পিছনে পায়ের শব্দ – ১৯

১৯.

হাইওয়ের বাঁকের মুখে একটা স্টপে বাস থেকে নেমে পড়লেন কর্নেল। বাঁদিকে উত্তরে খ্রিস্টানপাড়া, সামনে পূর্বে ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জ। খ্রিস্টানপাড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে সংকীর্ণ আর এবড়ো-খেবড়ো একটা রাস্তা। সেদিকে না গিয়ে সিধে এগোলেন। কাছিমের খোলার গড়ন রুক্ষ উঁচু জমিটা বিকেলের আলোয় বিবর্ণ মড়ার খুলির মতো বিশ্রী দেখাচ্ছে। এখানে-ওখানে গর্ত। ভিতরের মাটিটা লালচে। আদিবাসীরা ঘরের দেয়াল রঙ করতে নিয়ে যায় দেখেছেন। লালঘুঘুর ঝকের ক্যামোফ্লাজের জন্য চমৎকার জায়গা। বাইনোকুলারে একটা ঝাক চোখে পড়ল। পশ্চিম থেকে রোদ্দুর পড়েছে। ওড়ার মুখেই ছবি নিতে হবে। দ্রুত ক্যামেরায় টেলি লেন্স ফিট করে গুঁড়ি মেরে উঠে গেলেন।

কিন্তু ক্যামেরা তাক করার সুযোগই দিল না ওরা। উত্তরে উড়ে গেল খ্রিস্টানপাড়ার ওপর দিয়ে। হতাশ হয়ে আবার বাইনোকুলারে দেখতে থাকলেন উড়ন্ত ঝাকটিকে। কোনাকুনি চলে যাচ্ছে ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির দিকে। খ্রিস্টানপাড়ায় আসন্ন ক্রিসমাসের তুলকালাম মাইকের বাজনাই হয়তো কাছাকাছি বসতে দিল না।

একটু পরে বাইনোকুলারে ধরা পড়ে গেলেন বেলিংটন জেভিয়ার। হাতে সেই কাটারি, বগলে ক্রাচ। কিন্তু ঝোপের আড়ালে মাঝে মাঝে গুঁড়ি মেরে বসছেন। আবার একটু উঠে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন। কিছুটা এগিয়ে কোনও গাছের গুঁড়িতে সেঁটে যাচ্ছেন। অমন করছেন কেন? ব্যাপারটা দেখা দরকার।

ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির দক্ষিণে বন-জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলেন জেভিয়ার। কর্নেল সিধে নাক বরাবর হাঁটতে থাকলেন। স্টেশন রোড ধরে এগিয়ে ডাইনে কুঠিবাড়িতে যাওয়ার সরু রাস্তাটা। সেখান থেকে জঙ্গলটা বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে দেখলেন। জেভিয়ারকে খুঁজে বের করা গেল না।

কর্নেল ইরিগেশন বাংলোর দিকটা দেখতে থাকলেন। লনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন গণনাথ আর সেই রাজেশ শর্মা। একটা লাল মারুতি গেটের এধারে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলোর গ্যারেজের সাদা গাড়িটা গণনাথের। এখনও যথেষ্ট রোদ আছে। তা হলে কি আজ শুটিং হয়নি, নাকি একটু সকাল-সকাল হয়ে গেছে?

রামলালকে দেখা গেল না। বাংলোর বারান্দায় সাদা বেতের চেয়ারে একটি মেয়ে এবং আরও দুজন পুরুষকে আবছা দেখা গেল। পশ্চিমে ওয়াটারড্যামের কিনারায় উঁচু গাছপালা সূর্যকে আড়াল করেছে। বারান্দায় গাঢ় ছায়া। সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসে আছে সেই যুবকটি, যাকে কর্নেল গণনাথের বডিগার্ড বলেছিলেন। যেহেতু গণনাথ এ কথার প্রতিবাদ করেননি, ধরে নেওয়া যায় সে তা-ই।

একটু পরে গণনাথ এবং রাজেশ শর্মা গেট খুলে ঢালু রাস্তায় এলেন। তারপর লাল গাড়িটার পাশ দিয়ে দুজনে এসে স্টেশন রোডে পৌঁছুলেন। ক্যানেলব্রিজে দাঁড়িয়ে দুজনে আবার কিছুক্ষণ কথা হল। তারপর এদিকে আসতে থাকলেন। তখন কর্নেল একটা ঝোপে ঢাকা স্থূপের আড়ালে সরে গেলেন। বডিগার্ড গেট পেরিয়ে আসছে এতক্ষণে। একটু দূরত্ব রেখে সে ওঁদের অনুসরণ করছে।

ওঁরা কুঠিবাড়ি ঢোকার রাস্তায় এলে কর্নেল শুনতে পেলেন, শুটিং প্রোগ্রাম। নিয়ে কথা হচ্ছে। রাজেশ শর্মা বাংলায় কথা বলছেন। ক্রেন আমি আনিয়ে দেব। ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলে আপনি পুরো ওয়ালটা পাচ্ছেন। ক্রেনের সঙ্গে শালকাঠের সিক্স বাই ফাইভ বাই থ্রি ফিট হাইট বক্স ফিট করা থাকবে। দুজন কেন, তিনজন বসুন না! কিন্তু রিস্ক আছে! হিয়োর ডামি আনিয়ে নিন।

গণনাথ বললেন, অসুবিধে নেই। বেচুবাবুকে যদি বলি একটা বাঘের দরকার, তা-ও এনে দেবেন।

দুজনে হেসে উঠলেন। রাজেশ বললেন, কুরুডি ফরেস্ট থেকে?

বেচুবাবুর পক্ষে তা-ও অসম্ভব নয়। এক হিরোইন গেল। এবার দেখবেন কাকে আনছেন বেচুবাবু।

শ্রাবন্তীজি হঠাৎ চলে গেলেন কেন?

গণনাথ তেতমুখে বললেন, প্রেমিকের মৃত্যুতে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জীবনে কখনও ও অ্যাকট্রেস হতে পারবে? বলেই একটু হাসলেন। বেচুবাবু বলছিলেন সিলেকশন ঠিক হয় নাই! ঠিক তা-ই।

কুঠিবাড়ির ফটকের কাছে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন রাজেশ শর্মা। জ্যাকেট এবং প্যান্টের পকেট খুঁজে বললেন, সিগারেট ফেলে এসেছি গাড়িতে।

গণনাথ সিগারেটের প্যাকেট বের করে বললেন, নিন!

সরি! ওই ব্র্যান্ড তো আমার চলে না দাদা! বলে পিছনে ঘুরলেন রাজেশ। গণনাথের বডিগার্ডকে বললেন, আমার গাড়ি থেকে সিগারেট প্যাকেটটা এনে দাও। জলদি কর না ভাই।

বডিগার্ড হন্তদন্ত চলে গেল। গণনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আইডিয়াটা আমার মাথায় ছিল না, তা নয়। শুধু রিস্কের কথাটা ভেবেই–তবে ছাদ থেকে ক্যামেরা জুম করে খাদের ওপারের চরে কুসমিকে ধরা যাবে। তার ধনুকের তীরটা সিম্বলিক হবে। মানে, দা অ্যারো ওভার দা ব্ল্যাক ওয়াটার–দা প্রিমিটিভ মোবাইল ফোর্স অফ লাইফ ওভার দা ব্ল্যাক ট্র্যাপ অপ ডেথ।

রাজেশ পা বাড়িয়ে বললেন, রামলালকে বলে যেতাম, সিংজিকে ক্রেনের কথাটা বলে আসত।

গণনাথ বললেন, বউয়ের অসুখ। খবর পেয়ে দেখতে গেছে।

চলুন। রোদ থাকতে থাকতে দেখে নেবেন কোথায় ক্রেন ফিট করলে ঠিক হবে। বলে রাজেশ ব্যস্তভাবে এগিয়ে গেলেন খোলা সিঁড়িটার দিকে। গণনাথ তার ছবির আইডিয়া ব্যাখ্যা করতে করতে তাকে অনুসরণ করলেন।

কর্নেল বেরিয়ে এলেন আড়াল থেকে। ফটক পেরিয়ে কুলঝোপগুলোর পাশ দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন। শরীরটার ওজন বেড়ে গেছে। একটু পরে। খোলা ছাদে গণনাথ ও রাজেশকে দেখতে পেলেন। সিঁড়ির দিকে চললেন কর্নেল।

রাজেশ শর্মা পুবের রেলিংয়ে হাত রেখে একটু ঝুঁকে বলেছিলেন, ওয়ান্ডারফুল! ক্রেন এখানে ফিট করলে মাথার দিকটা খাদের ওপর যাবে। অনেকটা কভার করতে পারবেন ক্যামেরায়। দেখে যান পজিশন। আসুন!

গণনাথ দুটো হাত তুলে দুই কানের পাশে রেখে ক্যামেরার লেন্সে দেখার ভঙ্গিতে চরের দিকটা দেখছিলেন। রাজেশের ডাকে কাছে গেলেন। মুখে ফিল্মমেকারের তন্ময়তা গাঢ়। রেলিঙের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় নীচের জঙ্গলে কোথাও একটা অমানুষিক চিৎকার শোনা গেল। দুজনেই চমকে উঠে সোজা হলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা বিভীষিকার শিহরন ছড়িয়ে গেল পারিপার্শ্বিকে। রাজেশ বলে উঠলেন, হোয়াটস দ্যাট?

গণনাথ একটু হাসলেন। রামলাল বলেছিল কিচনির ডাক। কিচনি নাকি জলের পেত্নী।

কেমন টেরিফিক ক্র্যাকড ভয়েস। রাজেশ গম্ভীর মুখে বললেন। সাম অ্যানিম্যাল আই থিংক! আমার একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে। এই হন্টেড হাভেলির খুব বদনাম আছে। জলদি দেখে নিয়ে ফেরা যাক। আসুন। এখান থেকে ক্রেন এগিয়ে যাবে ওখানে। নীচে খাদ। বলুন, কেমন হবে?

গণনাথ তাঁর পাশে রেলিং ধরে ঝুঁকেছেন, সিঁড়ির মাথা থেকে কর্নেল বলে উঠলেন, মোটেও ভাল হবে না শর্মাজি!

দুজনে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

কর্নেল কয়েক পা এগিয়ে একটু হেসে বললেন, আপনাকে বলেছিলুম মিঃ সেন, এটা বিপজ্জনক খেলা।

রাজেশ শর্মা খাপ্পা হয়ে বললেন, হু দা হেল ইউ আর?

কর্নেল বললেন, এইমাত্র কিচনির ডাক শোনা গেল। এলাকার লোকে বলে, কিচনি ডাকলে কারও না কারও প্রাণ যায়। আ ডেথ সিগন্যাল শর্মাজি!

গণনাথ সেন কর্নেলের দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ হন হন করে এগিয়ে এসে তার পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। রাজেশ শর্মা কর্নেলের দিকে ঘুসি পাকিয়ে তেড়ে এলেন। ইউ ওল্ড হ্যাঁগার্ড! হু আর ইউ?

আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

আই সি! বনোয়ারিজি ওয়ার্নড় মি! বাট আই ফরগট অ্যাবাউট ইউ। রাজেশ শর্মার চোখ জ্বলে উঠল।

কোয়াইট ন্যাচারাল শর্মাজি! জিরো আওয়ারে কিছু মনে থাকার কথা নয়। কাউন্ট ডাউন শুরু হতে যাচ্ছিল–ওয়ান…টু..থ্রি…হঠাৎ কিচনির ডাক। তারপর দিস ওল্ড হ্যাঁগার্ড! বাধা পড়ে গেল।

রাজেশ শর্মা তার দিকে এক পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল রিভলভার বের করলেন। শক্ত মুখে গম্ভীর স্বরে বললেন, রোজি জেভিয়ার এবং কেয়া সেনের খুনীকে ধরিয়ে দেবার মতো এভিডেন্স আমার হাতে আছে, শর্মাজি! তা ছাড়া আমি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে কারও ঠ্যাং ভেঙে দিলে সেটা ক্রাইম বলে সাব্যস্ত হবে না।

রাজেশ শর্মা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আস্তে বললেন, আপনি কত টাকা চান?

বনোয়ারিজির আইডিয়া! অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দুবেজি আমাকে দশ হাজার টাকা দেখিয়েছেন।

দেন টোয়েন্টি। এগ্রি?

নীচে চলুন। কথা হবে। কর্নেল রিভলভারের নল দিয়ে সিঁড়ির দিকটা নির্দেশ করলেন।

রাজেশ শর্মা সিঁড়িতে পা দিয়ে বারবার পিছনে তাকাতে তাকাতে নেমে গেলেন। তারপর হঠাৎ একলাফে ভূপের আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল একটু সতর্ক হয়েছিলেন তার কাছে ফায়ার আর্মস আছে ভেবে। একটু পরে বুঝলেন, নেই। থাকলে গুলি ছুঁড়তেন। ফটকে গণনাথকে দেখা গেল। তার বডিগার্ড আসছিল হন্তদন্ত। কর্নেল দেখলেন, গণনাথ তাকে চাপাস্বরে কিছু বলমাত্র সে দৌড়ে গেল। কর্নেল ডাকলেন, মিঃ সেন!

গণনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন।

শর্মাজিকে ধরতে পারবে বলে মনে হয় না। লোকটির এই এরিং নখদর্পণে। আপনার লোক পৌঁছুনোর আগেই গাড়িতে চেপে উধাও হয়ে যাবে। শর্টকাটে ছুটে গেছে ও।

গণনাথ আস্তে বললেন, এতটা সাহস ওর হবে, কল্পনাও করিনি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, সব মানুষ একচক্ষু হরিণ। বরুণের মতো গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করাবে–এটাই আমার মাথায় ছিল। তাই তপনকে গাড়ির দিকে নজর রাখতে বলেছিলাম। বেলা হয়ে যাচ্ছে, পারিজাত হোটেল থেকে আমার লোকেরা আসছে না। তাই গাড়ি নিয়ে বেরুব ভাবছি। হঠাৎ শুনি বাইরে ধস্তাধস্তি, হইচই। তপন চেঁচাচ্ছে। বেরিয়ে গিয়ে দেখি তপন একজনকে পেটাচ্ছে।

রামলালকে।

গণনাথ একটু অবাক হলেন। আপনি জানেন?

এটুকু জানি যে সে মেকানিক। গাড়ির সব কিছু ওর জানা। টাকার লোভে শর্মার হুকুম তামিল করত।

তপন রামলালকে মেরেই ফেলত। ইতিমধ্যে বেচুবাবু এসে গেলেন আমার লোকজন নিয়ে। রামলালকে থানায় পাঠানো হল। এদিকে আমার ছবির হিরোইন কলকাতা ফিরে গেছে সকালের ট্রেনে। বরুণের সঙ্গে এমোশনাল সম্পর্ক ছিল। শক্ড় হওয়ারই কথা। গণনাথ সিগারেট ধরালেন। উত্তেজনায় তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। আর আমার ছবি করা হল না! আপনি ঠিকই বলেছিলেন, ডেঞ্জারাস গেম। ভাবতে বুক কাঁপছে। আপনি গিয়ে না পড়লে এতক্ষণে আমি…ওঃ! আমার মাথা ঘুরছে মশাই!

গণনাথ পা বাড়ালেন। কর্নেল বললেন, আপনি কি কলকাতা ফিরে যাবেন?

গণনাথ পিছু না ফিরে গলার ভেতর বললেন, হাঃ! মনে হল শব্দটা গর্জনমিশ্রিত আর্তনাদ।

অনির্বাণ সোমের খুনী কে, মিঃ সেন?

প্রিয় নয়। ওই শয়তানটা রাজেশ শর্মা।

এক মিনিট মিঃ সেন। কর্নেল এগিয়ে গেলেন। অনির্বাণকে কেন রাজেশ খুন করবে? কোম্পানিরই বা কী স্বার্থ এতে? অনির্বাণও কি কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেল করত?

গণনাথ জোরে মাথা নাড়লেন। আনু কিছু জানত না। জানত কেয়া। আমি কিছু জানি। আর জানে প্রিয়। তবে বরুণও কিছু আভাস পেয়েছিল মনে হচ্ছে। তাই শুওরের বাচ্চা রাজেশ নিশ্চয় রামলালকে বলে রেখেছিল…

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, তা হলে আনু খুন হল কেন?

গণনাথ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ব্যাপারটা আমি ভেবেছি। মনে হয়েছে, খুনী প্রিয় ভেবে ভুল করে আনুকে গুলি করে মেরেছে। এখন মনে হচ্ছে, আমি কারেক্ট। শর্মা ব্যাটাচ্ছেলে সে রাতে পাশের ঘরে ছিল। সে রামলালকে দিয়ে প্রিয়র গাড়ির ব্রেক খারাপ করিয়ে সম্ভবত শর্টকাটে ছুটে আসে। ইতিমধ্যে আনু গিয়ে পৌঁছেছে। অন্ধকারে শর্মা আনুকে প্রিয় ভেবে গুলি করে। তারপর গঙ্গায় বডিটা ফেলে দিয়ে আসে। হয়তো পরে রামলালকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

কর্নেল বললেন, হুঁ। আপনার কথায় যুক্তি আছে।

আই অ্যাম সেন্ট পার্সেন্ট কারেক্ট। এবার আপনি এর হেস্তনেস্ত করুন। কিন্তু সরি! আমার মাথা ঘুরছে। চলি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

গণনাথ চলে গেলেন। কর্নেল দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজেশ শর্মার সঙ্গে এখন ফায়ার আর্মস নেই বোঝা গেল। তা হলে প্রিয়র গাড়ির ভেতর পাওয়া। রিভলভারটা তারই। গণনাথ ঠিকই বলেছেন। ভুল করে আনুকে গুলি করেছিল প্রিয় ভেবে। অন্ধকার ও কুয়াশায় ভুলটা স্বাভাবিক। এও ঠিক যে শর্মা প্রিয়র জন্যই আগে থেকে ওই বাংলোয় এসে ওত পেতেছিল। শর্মা কোম্পানির হাতের পুতুল।

কিন্তু ওই জঙ্গলের ভেতর টার্গেট প্র্যাকটিস করত কে? রাজেশ শর্মা আশাপুরা থেকে এত দূরে এসে টার্গেট প্র্যাকটিস করত? গাছের গুঁড়িতে পাওয়া গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ রিভলভারের। রাজেশের এই সব জায়গা পরিচিত, বোঝ যায়। রোজি এবং কেয়াকে নিয়ে সে প্রেমের ফাঁদও পেতেছিল এখানে, সেটা আঁচ করা যায়। কাজেই রাজেশের পক্ষে টার্গেট প্র্যাকটিশ করা–প্রিয়কে মারার জন্য হাত পাকাতেই, অসম্ভব বলা চলে না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনও-কোনও মানুষকে দুর্দান্ত নিষ্ঠুর প্রাণী করে ফেলে।

কর্নেল জঙ্গলের ভেতর ঢুকলেন। সেই গাছটা খুঁজে বের করতে হবে। দিনের আলো কমে আসছে দ্রুত। আসন্ন শীতসন্ধ্যায় পাখিরা তুমুল ঝগড়াঝাটির মতো হল্লা করে। নাকি নিষ্ঠুর শীতরাত্রির বন্দনা? অথবা প্রকৃতি ঠাণ্ডাহিম হতে হতে প্রচণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আগে এই সব শব্দের উত্তাপে নিজেকে উষ্ণ করে নেয়? প্রকৃতি বড়ো রহস্যময়।

পিছনে শুকনো পাতায় মচ মচ শব্দ; কর্নেল চমকে উঠলেন। ধূসর আলোয় বাইনোকুলারে প্রত্যেকটি ইঞ্চি বড় আকারে দেখা যাচ্ছিল। বর্মার জঙ্গলে গেরিলাযুদ্ধের তালিম দিয়েছেন মার্কিন ‘এল আর পি জি’র সৈনিকদের। তারা ব্রিটিশ থার্টিন্থ ডিভিসনের সমান্তরাল জঙ্গলের ভেতর এগিয়ে জাপানি বাহিনীকে পেছন থেকে আঘাত হেনেছে। কোন শব্দ কোথা থেকে আসছে, কী সেই শব্দ এবং বিপজ্জনক না নিরাপদ, বুঝতে পারলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আবার একটু হাঁটলেন, শব্দটা পরীক্ষা করতেই। আবার মচমচ শব্দ পিছনে।

রিভলভার বের করতে গিয়ে করলেন না। ডাকলেন, মিঃ জেভিয়ার।

কোনও সাড়া এল না।

কর্নেল একটু হেসে ইংরেজিতে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! নাকের ডগা দিয়ে আপনার মেয়ের খুনী পালিয়ে গেল।

এবার লতাগুল্মে ঢাকা একটা পাথরের পাশে বেলিংটন জেভিয়ারকে দেখা গেল। নীল চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। ভিজে চোখ। হাতের চেটোয় মুছে ভাঙা গলায় বললেন, আজ আমার শেষ চেষ্টাও ব্যর্থ হল। প্রভু যিশু চান না, তাঁর শুভ জন্মদিনের প্রাক্কালে একজন ভক্ত খ্রিস্টানের হাতে মানুষের রক্ত ঝরুক।

জেভিয়ার ক্রস আঁকলেন বুকে। কর্নেল বললেন, পাপী শিগগির তার শাস্তি পাবে। আসুন, চুরুট টানা যাক। উত্তেজনা আমাদের দুজনকেই ক্লান্ত করেছে।

একটু পরে চুরুট টানতে টানতে খকখক করে কেসে জেভিয়ার বললেন, রোজির ঘরের তালা ভেঙে চোর ঢুকেছিল।

কিছু চুরি গেছে কি?

বেলিংটন জেভিয়ার গম্ভীর মুখে বললেন, রোজির একটা নোটবুক এবং একটা চিরকুট। রোজির মৃত্যুর কয়েকমাস পরে চিরকুটটা আমি দেখতে পাই। তখন বুঝতে পারি কী ঘটেছিল। কিন্তু শয়তানটাকে আর দেখতে পাইনি এ তল্লাটে। মহাশয়! আমি একজন গরিব বুড়োমানুষ। খোঁড়া। কী করতে পারতুম?

তার চোখ ভিজে গেল আবার। কর্নেল বললেন, বড্ড শীত! আসুন, আমরা একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে গল্প করি। জঙ্গলে আগুনের কুণ্ডের কাছে বসে গল্প করা আমার তো দারুণ লাগে। এ বিষয়ে আপনার কী মত?

জেভিয়ার উৎসাহে শুকনো ডালপালা কাটতে থাকলেন। কর্নেলও শুকনো পাতা কাঠকুঠো জড়ো করলেন। জেভিয়ার. বললেন, আমি নিশাচর মানুষ। আমারও এই অভ্যাস আছে। লোকেরা দূর থেকে ব্যাপারটা দেখে ভয় পায়। দ্বিপদ প্রাণীগুলো যত ভয় পায়, তত আমার আনন্দ হয়।

লাইটার জ্বেলে আগুন ধরিয়ে কর্নেল বললেন, লোকেরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, কিচনির ডাককে।

জেভিয়ার বসে আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে বললেন, কিচনি কিছুক্ষণ আগে ডেকেছিল। শুনেছেন কি?

শুনেছি। তবে আমার ধারণা, কিচনির এই শেষ ডাক।

জেভিয়ার তার দিকে একবার তাকালেন। ঠোঁটের কোনায় একটু বাঁকা হসি। জঙ্গলের ভেতরকার ধূসরতা গাঢ় হয়েছে। পাখিদের ডাক থেমে গেছে। একটু পরে কর্নেল বললেন, মিঃ জেভিয়ার! একটা গাড়ির ওপর আপনার এত আক্রোশ কেন? কেন দু-দুবার একই গাড়ির কাচ ভাঙলেন?

মুখ নামিয়ে জেভিয়ার বললেন, গাড়িটা আমার চেনা। নাম্বার মুখস্থ। ওই গাড়িতে চেপে শয়তান আর রোজিকে নিয়ে আসত। ওর জন্যই ক্যারি রোজিকে ডিভোর্স করে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। গত অক্টোবরে দেখি গাড়িটা অন্য একজন চালাচ্ছে।

সেই ‘ফানি চ্যাপ’। কোম্পানি তাকে গাড়িটা দিয়েছিল।

জেভিয়ার রুষ্ট মুখে বললেন, গাড়িটাকে বাগে পাইনি তখন। তো উনিশে ডিসেম্বর বিকেলে সেচ বাংলোয় শয়তান ‘আর’-কে দেখতে পেলাম। সন্ধ্যার পর চুপিচুপি গিয়ে বাংলোর কাছে ঝোপের ভেতর ওত পেতে রইলাম। হাতে এই কাটারি। কিন্তু সে বাংলো থেকে বেরুচ্ছে না। জেদ চেপে গেল। বসে রইলাম–ওকে বেরুতেই হবে। তখন অনেক রাত। লনের নুড়িতে পায়ের শব্দ শুনে বাংলোর নিচু দেয়ালের কাছে গেলাম। মাথা তুলে দেখি, অন্য একজন। সে আমাকে দেখতে পেয়েই হইচই করল। রামলাল আমাকে ভাগিয়ে দিল। কুঠিবাড়িতে আমার বন্ধু ক্লিফটনের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলুম। ও ঈশ্বর! হঠাৎ স্টেশন রোডে সেই গাড়িটা দেখতে পেলাম–বাংলোর দিকে যাচ্ছে! সোজা চলে গেলাম আবার। গাড়িটা রাস্তায় ঘুরিয়ে রেখে ‘ফানি চ্যাপ’ বাংলোর দিকে গেল। এই তো সুযোগ! কিন্তু দুর্ভাগ্য! বদমাস রামলাল এসে পড়ল। তারপর দেখি, সে বনেট খুলে কী করছে। আমি তখন ঝোপের আড়ালে। দেখলাম, কী একটা করে রামলাল তখনই চলে গেল। তখনও বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা কী।

কর্নেল আগুনে কয়েকটা শুকনো কাঠ গুঁজে দিয়ে বললেন, ব্রেক বিগড়ে দিয়েছিল সে।

জেভিয়ার চুপ করে থাকলেন। কাঠের নকল পা ছড়ানো, অন্য পায়ের হাঁটু ভাঁজ করা। চুরুটটা কামড়ে ধরে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কর্নেল বললেন, তারপর কী হল বলুন?

‘ফানি চ্যাপ’ বেরিয়ে এল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। এবারও একটা সুযোগ হাতছাড়া হল। বলে জেভিয়ার বুকে ক্রস আঁকলেন। শ্বাস ছেড়ে ফের বললেন, প্রভু যিশুর ইচ্ছা সবই।

কুঠিবাড়ির দিকে শেয়ালের ডাক শোনা গেল। কয়েকবার ডাকাডাকি করে শেয়ালগুলো চুপ করলে কর্নেল বললেন, কিন্তু আপনিই গাড়ির কাচ ভেঙেছিলেন, মিঃ জেভিয়ার! তাই নয় কি?

বেলিংটন জেভিয়ার বিষণ্ণ মুখে বললেন, আমি দুঃখিত। আর কয়েক ঘণ্টা পরে পরিত্রাতা প্রভু যিশুর শুভ জন্মক্ষণ। এটা একজন ভক্ত ক্যাথলিকের কনফেসন বলে ধরে নিন। আমি গাড়ির কাচ ভেঙে পাপ করেছি। আমার কনফেস করা উচিত।

কর্নেল সকৌতুকে বললেন, জানেন কি কেউ কেউ আমাকে ফাদার ক্রিসমাস বলে ডাকে?

আপনাকে ঠিক তা-ই দেখায় বটে! জেভিয়ার কর্নেলকে একবার দেখে নিলেন। কিন্তু কর্নেলের কৌতুক তাকে ছুঁতে পারল না।

গাড়ির কাচ ভাঙার ঘটনাটা বলুন এবার। কনফেসনে সমস্ত কিছু খুলে বলতে হয়, আপনি জানেন মিঃ জেভিয়ার!

একটু চুপ করে থেকে জেভিয়ার বললেন, স্টেশন রোড ধরে ফিরে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি, স্টেশন রোডে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। কিন্তু গাড়িটা থেমে আছে। সোজাসুজি চলে গেলাম। আশ্চর্য লাগল। গাড়িটা ঝোপের ভেতর আটকে গেছে।

ব্রেক বিগড়ে দিয়েছিল রামলাল। ঝোপে না ঢোকালে ‘ফানি চ্যাপ’ মারা পড়ত।

হ্যাঁ। কিন্তু গাড়িটাকে ভাঙচুর করার এমন সুযোগ ছাড়া যায় না। আমি কিচনির ডাক ডাকলাম। অমনি লোকটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং পালাতে থাকল। ফানি চ্যাপ’! আমি আলোর আড়ালে গাছপালার ভেতর ক্রাচের শব্দ করতে করতে কিছু দূর গেলাম। ওকে আরও ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। কুত্তাকা মাফিক ভাগা!

জেভিয়ার আবার খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। কর্নেল বললেন, তারপর ফিরে গিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙলেন?

প্রথমে হেডলাইট। বলে জেভিয়ার হাতের নিভিয়ে দেওয়া চুরুটটা কোটের পকেটে ঢোকালেন। ক্রাচের ঘায়ে আলো খতম করে সমস্ত কাচ চুরমার করলাম। তারপর মনে হল কেউ আসছে। অন্ধকারে আমি জন্তুর মতো দেখতে পাই। রাস্তার উল্টোদিকে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। সে এসে থমকে দাঁড়াল। গাড়িটা দেখতে পেয়ে কাছে গেল সে। কাচ ভাঙা দেখেও সে অবাক হল না। আশ্চর্য মহাশয়! সে গাড়িটাকে লাথি মারতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে সে গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রইল তো রইল! ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! জেভিয়ার শ্বাস ছেড়ে বললেন, সময়ের বোধ আমি কবে হারিয়ে ফেলেছি। আমি এক সময়হারা মানুষ, মহাশয়। কতক্ষণ পরে দেখি, সে টর্চ জ্বেলে গাড়ির ভেতরটা দেখছে। এ-ও অদ্ভুত! এতক্ষণ সে টর্চ জ্বালেনি।

হুঁ, টর্চটা গাড়ির ভেতর ছিল শুনেছি।

আরও অদ্ভুত, সে এবার রাস্তায় পায়চারি শুরু করল। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বালছিল এদিক-ওদিকে। বেগতিক দেখে আমি গুঁড়ি মেরে ঝোপের আড়ালে চলে গেলাম। কিচনির ডাক ডেকে ওকে ভয় পাইয়ে দিতাম। কিন্তু আমি দেখতে চাইছিলাম তার কী উদ্দেশ্য! আরও কতক্ষণ কেটে গেল। অন্ধকারটা কুয়াশায় ভরে গেল। আপনি দেখে থাকবেন, মেঘের মতো কুয়াশা চলাফেরা করে শীতের রাতে। হঠাৎ শুনি গুলির শব্দ। শুধু দেখলাম জ্বলন্ত টর্চটা আছড়ে পড়ল। অমনি আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলাম। আই কান্ট ট্যাল্ উইথ এনি ফায়ার আর্মস!

বলে বেলিংটন জেভিয়ার হঠাৎ ভয় পাওয়া মুখে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন, একটা কথা মিঃ জেভিয়ার! ওদিকে একটা গাছে কেউ গুলি ছুঁড়ে হাতের টিপ করত। আপনি বনচর মানুষ। নিশ্চয় আপনার চোখে পড়ে থাকবে।

জেভিয়ার পা বাড়িয়ে বললেন, আর পাপের কথা নয়। শুভ ক্রিসমাস আসন্ন। আমি গির্জায় যাওয়ার জন্য পোশাক বদলাব।

প্লিজ মিঃ জেভিয়ার।

জেভিয়ার ক্রাচে ভর করে চলতে চলতে চাপাস্বরে বললেন, শিগগির এখান থেকে চলে যান। আমার মাননীয় বন্ধু ক্লিফটনের আত্মাকে বিরক্ত করবেন না। গো অ্যাওয়ে! গো অ্যাওয়ে!

বেলিংটন জেভিয়ার জঙ্গলের ভেতর অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলেন।

.