2 of 4

৫৯. দানধর্ম্মকীৰ্ত্তন

৫৯তম অধ্যায়

দানধর্ম্মকীৰ্ত্তন

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি যেসমস্ত দানের বিষয় কীৰ্ত্তন করিলেন, তৎসমুদয় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কি আছে? যে বস্তু প্রদত্ত হইলে দাতা উহা ইহলোকে ও পরলোকে পুনরায় প্রাপ্ত হয়, তাহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত কৌতূহল উপস্থিত হইয়াছে, এক্ষণে আমার সমক্ষে আপনি তাহাই কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! প্রাণীগণকে অভয়প্রদান এবং কাহারও বিপদ উপস্থিত হইলে তাহাকে সাহায্যদান ও প্রার্থনানুরূপ ধনদান করিলে ইহলোক ও পরলোক তৎসমুদয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। ঐরূপ দানই উৎকৃষ্ট দান বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। সুবর্ণ, গো ও ভূমিদান অতিশয় প্রশস্ত; উহা পাপাত্মাকে পাপ হইতে পরিত্রাণ করিতে সমর্থ হয়। মহারাজ! তুমি সাধুব্যক্তিদিগকে নিরন্তর এই সমস্ত বস্তু প্রদান কর।

“দানধৰ্ম্মপ্রভাবে মনুষ্য নিষ্পাপ হয়। যে ব্যক্তি দত্তবস্তু [অত্যন্ত দুঃখপ্রাপ্ত] অক্ষয় করিতে অভিলাষী হয়েন, তিনি যে যে বস্তু সকলের প্রিয়তর, গুণবান ব্যক্তিদিগকে সেই সেই বস্তু প্রদান করিবেন। যে ব্যক্তি প্রিয়বস্তু প্রদান ও প্রিয়কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, সে প্রতিনিয়ত প্রিয়বস্তু লাভ করে এবং ইহলোকে ও পরলোকে সকলের প্রীতিভাজন হয়। যদি দরিদ্র কোন ব্যক্তিকে সমর্থ বিবেচনা করিয়া তাহার নিকট আহারোপযোগী বস্তু প্রার্থনা করে, আর ঐ ব্যক্তি যদি সমর্থ হইয়াও তাহার অভিলাষ পূর্ণ করিতে পরাঙ্মুখ হয়, তাহা হইলে সে নৃশংস বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। যিনি শত্রুগণেরও প্রতি বিপৎকালে অনুগ্রহ প্রদর্শন করেন, তিনিই উৎকৃষ্ট পুরুষ। যে ব্যক্তি কৃতবিদ্য জীবিকাশূন্য অবসন্ন মনুষ্যকে জীবিকা প্রদান করেন, তাঁহার তুল্য শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। যেসকল স্বধর্ম্মনিরত সচ্চরিত্র ব্যক্তি অন্নাভাবে পরিক্লিষ্ট হইয়াও যাঙ্ক্ষা না করেন, তাহাদিগকে অর্থাদি দান করিয়া প্রতিপালন করা অবশ্য কর্ত্তব্য।

“যাঁহারা পূজনীয় ও নিত্য সন্তুষ্ট, যাঁহারা দেবতা ও মনুষ্যের নিকট কিছুমাত্র প্রার্থনা করেন না এবং যাঁহারা অযাচিতোপস্থিত বিত্তদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করিয়া থাকেন, তাঁহারা ভুজঙ্গের ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর। ঐ সকল ব্যক্তি যাহাতে কুপিত না হয়েন, তুমি তদ্বিষয়ে সতত সাবধান থাকিবে। তাঁহাদিগের আহারোপযোগী অর্থ আছে কি না প্রতিনিয়ত চরদ্বারা তাহার অনুসন্ধান করিবে, এবং গৃহনির্ম্মাণ, ভৃত্যনিয়োগ ও পরিচ্ছদপ্রদান প্রভৃতি সুখাবহ কার্য্যদ্বারা তাঁহাদিগের তুষ্টি সম্পাদনে যত্নবান হইবে। তাঁহারা যাঁহার ধনাদি প্রতিগ্রহ করেন তাঁহার অত্যুৎকৃষ্ট ধর্ম্মসাধন করা হয়। যাঁহারা বেদবিধানানুসারে বিদ্যোপার্জ্জন ও নিয়মানুষ্ঠান করিয়া কাহারও আশ্রয় না লইয়াই জীবিকানির্ব্বাহ করেন, যাঁহাদিগের বেদাধ্যয়ন ও তপস্যা লোকরঞ্জনার্থ [লোকের সন্তোষের জন্য] অনুষ্ঠিত হয় না, সেই সমস্ত স্বারনিরত পবিত্রচিত্ত জিতেন্দ্রিয় ব্রাহ্মণগণকে যাহা প্রদান করা যায়, তাহাও অপরাহ্ণে নিশ্চয়ই পরলোকে অনুগামী হইয়া থাকে। সাগ্নিক ব্রাহ্মণ পূৰ্ব্বাহ্ণে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করিয়া যে ফললাভ করেন, সংযতচিত্ত ব্রাহ্মণকে অর্থাদি দান করিলে সেইরূপই ফললাভ হয়।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এক্ষণে তুমি শ্রদ্ধাবান ও দানশীল হইয়া এই সুবিস্তীর্ণ দানরূপ যজ্ঞের অনুষ্ঠান কর। গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণগণকে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য সমর্পণ, তাঁহাদের প্রতি ভক্তি ও তাঁহাদের পূজা করিলে দেবতাদিগের ঋণজাল হইতে অনায়াসে মুক্তিলাভে সমর্থ হওয়া যায়। যাঁহারা কদাচ কুপিত ও তৃণগ্রহণেও লুব্ধ না হয়েন এবং যাঁহারা সতত প্রিয়বাক্য প্রয়োগ করেন, তাঁহারাই আমাদিগের পরমপূজনীয়। যাঁহারা নিস্পৃহতানিবন্ধন দাতাকে সমাদর করেন না, তাঁহাদিগকে সূতনির্ব্বিশেষে প্রতিপালন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। আমি সেই সকল মহাত্মাকে নমস্কার ও তাঁহাদিগের নিকট হইতে অভয় প্রার্থনা করি।

‘ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণের প্রতি তেজ প্রদর্শন করিলে তাহা কোন ফলোপধায়ক [ফলপ্রদ] হয় না; অতএব তুমি আপনাকে রাজা ও মহাবলপরাক্রান্ত বিবেচনা করিয়া কদাচ তাঁহাদিগকে পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বিষয়াদি উপভোগ করিও না। তোমার বল ও গৌরববৃদ্ধির নিমিত্ত যেসমস্ত অর্থ আছে, তুমি স্বধর্ম্মপরায়ণ হইয়া সেই সমুদয় ধনদ্বারা ব্রাহ্মণগণের সৎকার কর। তাহারা যেন পুত্রের ন্যায় স্বেচ্ছানুসারে তোমাকে আশ্রয় করিয়া পরমসুখে কালযাপন করেন। নিত্যপ্রসন্ন, অল্পলাভে সন্তুষ্ট ব্রাহ্মণগণের বৃত্তিবিধান করিতে তোমা ভিন্ন আর কেহই সমর্থ নহে। যেমন স্ত্রীলোকের পতিসেবাই পরমধর্ম্ম ও পতিই পরমগতি, সেইরূপ ব্রাহ্মণসেবাই আমাদিগের পরমধর্ম্ম ও ব্রাহ্মণই পরমগতি। যদি ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দিগের নিষ্ঠুর ব্যবহারে অসন্তুষ্ট ও তাহাদিগের কর্ত্তৃক অসক্ত হইয়া তাহাদিগকে পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে তাহাদিগের বেদ ও যজ্ঞ শূন্য এবং উৎকৃষ্ট লোকলাভে বঞ্চিত হইয়া জীবিত থাকিবার প্রয়োজন কি?

“হে ধৰ্ম্মরাজ! পুৰ্ব্বে ক্ষত্রিয়েরা ব্রাহ্মণের সহিত ধৰ্ম্মানুসারে যেরূপ ব্যবহার করিতেন, আমি তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বকালে বৈশ্যগণ ক্ষত্রিয়দিগের ও শূদ্রগণ বৈশ্যদিগের সেবা করিত। শূদ্রগণ তেজঃপুঞ্জ ব্রাহ্মণগণকে স্পর্শ করিয়া সেবা করিতে সমর্থ হইত না। এক্ষণে তুমি সেই সমস্ত সত্যশীল, মৃদুস্বভাব, সত্যধর্ম্মপরায়ণ, ক্রূদ্ধ ভুজঙ্গের ন্যায় নিতান্ত ভয়ঙ্কর, সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণকে নিরন্তর সেবা কর। ক্ষত্রিয়গণের তেজ ও তপস্যা ব্রাহ্মণগণের প্রভাবে অচিরাৎ পরাভূত হইয়া যায়। ব্রাহ্মণ অপেক্ষা আমার পিতা, পিতামহ ও স্বীয় জীবনও প্রিয়তর নহে। এই জীবলোকে আমি সৰ্ব্বাপেক্ষা তোমার প্রতিই সমধিক প্রীতি প্রদর্শন করিয়া থাকি, কিন্তু ব্রাহ্মণেরা তোমার অপেক্ষাও আমার প্রীতিভাজন। ধৰ্ম্মরাজ! আমি যাহা কহিলাম, ইহাতে অণুমাত্রও সন্দেহ করিও না; ইহা সত্যবাক্যই প্রয়োগ করিতেছি। এই সত্যপ্রভাবেই মহারাজ শান্তনু যেসমস্ত লোকে গমন করিয়াছেন, আমি সেই সেই লোকে গমন করিব। আমি এই বিভক্তিপ্রভাবে সাধুদিগের গন্তব্য লোকসমুদয় নিত্যকালের নিমিত্ত লাভ করিব, সন্দেহ নাই। ঐ সমুদয় লোক এক্ষণে আমার জ্ঞানচক্ষুঃপ্রভাবে প্রত্যক্ষ হইতেছে। উহা প্রত্যক্ষ হওয়াতেই আমি পূর্ব্বে ব্রাহ্মণগণের উদ্দেশে যেসকল কার্য্যানুষ্ঠান করিয়াছি তদ্দ্বারা যারপরনাই সন্তোষ জন্মিতেছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *