৯২তম অধ্যায়
দেব-মানব লোকপরম্পরা শ্রাদ্ধপ্রচার
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষি নিমি এইরূপে সৰ্ব্বপ্রথমে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করিলে ধর্ম্মপরায়ণ যতব্রত মহর্ষিগণ তাঁহার নিদর্শনানুসারে বিধিপূৰ্ব্বক পিতৃগণের শ্রাদ্ধ ও তীর্থজলদ্বারা তাঁহাদিগের তৰ্পণ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে ক্রমে ক্রমে চারিবর্ণের সমুদয় লোকই দেবতা ও পিতৃগণকে অন্নদান করিতে আরম্ভ করিল। তখন দেবতা ও পিতৃগণ অনবরত শ্রাদ্ধভোজননিবন্ধন অজীর্ণরোগে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়া ভগবান চন্দ্রের নিকট গমনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘সুধাকর! আমরা নিবাপান্ন[শ্রাদ্ধের অন্ন]ভোজননিবন্ধন অজীর্ণরোগে বিষম যন্ত্রণাভোগ করিতেছি, অতএব আপনি ইহার উপায়বিধান করুন।’ দেবতা ও পিতৃগণ এইরূপে আপনাদের ক্লেশের বিষয় বিজ্ঞাপিত করিলে ভগবান্ চন্দ্র তাঁহাদিগকে কহিলেন, ‘হে মহাপুরুষগণ! যদি আপনাদিগের শ্রেয়েলাভের বাসনা থাকে, তাহা হইলে আপনারা ব্রহ্মার নিকট গমন করুন, তিনি আপনাদিগের অভিলাষ পূর্ণ করিবেন।’
“ভগবান্ সুধাকর এইরূপ উপদেশ প্রদান করিলে, দেবতা ও পিতৃগণ তাঁহার বাক্যানুসারে সুমেরুশৃঙ্গে সমাসীন সৰ্ব্বলোক পিতামহ ব্রহ্মর নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আমরা নিবাপান্ন ভোজন করিয়া অজীর্ণরোগে নিতান্ত নিপীড়িত হইয়াছি, অতএব আপনি প্রসন্ন হইয়া আমাদিগের শ্ৰেয়োবিধান করুন। তখন ভগবান্ কমলযোনি তাঁহাদিগের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘হে মহানুভবগণ! এই যে মহাত্মা হুতাশন আমার নিকট অবস্থান করিতেছেন, ইনিই। তোমাদিগের মঙ্গলবিধান করিবেন।’
“ভগবান্ ব্ৰহ্ম এই কথা কহিলে মহাতেজস্বী হুতাশন দেবতা। ও পিতৃগণকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘হে মহাপুরুষগণ! অতঃপর আপনারা আমার সহিত সমবেত হইয়া নিবাপান্ন ভোজন করিবেন, তাহা হইলেই আপনাদের অজীর্ণ রোগ দূরীভূত হইবে। মহাত্মা হুতাশন এইরূপে দেবতা ও পিতৃগণের রোগনাশের উপায়বিধান করিলে তাঁহারা অনলের সহিত শ্রাদ্ধভাগ ভোজন করিয়া সুস্থ হইলেন। এই নিমিত্ত শ্রাদ্ধে সর্ব্বপ্রথমে অগ্নিকে ভাগ প্রদান করিতে হয়। যাঁহারা সর্ব্বাগ্রে হুতাশনকে শ্রাদ্ধভাগ প্রদান করেন, ব্রহ্মরাক্ষসগণ তাঁহাদিগের শ্রাদ্ধের বিঘ্ন উৎপাদন করিতে সমর্থ হয় না। যে যজ্ঞে ভগবান অগ্নি অবস্থান করেন, রাক্ষসগণ সেই যজ্ঞ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক দূরে পলায়ন করিয়া থাকে।
“প্ৰথমে পিতাকে পিণ্ডদান করিয়া তৎপরে পিতামহ ও প্রপিতামহকে পিণ্ডদান করা কর্ত্তব্য। শ্রাদ্ধকৰ্ত্তা প্রতি পিণ্ডদানকালেই সাবিত্রী [গায়ত্রীপাঠ] ও ‘সোমায় পিতৃমতে স্বাহা’ ইত্যাদি মন্ত্র উচ্চারণ করিবে। রজঃস্বলা ও ছিন্নকর্ণা স্ত্রীকে শ্রাদ্ধ দর্শন করিতে অনুজ্ঞা ও ভিন্নগোত্রা রমণীকে শ্রাদ্ধের পাককাৰ্য্যে নিয়োগ করা কখনই কর্ত্তব্য নহে। নদী পার হইবার সময় পিতৃগণের তর্পণ ও নামোচ্চারণ করা নিতান্ত আবশ্যক। অগ্রে স্ববংশীয় পিতৃগণের পিণ্ডদান করিয়া পরিশেষে বন্ধু ও আত্মীয়গণের পিণ্ডদান কৰ্ত্তব্য। চিত্রিত গোযুগ[দুইটি গরু]যুক্ত শকট অথবা নৌকায় আরোহণ করিয়া নদী উত্তীর্ণ হইবার সময় সমাহিত হইয়া পিতৃগণের তর্পণ করা নিতান্ত আবশ্যক। অমাবস্যাই শ্রাদ্ধের প্রশস্ত কাল। অতএব ঐ দিনে-শ্রাদ্ধ করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। পিতৃভক্তিপরায়ণ মহাত্মারা নিশ্চয়ই পুষ্টি, আয়ুঃ, বীর্য্য ও শ্রীলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা এবং মহর্ষি পুলস্ত্য, বশিষ্ঠ, পুলহ, অঙ্গিরাঃ, ক্রতু ও কশ্যপ মহাযোগেশ্বর ও পিতৃগণ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন। পিণ্ডদান করিলে পিতৃলোক প্রেতত্ব হইতে বিমুক্ত হয়েন। এই আমি তোমার নিকট শ্রাদ্ধের উৎপত্তি ও শ্রাদ্ধ সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে দানের বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।”
