2 of 4

৬৮. দানপ্রসঙ্গে যম-ব্রাহ্মণসংবাদ—দূতের ভ্রম

৬৮তম অধ্যায়

দানপ্রসঙ্গে যম-ব্রাহ্মণসংবাদ—দূতের ভ্রম

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি পুনৰ্ব্বার আমার নিকট তিল, দীপ, অন্ন ও বস্ত্রদানের বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! এই উপলক্ষ্যে যম-ব্রাহ্মণসংবাদনামক এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে গঙ্গা ও যমুনার মধ্যদেশে যামুনগিরির নিম্নভাগে পর্ণশালানামে এক অতিরমণীয় প্রসিদ্ধ গ্রাম ছিল। ঐ গ্রামে অসংখ্য বিদ্বান ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। একদা যমরাজ কাকের ন্যায় জঙ্ঘা ও নাসিকাসম্পন্ন, কৃষ্ণবসন, উৰ্দ্ধবোমা, লোহিতাক্ষ এক পুরুষকে কহিলেন,—“তুমি অবিলম্বে পর্ণশালানামক গ্রামে গমন করিয়া অগস্ত্যগোত্ৰসমুদ্ভূত শান্তস্বভাব অধ্যাপক মহাত্মা শর্ম্মীকে যত্নপূৰ্ব্বক আনয়ন কর। আমি সেই মহাত্মার যথোচিত সৎকার করিব। তাঁহার গৃহের পার্শ্বে তাঁহার বয়ঃসম্পন্ন আর এক ব্রাহ্মণ বাস করেন, দেখিও, যেন ভ্রমক্রমে শৰ্ম্মীর পরিবর্তে তাঁহাকে আনয়ন করিও না।’ যমদূত মহাত্মা যমকর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া অচিরাৎ পর্ণশালানগরীতে গমনপূৰ্ব্বক যমরাজ যাঁহাকে আনয়ন করিতে নিষেধ করিয়াছেন, ভ্রমক্রমে তাঁহাকেই তাঁহার সমীপে সমানীত করিল। তখন ভগবান্ কৃতান্ত সেই ব্রাহ্মণকে দর্শনমাত্র গাত্রোত্থানপূৰ্ব্বক তাঁহার যথোচিত সৎকার করিয়া দূতকে কহিলেন, ‘দেখ, আমি যাঁহাকে আনিতে নিষেধ করিয়াছিলাম, তুমি তাঁহাকেই আনয়ন করিয়াছ; অতএব শীঘ্রই ইঁহাকে ইঁহার আবাসে সংস্থাপিত করিয়া আমার নির্দ্দিষ্ট ব্রাহ্মণকে আনয়ন কর।’

“ভগবান্ কৃত্তান্ত দূতকে এইরূপ কহিলে সেই ব্রাহ্মণ বৈরাগ্যযুক্ত হইয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ধৰ্ম্মরাজ! এ স্থান হইতে গমন করিতে আমার বাসনা নাই; যতদিন আমার কাল পূর্ণ না হয়, ততদিন আমি এই স্থানেই অবস্থান করিব।’

“তখন ভগবান্ যম তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আমি, লোকের আয়ুঃসত্ত্বে তাহাকে কদাপি আপনার আলয়ে স্থান দান করিতে পারি না। কেবল কালপ্রভাবে ক্ষীণায়ু ব্যক্তিদিগের ধর্ম্মাধর্ম্ম অবধারণ ও গতিবিধান করিতেই আমার ক্ষমতা আছে; সুতরাং আপনাকে এই যমলোকে বাস করিতে অনুমতি প্রদান করা আমার সাধ্য নহে; অতএব অদ্যই আপনাকে স্বীয় ভবনে গমন করিতে হইবে। এক্ষণে এই স্থানে অবস্থান ভিন্ন আপনি আমার নিকট আর যাহা প্রার্থনা করিবেন, আমি নিশ্চয়ই আপনার সেই প্রার্থনা পূরণ করিব।’ ভগবান কৃতান্ত এই কথা কহিলে ব্রাহ্মণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ধৰ্ম্মরাজ! আপনি ত্রিলোকের সাক্ষিস্বরূপ; অতএব মর্ত্যলোকে যে যে কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে পুণ্যলাভ হয়, তৎসমুদয় আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।’

শৰ্ম্মীপ্রতিবেশিসমীপে যমের দানধৰ্ম্মকীৰ্ত্তন

“যম কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি আপনার নিকট দানবিধি যথার্থরূপে কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। তিলদানকে পরমদান বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। তিলদান করিলে অক্ষয় পুণ্যলাভ হইয়া থাকে। অতএব যথাশক্তি তিলদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ব্যক্তি প্রত্যহ তিলদান করেন, তাঁহার সমুদয় কামনা পূর্ণ হয়। শ্রাদ্ধে তিলদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কিছুই নাই। অতএব আপনি বিধিপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণকে তিলদান করিবেন। বৈশাখী পৌর্ণমাসীতে ব্রাহ্মণগণকে তিলদান, তিলভক্ষণ ও তিলস্পর্শ করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। যাঁহারা সম্পূর্ণ উন্নতিলাভের বাসনা করেন, তাঁহাদিগের নিত্য জলদান ও জলপান করা নিতান্ত আবশ্যক। ইহলোকে পুষ্করিণী, তড়াগ ও কূপসমুদয় অতিশয় দুর্ল্লভ; এই নিমিত্ত ঐ সমুদয় খনন করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য। সৰ্ব্বদা জলপান করিলে উৎকৃষ্ট পুণ্যলাভ করা যায়। অতএব আপনি নিয়ত জলদানের নিমিত্ত জলাশয় খনন ও ভোজনাবসানে জলদান করিবেন।”

যমবর্ণিত প্রদীপাদি দানের প্রশংসা

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহাত্মা যম ব্রাহ্মণকে এইরূপ কহিলে, যমদূত স্বীয় প্রভুর আজ্ঞানুসারে তাঁহাকে তাঁহার ভবনে সংস্থাপিত করিয়া মহাত্মা শৰ্ম্মীকে গ্রহণপূৰ্ব্বক পুনৰ্ব্বার যমলোকে উপস্থিত হইল। তখন প্রতাপান্বিত ভগবান্ যম ধৰ্ম্মপরায়ণ মহাত্মা শর্ম্মীকে অবলোকন করিবামাত্র যথোচিত পূজা ও বিবিধ উপদেশ প্রদান করিয়া দূতদ্বারা তাঁহাকে তাঁহার আলয়ে প্রেরণ করিলেন। মহাত্মা শৰ্ম্মী স্বীয় গৃহে উপনীত হইয়া যমের উপদেশানুসারে কার্য্য করিতে লাগিলেন।

“দীপদান করিলে পিতৃলোকের সন্তোষসাধন করা যায় বলিয়া ভগবান্ যম ঐ দানের অতিশয় প্রশংসা করিয়া থাকেন। যাঁহারা নিত্য দীপদান করেন তাঁহারা পিতৃলোকে নিশ্চয়ই সদ্‌গতিলাভে সমর্থ হয়েন। নিয়ত দীপদান করিলে দেবতা, পিতৃলোক ও আপনার চক্ষুর তেজঃ বৃদ্ধি হয়; অতএব নিত্য দীপদান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ব্রাহ্মণ রত্ন বিক্রয় করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাঁহাকে রত্নদান করিলে মহাপুণ্যলাভ হইয়া থাকে। ব্রাহ্মণ দাতার নিকট হইতে প্রতিগৃহীত রত্ন বিক্রয় করিয়া যজ্ঞানুষ্ঠান করিলে তাঁহাকে কখনই বিক্রয় ও প্রতিগ্ৰহজনিত দোষে লিপ্ত হইতে হয় না। ধৰ্ম্মজ্ঞ মহাত্মা মনু কহিয়াছেন, যদি কোন ব্রাহ্মণ দাতার নিকট ধন গ্রহণ করিয়া সুব্রাহ্মণগণকে তৎসমুদয় প্রদান করেন, তাহা হইলে তাঁহার ও দাতার উভয়েরই অক্ষয় পুণ্যলাভ হইয়া থাকে। লোকে জিতেন্দ্রিয় হইয়া বস্ত্রদান করিলে পরমসুন্দর ও সুবেশসম্পন্ন হইতে পারেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট বেদপ্রমাণানুসারে গো, সুবর্ণ ও তিলাদি দানের বিষয় বারংবার কীৰ্ত্তন করিলাম। ইহলোকে পুত্রলাভ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট লাভ আর কিছুই নাই, অতএব দানপরিগ্রহপূর্ব্বক পুত্রোৎপাদন করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *