৭৮তম অধ্যায়
কপিলাদানমাহাত্ম্য–বশিষ্ঠ-সৌদাসসংবাদ
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পূৰ্ব্বকালে ইক্ষ্বাকুবংশে সৌদাসনামে এক নরপতি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি একদা সৰ্ব্বলোকচর স্বীয় কুলপুরোহিত ভগবান্ বশিষ্ঠকে অভিবাদনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! ত্রিলোকমধ্যে পবিত্র কি এবং মনুষ্য সর্ব্বদা কিরূপ মন্ত্র পাঠ করিলে উৎকৃষ্ট পুণ্যলাভ করিতে পারে, তৎসমুদয় আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।’
“তখন গোমন্ত্রবিশারদ পরমপবিত্র মহর্ষি বশিষ্ঠ গোসমুদয়কে নমস্কার করিয়া সৌদাসকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! গোসমুদয়ের গাত্র হইতে গুগ্গুল গন্ধ ও অন্যান্য প্রকার সুগন্ধ নিঃসৃত হয়। উহারা প্রাণীগণের স্থিতি, ভূত, ভবিষ্যৎ, সনাতন পুষ্টি ও লক্ষ্মীর কারণ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে। অতএব উহাদিগকে যাহা প্রদান করা যায়, তাহা কখনই নিষ্ফল হয় না। পণ্ডিতেরা গোসমুদয়কে লোকের অন্ন, দেবোদ্দেশে হবনীয় দ্রব্য, স্বাহাকার, বষট্কার যজ্ঞ ও যজ্ঞফলের কারণ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। গোসমুদয় প্রাতঃকাল ও সায়ংকালে হোমসময়ে মহর্ষিগণকে হবিঃ প্রদান করে। অতএব যাঁহারা ধেনু দান করেন, তাতাঁরা অনায়াসে সমুদয় দুষ্কৃত হইতে বিমুক্ত হয়েন। সহস্ৰ ধেনুর অধীশ্বর শত ধেনু দান করিলে তাহার যে ফললাভ হয়, শত ধেনুর অধিপতি দশ ধেনু এবং দশ ধেনুর অধিপতি একমাত্র ধেনু প্রদান করিয়া সেই ফললাভ করিতে পারেন। যাহারা শত ধেনুর অধিপতি হইয়াও অগ্ন্যাধ্যানে পরাঙ্মুখ, যাহারা সহস্ৰ ধেনুর অধিপতি হইয়াও অযাজ্ঞিক এবং যাহারা সমৃদ্ধিশালী হইয়াও কৃপণ হয়, তাহাদিগের সৎকার করা কখনই কর্ত্তব্য নহে।
‘কাংস্যময় দোহনপাত্রের সহিত বস্ত্রসংবীত [বস্ত্রাচ্ছাদিত] সবৎসা কপিলাধেনু প্রদান করিলে অনায়াসে উভয়লোক জয় করা যায়। যাঁহারা শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণকে শত যূথপতি দীর্ঘশৃঙ্গ বলবান্ অলঙ্কৃত বৃষ দান করেন, তাঁহারা প্রতিজন্মেই অতুল ঐশ্বর্য্যলাভ করিতে পারেন। গোনাম কীৰ্ত্তন করিয়া শয়ন ও গাত্রোত্থান, প্রাতঃকাল ও সায়ংকালে গোসমুদয়কে নমস্কার, গোমূত্র ও গোময় দর্শনে অবজ্ঞা পরিহার এবং গোমাংসভক্ষণের বাসনা পরিত্যাগ করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যাঁহারা এইরূপ নিয়ম প্রতিপালন করিতে পারেন, তাঁহারা অবশ্যই পুষ্টিলাভে সমর্থ হয়েন। গোসমুদয়কে অশ্রদ্ধা করা কদাপি বিধেয় নহে। মনুষ্য সৰ্ব্বসময়ে, বিশেষতঃ দুঃস্বপ্নদর্শনের পর গোনাম কীৰ্ত্তন করিবে। গোময়মিশ্রিত জলে স্নান ও গোকরীষে [গোবরের খুঁটিয়ায়] উপবেশন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। গোকরীযে শ্লেষ্মা, মূত্র ও পুরীষ পরিত্যাগ করা কদাপি বিধেয় নহে। যাহারা আর্দ্র গোচৰ্ম্মে উপবিষ্ট হইয়া ধৃতভোজনপূৰ্ব্বক পশ্চিমদিক্ অবলোকন, অগ্নিতে ঘৃতাহুতি প্রদান, ঘৃতদ্বারা স্বস্তিবাচন, ঘৃতদান ও ঘৃত ভোজন করেন, তাঁহাদের গোসমৃদ্ধি বৃদ্ধি হয়। যে ব্যক্তি গোমতীবিদ্যাদ্বারা সৰ্ব্বরত্নযুক্ত তিলধেনু মন্ত্রপূত করিয়া ব্রাহ্মণকে দান করেন, তাঁহাকে কখনই শোকতাপে লিপ্ত হইতে হয় না। কি দিবা, কি রজনী, কি নিঃশঙ্ক [নির্ভয়] প্রদেশ, কি ভয়ানক স্থান, সর্ব্বকালে সর্ব্বত্র সকল মনুষ্যেরই এই বাক্য উচ্চারণ করা আবশ্যক যে, “নদীসমুদয় যেমন সাগরকে প্রাপ্ত হয়, তদ্রূপ সুবর্ণশৃঙ্গসম্পন্না দুগ্ধবতী সুরভী ও সৌরভেয়ী ধেনুসমুদয় আমাকে প্রাপ্ত হউন, আমি সৰ্ব্বদা গোসমুদয়কে দর্শন করি এবং গোসমুদয় আমাকে সতত দর্শন করুন; আমি গোসমুদয়ের আশ্রিত ও গোসমুদয়ও আমার আশ্রিত এবং গোসমূহ যে স্থানে অবস্থান করিবেন, আমাকেও সেই স্থানে অবস্থান করিতে হইবে।” হে মহারাজ! লোকে মহাভয়ের সময়েও এই বাক্য উচ্চারণ করিলে অনায়াসেই তাহা হইতে বিমুক্ত হয়।”
