2 of 4

৫৮. জলাশয়াদি খননফল

৫৮তম অধ্যায়

জলাশয়াদি খননফল

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! জলাশয়খনন ও বৃক্ষরোপণ করিলে যে ফল হয়, তাহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত অভিলাষ হইতেছে, অতএব আপনি উহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! ইহলোকে বিবিধ ধাতুবিভূষিত নয়নাহ্লাদকর সর্ব্বভূতসমন্বিত উর্ব্বর ক্ষেত্রকেই শ্রেষ্ঠভূমি বলিয়া কীৰ্ত্তন করা যায়। ঐরূপ প্রদেশেই জলাশয় খনন করা কর্ত্তব্য। জলাশয়খননে যে যে গুণ, তাহা আনুপূর্ব্বিক কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। জলাশয়প্রতিষ্ঠাতা ত্রিলোকমধ্যে পূজনীয় হইয়া থাকেন। জলাশয় মিত্রের ন্যায় সৰ্ব্বভূতের উপকারক, সূর্য্যের প্রীতিকর, দেবগণের পুষ্টিবর্দ্ধক ও প্রতিষ্ঠাতার কীৰ্ত্তিপদ হইয়া থাকে। পণ্ডিতেরা কহেন যে, জলাশয় খনন করিলে তদ্বারা ত্রিবর্গের ফললাভ হয়। অতএব জলাশয় একটি পুণ্যক্ষেত্রস্বরূপ। চতুর্ব্বিধ প্রাণী জলাশয় হইতে জলপান করিয়া জীবনধারণ করে। অতএব জলাশয় প্রতিষ্ঠা করিলে প্রতিষ্ঠাতার নিশ্চয়ই শ্রীবৃদ্ধি হইয়া থাকে। পিতৃলোক, দেবতা, মনুষ্য, গন্ধৰ্ব্ব, উরগ, রাক্ষস ও পৃথিবীস্থ অন্যান্য প্রাণীগণ সকলেই জলাশয় আশ্রয় করেন। এক্ষণে ঋষিগণ জলাশয়খননের যেরূপ ফল কীৰ্ত্তন করিয়াছেন, তাহা কহিতেছি, শ্রবণ কর।

“বর্ষাকালে যাঁহার জলাশয়ে জল বিদ্যমান থাকে, তিনি অগ্নিহোত্ৰযজ্ঞের, শরৎকালে যাঁহার জলাশয়ে সলিল বিদ্যমান থাকে, তিনি সহস্র গোদানের, হেমন্তকালে যাঁহার জলাশয় সলিলপূর্ণ থাকে, তিনি বহুসুবর্ণ যজ্ঞের, শিশিরকালে যাঁহার জলাশয়ে সলিল বিদ্যমান থাকে, তিনি অগ্নিষ্টোমযজ্ঞের, বসন্তকালে যাহার জলাশয়ে জল থাকে, তিনি অতিরাত্ৰযজ্ঞের এবং গ্রীষ্মকালে যাঁহার জলাশয়ে জল বিদ্যমান থাকে, তিনি অশ্বমেধযজ্ঞের ফললাভ করিয়া থাকেন। মনুষ্য, গাভী ও পশুপক্ষী প্রভৃতি প্রাণীগণ যাঁহার জলাশয়ে জলপান করে, তাঁহার কুল পবিত্র হয় এবং তিনি অশ্বমেধযজ্ঞের ফললাভ করেন। প্রাণীগণ যাঁহার জলাশয়ে স্নান, জলপান ও বিশ্রাম করে, তাঁহাকে পরলোকে কখনই স্নান, জলপান ও বিশ্রামের নিমিত্ত ক্লেশভোগ করিতে হয় না। পরলোকে জলাঞ্জলিলাভ করা নিতান্ত সুকঠিন। জলদান করিলে অপরিসীম প্রীতিলাভ হইয়া থাকে। মোহ পরিত্যাগপূর্ব্বক ইহলোকেই তিল, জল ও দীপ প্রদান এবং জ্ঞাতিবর্গের সহিত আমোদপ্রমোদ কর। কারণ, ইহলোক হইতে প্রস্থান করিলে আর ঐ সমুদয় কার্য্য করিতে পারিবে না। জলদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কিছুই নাই। অতএব জলদান করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়।

বৃক্ষরোপণফল

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট জলাশয়দানের ফল কীৰ্ত্তন করিলাম, অতঃপর বৃক্ষরোপণের ফল কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। উদ্ভিদ পদার্থ বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, বল্লী, বংশ ও তৃণ এই ছয় জাতিতে বিভক্ত। এই সমুদয় রোপণ করিলে ইহলোকে কীৰ্ত্তি, শুভফল ও পিতৃলোকে সম্মানলাভ হইয়া থাকে। বৃক্ষরোপণকৰ্ত্তা স্বর্গে গমন করিলেও তাহার নাম বিলুপ্ত হয় না এবং সে অনায়াসে স্বীয় উৰ্দ্ধতন ও অধস্তন পুরুষদিগের উদ্ধারসাধন করিতে পারে। অতএব বৃক্ষরোপণ করা মানবগণের অবশ্য কর্ত্তব্য। বৃক্ষরোপণকৰ্ত্তা পরলোকগমন করিলে নিশ্চয়ই তাহার উদ্ধারসাধন হইয়া থাকে। বৃক্ষগণ পুষ্পদ্বারা দেবতা, ফলদ্বারা পিতৃলোক এবং ছায়াদ্বারা অতিথিদিগের সৎকার করিয়া থাকে। কিন্নর, উরগ, রাক্ষস, দেবতা, গন্ধৰ্ব্ব, ঋষি ও মনুষ্যগণ উহাদের আশ্রয়গ্রহণ করিলে উহারা ফলপুষ্পদ্বারা তাঁহাদিগের তৃপ্তিসাধন করে। অতএব জলাশয়তীরে বৃক্ষসমুদয় রোপণ করিয়া পুত্রের ন্যায় তাহাদের প্রতিপালন করা শ্ৰেয়োলাভার্থী ব্যক্তির অবশ্য কৰ্ত্তব্য। তাহারা ধৰ্ম্মানুসারে রোপণকৰ্ত্তার পুত্রস্বরূপ, সন্দেহ নাই। জলাশয়দাতা, বৃক্ষরোপণকৰ্ত্তা, যজ্ঞানুষ্ঠানকারী ও সত্যবাদী ইহারা নিশ্চয়ই স্বর্গারোহণ করেন; অতএব জলাশয়দান, বৃক্ষরোপণ, বিবিধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান ও সত্যবাক্যপ্রয়োগ করা সৰ্ব্বতোভাবে বিধেয়।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *