৯১তম অধ্যায়
মহর্ষি নিমির পুত্রশ্রাদ্ধ—মহর্ষি অত্রির উপদেশ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কোন্ সময়ে কোন্ মহর্ষিকর্ত্তৃক শ্রাদ্ধ কল্পিত হইয়াছে, শ্রাদ্ধ কিরূপ এবং শ্রাদ্ধে কোন্ কার্য্য, কি কি ফলমূল ও কোন্ কোন্ ধান্য নিষিদ্ধ, তৎসমুদয় কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! শ্রাদ্ধ যেরূপ এবং যে সময়ে যাঁহাদ্বারা যেরূপে উহা কল্পিত হইয়াছে, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূর্ব্বে ব্রহ্মার পুত্র অত্রিবংশে দত্তাত্রেয়নামে এক মহর্ষি জন্মগ্রহণ করেন। দত্তাত্রেয়ের নিমিনামে এক তপোবলসম্পন্ন পুত্র ছিলেন। তাঁহার শ্রীমাননামে এক পরমরূপসম্পন্ন পুত্র হইয়াছিল। ঐ পুত্র সহস্র সহস্র অতিকঠোর তপানুষ্ঠান করিয়া কালধৰ্ম্মসহকারে কালকবলে নিপতিত হইলে, মহর্ষি নিমি শোকে একান্ত অধীর হইয়াও শাস্ত্রানুসারে অশৌচাষ্ঠে ক্ষৌরাদি কার্য্য সম্পাদন করিলেন। অনন্তর তিনি চতুর্দ্দশী দিবসে দ্রব্যসামগ্রী আয়োজন করিয়া পরদিন প্রভাতে জাগরিত হইলেন এবং শোকাপনোদন পূৰ্ব্বক চিত্তকে বিষয়ে ব্যাপৃত করিয়া সমাহিতচিত্তে শ্রাদ্ধকার্য্যে অনুধ্যানপুরঃসর [অত্যন্ত শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া] পুত্রের প্রিয় ফল, মূল ও অন্যান্য শাস্ত্রোক্ত উৎকৃষ্ট পদার্থসমুদয় আহরণ করিলেন। তৎপরে পূজ্যতম সাতজন ব্রাহ্মণকে আনয়নপূর্ব্বক স্বয়ং দক্ষিণান্তে কুশসমুদয় সমাস্তীর্ণ করিয়া সেই ব্রাহ্মণগণকে তাহাতে উপবেশন করাইয়া তাঁহাদের পদতলে প্রাদেশপ্রমাণ কুশসমুদয় প্রদানপুরঃসর সঁহাদিগকে লবণবর্জ্জিত শ্যামাকান্ন [শ্যামাশাকযুক্ত অন্ন] ভোজন করাইতে লাগিলেন এবং তাঁহাদের ভোজন সমাপ্ত হইলে পুত্র শ্রীমানের নামগোত্র উল্লেখপূৰ্ব্বক কুশোপরি পিণ্ডদান করিলেন।
“এইরূপে শ্রাদ্ধকার্য্য সম্পাদিত হইলে মহর্ষি নিমি আপনার ধৰ্ম্মসঙ্করবিষয়ে সন্দিহান হইয়া একান্ত ব্যথিতচিত্তে মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন যে, আমি যে কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিলাম, পূর্ব্বে কোন মহর্ষিই এরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করেন নাই। অতএব বোধ হয়, ব্রাহ্মণগণ আমার এই অপরাধনিবন্ধন
আমাকে শাপপ্রদান করিবেন। মহর্ষি মনে মনে এইরূপ আন্দোলন করিয়া স্বীয়
বংশকর্ত্তা অত্রিকে স্মরণ করিলেন। নিমি স্মরণ করিবামাত্র মহাত্মা অত্রি তথায় উপস্থিত হইয়া সেই পুত্রশোকসন্তপ্ত মহর্ষিকে অবলোকনপূৰ্ব্বক আশ্বাস প্রদান করিয়া কহিলেন, ‘বৎস! তুমি যে পিতৃযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছ, ইহাতে ভীত হইবার প্রয়োজন নাই। ব্রহ্মা ভিন্ন আর কোন ব্যক্তিই শ্রাদ্ধবিধি বিহিত করিতে সমর্থ নহেন। এক্ষণে আমি তোমার নিকট ব্রহ্মবিহিত অতি উৎকৃষ্ট শ্রাদ্ধবিধি কহিতেছি, তুমি উহা শ্রবণ করিয়া নিঃসন্দিগ্ধচিত্তে উহার অনুষ্ঠান কর।
অত্রিকর্ত্তৃক শ্রাদ্ধক্রিয়াপ্রদর্শন
‘প্রথমতঃ মন্ত্রোচ্চারণপূৰ্ব্বক অগ্নৌকরণক্রিয়া সম্পাদন করিয়া অগ্নি, সোম ও বরুণদেবকে আহুতি প্রদান করা কর্ত্তব্য। পিতৃলোকের সহিত বিশ্বদেবগণ একত্র অবস্থান করেন, ব্রহ্মা স্বয়ং তাঁহাদিগের ভাগ কল্পনা করিয়াছেন। শ্রাদ্ধকালে শ্রাদ্ধের আধার পৃথিবী, বৈষ্ণবী, কাশ্যপী ও ক্ষমাদেবীকে স্তব করিতে হয়। শ্রাদ্ধোদক আনয়নসময়ে বরুণদেবকে স্তব করিয়া তৎপরে অগ্নি ও সোমদেবের তৃপ্তিসাধন করা কর্ত্তব্য। ব্রহ্মা যে উষ্মপ পিতৃদেবদিগের ভাগ কল্পনা করিয়াছেন, শ্রাদ্ধে সেই পিতৃদেবদিগের অর্চ্চনা করিলে শ্রাদ্ধকৰ্ত্তার পিতৃপিতামহাদি অনায়াসে নরক হইতে মুক্তিলাভ করেন। অগ্নিধাত্তাদি সপ্তসংখ্যক পিতৃগণ স্বয়ম্ভূকর্ত্তৃক কল্পিত হইয়াছেন। পূর্ব্বে যেসমুদয় শ্রাদ্ধভাগাৰ্হ বিশ্বদেবের উল্লেখ করা হইয়াছে, এক্ষণে তাঁহাদিগের সমুদয় নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। বল, ধৃতি, বিপাপ্না, পুণ্যকৃৎ, পাবন, পার্ষ্ণি, ক্ষেম, সমূহ, দিব্যসানু, বিবস্বান, বীর্য্যবান, হ্রীমান্, কীৰ্ত্তিমান, কৃত, জিতাত্মা, মুনিবীর্য্য, দীপ্তিরোমা, ভয়ঙ্কর, অনুকৰ্ম্মা, প্রতীত, প্ৰদাতা, অংশুমান, শৈলাভ, পরম, ক্রোধী, ধীরোঞ্চি, ভূপতি, স্রূজ, বজ্ৰী, বরী, বিদ্যুদ্বর্চ্চা, সৌমবর্চ্চা, সূর্য্যশ্রী, সোম, সূর্য্যসাবিত্র, দত্তাত্মা, পুণ্ডরীয়ক, উষ্ণীনাভ, নভোদ, বিশ্বায়ুঃ, দীপ্তি, চমূহর, সুরেশ, ব্যোমারি, শঙ্কর, ভব, ঈশ, কৰ্ত্তা, কৃতি, দক্ষ, ভুবন, দিব্যকৰ্ম্মকৃত, গণিত, পঞ্চবীর্য্য, আদিত্য, রশ্মিমান্, সপ্তকৃত, সোমবর্চ্চা, বিশ্বকৃত, রবি, অনুগোপ্তা, নগ্ধা ও ঈশ্বর। এই আমি তোমার নিকট বিশ্বদেবদিগের নাম কীৰ্ত্তন করিলাম। ঐ সমুদয় মহাত্মা কালেরও অগোচর।
শ্রাদ্ধে নিষিদ্ধ দ্রব্যাদি
‘এক্ষণে যেসমুদয় দ্রব্য শ্রাদ্ধে নিষিদ্ধ, সেসমুদয় দ্রব্যের উল্লেখ করিতেছি, শ্রবণ কর। কেদ্রব [কেদোধানের চাউল] ও অসম্পূর্ণ তণ্ডুলযুক্ত [অপরিণত ধানের চাউল—ধান না পাকিতে যাহা কাটিয়া আনিয়া চাউল তৈয়ার করা হয়] ধান্য, হিঙ্গু [হিং], পলাণ্ডু [পেঁয়াজ], লশুন, শোভাঞ্জন [সজনা], কোবিদার [রক্তকাঞ্চনের ফল], গৃহাঞ্জন [গাজর], কুষ্মাণ্ড [কুমড়া], অলাবু [লাউ], গ্রাম্য বরাহমাংস, অপ্রেক্ষিত মাংস, কৃষ্ণজীরক, বিড়ঙ্গ, শীতপাকী শাক, বংশাদির অঙ্কুর, শৃঙ্গাটক [পানিফল], সমুদয় লবণ ও জম্বুফল এই সমুদয় শ্রাদ্ধে প্রদান করা অকৰ্ত্তব্য। ক্ষতদূষিত ও নেত্রজলযুক্ত দ্রব্য শ্রাদ্ধে প্রদান করা কদাপি বিধেয় নহে। শ্রাদ্ধ ও যজ্ঞে সুদর্শন শাক প্রদান করিলে পিতৃলোক ও দেবগণ কখনই তদ্দ্বারা পরিতৃপ্ত হয়েন না। শ্রাদ্ধকালে চণ্ডাল, শ্বপাক, কষায়িত, বস্ত্রধারী, কুষ্ঠরোগী, পতিত, ব্রহ্মহত্যাকারী ও সঙ্কর ব্রাহ্মণ উপস্থিত থাকিলে উহাদিগকে তথা হইতে দূরীকৃত করা কর্ত্তব্য।
“হে মহারাজ! মহর্ষি অত্রি স্বীয় বংশোদ্ভব নিমিকে এইরূপ উপদেশ প্রদান করিয়া ব্ৰহ্মসদনে গমন করিলেন।”
