১০
2 of 4

৬১. শিডিউল আর মুসলমানদের মিলমিশই বেশি

৬১. শিডিউল আর মুসলমানদের মিলমিশই বেশি

যোগেন-প্রহ্লাদ-শিবু চলছিল এইসব বলাবলি করতে করতে। সরকারি আইনে তো নমশূদ্ররা আলাদা জাত হিশেবে স্বীকৃত। দু-জন মন্ত্রীও করা হয়েছে তপশিলি থেকে। মন্ত্রিসভায় হিন্দু-মুসলিম অনুপাত হিন্দুদের পক্ষে দেখাতে তপশিলি মন্ত্রীদের হিন্দু বলা হয়। আবার, শাহেবদের বেঙ্গলের সব জাতপাত নিয়েই যে এই সরকার, তা বোঝাতে তপশিলিদের আলাদা করে তপশিলিই বলা হয়। শাহেবরা চায় তপশিলিরা আলাদা থাকে।

আলাদা মানে, আলাদা জাত হিশেবে মুসলমানরা শিক্ষা, সরকারি চাকরি ইত্যাদিতে যেমন শতকরা ভাগ পেয়েছে, শিডিউলরাও তাই চায়। তার মধ্যে রাজবংশী ও নমশূদ্রই প্রধান শিডিউলদের আর মুসলমানদের তো বামুন-কায়েত-বৈদ্যরা গ্রামের ভিতরে থাকতেই দিত না। চণ্ডাল ও যবন বলে তাদের গ্রামের বাইরে, প্রায় দেশের বাইরেই, থাকতে হত। এক সৈয়দ মুসলমানদের কেউ-কেউ গ্রামের ভিতরেই থাকত। শিডিউল আর মুসলমানদের মধ্যে কোনো গোলমাল নেই। গোলমাল পাকালে দুই সম্প্রদায়েরই ক্ষতি। দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের সুযোগ এর আগে কখনো এতটা নাগালে আসেনি।

কথাগুলো যে এমন করে ভাবা হচ্ছে, বলা যাচ্ছে তার সবচেয়ে বড় কারণ শাহেবদের সমর্থনে কথাটা আর বামুন-শুদ্দুরে আটকে নেই। আরো অনেক কথাই উঠছে ও উঠবে। বাংলার কৃষিতে কী কী ভাগ ছিল, বাংলার নদীগুলিতে কতটা জল ছিল, কী করে এই বিলগুলি তৈরি হল, নমশূদ্রদের এখানেই আসতে হল কেন, গরিব মুসলমানদেরও, নদী কেন শাহেবদের বেঙ্গলে মুখ ফেরায়, পাট চাষ শুরু হল ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের আর ঢাকা বন্যার একশ বছর পর, তারপরের চল্লিশ বছর কমবেশি সকলেই, হিন্দু-মুসলমান, সৈয়দ-নেড়ে, বামুন-শুদ্দুর, জমিদার-চাষি সকলেরই তো একটু ভাল হল।

নমশূদ্রদের যে চলে আসতে হল এই বিল-এলাকায় সেই বিচ্ছিন্নতাই কি একটা বিশেষ সময়ে রাজনীতির একটা পৃথক শক্তি হওয়ার দিকে ঠেলছিল? মুসলমানদেরও কি অনেকটা তাই? নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বুঝতেও মুসলমানদের সময় লেগেছে। সমাজ-অধিকারের অভাব বুঝতে এক বেলার হাটই যথেষ্ঠ। সমানাধিকারে অভাব থেকেই কি মুসলমানরা পৃথক শক্তি হয়ে উঠছিল?

বিলগুলি ১৭৭৮-এর ঢাকা বন্যার ফল। নদী খাত বদলেছে, খাতটা থেকে গেছে, এমন, যেন নদীটা আছে। খাত বদলানো নদীর পক্ষে খুব স্বাভাবিক নয়। খাতটা তৈরিই হয়, নদীর বা প্রবহমাণ জলরাশির স্বভাবে। যেদিকে ঢাল, নদী তো সেদিকেই বয়। কোনো কারণে মাটির ঢাল যদি বদলে যায়, ধীরে-ধীরে, নদী যে-পলি টানছে সেটাই কোনো একটা জায়গায় জলের তলে যদি জমে উঠতে থাকে, তাহলে, ঐ পথে নৌকো নিয়ে যাদের রোজ যাতায়াত তারা জলের রঙেও বোঝে, স্রোতের হেরফেরেও বোঝে, আরো কী কী ভাবে বোঝে তা আর কে জানে, কিন্তু বোঝে। অববাহিকার নদী এক ধাক্কায় ঐ ডোবা চর ভাসিয়েও দিতে পারে, যদি খুব কম সময়ে খুব বেশি বৃষ্টি হয়।

আবার উলটোটাও তো হয়, বেশিই হয়।

শাহেবদের বেঙ্গলে নদীর সরে যাওয়া, নদীর পাড় ছেড়ে যাওয়া, নদীর পাশ ফেরা, নদীর মুখফেরানো, পুরুষ-নারীর সম্পর্কের আদল পেয়ে গেল নাকী শাহেবদের বেঙ্গলে কি নদীগুলোর স্বভাব-চরিত্র বদলাল?

আগে, শাহেবদের আগে, নদী ছিল পাড়ে বাঁধা। শাহেবদের আগে নদী ছিল দেশান্তর, আবার, দেশান্তরে যাওয়ার, বা দেশান্তর থেকে ফেরার সাঁকো। শাহেবদের আগে নদীর জল ছিল আত্মরক্ষার অন্তঃপুর।

সৈ সৈ সৈ, আর কী দেখা
ঘাটের কূলে?
দেখি, সারি সারি মাইয়্যা।
পাও দিয়্যা জলে
আউল্যা দিছে চুলে।
মেয়ে না, মেয়ে না, ঐগুলা
নদীর ঢেউয়ের ছলা।
ঢেউ থ্যামল ভাঙে তেমন
ঘোমটা টাইন্যা মাথায়
ডুব দিল জলে।
সৈ সৈ সৈ, লরম বাসিস কীরে?
ঐ দ্যাহো না কানাই ঠাকুর
জলের সাঁকো বায়।
লাজ বাইসল্যাম তারে।

শাহেবদের পরে গ্রামের ছোট খালটাও হয়ে যায় কূলহীন, পাড় হীন, শক্তিমনে।

কোঁয়ারি লো,
বন্ধুরে ফিরায়্যা দ্যাও ভালমতে

বরিশালে উনিশ শতকের মাঝামাঝিও মুসলমান মেয়ে খেয়ামাঝি ছিল—খোলাসচন্দ্র লিখে রেখে গেছেন। তখনো তাকে নিয়ে মশকরা ছিল—

তোর নিজের কোমরের যা ওজন
তোর ডিঙা ডুবতে কতক্ষণ?

এই উপকথাময় বিলময় প্রদেশে নদীর মুখফেরানোর নতুন উপমা তৈরি হতে লাগল নতুন-নতুন চাষের মত। কত বড় নদী খাল দিয়ে বইল, কত নদী তার পাড় হারিয়ে ফেলল, যে শূদ্রানী আর যবনী ছাড়া খেয়া পারাপার চলে না।

যদি একটা কথা তোলা না হয় যে নমশূদ্রদের আদিবাস কোথায় ছিল—তাহলে শাদাসিধে একটা পথের হদিশ করা যায় ১৭৬৯ থেকে ১৭৭৯ পর্যন্ত। এই দশটা বছরে নমশূদ্রদের পৌঁছে দেয়া যায় দুর্ভিক্ষ—মৃত্যুর কোনো প্রদেশ থেকে পলাতক জনগোষ্ঠী হিশেবে ৭৮-এর বন্যায় তৈরি এই বিলগুলিতে।

নমশূদ্রদের এই দীর্ঘ বহির্যাত্রায় প্রতিষ্ঠিত প্রদেশের বাইরে তাদের চলে আসায় উচ্চ হিন্দুদের শাস্ত্রীয় বচনের অনুসরণ থাকতে পারে—চণ্ডালরা জনপদের বাইরে থাকবে। এর চাইতে বাহির তো আর ছিল না, নদীগুলি যেখানে এসে শেষ হয়ে যায়। এমন সে-জায়গা, যে নিজেদের যাতায়াতের জন্য সেই সব জায়গার নতুন-নতুন নাম দরকার হয়। পদ্মা, উত্তর থেকে ঢুকে ফরিদপুরের উত্তর-পুব দিয়ে নেমে যাওয়ার পথে, একবার কুমার নদীতে ঢুকে, আর-একবার আড়িয়াল খাঁতে ঢুকে দুটো আবর্ত তৈরি করেছে। কুমার নদীর পুরনো সোঁতা এখনো আছে—কুমোরের পুরনো-সোঁতা বলেই। এই দুই আবর্তের মধ্যে ও আশপাশে যে-জমিগুলি পড়ে ছিল বা গড়ে উঠেছিল ১৭৭৮-এর বন্যার পর, সেখানে সব গ্রামেরই নাম ‘চর’ দিয়ে। চর মাধবদিয়া, উত্তর চর মাধবদিয়া, চর টেপুয়া-কান্দি, ডিক্রির চর, চর হরিনামপুর, চর মহানামিয়া, চর ইজদ্দিন, চর মাইজাদ্দিন, চর আমরাপুর, চর চাঁদপুর, চর বিষ্ণুপুর, আক্তার চর, বুড়ি রায়ের চর, ভাসান চর, চর মোনাইর। অথচ ফরিদপুরের অন্য কোথাও এমন ‘চর’ দিয়ে গ্রামের নাম হয় না। নদী ছাড়া চর হয় না, সে চরে নদী আর কোনো দখল রাখে না। নদী ছাড়া বিলও হয় না, বিলে নদীর চিহ্ন থাকে, দখলও থাকে একটু-আধটু। নদীর যেমন বিস্তার থাকে, বিলেরও থাকে তেমন বিস্তার—কিন্তু ধ্বংসের মত, ছন্নছাড়া, কাউকে আহ্বান করে না। জলও আছে বিলের, টানা জল, নানা গভীরতার। আবার ছেঁড়া জল নেমে গেছে গুহার মত। বিলের নদীরও নাম থাকে কিন্তু সে-নাম রক্ষা করা খুব কঠিন। বেশ মাইল-মাইল তফাতের চার নদী বর্ষায় হয়ে গেল মিলেমিশে একটাই হাওড়।

মাইলের পর মাইল শুকনো গাছের জঙ্গল সে-জঙ্গলের পাতা গরু-ছাগলে খায় না। আবার এক বাঁকে টলটলায় পদ্মপাতা। পদ্মপাতায় আর পানিখোঁচা পাখিতে সে পদ্মবিলের জল দেখা যায় না। বিলে কোনোকিছুরই পরম্পরা নেই, ধারাক্রম নেই—পাখির না, জলের না, মাটির না, গাছের না, মাছের না, বাতাসের না। খুব একটা ছোট জায়গা যদি অজস্র-অজস্র নদীর জলের পলিতে তৈরি হয়ে থাকে, বা তত তৈরিও থাকে না, আর সেই জলস্রোতে ভেজা জায়গাটুকুতে অতগুলো নদী যদি আবার নিজেদের ভিতর জলবিনিময় করতেই থাকে, যাকে বলে ছিনিমিনি খেলা, জলের—একমাত্র তাহলেই সেখানে বিল তৈরি হতে পারে। বিলের পক্ষে মানুষের থাকা-না-থাকা খুব দরকারি নয়। কতটুকু জায়গা আর এই অববাহিকা-বদ্বীপ, সুন্দরবন থেকে উত্তরে করতোয়া-করতোয়াই তো সীমা, আর আড়াআড়ি মেহেরপুর থেকে পদ্মা। এর মধ্যে একেবারে তলা থেকে যে-বিলের ডাকনাম আছে, সেই বিলগুলির নাম বলা যায় যদি তাহলেও তো সেইসব নাম থেকে এক জনপদের আভাস আসে মনে। আমাদের অভ্যাসে নেই নেপদ-ছাড়া কোনো স্থান নাম। আমাদের অভ্যাসে নেই সংযোগহীন কোনো বিস্তার। নিচা-ভৈরবের বিল, উঁচা-ভৈরবের বিল, বাগেরহাটে মাটি যতটা—বাঘিয়া বিল-সাতলা বিল মিলে ততটাই জায়গা, বাখিয়া-সাতলা বিল জুড়ে গোপালগঞ্জ—এখন গোপালগঞ্জই চেনা নাম, পুরনো কুমারের বিল, দুর্গাদহের বিল, শিব-আত্রাইয়ের বিল, পাবনার দক্ষিণপুব আর রাজশাহির উত্তর-পশ্চিম জোড়া চলন বিল। মাঝখানে এক ডাঙার পরে গোদাই বিল। চলন আর গোদাই মিলে যেন একটা সমুদ্রের শুকনো তল।

কম-বেশি ১৭৮০ সনের এই বিল দিয়ে যোগেন-প্রহ্লাদ-শিবু হাঁটছিল ১৩৪৩-এর স্নানযাত্রার দিন। স্নান হয় ওড়কান্দির ঠাকুরবাড়িতে। এবার জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমা পড়ছে আষাঢ়ে। তাই স্নানযাত্রা চলে এসেছে শ্রাবণের দোসরা। বছর আট-দশ হল স্নানযাত্রার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছে, ‘নমশূদ্র বিজয়যাত্রা’। যারা মেলায় যাওয়ার আগে মেলার নাম-ঠিকানা জেনে নেয় তেমন লোক এখানে নেই। ‘মেলা’তেই চলে যায়। বড়জোর ‘ওড়কান্দির মেলা’ বা ‘গোপালগঞ্জের মেলা।’

‘স্নানযাত্রা’র সঙ্গে ‘বিজয়যাত্রা’ জোটে কবে থেকে তার হিশেব-নিকেশ কারোপক্ষেই খুব দরকারি নয়। যদি কারো কোনোদিন উৎসাহ হয়, তাহলে সে নিজেই হিশেব করে নিতে পারে। ১৯২৩ সাল থেকে ২৬ সাল পর্যন্ত এই পদ্মবিলায় নমশূদ্র—মুসলমানদের চতুর্বর্ষব্যাপী যুদ্ধ চলে। ১৯২৬-এ তার নিষ্পত্তি হয়। তারই দু-এক বছর পর থেকে স্নানযাত্রার সঙ্গে বিজয়যাত্রা যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। মানে, আজকের এই মেলা থেকে বছর ন-দশ আগে।

কিন্তু এ নিয়ে তো কোনো তর্ক নেই। তর্ক উঠতে পারত—পদ্মবিলায় সত্যি-সত্যি ১৯২৩-এ কোনো দাঙ্গা হয়েছিল কী না, সেটা নমশূদ্র-মুসলমান দাঙ্গা ছিল কী না, সে দাঙ্গা চার বছর ধরে চলেছিল কী না ও ১৯২৬-এ নমশূদ্রদের বিজয়ে সে-দাঙ্গার নিষ্পত্তি ঘটেছিল কী না—এইসব নিয়ে তর্ক উঠতে পারত। ভবিষ্যতেও উঠতে পারে। কিন্তু এখনো ওঠেনি।

ওঠেনি যখন, তুলে দরকার কী? যখন ওঠার, উঠবে। ঐ ‘বিজয়যাত্রা’ জুড়ে দেওয়ার বছরখানেক পর ঐ পিরশাহেবরা কথাটা তুলেছিল যে মুসলমানরাও তাহলে সবেবরাতের মেলার সঙ্গে বিজয়মালা করবে। সেটা যে শেষ পর্যন্ত হয়নি তার কারণ ফরাজিদের মেজাজ। তারা পিরশাহেবের মুখের উপরই বলে দিয়েছে, ‘লতুন লতুন হাঙ্গাম বাধাইব্যার কামডা কী? দাঙ্গায় আবার জিতাজিতি কী? অগ স্নানযাত্রা তো পুরানা। আমরা তো যাই। এর লগে সবে-বরাতের মিল কীসের?’

যোগেন যে-কথাগুলি প্রহ্লাদ-শিবুকে বলছিল, সেগুলো সে ভেবেচিন্তে ঠিক করেনি বলেই তার জানা ছিল না—আরো এত সব ইচ্ছের কথা প্রহ্লাদ আর শিবুকে সে বলতে চাইবে, অপ্রস্তুতির দেয়াল একবার ভেঙে গেলে আর মেরামতি চলে না, তখন আর-কাউকে ডেকে জুটিয়ে ভাঙনটাকে সমবেত ইচ্ছের প্রকাশ করে তোলারই চেষ্টা হয়। তার আর জয়পরাজয় থাকে না।

যোগেন বলছিল—বুঝ্যা কন, কর্তা, তালি হিন্দুরা আমাগ সিট দিলে আমরা মেম্বার, মুসলমানরা আমাগ চাকরি দিলে আমরা মিনিস্টার, তাইলে আমরা নিজেরা হইল্যামডা কী? অ্যাহন তো টাইম আইস্যা গিছে। কিছু তো আপনার হওয়া লাগব। ধরেন, এ-বছর থিক্যা তো আমরা কইতে পাইরতাম, এই মেলায় উচ্চ বর্ণহিন্দুগ ঢোকা নাই।’

‘কথাডা কী কও যোগেন, তোমার কী কাণ্ডজ্ঞান লোপ পাইল। ঠাকুর-কায়েতগো এ-মেলাতে যোগদানে এটাও তো-প্রমাণ হয় যে আমাগ রীতিনীতি স্বীকার ধইরল।’

‘আমার কথড একেবারে মাড়াইয়্যা দিলেন? আপনার রীতিনীতি আপনার কী না তা স্বীকারের লগে বামুন-কায়েতগ ডাইক্যা-পুইখ্যা আইনতে হব? আইনতেছেন তো স্যায় কম কইরাও পঞ্চাশ বছর পঞ্চাশডা বছরে একডা চুলও তো পাইকব? না কী?

‘তাই বইল্যা কি মালায় সাইনবোর্ড ঝুলান যায়—উচ্চবর্ণের যোগদান নিষেধ। কাইল তাইলে মুখ দেখাইবার পারবা?

‘কষ্ট হব্যার পারে অভ্যাস নাই তো। ঠাকুরমশাইগ, মা-গোঁসাইগ মুখ তো কালা হয় না। মা-দুগ্‌গার পূজার বাড়ির ছায়ার মধ্যেও যহন আমাগ ঢুইকবার দ্যায় না। করনির মাও, জগার তাপ, জিরান, দীরা, পুননজেঠা—এরা তো সব ঘোষাল বাড়ির ভিতরের মানুষ। সবাই রোজ দ্যাহে না ছোট ঘোষাল কর্তারছোট ছাওয়ালডা রাতদিন টুনির কাঁখে আর টুনির বোঁটা কামড়াইয়্যা রক্ত বাইর কইরা দ্যায়? এগ দেইখ্যা তো অগ মুখ কালা হয় না।

‘হয়। হয়। হয় বইল্যাই তো রাস্তায় নামছি। এডাও তো ভাইব-ব্যার লাইগব যোগেন যে ছোঁয়াছুঁয়ির বিরুদ্ধে আর মন্দিরে ঢোকাঢুকির বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণ হিন্দুও খাড়াইব্যার ধইরছে। মহাত্মা—’

‘এইসব ভোগবাজির কথা বাদ দ্যাও প্রহ্লাদদা। তোমায় যদি মানস হয় তয় না-হয় বামুনগ একডা মহোচ্ছব দিয়্যা দ্যাও।’ যোগেন হেসে ফেলে যোগ করে, ‘কিন্তু সেইহানে কোনো নম বা গান্ধীর হরিজন বইসব্যার পারব না। তেমনি যহন আমাগ মহোচ্ছবের লাইন ফেইলবা সেইখানে আমরা থাকব আর মুসলমানরা থাকব—কোনো বামুন-কায়েত, বদ্যি থাকব না।’

‘আমার মহোচ্ছব দেয়ারও কাম নাই আর তোমার বামুনগ নিমন্ত্রণ কাটারও কাম নাই।’

‘মানে অ্যাহন যেটুক যা পাইছ, তা ভালই পাইছ একডা যোগেন মেম্বার।’

‘হাঁ কমডা কী?’ মেম্বার থিক্যা মিনিস্টার হইবা।’

‘আর যোগেনডা মিনিস্টার হইলে তো নমশূদ্র জাতির উদ্ধার?

‘কথাডাতো সইত্য যে যোগেন মন্ত্রী হইলে আমাগ সমাজডার সম্মান এডডু বাড়ে। এমন মানুষ তো আমাগে মইধ্যে খুব বেশি নাই।

‘কী যে কও প্রহ্লাদদা। চিরডাকালই তো আমাগ কেউ না কেউ মন্ত্রী। তার নিট ফল হইল আগৈলঝরা ইসকুলের বেড়াও নাই ছাত্তরও নাই। আমার ভাইব্যাটা ষষ্ঠী আমাগ লগি ঠেলে। আমাগ গুরুও বেশি, মন্ত্রীও বেশি। ঐ সব হইয়্যা কিছু হইব না। আমাগ চাই নেতা। নেতা মাইন্য কইরবার মত মানুষ মাইন্যাব্যার মত মানুষ।’

‘সে তো কতই ভজায়—আমারে মানো, আমারে মানো।’

‘এই তোমার স্নানযাত্রার বিজয়যাত্রা বানায়্যা জয়যাত্রার মেলা যে বসাও যদি কোনো দাঙ্গা হইয়্যাও থাকে চাইর বছর ধইরা, সেডার বিজয়ডাই-বা কী, তাতে গুরু গুরুচাঁদের দানডাই-বা কী?

‘গুরুই তো কইল, আমরা স্বাধীনতা চাই না! আমরা শাহেবগো অধীনতা চাই—তাইতে শাহেবরা খুউব বাহবা দিছিল।’

‘বাহবা দিছিল ক্যা? না, পদ্মবিল্যার মুসলমানরা তহন গান্ধীর চেলা হইয়্যা খিলাফৎ কইরব্যার ধইরছিল। তাই শাহেবগোর কাছে শুদ্দুররা তহন ভাল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *