বরকধঝ-কচতটপ রহস্য – ৩

০৩.

 হরিপদবাবুর দোতলা বাড়িটা ঘিঞ্জি গলির শেষ দিকটায় একটা পুকুরের ধারে একাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা দেখে বোঝা যায়, টায়ে-টোয়ে খরচা করে কোনক্রমে তৈরি করা হয়েছিল। পুকুরের ওপারে কলোনি এলাকা। ঘন গাছপালার ভেতর ছোট আকারের ঘরবাড়ি।

দোতলার জানালা থেকে আমাদের গাড়ি দাঁড় করানো দেখে থাকবেন হরিপদবাবু। আমরা নামার সঙ্গে সঙ্গে উনিও এসে গেলেন। কর্নেল নমস্কার করলেন। উনিও নমস্কার করে নার্ভাস মুখে বললেন–আপনারা কি সি আই ডি থেকে আসছেন স্যার?

কর্নেল অম্লানবদনে বললেন–হ্যাঁ। আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।

বেশ তো। আসুন। ওপরে আসুন।

না, হরিপদবাবু! এখানে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করে চলে যাব।

 বলুন স্যার!

–আপনি কি বাংলায় আগস্ট বিপ্লব নামে কোনও বই পড়েছেন?

 হরিপদবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন—না তো। কেন স্যার?

–আপনার ভাড়াটে পরিতোষবাবুর ঘরে বইটা কখনও দেখেছেন?

পরিতোষদার ঘরে আমি বিশেষ ঢুকিনি। উনি বদরাগী টাইপ লোক ছিলেন। পাড়ায় বাস্তুহারা সমিতি ছিল তখন। সে অনেক বছর আগের কথা স্যার। সমিতির লোকেরা আমাকে এসে ধরলেন। তাদের কথায় ভাড়া দিয়েছিলাম।

আর একটা কথা হরিপদবাবু! আপনার তো টেলিফোন আছে?

–আছে স্যার।

–টেলিফোনে পরিতোষবাবুকে কেউ ডেকে দিতে বলত?

 হ্যাঁ, স্যার! মাঝে মাঝে টেলিফোন আসত। বাড়িতে যে-যখন থাকত, ওঁকে ডেকে দিত। ওঁর সঙ্গে আমার এবং আমার ফ্যামিলির গুড রিলেশন ছিল।

–গতকাল বা তার আগের দিন কেউ ওকে ফোন করেছিল?

 হরিপদবাবু মাথা নাড়লেন।-হ্যাঁ, হ্যাঁ। গতকাল সকালেই তো। আমি মিসূহ্যাপটার কথা জানিয়ে দিলাম।

–ট্রাংককল কি?

–অ্যাঁ? হ্যাঁ! ট্রাংককল। তাই জিজ্ঞেস করলাম কোথা থেকে বলছেন? কী একটা জায়গার নাম বলল, বোঝা গেল না। তো স্যার আমি বললাম, পরিতোষবাবুর খবর খারাপ। মাডারড়।

কুমারচক থেকে ট্রাংককল?

 হরিপদবাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন–হতেও পারে। বুঝতে পারিনি স্যার। আসলে তখন মনের অবস্থা বুঝতেই পারছেন।

–আর একটা প্রশ্ন। আপনি, যখন পরিতোষবাবুর মাডারের খবর পান, তখন ওঁর ঘরের দরজা খোলা ছিল, লক্ষ্য করেছিলেন কি?

–হ্যাঁ। খোলা ছিল। আসলে আমি অনিদ্রার রুগী স্যার। বেলা অব্দি ঘুমোই। নীচে ডাকাডাকি শুনে ঘুম ভেঙে গেল। তারপর আমার ছেলে বাণীব্রত বলল, সাংঘাতিক ব্যাপার। পরিতোষজেঠু মাডার হয়েছেন। বডি পড়ে আছে রেললাইনের কাছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। রাত তিনটে নাগাদ নীচের ঘরে সাড়াশব্দ পেয়েছি। ভেবেছিলাম, পাগলাকে তাড়া করে পরিতোষদা ফিরে এলেন।

নীচের ঘরে শব্দ শুনেছিলেন? কী শব্দ?

