১০
2 of 4

১০১. ইন্টারভ্যালে গিরিশের সন্দেশ

১০১. ইন্টারভ্যালে গিরিশের সন্দেশ 

ইন্টারভ্যালের আগেই সত্যবতী, মানসী, অজয় এদের কথা বোঝা গেছে। আবার রাণা প্রতাপের নিজের ভাই সগার সিংহ ও তাঁর নাতি অরুণ সিংহ, কল্যাণীর মুসলমান-ধর্মান্তরিত স্বামী, কল্যাণীর পতিধর্ম আর তার বাবার দেশধর্মের বিরোধ—এগুলি গল্পের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। 

ইন্টারভ্যালে ম্যানেজার তাঁর লোকজন সহ কাপ ভর্তি চা, প্লেট ভর্তি সিঙারা, আর-একটা প্লেট ভর্তি সন্দেশ এনে দুজনের সামনে ধরে। হকশাহেব বা যোগেন কেউই খাদ্য প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। হকশাহেব বললেন, ‘এতই যদি ডিশ-পাইড়্যা খাওয়াইবেন, তালি কি আর দশমিনিটের হাফটাইমে চলে? তালি তো হাফটাইমের টাইম বাড়াইতে হয়,’ বলতে-বলতেই হকশাহেব দুটো সন্দেশ একসঙ্গে মুখে পুরেছেন। অনায়াস দক্ষতায় সবচেয়ে কম সময়ে সে দুটোকে গিলে হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘এডা কি গিরিশের সন্দেশ।’

ম্যানেজার হাত জোড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার, আপনারা খান স্যার। আপনাদের খাওয়া শেষ না হলে ইন্টারভ্যাল শেষ হওয়ার বেল বাজবে না।’ 

ততক্ষণে হকশাহেব যোগেনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, ‘মণ্ডল, এই—যে গিরিশ, আমি আর একডাও খাব না। তুমি অপরাধীর কইর‍্যা ফেলছিলা। তুমি বেবাক খাও। আমি সিঙারা খাই।’ হকশাহেব একটা সিঙারা তুলে নিলেন। এক কামড়ে সিঙারার অর্ধেকটা মুখের ভিতরে নিয়ে হকশাহেব জড়িয়ে বলেন, ‘বাঃ গরম তো, মণ্ডল, তুমি সিঙারা খাইয়ো না। তালি সন্দেশের টেস্ট নষ্ট হইয়া যাবে। জলও খাইব্যা না। চাও খাইব্যা না। মুখের আইঠ্যা ধুব্যা না। যতক্ষণ সেই স্বাদ মুখে লাইগ্যা থাকে, ততক্ষণই স্বর্গবাস। খাও, খাও।’ 

যোগেন অতিথির মত ধীরে-ধীরে খাচ্ছিল। আবার, তার খাওয়ার মধ্যে যাচাইয়ের ভাবও ছিল। সত্যি এ সন্দেশ সে আগে খায় নি। প্লেটটা তো চায়ের প্লেট, তাই সন্দেশ যেন অনেক মনে হয়েছিল। এখন তো মাত্র ছটা পড়ে আছে। 

যোগেন তার খাওয়ার গতি তো বাড়ায়ই না, উল্টে, চোখ বুজে সন্দেশগুলো অর্ধেক করে-করে যত্ন করে মুখে দিতে লাগল, বাঁ হাতটা আলগা করে ধরে, যাতে সন্দেশের গুঁড়ো পড়ে না যায়। আর তার আস্বাদনের গভীরতা, তার ঠোটে একটা রেখা হয়ে ওঠে, তৃপ্তির রেখা। 

হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘মণ্ডল, আইজ তুমি একডা ডার্বির টিকিট কিনলে পারতা। লাইগ্যা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল ছিল। একই দিনে শিশির ভাদুড়ী ও গিরিশ-আস্বাদন তো ভাগ্য ছাড়া হয় না।’ 

দর্শকদের অনেকেই আন্দাজমত হলে ফিরে আসছিল। কেউ-কেউ নিজের আসনে বসে পড়ছিল। কেউ-কেউ আবার বেরিয়ে যাচ্ছিল, ইন্টারভেল শেষ হয়নি দেখে। দুটো-একটা এমন কথাও শোনা গেল, বেশ উঁচু গলায়, ‘সিন তুলতে ভুলে গেচে রে’। বা, ‘হাফটাইমেই যবনিকাপতন করে দিলে, দেকো হিশেব কষে, লাভ বেড়ে যায় দ্বিগুণ।’

‘লাভের গুড় যেন কে খায়—যুদ্ধ-যুদ্ধ করে লেকচার শুনিয়ে হাফটাইমে ড্রপ ফেললে, যুদ্ধ দেকাবে কখন? কালই তো রাইভ্যাল কোম্পানি রটিয়ে দেবে—এ থেটারে যাস নে, পতন আচে—যবনিকাপতন—মেবার নেই। মানে, যুদ্ধ নেই। এ-বড় কঠিন কমপিটিশনের বাজার।’ 

এমন একটা সমাবেশে যোগেন তার সামনে ম্যানেজারের লোকের ধরে থাকা প্লেট থেকে আধখানা করে সন্দেশ মুখে পুরে চিবুচ্ছে। ম্যানেজার বাবুর আরো একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল জল আর চায়ের ট্রে ধরে। হলে নানা ধরণের এই কথাগুলোতে অস্বস্তি পেয়ে সে বলে, ‘ও-সব কথায় কান দেবেন না স্যার। থিয়েটার তো একটা সংসার। সব দিন কি আর এক রকম চলে। এ কি রেলের স্টেশন যে গার্ড শাহের হুইসল দিলেই ট্রেন ছাড়বে? পর্দা একবার ফেললে আবার তোলার আগে সব ব্যবস্থা কমপ্লিট করতে হবে না?’ 

হঠাৎ ম্যানেজারবাবু এসে পড়ে হাতজোড় করে বলে—’স্যার, তা হলে অনুমতি দিন। ড্রপ তুলি?’ 

শেষ আধটুকু মুখে নিয়ে যোগেন বলে দেয়, ‘হুঁ-হুঁ।’ 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *