৫৫. শ্বশুরবাড়িতে যোগেন
আগৈলঝরার মিটিং সেরে শ্বশুরমশায় আর তাঁর লোকজনের সঙ্গে খাগবাড়ির নৌকোয় উঠে যোগেন হাতের ঘড়িতে সময় দেখে সাতটা কুড়ি, মানে সূর্যাস্তের পর এক ঘণ্টার ওপর, মানে এই মিটিঙের সুবাদে আগৈলঝরায় রাত্রির প্রথম প্রহর ঘণ্টাখানেক লেট, মৈস্তারকান্দিতে দ্বিতীয় প্রহরও পার হয়ে গেছে। যে দুটি-একটি লন্ঠন, একটি পাটের মশাল আর কয়েকটা কুপি আর এইসব আলো ও ছায়ায় গুণিত মানুষের ভিড় যোগেনকে নৌকো পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল, নৌকো খুলতে না-খুলতেই সে-সব যেন মুহূর্তে মুছে যায়। যোগেনের নৌকোই বের হয়ে গেছে ঐ আলোর প্রতিবিম্ব থেকে। এখন শুধু দেখা যায় অসম আকারের আলোবিন্দুর বাঁকা রেখা।
আগৈলঝরা থেকে খাগবাড়ি একটু পুব কোণে। মৈস্তারকান্দি থেকে সময় কম লাগে। একটা ডাঙা জমি ঘের দিতে গিয়ে একটু দেরি হয়। অন্ধকারে অন্ধকার ডাঙাটাকে মনে হয় যেন দিগন্ত। গাঁয়ের নাম ভুলকাঠি। নাম নাকী আসলে ফুলকাঠি। বরিশালি জিভে প, ফ, কিছুই খেলে না। তাই হয়ে গেছে, ভুলকাঠি।
খাগবাড়িতে বারুইদের ঘাটে নৌকা লাগতেই নৌকোর ভিতর থেকে কেউ চেঁচায়, ‘আরে, আছে কেডা, আলো দেহাও।’ দু-একজন লাফ দিয়ে নেমে যায় নৌকো দুলিয়ে। তাদের পায়ের মাপ আছে—এক যদি এর মধ্যে জোয়ার খেলে গিয়ে না থাকে। আর, থাকলেই-বা কী, বড় জোর একটা চুবান।
ঘাটে আলো আসতে একটু তো দেরি হবেই।
‘যোগেন, বইস্যাই থাহো, খাড়াইয়ো না—’
যোগেন একটু আওয়াজ তুলে হাসে, ‘বইস্যাই আছি, শুইয়্যা পড়ি নাই।’
আলো আসছিল। গাছপালার মাথায় খুব হালকা একটা ভেজা আলো ধানক্ষেতের জলের মত কাঁপছিল। সেই আলোটাই দুলছিল না এই নৌকোটাই দুলছিল—বোঝা যায় না। বুঝতে-না-বুঝতেই আলোটাতে মানুষের স্বর লাগে আর ঘাটটাকে উদ্ভাসিত দেখায়। জল তো নীচে। সেই নীচের কয়েক ধাপ গড়াতেই আলো যায় ফুরিয়ে কিন্তু নৌকোর জলের এদিকে-ওদিকে-সেদিকে দুটো লন্ঠনের শিখা ভেঙেচুরে ডুবে যেতে থাকে।
পাড় থেকে মেয়েদের কারো গলা এল, ‘এবার কি সত্যি জামাই? নাকী এবারও জামাইয়ের খবর?’
‘সে আবার কী? গোটা এডডা জামাই নিয়্যা আইল্যাম, স্যায়ের ভারে নৌকা ডুইবতে ডুইবতে ভাইস্যা আইল হাঁসের নাগাল। অ্যারেও যদি কও জামাই না, জামাইয়ের খবর, তাইলে জামাই আইনব্যার জইন্য গয়নার নাও পাঠাইয়ো।’
‘ঠাউরবেটা, মিছা কই না। স্যায় ধরো দুপুরের পর থিক্যা অ্যাহের পর অ্যাহ খ্যাপ আসে আর কয় আপনাগ জামাই আইসবে মিটিং সাইরা, আপনাগ জামাই আইসবেন মিটিং থিক্যা, আপনাগ জামাই ছাইড়ছে মৈস্তারকান্দি, আপনাগ কেউ গেছে নি আগলঝারা। শ্যাষে দিদি কইল, জিগা-না, কেন আইসছে। আমি চিক্কুর দিল্যাম, ‘মাঝি, কইয়্যা য্যান, আইলেন কোথথন্।’ কইল য্যান কিছু। শুইনব্যার পাইল্যাম না।’
‘তারপরেও না আইল দুই পাক?’
‘তাতে কি তোমাগো ক্ষতি হইছে কুনো? খবর দিছে। খবর শোনো।
‘আমারাও তো সেডাই ভাবব্যার ধইরছি দাদা, ক্ষতি কইরলাম নাকী কিছু? আমাগ কি নৌকা পাঠাইতে কইল? না, মানুষ পাঠাইতে কইল?’
‘বাব্বা, আমাগ অম্লা যে শ্বশুরবাড়ি কইর্যা বুদ্ধিশুদ্ধি, অ্যাককেরে পালটি জোয়ারের ধাক্কায় হোলগা ঘাসের নাগাল, ফনফনাইয়া বাইড়ায় আইনছে। মানুষ কইল না নৌকা কইল?’
এইসব কথাবার্তার মধ্যেই নৌকো থেকে নামা, ঘাট বেয়ে ওঠা, ঘরের দিকে যাওয়া ঘটছিল। এসব কথা তো মুখের দিকে তাকিয়ে হয় না, স্বর চিনে হয়। সূর্যাস্তের পর যেটুকু সময় জাগরণ, তাতে তো কেউ কারো মুখ দেখতে পায় না, শুধু স্বর শুনতে পায়। স্বর যদি কেউ না তোলে তাকেও শুনতে পায়। জন্ম-মৃত্যু আপদ-বিপদের তো আর আলো-অন্ধকার নেই, বেলা-কালবেলা নেই। আপদ-বিপদের প্রধান যেটা, ডাকাতি, সেটা খাগবাড়িতে হয় না। বরং এদেরই কেউ-কেউ বছরে দু-একটা ডাকাতি করতে বেরয়। পেটের ছেলে বেরবার তো আর রাতবিরেত নেই। জন্ম যদি নেহাৎ ঘটতেই থাকে তাহলে কুলসুখ বা তার মাকে ডাকতে হয়। রাতবিরেতে এখন কুলসুখই বেরয়—ওর তালাক হয়ে যাওয়ার পর থেকে। খাগবাড়ির মত একমুঠো গ্রামে পেটের সব বাচ্চাই তো আর রাতেই বেরয় না। বা, একই রাতে দু-দুটো পেট থেকে তো আর বাচ্চা বেরয় না। মৃত্যু যদি অন্ধকার বেলায় হয়, তাহলে আর কী, যেন মরণ হয়নি ভেবে নিয়ে অন্ধকার কাটিয়ে দিতে হয়।
এদের রোজকার অভ্যেস থেকে আজ রাত তো বেড়েইছে, এমনকী জামাইয়ের আসার মত উপলক্ষের পক্ষেও, এমনকী, এমএলএ জামাইয়ের মত ব্যতিক্রম উপলক্ষের পক্ষেও। বাড়ির দুয়ারে ঢুকে আবছায়া দাওয়াগুলিতে লোকজন-বসতে না বসতেই, লম্বা সরু মাটির দাওয়ায় দরজার এক পাশে একটা, আর-এক পাশে একটা, আসন পেতে আর বাকি দাওয়া খালি রেখেই, দাওয়াজোড়া খাওয়ার জায়গা পড়ে। এ সমাজে খাওয়ার জায়গা সাজানোর কোনো রীত নেই। আইল যেহানে খুশি বইল, ভাত-ডাইল-তরকারি-মাছ এক শানকিতে বা বাটিতে দেয়া হইল, গাবুরগবুর খাইয়্যা, শানকি ধুইয়্যা রাইখ্যা ঢকঢকাইয়া এক প্যাট জল খাইয়্যা যেহানে যাওয়ার দবদবাইয়্যা গেল। বারুই বাড়িতে জামাইখাওয়ানোর জন্য এমন আয়োজন। কেউ কেউ দুয়ারে দুই পা ফাঁক করে মাঝখানে কলাপাতা নিয়ে বসে গেছে। জলের একটা চুমকি, মাটির, জামাইয়ের আসনের সামনের বাঁশের গোড়ায়। ওটা থেকেই সবাই ঢকঢকিয়ে জল খায়। বারুইমশায় সম্পন্ন মানুষ, পুরো গ্রামেই চেনাজানা আছে। একটা বড় মাটির হাঁড়ি, ভাতের, দুইজন ধরাধরি করে দাওয়ার তলায় রাখে।
এই-যে লোক খাওয়ানোর আয়োজন, দাওয়ায় লাইন পেতে বসা, পাতে-পাতে পরিবেষণ, একটুআধটু যাচন–এসব বড় জাতের কাছ থেকে শিক্ষা। বামুনবাড়ি-বদ্যিবাড়ি-তেমন-তেমন কায়েতবাড়ির সঙ্গে বিশেষ করে নমশূদ্রদের জীবনের এত মাখামাখি যে ছোঁয়াছুঁয়ির মত কঠিন রীতিকানুনও দুইপক্ষই এমন অগোচরে মেনে চলে যে তা থেকে কোনোরকম ঠোকাঠুকি লাগে না। কত বছর থেকে এই লেনদেন চলে আসছে যে নমশূদ্রদের মধ্যে অনেকেই, মেয়ে-পুরুষ যাই হোক, বয়েস যাই হোক, অনেকেই এমন একটা কল্পনাকেই জীবনযাপনের আধার বলে অচেতনে মেনে নেয়—বামুন-শুদ্দুরের একটাই জীবন, শুদ্দুরের কাজ না পেলে বামুনের পেট ভরবে? আর, বামুনদের ছায়া না পেলে শুদ্দুরের শ্বাস বইবে? ছুঁত-অদ্ভুত, জলচল-জলঅচল, ছোঁয়াছুঁয়ি, খাওয়া-দাওয়া এইসব এত শ শ বছর ধরে এমন পাকাপোক্ত ঠিক হয়ে আছে যে বামুনেরও মনে থাকে না, শুদ্দুরেরও মনে থাকে না, সীমা একটা আছে। মনে থাকে না কারণ তারা কেউই এটা শেখেনি, সবারই এটা অভ্যাস। কোন্ এমন বামুনদের গাঁ আছে কোথায়, যে গাঁয়ের বামুনদের ছাওয়াল-পাওয়াল শুদ্দুর মাদের বুকের দুধ ছাড়া চার-পাঁচ বছর বেঁচে থাকে, শুদ্দুর মায়ের হাতে বানানো মুড়কিমোয়া খায় না? কী-যে খায় না, তার লিস্টি এত ছোট ও গোপন যে দুইপক্ষের কোনোপক্ষ না-জানলেও লঙ্ঘন হয় না। এমন একটা ওতপ্রোত জীবনযাপনে অস্পৃশ্যতা বামুনদের দিক থেকেও এত অবান্তরও যে সত্যি একটা সমগ্র জীবনেরই মায়া তৈরি হয়। খুব নিবিষ্ট বিচারে কারো মনে হতে পারে–তাহলে জাতপাত নিয়ে এত কথা যে ওঠে, বামুনরাও যে কখনো-সখনো স্পর্শদোষে পতিত হয়, শূদ্ররাও যে অনেক সময় স্পর্শগুণেও উন্নত হয় না—এসব কি জীবনযাপনের বাইরে? এমন প্রশ্নের উত্তরেও কারো মনে হতে পারে, এই জীবনযাপনেরই ভাগিদার কারো মনে হতে পারে—বোধহয় তাই, এটা সত্যিকারের জীবনযাপনের বাইরেরই ব্যাপার। কিন্তু কত কাল যে এই ভিতর-বাহির আছে তা কারো জানা নয়। সেই অনন্তকালই হয়ত একটা ফাঁক চাঁদের আলোয় ছায়ার মত আবছা হয়ে আছে—চাঁদ আস্তে পারলেই ছায়ারা চলে যাবে। কত কত হাজার বছর ধরে চন্দ্রাস্ত ঘটে গেল, ছায়া ঘুচল না। যেন, ওটা ছায়া না। ওটা বিন্ধ্য পাহাড়ের নমস্কার। সীমানা। বাহির বাহিরেই ও ভিতর ভিতরেই থাকবে। ব্যবধান ঘুচবে না।
জীবনযাপন মানে তো খাওয়াপরা, ছেলেপেলের জন্ম দেয়া, ছেলেপেলে বড় করা, ছেলেপেলেদের শিক্ষা দেয়া—বামুনরা শেখায় লেখাপড়া, শুদ্দুররা শেখায় জাতকর্ম-স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা–এর কোন্ একটা কাজ বামুনবাড়িতে শুদ্দুর ছাড়া চলে? পুরুষরা কর্তার খাশ জমির কৃষানি থেকে কর্তার ডাকা নদীর জেলেগিরি পর্যন্ত কী কাজ করে না? আর মেয়েরা? রান্নাঘরের বারান্দা থেকে বামুনমার কথামত হলুদ বেটে, জিরে বেটে, পেঁয়াজ বেটে, রসুন বেটে, আদা বেটে, ডাঁটা কেটে, ডাঁটার আঁশ তুলে, লাউয়ের খোসা কুচি করে, মোচা কুচি করে—এক-এক নমশূদ্র মেয়ে এমন ওস্তাদ হয়ে ওঠে যে রান্নাঘরের চৌকাঠটা কার্যত উবে যায়।
এই সত্য আর এর বিরুদ্ধে পালটা অসত্য তো একসঙ্গেই চলতে থাকে। বামুনবাড়ির রান্নাশালে শুদ্দুরনী ঢোকে ক্যামনে? যদি-বা ঢোকেও, আগুন ছোঁয় ক্যামনে? যদি-বা ছোঁয়ও, জল ঢালে ক্যামনে? আর যদি ঢালেও, সেই রান্না সাজাইয়াগুছাইয়া ঢাইক্যা-ঢুইক্যা রাখে ক্যামনে? আর যদি রাখেও, সেই ঢাকা খুইল্যা সেই খাদ্য বামুনবাড়ির মাইয়া-বৌরা তাগো বাপ-স্বামী-ছেলের পাতে তুইল্যা দেয় ক্যামনে?
আরে, এইসব কি আর মুনশেফের হুকুম নিয়ে হয়, কিন্তু হয়। বড়-বড় সব বাড়িতে তো রান্নাঘরের কর্ত্রী একটা পোস্ট। আর ভিতরবাড়ির কূটনীতিতে এক বিন্দুও রোম্যান্স নেই। জমিদার বামুন-বদ্যি-কায়েতের অন্তঃপুর প্রতি মুহূর্তে রক্তাক্ত। এতটা রক্তাক্ততা সত্ত্বেও সেখানে কোনো নাটক নেই।
সময় মত ও দরকার মত কর্তার কোনো বোন বিধবা হয়ে দু-চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে এসে থাকে। বা, গিন্নির কোনো মামাতো ভাইও সংসারসহ এসে পড়তে পারে। বা, কর্তাদের কোনো এক ভাই আধপাগলা, আধা সন্ন্যাসী, উদাসী, স্বদেশী, থাকতে পারে। বিয়ের আগে থেকেই সে এরকম। বিয়ে দিলে এসব সেরে যায়-ধারণায় তাকে বিয়েও দেয়া হয়। বিয়ের ফল ফলতেই থাকে। তখন তার বৌ নিজের স্বামীর, নিজের, নিজের ছেলেমেয়েদের ডালভাত নিশ্চিত করতে রান্নাঘরে গোখাটনি খাটতে শুরু করে। বামুনরা আসলে গতর সোহাগি। গতর যদি বাঁচাতে পারে, তাহলে দুটো ভাত জোটাতে তাদের আপত্তি নেই। আর সে ভাইবৌও তো বামনি। এগুলো হচ্ছে একান্নবর্তিতার সুবিধে।
এর অন্য প্রকারও আছে।
এই গিন্নি যদি কর্তার দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ হন, যদি কর্তার ধাতে মেয়ের বিছন থাকে বেশি কিন্তু এই শেষ পক্ষে দু-চারটি ছেলে জন্মে গেছে, প্রমাণত নতুন গিন্নির ধাতে, যদি পুত্রবধূরা বাড়িতে ঢুকতে শুরু করে থাকে—তাহলে, গিন্নিমা রান্নাঘরের কালি-ঝুলি-তেল-তাপের মধ্যে থাকেন সেটা কর্তাবাবু চান না, গিন্নিমাও চান না। কিন্তু রান্নঘরের দখল কী করে ছাড়বেন? তখন, প্রথমত তিনি বৌমাদের সে-দায়িত্ব থেকে ছাড় দেন, ‘তেল-ঝোল মেখে চেহারা নষ্ট করো না, চেহারাতেই পরিচয়’, আর সেই বাটনা বাটা শুদ্দুরনী চৌকাঠ ডিঙিয়ে রাঁধুনীও হয়ে যায়।
এই খেলাটা খেলতে, গিন্নিমার ইঙ্গিত বুঝতে, নমশূদ্র মেয়েরা ভালই বাসে। তারা এটা দশকান করে না যদিও দশকান হয়ে যায়। হয়ে যায় বটে কিন্তু তারা কেউ মাথাটি হেলায় না। তাদের হাতে যে বামুনবাড়ির সবাই খাচ্ছে, এটা তাদের একটা মর্যাদা দেয়, নিজের কাছে। বামুনের জাত মারা যাচ্ছে, গোপনে—এ থেকে তাদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক কোনো জয়বোধ জাগে না। বরং তারা যেন অনেকটা বামনী হয়ে গেল—এই গৌরববোধটা তাদের হাঁটাচলায় এসে যায়।
এইসব বিনিময়—গোপন ও প্রকাশ্য—খাওয়ার জায়গা দেয়া, সাজিয়ে খাবার দেয়া, পরিবেষণ ইত্যাদি এ-সমাজে ঢুকে যাচ্ছে—সেটুকু যে পারে।
হাঁড়ির ভিতর একটা শানকি ডুবিয়ে ভাত তুলে দেয়া হচ্ছিল, যোগেনের পাতে। দিচ্ছিল দুই বৌ, ঘোমটা তাদের মাথার আধবরাবর।
যোগেন খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে, ‘আমার একডা সাফা-হওয়া আছিল—’
‘সন্দডা না-জাইনলে সাফা হইবা ক্যামনে?’
‘আমার হিশাবে তো সন্দ নাই। আমি তো এই বাড়ির এগার বছরের পুরানা জামাই।’
‘হইল্যা। কেডা অস্বীকার দিচ্ছে? যে জবাব দিচ্ছে সে যেন এ-খেলার নিয়ম জানে।
‘এগার বছরে তো পুরানা জামাই ঘরজামাই হইয়্যা যায়।’
‘তোমার কি হওনের ইচ্ছা? আমাগোরও অনিচ্ছা নাই। কিন্তু খাগবাড়িতে তো আইনসভা নাই’—সমবেত হাসিতে বোঝা যায় সবাই মজা পাচ্ছে।
‘সে-কথা না। আমার বেলায় দেখত্যাছি আমি যতই পুরানা হয়্যা যাচ্ছি জামাই বইল্যা, আমার সঙ্গে ততই ব্যাভার করা হচ্ছে য্যান, আমি নতুন জামাই।’
‘মানে কইতে আছ যে জামাইয়ের আদর কমে নাই। সে তো আমাগ গৌরবের কথা। তোমারও গৌরবের কথা যে তোমার শ্বশুরবাড়ি আদর কম্যাইয়া জামাই তাড়ায় না।’
‘সে না-হয় এডডু গুমর হওয়ারই পারত। কিন্তু আমার তো ডর লাগে-
‘ডরের হেতু?’
‘যে-রেটে আমারে আপনারা পুরান থিক্যা নতুন বানাবার ধরছেন, সেই রেটে তো দুই-চার বছরের মইধ্যে আপনারা বলাকওয়া শুরু কইরবেন—মৈস্তারকান্দির যোগেনের সঙ্গে আমাগ মাইয়ার বিয়ার কথা চইলতেছে মাত্র, বিয়া হয় নাই। তহন আমি কী কইব?’
যোগেনের কথাটাতে একটু যে পেঁচানো রসিকতা ছিল সেটা একটু-আধটু আন্দাজ করলেও, সবাই ঠিকঠাক ধরতে পারছিল না। অথচ উত্তরের সময় বয়ে যাচ্ছে।
ফলে, এবার পালটাপক্ষ বদলে গেল। কেউ একজন নতুন গলায় বলে, ‘এইডা তুমি কী কইল্যা যোগেন। এক বামুনের বিধবার এক পোলা আছিল। ঐ যেমন হয়, গায়ের রং ধলা আর এডডু হাবাগোবা। তার তো বিয়্যা হইল। দ্বিরাগমনে পাঠাইবার কালে মা ছাওয়ালরে উপদেশ দিল—মানুষজনের সঙ্গে এড্ডু-আধডু কথাবার্তা কস, নইলে তো তোরে বোবা ভাইবব। বেশি কথা কস না—তাইলে তো বেবাকে জাইন্যা ফেইলবে তুই বোগ্দা। তো সে ছাওয়াল শ্বশুরবাড়ি যাইয়্যা শ্বশুরের সঙ্গে আলাপে বইস্ল। সামনে-শ্বশুরবাড়ির বড় পুকুর। সেইদিকে চাইয়্যা-চাইয়্যা বামুনের পোলার ভাবোদয় ঘইটল। কয় যে, আচ্ছা শ্বশুরমশাই, এই-যে এত বড় পুকুর কাটাইছেন, এর এত মাটি কী কইরলেন। শ্বশুরমশায় জবাবে বলেন–বাবা, সে- মাটির অর্ধেক খাইছেন তোমার মায়। নাইলে এমন পণ্ডিত ছাওয়াল হয়? আর অর্ধেক খাইছি আমি। নাইলে তোমার হাতে মেয়ে দেই?’