দরজা বন্ধ হওয়ার। আরও কী সব শব্দ য়েন।

–অথচ পরে দেখলেন দরজা খোলা?

হ্যাঁ, স্যার!

–পুলিশকে জানিয়েছেন এসব কথা?

পরিতোষবাবু বিব্রতভাবে বললেন–সব কথা গুছিয়ে বলার মতো অবস্থা ছিল না। ওনারাও জিজ্ঞেস করেননি। ওই দেখুন, ঘরে সিলকরা তালা এঁটে দিয়েছে পুলিশ।

থ্যাংকস। চলি…।

 দু-একজন করে কৌতূহলীদের ভিড় জমছিল। কর্নেল গাড়িতে উঠেই বললেন কুইক জয়ন্ত। বলা যায় না, ভিড় থেকে হয়তো শ্লোগান উঠবে এক্ষুনি জবাব চাই জবাব দাও!

কর্নেল হাসছিলেন। ঘিঞ্জি গলিতে সাইকেল রিকশার ভিড়। বড় রাস্তায় পৌঁছে বললাম–অমরেশবাবুকে খুন করে এসে খুনী হয়তো একইভাবে ওঁর ঘরে ঢুকেছিল। নন্দিনী সাড়াশব্দ পায়নি। কারণ সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরিতোষবাবুর ঘরে খুনী এসে ঢুকেছিল। ওপরতলা থেকে হরিপদবাবু সেটা টের পান। কিন্তু উনি ভেবেছিলেন, পরিতোষবাবু ফিরে এলেন। ঠিক বলছি বস্?

হুঁ। 

কী খুঁজতে এসেছিল খুনী? গুপ্তধনের সূত্র?

 কর্নেল আমার প্রশ্নের জবাবে শুধু হাসলেন। গোলপার্কে পৌঁছনোর পর বললেন–আমার সঙ্গে লাঞ্চ খেয়ে তোমাকে বেরুতে হবে। অফিসে ফোন করে জানিয়ে দেবে, ক্যাজুয়াল লিভ নিচ্ছ। তিনটে নাগাদ শেয়ালদায় আপ কৃষ্ণনগর লোকাল ধরব। কৃষ্ণনগর থেকে বাসেই যাব। বাসে ঘণ্টাখানেকের জার্নি। আসলে আমরা ঘুরপথে যেতে চাই। সোজা ট্রেনে গেলে স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্ব। কিন্তু রিস্ক না নেওয়াই ভাল।

কুমারচক যাবেন নাকি?

–আমি যাব অর্কিডের খোঁজে। তুমি যাবে তোমার কাগজের পক্ষ থেকে। উন্মাদ আশ্রম সম্পর্কে রিপোর্টাজ লিখবে। মিনিস্টার যখন পৃষ্ঠপোষক, তখন কাগজের ইন্টারেস্ট থাকতেই পারে। মিনিস্টারেরও পাবলিসিটি হবে। পরবর্তী ভোটে কাজে লাগবে সেটা। পয়েন্টটা বুঝলে তো?

বুঝলাম। কিন্তু পাগলাগারদ ব্যাপারটা বড্ড অস্বস্তিকর।

 উন্মাদ আশ্রম ডার্লিং!

–একই কথা। বরং হালদারমশাইকে সঙ্গে নিয়ে যান না কেন?

–হালদারমশাই সকালের ট্রেনে আবার গেছেন। তবে এবার গিয়ে সম্ভবত ছদ্মবেশ ধরেছেন।

–কী সর্বনাশ! আবার কী বিভ্রাট বাধাবেন তা হলে।

 কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন–তুমি তো জানো, উনি ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ। বলা যায় না, হয়তো পাগল সেজে আশ্রমে ভর্তি হয়েই গেছেন এতক্ষণে…।

ইলিয়ট রোডে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে নন্দিনীকে দেখে অবাক হলাম। সে কর্নেলকে বলল–তারাজেঠুদের টেলিফোন হঠাৎ ডেড হয়ে গেছে। তাই চলে এলাম।

কর্নেল বললেন-কতক্ষণ এসেছ?

মিনিট দশেক আগে। নন্দিনী চাপাস্বরে বলল–মা বলল, কাউকে না জানিয়ে চুপচাপ আসতে। তাই একা এলাম। আমাকে এখনই ফিরতে হবে।

কর্নেল ভুরু কুঁচকে তাকালেন–কিছু কি ঘটেছে?

নন্দিনী তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ভাজ করা নীল ইনল্যান্ড লেটার বের করে কর্নেলকে দিল।–আজ বাবার টেবিলের ড্রয়ার গোছাতে গিয়ে এই চিঠিটা পেয়েছি। চিঠিটা দেখুন, মায়ের নামে এসেছিল। বাবা মাকে না দিয়ে কেন লুকিয়ে রেখেছিল বুঝতে পারছি না। মাকে আপনার কথা বলেছিলাম। মা এখন অনেকটা সুস্থ। আপনাকে জানাতে বলল।

কর্নেল চিঠিটা পড়ছিলেন। পড়ার পর আতসকাঁচে ডাকঘরের ছাপ পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন–গত ২৫ মে লোকাল পোস্ট অফিসে এসে পৌঁছেছিল। তো তোমার মা চিঠিটা পড়ে কী বললেন?

নন্দিনী বলল–মা বরাবর একটু হিস্টেরিক টাইপ। প্রথমে ভেবেছিলাম চিঠিটা দেখাব না। কিন্তু পরে ভাবলাম দেখানো উচিত। দেখালাম। বলল, বুঝতে পারছি না। তোর তারাজেঠুকে ডাক। তখন আপনার কথা বললাম।

কর্নেল চিঠিটা আমাকে দিলেন। কারণ আমি উসখুস করছিলাম চিঠিটা দেখার জন্য। চিঠিতে শুধু লেখা আছে :

আপনার স্বামীকে বলে ব্যর্থ হয়েছি। এবার আপনাকে বলছি। যদি বিধবা না হতে চান, তাকে বলুন অবিলম্বে দেখা করুক। এই শেষ চিঠি।
ইতি
বরকধঝ-কচটপ

 কর্নেলকে ফেরত দিয়ে বললাম–লাহিড়ি সায়েবকে জানিয়ে দিন। থার্ড ডিগ্রিতে চড়ালে পাগলামি ঘুচে যাবে। হাতের লেখা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পাগলের কীর্তি! কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং!

কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন–চিঠিটা বাগবাজার পোস্ট অফিসে ডাকে দেওয়া হয়েছিল। নকুল মিস্ত্রি লেনের কাছাকাছি।

তা হলেই বুঝুন!

নন্দিনী ছোট্ট শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল–আমি চলি। পুলিশ এলে কি, চিঠির কথা বলব?

না চেপে যাও। আমি দেখছি। তবে আজ আড়াইটের পর আমি বাইরে যাব। যদি কিছু জানাবার মতো ঘটে, এই নাম্বারে ফোন করে জানাবে। আমার নাম করবে। তোমার তারাজেঠুর ফোন খারাপ বললে। অন্য কোথাও ফোন পাবে না?

–মোড়ে ওষুধের দোকানে পেয়ে যাব।

 কর্নেল একটা চিরকুটে ফোননম্বর এবং নাম লিখে দিলেন। বললেন–মিঃ লাহিড়িকে চাই বলবে। আমার নাম করে বলবে, উনি কথা বলতে চান। তা হলে যদি অন্য কেউ ফোন ধরে, সে ওঁকে দেবে। আর উনি নিজেই ফোন ধরলে তো কথা নেই। এটা ওঁর পার্সোনাল ফোন নম্বর। আর তলারটা বাড়ির ফোন নম্বর। রাত আটটা-নটার পর হলে বাড়িতে পাবে ওঁকে।

নন্দিনী জিজ্ঞেস করল–কে ইনি?

কর্নেল হাসলেন–আমার এক স্নেহভাজন বন্ধু। তবে তোমার বাবাকে ইনিও। বিশেষ চিনতেন।

নন্দিনী চলে যাওয়ার পর কর্নেল টেলিফোন ডায়াল করতে ব্যস্ত হলেন। একটু পরে লাইন পেলেন।–অরিজিৎ? বরকধঝ…হ্যাঁ, হ্যাঁ। প্রকৃত পাগল তো বটেই। তো শোনো! তোমাকে নন্দিনীর কথা বলেছিলাম। আমি নদীয়ার কুমারচক যাচ্ছি। কবে ফিরব ঠিক নেই।…না, না। অর্কিডের খোঁজে। হালদারমশাই আমাকে কুমারচক থেকে একটা অর্কিড এনে দিয়েছেন। যাই হোক, নন্দিনীর মায়ের নামে একটা চিঠি এসেছিল। অমরেশবাবু স্ত্রীকে না দিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। চিঠিটা ষষ্ঠীর কাছে রেখে যাচ্ছি। তোমাকে দেবে।…হ্যাঁ, ইন্টারেস্টিং চিঠি। বরকধঝ-কে চিঠির কথাগুলো লেখানোর চেষ্টা করবে।…নাহ্। ওকে চিঠি দেখাবে না।…দ্যাটস রাইট। আর নন্দিনীকে তোমার নাম্বার দিয়েছি। পরিচয় দিইনি। কিছু ঘটলে তোমাকে রিং করে জানাবে সে। আর একটা কথা। ওদের বাড়ির কাছে তোমাদের লোক রাখা দরকার মনে হচ্ছে। প্লিজ অরিজিৎ! দিস ইজ ইমপর্ট্যান্ট।…ও কে ছাড়ছি।…

ফোন ছেড়ে কর্নেল হাঁকলেন–ষষ্ঠী!

ষষ্ঠীচরণ পর্দার ফাঁকে মুখ বের করে বলল–লাঞ্চো রেডি বাবামাশাই।

–লাঞ্চো পরে খাচ্ছি। তুই কাগজের দাদাবাবুকে নিয়ে যা। নীচে গিয়ে গোমসূবে বল্, বেসমেন্টের গ্যারাজে জয়ন্তের গাড়ি থাকবে। আমার গাড়ির পাশে পেয়ে যাবে, জয়ন্ত! যাও। ভয় নেই। গাড়ি চুরি যাবে না।

কৃষ্ণনগর থেকে ভিড়ে বোঝাই বাসটা যখন আমাদের কুমারচক পৌঁছে দিল, তখন চারদিকে সন্ধ্যার ঘোর লেগেছে। কিন্তু এ কোথায় এলাম? পিচরাস্তার ধারে কয়েকটা ঘুপচি দোকানপাট। কাছাকাছি আর কোনও ঘরবাড়ি নেই। উঁচু-নিচু গাছপালা আর আবাদী-অনাবাদী মাঠ। বললাম–কোথায় কুমারচক?

কর্নেল বললেন–আছে। গাছপালার আড়ালে ওই দেখ আলো ঝিকমিক করছে। মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্ব।

তা হলে এখানে নামলাম কেন?

–এটাই বাসস্টপ। কুমারচক ডাকবাংলোর স্টপ বলে লোকে। দাঁড়াও। একটা সাইকেল-রিকশা ডাকি।

বাস থেকে জনাকতক যাত্রী নেমেছিল। তারা কেউ সাইকেল রিকশায়, কেউ পায়ে হেঁটে চলে গেল। আমাদের দেখে একজন রিকশাওলা এগিয়ে এসেছিল। কর্নেলের চেহারা দেখেই তার শ্রদ্ধাভাব কিংবা বড় দাও মারার মতলব যেন। আসুন স্যার! লিয়ে যাই। ডাকবাংলোয় যাবেন তো স্যার? দশ টাকা রেট। ফরেস্টবাংলো কুড়ি টাকা। ট্যুরিস্ট লজ হলে পঁচিশ লাগবে স্যার! রাস্তা খারাপ।

কর্নেল রিকশায় উঠে বললেন–ফরেস্ট বাংলো।

বাসরাস্তাটা ধরে এগিয়ে রিকশাওলা বলল–আমি বলেই যাচ্ছি স্যার! অন্য কেউ আসত না। সন্ধেবেলা আজকাল বড় ছিনতাইয়ের ভয়।

–পাগলেরও ভয়।

 রিকশাওলা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।–আজ্ঞে?

-বলছি পাগলের পাল্লায় পড়ার ভয়ও আছে। কারণ কুমারচকে নাকি পাগলাগারদ আছে শুনেছি।

রিকশাওলা আমোদে খিকখিক করে হাসতে লাগল। পিচরাস্তা থেকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া খোয়াঢাকা সংকীর্ণ রাস্তায় রিকশা জোরে গড়াচ্ছিল এবার। সমতলে পৌঁছে সে বলল–কথাটা স্যার মিথ্যে বলেননি। শুনলাম, গারদ ভেঙে দেবুবাবু পালিয়ে গেছে। আগের দিন কাকে কামড়ে দিয়েছিল। পাগলাদের দাঁতে বিষ আছে। স্যার। তার নাকি মরো-মরো অবস্থা।

–পাগলের নাম দেবুবাবু?

–আজ্ঞে। অনেক বছর ধরে পাগলা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ওনার এক ভাই চণ্ডীবাবু সুবরেজেটিরি আপিসের মুহুরি। গত মাসে দাদাকে কোত্থেকে ধরে এনে শচীনবাবুদের পাগলাগারদে ভর্তি করেছিল। কিন্তু দেবুবাবুকে ধরে রাখতে পারে। শুনেছি, গরমেন্টের জেল ভেঙে পালিয়ে এসেছিল। গরমেন্টই ধরতে পারেনি।

সে রিকশা থামিয়ে নামল। রিকশার মাথার ল্যাম্পটা জ্বেলে নিল। দুধারে উঁচু গাছ। অন্ধকার এখন গাঢ় হয়েছে। কর্নেল টর্চের আলো জ্বেলে সামনে ও পাশটা। দেখছিলেন। রিকশাওলা তার রিকশায় উঠে প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলল–টর্চ জ্বালবেন না স্যার। তাহলে আর দেখতেই পাব না কিছু।

-তুমি ঠিক বলেছ। তোমার নাম কী হে?

–আজ্ঞে স্যার, নেয়ামত আলি।

কুমারচকেই বাড়ি?

–আজ্ঞে, ছিল। এখন ডাকবাংলোর বাসটপে থাকি।

কুমারচক ছেড়ে চলে এলে কেন?

–ভাইদের সঙ্গে বনিবনা হলো না। জমিজিরেত তো নেই। তাই চলে এলাম। বাসটপ থেকে প্যাসেঞ্জার পাই। দুটো পয়সা বেশি রোজগার হয়।

রিকশাওলাটি খুব কথা-বলিয়ে লোক। দেশের হালচাল রাজনীতি, পার্টিবাজি, ভোট-এ সবই তার নখদর্পণে এবং তার এসব বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিও আছে। কর্নেল দিব্যি ওই বিরক্তিকর প্রসঙ্গ নিয়ে কথার যোগান দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পরে বাঁদিকে রিকশা মোড় নিল। এতক্ষণে সামনে দূরে গাছপালার ভেতর বিদ্যুতের আলোর ছটা চোখে পড়ল। এবার সামান্য চড়াই। রিকশাওয়ালা সিট থেকে নামলে কর্নেল বললেন–ঠিক আছে নেয়ামত। আমরা এটুকু হেঁটে চলে যাব। এই নাও তোমার ভাড়া।

রিকশাওয়ালা খুশি হয়ে চলে গেল। কর্নেল হাঁটতে হাঁটতে বললেন–তুমি একবার বলেছিলে রিকশায় চাপা অন্যায় এবং আমি কেন রিকশায় চাপি? জয়ন্ত, আমি শ্রমের বিনিময়ে মহুরি দিচ্ছি বলে তৃপ্তি পাই, এমন কিন্তু নয়। তুমি লক্ষ্য করে থাকবে, বিশেষ বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে আমি রিকশায় চাপি। এটুকু রাস্তা অনায়াসে হেঁটে আসতে পারতাম। কিন্তু বরকধঝ-কচতটপ-র নাম যে দেবীবাবু এবং সাবরেজেস্ট্রি অফিসের মুহুরি চণ্ডীবাবু যে তার ভাই, এই তথ্যটা এত শিগগির কি জানতে পারতাম? আমি দেখেছি, মফস্বলের রিকশাওলারা অনেক বিষয়ে খোঁজখবর রাখে। এরা একেকজন একেকটি তথ্যকেন্দ্র।

ফরেস্টবাংলোটা একটা উঁচু জায়গায়। গেটের সামনে যেতেই এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে স্যালুট ঠুকলেন।আসুন কর্নেলসায়েব! ডি এফ ও সায়েবের লোক বিকেলে আমার কোয়ার্টারে মেসেজ দিয়ে গেল। তখনই চলে এলাম বাংলোয়। কিন্তু ট্রেন চলে গেল। আপনার দেখা নেই। তাই ভাবলাম আজ আর আসছেন না।

কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকের নাম অনন্ত বিশ্বাস। একসময় ডিফেন্সে ছিলেন। পরে ওড়িশার একটা জঙ্গলে রেঞ্জার ছিলেন। চোরাশিকারিদের সঙ্গে ঝামেলায় চাকরি ছেড়ে দেন। তারপর আবার সেই জঙ্গলের চাকরি জুটিয়েছেন। তবে এ জঙ্গল ওঁর ভাষায় নিরিমিষ জঙ্গল। মৌরী নদীর দুধারে একসময় বাঘ-ভালুকের জঙ্গল ছিল। পরে জঙ্গল প্রায় উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার কারণে সরকার গত তিরিশ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে জঙ্গলটার ভোল ফিরিয়েছেন। তবে বাঘ-ভালুক নেই। বছর তিনেক আগে একটা ডিয়ার পার্ক হয়েছে। এই পর্যন্ত।

বাংলোয় কেয়ারটেকার-কাম-চৌকিদার ভোলা কর্নেলকে চেনে। মালী নবও চেনে। কুমারচকে কর্নেল দুবছর আগে এসেছিলেন। অথচ আমাকে বলেননি।

অনন্তবাবু সাইকেলে চেপে চলে গেলেন। আমরা বাংলোর উত্তরের বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিলাম। আলোর শেষ প্রান্তে ছোট্ট গেট। গেট থেকে পায়েচলা পথ জঙ্গলের ভেতর নেমে গেছে। কর্নেল বললেন–শ’দুই মিটার হেঁটে গেলে মৌরী নদী। এদিকটায় দিনে একটা পুকুর দেখতে পাবে। তারই মাটি টিলার মতো উঁচু করে এই বাংলো তৈরি হয়েছিল। নদীতে যত বন্যাই হোক, বাংলো ডোবে না। পুকুরটা নদীর জল পাম্প করে এনে গ্রীষ্মে ভর্তি রাখা হয়। পুকুরে প্রচুর মাছ আছে।

নব মালী বারান্দার শেষ দিকটায় বসেছিল। বলল–আর তত মাছ নেই স্যার! চোরের খুব উপদ্রব বাড়ছে। এই তো সেদিন রাতে জাল ফেলে ধরে নিয়ে গেল। আমরা ভয়ে বেরুতে পারিনি।

ফরেস্টগার্ড ছিল দেখেছিলাম। তারা কী করে?

নব হাসল।–গার্ড স্যার নামেই। নাইট ডিউটির সময় বাড়ি গিয়ে ঘুমোয়। সবই খাতা-কলমে। যত ঝামেলা আমার আর ভোলাদার। আজ রাতে রঘু আর কাশেমের ডিউটি নদীর ওপারে। এপারে ডিউটি শ্যামা আর লালুর। খাতায় সই করে বেরিয়ে গেছে। মাঝরাতে কান করলে শুনবেন গাছ কাটার শব্দ। ট্রাক কি নৌকোয় চাপিয়ে নিয়ে যায়। ধরবে কে? তবে হ্যাঁ, বন্দুকের ফটাস্ ফটু শুনতে পাবেন। কৈফৎ দিতে হবে তো?

ভোলা কিচেন থেকে বলল–কী ফালতু বকবক করিস নব? সায়েবদের ডিসটাব হচ্ছে না?

কর্নেল বললেন–না, না! নবর গল্প শুনতে ভালই লাগছে। আচ্ছা নব, আসার পথে শুনলাম, কুমারচকের পাগলাগারদ থেকে এক খুনে পাগল পালিয়ে গেছে।

–ও। হ্যাঁ। আমিও শুনেছি স্যার! বলে সে ডাকল–ভোলাদা! কিচেন থেকে ভোলা সাড়া দিল শুধু।

-ভোলাদা তার পাল্লায় পড়েছিল স্যার। নব বলল। সে হেসে অস্থির হচ্ছিল।–সেদিন কলকাতা থেকে এক অফিসার এসেছিলেন। সঙ্গে ফেমিলি ছিল। ভোলাদা সাইকেলে বাজার করে ফিরছে। ফরেস্টের এরিয়ায় স্যার, পড়বি তো পড় একেবারে তার মুখে। তারপর কী হলো সায়েবদের বলো ভোলাদা।

কর্নেল ডাকলেন–ভোলা। রান্না পরে হবে। এসো, গল্প করা যাক।

ভোলা বেরিয়ে এল একটু পরে। গামছায় হাত মুছে হাসতে হাসতে বলল আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। সাইকেলে জঙ্গল ভেঙে সোজা আসছি। তখন বেলা প্রায় দশটা-এগারোটা হবে স্যার! ভাবলাম লুকিয়ে কেউ ডাল কাটতে এসেছে। হাতে কী একটা আছেও বটে। যেই বলেছি, কে রে? অমনি কী যেন বলে তেড়ে এল।

বরকধঝ-কচতটপ?

–তা-ই হবে। তবে স্যার, হাতে একটা শাবল ছিল। আমি পালিয়ে এলাম। কুমারচকে এক চণ্ডীবাবু আছে। তারই দাদা। কিন্তু তখনও জানি না, সে পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে এসেছে। শাবল ছুঁড়েছিল স্যার! জোর বেঁচে গেছি।

কর্নেল আস্তে বললেন–শাবল?

ভোলা হাসতে লাগল। লালুকে বলেছিলাম। আমাদের গার্ড স্যার। লালু শাবলখানা কুড়িয়ে এনেছিল। পাগলাবাবুকে দেখতে পায়নি।…

.