত্রা আর নমবিজয় যাত্রায় আর গাইব লায়লা-মজনু?’ তখন ধুয়োরা গাইছে, ‘করেন রক্ষণ।’

‘খাড়াও। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বন্দন দিয়া শুরু কইরছে। এইবারই ‘নমবিজয়ে’ ঢুইকবে, পদ্মবিলা নিয়া?’

‘আরে শুইনছি দাদা। সেই মুসলমানগো ছেরাদ্দ।’

‘তাইলে পরে শুইনছ! তুমি তো তহন কলেজে। না?’

‘কলেজেই যাই আর যেহানেই যাই, আমি তো তহনো, নম, অ্যাহনো নম। আমার উপায় আছে নি নমবিজয় না-শোনার?’

‘তোমার তো পছন্দ হয় নাই?’

‘কীসের কথা জিগান?’

‘ঐ গানডার কথা—’

‘গানের আবার পছন্দ-অপছন্দ কী? ভালই। যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব উঠে। সেইডা তো অনেক কালের ঘটনা। না? তোমারও তহন বয়স হয় নাই—’

‘তা হইব না ক্যা? তবে ঘটনাডা তো পুরনাই। ধরো গনতিতে খাড়াইব, হ্যাঁ বছর পনের আগে শুরু আর বছর এগার-বার আগে সমাপন, ‘সংখ্যাদুটি বলার সময় প্রহ্লাদকে কর গুণতে হয়।’

ধুয়োরা তখন গাইছে, ‘করি সমাপন।’

‘কতকগুল্যান মিথ্যা-মিথ্যা কথা সাজাইয়্যা নমবিজয় গীত বানাইছে।’

‘সব মিছা কথা নি? য্যান তহন শুইনছিলামও’।

‘গীত বানাইলে মিছা হব না? গীতের তালবাদ্যি আছে, নর্তক-কুর্দন আছে, হুংকারটুংকার আছে। এইগুলা না হইলে গীত হয়? এগুলা মিছা ছাড়া সত্যি হয়? চারচায়ড্যা বছর ধইর্যা কুনো কাইজ্যা হবার দেখছ নি? তাই আবার বছরে একদিন কইব। সেডারে দাঙ্গা কয় কেডা? চাইরড্যা বছরে দশটা কাইজ্যাও হবার পারে প্রহ্লাদদা কিন্তু একটা কাইজা চাইর বছর ধইর্যা চইলব্যার পারে না—জমিদারে-জমিদারে দখলের কাইজ্যা ছাড়া।’

ততক্ষণে বৈরাগীর ঢোল-কাঁশি খুব জোরে-জোরে বেজে উঠেছে। যুদ্ধের একটা আবহাওয়া যেন তৈরি হচ্ছে। সেই ভূমিকাটুকু শেষ হলে বৈরাগী লাফ দিয়ে সামনে এসে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, দুই হাত জড়ো করে, পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে নমস্কার করে হঠাৎ লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

ঢোলের একটা বড় আওয়াজের সঙ্গে দূর আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বৈরাগী গেয়ে ওঠে—

ঐ দেখো ঐ দেখো ছুটে মুসলমানেরা
প্রায় সকলেই তার অঙ্গুলিনির্দেশে আকাশের সেই কোণে তাকায়।
ভাদ্রমাসী গঙ্গা হেন স্রোত দিশাহারা।
দর্শক-শ্রোতাদের দৃষ্টি তার স্বর ফিরে এলে বৈরাগী গায়,
আল্লা হো আকবর বলি ছাড়িল জিগির
কত মত দাড়ি নিয়া করিল ফিকির।

যারা শুনছিল তারা কেউ-কেউ হয়ত পরের ঘটনাগুলি মনে করতে পেরে আগেই হেসে উঠছিল। বৈরাগী গায়,

পশ্চিমে সূর্যের অস্ত সে মুখে নমাজ।
যত করে মুসলমান সকলি অকাজ।
লুঙ্গিতে ঢাকি রাকি সুন্নত ধন।
ঐ মুসলমান আসে শূদ্র করিতে নিধন।
ঢোল-কাঁশির বাজনার তালটা সামান্য একটু বদলায়।
অনিবার্য মৃত্যুর কোলে পড়িতে ঝাঁপায়ে।
বীরমূর্তি নমশূদ্র রয়েছে দাঁড়ায়ে।।
নমশূদ্র পক্ষে বীর অনন্ত সর্দার।
পরানপুরেতে আসি বান্ধিয়াছে ঘর।
কুমারিয়া, লক্ষ্মীপুরা, পদ্মবিলা বাসী।
শূদ্র প্রধান যত উপস্থিত আসি।।
গুরুচাঁদ আগুয়ান—সম্মুখ সমরে।
মুসলমানে নির্বংশ করিবার তরে।

দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে মুসলমান গৃহস্থ, মেয়েরা, বাচ্চারা আছে। তারাও এই গান শুনে আনন্দ পাচ্ছে, হাসছে, এলোমেলো হাততালিও দিচ্ছে। তারা এটাকে শুধুই একটা গান বলে শুনছে, দেখছে। এরকম গানে দুই পক্ষ না-হলে গানটা হবে কী করে?’ হিন্দু মুসলমান গানের দুই পক্ষ।

যোগেন গানটাকে গান বলে নিতেই পারছিল না।

নমশূদ্রকে হিন্দু করে মুসলমানের সঙ্গে লড়িয়ে দেয়া কী করে গান হয়? তাহলে যা প্রতিদিন, অষ্টপ্রহর, নিত্যি, চব্বিশ ঘণ্টা ঘটে সেটা নিয়ে দুই পক্ষ হয় না কেন। থানায় রোজ যে এফআইআর হয়, যে-কোনো থানায়, তার দশটার মধ্যে সাতটা তো ভাগচাষী রায়ত, সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, তার বিরুদ্ধে কিছু জমিদারের এজাহার। এজাহার পড়লেই বোঝা যায়—রায়তকে অন্তত কিছুদিনের জন্য জেল-কাস্টডিতে রাখা জমিদারের পক্ষে নিতান্ত দরকার। কেন? যে-কোনো উদ্দেশ্যই একইরকম তুচ্ছ। হয়ত রায়তের অধীনস্থ পুকুরের মাছের জন্য জমিদার কোনো জাইল্যা-পাইকারের কাছ থেকে টাকা জমা নিয়ে নিয়েছে। রায়ত দু-দিনের জন্য চোখের আড়াল হলে, জালিয়া, দু-তিন রাতেই পুকুর খালি করে দিতে পারবে। বা, রায়তবাড়ি কোনো মেয়েকে বাড়ির কাজে বহাল করতে চায় জমিদার, যাতে মেয়েটিকে চোখের সামনে যখনতখন এলোমেলো দেখতে পারে জমিদারবাবু। রায়ত দুদিন চোখের বাইরে না-গেলে জমিদার কী করে বলে, ‘আর দিনকাল খারাপ, কোনোদিন ডাকাইতি কইর‍্যা নিয়্যা যাবে মেয়েডারে। আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিস-যে-কয়দিন রায়ত না খালাস হয়।’ দশটা এজাহারের মধ্যে সাতটাই এই। আরো খানদুই পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে সেই মেয়েছেলে নিয়ে—হতে পারে কোনো মার্ডারের ইতিহাস পাকানো। তার, দশটা এফআইআর-এর মধ্যে একটা হয়ত আইনসঙ্গত অভিযোগ। তাও কে কোন্ জমি চাষ করছে কয় পুরুষ আর সে জমির জন্য খাজনা জমা দিচ্ছে কোনো জমিদার কয় পুরুষ—তাতেই ঠাসা। গানের জন্য এই দুই পক্ষ, জমিদার আর চাষি, কেন চোখে পড়ে না, অথচ বারবারই চোখে পড়ে হিন্দু-মুসলমান। এই গানটা, এই বৈরাগীর গানটা তৈরি হয়েছিল পদ্মবিলা দাঙ্গার সময় হিন্দুগ গরম করার জন্য। তারপরে না-হয় সকলেই এখন হিন্দু-মুসলমান ভুলে গেছে—’আরে, গানে একটু রস নাইলে চলে?’ দু-চার বছর পরে এমন একটা দিন আবারও আসতে পারে, যেদিন মুসলমানরা আর এই গানটাকে গান না-ভেবে, মুসলিম বিরোধী প্রচারই ভাববে। নমশূদ্র আর মুসলমান নিয়ে তো কত পিরিতি আর ছাড়াছাড়ির গান।

যোগেন উঠে দাঁড়ায়। আওয়াজ করে হাই তুলে, দু-দিকে দু-হাত ছড়িয়ে আড় ভাঙে। দু-এক পা হেঁটে একটুখানি সরে যায়। এদিক-ওদিক তাকায়। বৈরাগী তখন ঢোল-কাঁশি পিটিয়ে যুদ্ধ করে দিয়েছে

কত কত হাজি
কত কত কাজি
ধাইল ছাড়ি নমাজে
বড় বড় দাড়ি
চামের ঝাড়ি
গোঁফ উঠে শির
নমশূদ্রের গুরু
গুরুচাঁদ গুরু
সমরে যখন নিধিতেছে।

যারা শুনছে তাদের ভাল লাগছে—বাচ্চা বা বুড়োবুড়িরা হাসছে বেশ জোরে। মাঝারি ভারী গলায় বাহবাও শোনা যায়। বৈরাগীর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভিড়। এতদিন ধরে গানটার তারিফ চলছে কিন্তু বৈরাগী ছাড়া তো কেউ গানটার লেজামুণ্ডু জানে না। তারা এই গানের টুকরোটাকরা গায়।

যোগেন পায়ে-পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় বৈরাগীর পাশে। বৈরাগী মাটি ছুঁয়ে নমস্কার করে ঘুরে ঢোলওয়ালার গলা থেকে ঝোলানো ঢোলটা খুলে এনে যোগেনকে পরিয়ে দেয়। যোগেন, ঢোলে টোকা দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে চোখদুটো ঢোলে ফিরিয়ে এনে কিছু জিজ্ঞাসা করে বৈরাগীকে। বৈরাগী হেসে সম্মতি দেয়।

ঢোলটা যোগেনের টোকায় জোরে বেজে উঠতেই যোগেন বেশ উঁচু গলায় গানের সুরে বৈরাগীকে জিজ্ঞাসা করে।

প্রশ্ন : যোগেন
পদ্মবিলায় যাবৎ যবন যদি নিধনই করিলা।
তাইলে এত মজুত যবন কোথাথিক্যা পাইলা।।

হাসির সঙ্গে হাততালি ও গলার আওয়াজে শ্রোতারা তাদের সমর্থন জানিয়ে দেয়। তারা বুঝে গেছে ধাঁধা খেলা শুরু হল। প্রাথমিক এইসব প্রস্তাবন-গ্রহণে একটু সময় গেল। সেই সময়টুকু বৈরাগী উত্তরটা ভেবে নিয়েছে। যোগেন মণ্ডল নিশ্চয়ই তার কাছা খুলে জব্দ করতে চায় না। বৈরাগীর তো রাজি না-হয়ে কোনো উপায়ই ছিল না। মণ্ডলমশায় তার সঙ্গে তরজায় নেমেছে, এ তো বৈরাগীর পক্ষে সৌভাগ্য। সে গলাটা তুলে বেশ ভাল করেই জবাব দেয়।

উত্তর : বৈরাগী
এক মরদে চাইর বিবি ফরজ যদি হয়।
একই দিনে চাইর সুরতে চাইর পোয়াতি হয়।।

যোগেন হেসে ফেলে। যোগেন উঠে এসেছে তো পালটা-করি গাইতো। বৈরাগী তাকে যেন না টেনে রাখে। ঢোল আর একটু সরব হয়,

প্রশ্ন : যোগেন
এ তো বিবি চাইরজন, এক আঙুলে গনা,
এক কেষ্ঠ ঠাকুরের পত্নী সাতাইশ হাজার জনা
বৌ গুইন্যা শ্যাষ হব হিন্দু-শেখ মানা?

যোগেন ঢোলে বাঁ-হাতে একটা উঁচু শব্দ তুলে জিজ্ঞাসা করে, ‘হিন্দু কয় কারে?’

উত্তর : বৈরাগী
বেদ-ধর্ম মাইন্যা যারা চলে এ-সংসারে।

প্রশ্ন : যোগেন
মাইতে চাহিলেও কাগো তেমন মানা অপরাধ?

উত্তর : বৈরাগী
শুদ্দুর আর যবন হইল বেদ থিক্যা বাদ।

প্রশ্ন : যোগেন
শূদ্র আর শ্যাখ তাইলে আত্মীয় দাঁড়ায়?

উত্তর : বৈরাগী
ক্যামনে আত্মীয়তার সম্বন্ধ-বন্ধন?

প্রশ্ন : যোগেন
প্রকৃতি-পুরুষে যেমন সন্তান ধারণ

যোগেন
শ্রীরামচন্দ্রের কী হন শ্রীমান লক্ষ্মণ?

বৈরাগী
এক গর্ভ হইতে এক যমজ যেমন।

যোগেন
রাম ও লক্ষ্মণ কিন্তু সাতাইল্যা ভাই।
বৈমাত্রেয় দুই ভাই তাতে সন্দ নাই।।

বৈরাগী
সত্যাইল্যা হইয়াও সহোদর আমি।

যোগেন
সাতাইটাও তাইলে তোর গায়ে।

প্ৰাণাধিক
তেমনি প্রাণাধি হেয় শুদ্দুর মুসলমান।

শেখ আর শুদ্দুরের একই দুশমন।
বামুন-কায়েত-বৈদ্য উচ্চ হিন্দুগণ।
পদ্মবিলায় কুনো কালে কাইজ্যা হয় না।
কাইজ্যার গল্প-গান সব মিথ্যা রটনা।।

তরজা শেষ। বৈরাগী এসে যোগেনের হাঁটু ছুঁয়ে সেবা দেয়। যোগেন তাকে বলে, ‘যাইয়ো না। খাড়াও।’

ঢোলটা বাজাতে-বাজাতে ভিড়ের নড়াচড়া দেখে যোগেন বোঝে—তরজার শেষ বলতে দেখতে-শুনতে-বুঝতে এদের যে-ধারণা—তার সঙ্গে এই শেষ-হওয়াটা মেলে না। শেষে একটা গৌরগান গাইলে হত। পদ তৈরি করতে-করতে যোগেনের খেয়াল ছিল না। অন্য তরজায় তো এই খেয়ালের দরকার পড়ে না। পদের পর পদই গৌরপদে পৌঁছে দেয়। যোগেন যে এতদূর পর্যন্ত বলে ফেলবে, বামুন-কায়েত-বৈদ্যরাই হচ্ছে শূদ্র-মুসলমানের একমাত্র শত্রু, সে নিজে অতটা প্রস্তুতি ছিল না। পদ তৈরির বাধ্যতায় ঐ কথাটি অত সরল হয়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল। তার আর উপায় ছিল না। শেষ কথাটি না বলে, ‘পদ্মবিল্যায় কোনোকালে কাইজ্যা হয় নাই।’

এই এত লোকজন স্নানযাত্রায় ওড়াকান্দির মেলায় এসেছে। সেই মেলার সঙ্গে ‘নমশূদ্র বিজয়’ যোগ করে মেলাটাকে আত্মসাৎ করা তার কোনো দিনই পছন্দ না আর আইনসভা থেকেই খুব আবছা এই একটা ধারণা তার মাথায় ঢুকেছে—হিন্দু-মুসলমান কাইজ্যায় নমশূদ্র বা শিডিউল্ড কাস্টরা কেন হিন্দুপক্ষ হবে? এই গান বানাতে-বানাতে সেই আবছাটা কেটে গেল তার।

তার আবছা কেটে গেলেও, সে বুঝল, ভিড়ের কাছে আবছা হয়ে গেল। ভিড়টাকে যোগেন কি একটু উদ্বিগ্ন করে ফেলল? তেমন উদ্বেগ তৈরি না করে কি যোগেন তার কথা বলতে পারত? যোগেন চাইল—এই ভিড়টাকে তার অভ্যস্ত ও প্রত্যাশিত আনন্দে ফিরিয়ে নিতে। বৈরাগীকে সে বলে, ‘গলা দ্যাও।’ তারপর ঢোলে দুই নরম টোকা দিয়ে নরম করে গেয়ে উঠল—’তিলেক দাঁড়াও শ্যাম রায়।’ ভিড়টা একসঙ্গে আঃ বলে শ্বাস ফেলল। দু-একজন দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তারা ধপধপ করে বসে পড়ে। সকলের প্রাণের গান।

কোন্ রন্ধ্রে পুরে বাঁশি কুলবতীর মন
কোন্ রন্ধ্রে পুরে বাঁশি রাধায় কর উদাসিনী
সাক্ষাতে বাজাও, শুনি। আমার মাথা খাও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *