৮৫তম অধ্যায়
সুবর্ণের পিতৃপরিচয়—তারকাসুর-বধ-ব্যবস্থা
“মহর্ষি বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘দুরাত্মা তারকাসুর এইরূপে দেবগণকে নিপীড়িত করিলে তাঁহারা বিষণ্নমনে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন, “ভগবন্! তারকাসুর আপনার বরে দর্পিত হইয়া আমাদিগকে নিতান্ত নিপীড়িত করিতেছে। আমরা তাহার ভয়ে যারপরনাই ব্যাকুল হইয়াছি; অতএব আপনি অবিলম্বে তাহাকে বিনাশ করিয়া আমাদিগের পরিত্রাণ করুন। এক্ষণে আপনি ভিন্ন আমাদিগের আর উপায়ান্তর নাই।”
‘ব্রহ্মা কহিলেন, “দেবগণ! আমি সৰ্ব্বভূতে সমদর্শী। আমার অধৰ্ম্মপ্রবৃত্তি নাই। আমি পূর্ব্বেই তারকাসুরের বিনাশের উপায় করিয়া রাখিয়াছি। তোমরা শীঘ্রই সেই দুরাত্মাকে বিনাশ করিবে। দেব ও ধৰ্ম্মসমুদয় কখনই বিলুপ্ত হইবে না, অতএব তোমরা নিরুদ্বেগ হও।”
‘দেবগণ কহিলেন, “ভগবন্! দুরাত্মা তারকাসুর আপনার নিকট ‘দেবতা, অসুর ও রাক্ষসগণের অবধ্য হইব’ বলিয়া বর গ্রহণপূৰ্ব্বক নিতান্ত গর্ব্বিত হইয়াছে। তাহাকে বধ করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নহে। আর আমরা মহাদেবকে সন্তানোৎপাদনে বিরত করাতে দেবী পার্ব্বতী আমাদের প্রতি ক্রূদ্ধ হইয়া আমাদিগের অপত্য জন্মিবে না বলিয়া অভিশাপ প্রদান করিয়াছেন। সুতরাং তারকাসুর যে কিরূপে বিনষ্ট হইবে, তাহা আমরা নির্দ্ধারিত করিতে পারিতেছি না।”
‘তখন ব্রহ্মা কহিলেন, “হে সুরগণ! রুদ্রাণী যে সময় তোমাদিগকে শাপ প্রদান করেন, হুতাশন তৎকালে তোমাদিগের নিকট উপস্থিত ছিলেন না। অতএব তিনি অসুরবধের নিমিত্ত পুত্রোৎপাদন করিলে সেই পুত্র দেব, দানব, রাক্ষস, গন্ধৰ্ব্ব, নাগ, মনুষ্য ও পক্ষিগণকে অতিক্রম করিয়া অমোঘ অস্ত্রদ্বারা তোমাদিগের ভয়প্রদ দুরাত্মা তারক ও অন্যান্য অসুরগণকে নিপাতিত করিবে, সন্দেহ নাই। ভগবান ভবানীপতির তেজের কিয়দ্দংশ অনলে নিপতিত হইয়াছে, মহাত্মা হুতাশন অসুরগণের নিমিত্ত দ্বিতীয় পাবকের ন্যায় সেই শৈব তেজ গঙ্গাতে পরিত্যাগ করিলেই তোমাদিগকে ভয়হৰ্ত্তা কুমার সমুৎপন্ন হইবে। অতএব তোমরা অবিলম্বে তেজোরাশি হুতাশনের অন্বেষণ কর। এই আমি তোমাদের নিকট তারকাসুরবধের উৎকৃষ্ট উপায় কীৰ্ত্তন করিলাম। পাৰ্ব্বতীর শাপপ্রদানকালে হুতাশন তোমাদের সমভিব্যাহারে ছিলেন না বলিয়া ঐ শাপ তাঁহাতে সংক্রামিত হয় নাই। আর তিনি তৎকালে তোমাদের সমভিব্যাহারে থাকিলেও ঐ শাপপ্রভাবে তাঁহার পুত্রোৎপত্তির ব্যাঘাত হইত না।
“হুতাশন সৰ্ব্বাপেক্ষা তেজস্বী। অল্পতেজস্বীর শাপ কখন অধিক তেজস্বীর তেজের হানি করিতে পারে না। বলবান্দিগকে অপেক্ষাকৃত পরাক্রান্ত ব্যক্তির নিকট পরাভূত হইতে হয়। তপস্বীরা বরদাতা অবধ্য দেবগণকে বিনাশ করিতে পারেন। অতিতেজস্বিগণের অসাধ্য কিছুই নাই। এক্ষণে প্রার্থনা করি, ভগবান্ হুতাশন তোমাদের মঙ্গলবিধানার্থ পুত্রোৎপাদন করিতে অভিলাষ করুন। অতঃপর তোমরা অতি ত্বরায় সেই রুদ্র অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সৰ্ব্বভূতের হৃদয়স্থিত তেজোরাশিরূপ সৰ্ব্বব্যাপী ভগবান অনলের অন্বেষণ কর। তিনিই তোমাদিগের মনোরথ পূর্ণ করিবেন।”
শঙ্করীর শাপভয়ে লুক্কায়িত অগ্নির অন্বেষণ
‘সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা এই কথা বলিলে দেবগণ কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত তপোবলসম্পন্ন মহাত্মা মহর্ষি ও সিদ্ধগণসমভিব্যাহারে চতুর্দ্দিকে হুতাশনের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু ঐ সময়ে তিনি জলমধ্যে অবস্থান করাতে সাক্ষাৎকারলাভে সমর্থ হইলেন না। অনন্তর একদা দেবগণ অগ্নির অদর্শননিবন্ধন নিতান্ত দুঃখিত ও ভীত হইয়া চিন্তা করিতেছেন, এমন সময় এক মণ্ডূক [ভেক-ব্যাঙ] অগ্নিতেজে নিতান্ত সন্তাপিত ও ক্লান্ত হইয়া রসাতল হইতে সমুত্থানপূর্ব্বক তাঁহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিল, “হে সুরগণ! ভগবান্ হুতাশন তেজোদ্বার সমুদয় জল ব্যাপিত করিয়া রসাতলে অবস্থান করিতেছেন। জলচরগণ তাঁহার তাপে নিতান্ত কাতর হইয়াছে। আমি তাঁহার তাপ সহ্য করিতে না পারিয়া এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছি। এক্ষণে যদি আপনারা অনলের সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাসনা করেন, তাহা হইলে অচিরাৎ রসাতলে গমনপুৰ্ব্বক তাঁহার অন্বেষণ করুন। আমি চলিলাম; আর বিলম্ব করিতে পারি না। আমি আপনাদের নিকট আসিয়া হুতাশনের আত্মগোপনবৃত্তান্ত প্রকাশ করিতেছি, জানিতে পারিলে তিনি নিশ্চয়ই আমার প্রতি ক্রূদ্ধ হইবেন।”
ভেকাদির প্রতি অগ্নিপ্রদত্ত অভিশাপ-প্রতিক্রিয়া
‘রসাতলবাসী মণ্ডূক দেবগণকে এই কথা কহিয়া অবিলম্বে জলমধ্যে প্রবেশ করিল। তখন হুতাশন মণ্ডূকের সেই কপটতা পরিজ্ঞাত হইয়া “তোমরা অদ্যাবধি রসনেন্দ্রিয়বিহীন হইবে” বলিয়া ভেকজাতিকে অভিশাপ প্রদানপূর্ব্বক প্রচ্ছন্নভাবে অতিশীঘ্র অন্যত্র প্রস্থান করিলেন। হুতাশন রসাতল হইতে স্থানান্তরিত হইলে দেবগণ তাঁহার প্রস্থান ও মণ্ডূকদিগের প্রতি শাপপ্ৰদানবৃত্তান্ত পরিজ্ঞাত হইয়া ভেকজাতির প্রতি কৃপাপ্রদর্শনপূৰ্ব্বক তাহাদিগকে কহিলেন, “হে মণ্ডূকগণ! তোমরা অগ্নিশাপে রসনাবিহীন ও রসাস্বাদনে বঞ্চিত হইয়াও বিবিধ বাণী উচ্চারণ করিতে পারিবে; তোমরা অচেতন, অনাহারী, শুষ্কদেহ, মৃতকল্প হইয়া বিলমধ্যে বাস করিলেও ভূমি তোমাদিগকে রক্ষা করিবেন এবং অন্ধকারময়ী রজনীতেও তোমরা নানাস্থানে বিচরণ করিতে পারিবে।”
‘দেবগণ মণ্ডূকদিগকে এইরূপ বর প্রদান করিয়া পুনরায় অগ্নির অন্বেষণার্থ পৃথিবী পর্য্যটন করিতে লাগিলেন, কিন্তু তাঁহার সন্দর্শনলাভে সমর্থ হইলেন না। অনন্তর ঐরাবতসদৃশ এক প্রকাণ্ড হস্তী তাঁহাদিগকে দর্শন করিয়া সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিল, “হে দেবগণ! হুতাশন এক্ষণে অশ্বত্থবৃক্ষে অবস্থান করিতেছেন।” মাতঙ্গ এই কথা কহিলে, অগ্নি সাতিশয় ক্রোধাবিষ্ট হইয়া “অদ্যাবধি তোমাদের রসনা বিপরীতগামিনী হইবে” বলিয়া হস্তিজাতির প্রতি শাপপ্রদানপূৰ্ব্বক সত্বর অশ্বথবৃক্ষ হইতে নির্গত হইয়া শমীগর্ভে প্রবেশ করিলেন। তখন দেবগণ অগ্নির প্রস্থান ও দ্বিরদগণের [হস্তী দিগের] প্রতি অভিসম্পাতের বিষয় অবগত হইয়া হস্তিজাতির প্রতি কৃপাপ্রদর্শনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “হে মাতঙ্গগণ! তোমরা অগ্নির শাপে প্রতীপজিহ্ব [বিপরীতরসনা—জিহ্বার অগ্রভাগ ভিতরদিকে ঘুরান] হইয়া সমুদয় সামগ্রী আহার ও উচ্চৈঃস্বরে অস্পষ্ট বাক্য উচ্চারণ করিতে পারিবে।”
‘সুরগণ এইরূপে মাতঙ্গগণকে বরপ্রদানপূর্ব্বক পুনরায় অগ্নির অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ সময় অগ্নি যে অশ্বত্থবৃক্ষ হইতে নির্গত হইয়া শমীবৃক্ষে প্রবিষ্ট হইয়াছিলেন, শুকপক্ষী তাহা তাঁহাদের নিকট ব্যক্ত করিল। তখন হুতাশন শুকপক্ষীকে এই বলিয়া শাপ প্রদান করিলেন যে, “তুমি অদ্যাবধি বাকশক্তিবিহীন হইবে।” ঐ শাপপ্রভাবে শুকপক্ষীর জিহ্বা পরিবর্ত্তিত হইল। হুতাশন এইরূপ শাপ প্রদান করিলে দেবগণ শুকের প্রতি সাতিশয় দয়াবান হইয়া কহিলেন, “হে শুক! তুমি কখনই একবারে বাকশক্তিবিহীন হইবে না। তোমার জিহ্বা পরিবর্ত্তন হইলেও বালক ও বৃদ্ধেরা যেমন অতি মধুর অব্যক্ত শব্দ উচ্চারণ করে, তুমিও তদ্রূপ শব্দ উচ্চারণ করিতে পারিবে।” দেবগণ শুকপক্ষীকে এই কথা কহিয়া শমীগর্ভে হুতাশনকে সন্দর্শন করিলেন। তদবধি যজ্ঞাদি সমুদয় কার্য্যে শমীকাষ্ঠ হইতে অগ্নি উৎপাদনের উপায় অবগত হইল। এই নিমিত্তই শমীগর্ভে অগ্নি দৃষ্ট হইয়া থাকেন। ভগবান হুতাশন রসাতলে শয়ন করাতে তাঁহার তেজঃপ্রভাবে রসাতলস্থ যে সলিলসমুদয় সন্তপ্ত হইয়াছিল, সেই উত্তপ্ত জলরাশি পৰ্ব্বতপ্রস্রবণ[ঝরণা]দ্বারা অদ্যাপি নির্গত হইতেছে।।
‘অনন্তর ভগবান্ হুতাশন দেবগণকে সন্দর্শন করিবামাত্র নিতান্ত ব্যথিত হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে দেবগণ! তোমরা কি নিমিত্ত আমার নিকট আগমন করিয়াছ, তাহা কীর্ত্তন কর।”
‘তখন দেবতা ও মহর্ষিগণ হুতাশনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে বৈশ্বানর! আমরা তোমার প্রতি যে কাৰ্য্যের ভারাৰ্পণ করিব, তোমাকে তাহা সম্পাদন করিতে হইবে। কর্ম্ম সুসম্পন্ন হইলে তোমার যশের পরিসীমা থাকিবে না।”
অগ্নিতেজে গঙ্গার গর্ভধারণ
‘তখন হুতাশন কহিলেন, “হে সুরগণ! আমি তোমাদিগের আজ্ঞাবহ ভৃত্যস্বরূপ; অতএব তোমরা আমাকে যাহা আদেশ করিবে, আমি নিশ্চয়ই তাহা করিব।”
‘অগ্নি এইরূপে দেবকার্য্যসাধনে অঙ্গীকার করিলে, দেবগণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে অনল! তারকনামে এক মহাসুর ব্রহ্মার বরলাভে দর্পিত হইয়া আমাদিগকে অত্যন্ত ক্লেশ প্রদান করিতেছে; অতএব তুমি তাহাকে বিনাশ করিয়া এই সমুদয় প্রজাপতি, ঋষি ও দেবতাদিগকে পরিত্রাণ কর। তুমি স্বয়ং মহাবলপরাক্রান্ত এক অপত্য উৎপাদন করিলেই তাহা হইতে আমাদিগের কার্য্যসিদ্ধ ও দুঃখ দূর হইবে। আমরা পাৰ্ব্বতীকর্ত্তৃক অভিশপ্ত হইয়া অপত্যোৎপাদনে অক্ষম হইয়াছি, সুতরাং তোমার বীর্য্য ভিন্ন আর আমাদিগের উপায়ান্তর নাই। অতএব তুমি অচিরাৎ আমাদিগকে পরিত্রাণ কর।”
‘দেবগণ এই কথা কহিলে ভগবান্ হুতাশন তাঁহাদিগের বাক্যে স্বীকার করিয়া তৎক্ষণাৎ ভাগীরথীর নিকট গমন করিলেন। তথায় তাঁহাদের পরস্পর সম্ভোগ হওয়াতে ভাগীরথীর গর্ভাধান হইল। ঐ গর্ভ কক্ষলগ্ন হুতাশনের ন্যায় ক্রমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিল। তখন ভাগীরথী হুতাশনের তেজঃপ্রভাবে নিতান্ত কাতর হইলেন। ঐ সময় এক মহাসুর হঠাৎ ঘোরতর চীৎকার করিয়া উঠিল। ভগবতী ভাগীরথী সেই অলক্ষিতৎপন্ন ভীষণ শব্দে নিতান্ত ভীত ও উদ্ভ্রান্তনেত্র হইয়া একেবারে বিচেতনপ্রায় হইয়া শরীর ও গর্ভভারবহনে একান্ত অসমর্থ হইলেন। তখন তিনি কম্পিতকলেবরে হুতাশনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! আমি আর আপনার তেজ ধারণ করিতে পারি না। ঐ তেজঃপ্রভাবে আমি একান্ত ক্লান্ত হইয়াছি, আর আমার পূৰ্ব্বের ন্যায় স্বাস্থ্য নাই; আমার মন নিতান্ত অস্থির হইয়াছে। অতএব এক্ষণে গর্ভ পরিত্যাগ করিব; কিন্তু আমি ইহা ইচ্ছাপূর্ব্বক পরিত্যাগ করিতে উদ্যত হই নাই। আমার নিতান্ত কষ্ট হওয়াতেই আমি ইহা পরিত্যাগ করিতেছি। বিশেষতঃ আমি স্বয়ং কামনাপূর্ব্বক আপনার তেজ গ্রহণ করি নাই; আপনি কার্য্যসাধনার্থই আমাতে তেজসংক্রামিত করিয়াছেন। অতএব আমি এখন নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া এই গর্ভ পরিত্যাগ করিলে যে দোষ, গুণ বা ধর্ম্মাধর্ম্ম সমুৎপন্ন হইবে, আপনি তৎসমুদয়ের অধিকারী।”
গঙ্গার গৰ্ভত্যাগ
তখন ভগবান্ হুতাশন ও অন্যান্য দেবগণ গঙ্গাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভাগীরথি! তুমি গর্ভধারণ কর। ঐ গর্ভ হইতে মহাফল উৎপন্ন হইবে। তুমি যখন সমুদয় বসুন্ধরা-সঞ্চরণে সমর্থ হইয়াছ, তখন অনায়াসেই এই গর্ভধারণে সমর্থ হইবে।” ভগবান্ অগ্নি ও অন্যান্য দেবগণ এইরূপ নিবারণ করিলেও ভাগীরথী সেই অগ্নিতেজঃসত প্রদীপ্ত পাবকসদৃশ গর্ভধারণে নিতান্ত অসমর্থ হইয়া সুমেরুপৰ্ব্বতে গিয়া উহা পরিত্যাগ করিলেন। অনন্তর ভগবান্ হুতাশন তথায় আগমনপূৰ্ব্বক গঙ্গাকে দর্শন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভাগীরথি! এক্ষণে তোমার গর্ভধারণজন্য দুঃখ অপনীত হইয়াছে? যাহা হউক, এক্ষণে এই গর্ভ কিরূপ বর্ণ, কিরূপ আকার এবং কিরূপ তেজঃসম্পন্ন, তৎসমুদয় কীৰ্ত্তন কর।”
‘তখন সরিদ্বরা গঙ্গা হুতাশনকর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, “ভগবন্! আপনার তেজঃসত সেই গর্ভ আপনারই ন্যায় তেজস্বী এবং স্বীয় সুনির্ম্মল প্রভাপ্রভাবে [প্রভায়] পর্ব্বতকেও উদ্ভাসিত করিতে সমর্থ হইয়াছে। তাহার গন্ধ কদম্বের ন্যায় মধুর এবং দেহ কমলোৎপলসমলঙ্কৃত [কমলকুমুদে শোভিত] হ্রদের ন্যায় সুশীতল। উহার তেজঃ পৃথিবীর যে বস্তু স্পর্শ করিতেছে, তাহাই সুবর্ণময় হইয়া যাইতেছে। ফলতঃ উহা এই চরাচর বিশ্বকে তেজোদ্বারা উদ্ভাসিত করিয়াছে। উহার কান্তি সূর্য্য, অগ্নি ও চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল।” দেবী গঙ্গা হুতাশনকে এইরূপ কহিয়া অন্তর্হিত হইলেন। হুতাশনও দেবগণের কার্য্যসাধন করা হইল জানিয়া আপনার অভিলষিত স্থানে প্রস্থান করিলেন। হে জামদগ্ন্য! সুবর্ণ এইরূপে অগ্নিরই তেজঃ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এই নিমিত্ত দেবতা ও মহর্ষিগণ অগ্নির নাম হিরণ্যরেতাঃ রাখিয়াছেন। দেবী পৃথিবী ঐ সুবর্ণ ধারণ করিয়াছিলেন বলিয়াই তাঁহার নাম বসুমতী হইয়াছে।
কার্ত্তিকেয়ের জন্ম
‘অনন্তর সেই অগ্নিসম্ভূত তেজঃ হিমালয় হইতে গঙ্গাপ্রবাহে প্রবাহিত ও এক শরবনে সংলগ্ন হইয়া ক্ৰমশঃ পরিবর্দ্ধিত ও বালকরূপে পরিণত হইল। ঐ সময় কৃত্তিকাগণ সেই তরুণসূর্য্যসঙ্কাশ অদ্ভুতদর্শন বালককে শরবনে নিপতিত নিরীক্ষণ করিয়া তথায় আগমনপূৰ্ব্বক স্তননিঃসৃত দুগ্ধদ্বারা পোষণ করিতে লাগিলেন। কৃত্তিকারা তাঁহাকে পোষণ করিয়াছিলেন বলিয়া সেই কুমারের নাম কার্ত্তিকেয়, তেজঃস্কর অর্থাৎ ক্ষরিত হওয়াতে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বলিয়া তাঁহার নাম স্কন্দ এবং গুহাবাসনিবন্ধন তাঁহার নাম গুহ হইয়াছিল।।
‘হে জামদগ্ন্য! সমুদয় সুবর্ণ বহ্নি হইতে উদ্ভূত হইয়াছে। তন্মধ্যে জাম্বুনদ সুবর্ণই সর্ব্বোৎকৃষ্ট। দেবগণ তদ্দ্বারা ভূষণ প্রস্তুত করিয়া ধারণ করেন। অগ্নি হইতে সদ্ভূত হইয়া রূপপরিগ্রহ করিয়াছে, এই নিমিত্ত সুবর্ণের নাম জাতরূপ হইয়াছে। এই সুবর্ণ রত্নের মধ্যে উৎকৃষ্ট রত্ন, ভূষণের মধ্যে উৎকৃষ্ট ভূষণ এবং সকল বস্তু অপেক্ষা পবিত্র ও মঙ্গলজনক। ইহা অগ্নি, ব্রহ্মা ও মহেশ্বরস্বরূপ। ইহা দান করিলে অগ্নি ও চন্দ্রলোকলাভ হয়।
সুবৰ্ণবর্ণনপ্রসঙ্গে রুদ্রের রারুণযজ্ঞ বৃত্তান্ত
‘হে রাম! আমি এই উপলক্ষ্যে পূৰ্ব্বে পিতামহ ব্রহ্মা যেরূপ কার্য্য করিয়াছিলেন, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূর্ব্বে ভগবান রুদ্র বারুণীমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া এক যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ যজ্ঞকালে মুনিগণ, অগ্নি প্রভৃতি দেবতাসকল, যজ্ঞাঙ্গসমুদয়, মূৰ্ত্তিমান্ বষট্কার এবং সাম, যজু ও ঋগ্বেদ [যক্ষাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা] তাঁহার নিকট আগমন করিলেন। বেদের লক্ষণ, উদাত্তাদি [উচ্চনীচক্রমে উচ্চারণ] স্বর, স্বরের আরোহাবরাহ ক্রম, নিরুক্ত [অর্থ], নিষদাদি স্বরপংক্তি [সা ঋ গা মা ইত্যাদির অধিষ্ঠাত্রী], ওঙ্কার, নিগ্রহ ও অনুগ্রহ তথায় আগমন করিয়া দেবদেবের নেত্রে বাস করিতে লাগিলেন। বেদ, উপনিষদ, বিদ্যা, সাবিত্রী এবং ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান তাঁহার অন্যান্য শরীরমধ্যে অবস্থিত হইল।। দেবাদিদেব মহাদেব এইরূপে সৰ্ব্বময় হইয়া স্বয়ং আপনাকে আপনাতে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। তখন তাঁহার সেই যজ্ঞ যারপরনাই সুশোভিত হইল।
‘হে রাম! পশুপতিই ভূলোক, দ্যুলোক, ভূপতি, গণপতি, অগ্নি, ব্রহ্মা, রুদ্র, বরুণ ও প্রজাপতি বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকেন। তাঁহার যজ্ঞ দর্শন করিবার নিমিত্ত মূৰ্ত্তিমান্ তপঃ, যজ্ঞ, ব্রত, দীক্ষা, দিকপতিগণের সহিত দিকসমুদয় এবং দেবপত্নী, দেবকন্যা ও দেবজননীগণ সমবেত হইয়া প্রীতমনে তথায় আগমন করিলেন। ঐ সময় ব্রহ্মা মহাদেবের বর্হিযজ্ঞে দীক্ষিত হইয়া প্রজ্বলিত হুতাশনে, আহুতি প্রদান করিতেছিলেন। দেবকন্যাগণকে দেখিবামাত্র তাঁহার রেতঃ স্খলিত হইয়া ভূতলে নিপতিত হইল। তখন সূর্য্যদেব করদ্বারা সেই ভূতলনিপতিত ধূলিমিশ্রিত রেতঃ গ্রহণ করিয়া হুতাশনে নিক্ষেপ করিলেন। অনন্তর ভগবান্ প্রজাপতির পুনরায় রেতঃ স্থলিত হইল। তখন তিনি স্বয়ং অবিলম্বে সেই শুক্র স্রুবদ্বারা গ্রহণ করিয়া হবনীয় দ্রব্যের ন্যায় মন্ত্রোচ্চারণপূৰ্ব্বক অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলেন। ঐ রেতঃ ত্রিগুণাত্মক। উহা হুতাশনে নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র, উহার রাজসিক অংশ বিবিধ জঙ্গম ও তামসিক অংশ নানাবিধ স্থাবর ভূতরূপে পরিণত হইল এবং উহার সাত্ত্বিক অংশ রাজসিক ও তামসিক অংশ ভূতের অন্তর্ভূত হইয়া রহিল। ঐ সত্ত্বগুণ বিশ্বব্যাপক এবং বুদ্ধি ও ধর্ম্মপ্রবৃত্তিস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে।
‘অগ্নিতে ব্রহ্মার শুক্র আহুত হইলে প্রথমতঃ উহার শিখা হইতে ভৃগু, সধূম অঙ্গার হইতে অঙ্গিরাঃ ও নিধূম অঙ্গার হইতে কবির উৎপত্তি হয়। তৎপরে সেই যজ্ঞীয় হুতাশনের প্রভা হইতে মরীচি, যজ্ঞীয় কুশ হইতে বালখিল্যগণ ও মহর্ষি অত্রি এবং যজ্ঞীয় হুতাশনের ভস্মরাশি হইতে তপোবলসম্পন্ন শ্রুতশীলসমলঙ্কৃত ব্রহ্মর্ষিগণসদৃশ বৈশ্বানরগণ জন্মগ্রহণ করেন। পরে অগ্নির নেত্রদ্বয় হইতে সুরূপ অশ্বিনীতনয়দ্বয়, কর্ণ হইতে অন্যান্য প্রজাপতিগণ ও রোমকূপ হইতে মহর্ষিগণ, স্বেদজল হইতে ছন্দঃ ও বল হইতে মনঃ প্রাদুর্ভূত হইলেন। ঐ অগ্নির দাহ্যকাষ্ঠসমুদয় মাস, কাষ্ঠের নির্য্যাস পক্ষ এবং অগ্নির তৈজস পিত্ত, অহোরাত্র ও মুহূর্ত্তরূপে পরিণত হইল; পরিশেষে সেই হুতাশনে, শোণিত হইতে রৌদ্র ও সুবৰ্ণবর্ণ মৈত্র দেবতার, ধূম হইতে বসুগণ, শিখা হইতে দ্বাদশ আদিত্য এবং অঙ্গার হইতে গ্রহণক্ষত্রাদি জন্মগ্রহণ করিলেন। এই নিমিত্ত মহর্ষিগণ অগ্নিকে সৰ্ব্বদেবময় বলিয়া নির্দ্দেশ করেন। প্রজাপতি ব্রহ্মা উঁহাকে পরব্রহ্ম বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া গিয়াছেন।
রুদ্রাদি দেবত্রয়ের সন্তানসম্পর্কিত বিবাদ
এইরূপে ভৃগু প্রভৃতির সৃষ্টি হইলে বারুণীমূৰ্ত্তিধারী ভগবান্ ভূতনাথ দেবগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে সুরগণ! এই যজ্ঞ আমাকর্ত্তৃক অনুষ্ঠিত হইয়াছে, আমিই এই যজ্ঞের অধীশ্বর। অতএব সৰ্ব্বাগ্রে অগ্নি হইতে যে তিনটি পুত্র উৎপন্ন হইয়াছে, তাহারা আমারই পুত্র। আমি যজ্ঞ আহরণ করিয়াছি, সুতরাং যজ্ঞ হইতে যাহা যাহা উৎপন্ন হইল, তৎসমুদয় আমারই অধিকৃত সন্দেহ নাই।”
‘তখন অগ্নি কহিলেন, “হে দেবগণ! ঐ তিন অপত্য আমার আশ্রয় করিয়া আমারই অঙ্গ হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে, অতএব তাহারা আমার অপত্য। বরুণরূপী মহাদেব কখনই ইহাদিগের অধিকারী হইতে পারেন না।” অগ্নি এই কহিয়া নিরস্ত হইলে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা কহিলেন, “আমারই বীর্য্যের দ্বারা এই তিন অপত্যের উৎপত্তি হইয়াছে; অতএব ইহারা আমার সন্তান। শাস্ত্রানুসারে বীজবপ্তাই [বীজাধান কৰ্ত্তা—যেমন জমিতে যে বীজ বোনে, সে ফলস্বরূপ শস্য পায়; তদ্রূপ যে গর্ভাধান করে, সেই ফলস্বরূপ পুত্রের পিতা] ফলভভাগের অধিকারী হইয়া থাকে।”
এইরূপে তাহারা তিনজন পুত্র লইয়া বিবাদ আরম্ভ করিলে দেবগণ ভগবান্ ব্রহ্মার নিকট সমুপস্থিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহাকে অভিবাদনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভগবন্! আপনি এই সমুদয় জগতের সৃষ্টিকর্ত্তা। আমরা আপনা হইতে সমুদ্ভূত হইয়াছি। অতএব আপনি প্রসন্ন হইয়া মহাত্মা হুতাশন ও বরুণরূপী মহাদেবকে এক এক পুত্র প্রদানপূৰ্ব্বক উহাদিগের মনোরথ পূর্ণ করুন।”
ব্রহ্মার ব্যবস্থায় বিবাদভঞ্জন
‘দেবগণ এইরূপ কহিলে ভগবান্ ব্রহ্মা তাঁহাদের বাক্যে সম্মত হইয়া সূর্য্যের ন্যায় তেজস্বী ভৃগুকে মহাদেবের ও অঙ্গিরাকে অগ্নির পুত্ৰত্বে পরিকল্পিত করিয়া স্বয়ং কবিকে পুত্ররূপে গ্রহণ করিলেন। তখন প্রজাপতি মহাত্মা ভৃগু বারুণ, শ্ৰীমান অঙ্গিরা আগ্নেয় এবং মহাষশাঃ কবি ব্রাহ্ম বলিয়া বিখ্যাত হইলেন। তৎপরে মহাত্মা ভৃগু চ্যবন, বজ্ৰশীর্ষ, শুচি, ঔৰ্ব্ব, শুক্র, বিভু ও সবন এই সাতটি আত্মতুল্য পুণ্যবান পুত্র উৎপাদন করিলেন। তুমি সেই ভৃগুবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া ভার্গব নাম ধারণ করিয়াছ। ভগবান্ অঙ্গিরা হইতে বৃহস্পতি, উতথ্য, পয়স্য, শান্তি, ঘোর, বিরূপ, সংবৰ্ত্ত ও সুধন্বা এবং ভগবান্ কবি হইতে কবি, কাব্য, ধৃষ্ণু, শুক্রাচার্য্য, ভৃগু, বিরজা, কাশী ও উগ্র উৎপন্ন হয়েন। তৎপরে ঐ সমুদয় মহাত্মা হইতে বিবিধ বংশ সমুৎপন্ন হয়। এই নিমিত্ত উঁহারা প্রজাপতি বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। এইরূপে ভগবান্ ভৃগু, অঙ্গিরা ও কবির বংশজাত প্রজাসমূহে জগৎ পরিপূর্ণ হইয়াছে। বরুণমূৰ্ত্তিধারী ভগবান্ মহাদেবের যজ্ঞ হইতে মহাত্মা ভৃগু, অঙ্গিরা ও কবি উৎপন্ন হইয়াছিলেন, এই নিমিত্তি উঁহাদিগের বংশসমুদয়ের সাধারণ নাম বারুণ। কিন্তু ভৃগুর বংশে যাঁহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারা আঙ্গিরস এবং কবির বংশে যাঁহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারা কাব্য বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন।
‘হে রাম! পূর্ব্বে দেবগণ সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মার নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে কহিয়াছিলেন, “ভগবন্! আপনি প্রসন্ন হইয়া অনুজ্ঞা করুন, মহর্ষি ভৃগু প্রভৃতির বংশসম্ভূত এই সমুদয় মহাত্মা প্রজাপতি, বংশকর্ত্তা, তপস্যা ও ব্রহ্মচর্য্যনিরত, দেবপক্ষপরায়ণ ও প্রশান্তমূৰ্ত্তি হইয়া আপনার তেজ পরিবর্দ্ধিত করিয়া আপনার প্রসাদে লোকসমুদয়ের উদ্ধারসাধনে প্রবৃত্ত হউন। ঐ মহাত্মাগণ ও আমরা সকলেই আপনার সৃষ্টপদার্থ। সুতরাং আমরা পরস্পরকে অভিবাদন করিব। ঐ সমুদয় মহাত্মা প্রতিযুগে এইরূপে প্রজাগণের সৃষ্টি করিবেন।” দেবগণ এইরূপে প্রার্থনা করিলে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা প্রীতমনে ‘তথাস্তু’ বলিয়া তাঁহাদের বাক্যে স্বীকৃত হইলেন এবং দেবগণ-কৃতকার্য্য হইয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন। হে রাম! বরুণরূপধারী দেবদেব মহাদেবের যজ্ঞে যেসমুদয়, অদ্ভুতকাণ্ড উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিলাম।
‘অগ্নি, প্রজাপতি ব্রহ্মা ও পশুপতি রুদ্রস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন। সুবর্ণ সেই অগ্নির অপত্য। বেদে ও শাস্ত্রানুসারে অগ্নির অভাবে সুবর্ণই অগ্নিস্বরূপে পরিগণিত হয়। কুশস্তম্ভে সুবর্ণ সন্নিবেশিত করিয়া অগ্নির উদ্দেশে আহুতি প্রদত্ত হইয়া থাকে। বল্মীকবিবর [উইয়ের ঢিপি], ছাগ পশুর দক্ষিণ কর্ণ, সমভূমি ও তীর্থসলিলে আহুতি প্রদান করিলে ভগবান্ অগ্নি প্রীতিলাভ করিয়া থাকেন। অগ্নি সৰ্ব্বদেবময়; সনাতন ব্রহ্মা হইতে অগ্নি উৎপন্ন হইয়াছেন। অগ্নি হইতে কাঞ্চনের উৎপত্তি হইয়াছে। সুতরাং যিনি সুবর্ণ দান করেন, তাঁহার সমস্ত [সমস্ত দেবতা তাহাকে অভীষ্ট প্রদান করিয়া থাকেন] দেবতা প্রদান করা হয়। ঐ দানজন্য পুণ্যপ্রভাবে তাঁহার উজ্জ্বল লোকসমুদয় লাভ হইয়া থাকে এবং ধনাধিপতি কুবের তাঁহাকে স্বর্গে অভিষিক্ত করেন।
‘যিনি প্রাতঃকালে মন্ত্র উচ্চারণপূৰ্ব্বক সুবর্ণ দান করেন, তাঁহার দুঃস্বপ্ন প্রতিহত হইয়া যায়। যিনি মধ্যাহ্নে সুবর্ণ দান করেন, তাঁহার অনাগত পাপ বিনষ্ট হয় এবং যিনি সায়াহ্নে সুবর্ণ দান করেন, তিনি ব্রহ্মা, বায়ু, অগ্নি ও চন্দ্রের সলোকতা, ইন্দ্রলোকে প্রতিষ্ঠা ও ইহলোকে যশোলাভ করিয়া থাকেন, তাঁহার সমুদয় পাপ ধ্বংস হইয়া যায়। ইহলোকে তাঁহার অনুরূপ আর কেহই থাকে না এবং তিনি অনায়াসে সমুদয় লোকে গমন করিতে পারেন। সুবর্ণ দান করিয়া যে সমস্ত উৎকৃষ্ট লোকলাভ হয়, তাহা অক্ষয় হইয়া থাকে। যিনি সূর্য্যোদয় হইলে অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া কোন ব্রত উপলক্ষ্যে সুবর্ণ দান করেন, তাঁহার সমুদয় কামনাই সফল হয়। সুবর্ণ অগ্নিস্বরূপ, সুবর্ণ দান করিলে সুখবৃদ্ধি, অভিষ্টগুণলাভ ও চিত্ত বিশুদ্ধ হইয়া থাকে। হে রাম! এই আমি তোমার নিকট সুবর্ণ ও কার্ত্তিকেয়ের উৎপত্তি-বৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করিলাম। মহাত্মা কার্ত্তিকেয় এইরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া ক্ৰমশঃ পরিবর্দ্ধিত হইলে দেবাসুরসংগ্রামে দেবগণকর্ত্তৃক সেনাপতিত্বে বৃত হইয়াছিলেন এবং ইন্দ্রের আজ্ঞায় দুর্দ্দান্ত তারক ও অন্যান্য দানবগণকে বিনাশপূৰ্ব্বক লোকের হিতসাধন করিয়াছিলেন। হে জামদগ্ন্য! আমি যে সুবর্ণদানের ফল কীৰ্ত্তন করিলাম, তাহা তুমি শ্রবণ করিলে। অতএব তুমি পবিত্র হইয়া ব্রাহ্মণকে সুবর্ণ দান কর। এই কথা কহিলে ভগবান্ জামদগ্ন্য তাঁহার বাক্যানুসারে নিরন্তর ব্রাহ্মণগণকে সুবর্ণদানপূৰ্ব্বক পাপনিৰ্মুক্ত হইলেন।
“হে যুধিষ্ঠির! এই আমি তোমার নিকট সুবর্ণের উৎপত্তি ও সুবৰ্ণদানের ফল কীৰ্ত্তন করিলাম। অতএব তুমি ব্রাহ্মণগণকে সুবর্ণ দান কর, সুবর্ণদানপ্রভাবে অনায়াসেই পাপ হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারিবে।”
