৯৩তম অধ্যায়
উপবাসের অনুকল্প বিধান
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! উপবাসব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণ যদি শ্রাদ্ধে ব্রাহ্মণর্ক্তৃক নিমন্ত্রিত হয়েন, তাহা হইলে তাঁহার ব্রতভঙ্গ করা কর্ত্তব্য, কি শ্রাদ্ধকৰ্ত্তার প্রার্থনাভঙ্গ করা উচিত?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যাঁহারা বেদোক্ত উপবাসব্রত পরায়ণ নহেন, তাঁহারা ব্রাহ্মণের অনুরোধে ব্রতভঙ্গ করিতে পারেন, কিন্তু যাঁহারা বেদোক্ত উপবাসব্রতপরায়ণ হয়েন, তাঁহারা যদি কোন ব্যক্তির অনুরোধে আহার করেন, তাহা হইলে তাঁহাদিগের ব্রতভঙ্গপাপে নিশ্চয়ই দূষিত হইতে হয়।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সামান্য লোকেরা উপবাসকে তপস্যা বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকে। অতএব জিজ্ঞাসা করি, উপবাস কি তপস্যা, না তপস্যার অনুরূপ?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মনুষ্যেরা একমাস ও অর্দ্ধমাস উপবাসকেই তপস্যা বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকে। কিন্তু যে উপবাসদ্বারা শরীর নষ্ট হয়, তাহা প্রকৃত তপস্যা নয়। লোভাদিপরিত্যাগই তপস্যা। ব্রাহ্মণের সর্ব্বদা উপবাসী ও ব্রহ্মচারী হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। মাংসাহার করা শ্রেয়স্কর নহে। তিনি সতত পবিত্র ও সত্যবাক্য উচ্চারণ করিবেন। মুনি হইয়া বেদাধ্যয়ন করা তাঁহার অবশ্য কর্ত্তব্য। তিনি পরিবারপরিবৃত, দানশীল ও ধর্ম্মার্থী হইবেন এবং এককালে নিদ্রা পরিত্যাগ করিবেন। অমৃতাশী, বিঘসাশী ও অতিথিপ্রিয় হওয়া তাঁহার নিতান্ত উচিত।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিরূপ ব্রাহ্মণকে সৰ্ব্বদা উপবাসী, বিঘসাশী ও অতিথিপ্রিয় বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যিনি কেবল প্রাতঃকালে ও সায়ংকালে আহার করেন, অন্যসময় কিছুমাত্র ভোজন করেন না, তিনিই সর্ব্বদা উপবাসী। যিনি কেবল ঋতুকালে ভাৰ্য্যাসম্ভোগ করেন, তিনিই ব্রহ্মচারী বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। যিনি বৃথামাংস ভোজন না করেন, তিনিই অমাংসাশী। যিনি দিবানিদ্রা পরিহার করেন, তিনি নিদ্রাত্যাগী। অতিথি, ভৃত্য প্রভৃতি সকলের আহার হইলে যিনি আহার করেন, তিনি অমৃতাশী বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। যিনি ব্রাহ্মণভোজন না করাইয়া কখনই আহার করেন না, তিনি নিশ্চয়ই স্বর্গলাভ করেন। যিনি দেবতা, পিতৃগণ ও আশ্রিত ব্যক্তিবর্গের ভোজনাবশিষ্ট দ্রব্যদ্বারা আপনার ক্ষুধাশান্তি করেন, তাঁহাকেই বিঘসাশী বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। এই সকল মহাত্মা গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণকর্ত্তৃক সেবিত হইয়া ব্রহ্মলোকে অনন্তকাল বাস করেন এবং তথায় দেবগণ ও পিতৃগণের সহিত আহার ও পুত্রপৌত্রগণের সহিত বিহার করিতে সমর্থ হয়েন।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মনুষ্য ব্রাহ্মণগণকে বিবিধ বস্তু প্রদান করিয়া থাকে, এ স্থলে জিজ্ঞাসা করি, কিরূপ দাতার অর্থ প্রতিগ্রহ করা যাইতে পারে এবং কিরূপ দাতার নিকট প্রতিগ্রহ কৰ্ত্তব্য নহে?”
দানগ্রহণের দোষনির্ণয়—ক্ষুধাক্লিষ্ট ঋষিসংবাদ
ভীষ্ম কহিলেন, “যুধিষ্ঠির! যিনি সাধুব্যক্তির নিকট প্রতিগ্রহ করেন, তিনি অল্পদোষভাগী হয়েন, যিনি অসাধুর নিকট প্রতিগ্রহ করেন, তিনি বহুদোষে লিপ্ত হইয়া থাকেন। ফলতঃ সাধুর নিকট হউক বা অসাধুর নিকট হউক, প্রতিগ্ৰহ করিলেই দোষে লিপ্ত হইতে হয়। এই নিমিত্ত পূৰ্ব্বকালীন অনেক মহাত্মা প্রতিগ্রহে সম্পূর্ণরূপে পরাঙ্মুখ হইয়াছিলেন। এক্ষণে আমি এই উপলক্ষ্যে সপ্তর্ষি-বৃষাদভি-সংবাদনামক এক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“কশ্যপ, অত্রি, বশিষ্ঠ, ভরদ্বাজ, গৌতম, বিশ্বামিত্র ও জমদগ্নি এই সাতজন মহর্ষি এবং দেবী অরুন্ধতী ইঁহারা সমাধিদ্বারা ব্ৰহ্মলোকপ্রাপ্তির অভিলাষে ঘোরতর তপানুষ্ঠানপূৰ্ব্বক পৃথিবী পর্য্যটন করিতেন। ইঁহাদিগের গণ্ডানাম্নী এক কিঙ্করী ছিল। পশুসখনামে একজন শূদ্রের সহিত তাহার বিবাহ হয়। পশুসখও ঐ মহর্ষিদিগের সহিত থাকিয়া সতত তাঁহাদিগের পরিচর্য্যা করিত। ঐ সময় পৃথিবীতে ঘোরতর অনাবৃষ্টি উপস্থিত হওয়াতে মনুষ্যগণ ক্ষুধায় একান্ত কাতর হইয়া অতিশয় দুর্ব্বল হইতে লাগিল।
“পূৰ্ব্বে মহারাজ শৈব্য এক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া ঋত্বিগণকে আপনার এক পুত্র দক্ষিণাস্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন। সেই শৈব্যকুমার এই দুর্ভিক্ষকালে দৈবদুর্ব্বিপাকবশতঃ অকালে প্রাণপরিত্যাগ করিল। মহর্ষিগণ বহুদিন অনাহারনিবন্ধন ক্ষুধায় একান্ত কাতর হইয়াছিলেন। এক্ষণে সেই রাজকুমারকে কালকবলে নিপতিত দেখিয়া আপনাদের প্রাণরক্ষাৰ্থ তাহাকে ভক্ষণ করিবার মানসে স্থালীতে পাক করিতে লাগিলেন। ঐ সময় মহারাজ শৈব্য পথিমধ্যে পরিভ্রমণ করিতেছিলেন। তিনি যদৃচ্ছাক্রমে সেই মহর্ষিগণের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাদিগকে সেই মৃতদেহ পাক করিতে নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন, ‘হে ব্রাহ্মণগণ! আপনারা যদি প্রতিগ্রহ করেন, তাহা হইলে আপনাদিগকে কখনই এই অভক্ষ্য ভক্ষণ করিতে হয় না। আমার অতুল সম্পত্তি আছে। যদি আপনারা আমার নিকট প্রতিগ্রহ করিতে বাসনা করেন, তাহা হইলে আমি অনায়াসে আপনাদিগকে সহস্র অশ্বতর ও সহস্র বৎসসমবেত সহস্র শ্বেত অশ্বতরী, গুরুভার বহনক্ষম স্থূলকায় একলক্ষ শ্বেতবর্ণ বৃষভ, স্থূলকায় সৎকৃপ্রসূত [একবারমাত্র প্রসবকারিণী] একলক্ষ ধেনু, উৎকৃষ্ট গ্রামসমুদয়, ধান্য, বিবিধ সুখাদ্য দ্রব্য, যব, রত্ন ও অন্যান্য দুর্ল্লভ পদার্থসমুদয় প্রদান করিতে পারি। অতএব আপনারা এই অভক্ষ্য ভক্ষণের সঙ্কল্প পরিত্যাগপূৰ্ব্বক আমার নিকট প্রতিগ্রহ করুন। যে ব্রাহ্মণ আমার নিকট যাজ্ঞা করেন, আমি তাঁহাকে প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয় জ্ঞান করি।
“তখন মহর্ষিগণ কহিলেন, ‘মহারাজ! রাজার নিকট প্রতিগ্রহ স্বীকার করিলে আপাততঃ অতিমধুর আস্বাদলাভ হয়, কিন্তু পরিণামে উহা বিষতুল্য হইয়া উঠে। আপনি ইহা বিশেষ অবগত হইয়াও কি নিমিত্ত আমাদিগকে প্রলোভিত করিতেছেন? দেবগণ ব্রাহ্মণদেহ আশ্রয় করিয়া অবস্থান করেন। তপস্বী ব্রাহ্মণগণের শরীর নিতান্ত নিৰ্ম্মল। উঁহারা প্রীত হইলে দেবতারা প্রীতিলাভ করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ যে দিন রাজার নিকট প্রতিগ্রহ করেন, তাঁহার সেই সেই দিবসের সঞ্চিত তপস্যা নিশ্চয়ই ধ্বংস হইয়া যায়। অতএব হে মহারাজ! আপনার মঙ্গললাভ হউক, আপনি যাচকদিগকেই ধন প্রদান করুন।
“ঋষিগণ শৈব্যকে এই কথা কহিয়া সেই পচ্যমান [কৃতপাক-পাককরা] শবমাংস পরিত্যাগপূৰ্ব্বক আহার অন্বেষণার্থ বনমধ্যে প্রস্থান করিলেন।
“ঋষিগণ প্রস্থান করিলে নরপতি শৈব্য মন্ত্রীকে আহ্বান করিয়া সেই মহর্ষিদিগকে প্রত্যহ উড়ুম্বরসকল প্রদান করিতে অনুমতি এ করিলেন। মন্ত্রিগণও বনমধ্যে গমন করিয়া সেই মহর্ষিদিগকে প্রতিদিন বৃহত্তর উড়ুম্বরসকল প্রদান করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিন পরে একদা মহারাজ শৈব্য ভৃত্যদ্বারা সেই মহর্ষিদিগের নিকট সুবর্ণপূরিত বহুসংখ্যক উডুম্বর প্রেরণ করিলেন। মহর্ষি অত্রি সেই উড়ুম্বরসমুদয় গ্রহণমাত্ৰ পূৰ্ব্বাপেক্ষা গুরুতর বোধ করিয়া তৎসমুদয় গ্রহণে পরাঙ্মুখ হইয়া কহিলেন, আমরা নিতান্ত বিবেকশক্তিবিহীন, অসাবধান বা একান্ত মূর্খ নই। এই উড়ুম্বর সমুদয়ের মধ্যে যে সুবর্ণ নিহিত হইয়াছে, তাহা অবগত হইয়াছি। ইহা গ্রহণ করিলে পরিণামে আমাদের বিলক্ষণ অনিষ্ট ঘটিবে। যাহারা ইহলোকে ও পরলোকে সুখ প্রার্থনা করে, তাহাদিগের পক্ষে ইহা গ্রহণ করা কোনক্রমেই বিধেয় হইতে পারে না।’
বশিষ্ঠাদি ঋষিগণের দানগ্রহণে উপেক্ষা
“বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘আমরা একটি নিষ্ক [স্বর্ণমুদ্রা] গ্রহণ করিলে আমাদের শত সহস্র নিষ্কগ্রহণের পাপ জন্মে। অতএব বহু নিষ্ক গ্রহণ করিলে আমাদিগকে নিশ্চয়ই অধোগতিলাভ করিতে হইবে।
“কশ্যপ কহিলেন, ‘এই ভূমণ্ডলে ধান্য, পশু, স্ত্রী ও হিরণ্য [স্বর্ণ] প্রভৃতি যেসমুদয় পদার্থ বিদ্যমান রহিয়াছে, তৎসমুদয় একজনের হস্তগত হইলেও তাহার তৃপ্তিলাভ হয় না; অতএব শান্তিগুণ অবলম্বন করাই অবশ্য কর্ত্তব্য।
“ভরদ্বাজ কহিলেন, ‘মনুষ্যের আশার ইয়ত্তা নাই। রুরুমৃগের শৃঙ্গ উদ্গত হইলে সেই মৃগের সহিত শৃঙ্গ যেমন দিন দিন পরিবর্দ্ধিত হয়, তদ্রূপ মনুষ্যের আশাও ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইয়া থাকে।
“গৌতম কহিলেন, ‘মনুষ্যের আশা সমুদ্রতুল্য। এক ব্যক্তি পৃথিবীস্থ সমুদয় পদার্থ গ্রহণ করিলেও তাহার আশা পরিপূর্ণ হয় না।’
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, ‘মনুষ্যের একটি প্রার্থনা সফল হইলেই তৎক্ষণাৎ অপর কামনা তাহাকে আক্রমণ করে।’
“জমদগ্নি কহিলেন, ‘যে ব্রাহ্মণ প্রতিগ্রহে পরাঙ্মুখ হয়েন, তাঁহারই তপস্যা অক্ষয় হয়; কিন্তু যাঁহারা প্রতিগ্রহ করেন, তাঁহাদিগের তপস্যা অচিরাৎ বিনষ্ট হইয়া যায়।’
“অরুন্ধতী কহিলেন, “কেহ কেহ ধর্ম্মার্থ দ্রব্যসঞ্চয় করা কর্ত্তব্য। বলিয়া নির্দ্দেশ করেন; কিন্তু আমার মতে দ্রব্যসঞ্চয় অপেক্ষা তপঃসঞ্চয়ই শ্রেয়স্কর।
“গণ্ডা কহিল, আমার প্রভুগণ পরমতেজস্বী হইয়াও যখন প্রতিগ্ৰহ করিতে ভীত হইতেছেন, তখন আমি যে উহাতে ভীত হইব, তাহার আর সন্দেহ কি?
“পশুসখ কহিল, ধৰ্ম্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ধন আর কিছুই নাই লোভাদির বশীভূত হইলে কখনই ঐ ধন লাভ করা যায় না। ব্রাহ্মণই ঐ ধনপ্রাপ্তির উপায় অবগত আছেন। অতএব সেই ধৰ্ম্মরূপ ধনপ্রাপ্তির উপায় শিক্ষা করিবার নিমিত্ত আমি ব্রাহ্মণগণের সেবাতে নিযুক্ত ও অনুগত হইব।
“এইরূপে সকলের বাক্য সমাপ্ত হইলে মহর্ষিগণ একবাক্য হইয়া কহিলেন, ‘যিনি গোপনে এই উড়ম্বরসমুদয়ের মধ্যে সুবর্ণ নিহিত করিয়া আমাদের নিকট প্রেরণ করিয়াছেন, তাঁহার দানের মঙ্গল হউক।’ ”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রতপরায়ণ ঋষিগণ এই কহিয়া সেই সুবর্ণপূরিত উডুম্বরফলসমুদয় পরিত্যাগপূৰ্ব্বক স্থানান্তরে গমন করিলেন।
দানগ্রহণে বাধ্য করার জন্য অভিচারক্রিয়া
“তখন সেই মন্ত্রিগণ মহারাজ শৈব্যের নিকট সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! ব্রাহ্মণগণ সেই ফলসমুদয়ের মধ্যে গোপনে সুবৰ্ণ নিহিত অবগত হইয়া ফল পরিত্যাগপূৰ্ব্বক অন্যত্র গমন করিয়াছেন।’ মন্ত্রিগণ এই কথা কহিলে নরপতি শৈব্য মহর্ষিগণের প্রতি নিতান্ত ক্রূদ্ধ হইয়া তাঁহাদের অনিষ্টসাধনবাসনায় গৃহে গমন করিলেন এবং তথায় অতিকঠোর নিয়ম অবলম্বনপূর্ব্বক আভিচারিক মন্ত্র উচ্চারণপুরঃসর তাঁহাদের প্রত্যেকের নামোল্লেখ করিয়া আহবনীয় অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। আহুতিদান সমাপ্ত হইলে সেই হুতহুতাশন হইতে এক ভীষণমূৰ্ত্তি রাক্ষসী সমুৎপন্ন হইল। তখন নরপতি বৃষাদভি তাহাকে যাতুধানী এই সংজ্ঞা প্রদান করিলেন। কালরাত্রিস্বরূপা যাতুধানী হুতাশন হইতে সমুত্থিত হইয়াই নরপতিসমীপে গমনপূর্ব্বক কৃতাঞ্জলিপুটে কহিল, ‘মহারাজ! আমাকে কোন্ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন।
“তখন শৈব্য তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘যাতুধানি! তুমি শীঘ্র অত্রি, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, ভরদ্বাজ, গৌতম, বিশ্বামিত্র ও জমদগ্নি এই সাত ঋষি, অরুন্ধতী এবং তাহাদের দাস পশুসখ ও দাসী গণ্ডার নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাঁহাদের নাম ও নামানুরূপ কার্য্য অবগত হইয়া তাঁহাদিগকে বিনাশ কর। তাঁহারা সকলে বিনষ্ট হইলে তোমার যে স্থানে ইচ্ছা গমন করিও।’ রাজা শৈব্য এই কথা কহিলে, যাতুধানী তাঁহার বাক্যে স্বীকার করিয়া, যে বনমধ্যে ঋষিগণ পরিভ্রমণ করিতেছিলেন, তথায় গমন করিল।
খাদ্যাভাবে ঋষিগণের পরস্পর দুঃখপ্রকাশ
“ঐ সময় অত্রিপ্রমুখ মহর্ষিগণ সেই বনমধ্যে ফলমূল ভক্ষণ করিয়া বিচরণ করিতেছিলেন। তাঁহারা ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিতে করিতে হঠাৎ একজন স্থূলাঙ্গ সন্ন্যাসীকে একটি পীবরতনু [স্থূলদেহ] কুক্কুর লইয়া তথায় আগমন করিতে দেখিলেন। দেবী অরুন্ধতী তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া সপ্তর্ষিগণকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে মহর্ষিগণ! এই সন্ন্যাসী যেমন স্থূল আপনারা কখনই এরূপ হইতে পারিবেন না।’
“তখন মহর্ষি বশিষ্ঠ অরুন্ধতীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘প্রিয়ে! সায়ংকাল ও প্রাতঃকালে যথানিয়মে অগ্নিহোত্রে আহুতি প্রদান করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য। এক্ষণে তাহার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম হওয়াতেই আমি যারপরনাই দুঃখিত আছি। কিন্তু এই ব্যক্তি তাদৃশ দুঃখ অনুভব করিতেছে না, এই কারণে ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ বিলক্ষণ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।
“অত্রি কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমার যেমন খাদ্যদ্রব্যসমুদয় নিতান্ত অসুলভ, ক্ষুধা অতিমাত্র পরিবর্দ্ধিত এবং বেদজ্ঞান বিলুপ্ত হইয়াছে, ইহার সেরূপ হয় নাই; এই কারণেই ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।’
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, ‘ভদ্রে! শাস্ত্রানুসারে ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতে সমর্থ হইতেছি না এবং ক্ষুধাপ্রভাবে যারপরনাই কাতর, একান্ত অলস ও এককালে জ্ঞানশক্তিবিহীন হইয়াছি; কিন্তু এই ব্যক্তির কোন অংশে কিছুমাত্র অপচয় হয় নাই, এই কারণে ইহার ও ইহার এই কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।
‘জমদগ্নি কহিলেন, ভদ্রে! আমাকে যেমন বার্ষিক [এক বৎসরের উপযুক্ত খাদ্য চাউল] তণ্ডুল ও কাষ্ঠসঞ্চয় করিবার নিমিত্ত নিরন্তর চিন্তা করিতে হয়, ইহাকে তদ্রূপ কষ্ট স্বীকার করিতে হয় না; এই কারণেই ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।
“কশ্যপ কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমার চারি সহোদর উদরান্নের নিমিত্ত দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করাতে আমি যারপরনাই কষ্ট পাইতেছি, কিন্তু এই ব্যক্তিকে সেরূপ কষ্টভোগ করিতে হয় না; এই কারণেই ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।
“ভরদ্বাজ কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমার যেমন ভাৰ্য্যাপবাদনিবন্ধন যৎপরোনাস্তি শোক উপস্থিত হইয়াছে, ইহার সেরূপ হয় নাই; এই কারণেই ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।
“গৌতম কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমার কুশরজ্জুনির্ম্মিত ও রঙ্কুরোম[মেষলোম]প্রস্তুত তিনখানি মাত্র বস্ত্র আছে, তাহাও আবার তিন বৎসর ব্যবহৃত হওয়াতে নিতান্ত জীর্ণ হইয়া গিয়াছে, কিন্তু আমার ন্যায় ইহার বস্ত্রের কষ্ট উপস্থিত হয় নাই; এই কারণেই ইহার ও ইহার কুক্কুরের দেহ হৃষ্টপুষ্ট হইয়াছে।’
ঋষিগণের অগ্নিকুণ্ডোত্থিত রাক্ষসীর দর্শন
“তাঁহারা পরস্পর এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এই অবসরে সেই স্থূলকলেবর সন্ন্যাসী কুক্কুরের সহিত তাঁহাদিগের সন্নিহিত হইয়া ন্যায়ানুসারে তাঁহাদের প্রত্যেকের করস্পর্শ করিলেন। পরে তাঁহারা সেই সন্ন্যসীকে কহিলেন, এই বনমধ্যে আহার-সামগ্রী তাদৃশ সুলভ নহে, এক্ষণে আইস, আমরা সকলে সমবেত হইয়া যাহাতে আহারদ্রব্য আহরণ করিতে পারি, তদ্বিষয়ে যত্নবান হই।
“তাহারা এইরূপ কৃতনিশ্চয় হইয়া ইতস্ততঃ ফলমূল আহরণ, করিয়া সেই বনমধ্যে বিচরণ করিতে লাগিলেন। একদা তাঁহারা সেই অরণ্যে স্বেচ্ছানুসারে পরিভ্রমণ করিতেছেন, এই অবসরে নিৰ্ম্মল সলিলপরিপূর্ণ, বিবিধ-জলচর-বিহঙ্গসমাকীর্ণ, কর্দ্দমশূন্য, তীর্থসম্পন্ন [তীর্থতুল্য পবিত্রতাযুগ], তরুণসূর্য্যসঙ্কাশ, কমলদলে সমলঙ্কৃত, বৈদূর্য্যমণি সমবর্ণ, পদ্মপত্রে সুশোভিত একটি রমণীয় সোবর তাঁহাদের নেত্রপথে নিপতিত হইল। ঐ সরোবরে প্রবেশ করিবার একটিমাত্র পথ ছিল। শৈব্যরাজপ্রেরিতা বিকৃতদর্শনা যাতুধানী সেই পথে দণ্ডায়মানা হইয়া উহা রক্ষা করিতেছিল। মহর্ষিগণ সরোবর নিরীক্ষণ করিয়া মৃণাল গ্রহণ করিবার নিমিত্ত সন্ন্যাসীর সহিত তথায় গমন করিলেন এবং অচিরাৎ বিকৃতদর্শনা [ভীষণাকুৎসিতা] যাতুধানীকে দর্শন করিয়া কহিলেন, ‘ভদ্রে! তুমি কে, কাহার কোন্ উদ্দেশ্যসাধন করিবার নিমিত্ত একাকিনী এই স্থানে অবস্থান করিতেছ?’
“তখন যাতুধানী কহিল, ‘হে তপোধনগণ! আমি যে হই না কেন, আমার নামগোত্রাদির পরিচয় জিজ্ঞাসা করিবার তোমাদের কিছুমাত্র আবশ্যক নাই। আমি এই সরোবরের রক্ষক, আমার এইমাত্র পরিচয় তোমাদিগের জ্ঞাতব্য।’
রাক্ষসীর নিকট ঋষিগণের ভক্ষণীয় প্রার্থনা
“তখন মহর্ষিগণ কহিলেন, ‘ভদ্রে! আমরা সকলে ক্ষুধায় যারপরনাই কাতর হইয়াছি, আমাদিগের আহারদ্রব্য কিছুমাত্র নাই। এক্ষণে তোমার যদি অভিমত হয়, তাহা হইলে মৃণাল উৎপাটন করিয়া লইয়া যাই।’
“যাতুধানী কহিল, ‘হে তপোধন! অগ্রে তোমরা তোমাদের প্রত্যেকের নাম ও নামের অর্থ কীৰ্ত্তন করিয়া পশ্চাৎ ইচ্ছানুসারে মৃণাল গ্রহণ কর।’
“তখন মহর্ষি অত্রি তাহাকে তাঁহাদের বধার্থিনী যাতুধানী বলিয়া জ্ঞাত হইয়া কহিলেন, “শোভনে! আমি ত্রিকালীন বেদাধ্যয়ননিবন্ধন জাগরণ করাতে রাত্রিকে অরাত্রি অর্থাৎ দিবসের ন্যায় করিয়াছি। আমি যে রাত্রিতে অধ্যয়ন করি নাই, তাহা রাত্রিই নহে এবং আমি লোকসমুদয়কে অৎ (পাপ) হইতে ত্রাণ করিয়া থাকি, এই কারণে আমার নাম অত্রি হইয়াছে।
“যাতুধানী কহিল, ‘হে তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না। তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।
“বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘শোভনে! আমি বসু[অণিমাদি ঐশ্বর্য্য]সম্পন্ন ও সবাসীদিগের [প্রতিবেশীদিগের] মধ্যে শ্রেষ্ঠ, এই নিমিত্ত আমার নাম বশিষ্ঠ হইয়াছে।
‘যাতুধানী কহিল, “তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না, অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।
“কশ্যপ কহিলেন, ‘শোভনে! আমি কশ্য (শরীর) রক্ষা করিয়া থাকি এবং তপঃপ্রভাবে কাশ্য (দীপ্তিমান) হইয়াছি; এই নিমিত্ত আমার নাম কশ্যপ হইয়াছে।’
“যাতুধানী কহিল, ‘তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না; অতএব তুমি এক্ষণে। স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।
‘ভরদ্বাজ কহিলেন, ‘শোভনে! দ্বিজগণের (দেবতা, ব্রাহ্মণ, শিষ্য ও স্ত্রীপুত্র প্রভৃতি পোষ্যবর্গের) অব্যাজে পোষণ করিয়া থাকি; এই নিমিত্ত আমার নাম ভরদ্বাজ হইয়াছে।”
“যাতুধানী কহিল, ‘তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না, অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“গৌতম কহিলেন, ‘শোভনে! আমি জন্মগ্রহণ করিবামাত্র আমার শরীরে গো (কিরণ) দ্বারা তমঃ নিরাকৃত হইয়াছিল, আর আমি গোসমুদয়ের (ইন্দ্রিয়গণের) দমন করিয়াছি, এই নিমিত্ত আমার নাম গৌতম হইয়াছে।
“যাতুধানী কহিল, ‘তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলাম না; অতএব তুমি স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, “শোভনে! বিশ্বদেবগণ আমার মিত্র এবং আমি বিশ্বের মিত্র, এই নিমিত্ত আমার নাম বিশ্বামিত্র হইয়াছে।’
“যাতুধানী কহিল, ‘তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না; অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“জমদগ্নি কহিলেন, “শোভনে! আমি (দেবতাদিগের যোগোপযোগী) অগ্নি হইতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি; এই নিমিত্ত আমার নাম জমদগ্নি হইয়াছে।’
“যাতুধানী কহিল, ‘তপোধন! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না; অতএব তুমি স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“অরুন্ধতী কহিলেন, ‘শোভনে! আমি ভর্ত্তার সহিত অরু (পৃথিবী) ধারণ করি এবং ভর্ত্তার মন অনুরুদ্ধ করিয়া থাকি; এই – কারণে আমার নাম অরুন্ধতী হইয়াছে।’
“যাতুধানী কহিল, ‘তাপসি! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না; অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“গণ্ডা কহিল, ‘শোভনে! গণ্ডধাতুর অর্থ বক্ত্রের একদেশ। আমার গণ্ড উন্নত, এই নিমিত্ত আমার নাম গণ্ডা হইয়াছে।’
“যাতুধানী কহিল, ‘ভদ্রে! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইলাম না; অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
“পশুসখ কহিল, ‘শোভনে! আমি পশুগণকে দর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকি এবং আমি পশুপ্রিয়সখা; এই নিমিত্ত আমার নাম পশুসখ হইয়াছে।’
‘যাতুধানী কহিল, ‘ভদ্র! আমি তোমার নামের অর্থ কিছুমাত্র হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলাম না, অতএব তুমি এক্ষণে স্বচ্ছন্দে সরোবরে অবতীর্ণ হও।’
রাক্ষসীবধ–সংগৃহীত ভক্ষ্যাপহরণে ক্ষোভ
“সন্ন্যাসী কহিলেন, ‘শোভনে! এই সমস্ত মহাত্মা যেরূপ স্ব স্ব নাম অর্থের সহিত নির্দ্দেশ করিলেন, আমি সেইরূপ কখনই সমর্থ হইব না। আমার নাম শুনঃসখসখা।’
“যাতুধানী কহিল, ‘হে তপোধন! তুমি একবার নাম উল্লেখ করাতে আমি অবগত হইতে পারিলাম না; অতএব তুমি পুনরায় তোমার নাম উল্লেখ কর।’
“তখন সন্ন্যাসী কহিলেন, ‘আমি যখন একবার আপনার নামোল্লেখ করিলে তুমি তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলে না, তখন আমি নিশ্চয়ই এই ত্ৰিদণ্ডাঘাতদ্বারা তোমাকে বিনষ্ট করিব। এই বলিয়া সন্ন্যাসী তাহার মস্তকে প্রহার করিবামাত্র যাতুধানী ভূতলে নিপাতিত ও তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত হইল। মহাপ্রতাপশালী সন্ন্যাসী এইরূপে সেই রাক্ষসীকে সংহারপূৰ্ব্বক পৃথিবীতে ত্ৰিদণ্ড প্রোথিত করিয়া তৃণসমাচ্ছন্ন প্রদেশে উপবেশন করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মহর্ষিগণ, দেবী অরুন্ধতী ও ভর্ত্তার সহিত গণ্ডা বহু পরিশ্রমে মৃণালসমুদয় উৎপাটনপূৰ্ব্বক সরোবর হইতে উত্থিত হইলেন এবং সত্বর সেই মৃণালসমুদয় তীরে অবস্থাপনপূৰ্ব্বক পুনরায় সরোৱরে অবতীর্ণ হইয়া সলিলদ্বারা পিতৃগণের তৰ্পণ করিতে লাগিলেন।
তর্পণ সমাপ্ত হইলে মহিষগণ অরুন্ধতী, গণ্ডা ও পশুসখের সহিত মৃণালভক্ষণের বাসনায় তীরভূমিতে উত্তীর্ণ হইলেন, কিন্তু তথায় সে মৃণালসমুদয় দেখিতে পাইলেন না। তখন তাহারা পরস্পর পরস্পরের উপর আশঙ্কা করিয়া কহিতে লাগিলেন যে, আমরা সকলেই অত্যন্ত ক্ষুধার্ত্ত হইয়াছি; অতএব ইহার মধ্যে কোন নৃশংস দুরাত্মা আমাদিগের সঞ্চিত মৃণালসমুদয় অপহরণ করিল; এক্ষণে আমাদিগের সকলেরই এ বিষয়ে শপথ করা কর্ত্তব্য।’
মৃণাল অপহর্ত্তার প্রতি অত্রি-আদির অভিশাপ
“তখন অত্রি কহিলেন, যে ব্যক্তি এই মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে গোশরীরে পদাঘাত, সূৰ্য্যাভিমুখে মূত্র পরিত্যাগ ও অনধ্যায়ে অধ্যয়ন করুক।’
“বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে কুক্কুরজীবী, যথেচ্ছাচারী সন্ন্যাসী, শরণাগতঘাতক ও কন্যোপজীবী হউক এবং কৃপণের নিকট অর্থ যাজ্ঞা করুক।’
“কশ্যপ কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে সৰ্ব্বত্র সকল প্রকার বাক্যোচ্চারণ, ন্যস্ত ধন অপহরণ, মিথ্যাসাক্ষ্য প্রদান, বৃথামাংস ভোজন, বৃথা দান ও দিবাভাগে স্ত্রীসম্ভোগ করুক।’
“ভরদ্বাজ কহিলেন, ‘যে দুরাত্মা মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে স্ত্রী, গাভী ও জ্ঞাতিগণের প্রতি অধর্ম্ম ব্যবহার, যুদ্ধে ব্রাহ্মণকে পরাজয়, আচার্য্যকে অনাদর করিয়া বেদাধ্যয়ন এবং কক্ষলগ্ন হুতাশনে আহুতিপ্রদানে প্রবৃত্ত হউক।’
“জমদগ্নি কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে জলমধ্যে পুরীষপরিত্যাগ, গোদ্রোহ [গোহিংসা], আপৎকাল ব্যতীত আতিথ্যস্বীকার ও ঋতুকাল ব্যতীত স্ত্রীসম্ভোগ করুক এবং সকলের দ্বেষ্য, ভাৰ্য্যোপজীবী, বান্ধববিহীন ও শত্রুসম্পন্ন হউক।
“গৌতম কহিলেন, “যে ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে বেদ অধ্যয়ন করিয়া পরিত্যাগ, পিতা, মাতা ও গুরুর হিংসা ও সোমবিক্রয় করুক এবং যে গ্রামে একমাত্র কূপ ভিন্ন অন্য জলাশয় নাই, সেই গ্রামনিবাসী শূদ্ৰাপতি ব্রাহ্মণের সমলোকগামী হউক।
“বিশ্বামিত্র কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, তাহার জীবদ্দশাতেই অপর ব্যক্তি তাহার গুরুজন ও ভৃত্যাদি পরিবারবর্গের ভরণপোষণ করুক; তাহার যেন সদ্গতিলাভ না হয়। সে যেন বহুপুত্রসম্পন্ন, অপবিত্র, ব্রাহ্মণাধর্ম্ম, ধনগৰ্ব্বে গর্ব্বিত, কৃষক, মৎসরী ও ক্ষত্রিয় [ভ্রষ্ট-ক্ষত্রিয় প্রভৃতির পুরোহিত] প্রভৃতি অযাজ্যবর্ণের পুরোহিত হইয়া জনসমাজে অবস্থান করে এবং তাহাকে যেন বেতনভুক হইয়া প্রভুর নিকট কপটতাচরণ করিতে হয়।’
“অরুন্ধতী কহিলেন, ‘যে মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে যেন নিয়ত নিন্দা, স্বামীর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ, একাকী সুস্বাদু অন্নভোজন ও জ্ঞাতিগৃহে অবস্থানপূর্ব্বক দিবাবসানে শত্রু ভক্ষণ করে এবং তাহাকে যেন পরপুরুষের উপভোগ্যা ও বীরপুত্রের মাতা হইতে হয়।
‘গণ্ডা কহিল, ‘যে মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে সতত মিথ্যাবাক্যপ্রয়োগ, বন্ধুগণের সহিত বিরোধ, শুল্কগ্রহণপূর্ব্বক কন্যাদান, অন্নপাক করিয়া একাকী ভক্ষণ, চিরকাল অন্যের দাসী হইয়া জীবনধারণ ও জার[উপপতি]সংসর্গে গর্ভধারণ করুক।’
“পশুসখ কহিল, ‘যে ব্যক্তি এই মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে যেন দাসীগর্ভে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক, বহুপুত্রযুক্ত ও দরিদ্র হইয়া দেবতাদিগকে নমস্কার না করে।’
“এইরূপে তাঁহাদের সকলের শপথ সমাপ্ত হইলে সেই কুক্কুরসহায় সন্ন্যাসী কহিলেন, ‘যে ব্যক্তি এই মৃণাল অপহরণ করিয়াছে, সে সমস্ত ব্রহ্মচর্য্য, যজুর্ব্বেদ ও সামবেদবেত্তা ব্রাহ্মণকে কন্যাদান এবং অথৰ্ব্ববেদ অধ্যয়নান্তে স্নান করুক।’
“সন্ন্যাসী এই কথা কহিলে, ঋষিগণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভদ্র! তুমি যাহা যাহা উল্লেখ করিয়া শপথ করিলে, তৎসমুদয়ই ব্রাহ্মণদিগের প্রার্থনীয়; সুতরাং উহাদ্বারা তোমার শপথ করা হয় নাই। অতএব নিশ্চয় বোধ হইতেছে, তুমিই আমাদিগের মৃণাল অপহরণ করিয়াছ।’
ইন্দ্রের আত্মপ্রকাশ—অত্রি-আদির অভিভাষণ
“তখন সন্ন্যাসী কহিলেন, ‘মহর্ষিগণ! আপনারা আমাকে প্রকৃত সন্ন্যাসী বলিয়া জ্ঞান করিবেন না। আমি সুররাজ পুরন্দর, আমি আপনাদিগের মৃণাল অপহরণ করিয়াছি যথার্থ বটে, কিন্তু উহা আত্মসাৎ করা আমার উদ্দেশ্য নহে। আমি আপনাদিগের পরীক্ষার্থ আপনাদিগের সমক্ষেই এই মৃণালসমুদয়ই অন্তর্হিত করিয়াছি। আমি আপনাদিগকে রক্ষা করিবার নিমিত্তই সুরলোক হইতে এ স্থানে উপস্থিত হইয়াছি। ইতিপূর্ব্বে যে স্ত্রীলোকটি এই সরোবরের প্রবেশপথে দণ্ডায়মান ছিল, সে যাতুধানীনামে ভয়ঙ্করী রাক্ষসী। ঐ পাপীয়সী শৈব্যরাজের হোমাগ্নি হইতে সম্ভূত হইয়া তাঁহার আদেশানুসারে আপনাদিগের বিনাশবাসনায় এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছিল। ঐ দেখুন, আমি তাহাকে বিনাশ করিয়াছি। যাহা হউক, এক্ষণে লোভপরাঙ্মুখ হইয়া আপনারা অক্ষয়লোকলাভে অধিকারী হইয়াছেন। অতএব শীঘ্র এ স্থান হইতে গাত্রোত্থান করিয়া সেই সমুদয় ললাকে গমন করুন।’
“সুররাজ আত্মপরিচয় প্রদানপূর্ব্বক এই সকল কথা কহিলে, সেই মহর্ষিগণ, অরুন্ধতী, গণ্ডা ও পশুসখ যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়া ‘তথাস্তু’ বলিয়া ইন্দ্রের সহিত স্বর্গে গমন করিলেন। ঐ মহাত্মারা ক্ষুধার সময় ভোগসুখে প্রলোভিত হইয়াও লোভপরবশ হয়েন নাই; এই নিমিত্তই উঁহাদের স্বর্গলাভ হইয়াছিল। অতএব সকল অবস্থাতেই লোভ পরিত্যাগ করা সকলের অবশ্যকর্ত্তব্য কৰ্ম্ম ও শ্রেষ্ঠধৰ্ম্ম। যে ব্যক্তি সভামধ্যে এই উপাখ্যান কীৰ্ত্তন করে, তাহার নিশ্চয়ই অর্থলাভ হয়, দুঃখের লেশমাত্র থাকে না; ঋষি, দেবতা ও পিতৃগণ তাহার প্রতি পরম আহ্লাদিত হয়েন এবং পরলোকেও তাহার ধৰ্ম্ম, অর্থ ও যশের পরিসীমা থাকে না।”
