১০
2 of 4

৫৯. বিলের পথে রাজনীতি

৫৯. বিলের পথে রাজনীতি

কোর্টে যেমন এককোণে দাঁড়িয়ে দুই কাল কোট গোপন কথা বলে, তেমনি স্বরে যোগেন কথা বলছিল। ভাল করে শোনার জন্য একদিক থেকে প্রহ্লাদ, আর-এক দিক থেকে শিবু ঘাড় হেলিয়ে দিচ্ছিল যোগেনের দিকে। প্রহ্লাদ সব থেকে খাটো, ফলে তাকে মাঝেমধ্যেই পায়ের আঙুলের ওপর হাঁটতে হয়। শিবুর মাথায় ঘট, ঘাড় হেলাতে তাকে বাঁ-হাতে ঘটটাকে সামলাতে হয়।

‘কথাডা শ্যাষ হইব না। কিন্তু উত্থাপনডা হৌক। কও প্রহ্লাদদা, নমশুদ্দুররা তো কবে থিক্যাই নমশুদ্দুর, রাজবংশী তো কবে থিক্যাই রাজবংশী, বাগদিরা তো কবে থিক্যাই বাগদি। মানে, কই, এইসব মানুষকে এক কইর‍্যা শুদ্দুর, চাঁড়াল এমন কইর‍্যা কথা বলা হয় ঠিকই কিন্তু এই ভোটের আগে কুনোদিন এই হিশাব কারো মাথায় আসে নাই যে বাংলায় এইসব জাইত একসঙ্গে বতিরিশডা মেম্বার হব্যার পারে। এইডা, এই এক-কইর‍্যা বলা সম্ভব হইল তো কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের লগে। হ্যাঁ। এডা তো ঠিক কথা—ঐ ৩২ জনের মইধ্যে সাতজন পুরানা কংগ্রেসি, একজন পুরানা হিন্দু। হইল। কিন্তু মাথা-গণতিতেও তো আইনসভার মোট মেম্বারগ দুই আনা তপশিলি। এইডা কহনো ঘটে নাই, কহনো ঘটে নাই। তাইলে আমাগ চাওয়া, আমাগ দাবিদাওয়া এসবও তো বদল দরকার, অ্যাহেবারে পুরাখান বদল। অ্যাদ্দিন কী ছিল, যত বড়লোকই হও, যত বিদ্বানই হও, যত বড় ডাক্তারই হও তুমি যদি শুদ্দুর হও, তাইলে তুমি কিছুই পাবা না। ২৫-এর কাউন্সিলের ভোটে এডডা নমশুদ্দুর জিতল? মুকুন্দ মল্লিকও না। আর আমরা সরকারের কাছে গিয়্যা ভিক্ষা চাই—আমরা তো শাহেবগ অনুগত প্রজা, আমাগ ক্যান দয়া করেন না?’

‘এইসব কথা তোমার ঠিক না যোগেন। আমাগ পিতৃপুরুষরা কম আন্দোলন কইরছেন? সেগুল্যা তো অ্যাহন ইতিহাস হইয়া গিছে। ব্রাহ্মণগ বয়কট করা, বামুনগ কাজ না-করা, বামুনরা দ্যাশের কথা যা কয় তা বিশ্বাস না করা, কোথায় য্যান কালীপূজা নিয়া দাঙ্গা বাধছিল আমাগ সঙ্গে বামুনগ। আমাগ বাপঠাকুরদাগ জাতি নিয়া খুব অভিমান ছিল।’

‘শুনো—আমরা তো কথা কইতেছি ১৯৩৭-এর ভোটের পরের মন্ত্রিসভা আর আইনসভা নিয়্যা? এর আগে কুনো ভোট ছিল? কুনো আইনসভা ছিল, কোনো মন্ত্রিসভা ছিল? ছিল না তো? তহন বামুন-কায়েত ছিল—আমাগ বাপঠাকুরদাদারা নিজেরা বামুন হইব্যার চাইত। কত জন তো স্যায় সুযোগে কায়স্থ হয়্যা গেল। সেইডা তো ইতিহাস। কিন্তু অ্যাহন তো ইতিহাস নাই। অ্যাহন তো তোমাগ বামুন-কায়েতের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি, চেয়ারে বইস্যা এক গেলাশ থিক্যা জল খাইব্যা, এক-একডা আইন পাশ হইব। সেইহানে হিন্দুগর ভিতরে অনুন্নত টুকরা বইল্যা নিজের পরিচয় দিব্যা, নাকী নিজের পরিচয় দিবা এই বইল্যা যে দ্যাশের সব মানুষ হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হইয়্যা যায় নাই। আমরা স্বতন্ত্র জাইত। হিন্দুও না, মুসলমানও না। আমরা তপশিল জাতি। আমাদের স্বার্থে কাজ হইলে সরকার রাইখব। আমাগ বিপক্ষে কাম হইলে সরকার, ফেল্যায়া দিব। এই কথাটা জোর দিয়া কব্যার দিব্যা, কি দিব্যা না?’

‘কবে কেডা? আমিই-বা তার কোন্ মামাশ্বশুর? বইলতে না-দেয়ার কেডা?’

‘ধরো আমি কইব্যার চাই যে আমাগ, মানে তপশিলি জাইতের মানুষগ হিন্দু বইল্যা ধরা চইলব না। ক্যান চইলব না—তার ধরো সব অকাট্য যুক্তি আছে। যুক্তি শুইন্যা তো মানুষ মত ঠিক করে না। মত ঠিকই থাহে। বিরুদ্ধের যুক্তির জোর থাইকলে নিজের মতডারে আরো আঁকড়াইয়া ধরে। আমার যুক্তি মাইন্যা যে হিন্দুরা কইব—তুই তো ঠিক কথাই কইছিস, যা, তোরে ছাইড়া দিল্যাম-এ-কথা ভাইব না প্রহ্লাদদা। একবার যদি বইল্যা ফ্যালা যায়, আমরা হিন্দু না দেইখব্যা কী ভূমিকম্প শুরু হয়—’  

‘সে শুরু হোক গিয়্যা। তোমার তো তা নিয়্যা ভাবনা নাই। তুমি তো ভূমিকম্পই সৃষ্টি কইরব্যার চাও। কিন্তু বিপদড়া তো তোমারই ভিতর থিক্যা পাক দিয়্যা উইঠব—অ্যাঁ, তাইলে কি যোগেন মণ্ডল আমাগ হিন্দুর বাইরে গিয়্যা মুসলমান বানাবার চায়?’

‘ঠিক। ঠিক। এই কথাডাও উইঠবই। আজ থিক্যা একশ বছর পর কইলেও উইঠব। তাইলে আর কইল্যাম ক্যা—আগে কি কহনো শিডিউল বইল্যা কুনো জাইত ছিল? ছিল না। তহন আলাদা-আলাদা জাইত ছিল—চাড়াল, মেথর, ডোম, ধাঙর, রাজবংশী। এই আলাদা জাইতগুল্যা কিন্তু হিন্দুধর্মের বিধান। অ্যাহন যদি সেই সব মিল্যা শিডিউল হয়, তাইলে তো ব্রিটিশ গবনমেন্টের আইন-মোতাবেক শিডিউল। তয়? সরকার নতুন একডা জাইত দিল আর আমরা নি না!’

‘একডা কথা জিগ্যাব? কথাডা কি আপনে সবে ভাবা শ্যাষ করছেন, না, শুরু করছেন? আর কারো সঙ্গে কি এই নিয়্যা কথা হইছে?’ শিবু হালদার এই প্রথম কথা বলল। লম্বা ও রোগা মানুষটির সারা মুখে অজস্র রেখা উঠে ভেঙে-ভেঙে যাচ্ছে! মাথার ওপরের ঘটটাকে সামাল দিতেই যেন, শিবু হালদারের বাঁ হাতের আঙুলগুলি কাঁকড়ার দাঁড়ার মত হয়ে যায়।

‘ঠিকই কইছেন শিবু বাবু। ভাবনা তো আর ফৌজদারি কেস না, যে এফআইআর দিয়া শুরু আর জাজমেন্ট দিয়্যা শেষ? বরং কইব্যার পারেন, ঠিক মনে আসে নাকী কইবার পারেন—ধরেন, শিশু বয়স থিক্যা তো আমি পালা গাই। রাধা যহন কৃষ্ণের বাঁশি শুনগা ম‍ইধ্য রাইতে, পাশে স্বামী আয়ান, দরজায় ননদিনীরা পাহারায়, তার উপর বৃষ্টি আর বাজ, যেহানে রাধা আছে সেহান থিক্যা কৃষ্ণের কাছে যাওয়ার তো কোনো উপায়ই নাই। কিন্তু রাধার আর, সব নিয়্যা দুশ্চিন্তা আছে-ক্যামনে স্বামীর পাশ থিক্যা উইঠবে, ক্যামনে একডুও আওয়াজ না তুইল্যা একে-একে পা দুখান পালঙ্ক থিক্যা নামাইবে, দরজার খিল খুইলব ক্যামনে, কপাট ফাককইর‍্যা গইল্যা যাইবে তারওপর, যে-বৃষ্টিতে আকাশখান আর আপনে ধইর‍্যা রাইখবার পারে না, সেই বৃষ্টিরে রাধা ছত্র কইর‍্যা নিবে, চিকুরের আলো দিয়্যা রাধা বর্ষায় বদলাইয়্যা-যাওয়া ঘাট চিন্যা নিবে, বাজের আওয়াজে রাধা নিজের বুকের আওয়াজরে লুকায়া থুবে—এইসব কঠিন-কঠিন দুশ্চিন্তা রাধা দুই শ্বাসের মধ্যিখানের ফাঁকডাতেই মিটাইয়া নেয়—শুধু একডা কথা নিয়্যা রাধার কুনো দুশ্চিন্তাই নাই যে সে কৃষ্ণের কাছে পৌঁছাইয়্যা যাইবে ঠিক, না-পৌঁছান্ যায়? ভাবনাডা তেমন কিছু? না ভাবা যায়?’

যোগেনের এই কথাতে শিবুর মুখের রেখাগুলি বদলে গেল, শিবুর ঠোটের দুই কোন বেশ শক্ত হয়ে বেঁকে গেল নীচের দিকে, এত ভাঙচুরের মধ্যেও চিবুকটা তীক্ষ্ণই থাকল। যোগেনের কথার পর সে চুপ করেই ডানদিকে একটু সরে যায়।

ওরা তিনজন হাঁটতে-হাঁটতে রাস্তা-পথঘাট কোনো কিছুই দেখছিল না। আবার, যাদের নিত্যি চব্বিশ ঘণ্টা যাতায়াত এই পথে, তাদের চলার ব্যস্ততা বা অভ্যাসও এদের পায়ে ছিল না। বরং এরা যেন একটু আনমনাই হয়ে যায়, এমন পথিক মানুষ যেমন আনমনায় পথের দূরত্ব অতিবাহন করে। প্রতিদিনের আসাযাওয়ায়, প্রতিদিনের হাঁটাচলায়, প্রতিদিনের এই শ্রাবণ-প্রান্তর ও শ্রাবণ-আকাশের ভিতর পথ তৈরি করায়, নিকট এক আত্মীয়তাই ব্যাপ্ত ছিল এই নিসর্গে। এখনো তারা যেন উত্তর বরিশালের ভর্তার বিল, সতারের বিল দিয়েই হাঁটছে। মাঝখানে যে-একটু নদী পার হতে হল, তা না পেরলেও ক্ষতি ছিল না। সেই নদী পেরবার পর নদীটা তাদের স্মৃতিতে থাকে না, চট করে নামটাও মনে না-পড়তে পারে। এমন সব টুকরোটাকরা নদী, এমন সব আকাবাঁকা খাল, এমন সব কেদো বন বা নলবন, এমন সব ধানশিষ তাদের শরীরের ভিতরে এত গেড়ে গেছে যে শরীরের বাইরে সেসব দেখাও সম্ভব নয়।

.

বিলে একইরকমের ধান রোয়া হয় না।

যেখানে সারা বছর জল থাকে—ছপছপানো জল, সেখানে বিছন-ছিটনো চাষ হয় সারা বছর। এইসব বারমাসি ধান নিয়েই ছড়া আর গল্প তৈরি হয়—সেই পুবের পাহাড়তলির সোলা নাই-এর ঝিল থেকে, পশ্চিমে নীচা-ভৈরবের বিল, উত্তরে সেই সিলেটের বাওর-বিল, পশ্চিমের দিকের উত্তরে পাবনা-রাজশাহি দুই জেলা জোড়া চলন বিল। সন্ধ্যায় সূর্য পাটে বসলে শোয়ার আগে একমুঠো বিছন দিল ছড়িয়ে আর বৌ সকালে সেই ধান কেটে, ঝেড়ে, কুটে ভাত রান্না করে ফেলল, তার যেমন স্বাদ তেমনি বাস। এই রাতের আকাশে তারা ছিটনোর মত, সন্ধ্যার ক্ষেতে বিছন—ছড়ানো একরাতে পেকে যাওয়া ধানের নামের বাহার কত—ছিটানশালি, গুড়জালি, পুঁটিধান, খৈশিষ, হাওরের আগুরি, চলনবালাম, কাটারি। নামের কোনো শেষ নেই। আর, সব মিলিয়ে এই একরাতে পাকা বিল্যাধানকে বলে মনপড়ানি ঠাকুরদানি আঁচলবাঁধনি। কিন্তু পৃথিবীতে, বা, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকার এই বিলাঞ্চলে বা পাবনা-রাজশাহি থেকে সিলেটের হাওড় পর্যন্ত বিলগুলিতে কোনো কৃষককে জিজ্ঞাসা করলে, তারা কিন্তু একজনও স্বীকার করে না এমন রাতপোহানি ধানের ভাত সে খেয়েছে কখনো। আরো ধানের নাম করে যায় ‘আমার হাতে, ‘আমার ক্ষ্যাতে এই ভাত যে হইছে, সেই ডাই তো আমাগ চোদ্দ পুরুষের পুণ্য, ঐ-ধান আইঠ্যা কইরলে আমাদের পরের চোদ্দ পুরুষের পতন

কিন্তু একটু আড়াল বা নিভৃতি পেলে বা একা হয়ে গেলে প্রায় সবাই একই জবাব দেয়—স্বীকারোক্তির সেটাই শেষ সীমা, ‘য্যান একবার শুইনছিল্যাম আমার মুখ-অ্যাইঠ্যা করার সময় দিছিল। কিন্তু কোনো স্বাদ স্মরণ নাই।’

যে-ধানের স্মরণ থাকে না, সে-ধান তাহলে এখনো চাষ হয় কী করে?

নিজের খাটনি-কামাইয়ের জায়গাই যখন মানুষের রূপকথার আঙিনা হয়ে ওঠে, তখন সে কোনো কারণেই সে-আঙিনার দখল ছাড়ে না। সে-যে ধানের দখল ছাড়ছে না সেটা জানানোর একটা স্বর বা স্তর আছে। খুলনার মুখের কথা তো ফরিদপুরে চলে না, ফরিদপুরের কথা সিলেটে চলে না, সিলেটিরা নিজেরাই নিজেদের কথা বোঝে না, কিন্তু এইসব ভাষার স্বরে একটা মিল এসে যায়, গলার স্বরে, সেই স্বরে জোর দেয়ার ধাঁচটা আলাদা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু স্বর না কী সুর, তাতে বদলায় না, ‘সারাজীবন তো স্যায় বিছনই ছড়াই, হয় কী হয় না কে জানে,’ ‘ঐ বিছন-ছাড়া কি এই বিল্যাজলে চাষ হয়—আমার তো ছয় ছাওয়াল-পাওয়াল, মুখের ছাঁচ ক্যান আলাদা, আবার দেইখলে ঠাহর হয় ভাইবুন,’ ‘কী কইর‍্যা জানা হইল যে ঐ ধান আর হয় না? হয়, কিন্তু অন্য সব ধানের মইধ্যে লুকাইয়্যা থাহে’, ‘দেবদেবতার ধান নিয়্যা কথা এত ক্যান’, ‘এ-ধানের নাম মনপড়ানি, মন পড়ানি, কী মনে পড়ায়?’

যশোর থেকে সিলেট যদি উচ্চারণ-অনুযায়ী বর্ণমালা বানানো যায়, তাহলে শোনায় যেন প্রাকৃতিক, গভীর রাতে চেনা জলের আওয়াজের মত প্রাকৃতিক, বা দূরের একটা চেনা গাছের বুড়োবুড়ি প্যাঁচাপ্যাঁচানীর মত প্রাকৃতিক, রাতে জল থেকে উঠে আসা দলবাঁধা ভোদরের দৌড়নোর মত প্রাকৃতিক। কিন্তু ‘মনপড়ানি ধান,’ ‘মনপড়ানি’ ধানই হয়—সেটার আর ফরিদপুরি বা বরিশালি বা সিলেটি বিছন হয় না। কেউ যদি ‘মনপোড়ানি,’ বলে, তাহলে কেউ-না-কেউ বলে দেয়——হেই কবে পড়ছে খেজুরের ডাল, শুকায়্যা হইছে ফালফাল, পুইড়ব না তো ভিজব না কী,’ বা ‘পোড়ে তো পানি ঢাল্’, বা, ‘ঠাকুরদেবতা নিয়্যা এত পোড়াপুড়ি ক্যা?’

ভুল স্বীকারের কোনো পদ্ধতি এ-সমাজে নেই—‘কী এমন দোষ ঠেকছে, মনপোড়ানি কওয়ায়?’

‘আমি কি বামুনঠাউর যে দোষগুণ জানি? যা জানার হেটুক জাইনলে তো মরণ পর্যন্ত চল্যা যায়। বলদের বাঁট নাই। নিজের হোগা নিজে দেখা যায় না। চক্ষু দুইডা বইল্যা দুইড্যা জিনিস দেখা যায় না। মাগের উপুর উইঠলে আর তলার শ্বাস শুইনো না।—এইসব কি বামুনগ কাছে শিখা? গল্পডা না জাইনলে, গল্পডা জাইন্যা রাখ।’

শিব তো ভিক্ষা চাইয়্যা বইসছে অন্নপূর্ণার সামনে হাত পাইত্যা। হাত তো পাতাই যায়। পাতলেই কি কিছু দেয়া যায় স্যায় পাতা-হাতে? কোলের ছাওয়াল হাত পাইতলে মাই দেয়া যায়। সই হাত পাইতলে মুখের পানের ভাগ দেয়া যায়। রাবণরাজা হাত পাইতলে ভিক্ষা দেয়া যায়। আবার গোপাল হাত পাইতলে নাড়ু দেয়া যায়। জামাই আইস্যা হাত পাইতলে ঝি-রে দেয়া যায়। ঠাকুর স্বপ্নে হাত পাইতলে পূজা দেয়া যায়। যমরাজা আইস্যা হাত পাইতলে পরান দেয়া যায়। বাপ আইস্যা হাত পাইতলে কপাল দেয়া যায়। নদী আইস্যা হাত পাইতলে চক্ষু দেয়া যায়। গাছ আইস্যা হাত পাইতলে জিরান দেয়া যায়।

কিন্তু শিব আইস্যা হাত পাইতলে অন্ন দেয়া যায়? যায় না। অন্নপূর্ণা হইলেও যায় না। ঐ ভিক্ষার হাতখান পুরাইতে অন্নপূর্ণার অন্নের পাহাড় হইয়্যা যাবে নে ইদুরের গর্তের মাটি।

তাইলে, শিবের পাতা হাত ভরব কীসে অন্নপূর্ণা? তাইলে, এত অন্নকূট সাজাইল ক্যা অন্নপূর্ণা?

তাইলে?

এই স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জুড়ান্ খিদা শিবের মিটায় ক্যামনে অন্নপূর্ণা? ঠারে চাইয়া দ্যাহে হাতখান পাতাই আছে, সেই ভিখারির হাত, পাতাই আছে, সরে নাই।

তহন, তহনই, চিকুর খেলে অন্নপূর্ণার মাথায়। একবারই খেলে। সে-চিকুরের আলো আছে, আওয়াজ নাই। য্যামন চিকুর জ্বইল্যা উঠে বিলের শ্যাষ আকাশে। যেমন চিকুর চক্ষু ধাঁধাঁয় দুইডা পাড়ের নদীর আর-এক পাড়ে। যেমন চিকুর চাঁদের রাইতে চাঁদের ভিতর লুক্যাইয়া জ্বলে। তেমন একডা চিকুর খেলে অন্নপূর্ণার মনে

মনে পইড়া যায়—শিবের অন্নের তরে-না অন্নপূর্ণা একমুঠ এই ধান বাইন্ধ্যা গিঁঠ দিয়্যা রাইখছে আঁচলে!

সেই গিঁঠ খুইল্যা, দুই হাতের পাতা ভইর্যা সেই ধান নিয়্যা অন্নপূর্ণা ঝরাইয়্যা দ্যায় তার ভিখারির পাতা হাতে। সেই মনপড়ানি ধান অন্নপূর্ণার হাত থিক্যা শিবের হাতে পড়ে, য্যান দুধের স্রোত। সে ধান কি মন পোড়াইবার পারে? সে ধান তো মনে আইন্যা দেয়—বাঁচন আছে,             বাঁচন আছে। মন পুড়ব ক্যা? মনে পইড়ব। ঠাকুরদানি আঁচলবাধনি

ওরা—যোগেন-প্রহ্লাদ-শিবু—এইসব উপকথা দিয়েই হাঁটছিল।

শিবু বলে, ‘তাইলে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মতুয়া ধর্মের নাগাল একডা নতুন ধর্ম কইরবেন, শিডিউল ধর্ম? জিত্যা মেম্বার হইয়্যা গুরু সাইজবেন তা গুরু তো সাইজলেই হইত। আপনে তো চাঁদশিও জানেন, ইংরাজিও জানেন, গানের গলাও তো ভাল। তাই যদি হবেন তাইলে এই ভোটাভুটি, কইলকাত্তা—বরিশাল, হকশাহেব-লাটশাহেব এত ভেজাল পাকাইলেন ক্যা? আমাগ তো গুরুর কোনো অভাব কোনো কালে ছিল বইল্যা শুনি নাই। শুধু একডা যুতমত গাছ-খোঁজার হ্যাঙ্গাম। জোড়া-পাকুড় বা উজির পুরের কাটাগাছ হইলে তো কথাই নাই।

‘শিবুবাবু, আপনি অ্যাদ্দিনের সাবেক মুহুরি যে দলিলের সীমানার বরই গাছকে বানাইয়্যা দ্যান জিক্যা গাছ, আর আপনে আমার এতডা কথা শুইন্যা বুইঝলেন আমি অ্যাহন আশ্ৰম খুইল্যা গুরু সাইঝবার চাই। গুরুই যদি সাজার সাধ, আপনার সেরেস্তা কী দোষ কইরাছিল?’

‘আমিও তো সেইডাই জিগাই-শেরেস্তা দোষ করছিল কী?’

‘আমি ঠিক এর উল্ডা কথাডা কব্যার চাই। তা আপনাগো কাছেই সে-কথার যদি এই মানে খাড়ায় তাইলে দশে তো আরো কী বুইঝব কেডা জানে?’

‘যোগেন, তুমি বলো-না। এই তো প্রথম কইতেছ, তোমারও এডডু জড়তা আছে, শিবুরও আছে, তুমি কইব্যার ধরো।’

‘এ কি নিমাইসন্ন্যাস-পালার রিহার্সেল নাকী। আচ্ছা, তত্ত্বকথাডা বাদ দেন। কামের কথা দিয়্যা কইলে বোধহয় কওয়ায় সুবিধা হয়। শিবুবাবু, যেইখানে ঠেকবেন সেইখানে জিগাবেন।

মাথায় একডা হাঁড়ি নিয়্যা কি কান অত খাড়া রাহা যায়?’

‘দ্যাও-না, আমারে দ্যাও, খানিকডা নেই,’ প্রহ্লাদ হাত বাড়ায়। ‘না, না, তার কাম কী, ঠিক আছে। কন।

‘শিবুবাবু—মহাত্মা গান্ধী আর কংগ্রেস মিল্যা যে নতুন জিগির তুইলছে, ছোঁয়াছুঁয়ি মানা চইলবে না, শুদ্দুরগ সব মন্দিরে ঢুইকব্যার দিবার লাইগব আর শুদ্দুরগ সঙ্গে ভাত খাবার লাগব আর শুদ্দুরগ দেয়া জল বামুনগ খাবার লাগব—আপনি কি এডায় আছেন? না, নাই?’

‘আমার নাহাল এড্‌ডা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনুষ্যের কি সেই জোর থাইকব্যার পারে যে মন্দিরে ডাইকলে বা বামুনবাড়িতে ভাত দিলে যাব না, খাব না?’

‘বে—শ। আপনে আর আমি দুইজনই তো শূদ্র। শূদ্রের তো আর উঁচা-নিচা নাই।’

‘থাইকব না ক্যা? সৎশূদ্র বইল্যা ২১-সালের সেনসাসে দুনিয়ার সাহা-শুঁড়ি সব কায়েত হইল না?’

‘আপনি কি চান সৎশূদ্র হইব্যার?’

‘আমি ঠিক জানি না নিজে-নিজেই কি সৎশূদ্র হওয়া যায়? বামুনগ বিধান লাগে না?’

‘বিধান তো পাইছেন। কংগ্রেস দিছে, গান্ধী দিছে। মুসলমানগ হিন্দু করাও তো শুরু হইছে। আমি এইডা দশের সামনে বুক ফুলাইয়্যা কইব্যার চাই—আমারে ঢুইকতে দিলেও আমি মন্দিরে ঢুইকব না, আমার কাছে গঙ্গাযাত্রী বামুনও যদি জল চায় আমি দিব না। আমি অস্পৃশ্যই থাইকব্যার চাই। মুসলমানগ হিন্দু বানানোওতে আমার মত নাই। আমি নমশূদ্রই থাইকবার চাই।’

‘তাতে তো কুনো অসুবিধা নাই। মন্দিরে ঢুইকলে বা পংক্তিভোজনেও শূদ্র তো শূদ্রই থাকব। শুধু উঁচা বর্ণের বিধি ব্যবহার বদলাব। খুব প্যাঁচ আছে—তুই আলি না, তাই খালি না। আইন না আইলে আর তুই আইলেও তোর খাওয়া হইত না। পাশে বসার বামুন না থাইকলে পংক্তিভোজন ক্যা? অহন তো তোগো নতুন দুর্দশা। বামুন জোগাড় না হইলে খাওয়া হইব না।’

‘দ্যাহেন, আমাগ শুদ্দুর সমাজেও তো উঁচানীচা আছে। আমাগ মইধ্যে যারা নীচস্য নীচ তাগো কথা আমি জানি না, কিন্তু যারাই এন্ড্রু জানলা-দরজা দিয়া চায়, তারা বেবাকে ভাবে—বামুনগ মন্দিরের দেবতা তাদের পূজা নেয় না বল্যাই তাগ দুঃখ যায় না। স্যাও ভাবে—বামুনরা উচ্চজাত।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *