পিছনে পায়ের শব্দ – ১২

১২.

 এদিন ভোরেও গাঢ় কুয়াশা। কর্নেলের পরনে ওভারকোট, মাথায় পুরু মাংকি ক্যাপ। বাইনোকুলার, ক্যামেরা আর প্রজাপতি-ধরা নেট-স্টিক তাঁর নিসর্গভ্রমণে সঙ্গে থাকাটা অবধারিত। অরীন্দ্রের গত রাত থেকে মনমেজাজ খারাপ। নইলে সঙ্গী হতেন। অবশ্য কর্নেল একাই বেরুতে চেয়েছিলেন।

গেট পেরিয়ে পুরনো সড়কে কয়েক পা হাঁটতে পিছনে ধুপ-ধুপ শব্দ। দ্রুত ঘুরে দুটি ছায়ামূর্তি দেখতে পেলেন। সাত্যকি আর পিউ জগিংয়ে বেরিয়েছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় তাকে লক্ষ করল না ওরা। করলেও চেনার সম্ভাবনা ছিল না। দাড়িটা পুরো ঢাকা।

একটু গম্ভীর হলেন কর্নেল। পিছনে ধুপ ধুপ শব্দ শুনেই চমকে উঠেছিলেন। বয়স কি তার সেই তীক্ষ্ণ বোধটিকে ক্রমশ ভোতা করে দিচ্ছে? কোথাও কোনও শব্দ শুনতে পেলেই শব্দটা কিসের এবং কতটা দূরত্বে, সঙ্গে সঙ্গে আঁচ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্মার জঙ্গলে একটা মার্কিন গেরিলাবাহিনী ‘লং রেঞ্জ পেনিট্রেশন গ্রুপ’ এল আর পি জি-কে জঙ্গলযুদ্ধের তালিম দিতেন। জঙ্গলে শব্দ একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। রাণুর শিকারী স্বামী বিজয়েন্দুকেও প্রচুর তালিম দিয়েছিলেন। এক সেকেন্ডের অন্যমনস্কতা সাংঘাতিক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, কতবার বোঝাতেন তাকে। বিজয়েন্দু তবু বেঘোরে প্রাণ খোয়াল। আসলে কোনও কোনও মানুষের কাছে সব শিক্ষা বাইরে থেকে চাপানো জিনিসের মতো। কিছু মানুষের বেলায় যে-কোনও ধরনের শিক্ষার ব্যাপারে একটা সহজাত বোধ থেকে যায়। সেই বোধ তাকে স্বভাব-শিক্ষিত করে তোলে। একেই কি অশিক্ষিতপটুত্ব বলা হয়? জঙ্গলবাসী সব মানুষই কিন্তু ‘ট্র্যাকার হতে পারে না। কেউ কেউ হতে পারে। সহজাত বোধ। কাল কুঠিবাড়ির জঙ্গলের শুকনো পাতার ওপর সন্তর্পণ শব্দটা? সত্যিই কি কোনও পাখি কি খরগোসজাতীয় প্রাণীর? তখন ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাননি। রাতে বিছানায় শুয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল, শব্দটা হয়তো কোনও মানুষের চুপিচুপি পা ফেলার। কিন্তু কে সে? সত্যিই কি কেউ তাকে অনুসরণ করছিল?

আর ওই তথাকথিত কিচনির চিৎকার? স্থানীয় লোকেরা তার সঙ্গে মৃত্যুকে জড়িয়ে ফেলেছে, সেটা হয়তো কুসংস্কার। কোইনসিডেন্স বলা চলে। কুসংস্কারের উদ্ভব এ ধরনের দুটি ঘটনার জোড়াতাপ্পি থেকে। ওই তীক্ষ্ণ চেরা গলার চিৎকার কোনও জন্তুর হওয়াই সম্ভব। সুশীলা বলছিল, কিচনি চিৎকার করলে কোনও মানুষের প্রাণ যায় নাকি। যদি আজ সত্যিই তেমন কিছু ঘটে থাকে, একটু ভাববার কথা। প্রিয়ও নাকি সেই চিৎকার শুনেছিল এবং অনির্বাণ সোম খুন হয়ে গেল। তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, ডেডবডিটা গঙ্গার দহে ফেলল কে? কিচনির কীর্তি? কর্নেল আপন মনে একটু হাসলেন। ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে এখনও প্রাগৈতিহাসিক আদিমতার কিছু লক্ষণ তিনি লক্ষ করেছেন। মানুষজন এবং প্রকৃতিতে কী এক রহস্য মাঝে মাঝে ছায়া ফেলে বেড়ায়।

এটা স্টেশন রোড। ইরিগেশন ক্যানেলের ব্রিজের একটু আগে বাঁদিকে চওড়া নতুন রাস্তা। একধারে ওয়াটার ড্যাম, অন্যধারে অসমতল উঁচু-নিচু জঙ্গল। পুরনো এবং নতুন ক্লিফটনগঞ্জের মধ্যে এই জঙ্গলটাই এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। মসৃণ নতুন রাস্তার ধারে উঁচুতে কুয়াশার মধ্যে এখনও জুগজুগে আলো। দূরে নিউ ক্লিফটনগঞ্জ টাউনশিপেও আলোর ফুটকি। সওয়া ছটা বাজে। কুয়াশার পর্দা ঝুলে আছে ড্যামের জলে। ক্যানেল ব্রিজের ওধারে নিচু টিলার ওপর ইরিগেশন বাংলোর আবছা আভাস। ফিল্মমেকার গণনাথ সেন এখনও হয়তো ঘুমোচ্ছেন। কর্নেল ড্যামের রাস্তায় চলতে থাকলেন। বার্ড-স্যাংচুয়ারি এলাকা পর্যন্ত গিয়ে কিছু পাখি দেখবেন এবং তারপর গণনাথ সেন। ততক্ষণে রোদ্দুর ফুটবে।

সামনে কুয়াশার ভেতর একটা ছায়ামূর্তি ফুটে উঠল। এবং ধুপ-ধুপ শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন কর্নেল। সাত্যকি একা ফিরে আসছে। পিউ কি পিছিয়ে গেছে? পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই কর্নেল সকৌতুকে মিলিটারি হাঁক ছাড়লেন, হল্ট।’

সাত্যকি দাঁড়িয়ে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, ও! ফাদার ক্রিসমাস। মর্নিং!

মর্নিং! কর্নেল হাসলেন। আবার কি সঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেললে?

 সাত্যকি দম নিয়ে বলল, শি ইজ ড্যাম টায়ার্ড। কিন্তু আমি যাচ্ছিলুম আপনাকে একটা খবর দিতে।

কর্নেল কৌতুকে বললেন, কোনও ডেডবডির নয় তো?

সিওর।

মাই গড! কী বলছ তুমি? কর্নেল চমকে উঠেছিলেন। ফের বললেন, কোথায় ডেডবডি দেখেছ?

সাত্যকি হাসল। নাহ্। নো ডেডবডি। এগেন আ কার উইথ স্ল্যাশড গ্লাস অ্যান্ড হেভি স্পট অব ব্লাড।

সে কী! কোথায়?

পিউ আপনার জন্য ওয়েট করছে। গো দেয়ার অ্যান্ড সি। পিউয়ের নার্ভ দেখে অবাক হয়ে যাবেন।

সাত্যকি আবার জগিংয়ের ছন্দে পা ফেললে কর্নেল বললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? থানায় নাকি?

সিওর। বলে সাত্যকি ধাবমান হল।

কর্নেল হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। একটু দূর থেকে পিউকে দেখতে পেলেন, ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেলকে দেখে সে সোজা হল। কর্নেল তাকে না ডাকলে চিনতে পারত না।

পিউ ছটফট করে বলল, আবার তা-ই কর্নেল! ওই দেখুন, জামাইবাবুর সেই গাড়িটা জলে পড়েছে। আর এখানে কত রক্ত। দেখুন! দেখুন! অনেক বেশি রক্ত। সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে।

রাস্তা থেকে ঢাল বেয়ে নেমে জলের ধারে গেলেন কর্নেল। গাড়িটার ডানদিকের দরজা খোলা। ভেতরে জল ঢুকেছে। পেছনকার দুপাশের দরজা। আটকানো। কিন্তু প্রায় সমস্ত কাঁচই ভাঙা। কর্নেলের কাছে নেমে গেল পিউ। বলল, গাড়িটা আমার চোখে পড়েছিল। বুড়োদা তো কিছু দেখেও দেখে না। কর্নেল, আমার মনে হচ্ছে, আবার ব্রেক ফেল করেছিল। এবারও কাচ ভাঙা। অদ্ভুত ব্যাপার নয় কর্নেল?

কর্নেল আস্তে বললেন, হুঁ।

 কিন্তু এই গাড়িটা তো পুলিশ সিজ করেছিল, বুড়োদা বলল। এখানে এল কী করে?

কর্নেল জলের কিনারা থেকে ঘাস ও নরম মাটিতে চাকার দাগ অনুসরণ করে রাস্তায় উঠলেন। বললেন, চলে এস, পিউ। রক্তটা দেখা যাক।

পিউ দ্রুত এগিয়ে গেল। রাস্তায় প্রায় তিরিশ মিটার এগিয়ে সে থামল। এই দেখুন, পিচের ওপর কত রক্ত।

অনেকটা জায়গা জুড়ে কালচে রক্তের ছোপ। কর্নেল খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, গাড়িটা আসছিল আমরা যেদিক থেকে এসেছি সেদিক থেকে। ব্রেক ফেল করাটা টের পেয়ে ড্রাইভার এখানেই ঝাঁপ দিয়েছিল।

ড্রাইভার…কর্নেল! বরুণদা নয় তো? পিউ উত্তেজিতভাবে বলল। কাল বরুণদা দিদির সঙ্গে কিন্তু গাড়ি চেপেই দেখা করতে এসেছিল। দিদি বলেছে আমাকে।

তোমার দিদি গাড়িটা দেখেনি?

নিশ্চয় তত লক্ষ করেনি। করলে চিনতে পারত ওর হাজব্যান্ডের গাড়ি। রেগে যেত।

গাড়িটা তো কোম্পানির।

 তাতে কী? বলে পিউ অন্যমনস্কভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। বুড়োদা বলে গেল থানাতেও খবর দেবে। কিন্তু থানা তো দূরে। বাড়ি ফিরে সাইকেল নিয়ে বেরুবে। ওদিকে একটা রাস্তা আছে নাকি একটু শর্টকার্ট করা যায়।

কর্নেল লক্ষ করছিলেন। রক্তের দাগ উল্টোদিকের জঙ্গলের ঢালেও রয়েছে। প্রচণ্ড আহত হয়েছিল লোকটি এবং ঝপ দেবার সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়েনি, এটা তার প্রমাণ। কিন্তু জঙ্গলের দিকে কেন গেল ক্ষতবিক্ষত দেহে?

পিউ বলল, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?

নীচে ঝোপের ভেতর ঘাসে আরও খানিকটা রক্ত। কর্নেল হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে রক্তটা দেখছিলেন। পিউ গিয়ে বলল, সর্বনাশ! নিশ্চয় বরুণদা। অ্যান্ড হি ইজ ডেড।

কিন্তু ডেডবডি কোথায়?

খুঁজলে জঙ্গলে কোথাও পাওয়া যাবে। আসুন, খুঁজে দেখি।

কর্নেল সোজা হয়ে চারদিকটা দেখে নিয়ে বললেন, ব্রেক ফেল করা গাড়ি থেকে যে কঁপ দিয়েছিল, তার আহত অবস্থায় রাস্তাতেই পড়ে থাকার কথা। যদি জ্ঞান থাকে, সে অপেক্ষা করবে সাহায্যের জন্য। কিন্তু এখানে ঝোপের আড়ালে আসবে কেন?

কর্নেল! কোনও জন্তুর কবলে পড়েছিল বরুণদা। এই জঙ্গলে নিশ্চয় জন্তুটন্তু আছে। আপনি কাল ভালুকের কথা বলছিলেন।

ভালুক হিংস্র বটে, মানুষে রুচি নেই ডার্লিং। মাংস জিনিসটা ভালুকের স্বাভাবিক খাদ্য নয়। ভালুক রীতিমতো বাবু। খায় মধু, নানা রকমের ফল এবং বিশেষ করে মহুয়া–যা থেকে এই এলাকায় উৎকৃষ্ট মদ তৈরি হয়। কিন্তু বডিটা খোঁজা দরকার।

ততক্ষণে কুয়াশা কিছুটা ফিকে হয়েছে। কর্নেল বাইনোকুলার বের করে চোখে রাখলেন। একটু পরে বললেন, চলে এস পিউ! আবার একটুখানি অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যাক।

পিউ অনিচ্ছায় পা বাড়াল। জঙ্গলের ভেতর মাঝে মাঝে নানা গড়নের পাথরের চাই। এতক্ষণে পাখিদের মুখ খুলেছে। কুয়াশা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর রাতের ছোপ এখানে ওখানে লেগে আছে। কিছুক্ষণ পরে একটা খোলা জায়গায় অড়হরের খেত দেখা গেল। তারপর একটা রুক্ষ জমি উঁচু হয়ে আছে। হঠাৎ ডানা ঝটপট করে একদল বুনো পায়রা উড়ে গেল। কর্নেল বাইনোকুলারে ঝকটাকে দেখে বললেন, লালঘুঘু ভেবেছিলাম। আমার ব্যাড লাক ডার্লিং!

পিউ মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি সত্যি বড় অদ্ভুত মানুষ।

কেন বলো তো?

 এখন কি পাখি-ফাখি দেখার সময়? বরুণদার জন্য ভাবনা হচ্ছে।

কর্নেল ঘুরে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, কাল সন্ধ্যায় বরুণ সম্পর্কে কথা বলার সময় তোমার টোনটা অন্যরকম ছিল। মনে হচ্ছিল, তুমি তার আসাটা পছন্দ করোনি।

করিনি। কারণ বরুণদা খুব অ্যামবিশাস টাইপ। জামাইবাবুর প্রতি বরাবর জেলাস ছিল। আমি জানি।

কর্নেল হঠাৎ হাত তুলে নাড়তে থাকলেন। তারপর গলা চড়িয়ে বললেন, হ্যাল্লো মিঃ জেভিয়ার! গুড মর্নিং!

পিউ দেখল এই উঁচু জমির ঢালের নীচে খানিকটা জলা জায়গা ঘন দামে ঢাকা! তার ওধারে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই পাগলাসায়েব বেলিং টন জেভিয়ার। তাদের দেখছেন। পিউ আস্তে বলল, কর্নেল। প্লিজ অ্যাভয়েড হিম। লোকটাকে দেখলেই আমার কেমন ভয় করে। তাছাড়া এখন ওর পাগলামি দেখার মুড নেই।

কর্নেল বললেন, চলে এস ডার্লিং। জেভিয়ারসায়েবের গোলাপবাগান দেখলে অবাক হয়ে যাবে।

কী অদ্ভুত আপনার কথাবার্তা! এখন আপনি গোলাপ-টোলাপ নিয়ে…আরও বিরক্ত হয়ে পিউ থেমে গেল।

জেভিয়ার নিষ্পলক চোখে তাকিয়েছিলেন। তার হাতে সেই ধারালো কাটারি। কর্নেল কাছে গিয়ে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! উই কেম টু সি ইওর লাভলি রোজ গার্ডেন। শি ইজ ভেরি মাচ ইন্টারেস্টেড, ইউ সি!

জেভিয়ার একটু হাসলেন। ঝুট! বিলকুল ঝুট স্যার। আই অ্যাম সরি– লেকিন হম সমঝ গেয়া, ইউ আর আ গুড ট্র্যাকার।

আই কুড নট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট।

জেভিয়ার চোখ নাচিয়ে বললেন, দা কার স্যার। অ্যান্ড দা ব্লাড। হাঁ, দা। ম্যান ওয়াজ সিরিয়াসলি উন্ডেড। কিচনি উসকো উঠাকে লে গেয়ি। ম্যয় রাতভর ঘুমতে রহে। দেখুকার ভাগা! হোয়াট ক্যান আই ডু? লেংড়া বুঢ়ঢ়া আদমি। বাট আই ট্রায়েড টু সেভ হিম। লেকিন উও কিতনি…..সরি স্যার! আই মাস্ট নট টক মোর।

কর্নেল চুরুট কেস বের করলেন। আস্তে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! ডু ইউ নোট দ্যাট ইওর ডটার ওয়াজ মার্ডার্ড?

মার্ডার্ড! জেভিয়ার জোরে মাথা নাড়লেন। ও নো, নো। শি হ্যাড কমিটেড সুইসাইড।

মিঃ জেভিয়ার, শি ওয়াজ ব্লুট্যালি মার্ডার্ড।

জেভিয়ারের হাত কাঁপছিল, যখন একটা চুরুট তুলে নিলেন। কর্নেল তারটা ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটা ধরালেন। তারপর জেভিয়ার কাসতে কাসতে বললেন, আর ইউ আ ডিটেকটিভ অফিসার?

নো। বাট আই ওয়ান্ট টু ফাইন্ড আউট দা ট্রুথ।

ইউ আর আ রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। কর্নেল। ইজ ইট?

ইয়া।

হোয়াস্ ইওর ইন্টারেস্ট দেন?

জাস্ট আ হবি। আই লাইক টু স দা মিট্রি।

জেভিয়ার হাসবার চেষ্টা করে বললেন, প্লিজ স্যার, ডোন্ট ট্রাই টু ইনভলভ মি ইন ইওর ডেঞ্জারাস হবি। লড়কি! তুম কভি ইনকা সাথ মাত ঘুমো! কিচনি ইজ ওয়াচিং য়ু! ভাগো!

বলে জেভিয়ার ক্রাচে ভর করে পা বাড়ালেন। কর্নেল বললেন, মিঃ জেভিয়ার! ইওর ডটার রোজি ওয়াজ রিয়্যালি মার্ডার্ড! দা কিলার হ্যাভ পুশড হার ফ্রম রুম্ অব দা ক্লিফটন-হাউস।

জেভিয়ার ঘুরে চোখ কটমট করে বললেন, গো অ্যাওয়ে! গো অ্যাওয়ে! তারপর জঙ্গলের ভেতর উধাও হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে তার আন্দোলিত ধূসর টুপিটি অদৃশ্য হল গাছপালার আড়ালে।

পিউ বলল, অদ্ভুত লোক। মনে হচ্ছে, অনেক কিছু জানেন। অথচ বলবেন না। পাগলামি!

কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিয়ে আস্তে বললেন, এস।

ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জের একটা বিচ্ছিন্ন টুকরোর মতো ঘিঞ্জি বসতি দেখা যাচ্ছিল। একটা গির্জা, পোড়ো এবং ভাঙাচোরা কিছু ইটের বাড়ি ঘিরে যথেচ্ছ। জঙ্গল। পিউ ফেস করে বলল, আমি টায়ার্ড।

ডার্লিং, তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।

 প্লিজ! আর জোক করবেন না। সত্যি আমার কিছু ভাল লাগছে না আর!

জেভিয়ার সায়েবের গোলাপবাগান দেখলে আবার পৃথিবীকে ভাল লাগবে।

পিউ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আপনি কি পাগলাসায়েবের বাড়িতে যাচ্ছেন? কিন্তু সে তো ওদিকে কোথায় চলে গেল।

আমরা ট্রেসপাস করব।

পিউ আর কোনও কথা বলল না। কর্নেলকে অনুসরণ করল। যেতে যেতে সে পিছু ফিরে দেখছিল জেভিয়ার তাদের দিকে লক্ষ রেখেছেন কি না। তার অস্বস্তি হচ্ছিল। জেভিয়ারের হাতের কাটারিটা তার মনে পড়ছিল।

একটা জরাজীর্ণ বাংলোবাড়ি। তিনদিকে ভাঙা ইটের পাঁচিলের বুকে ঘন ঝোপ বেড়ার কাজ করছে। বসতির একটেরে এই বাড়িটা। কুয়াশা ভেঙে আবছা হলুদ খানিকটা রোদ গড়াচ্ছে। চারদিক খাঁ খাঁ নিঝুম। কর্নেল শিশিরে ভেজা ঝোপ গলিয়ে বাড়িটাতে ঢুকলেন। পিউ একটু দ্বিধার ভঙ্গিতে ঢুকল। ছোট্ট চত্বর জুড়ে গোলাপবাগান হঠাৎ রক্তাক্ত দেখাল তার চোখে। সে ফিসফিসিয়ে উঠল, যদি পাগলাসায়েব এসে পড়ে?

কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, জেভিয়ার এখন ড্যামের রাস্তায় উঠেছেন। মনে হচ্ছে গাড়িটার কাছেই যাচ্ছেন। কাজেই তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

কিন্তু আপনি এখানে এলেন কেন?

তোমাকে গোলাপবাগান দেখাতে। কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন। তুমি এই গোলাপবাগানে দাঁড়িয়ে হতভাগিনী রোজিকে খুঁজে বের করো, পিউ! আমি আসছি। জেভিয়ারকে যদি দেখতে পাও, আমাকে ডাকবে।

আমার কিন্তু ভয় করছে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

 রোজির সঙ্গে আলাপ করো। এখনই আসছি।

কর্নেল এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বারান্দায় উঠলেন। পাশাপাশি দুটো ঘর। বারান্দার খানিকটা বেড়া দিয়ে কিচেন করা আছে। টিনের দরজাটা বন্ধ। অরীন্দ্রের সঙ্গে এসে জেনেছিলেন কোন ঘরটায় রোজি থাকত। সেই ঘরের দরজায় জীর্ণ মরচে ধরা সাধারণ একটা তালা ঝুলছে। কর্নেলের হাতে দস্তানা। কয়েকবার মোচড় দিলে তালার বদলে একটা কড়া উপড়ে এল। ভেতর থেকে ভ্যাপসা গন্ধ বেরিয়ে ধাক্কা দিল। জেভিয়ার তার মেয়ের ঘরে ঢোকেন না মনে হচ্ছে। কষ্ট পাবেন বলেই কি? কর্নেল পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে জ্বাললেন। একটা লোহার খাটে ঝুলকালিতে ময়লা বিছানা। একটা ছোট্ট টেবিল, দুটো চেয়ার। সবই ধুলোময়লায় নোংরা। কোনার দিকে ইটের ওপর বসানো, একটা কালো তোরঙ্গ। দেয়ালের ব্র্যাকেটে ঝুলছে কয়েকটা পোশাক। টেবিলের ড্রয়ার টেনে দেখলেন একগাদা টুকিটাকি জিনিস, কিছু চিঠি, একটা নোটবই। নোটবইটার পাতা ওল্টাতে গিয়ে একটা ভাজ করা হলদে কাগজ পেলেন। কাগজটা ইংরেজিতে লেখা একটা চিঠি। তলায় নামের বদলে একটা হরফ মাত্র।

চিঠিটা সম্বোধনহীন। জড়ানো, প্রায় দুর্বোধ্য লেখা। কিছু না ভেবেই কর্নেল চিঠি আর নোটবইটা পকেটে ঢোকালেন। তোরঙ্গটা তালা বন্ধ। খুলে দেখার দরকার ছিল। কিন্তু আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না। পাগলাসায়েবের গাল খাওয়ার ভয়ে কেউ নাকি বাড়ির ত্রিসীমানায় আসে না। তবু কিছু বলা যায় না। দেখলে হইচই বাধাবে।

বাইরে থেকে পিউ চাপাস্বরে ডাকছিল, কর্নেল! কর্নেল!

বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে কড়াটা ঘেঁদা দিয়ে ঢুকিয়ে চাপ দিলেন কর্নেল। আগের মতো আটকে গেল। তারপর বারান্দা থেকে নেমে একটু হেসে বললেন, কিচনি দেখতে পাচ্ছ কি?

পিউ তেতো মুখে বলল, দিস ইজ টু মাচ। একটা লোক আমাকে দেখে গেল।

দেখলেও কিছু ভাববে না। ইউ লুক মেমসায়েব। জেভিয়ারের কোনও আত্মীয় মনে করবে। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে ফের বললেন, অ্যান্ড আই লুক ফাদার ক্রিসমাস। চলো। কেটে পড়া যাক।

খ্রিস্টান বসতি এড়িয়ে সর্যে আর অড়হর ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে একফালি ঝরঝরে রাস্তায় পৌঁছে পিউ বলল, গোয়েন্দাগিরি করে নিশ্চয় কিছু ব্লু পেলেন?

কে জানে ক্লু কি না। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, তবে আমার থিওরি হল, এক পা এগোনোর আগে দু’পা পিছোনো। তুমি কোনও উঁচু জায়গায় উঠতে হলে পিছিয়ে এসে দৌড় দাও। পিউ, সব ঘটনার খাঁটি ব্যাখ্যা পেতে হলে ঘটনার পিছনদিকটা খুঁজতে হয়। আমার স্টার্টিং পয়েন্ট হল রোজি।

পিউ চুপ করে থাকল। এতক্ষণের উত্তেজনা তাকে এবার যথেষ্ট ক্লান্ত। করেছে।

চারুভবনের গেটে সাবর্ণী দাঁড়িয়েছিল। কর্নেলকে দেখে এগিয়ে এল। ব্যস্তভাবে বলল, বরুণ গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে আছে। সাত্যকি খবর দিল। ভগীরথ রিকশো ডাকতে গেছে।…

.