১০
2 of 4

৬৬. ভাদ্রের স্নানযাত্রা আর নমশূদ্রবিজয় যাত্রা

৬৬. ভাদ্রের স্নানযাত্রা আর নমশূদ্রবিজয় যাত্রা

ওরা ঠাকুরবাড়িতে পৌঁছেই গিয়েছিল প্রায়। রাস্তায় লোকজন বাড়ছে, তবে, তেমন কিছু নয়। ভিড় বাড়বে দুপুরের মহোচ্ছবের সময় থেকে রাত পর্যন্ত। আলোর একটা ব্যবস্থা থাকে— দুটো-চারটে হ্যাজাক বা ডেলাইট। যারা আসে তাদের সঙ্গে না-জ্বালানো হ্যারিকেন থাকেই। এত বেশি প্রাকৃতিক আলো ও অন্ধকারে এই মানুষজনের বসবাস, যে দুটো-চারটে হ্যাজাক বা ডেলাইটের অপ্রাকৃত দীপ্তিতে এত মানুষজনের মুখগুলিকে এত দীপিত দেখা ছেড়ে উঠতে মন চায় না। বিকেলের দিক থেকেই তাই ভিড় বাড়তে থাকে।

কিন্তু যারা মোড়ল-মাতব্বর-নেতা তাদের আসার সময় ঐ দুপুরের ভোগের মুখে-মুখে। পুজোআর্চায় ভোগই তো আসল অনুষ্ঠান। ভোগের সময় ভাতের ও ধূপের গন্ধ মিলিয়ে একটা গন্ধ ছড়ায়। সব মিলিয়ে মনে থাকে না—এটা নমশূদ্রদের পরব। কিছু মুসলমানও এটাকে পরব মানে

এগতে-এগতে দেখা হয় ওদের সঙ্গে চেনাজানা মানুষের। দাঁড়িয়ে একটু কথা বলতে হয়। যার সঙ্গে যা সম্পর্ক সেই ধরে ডাকাডাকিও চলে, ‘ও মিয়াশাহেব’, ‘মুহুরিমশায়,’

‘ঠাকুরবাড়ি মুহুরি কেডা, বেবাক মাগুইর্যা’, ‘মা তো দিনে ভালো, রাইতে কানা’।

এরাও তো মানুষজনকে ডেকে জানান দেয়। ‘ও, তালই, তালইই আছো নাকী বেহাই হইছ।’

‘ধুত শালা, এমএল হইছ, লগে ব্যান্ডপার্টি নাই।’

চেনা-আত্মীয়-কুটুম মেয়েদের সঙ্গে, গিন্নিদের সঙ্গে তো এই দেখায় আলাদা করে কথা না বললে তাদের দুঃখ হয়। যোগেনেরও হয়, দুঃখ।

‘মেলার মইধ্যে খেলার কথা কই ক্যামনে?’

‘ক্যা? কেষ্ট ঠাউর তো সেই ব্যবস্থাই কইর‍্যা দিছেন। বারমাসে বার যাত্রা।’

‘কবরাজ ব্যবস্থা দিলেই তো পাঁচন উইড়্যা আসে না।’

‘পাচন উইড়ব্যার যাইব ক্যান? উইড়লে উইড়ব শরবৎ। ‘কইলকাতাত নি বুলিশেখার ইশকুল আছে?’

‘জ্যাঠা, আমারে তুমি চিইনব্যার পারো নাই!’

‘খাড়া, নজর কইরা দেহি মা কী কী বদলাইছ? নড়াইলের জল য্যান ধলা- ‘জ্যাঠা, চিইনব্যার পারছ?’

‘সেই দুঃখে নি কাঁদিস? বোকা মাইয়্যা।’

‘জ্যাঠা, এইহান থিক্যা এইহান, একখানই তো নদী, এত দূর ঠ্যাকে ক্যা?’

‘ঐডা তোমার সংসার, তোমার নিজের সংসার। দূর হইব ক্যা? জামাই আইছে?’

‘আইসব্যার চাইছিল। আমি কই, না, থাহ। আমি এডডু বাপের বাড়ি কইর‍্যা আসি।’

‘খাঁশাহেব, অ্যাহনো কি ছুঁচে সুতো পরাবার পারেন?’

‘ম ন ড ল! বুকে আইস। তোমার তেমন সন্দেহের হেতু কি কিছু ঘটছে বাপ?’

‘এর থিক্যা দুর্ঘটন আর কী ঘইটব্যার পারে? আপনার নমাজি টুপির সুতির কাম দেইখতে বেবাক মানুষ আসে দুনিয়া থিক্যা। তেমন যার সূক্ষ্মদৃষ্টি স্যায় কী না আমার নাগাল একডা মহিষরে দেইখবার পায় না?’

‘ম ণ ড ল। বাপ। বুকে আইসো। অমন করার নাই। দুঃখ লাগে। তুমি বাপ কি শুধু চক্ষুতে আঁটা?’

‘মোক্তার কর্তা! ঐ জালচুরির মামলাডা মিটাইয়্যা নিছি।’

‘ভালোা কইরছ। আমার পয়সাডা দিয়া আইস।’

এমন সব কথাবার্তার দেখাশোনার মধ্যে, তারা যে-আলাপ করছিল, সেটা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে যায়। তারপর ওরা যেন ভুলেও যায়।

শিবু বলে, ‘আমি এডডু তাড়াতাড়ি চইলল্যাম—ভোগের আগে তো পূজাড়া দেয়া লাগে।’

পি আর ঠাকুর এগিয়ে আসছে। খুব শাদা একটা ধুতি লম্বা করে পরা, খুঁটটা গায়ে জড়ানো পাতলা, ধবধবে, একটা নেটের গেঞ্জির ওপর। ঠাকুরদা গুরুচাঁদ তো আর শুধু ঠাকুরদাই ছিলেন না, ছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান। সে দায়দায়িত্ব তো পি-আর-এর ওপরই পড়েছে। সেই ধরলে একটু রোগা দেখায়। গত আইনসভা তো করতেই পারেনি।

‘যোগেনবাবু যে এসেছেন, শুনেছি। দেখা করতে যাওয়ারও খুব দরকার ছিল। সে তো হলই না। আজও তো হবে না। আমি তো লাস্ট সেশনে মুখ দেখাতেও পারিনি। এবার একসঙ্গে এতগুলো বিল! আপনি দেখেছেন নাকী ড্রাফট?’

‘এড্‌ডু আধডু চোখ বুলাইছি। আমাগ খুব মুশকিল।’

‘আমাগর সিংগুলার নাম্বারটা কী?’

‘আমি আপনার জেরার যোগ্য পাত্র না, ঠাকুর।’

‘এই সিংগুলারহীন প্লুরাল প্রোনাউন হচ্ছে সবচেয়ে বিপদের।’

‘তাইলে তো আপনে ধইরাই ফেইলছেন—আমাগর সিংগুলারও আমাগ।’

হাসির একটা হুল্লোর ওঠে—সবচেয়ে জোরে হাসে যোগেন।

হাসি থামলে যোগেন বলে—’অ্যাহন আপনার ঘাড়ে এই যজ্ঞিবাড়ি। অ্যাহন যজ্ঞি সামলান। পরে কথা তো হইবই।’

‘একটু ইশারা দিয়ে যান—বিপদটা কোনদিকের? না হলে কলকাতায় গিয়ে তো বোকা বনব। ‘আপনার পক্ষে বোকা হওয়াডা খুবই পরিশ্রমসাধ্য। অতডা খাটনি এই শরীরে পুষায়? তার থিক্যা অ্যাহন মানুষজন দ্যাহেন। আপনারে আমার বগলে রাখাড়া খারাপ দেহায়। আমিও একডা ঘুরান দিয়া মানুষজন দেহি।’

‘সে তো দেখবেনই। মানুষজনও তো আপনারে দেখবে।’

‘এই তো দিলেন আটকাইয়া। আরে, শেষে কি প্রিভি কাউন্সিলের ব্যারিস্টারের কাছে জজ কোর্টের উকিল পারে? আমাগ খুব মুশকিল কইছি ক্যা? বেবাকেরই তো মুশকিল। ধরেন, কংগ্রেসের মত একডা অল ইন্ডিয়া পার্টি, সত্যিকারের অল ইন্ডিয়া। শুধু বেঙ্গলের গবর্মেন্ট নিয়্যা কোনো অ্যাটিচুড ঠিক কইরব্যার পারে না। আমাগ নাগাল লোক্যাল ফ্যাক্টররে ছাইড়া দ্যান।

‘হ্যাঁ। সেটা তো কংগ্রেসের বিপদ। সব জায়গায় কংগ্রেসের গবর্মেন্ট আর এখানেও হতে পারত। ওরা ঠিক মেনে নিতেই পারছে না ওরা গবর্মেন্টে নেই।’

‘সেইডা বিপদ না? আমাগ? সিস্টেমডা খাড়াইব ক্যামনে?

‘এই তো সেদিন গবর্মেন্ট হল। তাও তিল কুড়িয়ে বেল। ও সেট্‌ করে যাবে।’

‘সেলডা করব কে–হকসাহেব, না লিগ, না গবর্নর?

‘হ্যাঁ। এটা সিরিয়াস ব্যাপার। গবর্নরও বোধহয় এমনই চান।

‘তাইলে আমাগ বিপদড়া বাড়ে না? শিডিউল এমএলএগ তো প্রধান টানডা শিডিউলের দিকে। এদিকে অন্য পার্টির টানাটানি।’

‘আপনার মুখে এত পরিষ্কার কথা শুনলে সন্দেহ হয়, উলটো কথাটা আপনি আমাকে দিয়ে বলাতে চান। না, আমারও মনে হয়, কারণ আলাদা-আলাদা হতে পারে কিন্তু শিডিউল মেম্বারদের অনেস্ট অবলিগেশন একটা আছে।’

‘ভালা কইছেন। আপনার কাছে আমার অবলিগেশনের অনেস্টি বোঝার কোনো পরীক্ষার যন্তর আছে? মনে-মনেও?’

‘সেটা আমার থাকবে কী করে? খাটা কিন্তু আপনি বললেন—যে এই চাওয়াটায় শিডিউল মেম্বারদের কোনো ফাঁকি নেই।’

‘এই কথাডা কিন্তু ভাইবাই বলছিল্যাম। অ্যাহন বড়জোর যোগ কইরব্যার চায়—ইফ অ্যালাউড’।

‘যোগেনবাবু, এরপর; বলতে হবে–টুবি অনেস্ট, অথবা, টুবি অব স্পেশ্যাল ক্যাটিগরি, আর এটাও তো বলতে চাই কথাটা কিন্তু পুরনো যে ডিপ্রেসড ক্লাসকে অ্যান্টি-ন্যাশন্যালিস্টরা কাজে লাগাচ্ছে। আপনিও তো সেরকমই যেন বলছেন যে আমাদের চাওয়ার অনেস্টি ততদিন খাঁটি থাকবে, যতক্ষণ তেমন থাকতে দেয়া হবে, মানে বাইরের কেউ দেবে, সেটা শাহেবরাও হতে পারে, সেটা স্বদেশীরাও হতে পারে, সেটা আমরা নিজেরাও হতে পারি। আপনি কথাটা শেষ করলেন না।’

‘আমি কে শেষ করার, যদি নিজে থেকে শেষ না হয়। ঐ যে শিডিউল ইউনিটি কি রাখতে চাব্যার পারে কেউ, ধরেন, রসিক কাকার মত কেউ, যিনি বিপদের সময় কংগ্রেসে গিছেন আর তাঁর কপালে শুধু জুটেছে গালি। তাঁর কাছে কোটা বড়—প্রসন্নদেব রায়কতকে শিডিউল্ড কাস্ট মিনিস্টার বইল্যা মানা। নাকী কংগ্রেসকে শিডিউল্ড কাস্ট সম্পর্কে সচেতন করা?’

‘দুটো একসঙ্গে হবে না—মনে করছেন?’

‘সব পার্টিই তো শিডিউল কাস্ট মেম্বারদের সম্পর্কে অনেক নরম। গান্ধীও এখন কংগ্রেসের কর্মসূচিতে শিডিউলদের দাবিদাওয়ার জায়গা কইরছেন। কিন্তু পার্টি কি তার মেম্বারদের হুইপ দিবে না? ধরেন, যদি একডা এমন বিষয় ওঠে—যে-বিষয়ে কংগ্রেসের আর শিডিউলগ ইনটারেস্ট আলাদা, তহন আমরা কার কথা শুইনব বা বইলব?’

ভীষ্মদেব দাশ এসে এদের আড্ডা ভেঙে দিল, ‘আচ্ছা, ঠাকুর আর মণ্ডল কি অ্যাসেম্বলি ছাড়া কোনো কথা কইছে?’ একমাত্র সাক্ষী প্রহ্লাদ, হাসে। ‘তোমার পিতৃদায়! আর এখানে খাড়াইয়্যা আইনসভা কইরতেছ?’

‘আজ আমার পিতৃদায় কেন হবে? সে তো যখন হয়েছে তখন ওড়াকান্দির বাইরে এক পাও যাইনি, দশদিন হবিষ্যি করেছি। আজ তো মেলা। আজ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে না?’

‘নিশ্চয়ই দেখা হবে। কিন্তু যদি বন্ধু বন্ধুকে দেখলেই ধর্মের ষাঁড়ের মত লেজ তুলে সামনের দুই পা তুলে দিতে চায়—তাহলে লাঠিপেটা করতে হবে।’

যথোচিত হাসির পর যোগেন ভীষ্মদেবের কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘বাপের জামাই, এই মেলায় তো গানটান হবে। তার লগে লাগাইয়্যা দ্যাও একডা খামার-কীৰ্তন—’

সকলের হাসির মধ্যে ভীষ্মদেব বলে, ‘তোদের বরিশাল-বাকলার সঙ্গে কেউ কি খামারে পারে? দেখিস না? দেখ, গোপালগঞ্জের সবই কেমন নেতানো, দেখেই বোঝা যায়, এ-দেশে খাড়াইন্যা পুরুষের অভাব।’

‘বলব নাকী ডেকে একটু পৌরুষ দেখাতে?’ ঠাকুর যোগ করে, ‘কাকা, একটা খবর দেয়ার আছে। আমরা বাড়ির সবাই একমত হয়ে এই ঠাকুরবাড়িকে ‘গুরুচাঁদ মিশন’ করেছি। ওঁর থাকা আর না-থাকাটার মধ্যে তফাত বিস্তর। উনি উপস্থিত না-থাকলে আশ্রম কি আর আগের মত থাকতে পারে। তার চাইতে ‘মিশন’ করলে আমরা সব জায়গাতেই কাজ করতে পারব—রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রমের মত।

ভীষ্মদেব বলে, ‘তুমি উদাহরণটা দিলা তাই বলি ওদের সঙ্গে যেন শিষ্যা না যায়, অন কমিউন্যাল কোশ্চেন।

‘এ-কথাডা কি অ্যাহন প্রকাশ্যে বলাকওয়া শুরু হওয়া উচিত না জামাই যে নমশূদ্ররা কোনোভাবেই হিন্দুসভা কী মিশন কী সেবাশ্রম কী কংগ্রেসের ফর্মুলায় নিজেদের কমিউন্যাল পজিশন ঠিক কইরবে না। এই জায়গাড়া গোলমাল হয়্যা আছে।’

‘খুব বেশি আছে? একটু কুয়াশা থাকা তো ভাল। ধর্মের ব্যাপার তো। সবারই নিজের সেন্টিমেন্ট থাকে তাছাড়া, তাত্ত্বিক কথা হিশেবে কেউ বলতে পারে। তুমি বোধহয় অর্গানাইজেশন্যালি বলতে চাও? তাতে কি আমাদের সমাজের সবাই একমত?’

এর মধ্যে একটা হৈচৈ পড়ে যায়। পি আর ঠাকুর বলে, ‘ভোগ দেয়া শুরু হল—’

প্রহ্লাদ বলে ওঠে, ‘এই যোগেন, চলো, চলো, শেষে জায়গা পাব না—নোর পাইর্যা চলো, বিশ্ব জ্যাঠা চলেন। ততক্ষণে মাঠের মধ্যে লাইন দিয়ে লোক বসে যেতে শুরু করেছে—হাতে কলাপাতা আর মাটির খুড়ি নিয়ে। যে-জায়গাটাকে লক্ষ করে প্রহ্লাদ, ভীষ্মদেব আর যোগেন ছুটছিলই প্রায়, তার কাছাকাছি হতেই প্রহ্লাদ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কাম সাইরছে। তোমাগো লেকচার মারাইতে গিয়া তো কলাপাতা-খুড়ি সংগ্রহ হয় নাই।’

যোগেন বলে ওঠে, ‘আপনারা বইস্যা পড়েন, আমার জায়গাডা রাইখবেন, আমি পাতাখুড়ি আইনতেছি।’

আরো অনেকের সঙ্গে যোগেনও দৌড়য়। কোঁচার কাপড়টা আর জুতোটায় জড়িয়ে পড়ছিল বলে যোগেন একহাতে কাপড়টাই তুলে নেয় হাঁটুর কাছে। দৌড়তে গিয়ে যোগেন দেখে, সে যতটা দ্রুত দৌড়য় বলে তার ধারণা, কিছুতেই সেই বেগটা পাচ্ছে না। তারপর, জোর দিয়ে চেষ্টা করতে গিয়ে বোঝে জুতোটা বাধা হচ্ছে। যোগেন মুখে যদিও বলেনি, মনে মনে কয়েকবার ‘শালা জুতামারানি’ বলে রাগ জানালেও জুতোটা কিন্তু পা থেকে খুলে ছুঁড়ে দেয়নি—দামের হিশেবটা তার খেয়াল ছিল। সে খেয়ালে এটাও ছিল যে কোর্টে যাওয়ার জন্য প্যান্টকোটের সঙ্গে পরার বুটজুতোটা এখন ব্যবহারই করা হয় না।

কলাপাতাগুলো পাঁজা করা ছিল না—গোটা পাতা ডাঁই করা ছিল। নিজেদের সাইজ করে নিতে হবে। যোগেন টান দিয়ে পাতা বের করে কিন্তু কাটবে কী করে? যোগেন টেনেছিল একটা মোটা ডাঁটের দু-পাতি পাতা। সে সেটা ডাঁইয়ে ফেলে, একটা সরু ডাঁটের একপাতি পাতা টানে, যেন তার ফলে সাইজ করার চাকু বা দা তার হাতে এসে যাবে। যোগেন একটা বাঁশের বাতার চাঁচ চেগার থেকে একটা টেনে ভেঙে দুটো দুই-হাতে নিয়ে খাওয়ার জায়গার দিকে দৌড়তে গিয়ে দেখে আবার সেই কোঁচা-জুতোয় জড়িয়ে যাচ্ছে। ‘শালা, য্যান নারানশিলা নিয়্যা যাত্যাছি,’ নিজেকে এই গালটা দিয়ে সে বাতাধরা হাতটি দিয়ে কোঁচা টেনে তোলে। ‘এর মইধ্যে প্রহ্লাদদা একপাক ঘুইরা গ্যাল না কী?’

ওড়াকান্দির স্নানযাত্রার মেলার নিয়ম—কেউ কারো কাজ করে দেবে না। ‘বেগাড় নাই।’ কেউ কারো জন্যে প্রসাদ এনে দিলে কিংবা পাতা এনে দিলে কিংবা জল এনে দিলে কিংবা পাতা কুড়িয়ে নিলে ঠাকুরের অসম্মান হয়। গুরুচাঁদের বাণী আছে—সারা বচ্ছর বেগাড় দেই/একডা দিন শোধ নেই। এখানে স্নানযাত্রার মেলায় গড়াতে গড়াতে আসা বুড়িও কারো হাত থেকে জল নেয় না, মেলায়।

যোগেন এইসব নমশূদ্র ধর্মীয় গুরু গিরিটিরির ধারেকাছে নেই। সে যে নিজে হাতে পাতা আনতে ছোটে, সেটা একটা যৌথ-আচারের প্রতি অচেতন আনুগত্য। সে-আচারে এটুকু ভেজাল তো ঢুকেইছে যে দু-জন জায়গা রাখল তিনজনের জন্য, বা একজন পাতা আনল তিনজনের। বা, তারা পাতাকাটা শুরু করার আগেই নোন্তা শেখ এসে বলে, ‘এ-ই, পেল্লাদ, এডডু হোগা গুটাইয়্যা সর্’, মানে উনি লাইন টপকে এখানে এদের মধ্যেই বসবেন। ওরা নোস্তা শেখকেও পাতা এগিয়ে দেয়। নোন্তা শেখ সেটা উলটো করে পাতে।

গলা খিচুড়ির একটা বিশাল হাঁড়ি কয়েকজন মিলে টেনে এনে রাখে। তার ভিতরে নারকেলের অর্ধেক মালই একটা হাতার মত লাঠি দিয়ে গাঁথা। সেই হাতায় নিজেকে প্রসাদ পরিবেষণ করতে হয়। কলাপাতায় আর গলা খিঁচুড়ি কতটুকু আঁটবে? বেশি নিলে তো আবার গড়িয়ে পড়ে। পড়েও। কম নিলে তো আবার পেট ভরে না। যতক্ষণ প্রসাদ খাওয়া চলে, ততক্ষণ বেশিরভাগই সেই ডেকচি ঘিরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খায় আর মাঝেমধ্যে হাতা ডুবিয়ে খিচুড়ি তোলে পাতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *