পিছনে পায়ের শব্দ – ৬

০৬.

ফোন রেখে মোহনলাল চেয়ারে হেলান দিলেন। চোখ বন্ধ। বাঁহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে কপাল টিপে ধরলেন। টেবিলের সামনে ফাইল হাতে প্রসাদজি দাঁড়িয়েছিলেন। একটু কাশলেন। তখন মোহনলাল চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, আধা ঘন্টা বাদ আইয়ে ভাই! ঔর দেখিয়ে…নেহি! আপ যাইয়ে! আধা ঘণ্টেকি বাদ।

সিনিয়র ক্লার্ক প্ৰসাদজি বিরক্তি চেপে চলে গেলেন। এতক্ষণ ফোনে একতরফা বাতচিত শুনে আঁচ করেছিলেন, কোথাও কী একটা ঘটেছে। আবার কোনও খতরনাক। এ কোম্পানিতে খতরনাক লেগেই আছে। কিন্তু পাঁচটা বাজে। আরও আধ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখল মালিক। একটা জরুরি কাজ ছিল।

মোহনলাল ফোন তুলে ইন্টারন্যাল ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন, দত্ত? একবার আসবেন? হ্যাঁ। এখনই। ওঁকে একটু বসতে বলুন। দিস ইজ ইমপর্ট্যান্ট।

একটু পরে বরুণ দত্ত হন্তদন্ত ঢুকল। মুখে উজ্জ্বল হাসি। বলল, মজুমদার ট্রেডার্সের কেস প্রায় সেট, লালজি! কনগ্রাচুলেশন পাওনা রইল।

মোহনলাল গম্ভীর হয়ে বললেন, কিন্তু আর এক মজুমদার ঝামেলা বাধিয়েছে! বসুন।

বরুণ বসে বলল, প্রিয় নয় তো?

আবার কে? মোহনলাল টেবিলের সামনে ঝুঁকে এলেন। আমিনগঞ্জ থেকে বনোয়ারি ট্রাঙ্ককলে জানাল, মজুমদার ইজ অ্যারেস্টেড।

বরুণ চমকে উঠল। বলল, কিন্তু এক্সপোর্ট লাইসেন্সটা তো জেনুইন। এগ্রিমেন্ট পেপার্সও জেনুইন।

নাহ্। কোম্পানির কোনও ব্যাপারে নয়। কাকে নাকি মার্ডার করেছে।

বরুণ নড়ে বসল এবং হেসে ফেলল। প্রিয় মার্ডার করেছে? লালজি, দিস ইজ ইমপসিবল! প্রিয়র মাথায় কিছু গণ্ডগোল আছে। কিন্তু আমি জানি, ওর। মতো ভিতু আর কাওয়ার্ড আর একটিও নেই।

আপনার জানা বা আমার জানাতে কিছু যায়-আসে না বরুণবাবু। মোহনলাল হাসবার চেষ্টা করলেন। যাই হোক, তার ব্যাপার সে বুঝবে। বনোয়ারি বলল, ক্লিফটনগঞ্জে তার কোন আত্মীয় আছে। কাজেই আমাদের দিক থেকে কিছু করার দরকার হবে না। কিন্তু মজুমদারের গ্যাপ ফিলআপ করতেই হবে। ডিসেম্বরেই আমিনগঞ্জ ফ্যাক্টরির মাল আশাপুরায় পৌঁছে দিতে হবে, মাইন্ড

বরুণ মনে মনে খুশি হল। বলল, ঠিক আছে। কিন্তু প্রিয়র ব্যাপারটা ডিটেলস কিছু বললেন বনোয়ারিজি?

 কী সব মেয়েঘটিত ব্যাপার। মোহনলাল ড্রয়ার থেকে পানের ডিব্বা বের করে বললেন, এনিওয়ে, ডোন্ট বার অ্যাবাউট হিম। আর একটা কথা। ক্লিফটনগঞ্জ ইরিগেশন বাংলোয় গণনাথবাবু আছে। ফিল্মমেকার। ইউ নো হিম। ওঁর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করবেন। বললেন হি মে প্রসিড উইথ হিজ ওয়ার্ক অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল! দরকার হলে ট্রাঙ্ককলে কথা বলতে বলবেন।

মোহনলাল বাঙালির মতোই বাংলা বলেন। কথা শুনলে বোঝা যায় না তিনি অবাঙালি। বরুণ উঠে দাঁড়ালে ফের বললেন, ক্যাশে যান। বলে দিচ্ছি। টাকাকড়ি যা দরকার মনে করেন, নেবেন। আর….এক মিনিট। গণনাথবাবুর জন্য কিছু টাকা নিয়ে যান। একটু বেশি ক্যাশমানি হবে। ডোন্ট ওরি! স্যুটকেসের ভেতর সাবধানে রাখবেন। আপনি আগে যাবেন ক্লিফটনগঞ্জে এবং গণনাথবাবুকে টাকাটা দেবেন। ইরিগেশন বাংলোয়। কেমন তো! তারপর বাসে চলে যাবে আমিনগঞ্জ। বনোয়ারিকে বলে দিয়েছি, আপনি যাচ্ছেন।

বরুণ একটু ইতস্তত করে বলল, ভাবছিলুম গাড়ি নিয়ে যাব।

না। সঙ্গে এত টাকা নিয়ে গাড়ি নয়। রিভলভিং চেয়ারসুদ্ধ ঘুরে মোহনলাল পেছনের ছোট্ট আয়রন চেস্ট খুললেন। গাড়ি আপনি পেয়ে যাবেন আমিনগঞ্জে। মজুমদার যে গাড়িটা নিয়ে গেছে, সেটা নাকি অ্যাকসিডেন্ট করে কোন গ্যারেজে আছে। আপনাকে তো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে ওখানে। কাজেই ওই গাড়িটা আপনি নিয়ে নেবেন। ঠিক আছে?

লালজি! প্রিয়র কাছে কোম্পানির অনেক কাগজপত্র ছিল।

টাকার বান্ডিল ধরা হাতটা তুলে মোহনলাল বললেন, ডোন্ট বার অ্যাবাউট দ্যাট। বনোয়ারি তত বুদ্ধ নয়। যান। আপনার ব্রিফকেস আনুন।

পাঁচটায় ব্র্যাবোর্ন রোডে মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির সদর অফিস থেকে বেরুল বরুণ। হাতের ব্রিফকেসে নগদ প্রায় পঁয়তিরিশ হাজার টাকা। এ টাকাকেই কালো টাকা বলা হয়, সে জানে। কিন্তু এত বেশি ক্যাশ টাকা সঙ্গে নিয়ে সে কখনও ঘোরেনি। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। লিফট থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারে পার্কিং জোনে সে নতুন কেনা লাল মারুতির দরজা খুলল। ব্রিফকেসটা পাশে রেখে গাড়ি স্টার্ট দিল। পেছনে সব গাড়িকেই সন্দেহের চোখে লক্ষ করছিল সে, যেন তাকে ফলো করা হচ্ছে। বারবার জ্যামের বিরক্তিকর বাধা। রেড রোডে পৌঁছে হঠাৎ তার খেয়াল চাপল, ক্যামাক স্ট্রিটে শ্রাবন্তীকে একটুখানি টোকা দিয়ে যাবে। প্রিয়গোপাল সেদিন আভাস দিয়েছিল, কোম্পানির ফিল্ম প্রোডিউসিং ইউনিটটা ফের চালু হচ্ছে। দিয়ে এক্সপেরিমেন্টের একটা তাল। শ্রাবন্তী গণনাথের লেটেস্ট ছবিতে একটা রোল পেয়েছিল, শ্রাবন্তীর নিজের কথায় হাফ-নায়িকা। ছবিটা হিট না করলেও ফ্লপ করেনি এবং শ্রাবন্তী দর্শকের দৃষ্টি কেড়েছে। এবার কি ফুল-নায়িকার চান্স দেবেন তাকে গণনাথ? আনমনে একটু হেসে বরুণ বাঁদিকে গাড়ি ঘোরাল। অভ্যাসমতো সে শিস দিচ্ছিল।

ফিফথ ফ্লোরে লিফট থেকে নেমেই শ্রাবন্তীর বোন সঙ্ঘমিত্রাকে দেখতে পেল বরুণ। বলল, সন্ধ্যাবেলা এমন সেজেগুজে কোথায় বেরুচ্ছিস রে?

সঙ্ঘমিত্রা হালকা হেসে বলল, প্রেম-ট্রেম করতে।

উরে ব্বাস! এরই মধ্যে আওয়াজ দিতে শিখেছিস? ভাল। তোর হবে। বরুণ ওদের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, মক্ষিরানী আছে তো?

আছে। তবে তোমার প্রতীক্ষা করছে না। ওয়েটিং ফর সাম বেচুবাবু!

বরুণ হাসতে হাসতে কলিং বেল টিপল। শ্রাবন্তী প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল। তারপর বলল, ও! তুমি?

বেচুবাবু ভেবেছিলে?

শ্রাবন্তী ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি কী করে জানলে? তারপর সে হাসল। বুঝেছি, মিতু বলেছে। মিতু ফোন ধরেছিল।

বরুণ ঘরে ঢুকে সোফার কোনা ঘেঁসে বসে ব্রিফকেসটা পাশে রাখল। তারপর বলল, বেচুবাবু আসছেন। তার মানে তোমার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে! গণবাবুর নতুন ছবির নায়িকা শ্রাবন্তী গুহ। কনগ্রাচুলেশন!

এখনই হইচই বাধাবে না বলে দিচ্ছি। বসো। আসছি।

চা-ফা খাব না। বরুণ ঘড়ি দেখে বলল, সময় নেই। কপালে অশেষ দুর্ভোগ আছে। তাই একটু হাসিমুখ দর্শন করতে এলুম। মনে হচ্ছে, তোমার শুটিং দেখার সৌভাগ্যে আজ রাতের জার্নির কষ্টটা ভবিষ্যতে পুষিয়ে যাবে।

শ্রাবন্তী সামনাসামনি বসে বলল, কী বলছ বুঝতে পারছি না। তুমি কোথায় যাচ্ছ?

আপাতত ক্লিফটনগঞ্জ।

 সে আবার কোথায়?

 তোমার ডাইরেক্টর-মশাই যেখানে এখন আছেন।

ভ্যাট! জায়গাটা কোথায়?

 বিহারে। পবিত্র গঙ্গাতীরে। সো মাচ আই নো!

তুমি কেন যাচ্ছ সেখানে?

কোম্পানির কাজে। বলে বরুণ সিরিয়াস হল। ওদিকে এক কাণ্ড! প্রিয়, [লাইন মিসিং]

সামান্য। কেন?

বরুণ সোফায় আধশোয়া হয়ে বলল, প্রিয় সঙ্গে বউ আর শ্যালিকাকে নিয়ে গেছে। ক্লিফটনগঞ্জে ওর কে এক আত্মীয় আছে। সেখানে ওদের রেখে কোম্পানির কাজে তার ঘোরার কথা। আজ বিকেলে হঠাৎ খবর এল, ওকে পুলিশ মার্ডারের অভিযোগে অ্যারেস্ট করেছে।

শ্রাবন্তী নড়ে উঠেছিল। চোখ বড় করে বলল, বউকে মার্ডার করেছে?

বরুণ মাথা নাড়ল। তা জানি না। তবে সেইরকম কিছু মনে হচ্ছে।

শ্রাবন্তী তেতো মুখ করে বলল, মনে হচ্ছে কী! তা-ই। সঙ্গে শ্যালিকা ছিল বলছ। চেন তাকে?

হুঁউ। মিতুর বয়সী। ভীষণ স্মার্ট আর সফিস্টিকেটেড টাইপ। বরুণ সিগারেট বের করে একটু হাসল। কিন্তু প্রিয়কে আমি যতটা চিনি, ওর পক্ষে এ একটা অসম্ভব ব্যাপার।

শ্রাবন্তী মাথা নেড়ে বলল, কখনই অসম্ভব নয়। বউ মারার যা হিড়িক পড়েছে আজকাল।

প্রিয়র বউকে তুমি দেখনি। যতটুকু জানি, খুব একটা ক্লিন টাইপ মেয়ে নয়। কিন্তু ভীষণ চালাক। বরুণ সিগারেট জ্বেলে সেন্টার-টেবিল থেকে অ্যাসট্রে টেনে নিল। ওয়েল, তুমি তো অনির্বাণ সোমকে চেন?

নাম্বার ওয়ান রোগ। গুণ্ডা।

বরুণ সোজা হয়ে বসে বলল, আহ, এত বলে না! আনু একটু ফেরোসাস টাইপের বটে, আই এগ্রি। যাই হোক, প্রিয়র বউয়ের প্রাক্তন প্রেমিক অনির্বাণ সোম।

শ্রাবন্তী বাঁকা মুখে বলল, কে কার প্রেমিক তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তবে তোমার ওই অনির্বাণ বস্তুটি কী আমি হাড়ে-হাড়ে জানি। তুমি তো বললে যেখানে যাচ্ছ, গণাদা আছেন। তমি গণাদাকে জিজ্ঞেস কোরো, হু ইজ হি।

বরুণ ভুরু কুঁচকে হাসল। ব্যাপারটা কী বলো তো?

ছাড়ো! শ্রাবন্তী আলতো হাতে চুল গুছিয়ে নিয়ে বলল, আচ্ছা, তুমি যেখানে যাচ্ছ….

ক্লিফটনগঞ্জ।

হুঁ। গণাদা ক্লিফটনগঞ্জে কী করছেন?

ওঁর নতুন ছবির লোকেশন। কী বলছি তুমি বুঝতেই পারছ না। বরুণ চোখে ঝিলিক তুলে চাপা গলায় বলল, আমার কোম্পানি এ ছবির ফাইন্যান্সার। এটুকু বলছি, লোকেশন দেখতে গিয়ে গণনাথ সেনের শুটিংও শুরু হয়ে যাচ্ছে। ওয়েট! কল এসে যাবে শিগগির। বিশেষ করে বেচুবাবু যখন তোমার কাছে আসছেন তখন তুমি রেডি হও।

শ্রাবন্তী খুশি চেপে বলল, পটানোর চেষ্টা করবে না কিন্তু।

বরুণ শুকনো হাসল। গণাবাবু ছাড়া কার সাধ্য তোমাকে পটায়? আমাদের এক ন্যাড়াদা ছিল। পুরনো কী একটা ফিল্মের গান গাইত, চাঁদ তুমি আকাশে থাকো, আমি তোমায় দেখব খালি…অমন চোখ কটমট করে তাকিও না। বিচ্ছিরি লাগছে। নায়িকাদের অমন করে তাকাতে নেই। বলে বরুণ ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়াল।

শ্রাবন্তী বলল, তুমি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছ, না ট্রেনে?

তোমার মাথা খারাপ? কোম্পানির কাজে আমার লাগ্লুটিকে তিন-সাড়ে তিনশো কিলোমিটার চক্কর খাইয়ে প্রাণে মেরে দেব? ট্রেনে।

কটায় ট্রেন?

 সাড়ে নটা।

 দেরি আছে। বসো। কথা আছে।

বরুণ হুকুম মানার ভঙ্গিতে বসল। বলল, হঠাৎ টোন বদলে গেল যে? তোমাকে কিন্তু নার্ভাস দেখাচ্ছে।

শ্রাবন্তী শ্বাস ফেলে আস্তে বলল, তুমি জান গণাদার সঙ্গে ওই গুণ্ডাটা আছে নাকি?

বরুণ একটু অবাক হয়ে বলল, অনির্বাণের কথা বলছ? তুমি হয়তো ভুল করছ শ্রাবন্তী!

তুমি জান কি না বলো।

বরুণ কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, জানি না। কিন্তু ধরো, যদি অনির্বাণ থাকে তুমি কি অফার এলে নেবে না ভাবছ?

শ্রাবন্তী ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল। তারপর বলল, জানি না আমি কী করব।

আনুকে তোমার কেন ভয়?

শ্রাবন্তী কী বলতে যাচ্ছিল, টুং শব্দে কলিংবেল বাজল। সে উঠে গিয়ে আই-হোলে চোখ রাখল। তারপর দরজা খুলে দিল। মিষ্টি হেসে বলল আসুন বেচুদা!

বরুণ বলল, আই হোপ, ইউ আর ক্যারিং আ হেভেনলি মেসেজ বেচুবাবু!

হঃ। বলে বিরাটকায় মানুষ বেচু দাশগুপ্ত সশব্দে বসলেন। ঘোলাটে বড় বড় চোখ তুলে বললেন, স্যানসায়েবের ম্যাসেজ আইছে। অ্যাট ওয়ান্স প্রোসিড উইথ দা হোল ইউনিট। বোঝেন অবস্থা। এখন কারে পামু, কারে না পামু….মালক্ষ্মী। কাইল ভোর ছয়টায় রেডি থেইক্যো। বসুম না! ক্যামেরাম্যান ভোম্বলেরে পাইলে হয়। ওদিকে আমার দুইখান গাড়িই গ্যারেজে। সাতটায় পামু। মালক্ষ্মী! যাই গিয়া।

শ্রাবন্তী ব্যস্ত হয়ে বলল, বসুন। এখানে বসে ফোনে কন্ট্যাক্ট করুন সবার সঙ্গে। অসুবিধে নেই।

অট্টহাসি হাসলেন বেচুবাবু। মালক্ষ্মী! এ সোজা কাম না। ফোনে হইব না। তা ছাড়া আইজ কাইল মাইনষের মুড হইছে অন্যরকম। লোকেশনে যাইয়া শ্যুটিং মানেই ঝামেলা। ইনডোর হইলে একজনেরটা অন্যেরে দিয়া ম্যানেজ করন যায়। মালক্ষ্মী, একটা কথা। গরম কাপড় লইবা। হেভি শীত। ডোন্ট ফরগেট দ্যাট।

তেমনই সশব্দে সোফা মচমচিয়ে উঠে দাঁড়ালেন বেচুবাবু। আর কোনও কথা না বলে সোজা গিয়ে দরজা খুললেন এবং বেরিয়ে গেলেন। শ্রাবন্তী আকস্মিকভাবে ধাক্কা সামলে নিতে পারছিল না। একটু দেরি করেই সে গেল দরজা বন্ধ করতে। বরুণ বলল, ভূমিকম্প! বাস্!

শ্রাবন্তী এতক্ষণে সামলে নিয়েছে। সে আবেগময় হেসে উঠল। তুমি জান, বেচুদা নৌকোয় উঠতেই ক্যামেরাসুদ্ধ নৌকো ডুবে গিয়েছিল?

এবার নৌকার ব্যাপার আছে কি?

আমি গপ্পটাই জানি না এখনও। শ্রাবন্তী চঞ্চল হয়ে বলল। অবশ্য গল্প জানা কোনও ব্যাপার নয়।

সে কী! গপ্প জান না, নায়িকা হবে? হোপলেস!

শ্রাবন্তী কপট ঝাঁঝে বলল, বাজে বকো না! আমি একটু ভাবনায় পড়ে গেলুম।

বরুণ ঠোঁট গোল করে দুবার মৃদু শিস দিয়ে বলল আনুর জন্য তো? আমিও তো যাচ্ছি ওই এরিয়ায় এবং থাকছিও। আমি ওকে ম্যানেজ করতে পারি, ইউ নো দ্যাট? আফটার অল আনু ইজ আ স্পয়েল্ড চাইল্ড! একটু আদর পেলেই নেতিয়ে পড়ে। আরে বাবা। তুমি তো অভিনেত্রী।

শ্রাবন্তী কথায় কান না করে বলল ধুস! বেচুবাবু এমনভাবে এলেন যে মাথা ঠিক রেখে কিছু জিজ্ঞেস করব, সুযোগই পেলুম না। সব কিছুতে ওঁর এই ড্রামাটিক ব্যাপার। তুমি জান? কেউ কোনও ব্যাপারে না বললে উনি তা শুনতেই পান না।

তুমি আমার কথা শুনছ না! বরুণ রাগ দেখিয়ে বলল, তুমি জান তোমার ডাইরেক্টর ভদ্রলোকের ওপর আমার খবরদারির কিছু স্কোপ আছে? আমার বসের কান ভাঙালে ওঁর ছবি করা ডকে উঠবে। তোমাকে দেখাচ্ছি। বলে সে ব্রিফকেসের ডালা খুলে চাপা হাসল। এর ভেতর তোমার গণাদার প্রাণভোমরা। জাস্ট লুক!

সে ব্রিফকেসের ভেতরটা দেখিয়েই বন্ধ করল। শ্রাবন্তী আস্তে শ্বাস ছাড়ল। কোনও কথা বলল না।

বরুণ আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, অতএব তুমি নিশ্চিন্ত হও, আনু ইজ নো প্রবলেম।

এই! শ্রাবন্তী আবার চঞ্চল হল। তুমি ট্রেনে না গিয়ে আমাদের সঙ্গে চলো না!

হুঁ, সেই কথাটাই ভাবছি। বরুণ মুখে চিন্তার ছাপ ফেলে বলল। শুধু একটাই প্রবলেম। অত ভোরে ওঠা!

বেচুদাকে বলব তোমাকে পিক আপ করবেন। শ্রাবন্তী চোখে হাসল। এবং একটু হিন্টও দেব যে…

দিতে পার। ব্যাপারটা তো সত্যি। তোমাদের ছবির জন্য আমিই টাকা নিয়ে যাচ্ছি!

শ্রাবন্তী ব্যস্তভাবে উঠল। তুমি বসো। অফিস থেকে আসছ। একটু কিছু খাও।

এ-মুহূর্তে যা খেতে ইচ্ছে করছে, তা কি পাব?

শার্টআপ! অসভ্যতা কোরো না। শ্রাবন্তী চাপাস্বরে বলল। পাশের ঘরে মা আছেন।

প্লিজ শ্রাবন্তী। নায়িকা হয়ে গেলে তো অ-ধরা হয়ে যাবে চিরকালের মতো!

বরুণ তড়াক করে উঠে শ্রাবন্তীর দুকাঁধে হাত রাখলে শ্রাবন্তী ওকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বরুণ শিস দিতে দিতে জানালার ধারে গেল। বিলিতি আমলের বাড়ি। আসবাবপত্র নতুন পুরনোতে মেশা। একটা ফায়ারপ্লেসও আছে। ওপরে শ্রাবন্তীর বাবার বিশাল পোর্ট্রেট। পাশে বেঁটে চীনা ফ্লাওয়ারভাসে একগাদা ঠাসাঠাসি ফুল। শ্রাবন্তীর বাবা নাকি বিখ্যাত গায়ক ছিলেন। ছবির পাশে ওঁর তানপুরাটা ঠাকুরদেবতার মতো সুদৃশ্য বেদিতে রাখা। বরুণ তানপুরাটা ছুঁতে গেল। অমনি ফোন বাজল। একটু ইতস্তত করে বরুণ এগিয়ে এসে ফোন তুলে সাড়া দিল। কোন মহিলা এই ফোনের নাম্বার জেনে নিয়ে বললেন, প্লিজ হোল্ড অন। ট্রাঙ্ককল।

বরুণ গলা চড়িয়ে ডাকল, শ্রাবন্তী! ট্রাঙ্ককল। শিগগির!

শ্রাবন্তী ছুটে এসে ফোন ধরল। শ্রাবন্তী বলছি। কে? দাদা, বলুন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইমাত্র বেচুবাবু…যাচ্ছি। মর্নিঙে আমরা স্টার্ট করছি। হ্যাঁ, ওকে! ভাববেন না। এই! অমন করে বললে আমি নার্ভাস হয়ে পড়ব….।

বরুণ ব্যস্তভাবে বলল, গণাবাবু? ছেড়ো না। আমি একটু কথা বলব।

শ্রাবন্তীর হাত থেকে সে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে বলল, দাদা! আমি বরুণ বলছি।…হ্যাঁ, উইথ মেসেজ অ্যান্ড মানি….একমিনিট দাদা। শুনলুম প্রিয় নাকি…কী? মাই গড!…সর্বনাশ! হ্যালো, হ্যালো…বরুণ ফোন নামিয়ে শ্রাবন্তীর দিকে ঘুরল। ফাসফেঁসে গলায় বলল, কেটে গেল! পুরোটা শোনা হল না। শ্রাবন্তী, প্রিয় আনুকে মার্ডার করেছে। অফ কোর্স, দিস ইজ আ গুড নিউজ ফর ইউ। বাট….হোয়াই অ্যান্ড হাউ?

শ্রাবন্তীর মন নিজের মধ্যে, দৃষ্টি বরুণের দিকে। দুচোখ ঝলমল করছে। বরুণ ধপাস করে বসে বলল, অবিশ্বাস্য! সামথিং রং এনিহোয়্যার। শ্রাবন্তী বলল, কী ব্যাপার? তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন? বরুণ ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল। গলার ভেতর বলল, আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে।

.