১০
2 of 4

৫৩. যোগেনের সঙ্গে বরিশালের কর্তাব্যক্তিদের কথোপকথন

৫৩. যোগেনের সঙ্গে বরিশালের কর্তাব্যক্তিদের কথোপকথন

এগিয়ে গিয়ে যোগেন দুর্গামোহন সেন, পণ্ডিতমশায়, দীনবন্ধু রায়চৌধুরী, মেজকর্তা—এঁদের প্রণাম করে। ছোনাউল্লাশাহেবকে সেলাম দেয়। তারপর তার জন্য রাখা চেয়ারটিতে বসে বলে, ‘মকলেশ্বর শাহাব কি সদরে নাই?’

শিবু হালদার পেছন থেকে খুব চাপা গলায় জানিয়ে দেয়—সদরে নাই। বাড়িত গিছেন।’

‘তাইলে কাইল দেখা হইব আগৈলঝরায়। আর হাসেম শাহাব? প্রেসিডেন্ট?’

‘আইসবেন বইলছেন।’

‘তাইলে আর দুই-পাঁচ মিনিট দেখা যাউক, কী কন? আপনে এড্‌ডু দেহেন। আর প্রহ্লাদদা যায় কৈ?’

শিবু হালদারকে এ-মিটিংয়ে কোনো কাজকর্ম করতে বলেনি যোগেন। শিবু নিজেই ঠিক করেছে, তার হাজির থাকা উচিত—কখন কী দরকার পড়ে। তেমন ফাইফরমাশ খাটলেই তো ভিতরের আর বাইরের মধ্যে সেতু বলে লোকজন তাকে মানবে। শিবু মিটিঙে নেই, থাকতেই পারে না, কিন্তু তাকে তো ঐ চওড়া বারান্দার মাঝ বরাবর দাঁড়াতে হয়। সেই মাঝখান দিয়েই কোতোয়ালির বড় দারোগা শাহেব ঘোরাঘুরি করছেন। শিবুকে তিনি দেখেও যে কিছু বললেন না, তাতেই শিবু বুঝে যায়—সরকারি লোকজন শিবুর নতুন গুরুত্ব মেনে নিল।

যোগেন বলছিল, ‘আমি স্যার আপনাগো বেবাকের সঙ্গে একত্রে কথা বইলতে চাইছিলাম। তাই আপনাগো এই কষ্ট দিতে হল। কিন্তু এড়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় তো মাথায় আইল না। আপনাগো মনে হইলে কন, তাই হবে।’

মেজকর্তা বলে ওঠেন, ‘পয়লা হিয়ারিঙে ফুলবেঞ্চ ডাইক্যা দিল্যা। ডিভিশন বেঞ্চ ঘুরাইয়া আনলে মামলাডা এড্‌ডু সাফসুরুৎ হইত না?’

‘স্যার, আমার তো কোনো মামলা নাই। আইনসভায় স্যার এইসব দলের উকিল-ব্যারিস্টাররা আর কাউরে কথা কইব্যারই দেয় না।’

‘তোমার তো তাইতে বাধা পাওনের কথা নাই। তুমি তো কিছু ফেলনা উকিল না—’  

‘আমি তো স্যার বাই বার্থ ফেনা। অ্যাকে বরিশালের ডাকাইত। তায় ডাকাইতের ডাকাইত নমশুদ্দুর। আমারে তো স্যার পর-পর মামলায় জিপি বা পিসিকে হারাইয়্যা মামলা জিত্যা প্রমাণ দিতে হয়—যারে তুমি ফেলনা ভাবো, সে কিন্তু অত ফেলনা নয়।’

সবাই হেসে উঠল, একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা কলকাতার শাহেব ব্যারিস্টাররা বুইজল কিছু তোমার দর?’

‘বরিশাইল্যা যদি কুনো দর হাঁকে, স্যায়, কি তা না-বুঝ্যাইয়া ছাইড়ব? আপনাগো শিক্ষায় পাঁচ মাসে যা হওয়ার তার থিক্যা বেশিই হইছে। কিন্তু স্যার ও শরৎ বোস, নাজিমুদ্দিন, আবুল হাসিম, তুলসী গোঁসাই—এগুলা তো এক-একডা প্রকাণ্ড কাণ্ড। আমাগো পোলিটিক্যাল পজিশনডা এডডু সুযোগ দিচ্ছে ভাল—

‘দেহো বাপ, সুযোগ আবার পিছল্যা না হয়—’

হাশেম আলি শাহেব গট গট করে হেঁটে আসেন। তাঁর পেছনে শিবু হালদার যেন ছুটতে-ছুটতে আসছে।

হাশেম আলি চেয়ারে বসেই বলে ওঠেন, ‘আরে, এই শিবুডা আমারে হাত ধইরা-ধইরা পিছন থিক্যা আগালায়্যা আইনবার চায়। য্যান মুই ফিরাইয়া আনব। অরে, পারবি আমার সঙ্গে হাঁইটবার?’

শিবু হালদার দূরে দাঁড়িয়ে হাত কচলে হাসে।

যোগেন বলে, ‘না-পিছলানো খুব কঠিন স্যার। পায়ের আঙুলে স্যার, কাঁকড়ার দাঁড়া থাকার লাগে। দাঁতে স্যার ঘড়িয়ালের কান থাকা লাগে। চোখে স্যার, পথকুক্কুরের সন্দ থাকা লাগে। আর এইসবগুলা যদি একসঙ্গে ফাংশন করানো যায়, তাইলে পা নাও পিছলাইতে পারে। ভোটের আগের পোলিটিক্যাল পজিশনগুলা তো উলোটপালোট হইয়্যা গেল। প্রজাপার্টি হইল তিন টুকরো। কংগ্রেস গেল চুপসাইয়্যা। মুসলিম লিগের পোয়া বার। আমরা স্যার বরিশালের কায়দায় এক লগিতে দুই নৌকা ঠেলতেছি। কংগ্রেস আর প্রজাপার্টির ফালিগুল্যা তো সব ব্যাপারেই মারকাটারি অপোজিশন। আমরা বসি স্যার অপোজিশনে, কিন্তু সরকাররে সাপোর্টও দেই। ক্রিটিক্যাল সাপোর্ট।’

‘ক্রিটিকটা কনে আর সাপোর্টটা কনে—এডা এডডু গলা ঝাইড়্যা কও। তোমাদের মতই যে থাকব, তা না। কিন্তু কাগজ পইড়্যা তো আইনসভার ভিতরে কে কী চাইব্যার চায় তাও বুঝা যায় না, কে কীসে সমর্থন দেয় তাও বুঝা যায় না।’

‘বুঝাড়া তো এডডু মুশকিলই স্যার, বাহির থিক্যা। খুনের মামলাতেও না-হয় একডা আন্দাজ পাওয়া যায় জাজমেন্টের। আইনসভায় সে-আন্দাজও তো করা যায় না। আমি এডডা সার কথা বুইঝ্যা নিছি স্যার। যাগো সরকার, স্যায়রা চায় অন্য দল থিক্যা মেম্বার ভাগাইতে। তালি তাদের মেজরিটি বাড়ব। আর সরকারের বিরুদ্ধে যারা, তারাও চায় শাসকদলের মেম্বার কমাইতে। তাই বাইছ্যা-বাইছ্যা এমনসব প্রস্তাব বা আইন দুই পক্ষই তোলে যাতে অপরপক্ষের কোনো একটা দলের জাতস্বার্থে লাগে। নতুন কথা উইঠলেই আমি স্যার বুইঝবার লগে ধর্মবকের মত গলা বাড়াইয়া দেই—কয়ডা জালিয়া কৈবর্ত আছে শিডিউল কাস্টের লিস্টে? স্যার, এই মন্ত্রিসভাডার নিজের হাঁটুর জোর নাই। নিজেরাই জানে না—সরকারের সাপোর্ট আইজ কত?

‘বুইঝল্যাম। কিন্তু তোমার ক্রিটিকডা কী?

‘সে-ও একডা সোজা বুদ্ধি করছি। সমাজ-উন্নয়ন বইল্যা নতুন এডডা মন্ত্রক বানাইছে। তাগো কাজ পুরানা সব ছোট খাটো পতিত কাজ খুঁইজ্যা বাহির করা—মহাভারতের টাইম থিক্যা যুধিষ্ঠির-দুর্যোধন কয়্যা আসতিছে—এই কাজডা অ্যাতদিন কেন হয় না। কিন্তু হয় নাই। ধরেন—বাঁধ কাটা বা বাঁধ তোলা, খালকাটা, খালের জল নিকাশী, প্রাইমারি স্কুল-এইসব কাজে আমরা গবমেন্টের পক্ষে আর ঋণ (সলিসি) বোর্ড, জিলা বোর্ড, মিউনিসিপালিটি, নানারকমের বোর্ড—এইসবে আমরা কোটা চাই—শিডিউল কাস্ট কোটা। কংগ্রেস চায় না আমাগো কোটা। কিন্তু লিগ চায়। ষোল আনার চায়্যা আঠার আনা চায়। সে কোটাভাবে স্যার, গবমেন্ট আমাদের সাপোর্ট করে। আমি তেমন দুইডা কাজ বাইর কইর‍্যা কাজ আরম্ভ কইরতে আসছি স্যার—আগৈলঝরা ইস্কুলরে মডেল ইস্কুল করা আর মাইলারার পশ্চিমে খাল কাইট্যা জল বাইর কইরা চাষের জমি বাইর কইরতে লাগব। কিন্তু এইসব প্রজেক্টে, স্যার, লোক্যাল ইনিসিয়েটিভ প্রমাণ করব্যার লাগে। সেইডার অবস্থা কী তা এডডু বুইঝ্যা যাই।’

দুর্গামোহন সেন মশায় আঙুল তুললেন। সাধারণত কোনো মিটিঙেই তিনি কিছু বলেন না। মিটিঙের বিষয় নিয়ে পরে কাগজে লেখেন। তাঁর কথাবলার সময় জিভের কিছু অসুবিধা ঘটে।

‘এইডা এডডু অদ্ভুত লাগে মণ্ডল। ধরো, জেলা বোর্ডে আগেকার আইনে যখন হাসেম আলি শাহেব মনোনীত হন, তাতে আমাদের কারো আপত্তি থাকলেও কোনো উপায় নাই। ইটস অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাই দি গবর্মেন্ট। কিন্তু অ্যা তো ঐ একই হাশিম শেখ ঐ একই গবমেন্ট নমিনেশনে আইসতেছেন বাট অ্যাজ এ মুসলিম। ইন দ্যাট কেস, হি লুজেস সাসটেনশিয়ালি ফ্রম দি পোটেনশিয়াল পাওয়ার অব হিজ নমিনেশন। তোমরা এই কোটা-সিস্টেমরে আরো বাড়াইতে চাও কেন?’

‘স্যার, এডা তো ন্যায্য কথা। কেডা না বুঝে? কিন্তু পুরানা, আইনেও স্যার গোপন কোটা থাহে। এ-বছর খাঁশাহেব, তো পরের বছর রায়শাহেব। বিধি যদি এমনই হয়, তালি স্যার, মুসলমান প্রধান অঞ্চলে যদি-বা কোনো ভাদ্দর পূর্ণিমায় মুসলমানের কপালে শিকা ছিঁড়লে ও ছিঁড়তে পারে কিন্তু সূর্য-চন্দ্র যদিন তদিনের মইধ্যে কোনো শুদ্দুর বা চাঁড়াল কোনো বোর্ডের মেম্বার হইব্যার পারব না—এই গ্যারান্টি আপনাগর দিচ্ছি।’

দুর্গা সেন চট করে এ-কথার কোনো জবাব দেন না। তাঁর কথা বলার অসুবিধের কথা সকলের জানা।

এতটা সময় যায় যে কারো মনে হতেই পারে যে দুর্গা সেন আর কিছু বলবেন না। তিনি তাঁর আঙুলও তোলেননি জানাতে যে তাঁর কথা শেষ হয়নি। গুমোট কাটাতে বরদাবাবু উকিলই চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করেন, একটু হালকা ভঙ্গিতে—’হাশেমশাহেব কোটা পছন্দ করবেন—ফ্রি-নমিনেশন না কোটা।’

হাশেম শেখ তাঁর চিবুকের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, ‘প্রশ্নডাকে ভবিষ্যৎকালে নিয়্যা দ্যাহেন। নাহলে পার্সপেকটিভ পাবেন না। ধরেন, আমার ইনতেকাল হইছে। গবমেন্টের মনে লয়–না হাসিম শেখই যহন নাই, তহন শ্রীশ চন্দ্র ন্যায়রত্নরে এবার প্রেসিডেন্ট করো। তিনি তো আমার থিক্যা শতগুণ যোগ্য। কিন্তু তাতে তো মুসলমানগো কোনো রিপ্রেজেন্টেশন হইব না। সেদিক দিয়্যা কোটা সিস্টেম ইজ এ গুড সেফ গার্ড।’

তুমি য্যান সোস্যাল ওয়েলফেয়ার নিয়্যা কী একডা কইল্যা?’ দিনু চক্রবর্তী যোগেনকে জিজ্ঞাসা করেন।

‘অ্যাড্‌ডা স্যার উদ্যোগ হইছে, বিশেষ কইরা গ্রামের নমশূদ্র ও মুসলমান প্রধান অঞ্চলে যদি স্থানীয় মানুষজন জমিজমা টাকাপয়সা দ্যায়, তাইলে সরকার ইশকুল কইর‍্যা দিবে। আবার কুনো একডা বাৎসরিক বন্যা ঠেকাইবার বাঁধের জইন্য বা ধরেন বিশেষ কইর‍্যা যশোর-খুলনা-বরিশালে লোনাজলের বিলা জায়গায় বাঁধ-ফাঁদ দিয়্যা কিছু চাষ-আবাদের ব্যবস্থা হয় তাইলে সরকার সাহায্য দিবে। এই কামে এক ডিরেকটরও নিয়োগ করা গিছে।’

‘কোন জাইত থিক্যা বাছা হইল?’

‘মুসলমান।’

‘তাইলে মুসলমানদের, মানে গরিব ভোটারদের ভোট কায়েম করার লাইগ্যাই সমাজকল্যাণ?’

‘তা তো নিশ্চয়ই স্যার। হিন্দু-প্রধান অঞ্চলে তো এই সমস্যা নাই। আপনাগ তো ঘরে-ঘরে গ্র্যাজুয়েট। আমি এই সুযোগডা নিয়্যা এইহানে অন্তত দুইডা-একডা কাজ কইরব্যার চাই। তার লগে আপনাগো আশীর্বাদ তো দরকার। যেমন ধরেন, আগৈলঝরা ইস্কুলটাকে প্রথমে মডেল ইস্কুল ক্লাশ সিক্স পর্যন্ত কইরব্যার চাই। আপনারা যদি দুই-চার কথা বলেন, লেখেন, তাইলে সুবিধা হয়। ভর্তার বিল নিয়্যাও এক কথা।’

‘সবই তো ভাল কাজ যোগেন কিন্তু যাগো ভাল কইরব্যার চাও, তারা নিজেগো ভাল চায় তো? এহানকার জমিদাররা তো মহাশয় মানুষ ছিলেন। তারা কিন্তু কম ইশকুল বানান নাই, কম রাস্তা বাঁধান নাই, কম ডিসপেনশরি খোলেন নাই। কিন্তু যাগো লাইগ্যা এইসব করা, তারা কিন্তু এই কাজগুলা রক্ষা কইরব্যার পারে নাই—’ মেজকর্তা বলে যাচ্ছিলেন।

তাঁর কথার মধ্যে হাশেম শেখ বলে ওঠেন—’ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডেরও তো সেই অবস্থা। নতুন কাজের থিক্যা দরকারি কাম হইছে পুরানা সুবিধাগুলি বাঁচান—টিউবওয়েলের রবার চাক্কি না-ভাঙা, হাটগুদামের চাল থিক্যা টিন খুইল্যা নিয়া না আসা, পিডবলিউডির লাগান রাস্তার কাঁঠালগাছ গুল্যা থিক্যা নাবাতি কাঁঠালগুল্যাক না কাটা, সরকারির ফেরির নৌকা চুরি না-করা।’

হাশেম আলিকে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ পণ্ডিতমশায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, ‘আমারে ক্ষমা দিবেন। এইসব আকামা কথায় কামডা কী। মেজকর্তাও কইলেন, শেখশাহেবও কইলেন—আগে সত্যযুগ বানাও তারপর হনুমানের মত বান্দর পাইবা। যোগেন তো গন্ধমাদন পর্বত আইনব্যার কথা কয় নাই। কইল ছোট ছোট সব কামের কথা। আগৈলঝরার ইশকুলডা উঁচা আর বড় হইলে ক্ষতি না লাভ। আমি তো লাভই দেহি। কাইল দেখা হইব নে আগৈলঝরার মাঠে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *