১০
2 of 4

৫৭. যোগেনের গোপালগঞ্জ যাত্রা ও প্রহ্লাদ আর শিবুর কাছে নিজের রাজনৈতিক দর্শন উত্থাপন

৫৭. যোগেনের গোপালগঞ্জ যাত্রা ও প্রহ্লাদ আর শিবুর কাছে নিজের রাজনৈতিক দর্শন উত্থাপন

পরদিন সকালে যোগেন খাগবাড়ি ছেড়ে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে রওনা হল, নৌকোয়, সেরকমই ঠিক ছিল। যদি তেমন কিছু দরকার পড়ে, তাহলে গোপালগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে কলকাতায় ফিরবে। গোপালগঞ্জ আর এই খাগবাড়ি থেকে কী দূর—খালের ৫৭ পাড়ে খাড়াইয়্যা একখান যুতমত ঢিল ছুঁড়লেই তো গিয়া গোপালগঞ্জের কোনো মানুষের মাথায় পড়বে। অবিশ্যি, তেমন একটা যুতসই ঢিল আর ঢিলছোঁড়ার মানুষ খুঁজে বের করতে হবে। যোগেন, প্রহ্লাদ, শিবু হালদার আর অচেনা একজন নৌকোয়—পথে কোথাও নেমে যাবে হয়ত। ওড়কান্দিও যাওয়া হতে পারে শুনে যোগেনের শাশুড়ি ওদের হাত দিয়ে পুজো পাঠিয়ে দিলেন। শাশুড়ি যখন যোগেনকে তার ইচ্ছের কথা বলে, যোগেন উত্তর দেয়, ‘এডা তো আমারই কহনের কথা। ঠাকুরবাড়ি যাব—হাতে পূজা নাই? প্রহ্লাদদারে বুঝাইয়্যা দ্যান। তবে সে আর-এডডা ঘটনাও ঘইটব্যার পারে, আপনার পূজাডা আমার নামে গেল।’

শাশুড়ি গলবস্ত্রই ছিল। হাতদুটি জোড় করে বলেন, ‘আমার আবার পূজা কী, বাবা? সব পূজাই তো তোমাগো লগে। ঠাকুরের ইচ্ছাড়াও দেহো। একজন তো আইসবেন, তাই তার বাপরে পাঠাইলেন নিজের পূজা আদায়ে।’

যোগেন ঘাটের দিকেই বেরচ্ছিল। শাশুড়ির কথা শুনে কিছু না-ভেবেই ভাল লেগেছিল। ওড়কান্দি হচ্ছে ঠাকুর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের থান, মতুয়া ধর্মের কেন্দ্র—হিন্দুদের যেমন কাশী, মুসলমানদের যেমন মক্কা, খ্রিস্টানদের যেমন রোম। নমশূদ্রদের সবচেয়ে বড় তীর্থ। গেল বছর দেহ রাখলেন গুরু চাঁদ সেটা বোধহয় ভালই হল, না-হলে মতুয়া ধর্ম দিয়ে তো আর শাসকশক্তি হওয়া যায় না—সমাজের, দেশের, দশের শাসক হওয়া যায় না, নিজের শাসক হওয়া যায়। একটা কোনো ধর্ম না-হলে নমশূদ্রদের তো চলে না, বড় ভক্ত জাত। এত ভক্ত, যার ইচ্ছে সে-ই তার মাথায় নিজের দুই পা রাখে। কিন্তু এখন তো দেশের মানুষের হাতে ক্ষমতা আসছে—এখনো নমশূদ্ররা ‘হাতে কাম আর কানে নাম’ নিয়েই থাকবে?

যোগেন এইরকম করেই ভাবছিল, তা নয়। শাশুড়ির পুজো দেয়ার প্রসঙ্গে এইসব ভাবনা তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু চলৎরিয় গেল না। এই দুই-এক মিনিট আগে বলা শাশুড়ির কথাগুলির স্মৃতি বিরক্তি হয়ে ফিরে এল—এমন বিরক্তি যা প্রকাশও করা যায় না, প্ৰমাণও করা যায় না। তার শাশুড়ির কথা, বা বলা, যেন বামুন-কায়েতের নকল। খুব খেয়াল করে নকলকরার মত মানুষ তার শাশুড়ি নয়। তবু কেন নকলি এসে যায়? তার যোগামার কথায় বা কাল রাতে কমলার কথায় তো তেমন নকলি আসেনি। নাকী এসেছে? কিন্তু যোগামা বা কমলার গলায় নকলি তার কানে লাগেনি, তারা তার মা আর বৌ বলে? যোগেন এই বৈপরীত্যগুলি মেনে নিয়েও গোঁ ছাড়ে না—ওরা কি আমাগো নাগাল ভক্তি দিবার পারে, তাইলে আমরা কেন আগের মত পূজা দিব?

নৌকোয় পুজোটা তুলে দেয়ার জন্যই ঘাটে দু-চারজন বৌ এসে নৌকোর গলুইটা ধুয়ে, নতুন একটা গামছা পেতে, তার মাঝখানে একখুনি নতুন খড় থেকে পাকানো একটা বিড়ে বসিয়ে, লাল একটা হাঁড়ি বসিয়ে নতুন সরা দিয়ে ঢেকে দিল। পুজো যা, তা হাঁড়ির ভিতরে আছে। সেই দুই-চারজন বৌয়ের মধ্যে, যোগেন কমলাকে ঠিক খোঁজেনি, কিন্তু কমলা থাকলে তার চোখে পড়ত। পড়ত কি? কমলাকে কি তেমন করে দেখা হয়েছে যোগেনের?

যোগেন উঠে বসতেই নৌকো ছেড়ে দিল আর মেয়েরা উলু দিয়ে উঠল। তিন ঝাঁক উলু শেষ হতে-হতে নৌকো মাঝখানে। উলুটা কেমন মিশে গেল খালের জলধ্বনিতে। অথবা, ধ্বনি বদলে যাওয়ায় যোগেনের কানে একটা বিভ্রম খেলল। সে একটা তৃপ্ত ঠোঁটে খালের মাঝখান থেকে নিকট-পাড়ের দিকে চাইল, যেন তার আজন্মের ভঙ্গিতে, বরিশালের খালের ভিতর থেকে পাড়ের দিকে তাকানো। নিজেরই ভঙ্গিগুলো নিজের অচেনা, উচ্চবর্ণের কেউ যদি চিনিয়ে না দেয়।

এটা একটা ছোট ছিপ নৌকো। তাতে একজনেরই এক গলুইয়ে বসে ভাটিতে ভাসার কথা—তা না, একে বারে দুই গলুইয়ে দুই লগি, মাঝখানে আবার দুই বৈঠা নিয়ে দুজন। একটুখানি জায়গায় তিনটা পাটাতন পাতা–বসার জন্য। বাকিটা খালি। খাগবাড়ি থেকে গোপালগঞ্জ, ঠিকই, এক ঢিলেরই দূরত্ব যেন, তবু, সেই দূরত্বটুকু জুড়ে আছে এই আগৈলঝরার খালের দক্ষিণ পার, বিষাইকান্দির খালটা আড়াআড়ি, বাগধার বিলের উত্তর কোণ আর মধুমতী নদীর কিছুটা। তারপর গোপালগঞ্জ। কাশিয়ানি বা আড়কান্দি যেতে হলে আর গোপালগঞ্জে ঠেকবে কেন? ভাটির মধুমতীতে ভাসলেই হল।

মুখে বললে যে-কোনো রাস্তাই লম্বা শোনায়। কিন্তু এইটুকু রাস্তায় যদি দুটো আল, একটা বিল, একটা নদী পার হতে হয় দুই-মানুষ সমান একটা ছিপে দুই-দুইজন লগি আর দুই-দুইজন বৈঠা নিয়ে, তাহলে তো যাত্রাটা ভারীই দেখায়। রাস্তা সোজা, দূরও হাতের মুঠোয়, সময়েরও তাড়া নেই তবু পথটা যত্রতত্র অপথ-কুপথ হয়ে যেতে পারে। বিষাইকান্দির খালটাকে নদী বললেই চলে। নদী মানে বিস্তার আর স্রোত। বিস্তার আর স্রোত মানে বিপদের বিস্তার আর স্রোতের প্রতিঘাত। আবার সেই কারণেই পার পাওয়ার বহু রাস্তা। কিন্তু বিলা-জায়গায় যদি নৌকো একবার ঠেকে তাহলে প্রধান বিপদ হচ্ছে–কোনদিকে ঠেললে নৌকো জল পাবে সেটা বোঝা। লগির ঠেলায় নৌকো হয়ত আরো ডাঙার দিকে উঠে আরো ফাঁসল। বিলের সে-ডাঙা তো আর শুকনো, খটখটে, ঘাসে-যাওয়া কোনো জায়গা নয়। হয়ত ঘণ্টা দুই জল নেমে গেছে, না-হয়, দুদিনই হল, থকথকে কাদা, সেখানে সাঁতার কাটা যায় না, সেখানে জলের তলে পা-রাখার কোনো মাটি পাওয়া যায় না, সেখানে ডুবলে আর ভেসে ওঠা যায় না। এইটুকু একটা ছিপ নৌকোকে নাড়াতে সাত-আটজন লোককেও তখন মনে হয় হারানো মানুষ। সেই সব ভেবেই ছিপ নৌকো, পাতলা, দরকারে হাতে নাড়ানো যায়। সেইজন্যই দুই বৈঠা—, হঠাৎ যদি জল বেড়ে যায়, তাহলে তো লগি ঠেলা যাবে না। বরিশালের খালবিলের জলের কোনো স্থায়ী মাপ নেই, তবে খুব বেশি চলনদারির জলের তো মোটামুটি একটা আন্দাজ হয়ে যায়। সমুদ্রের জল অজস্র নদী ও খালপথে ঢুকে পড়ে এমনই সহসা বদলে দিতে পারে অভিজ্ঞতার আন্দাজ যে কারণ-খোঁজার সময় পাওয়া যায় না। কারণ অবিশ্যি কেউ খোঁজেও না—জলের বিপদ তো রয়েসয়ে আসে না যে ধীরেসুস্থে ভাবার সময় পাওয়া যায়। তবে, পাড়ির সময় একবার মনে করা ভাল—সঙ্গে আর কিছু নেবে কী না।

এসব ভেবেই হয়ত খাগবাড়ি থেকে গোপালগঞ্জের এক ঢিল দূরত্বের জন্যও নৌকো ভাবা ও সাজানো হয়েছে বেশ ভাল। ছই একটা লাগিয়ে নিলে হত বটে কিন্তু নৌকোর ওজন যেত বেড়ে আর গতিও যেত কমে। কিন্তু শ্রাবণের মাঝামাঝি তো—পরপর কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি। নৌকো যখন ছেড়েছে তখন সকালের রোদ চড়েনি। বড় জলে—বিলে বা নদীতে রোদ তাড়াতাড়ি চড়ে—খালে দু-পাড়ের গাছগাছড়া বাড়িঘরের আড়াল থাকে বলে রোদ চড়তে পারে না। বিষাইকান্দির খালটা পেরতেই বেশ গরম লাগে। বাগধার বিলে ঢুকতেই যোগেন তার কোঁচা খুলে মাথায় দেয়। ছোট্ট একটা ছই যদি থাকত, তাহলে মাথাটা তার ভিতরে গুঁজে কী সুন্দর ঘুমটাই না ভাঙত গোপালগঞ্জে—সে কী রে, এর মধ্যে পৌঁছে গেলি।

নৌকোর মাঝিদের একটা অভ্যেস আছে—জলে কোনো বিপদের ভয় পেলে কথা বন্ধ করে দেয়। বরিশালে যারা যাতায়াত করে, অনেক সময় তারা মাঝিদের চাইতে বেশি সময় জলে থাকে। তাদেরও একটা মুদ্রাদোষ আছে—যেমন-তেমন জায়গায় মাঝিদের যাচাই করতে তাদের সঙ্গে ছোটখাটো আলাপ শুরু করে দেয়। এ আর কতটুকু যাওয়া? তবু তো যাওয়াই, খাল-বিল-নদীর জল ভেঙে যাওয়া, বাগধার বিলের মাঝখানে নৌকোটাকে যেন আরো ছোট মনে হয়। শিবু হালদার তার মুখোমুখি মাঝিকে ডাকে, ‘ও মিয়া, বিড়ি খাবানে একডা?’

দুই মাঝি, দুই বৈঠা, যোগেন বাদে তিন প্যাসেঞ্জারের বিড়ির ধোঁয়ায় বেশ একটা নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাথার কাপড়ের ভিতর থেকে যোগেন বলে ওঠে, ‘প্ৰহ্লাদদা, তোমার য্যান ক্যামন অতিথিসেবা কম। তুমি কোনোদিন আশ্রম-ব্যাবসায় ঢুইকো না।’ নামশূদ্রদের মধ্যে কোনো-কোনো বিশিষ্ট মানুষের আশ্রম-খোলার বাতিক আছে। বাতিক ছিল বলাই ভাল—এখন কমে এসেছে। তাঁদের গুণও থাকে কিছু—বেশিরভাগই টোটকা ঘটিত। কেউ হয়ত বছরভর খুকখুক কাশি, কাশির সঙ্গে দু-এক ফোঁটা রক্ত, সারিয়ে দিতে পারে। কেউ হয়ত হঠাৎ-কাশির দমক সারান। কারো নাম ডাক ঘা-কাটাছড়া সারানোয়। হাঁটুর বাত কেউ সারিয়ে দেন। যাকে বলে পেটখারাপ তা নয় কিন্তু খাওয়ার পরই বাহ্যে, ছোটা কারো ওষুধে সেরে যায়। আমাশা, রক্ত-আমাশা, অম্বল, অজীর্ণ, শূলব্যথা, প্রথম বা শেষ রাতের অনিদ্রা, মেয়েদের শ্বেতস্রাব, ঋতুকালে তলপেটব্যথা, স্তনের কাঁচা ফোঁড়া—এগুলি তো আছেই। টোটকা মানে স্বপ্নলব্ধ বা গুরুর কাছ থেকে পাওয়া গোপন বিদ্যা। এটা বেচা যায় না। তাই, শিষ্যসামন্ত নিয়ে এক-একটা আশ্রম খুলে বসেন। চাঁদসি-তে যাঁদের নামডাক হয়, তাঁদের তো আশ্রম রাখতেই হয়—নইলে অত রোগী থাকবে কোথায়, তাদের দেখাশোনাই-বা হবে কী করে?

‘ত্রুটিডা কও। অ্যাহন কি সেটা সংশোধনের উপায় করা যাবে? যদি না-যায় পাড়ে নাইম্যাই তোমার সেবার অভাব দূর করব।’

‘নিজের নেশাড়া পকেট কইর‍্যা আইনছ, আমার নেশাডা আইনল্যা না।’

‘দেহো যোগেন, সবকিছুর একডা নিত্যকর্ম আছে। নেশা কয় কারে। যেডা তোমার শরীরের প্রত্যঙ্গ হইয়্যা যায়। নেশার দ্রব্য সঙ্গে রাইখতে যে-মানুষ ভুইল্যা যায়, স্যায় তো দম টানিব্যার ভুইলে মইর্যা যাইব্যার পারে। তাইলে? যা তোমার শরীরের তাপ ছাড়া বাঁচে না, তাহাই তোমার নেশা।’ প্ৰহ্লাদ কথাটা শেষ করে দেয়ার ভঙ্গিতে বিড়িতে টান দেয়।

‘আদ্ধেকখান গাছের পাতার জন্যে এতখান কথা? তোমার মোক্তারি পেশা সার্থক।’ যোগেন কখনোসখনো পান খায়, তাই নিয়েই কথা।

‘যোগেন, তোমার সঙ্গে জরুরি কথাডা কি অ্যাহন কহা যায়। তোমার অ্যাসেম্বলি য্যান কবে?’

‘২৯শে জুলাই। গভর্নরস অ্যাডড্রেস।’

‘তাইলে ২৮শের পর তো তুমি নাই।’

‘২৭ সকালের মইধ্যে পৌঁছালে নিরাপদ। কইলকাতার খবরটবর তো জাইন্যা নিতে দিন দুই লাইগব। কথাডা যদি জরুরি হয় তাইলে অ্যাহন কওয়া-বলা যায় না? ধীর সমীরে যমুনা পুলিনে—’

‘তা হয়ত কওয়া যায়। ইতিপূর্বেও আমি দুই-এক বার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার মোক্তারি বুদ্ধিতে বুইঝব্যার পারি নাই—তুমি কথাডাতে ইনটারেস্টেড কী না। এ-বিষয়ে তোমার সিদ্ধান্তই বহাল।’

‘বিষয়ডা কী?’

‘ধরো, ইলেকশনের পর ছয় মাস পার হওয়ার চইলল, তুমি অ্যাহনো কোনো পার্টি-তৈরির বা কোনো পার্টিতে জয়েনের কোনো ইশারা দ্যাও নাই।’

‘ভোট না-হয় হইছে ছয়মাস, সরকার তো হইছে তিনমাস, তাও আবার বাহাত্তুরা বুড়ার নাগাল দুইখান দাঁত শুলিয়ে—আছে, না গিছে, না নিজের দাঁত নিজেই গিল্যা ফেইলছি। এই হাঙ্গামারা মইধ্যে তোমার একডা পার্টি হইল কী হইল না নিয়্যা কার মাথাব্যথা? গোলে তো সব হরিবোল হইয়্যা যাবে নে—’

‘তুমিই সব থিক্যা ভালো বুঝবা। না-হয় পরেই হবে। কিন্তু পরে যদি হওয়া লাগে তাইলেও তো আমাগো রেডি থাইকব্যার লাইগব।

শিবু হালদার হঠাৎ বলে ওঠে, ‘আমার কিন্তু মনে লাগে অন্তত বরিশালের জইন্য একডা পার্টি খাড়া করা দরকার। নাইলে মানুষজন কুথায় খুইজব, আপনার লগে একডা সংবাদ দিতে? মানুষের তো ভালোমন্দ আছে।’

‘ক্যা? মানুষজনের কি ইতিমধ্যে জানা হইয়্যা যায় নাই যে আসল এমএলএ-র নাম শিবু হালদার মশায়?’

‘স্যায় তো ব্যাবাকই জানে আর আসেও তো কোর্টে, বাড়িতে, সেরেস্তাতে এইডা-ঐডার কথা কইব্যার লগে কইর‍্যাও তো দেই, প্রহ্লাদদারেও জানাই কিন্তু সে তো আর এমএলএ-র কাম না; এমএল-এর কাম কইরব্যার লাইগলে পার্টি চাই অবশ্যই’।

‘অ্যাহন যে কামগুলা করেন সেগুল্যা কীসের কাম?’

সেগুলা তো জনসেবামূলক–আমাগো বরিশালে তো সেডা কিছু নতুন কথা না—অসুখ হইছে—ডাক্তার-কবরাজের পয়সা নাই, ক্যান জানি না, সামলা কিন্তু কইস্যা গিছে আর অসুখবিসুখ বাইর্যা গিছে।

‘তাইলে তো আপনি একডা পার্টি খুইল্যা মামলার সংখ্যা বাড়াইব্যার চান—’

‘এমন সরাসরি কইলে তো ‘হ্যাঁ’-কওয়া খারাপ শুনায় কিন্তু বস্তুডা একই। মামলা-মোকদ্দমা তো ক্ষমতা-প্রদর্শনের ক্ষেত্র। পার্টি ধইরলে স্যায় ক্ষমতা শক্তি এইসব জুগানে সুবিধাসুযোগ থাকে। পার্টিই যদি না কইরবেন, তালি মিছামিছি ভোটে খাড়াইলেন ক্যা?’

‘আমি তো জিগায়্যাই যাচ্ছি, এমএল-এর কামডা কী।’

‘ধরেন, ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বারের কাম যেমন নিজের গ্রামের রাস্তাডা নতুন করা, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মেম্বারের কাম যেমন নিজের মহকুমাডায় হাসপাতাল বসানো, হাসপাতাল যদি নাও হয়, তালি বিনা মূল্যে চিকিৎসালয় আর এমএল-এর কাম আপনি যা কইর‍্যা অ্যালেন কাইল, নিজের পকেডের পয়সা দিয়্যা অন্যের বাবার নামের ইশকুলের ভাঙা বেড়া সিধা করা।’

লগিমারার সুবিধের জন্য মাঝিরা কোদোবনের ভিতর ঢুকেছিল, খাড়া কোদোঘাস নৌকোর মানুষজনের মাথায় মুখে লাগছিল, শুড়শুড়ি দিচ্ছিল, দু-একটা হাঁচিও পড়েছে, নৌকোটা এগচ্ছিল তরতরিয়ে, রোদটাও সরাসরি লাগছিল না। শিবু হালদারের কথায় প্রহ্লাদ আর যোগেন এত জোরে হেসে ওঠে যে কেদো বনের ভিতর থেকে কয়েক ঝাঁক পানিছাঁচা পাখি একসঙ্গে আকাশে উঠে যায়—এত দিক থেকে, যেন নীচে জল নয়, শুধু পানিছাঁচা পাখিই ছিল।’

যোগেন বলে, ‘তয় তো আসল কথাডাই ধইরা ফেলাইছে। কও লিডার ছাড়া কেউ এমএল-এ হবার পারে? পারে না। তাইলে কও দেহি, অশ্বিনী দত্ত শুইন্ধ্যা কোন মানুষ আছে যে নিজের পকেট নিজে না-কাইট্যা লিডার হইছে।’

শিবু বলে, ‘হ্যায় যদি আপনার পকেটের উপরের ফাঁক গইল্যা টাহা ঢোকে, তাইলে, তলার ফুটা দিয়া কিছু টাকা না-হয় লিডারিবাবদ দ্যান গিয়া। কিন্তু পার্টি একডা দরকার। একডা সাইনবোর্ডে—পার্টির নাম, আপনার নাম, এম. এল-এ, যে-কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন।’

‘এইডা কোথায় টাঙাবেন!’

‘আপাতত প্রহ্লাদদার বাড়িতে’, শিবুর কথায় বোঝা যায়—সবগুলো কথাই সে ভেবেচিন্তে ঠিক করে রেখেছে। তার এতটা প্রস্তুতি ও প্রয়োজনকে তুচ্ছ করা যায় না।

যোগেন বলে, ‘অ্যাসেম্বলিতে আমাদের তো একটা নাম নিতে হইছে, সেডাই তো আমাগো পরিচয়। বেঙ্গল অ্যাসেম্বলি ইনডিপেনটেন্ড শিডিউল কাস্ট মেম্বারস লিগ। হেমচন্দ্র নস্কর, চব্বিশ পরগনার নেতা, প্রেসিডেন্ট আর আমি সেক্রেটারি। সেইডা লাগাইতে পারো। তাতে যদি কামের সুখসুবিধা হয়, তো হোক।

শিবু বলল, ‘নামটা আর-একবার করেন? আপনাগো সব কাজেই চাঁদশির গিঁঠ। সব পার্টির নাম দ্যাহেন—জিভের ডগা থিক্যা খসার আগেই ইষ্টমন্ত্রের মত কর্ণমূলে ঢুকব। কংগ্রেস, লিগ, হিন্দুসভা, প্রজাপার্টি, আরেসপি। আর আপনারা, কী কইলেন য্যান?’

‘বেঙ্গল অ্যাসেম্বলি ইনডিপেডেন্ট সিডিউল্ড কাস্ট মেমবার্স লিগ।’

‘এইডা মনে রাখা আমার কাম? এ নামডা তো বামুনগ, চোদ্দ পুরুষের নাগাল লম্বা। শ্যাষে আবার একডা ‘লিগ’ থুইলেন ক্যা?’

‘শোনেন শিবুদা, আমরা তো কুনো পার্টি হবার পারি না।’

‘নিষেধডা কার? শুদ্দুররা মেম্বার হইবার পারব কিন্তু পার্টি হইব্যার পারব না?’

‘অইলে আর ঠেগায় কেডা? হও।’

‘না। কথাডা বুঝান। আপনি একা বুইঝ্যা গাঁজা-খাওয়া সাধুর মতন গাল ফুল্যাইয়া বইস্যা থাইকলে হব? আমি বুইঝলে তো আরো দশে বুইঝব। কন।’

‘ভোটে তো শিডিউলগো সিট ছিল বতিরিশডা?’

‘আপনি যে শিডিউল হইয়্যা জেনারেলে গেলেন তার আদায় দিব কেডা?’

‘তার আর আদায় নাই। বাধা দিবেন না। বুইঝ্যালন। শিডিউলগো সিট বতিরিশডা। তাইলে মেম্বারও হইল বতিরিশডা শিডিউল। ধরেন, আমরা আছি তের, তেমনি রাজবংশী আছে। আমরা দুই জাইতই বেশি। প্রথম সুযোগেই আমরা এই বত্তিরিশজন শিডিউল একসঙ্গে বইসল্যাম হেম নস্করের বাড়িতে। কৃষকপ্রজা আর কংগ্রেসেরও বড় নেতারা ছিলেন। অ্যাহন, সেই মিটিঙে আমাগো বতিরিশ শিডিউলের মইধ্যে তো কংগ্রেসও ছিল, রসিক কাহা যেমন পাতিরাম রায়, খুলন্যার, যেমন, ঐ দিকের প্রেসিডেন্সি ডিভিশনে, তো বেবাকই কংগ্রেস। আবার মল্লিক ভাইরাও ছিল—যে-পার্টি মন্ত্রী কইরব, সেই পার্টিতে যাইব। তেমন পরিস্থিতিতে আমাগো এইটুক্ দেখানোই কর্তব্য ছিল, আমরা যে যে-পার্টিরই হই না ক্যান, আইনসভায় আমরা শিডিউল হিশাবে একটা বোঝাপড়ায় চইলব। নস্করমশায়রে কইরল প্রেসিডেন্ট, আমারে কইরল সেক্রেটারি। তাই নামডা হইল, ‘লিগ’। নামডায় ‘পার্টি’ তো দেয়া যায় না। তবে অ্যাহন তো মনে হইতেছে, ‘লিগ’ না কইয়্যা গ্রুপ কইলেই হইত। আসলে ‘লিগ’

‘লিগ’ শুইনতে-শুইনতে গোলে হরিবোল হইয়্যা গিছে। অ্যাহন কন বরিশালে গোলে হরিবোল হইয়্যা গিছে। অ্যাহন কন বরিশালে একখান পার্টি বানাইলে আমাগো লাভ বেশি? না কী কইলকাতায় সব শিডিউলরে জড়ো রাইখ্যা এডডা কিছু খাড়া করা ভাল?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *