৮৬তম অধ্যায়
তারকাসুরবধ বৃত্তান্ত
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি সুবর্ণদানের ফল ও উহার উৎপত্তি বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করিলেন। আপনি ইতিপূৰ্ব্বে তারকাসুরকে দেবাদিদেবের অবধ্য বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, এক্ষণে সেই মহাসুর কিরূপে নিপাতিত হইল, তাহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত কৌতূহল হইয়াছে; অতএব আপনি বিস্তারিতরূপে তাহার নিধনবৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! সরিদ্বরা গঙ্গা গর্ভ পরিত্যাগ করাতে দেবতা ও ঋষিগণ বিপদগ্রস্ত হইয়া সেই গর্ভ রক্ষা করিবার নিমিত্ত ছয় কৃত্তিকাকে প্রেরণ করিলেন। ঐ কৃত্তিকাগণ ভিন্ন দেবলোকে আর কেহই হুতাশননিহিত তেজোধারণে সমর্থ ছিলেন না। কৃত্তিকাগণ দেবগণকর্ত্তৃক প্রেরিত হইয়া অগ্নির রেতঃ পান করিয়া গর্ভধারণপূৰ্ব্বক ক্রমশঃ উহা পোষণ করিতে লাগিলেন। তখন ভগবান্ হুতাশন তাঁহাদিগের প্রতি সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন।
“অনন্তর ক্রমশঃ সেই গর্ভের বৃদ্ধিনিবন্ধন তাঁহাদিগের অঙ্গ তেজঃপরিব্যাপ্ত হওয়াতে তাঁহারা কুত্রাপি সুখলাভে সমর্থ হইলেন না। পরে প্রসবকাল উপস্থিত হইলে একেবারে সকলেই প্রসব করিলেন। তখন সেই ছয় কৃত্তিকার পুত্র একত্র মিলিত হইল। পরে বসুন্ধরা দেবী ঐ পুত্র গ্রহণ করিলেন। তখন হুতাশনসদৃশ তেজ ও দিব্যাকারসম্পন্ন কুমার শরবনে অবস্থানপূৰ্ব্বক পরমসুখে পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন।
কৃত্তিকাদির কার্ত্তিকেয়-প্রতিপালন
“অনন্তর কৃত্তিকাগণ সেই বার্সার্কসদৃশ পুত্রকে দর্শন করিয়া স্নেহনিবন্ধন স্তন্যপ্রদানদ্বারা তাঁহার পুষ্টিসাধনে প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর দিক্মুদয়, দিকের ঈশ্বরগণ, রুদ্রদেব, বিধাতা, বিষ্ণু, যম, পুষা, অর্য্যমা, ভগ, অংশ, মিত্র, সাধ্যগণ, ইন্দ্র, বসুগণ, অশ্বিনীকুমার, জল, বায়ু, অন্তরীক্ষ, চন্দ্র, নক্ষত্র, গ্রহ ও সূর্য্য প্রভৃতি দেবগণ এবং মূৰ্ত্তিমান্ সামাদি বেদসমুদয় দ্রুতবেগে সেই অগ্নিপুত্রকে সন্দর্শন করিতে সমাগত হইলেন। ঐ সময় ঋষিগণ স্তবপাঠ এবং গন্ধৰ্ব্বগণ সঙ্গীত আরম্ভ করিলেন। দেবতা ও ঋষিগণ সেই ব্রাহ্মণপ্রিয়, স্থূলকলেবর, দ্বাদশবাহু, শরগুল্মশয়ান [শরবনে শয়ান] দ্বাদশাক্ষ [বার চক্ষু], ষড়াননকে দর্শন করিয়া যারপরনাই আহ্লাদিত ও তারকাসুরের বিনাশবিষয়ে বিশ্বস্ত হইলেন।
“অনন্তর দেবগণ সকলেই কার্ত্তিকেয়ের নিমিত্ত প্রিয়বস্তু আহরণ করিয়া তাঁহার ক্রীড়ণীয় বস্তু ও পক্ষিসমুদয় প্রদান করিতে লাগিলেন। রাক্ষসগণ তাঁহাকে বরাহ ও মহিষ, গরুড় বিচিত্র ময়ুর, বরুণদেব হুতাশনসদৃশ কুক্কুট, চন্দ্র মেষ, সূর্য্য অতিমনোহর প্রভা, গোমাতা সুরভী একলক্ষ গাভী, অগ্নি গুণসম্পন্ন ছাগ, ইলা বহুতর কলপুষ্প, সুধন্বা শকট ও অত্যুৎকৃষ্ট রথ, বরুণদেব হস্তী ও অশ্বসমুদয় এবং দেবেন্দ্র সিংহ, ব্যাঘ্র, হস্তী, অন্যান্য পক্ষী, ভীষণাকার বহুতর শ্বাপদ ও বিবিধ ছত্র প্রদান করিলেন। রাক্ষস ও অসুরগণ তাহার অনুগত হইল। ঐ সময় তারকাসুর। কার্ত্তিকেয়কে ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে দেখিয়া বিবিধ উপায়ে তাঁহাকে বিনাশ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল; কিন্তু কোন প্রকারেই কৃতকার্য্য হইল না।
“অনন্তর মহাবাহু কার্ত্তিকেয় পরিবর্দ্ধিত হইলে দেবতারা তাঁহার নিকট তারকাসুরের উপদ্রবসমুদয় নিবেদন করিয়া তাঁহাকে সেনাপতিপদে নিযুক্ত করিলেন। মহাবলপরাক্রান্ত কার্ত্তিকেয়ও সেনাপতিপদে নিযুক্ত হইয়া অমোঘ শক্তিপ্রহারদ্বারা তারকাসুরকে শমনসদনে প্রেরণপূৰ্ব্বক দেবাধিপতি পুরন্দরকে পুনরায় ইন্দ্ৰত্বপদে স্থাপিত করিলেন। মহাদেবপ্রিয় হিরণ্যমূৰ্ত্তি ভগবান্ কার্ত্তিকেয় এইরূপে দেবতাদিগের সৈনিকভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। হুতাশন ও কার্ত্তিকেয়ের তেজঃ হইতে সুবর্ণ সমুৎপন্ন হইয়াছে এই নিমিত্ত উহা মাঙ্গল্যদ্রব্য ও উৎকৃষ্ট রত্ন বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। হে ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বে বশিষ্ঠদেব পরশুরামের নিকট. এই উপাখ্যান কীৰ্ত্তন করিলে ভৃগুনন্দন সুবর্ণদানপূৰ্ব্বক সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া স্বর্গলাভে অধিকারী হইয়াছিলেন; অতএব তুমিও যত্নপূৰ্ব্বক সুবর্ণদানে প্রবৃত্ত হও।”
