2 of 4

৯০. শ্রাদ্ধীয় দ্রব্যদানের পাত্রপাত্র নিরূপণ

৯০তম অধ্যায়

শ্রাদ্ধীয় দ্রব্যদানের পাত্রপাত্র নিরূপণ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কিরূপ ব্রাহ্মণকে শ্রাদ্ধভাগ প্রদান করা কর্ত্তব্য, তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! দানধৰ্ম্মবিদ ক্ষত্রিয় দানসময়ে ব্রাহ্মণগণের পরীক্ষা করিবেন না বটে, কিন্তু দৈব ও পিতৃকার্য্য উপলক্ষ্যে তাঁহাদিগের পরীক্ষা করা আবশ্যক। মানবগণ দৈবতেজঃসম্পন্ন হইয়া দেবগণের আরাধনা করিয়া থাকেন, কিন্তু শ্রাদ্ধের বিধি সেরূপ নহে। শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণদ্বারা শ্রাদ্ধীয় দেবতা ও পিতৃগণকে পরিতৃপ্ত করিতে হয়। অতএব পণ্ডিতেরা শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণগণের কুলশীল, বয়ঃক্রম, রূপ ও বিদ্যার পরীক্ষা করিবেন।

“ব্রাহ্মণগণের মধ্যে কতকগুলি পংক্তিদূষক [এক পংক্তিতে উপবেশনের অযোগ্য—অপবিত্র] ও কতকগুলি পংক্তিপাবন [এক পংক্তিতে বসিবার যোগ্য—পবিত্র] আছেন। এক্ষণে আমি অগ্রে পংক্তিদূষক ব্রাহ্মণের বিষয় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। প্রতারক, ব্রাহ্মণহত্যাকারী, যক্ষ্মারোগগ্রস্ত, পশুপালক, অধ্যয়নাদিবিহীন, শূদ্রের কিঙ্কর, বুদ্ধিজীবী, গায়ক, সৰ্ব্ববিক্রয়ী, গৃহদাহকর্ত্তা, বিষদাতা, কুণ্ডাশী [জারজের অন্নভোজী], সোমবিক্রেতা, সামুদ্রিকবেত্তা [হস্তরেখাদি বিচারে অর্থোপার্জ্জনকর্ত্তা], রাজদূত, তৈলকার, কূটকৰ্ত্তা [কূটনীতিপরিচালক], পিতৃদ্বেষ্টা, পুংশ্চলীর [ভ্ৰষ্টা রমণীর] স্বামী, নিন্দনীয় চৌর্য্যপরায়ণ, শিল্পজীবী, বহুরূপী, খলস্বভাব, মিত্রদ্রোহী, পারদারিক, শূদ্রের উপাধ্যায়, শাস্ত্রজীবী, মৃগয়ানিরত, কুক্কুরদষ্ট, জ্যেষ্ঠের অনুঢ়াবস্থায় দারপরিগ্রহকারী, অনাবৃতমেঢ্র, গুরুপত্নীহৰ্ত্তা, নষ্ট, দেবল ও গণক, ব্রাহ্মণদিগকে পংক্তিদূষক বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। ব্রহ্মবাদী মহাত্মারা কহিয়া থাকেন, ঐরূপ ব্রাহ্মণগণ শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য ভক্ষণ করিলে উহা রাক্ষসের ভুক্ত হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি যে দিনে শ্রাদ্ধে ভোজন করিয়া বেদাধ্যয়ন বা শূদ্রাগমন করে, তাহার পিতৃগণকে সেই দিন অবধি এক মাস তাহারই পুরীষে শয়ন করিতে হয়। শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য সোমবিক্রয়ী ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত হইলে বিষ্ঠারূপে পরিণত, চিকিৎসক ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত হইলে পূয় ও শোণিতরূপে পরিগণিত, দেবলকে প্রদত্ত হইলে নিষ্ফল, বৃদ্ধিজীবীকে প্রদান করিলে পিতৃগণের অপ্রাপ্ত, বাণিজ্যকারীকে প্রদান করিলে উভয়লোকে নিষ্ফল ও পোনৰ্ভবকে প্রদান করিলে ভস্মাহুত ঘৃতের ন্যায় নিতান্ত নিরর্থক হইয়া থাকে।

“যাহারা প্রমাদবশতঃ অধার্ম্মিক দুশ্চরিত্র ব্রাহ্মণগণকে হব্যকব্য প্রদান করে, তাহারা পরলোকে ঐ দানের ফললাভে বঞ্চিত হইয়া থাকে। আর যাহারা জ্ঞানপূর্ব্বক ঐরূপ ব্রাহ্মণগণকে হব্যকব্য প্রদান করে, তাহাদিগের পিতৃগণকে নিশ্চয়ই পুরীষ ভোজন করিতে হয়। যাহারা শূদ্রদিগকে উপদেশ প্রদান করে, তাহারাও পংক্তিদূষক দ্বিজাধম বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। কাণ [নেত্রহীন] ব্যক্তিরা যে পংক্তিতে উপবিষ্ট হয়, সেই পংক্তির ষষ্টিসংখ্যক ব্রাহ্মণ; ক্লীব যে পংক্তিতে উপবেশন করে, সেই পংক্তির শতসংখ্যক ব্রাহ্মণ এবং শ্বিত্ৰরোগাক্রান্ত ব্যক্তি যে পংক্তিতে উপবেশন করিয়া যেসমুদয় ব্রাহ্মণকে দর্শন করে, তাঁহারা সকলেই দূষিত হইয়া থাকেন। বেষ্টিতশিরাঃ [পাগড়ীযুক্ত মস্তক], দক্ষিণাস্য ও পাদুকাধারী হইয়া শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য ভোজন করিলে অসুরগণের তৃপ্তিলাভ হয়। লোকে অসূয়াপরতন্ত্র ও শ্রদ্ধাবিহীন হইয়া সমুদয় শ্রাদ্ধীয় বস্তু দান করে, তৎসমুদয়ে অসুরগণই তৃপ্তিলাভ করিয়া থাকে। কুক্কুর ও পংক্তিদূষক ব্রাহ্মণ শ্রাদ্ধ দর্শন করিলে শ্রাদ্ধ নিষ্ফল হয়। অতএব আবৃত স্থানে তিলসমুদয় বিকীর্ণ করিয়া শ্রাদ্ধ করা কর্ত্তব্য। যাহারা রোষপরবশ হইয়া অথবা তিলদান না করিয়া শ্রাদ্ধ করে, তাহাদিগের সেই শ্রাদ্ধ রাক্ষস ও পিশাচকর্ত্তৃক বিনষ্ট হয়। পংক্তিদূষক ব্রাহ্মণ যে যে কার্য্য সন্দর্শন করে, শ্রাদ্ধকৰ্ত্তা শ্রাদ্ধের। সেই সেই কার্য্যের ফললাভে বঞ্চিত হইয়া থাকে।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এক্ষণে আমি যত্নপূৰ্ব্বক পংক্তিপাবন ব্রাহ্মণগণের বিষয় কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। বেদব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণগণের মধ্যে যাঁহারা সদাচারনিরত, তাঁহাদিগকেই পংক্তিপাবন বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। যাঁহারা তৃণাচিতকেত মন্ত্রবিৎ [তন্নামক বেদমন্ত্রবিৎ], পঞ্চাগ্নিযুক্ত [চারিদিকে অগ্নিকুণ্ড ও উপরে সূর্য্য—এই পঞ্চাগ্নিমধ্যে অবস্থিত], ত্রিসুপর্ণ মন্ত্রবেত্তা [তন্নামক বেদমন্ত্রবেত্তা], ষড়ঙ্গবিৎ [শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ—বেদের এই ছয় অঙ্গে অভিজ্ঞ], বেদাধ্যায়ীর বংশোদ্ভব, সামবেদবেত্তা, সামগাতা, পিতামাতার বশীভূত, অথৰ্ব্ববেদপাঠক, ব্রহ্মচারী, যতব্রত, সত্যবাদী, ধৰ্ম্মশীল ও সুকৰ্ম্মনিরত; যাঁহাদের উর্দ্ধতন দশ পুরুষ শ্রোত্রিয় [বিশুদ্ধজন্মা, যথাযথ সংস্কারপন্ন ও বেদাধ্যায়ী]; যাঁহারা ঋতুকালে ধর্ম্মপত্নীতে গমন করেন; যাঁহারা অতিপবিত্র তীর্থসমুদয়ে স্নানাদি করিয়াছেন; যাঁহারা বিধিপূৰ্ব্বক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া যজ্ঞান্তস্নানে আপনাদিগের বিশুদ্ধিসম্পাদনে কৃতকার্য্য হইয়াছেন এবং যাঁহারা ক্রোধশূন্য, গম্ভীরস্বভাব, ক্ষমাশীল, জিতেন্দ্রিয় ও সৰ্ব্বভূতহিতনিরত, শ্রাদ্ধকালে সেই সমস্ত ব্রাহ্মণকেই নিমন্ত্রণ করা কর্ত্তব্য। ইঁহাদিগকে যে বস্তু প্রদান করা যায়, তাহা অক্ষয় ফল উৎপাদন করিয়া থাকে।

“যতি, মোক্ষধর্ম্মপরায়ণ ও পরমযোগী ব্যক্তিরাও পংক্তিপাবন বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন, যাঁহারা ব্রাহ্মণগণকে ইতিহাস শ্রবণ করাইয়া থাকেন, যাঁহারা ভাষ্য ও ব্যাকরণজ্ঞ, যাঁহারা পুরাণ ও ধর্ম্মশাস্ত্র অধ্যয়ন এবং ধর্ম্মশাস্ত্রানুসারে সমস্ত কার্য্য অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন, যাঁহারা গুরুকুলে নিয়মিত কাল বাস করেন, যাঁহারা সত্যবাদী এবং বেদাধ্যয়ন ও বেদগানে সুনিপুণ, তাঁহারা পংক্তির যতদূর দর্শন করেন, ততদূর পবিত্র হইয়া থাকে। এই নিমিত্তই ইহাদিগের নাম পংক্তিপাবন হইয়াছে। যাঁহার পুরুষপরম্পরা বেদাধ্যাপক, তিনি একাকীই সার্দ্ধ-তৃতীয় ক্রোশ পর্য্যন্ত পবিত্র করিতে পারেন। যে ব্যক্তি ঋত্বিক ও উপাধ্যায় নহে, সে যদি ঋত্বিগণকর্ত্তৃক অনুজ্ঞাত না হইয়া শ্রাদ্ধের শ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করে, তাহা হইলে পংক্তিস্থ, সমস্ত ব্যক্তির পাপ তাহাকে গ্রহণ করিতে হয়। যিনি বেদবিৎ ও পুণ্যবান্ তিনিই পংক্তিপাবন। অতএব শ্রাদ্ধকালে সবিশেষ পরীক্ষা করিয়া স্বধৰ্ম্মনিরত কুলীন বহু ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করাই শ্রেয়স্কর।

“যিনি শ্রাদ্ধকালে মিত্রকে আহ্বান করিয়া শ্ৰাদ্ধীয় দ্রব্য ভোজন করান, পিতৃ ও দেবগণ তৎকৃত শ্রাদ্ধে প্রীতি লাভ করেন না এবং তাঁহার স্বর্গলাভও দুর্ল্লভ হইয়া উঠে। যিনি শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য প্রেরণ করিয়া লোকের সহিত মিত্রতা স্থাপন করেন, তাঁহার দেবলোকলাভ হয় না এবং কারারুদ্ধ ব্যক্তি যেমন বিষয়ভোগে বঞ্চিত হয়, সেইরূপে তিনিও কৰ্ম্মফললাভে নিরাশ হইয়া থাকেন। এই নিমিত্ত জ্ঞানবান ব্যক্তি শ্রাদ্ধকালে মিত্রের সমাদর করেন না। মিত্রের সন্তোষোৎপাদনের নিমিত্ত তাঁহাকে ধন প্রদান করাই কৰ্ত্তব্য, কিন্তু শ্রাদ্ধকালে তাঁহাকে কোনরূপ প্রীতির চিহ্ন প্রদর্শন করা বিধেয় নহে। যিনি শত্রু ও মিত্র নহেন, সেই ব্যক্তিকেই শ্রাদ্ধকালে ভোজন প্রদান করা কর্ত্তব্য। ঊষরক্ষেত্রে বীজ বপন করিলে যেমন কোন ফলই উৎপন্ন হয় না, সেইরূপ অযোগ্য ব্যক্তিকে শ্রাদ্ধে ভোজন করাইলে সেই শ্রাদ্ধ ইহকাল ও পরকালে কোন ফলই উৎপাদন করে না।

“যে ব্রাহ্মণ অধ্যয়নশীল নহেন, তিনি তৃণাদির ন্যায় নিতান্ত নিস্তেজ, তাঁহাকে শ্রাদ্ধীয় বস্তু প্রদান ও ভস্মে ঘৃতাহুতিদান উভয়ই তুল্য। শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য পরস্পর আদানপ্রদান পিশাচোদ্দেশে প্রদত্ত দানের ন্যায় নিতান্ত নিষ্ফল হয়। উহা কখনই দেবতা ও পিতৃগণের তৃপ্তি-উৎপাদনে সমর্থ হয় না, উহা নষ্টবৎসা ধেনুর ন্যায় কাতরভাবে ইহলোকেই বিচরণ করিয়া থাকে। নর্ত্তক ও গায়ককে দান করিলে তাহা যেমন নিরর্থক হয়, সেইরূপ নীচ ব্রাহ্মণকে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য প্রদান করিলে তাহা কোন ফলদায়ক হয় না। নীচ ব্রাহ্মণে প্রদত্ত দ্রব্য দাতা ও গ্রহীতা উভয়েরই তৃপ্তিসম্পাদন করিতে পারে না, প্রত্যুত দাতার পিতৃলোককে স্বর্গ হইতে পরিভ্রষ্ট করে। যাঁহারা ঋষিনির্দ্দিষ্ট আচারনিরত, সৰ্ব্বধৰ্ম্মজ্ঞ, শাস্ত্রে কৃতনিশ্চয়, তাঁহারাই যথার্থ ব্রাহ্মণ। মহর্ষিগণ স্বাধ্যায়নিরত, জ্ঞাননিষ্ঠ, তপঃপরায়ণ ও স্বকর্ম্মাসক্ত হইয়া থাকেন। তন্মধ্যে যিনি জ্ঞাননিষ্ঠ, তাঁহাকেই শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য প্রদান করা কর্ত্তব্য। যাঁহারা ব্রাহ্মণগণের নিন্দা করেন না, তাঁহারাই যথার্থ মনুষ্য। যাহারা ব্রাহ্মণগণের নিন্দা করে, তাহারা নিতান্ত পামর; তাহাদিগকে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য প্রদান করা কদাপি বিধেয় নহে। আমি বানপ্রস্থ ঋষিদিগের মুখে শ্রবণ করিয়াছি যে, ব্রাহ্মণদিগের নিন্দা করিলে তিন পুরুষ নরকস্থ হয়। ব্রাহ্মণগণকে পরোক্ষেই পরীক্ষা করা উচিত। দোষশূন্য ব্রাহ্মণ শত্রু বা মিত্রই হউন, নিরপেক্ষ হইয়া তাঁহাকেই শ্রাদ্ধে ভোজন করাইবে। শ্রাদ্ধে দশলক্ষ নীচ ব্রাহ্মণকে ভোজন করাইলে যে ফললাভ না হয়, বেদজ্ঞ সাধু একমাত্র ব্রাহ্মণকে ভোজন করাইলে সেই ফললাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *