2 of 4

৯৫. ছত্র ও জুতার উৎপত্তি—জমদগ্নি-রেণুকাক্রীড়া

৯৫তম অধ্যায়

ছত্র ও জুতার উৎপত্তি—জমদগ্নি-রেণুকাক্রীড়া

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! শ্রাদ্ধ ও বিবিধ পুণ্যকর্ম্ম উপলক্ষ্যে ছত্র ও উপনযুগল প্রদত্ত হইয়া থাকে। অতএব কোন্ মহাত্মা ঐ ছত্র ও উপানহযুগল প্রদানের প্রথা প্রচলিত করেন, কিরূপে ঐ দুই পদার্থ উৎপন্ন হইল এবং কি নিমিত্তই বা শ্রাদ্ধাদি কাৰ্য্যে উহা দান করা হয়, তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যেরূপে ছত্র ও উপানহযুগলের উৎপত্তি ও দানের প্রথা প্রচলিত হইয়াছে এবং যে নিমিত্ত উহাকে পবিত্র সামগ্রী বলিয়া পরিগণিত করা যায়, তৎসমুদয় বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর।

“পূৰ্ব্বকালে একদা ভগবান্ জমদগ্নি ক্রীড়ার্থ [১] শাসনে শরসন্ধান করিয়া নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিলে তাঁহার পত্নী রেণুকা সেই নিক্ষিপ্ত শরসমুদয় আহরণ করিয়া তাঁহাকে অর্পণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে সেই শর ও জ্যাশব্দে জমদগ্নির কৌতুহল বৃদ্ধি হইতে লাগিল। তখন তিনি বাণনিক্ষেপে নিতান্ত আসক্ত হইয়া অনবরত শরনিকর পরিত্যাগ করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার পত্নী রেণুকাও বারংবার তৎসমুদয় আহরণপূৰ্ব্বক তাঁহাকে প্রত্যর্পণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে মধ্যাহ্নসময় সমুপস্থিত হইল, জমদগ্নি তথাপি শরনিক্ষেপে নিরস্ত হইলেন না। তিনি পূৰ্ব্বের ন্যায় শরপরিত্যাগ করিয়া রেণুকাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘প্রিয়ে! তুমি শীঘ্র শরসমুদয় আনয়ন কর, আমি পুনরায় উহা পরিত্যাগ করিব।’ জমদগ্নি এই আজ্ঞা করিবামাত্র রেণুকা শর আনয়নার্থ ধাবমান হইলেন। একে জ্যৈষ্ঠমাস, তাহাতে আবার মধ্যাহ্নকাল উপস্থিত। পতিব্রতা রেণুকা সেই ভীষণ সময়ে স্বামীর নির্দ্দেশানুসারে গমন করাতে আতপতাপে তাঁহার মস্তক ও পদতল নিতান্ত সন্তাপিত হইল। তখন তিনি অগত্যা অতি অল্পকাল বৃক্ষচ্ছায়ায় দণ্ডায়মান হইয়া পরিশ্ৰমাপনোদন করিলেন এবং পরিশেষে শরসমুদয় গ্রহণপূৰ্ব্বক ভর্ত্তার শাপভয়ে নিতান্ত ভীত হইয়া অতি সত্বর ঘর্ম্মাক্তদেহে কম্পিতকলেবরে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইলেন। তখন জমদগ্নি তাঁহাকে অবলোকনপূৰ্ব্বক ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বারংবার কহিতে লাগিলেন, ‘তোমার এত বিলম্ব হইল কেন?’

জমদগ্নির সূর্য্যসংহার প্রবৃত্তি

‘তখন রেণুকা স্বামীকে নিতান্ত ক্রূদ্ধ দেখিয়া সবিনয়ে কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি আমার প্রতি ক্রূদ্ধ হইবেন না। সূর্য্যকিরণে আমার মস্তক ও পদতল নিতান্ত সন্তপ্ত হওয়াতে আমি বৃক্ষচ্ছায়ায় ক্ষণকাল বিশ্রাম করিয়াছিলাম; তাহাতেই আমার বিলম্ব হইয়াছে।’

“রেণুকা এইরূপে আপনার দুঃখ প্রকাশ করিলে মহাপ্রভাব জমদগ্নি সূর্য্যের প্রতি নিতান্ত ক্রূদ্ধ হইয়া সহধর্ম্মিণীকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘প্রিয়ে! আজ আমি মহাতেজঃপ্রভাবে তোমার দুঃখদাতা প্রদীপ্তকিরণ দিবাকরকে নিপাতিত করিব।’ মহর্ষি এই বলিয়া শরাসন বিস্ফারণপূৰ্ব্বক শর গ্রহণ করিয়া সূৰ্য্যাভিমুখে দণ্ডায়মান হইলেন। তখন সূর্য্যদেব তাঁহাকে যুদ্ধবেশ ধারণ করিতে দেখিয়া ব্রাহ্মণবেশে তাঁহার সমীপে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ভগবন্‌! দিবাকর আপনার কি অনিষ্ট করিয়াছেন? তিনি লোকসমুদয়ের হিতসাধনের নিমিত্তই স্বর্গে অবস্থানপূর্ব্বক স্বীয় কিরণজালদ্বারা ক্রমশঃ রস আকৰ্ষণ করিয়া বর্ষাকালে মেঘমণ্ডলে সমাচ্ছন্ন হইয়া এই সপ্তদ্বীপা পৃথিবীতে সেই রস বর্ষণ করেন। তাহাতেই ওষধি ও লতাসকল পত্ৰপুষ্পযুক্ত এবং জীবগণের প্রাণস্বরূপ অন্ন সমুৎপন্ন হয়। জাতকৰ্ম্ম, ব্রত, উপনয়ন, বিবাহ, গোদান, যজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞান, সম্পত্তিলাভ ও ধনসঞ্চয় প্রভৃতি উৎকৃষ্ট কার্য্যসমুদয় অন্নদ্বারাই সম্পাদিত হইয়া থাকে। আমি আপনার নিকট যাহা কীৰ্ত্তন করিলাম, আপনি তৎসমুদয় বিশেষরূপে অবগত আছেন। অতএব এক্ষণে আমি আপনাকে বিনয় করিয়া কহিতেছি, আপনি সূর্য্যকে নিপাতিত করিবেন না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *