2 of 4

৬০. অযাচিতদানের প্রশংসাপ্রসঙ্গে যাচ্ঞার নিন্দা

৬০তম অধ্যায়

অযাচিতদানের প্রশংসাপ্রসঙ্গে যাচ্ঞার নিন্দা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! তুল্যরূপ আচার, কুল ও বিদ্যাসম্পন্ন ব্রাহ্মণদ্বয়ের মধ্যে যদি একজন অযাচক হয়েন, তাহা হইলে উহাদের কাহাকে দান করিলে অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট ফললাভ করা যায়, তাহা আপনি আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! যাচক ব্রাহ্মণ অপেক্ষা অযাচক ব্রাহ্মণকে দান করিলেই মহৎ ফললাভ হইতে পারে। যাচক ব্রাহ্মণ অপেক্ষা যে অযাচক ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, তাহার আর সন্দেহ নাই। রক্ষা 

ক্ষত্রিয়ের ও অজ্ঞা ব্রাহ্মণের ধৈর্য্যস্বরূপ। ধৈর্য্যশালী বিদ্বান ব্রাহ্মণ পরিতুষ্ট হইয়া দেবগণকে প্রীত করিতে পারেন। যাচক ব্রাহ্মণগণ দস্যুদিগের ন্যায় লোকদিগকে বিপদগ্রস্ত করে, এই নিমিত্ত পণ্ডিতেরা যাচ্ঞাকে চৌর্য্যস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন। যাচকেরা মৃতকল্প বলিয়া অভিহিত হয়। দানশীল মহাত্মাদিগকে কখনই অবসন্ন হইতে হয় না; প্রত্যুত তাঁহারা আপনার ও অন্যের জীবিকানির্ব্বাহ করিয়া পরমসুখে কালহরণ করিয়া থাকেন। মানবগণ দয়ার অধীন হইয়া যাচক ব্রাহ্মণদিগকে ধনদান করেন বটে, কিন্তু যেসমুদয় ব্রাহ্মণ নিতান্ত দুঃখী হইয়াও কাহার নিকট প্রার্থনা না করেন, তাঁহাদিগকে দান করাই সৰ্ব্বতোভাবে কৰ্ত্তব্য। যদি তোমার রাজ্যমধ্যে অযাচক দরিদ্র ব্রাহ্মণগণ বাস করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তুমি তাঁহাদিগকে ভস্মাচ্ছাদিত অনলের ন্যায় জ্ঞান করিবে। ঐ তপোবলসম্পন্ন মহাত্মারা পৃথিবীকেও অনায়াসে দগ্ধ করিতে পারেন; অতএব তাঁহাদিগের সত্ত্বার করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য।

“সতত জ্ঞান, বিজ্ঞান, তপস্যা ও যোগবলসম্পন্ন ব্রাহ্মণগণের পূজা এবং অযাচক মহাত্মাদিগের সম্মুখীন হইয়া তাঁহাদিগকে ধনদান করিবে। প্রাতঃকাল ও সায়ংকালে সংস্কৃত অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিলে যে ফললাভ হয়, বেদব্রতপরায়ণ ব্রাহ্মণগণকে দান করিলে সেই ফললাভ হইয়া থাকে। অতএব যাঁহারা বেদবিধানানুসারে বিদ্যোপার্জ্জন ও নিয়মানুষ্ঠান করিয়া কাহারও আশ্রয় না লইয়াই জীবিকানির্ব্বাহ করেন এবং যেসমুদয় ব্রাহ্মণ প্রশংসালাভের নিমিত্ত তপানুষ্ঠান না করেন, তুমি গৃহনির্ম্মাণ, ভৃত্যনিয়োগ এবং বিবিধ পরিচ্ছদ ও ভোগ্যবস্তু প্রদান করিয়া তাঁহাদিগকে পরিতুষ্ট করিবে। তাঁহারা যাঁহার ধনাদি প্রতিগ্রহ করেন, তাঁহার পরম ধৰ্ম্মসাধন করা হয়। যেসমুদয় ব্রাহ্মণের পুত্ৰকলত্রাদি সুবৃষ্টিপ্রতীক্ষানিরত কৃষিজীবীর ন্যায় ভোজ্যবস্তুর প্রতীক্ষা করে, তাহাদিগকে ভোজন করাইয়া ভোজ্যবস্তু প্রদান করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য।

“ব্রহ্মচারী জিতেন্দ্রিয় ব্রাহ্মণ প্রাতঃকালে যাঁহার গৃহে ভোজন করেন, ভগবান্ অগ্নি তাঁহার প্রতি নিতান্ত প্রসন্ন হয়েন। যে ব্যক্তি মধ্যাহ্নসময়ে ঐরূপ ব্রাহ্মণগণকে গো, হিরণ্য ও বস্ত্র প্রদান করেন, দেবরাজ তাঁহার প্রতি সাতিশয় প্রীত হইয়া থাকেন। আর যে ব্যক্তি অপরাহ্ণে অন্নাদি দানদ্বারা দেবতা, পিতৃগণ ও ব্রাহ্মণগণের তৃপ্তিসাধন করেন, তিনি বিশ্বদেবগণের প্রীতিলাভ করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই। অতএব তুমি সৰ্ব্বভূতে অহিংসা, পোষ্যবর্গের পোষণ, জিতেন্দ্রিয়তা, ত্যাগ, ধৈর্য্য ও সত্ত্বগুণ অবলম্বনপূৰ্ব্বক অবভৃত স্নানের ফললাভ কর। এই সমুদয় অপেক্ষা সদক্ষিণ উৎকৃষ্ট যজ্ঞ আর কিছুই নাই; অতএব তুমি শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া সতত এই সমুদয় কার্য্যে প্রবৃত্ত হও।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *