৭৯তম অধ্যায়
গোজাতির পূর্ব্বজন্মবৃত্তান্ত
“মহর্ষি বশিষ্ঠ কহিলেন, ‘হে মহারাজ! পূৰ্ব্বে গোজাতি শ্রেষ্ঠত্বলাভের নিমিত্ত লক্ষ বৎসর কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়াছিল। ঐ সময় তাহাদিগের মনে এই বাসনা হইয়াছিল যে, আমরা সমুদয় দক্ষিণার মধ্যে প্রধান হইব, আমাদিগকে কখন কোন দোষে লিপ্ত হইতে হইবে না, লোকে আমাদের পুরীষমিশ্রিত জলে স্নান করিয়া পবিত্র হইবে, দেবতা মনুষ্য প্রভৃতি সকলেই পবিত্রতাসম্পাদনার্থ আমাদের পুরীষ ব্যবহার করিবে এবং যাঁহারা আমাদিগকে দান করিবেন, তাঁহারা অনায়াসে আমাদিগের লোক লাভ করিতে পারিবেন।
‘গোসমুদয় এইরূপ কামনা করিয়া লক্ষ বৎসর কঠোর তপানুষ্ঠান করিলে, ভগবান্ ব্রহ্মা তাহাদিগের প্রতি প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, “আমার বরে তোমাদের সমুদয় কামনা সফল হইবে। অতঃপর তোমরা ইহলোকে অবস্থান করিয়া প্রাণীগণের নিস্তার কর।” গোসমূহ ব্রহ্মার নিকট এইরূপ বর প্রাপ্ত হইয়া অবধি লোকসমুদয়কে পবিত্র করিয়া আসিতেছে এবং সকল লোকের আশ্রয়, পরমপবিত্র ও সৰ্ব্বভূতের শিরোধার্য্য বলিয়া পরিগণিত হইয়াছে। অতএব যে ব্যক্তি প্রাতঃকালে গোসমূহকে নমস্কার করেন, তিনি নিশ্চয়ই পুষ্টিলাভে সমর্থ হয়েন।
‘যিনি ব্রাহ্মণকে বস্ত্র ও কপিলবর্ণ বৎসের সহিত পয়স্বিনী [দুগ্ধবতী] কপিলাধেনু প্রদান করেন, তিনি ব্রহ্মলোকে; যিনি ব্রাহ্মণকে বস্ত্র ও লোহিতবর্ণ ধেনু প্রদান করেন, তিনি সূর্য্যলোকে; যিনি বস্ত্র ও বিবিধবর্ণা বৎসের সহিত পয়স্বিনী বিবিধবর্ণা ধেনু প্রদান করেন, তিনি চন্দ্রলোকে; যিনি বস্ত্র ও শ্বেতবর্ণ বৎসের সহিত পয়স্বিনী শ্বেতবর্ণা ধেনু প্রদান করেন, তিনি ইন্দ্রলোকে; যিনি বস্ত্র ও কৃষ্ণবর্ণ বৎসের সহিত পয়স্বিনী কৃষ্ণধেনু প্রদান করেন, তিনি অগ্নিলোকে এবং যিনি বস্ত্র ও ধূম্রবর্ণা বৎসের সহিত ধূম্রবর্ণা ধেনু প্রদান করেন, তিনি যমলোকে সকলের নিকট সম্মানলাভে অধিকারী হয়েন। যিনি ব্রহ্মলোকে কাংস্যদোহনপাত্র ও বংসের সহিত জলফেনের ন্যায় শুভ্রবর্ণ সবৎসা পয়স্বিনী ধেনু প্রদান করেন, তাঁহার বরুণলোকলাভ হয়। যিনি কাংস্যদোহনপাত্র ও বস্ত্রের সহিত সবুৎসা, বায়ুসমুত্থিত ধূলির ন্যায় ধূসরবর্ণা ধেনু প্রদান করেন, তিনি বায়ুলোকে পূজ্য হয়েন। যিনি কাংস্যপাত্র ও বস্ত্রের সহিত হিরণ্যবর্ণা পিঙ্গলাক্ষী সবৎসা ধেনু প্রদান করেন, তাঁহার কুবেরলোকলাভ হয়। যিনি কাংস্যদোহনপাত্র ও বস্ত্রের সহিত ধূম্রবর্ণা সবৎসা ধেনু প্রদান করেন, তিনি পিতৃলোকে সম্মানলাভ করিয়া থাকেন। যিনি ব্রাহ্মণকে কণ্ঠভূষণ ও অন্যান্য অলঙ্কারের সহিত সবৎসা স্থূলাঙ্গী ধেনু প্রদান করেন, তাঁহার বিশ্বদেবগণের লোক, যিনি ব্রাহ্মণকে বস্ত্র ও গৌরবর্ণ বৎসের সহিত পয়স্বিনী গৌরবর্ণা ধেনু প্রদান করেন, তিনি বসুদিগের লোকলাভে অধিকারী হয়েন এবং যিনি কাংস্যদোহনপাত্র ও বস্ত্রের সহিত শ্বেতকম্বলবর্ণা সবৎসা ধেনু প্রদান করেন, তিনি সাধ্যগণের লোকলাভপূৰ্ব্বক পরম সুখ অনুভব করিয়া থাকেন।
“যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে সৰ্ব্বরত্নসমলঙ্কৃত প্রশস্তপৃষ্ঠ বৃষ দান করেন, তাঁহার মরুদগণের লোক; যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে সৰ্ব্বরত্নসমন্বিত নীলকলেবর যুবা বৃষ প্রদান করেন, তাঁহার গন্ধৰ্ব্ব ও অঙ্গরাদিগের লোক এবং যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণকে সৰ্ব্বরত্নভূষিত কণ্ঠাভরণযুক্ত বৃষ দান করেন, তাঁহার প্রজাপতির লোকলাভ হইয়া থাকে। যে মহাত্মা গোদানে একান্ত নিরত হয়েন, তিনি সূৰ্য্যের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন দিব্যবিমানে আরূঢ় হইয়া জলদজাল [মেঘ] ভেদপূৰ্ব্বক অনায়াসে স্বর্গে গমন করিয়া বিরাজিত হয়েন। তথায় পৃথুনিতম্বিনী [স্থূলনিতম্বা—স্থূল পাছা], সুচারুবেশা পুরনারীগণ হাবভাবাদিদ্বারা তাহাকে সতত আহ্লাদিত এবং বীণা, বল্লকী [বীণা] ও নূপুর প্রভৃতির মধুর নিনাদদ্বারা নিদ্রাবসানে জাগরিত করে। যে মহাত্মা বিধিপূৰ্ব্বক ধেনুদান করেন, তিনি সেই প্রদত্ত ধেনুর রোমপরিমিত বৎসর স্বর্গসুখ অনুভব করিয়া পরিশেষে শ্রেষ্ঠকুলে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক অতুল সুখভোগ করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই।’ ”
