সাহিত্য রূপপ্রতীক

সাহিত্য রূপপ্রতীক

কিছুকাল আগে মুসলমান লিখিয়েদের বে-ইসলামি রূপপ্রতীক ব্যবহারের অনৌচিত্য সম্বন্ধে লেখা একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। ওটি পড়ে আমাদের মনে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন জেগেছে :

প্রথমত, আমাদের ধারণায় ইসলাম হচ্ছে একটি ভাব বা আদর্শ কিংবা জীবন-বিধান বা জীবন-সংস্থা, যার সাধারণ নাম ধর্ম। কাজেই বিশ্বাস ও আচরণের ব্যাপারেই কেবল ইসলামি কিংবা বে-ইসলামি শব্দ বা সংজ্ঞার প্রয়োগ চলতে পারে। অন্যত্র ইসলাম শব্দের ব্যবহার অপপ্রয়োগ বই কিছুই নয়। নারঙ্গী কিংবা খোরমা বললে ইসলামি হবে, আর কমলা বা খেজুর বললে বুতপরস্তী হবে–এমন হাস্যকর যুক্তি শিক্ষিত মনে কী করে জাগে, ভেবে পাইনে।

দ্বিতীয়ত, ইসলাম পৃথিবীময় পরিব্যাপ্ত হয়েছে। তাই বলে মুসলমানের দেশ বা ব্যবহৃত সামগ্রীর সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক কী? আরবি মুসলমান গেঁও খায়, বাঙালি মুসলমান খায় ভাত। তাই বলে কী গেঁও আর ভাত ইসলামি হল? আরবের কোরআন আর রসুলই কেবল মুসলমানমাত্রেরই সাধারণ ঐতিহ্য, আর সে-সূত্রে এবাদতের ভাষা আরবিও। এ ছাড়া আরবের সঙ্গে মুসলমানদের অন্য কোনো সম্বন্ধ থাকার তো কথা নয়।

তৃতীয়ত, আরবেরা কোরআন গ্রহণ করল আর রসুলকে বরণ করল বটে কিন্তু তারা স্বদেশের ও স্বজাতির কুফরী ঐতিহ্যের গর্ব ছাড়েনি। ইরানেও দেখি তাই। য়ুরোপের খ্রীস্টানরাও গ্রীস রোমের pagan ঐতিহ্য ভোলেনি। আমরা যে ইসলাম ও ইসলামের উদ্ভব-ভূমির দোহাই দিয়ে স্বাদেশিক ও স্বাজাতিক ঐতিহ্য ভুলে আরবের বিয়াবান ও বসোরাই গোলাবের দিকে তাকিয়ে থাকবার নসিহত জারি করতে চাই–এরূপ চিন্তা দুনিয়ার কোনো জাগ্রত জাতি করে কী?

চতুর্থত, ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক কিংবা জাতিক জীবনে উঠতির ও পড়তির কতগুলো সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। উঠতির লক্ষণ প্রাণময়তা, আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মপ্রসারের অবিরাম প্রয়াস। পুরোনোর পুচ্ছগ্রাহিতা নয়; নতুনের উদ্ভাবনে ও উদঘাটনে, ক্ষয়-ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে চিন্তার ও কর্মের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ও বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার নির্ভীক উদ্যমেই এর প্রকাশ ও বিকাশ। আর পড়তির লক্ষণ হচ্ছে পুচ্ছগ্রাহিতা, যোগ্যজ্ঞাতি প্রীতি, কুটুমের গৌরব বশ্যতা, আত্মবিস্মৃতি, দেহে-মনে পরপোষ্যতা, অতীতমুখিতা, নিষ্প্রাণতা, আর চিন্তায় ও কর্মে উদ্যমহীনতা।

দুটো দৃষ্টান্ত নিলেই আমাদের বক্তব্য পষ্ট হবে। ইহুদির জাত আছে, ধর্ম আছে, ছিল না কেবল দেশ; তাই বলে তারা আত্মবিস্মৃত ছিল না। এ কারণেই জনসংখ্যায় নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও আজকের য়ুরোপীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিতে তাদের দান গুরুত্বে বিশিষ্ট। আর পাক-ভারতে প্রায় আড়াইশ বছর আগে দেশী ও ইঙ্গ-ভারতীয় খ্রীস্টান সমাজ গড়ে উঠলেও আত্মসচেতনতার অভাবে তাদের অস্তিত্বের ছাপ জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই ফুটে ওঠেনি। তারা শাসকজাতির জ্ঞাতিত্বের গর্বে, স্বধর্মীর স্বদেশ য়ুরোপ-মুখিতায় এবং য়ুরোপীয় সংস্কৃতিতে স্বকীয়তার স্বপ্নে নির্বোধ আত্মপ্রসাদ লাভ করে যে-আত্মপ্রবঞ্চনা করেছে, তাতে তাদের আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীন তথা সাধনাহীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে কেবলই Snobbery প্রকট হয়ে উঠেছিল জাতি বা সম্প্রদায় হিসেবে সুস্থ। হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠ হতে পায়নি। শিক্ষায়-সাহিত্যে-দর্শনে-বিজ্ঞানে কিংবা চারিত্রিক মহত্ত্ব-মাহাত্ম্যে তাদের কেউ গণ্য হয়ে ওঠেনি। স্বাধীন পাক-ভারতে তাদের মোহ-মুক্তির অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠছে, এখন হয়তো তাদের সত্যকার জীবন-সাধন শুরু হবে।

হাজার বছর ধরে উচ্চবিত্তের বাঙালি মুসলমান এরূপ বহির্মুখী মনের পরিচয় দিয়েছে। তাই বিগত হাজার বছরে বাঙালি মুসলিম উচ্চবিত্তের দ্বারা আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে শ্লাঘ্য, কোনো কীর্তি গড়ে ওঠেনি। নিম্নবিত্তের অজ্ঞ অশিক্ষিত লোকের মাটির মায়া ছিল, কিন্তু অজ্ঞতা-অশিক্ষার দরুণ তাদের স্বকীয় আদর্শ ও লক্ষ্য চেতনা ছিল না, তাই তারাও পর-প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বস্থ হতে পারেনি। আর তাই তারা গড়ে তুলেছিল লৌকিক ইসলাম–যার কল্পছায়ায় তারা জগৎ ও জীবনের মনোময় ব্যাখ্যা খুঁজেছে এবং পেয়েছে। তাদের ভক্তিবাদ, বৈরাগ্য ধর্ম ও মানবতাবোধ এক : অভিনব মরমীয়া তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে, যাতে দেহাত্মবাদ, মুরশিদ পন্থ, অলখ সই (অলক্ষ্য স্বামী) জীবন- জিজ্ঞাসার নিবৃত্তি ও জৈবধর্মের বিকৃতি ঘটিয়েছে। তবু এ কারুর কাছে গর্বের, আবার কারুর কাছে লজ্জাকর।

যারা বসুধৈব কুটুম্বকম-পন্থী তাদের কাছে মানুষের প্রাকৃত-মানসের এই সহজ ও অকৃত্রিম প্রকাশ গর্বের ও আনন্দের সামগ্রী। আর যারা স্বধর্মনিষ্ঠ আদর্শবাদী তাদের কাছে এ স্বধর্মভ্রষ্টতা– আদর্শচ্যুতি লজ্জার ও ক্ষোভের বিষয়। এ প্রাকৃতজনেরা জীবন-ভাবনার প্রয়োজনে উচ্চারণ করেছে। মানবতা ও মানব মহিমার চরম বাণী : নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ :

জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম একই মায়ের পুত।
আর–  লামে আলিফ লুকায় যেমন
মানুষে সাঁই আছে তেমন
তা-না হলে কী সব নূর-ই-তন
আদম তনকে সেজদা জানায়!
কিংবা, আহাদ আহমদ মাঝে
কেবল মিমে ফরক রয়।

আবার এরাই বাঁচবার গরজে করেছে নানা উপদেবতা ও অপদেবতার পূজা।

অতএব যারা ইসলাম-অনুগ জীবন, আদর্শ ও সংস্কৃতির পক্ষপাতী, তারা বিগত হাজার বছরের বাঙলার ইতিহাসে নিছক ইসলামি সংস্কৃতির কোনো নিদর্শন পাবে না। অবশ্য সুফীতত্ত্ব প্রভাবিত এই সংস্কৃতিকে দেশী মুসলিম সংস্কৃতি বলে স্বীকৃতি দিয়ে সহজেই গৌরব করা যায়।

সংস্কৃতি মাত্রেই স্বস্থ জীবনবোধের প্রকাশ এবং প্রাণময়তার অভিব্যক্তি। আর চিন্তায় ও কর্মে সুন্দরের সাধারণ নাম সংস্কৃতি। এর চর্চা এবং স্বরূপে এর প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের নাম সাংস্কৃতিক চর্চা। কাজেই তা বহু বিচিত্র ও নতুন হয়েই ফুটে ওঠে। নিতান্ত আদর্শানুগত্য কোনো সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে না, এমনকি সুষ্ঠু লালনেও অক্ষম। এইজন্যেই সাধারণত আমরা ইসলামি সংস্কৃতি বলতে যা বুঝি ও বুঝাই তাও আরব-ইরান-তুরানের দেশজ ও গোত্রজ সংস্কৃতির পাঁচমিশেলী রূপ মাত্র। তাই এর পরিচায়ক নাম হওয়া উচিত মুসলিম সংস্কৃতি এবং যেহেতু এ সংস্কৃতির উদ্ভব মুসলিম মানসে এবং এর প্রতিফলন হয়েছে মুসলমানেরই আচরণে ও কর্মে, সেজন্যে রূপকল্পে ও ভাবরসে তা ইসলামি জীবনবোধের দ্বারা প্রভাবিত। তাই বলে একে ইসলামি বলার যৌক্তিকতা নেই।

আগেও বলেছি, আবার বলছি; ধর্ম এক জিনিস, আর স্বাদেশিকতা, স্বাভাবিকতা ও স্বাজাতিকতা অন্য বস্তু। মানুষ চিরকাল বিদেশের ও বিজাতির ধর্ম গ্রহণ করেছে, কিন্তু স্বদেশ, স্বভাষা ও স্বাজাত্য ছাড়েনি। তাই পৃথিবীর তিনটে বহুল প্রচারিত ধর্মের ভাষা হিব্রু, পালি এবং আরবি–মসজিদ, মন্দির ও গীর্জার প্রাচীর ডিঙিয়ে বিদেশে কারো মুখের বুলি হতে পারেনি। হৃদয়বৃত্তির প্রাবল্য-বশে ধর্মের উদ্ভবভূমি, ধর্মীয় ভাষা এবং ধর্মপ্রবর্তকের গোত্র শ্রদ্ধেয় হতে পারে, তাই বলে নির্বিকার ও নির্বিচার আত্মসমর্পণ তথা আত্মবিলয় দাবী করতে পারে না। প্রত্যেক মানুষের যেমন ব্যক্তিক দাবী আর পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে, অর্থাৎ ব্যক্তি যেভাবে। নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও পরিবারের ও সমাজের সদস্য, তেমনি মানুষ বা জাতিবিশেষ তার স্বাদেশিকতা এবং স্বাভাষিক আর স্বাজাতিক স্বার্থ ও স্বাতন্ত্র্য অটুট রেখেই ধার্মিক ভ্রাতৃত্বে আস্থাবান থাকবে ও এর অনুসারী হবে; আমরা যেমন একাধারে নিজের কাজও করি, দেশের কথাও ভাবি এ দুটোতে কোনো অসঙ্গতি বা বিরোধ নেই। ইসলামি ভ্রাতৃত্বের রূপ কার্যত এভাবেই ফুটে উঠেছে–মুসলিম জগতের ইতিহাস সর্বত্র এ সাক্ষ্যই বহন করছে। Pan Islamism বা বিশ্বমুসলিম ঐক্যবাদের যদি কোনো সদর্থ ও ব্যঞ্জনা থাকে, তবে তা এখানেই এবং এরূপই। . এজন্যেই দেখতে পাই বুতপরস্ত আরব ইসলাম বরণ করল, আগুন-পূজক ইরানি ইসলামে দীক্ষা। নিল; কিন্তু স্বদেশের ও স্বজাতির কুফরী ঐতিহ্য ত্যাগ করেনি, কিংবা স্বাদেশিকতা, স্বাভাবিকতা ও স্বাজাতিকতা ভোলেনি, অথবা আত্মস্বাতন্ত্র্য বিলোপ করে বিশ্বমানবতায় বা আন্তর্জাতিকতায় লীন হয়ে যায়নি। আত্মরতিতে নয়, আত্মপ্রেমেই অবশ্য বিশ্বপ্রেমের বীজ নিহিত থাকে। তাই দেখতে পাই, আদর্শ মুসলিম সুলতান মাহমুদ গজনবী মোমেন কবি ফিরদোসীকে দিয়ে লেখালেন শাহ্নামা যাতে রয়েছে অমুসলিম ইরানি বাদশাহ্ ও বীরের কাহিনী। কাজেই ইসলামানুগ আত্মজীবন চর্যার মাধ্যমেই বিশ্বমানব পরিচর্যার পাঠ গ্রহণ করতে হবে।

কোনো ভাষাতেই ধর্মীয় রূপ থাকতে পারে না, থাকে ধার্মিকভাব। মোমেন স্বেচ্ছায় যে কথা বলবে, যা ভাববে বা করবে, তাতে–এক কথায় তার চলনে-বলনে-করণে ইসলামি ভাব বা আদর্শ থাকবেই। সে যেখানেই থাকুক, যে-ভাষায়ই বলুক আর যে হাতিয়ারেই করুক। এ বিষয়ে তর্কের অবকাশ নেই। কাজেই মাতৃভাষার সঙ্গে ধর্মের ভাষা মিশালেই ভাষা ও সাহিত্যের ধর্মীয় রূপ মেলে না। কে না বোঝে যে আরবি ভাষায়ও আল্লাহর নিন্দা করা যায়, আবার সংস্কৃত ভাষায়ও আল্লাহ্র বন্দনা সম্ভব।

 আমাদের দুর্ভাগ্য, একটা অহেতুক মোহবশে আমরা যুক্তি ও বিবেচনা পরিহার করে একপ্রকার আদর্শ-মরীচিৎকার পিছু ধাওয়া করছি। তার ফলে আমরা আমাদের স্থানিক, কালিক ও ব্যক্তিক গরজ ও উপযোগ ভুলে অর্থাৎ বাস্তব জীবনের পরিবেশ ও প্রয়োজন বিস্মৃত হয়ে মনোময় স্বপ্নলোক সৃষ্টির হাওয়াই আদর্শের রূপায়ণে উধ্বমুখে ছুটে চলেছি। এই আকাশচারিতা যে আমাদের শক্তি-সামর্থ্যের কেবল অপচয়ই ঘটাতে পারে, জীবনে কোনো সাফল্য কিংবা স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে না, তা আমরা ভাবতেও চাই না। সত্যকে অস্বীকার করা যে দায়িত্বকে এড়িয়ে যাওয়া তথা জীবনকেই ফাঁকি দেওয়া–এ বোধ আমাদের যতদিন সহজভাবে না জাগবে ততদিন আমাদের মন-মানসের মুক্তি নেই। ফলে এগিয়ে চলার পথ নির্ণয়ের সমস্যাও থেকে যাবে। অতএব রুদ্ধ থাকবে অগ্রগতিও।

 আমাদের কাছে যুক্তি-বুদ্ধি কীভাবে অবহেলিত এবং মোহাবেগ কত বেশি প্রবল তার একটি দৃষ্টান্ত দিলেই হবে।

উপমাদি অলঙ্কার তথা রূপ-প্রতীক ব্যবহৃত হয় বক্তব্যকে পষ্ট, সুষ্ঠু ও ঋদ্ধ করবার জন্যেই শিল্প-সৌন্দর্যও ফুটে ওঠে এভাবেই, কেননা পরিচিত বস্তু বা ভাবের ব্যঞ্জনা ও ঐশ্বর্য বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে অসামান্য করে তোলে। মাতৃভাষার শব্দ ও স্বদেশের বস্তুই বক্তার বা শ্রোতার মানসলোকে এ গুণ নিয়ে বিরাজ করে। অপরিচিত বিদেশী শব্দ, ভাব বা বস্তু তার ব্যঞ্জনা ও লাবণ্য নিয়ে ভিন্নদেশীর কানে-মনে সহজে এবং স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করতে পারে না। সত্যি কিনা জানিনে, শুনতে পাই কেবল বিদগ্ধ জনের পক্ষেই বিজাতীয় ভাষার রস-রূপ আয়ত্ত করা সম্ভব। 

এ যদি সত্যি হয়; সাধারণের জন্যে রচিত সাহিত্য আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দ বা বস্তুনাম বসালে তার ধ্বনি-সৌন্দর্য ও অর্থব্যঞ্জনা বৃদ্ধি পাবার কথা নয়। কেননা, ওগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অভাব রয়েছে এবং তাই কল্পনার দৃষ্টিও অতদূর না- পৌঁছাই স্বাভাবিক। তেমন অবস্থায় বিয়াবান, কাফেলা, মঞ্জিল, নারঙ্গী, খোর্মা, শব্ব-ই-গুল, কোহ্ কিংবা ইংরেজি বা গ্রীক পৌরাণিক শব্দ প্রভৃতি রচনা-গৌরব বৃদ্ধি করার কথা নয়। আর একটি কথা আগেই বলেছি, আরব-ইরানিরা তাদের কাফের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য-রিথ অবহেলা করেনি, পরম শ্রদ্ধায় বরণ করে নিয়েছে। আমরা কিন্তু আমাদের অমুসলমান পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ভুলবার সাধনা করেছি, আর অবজ্ঞা করেছি আমাদের স্বকীয় ও স্বাদেশিক সম্পদকে।

আমাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-প্রীতি যা-ই হোক না কেন, তা থাকবে (এবং থাকা বাঞ্ছনীয়ও) মুসলিম আরব ও ইরানির প্রতি। তাদের কাফের পূর্বপুরুষের জন্যে আমাদের কোনো শ্রদ্ধা-সমীহের ভাব থাকার কথা নয়, থাকা উচিতও নয়, অথচ এ ব্যাপারে আমাদের মনোভাব অদ্ভুত ও আত্মদ্বেষী। পাক-ভারতের দশ কোটি মুসলমানের কিছুসংখ্যক লোক আরব-ইরানি-তুরানির বংশধর হলেও নিশ্চয়ই আর সব মুসলমান দেশজ, তাহলে দাতার উপমা দিতে হলে বিদেশী বিজাতি কাফের হাতেমতাইর চেয়ে দেশী এবং সম্ভবত জ্ঞাতি কর্ণের উপমা মনে জাগাই স্বাভাবিক ও শোভন। তেমনি কাফের কবি ইমরুল কায়েসের চেয়ে কালিদাসের দাবী কম নয়।

নওসেরওয়া, জানান, শাহরিয়ার হলেন বিদেশী অমুসলমান, আর বিক্রমাদিত্য-ভোজরাজা আমাদের প্রতিবেশী এবং নানা সূত্রে চেনা লোক। বিদেশী কাফের শাহনূরীমান, রোস্তম-সোহরাব আমাদের আপন হলে আমাদের পাশের বাড়ির ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কিংবা ভীমার্জুনকে পর ভাবা কষ্টসাধ্য। এ কতবড় আত্মলাঞ্ছনা ও আত্মপ্রবঞ্চনা, আমরা ভেবে দেখছি কী? আমাদের রূপপ্রতাঁকে যদি বাছবিচার করতেই হয়, তাহলে আমাদের নীতি হবে–আমরা দেশী-বিদেশী মুসলিম ঐতিহ্য ও আদর্শপ্রসূ রূপপ্রতীকই কেবল গ্রহণ করব। দেশী বিদেশী কোনো মুসলমানেরই জ্ঞাতি অমুসলিমের কিছু গ্রহণ করব না। আর যদি সাহিত্য-শিল্পের উৎকর্ষের জন্যে নির্বিচারে রূপপ্রতীক ব্যবহার করতে চাই, তা হলে দেশীগুলোকেও হেলা করব না, কোনো বিরূপতা দেখাব না।

বিদেশী ভাব, বস্তু, শব্দ ও রূপপ্রতীক গ্রহণ ও বরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে তখনি, যখন জাতির ভাষা ও ভাবে তার অভাব থাকে অর্থাৎ নতুন বস্তুর নাম ও ভাবের বাহন হিসেবেই শুধু এক ভাষায় অপর ভাষার শব্দ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যেমন এ যুগে বিভিন্ন নতুন বস্তু পরিচায়ক ও ভাব। প্রকাশক ইংরেজি শব্দ এসেছে আমাদের ভাষায়। এ না হলে ঋণ গ্রহণ নিরর্থক ও অসার্থক।

আমরা এভাবে আড়াই থেকে তিন হাজার আরবি-ইরানি ও তুর্কী শব্দ আগেও গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি, প্রয়োজনমতো চিরকালই করব এবং তা শুধু এসব ভাষা থেকেই নয়, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে-কোনো ভাষা থেকেই করব। কেননা, তাতে আমাদের ভাষা ও সাহিত্য এবং মন-মানস সমৃদ্ধই হবে। কিন্তু অহেতুক মোহবশে করলেই কেবল আপত্তি উঠবে এবং সে-আপত্তি নিশ্চয়ই কল্যাণ-বুদ্ধিপ্রসূত হবে। বিশেষত, এখন আন্তর্জাতিকতার যুগ; চিত্ত প্রসারের এবং জীবনকে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেবার যুগ। অতএব যেখানে যা-কিছু ভালো, যা-কিছু সুন্দর ও কল্যাণকর, তা-ই কুড়িয়ে নেব, সাদরে গ্রহণ করব, আর আগ্রহে বরণ করব। আমাদের ধর্ম-ভাই আরব-ইরানির অবদান গ্রহণ করতে কোনো কুণ্ঠা থাকার কথা নয়। কিন্তু সংকীর্ণ চিত্তের মোহ ও বিকৃতিবশে জগতের উদার বিস্তারের আলো-হাওয়া থেকে নিজেদের গা-বাঁচিয়ে আদিম গোত্র ও কোটারি প্রীতির বশে পুরোনোকে ও বিশেষকে আঁকড়ে ধরার মনোভাবেই আমাদের আপত্তি। তা জীবন বিমুখিতার লক্ষণ তথা প্রগতির পরিপন্থী।