হাসির কোলাহলে সবচেয়ে উঁচুতে উঠল যোগেনের গলা। যোগেনের গলার এ হাসি শুনলে মনে হয়—আষাঢ়ের মেঘ ডাকছে।
রোল থামলে যোগেন বলে, ‘জবর কইছেন। কিন্তু আমি তো তা কই নাই?’
‘কী কও নাই?’
‘এই-যে এতখান খাল আগৈলঝরা থিক্যা এক-নৌকায় ছাগল গাদাগাদি হইয়্যা আইল্যাম, আমি তো একবারও বাবারে কই নাই—বাবা, দুইডা-একড়া মাগঙ্গার বাহনের লাগইগ্যা খালে ফেলাইয়া দেন। কইব্যার তো পাইরতাম। কই নাই। বাবা, কইছি?’
বারুইমশায় খাওয়াতে ব্যস্ত ছিল, তাই প্রথমে ঘাড় নাড়িয়ে জানাল যে এমন কথা যোগেন বলেনি। তারপর ঢোক গিলে, মুখে বলল, ‘না বাবা, কও নাই’, তারপর আবার ঢোঁক গিলে আরো একটু পরিষ্কার গলায় বলল, ‘কও নাই। সে তো তোমার আত্মরক্ষার কারণে। কইলে তো তোমার কথা রাইখব্যার লগে তোমারেই আগে খালে ফেইল্যা নৌকার ভার কমাইতে হত।’ এবার হাসির লহর উঠল, একবারে থামে না, বারবার নতুন করে ওঠে আর সব লহরেই যোগেনের গলা সবার ওপরে।
এক সময় হাসি থামে। সেই চুপচাপে মনে হয়—এই কথার খেলা বা লড়াই বোধহয় শেষ হল। ঠিক তখনই সকলে শুনতে পেল যোগেনের গলা, একটু নিচু স্বরে, ‘এইডা একডা কথার মত কথা। কেডা জানে না যে মহাদেব যোগেন্দ্রনাথের শ্বশুর দক্ষ আর তার মুন্ডুটা—। থাউক, সর্বদা সত্য কওয়া ঠিক না, বিশেষ কইর্যা চাক্ষুষ সত্য।’
যোগনের কথায় আগের মত হাসি উঠল না বটে কিন্তু যে-হাসি উঠল তার সবটাই পরিণত বুদ্ধির হাসি।
‘বাঃ বাঃ, বারুই, তোমার জামাইরে ঠেহানোর কেউ নাই। এ এক্কেরে কলির পরশুরাম। কবির দল গইড়লে দেখতা রাজেন সরকারের উপুর দিয়া যায়। ওকালতি কইরলে দেখতা জজশাহেবরে কানমলা দেয়। আর এই-যে মেম্বার হইছে সেইডার কাজকামের খবর তো জানি না-পসন্দ হয় সেহানেও ওর সমান কেউ নাই। হাতির নাগাল স্মৃতিশক্তি, ইন্দুরের মত দাঁত, শকুনের নাগাল চোখ আর বাঘের নাগাল ঘ্রাণশক্তি।’
‘থাইমা গ্যালেন, তালৈ মশায়? প্যাটের কথা কইলেন না? ঐডাই নাহি আমার প্রধান ইন্দ্রিয়। কিন্তু সেটা যে কোথায়—তা তো ট্যার পাই না। দেওয়া শ্যাষ না হইলে তো আমার খাওয়া শ্যাষ হয় না। সেই কথাডাই তো কইতেছিলাম। শ্বশুরবাড়ি হইলেও আমি তো এ-বাড়িতে অন্নসেবা করি নাই। যারা পরিবেষণ কইরতেছেন, তাগো হস্তসংবরণের অনুরোধ করি।’
