2 of 4

৮৩. গোলোকমাহাত্ম্য—ইন্দ্ৰ-ব্ৰহ্মার কথোপকথন

৮৩তম অধ্যায়

গোলোকমাহাত্ম্য—ইন্দ্ৰ-ব্ৰহ্মার কথোপকথন

ভীষ্ম কহিলেন, ‘যাঁহারা গোদান ও হুতাবশিষ্ট বস্তু ভোজন করেন, তাঁহারা নিত্য যজ্ঞানুষ্ঠানের ফললাভ করিতে সমর্থ হয়েন। দধি ও ঘৃত ব্যতীত যজ্ঞ সম্পাদিত হয় না, এই নিমিত্ত ধেনুগণ যজ্ঞের মূল বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকে। সমুদয় দান অপেক্ষা গোদান অতি প্রশস্ত। পণ্ডিতেরা গোসমুদয়কে পরমপবিত্র ও শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন, অতএব পুষ্টি ও শান্তিলাভের নিমিত্ত গোসমূহের সেবা করা অবশ্যই কর্ত্তব্য। গোসমুৎপন্ন দুগ্ধ, দধি ও ঘৃতপ্রভাবে সমুদয় পাপ বিনষ্ট হয় এবং গোসমুদয়ের তেজ উভয়লোকেই শ্রেষ্ঠ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। ফলতঃ গোসমুদয় অপেক্ষা পরম পবিত্র আর কিছুই নাই।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই উপলক্ষ্যে ব্রহ্মাসবসংবাদ নামক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। দেবরাজ ইন্দ্র দৈত্যগণকে পরাভূত করিয়া ত্রিভুবনের অধীশ্বর হইলে সমুদয় প্রজা সত্যধর্ম্মপরায়ণ হইয়াছিল। ঐ সময় একদা মহর্ষি, গন্ধৰ্ব্ব, কিন্নর, উরগ, রাক্ষস, দেবতা, অসুর, সুপর্ণ ও প্রজাপতিগণ সকলেই ভগবান ব্রহ্মার নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাঁহার উপাসনা করিতে লাগিলেন। নারদ, পর্ব্বত, বিশ্বাবসু ও হাহাহুহু প্রভৃতি গন্ধৰ্ব্বগণ তাললয়বিশুদ্ধ সুমধুর সঙ্গীত করিয়া তাঁহার তুষ্টিসম্পাদন করিতে আরম্ভ করিলেন। সমীরণ দিব্যকুসুম আহরণপূৰ্ব্বক মন্দ মন্দ প্রবাহিত হইতে লাগিল, ঋতুসমুদয় বিবিধ সুগন্ধি পুষ্প আহরণ করিতে আরম্ভ করিল। দিব্যবাদিত্ৰসকল বাদিত হইতে লাগিল এবং সমুদয় প্রাণী একত্র সমবেত হইল। ঐ সময় দেবরাজ ইন্দ্ৰ সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মাকে অভিবাদন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! লোকপালদিগের উপরিভাগে কি নিমিত্ত গোলোক সংস্থাপিত হইল? ধেনুগণ কিরূপ তপস্যা বা ব্রহ্মচর্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছিল যে, তাহারা দেবগণের উপরিভাগে পরমসুখে কালহরণ করিতেছে? এই বিষয় পরিজ্ঞাত হইতে আমি নিতান্ত সমুৎসুক হইয়াছি, অতএব আপনি ইহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।’

স্বর্গীয় গোজাতির মর্ত্যে অবতরণ

“দেবরাজ এইরূপ প্রশ্ন করিলে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান ব্রহ্মা তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘সুররাজ! তুমি ধেনুকে অবজ্ঞা করিয়াছিলে, এই নিমিত্ত তাহাদিগের মাহাত্ম্য পরিজ্ঞাত হইতে পার নাই, এক্ষণে আমি তোমার নিকট গোসমুদয়ের প্রভাব ও মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পণ্ডিতেরা ধেনুসমুদয়কে যজ্ঞাঙ্গ ও যজ্ঞস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। ধেনু ব্যতীত কখনই যজ্ঞ সম্পাদিত হয় না। প্রজাগণ ধেনুসমুদয় হইতে সমুৎপন্ন দুগ্ধ ও ঘৃতদ্বারা জীবনধারণ করিয়া থাকে। উহাদের গর্ভজাত বৃষদ্বারা কৃষিকার্য্য নির্ব্বাহ হইলে ধান্য ও বিবিধ বীজ উৎপন্ন হয় এবং তদ্দ্বারা যজ্ঞ ও হব্যকব্যের অনুষ্ঠান হইয়া থাকে। পরমপবিত্র গোসমুদয় হইতেই যজ্ঞসাধন দুগ্ধ, দধি ও ঘৃত উৎপন্ন হয়। উহারা ক্ষুৎপিপাসায় নিতান্ত কাতর হইয়াও বিবিধ ভারবহন করে এবং অমায়িক ব্যবহার ও সৎকার্য্যদ্বারা মহর্ষি ও অন্যান্য প্রাণীদিগকে রক্ষা করিয়া থাকে। এই নিমিত্ত আমাদিগের উপরিভাগে উহাদিগের লোক সংস্থাপিত হইয়াছে, উহারা প্রসন্ন হইলে নিশ্চয়ই বর প্রদান করিয়া থাকে।

‘হে দেবরাজ! গোসমূহ যে কারণে দেবলোকের উপরিভাগে বাস করে, তাহা তোমার নিকট কীৰ্ত্তন করিলাম। এক্ষণে উহারা যে নিমিত্ত পৃথিবীতে অবতীর্ণ হইল, তাহা বিশেষরূপে কহিতেছি, শ্রবণ কর। সত্যযুগে দানবগণ ত্রিলোকের অধীশ্বর হইলে ভগবান বিষ্ণু পৃথিবীতে জন্মপরিগ্রহ করিতে স্বীকার করিয়াছিলেন। ঐ সময় দেবজননী অদিতি পুত্রার্থিনী হইয়া একপদে অবস্থানপূর্ব্বক কঠোর তপানুষ্ঠান করেন। ধর্ম্মপরায়ণা যক্ষদুহিতা সুরভী তৎকালে অদিতির ঘোরতর তপস্যাদর্শনে পরিতুষ্ট হইয়া দেবগন্ধৰ্ব্বসেবিত পরমরমণীয় কৈলাসশিখরে গমন করিয়া একপদে অবস্থানপূর্ব্বক একাদশসহস্র বৎসর কঠোর তপানুষ্ঠান করিলেন। দেবতা, মহর্ষি ও মহোরগগণ তাঁহার বিস্ময়কর তপস্যায় প্রীত হইয়া সতত তাঁহার উপাসনা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে আমি সুরভীর সমীপে সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলাম, “বৎসে! আমি তোমার তপস্যায় প্রীত হইয়াছি, এক্ষণে তুমি বর প্রার্থনা কর।”

‘সুরভী কহিলেন, “ভগবন্! আমার অন্য কোন বরে প্রয়োজন নাই, আপনি প্রসন্ন হওয়াতেই আমার বরলাভ হইয়াছে।” সুরভী এইরূপে কোন বর প্রার্থনা না করিলে আমি তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলাম, “বৎসে! আমি তোমার তপস্যা ও নিস্পৃহতা দর্শনে যারপরনাই প্রীত হইয়া তোমাকে অমরত্ব প্রদান করিলাম। তুমি আমার প্রসাদে চিরকাল সমুদয় লোকের উপরিভাগে বাস করিতে পারিবে; তোমার লোক গোলোক বলিয়া লোকসমাজে বিখ্যাত হইবে; তোমার দুহিতৃগণ মানবগণের শুভকার্য্য সাধনপূৰ্ব্বক মনুষ্যলোকে অবস্থান করিবে এবং কি স্বর্গীয়, কি লৌকিক সকল সুখই তুমি অনুভব করিতে সমর্থ হইবে।” হে দেবরাজ! আমি এইরূপ বর প্রদান করাতেই গোলোক সৰ্ব্বকামসমন্বিত হইয়াছে। মৃত্যু, জরা, অনল, দুর্দ্দৈব, অশুভ কখন ঐ লোক আক্রমণ করিতে সমর্থ হয় না। ঐ লোক দিব্য-অরণ্য, দিব্য-আভরণ ও কামচারী বিমানসমুদয়ে সমলঙ্কৃত রহিয়াছে। লোকে ব্রহ্মচর্য্য, তপস্যা, জিতেন্দ্রিয়তা, দান ও তীর্থপর্য্যটন প্রভৃতি বিবিধ সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিলেই ঐ লোক লাভ করিতে সমর্থ হয়। এই আমি তোমার নিকট গোসমুদয়ের মাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলাম; অতএব গোসমূহের প্রতি অশ্রদ্ধা করা তোমার কখনই কর্ত্তব্য নহে।”

ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! সৰ্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা এইরূপ গোমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলে ভগবান্ ইন্দ্র তাঁহার বাক্যশ্রবণে গোসমুদয়ের প্রতি নিতান্ত ভক্তিপরায়ণ হইলেন। এই আমি তোমার নিকট সৰ্ব্বপাপবিনাশন পরমপবিত্র গোমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করিলাম। যে ব্যক্তি সর্ব্বদা সমাহিত হইয়া যজ্ঞ ও পিতৃকার্য্যসময়ে ব্রাহ্মণগণের নিকট এই পবিত্র গোমাহাত্ম্য কীৰ্ত্তন করেন, তাঁহার পিতৃগণের সৰ্ব্বকামসম্পন্ন অক্ষয় গোলোক লাভ হয়। গোভক্তিপরায়ণ ব্যক্তি পুত্ৰার্থী হইলে পুত্র, কন্যার্থী হইলে কন্যা, ধৰ্ম্মাথ হইলে ধৰ্ম্ম, ধনার্থী হইলে ধন, বিদ্যার্থী হইলে বিদ্যা ও সুখার্থী হইলে সুখ লাভ করিতে পারে, সন্দেহ নাই। ফলতঃ গোভক্তিপরায়ণ ব্যক্তিদিগের কিছুই দুর্ল্লভ হয় না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *