৫৫তম অধ্যায়
কুশিকের পরীক্ষার কারণ—বরলাভ
ভীষ্ম কহিলেন, “তখন মহর্ষি চ্যবন কুশিকরাজকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাজন! তুমি অভিলষিত বর প্রার্থনা এবং তোমার মনোমধ্যে যেসকল সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছে তাহা প্রকাশ কর, আমি অবিলম্বে তোমার সংশয়চ্ছেদন ও তোমাকে বর প্রদান করিব।’
“তখন নরপতি কহিলেন, ‘ভগবন্! যদি আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে ব্যক্ত করিয়া বলুন, আপনার গৃহে অবস্থান, একবিংশতি দিবস একপার্শ্বে শয়ন, বাঙ্নিষ্পত্তিমাত্র না করিয়া বহির্গমন, অকস্মাৎ অন্তর্দ্ধান করিয়া পরক্ষণেই দর্শনপ্রদানপূর্ব্বক পুনরায় একবিংশতি দিবস শয়ন, সৰ্ব্বশরীর তৈলাক্ত করিয়া স্নান না করিয়াই প্রস্থান, ভোজ্যবস্তু ও শয়নীয় সামগ্ৰীসমুদয় লইয়া হুতাশনে দাহন, আমাদিগকে রথে সংযোজনপূৰ্ব্বক উহাতে আরোহণ করিয়া গমন, অজস্র ধনদান, তপোবনমধ্যে আমাকে কাঞ্চনময় বিবিধ প্রাসাদ ও মণিবিক্ৰমময় পর্য্যঙ্ক প্রদর্শন এবং পুনরায় সেই সমুদয়ের বিলোপ করিবারই বা কারণ কি? এই সমুদয় বিষয় চিন্তা করিয়া আমি একান্ত মুগ্ধ হইয়াছি, কিছুমাত্র নির্ণয় করিতে পারি নাই; অতএব আপনি ঐ সমুদয়ের কারণ যথার্থরূপে কীৰ্ত্তন করুন।
“চ্যবন কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি যখন জিজ্ঞাসা করিলে, তখন প্রত্যুত্তর প্রদান না করা আমার কর্ত্তব্য নহে। অতএব আমি যে নিমিত্ত ঐ সমুদয় কার্য্য করিয়াছি, তাহা আদ্যোপান্ত কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা আমি দেবসভায় লোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট শুনিলাম যে, তোমার বংশ হইতে আমার বংশে ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মসঞ্চার হইবে এবং তোমার পৌত্র ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিবে। আমি ব্ৰহ্মার মুখে ঐ কথা শ্রবণ করিয়া তোমার বিনাশবাসনায় তোমার গৃহে আগমন করিয়াছিলাম। আমি তোমার পুরমধ্যে প্রবেশ করিয়া প্রথমেই তোমাকে কহিয়াছিলাম যে, আমি কোন ব্রত অবলম্বন করিব, তুমি আমার শুশ্রূষা কর। তাহার তাৎপর্য্য এই যে, বহু দিন তোমার সহিত একত্র বাস করিলে অবশ্যই তোমার কোন না কোন রন্ধ্র পাইব। কিন্তু তোমার সৌভাগ্যক্রমে আমি তোমার গৃহে আগমনাবধি তোমার কোন দুষ্কৃতি দর্শন করি নাই। সেই নিমিত্ত তুমি অদ্যাপি জীবিত রহিয়াছ, নতুবা কখনই জীবিত থাকিতে না।
‘আমি এই অভিসন্ধি করিয়া একবিংশতি দিবস নিদ্রিত ছিলাম যে, তোমরা কেহ আমার নিদ্রাভঙ্গ করিলেই আমি শাপপ্রদান করিব। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তুমি বা তোমার পত্নী আমার নিদ্রাভঙ্গ করিলে না। তৎপরে আমি এই মনে করিয়া গাত্রোত্থানপূৰ্ব্বক গৃহ হইতে বহির্গত হইলাম যে, তোমরা কেহ “আপনি কোথায় গমন করিতেছেন” বলিয়া জিজ্ঞাসা করিলে শাপপ্রদান করিব। কিন্তু তোমরা আমাকে কিছুমাত্র জিজ্ঞাসা করিলে না। তখন আমি তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিত হইয়া পরক্ষণে তোমার গৃহে আগমনপূৰ্ব্বক এই অভিসন্ধিতে যোগাবলম্বন করিয়া পুনরায় একবিংশতি দিবস নিদ্রিত হইলাম যে, তোমরা আমার সেবানিবন্ধন একান্ত পরিশ্রান্ত ও অতিশয় ক্ষুধার্ত্ত হইয়া আমার উপর বিরক্ত হইবে, তাহা হইলে আমি শাপপ্রদানের সূত্র পাইব; কিন্তু দেখিলাম, তাহাতেও তোমাদিগের অণুমাত্র ক্লেশবৃদ্ধি হইল না। তখন আমি এই মনে করিয়া ভোজন-সামগ্ৰীসমুদয় দগ্ধ করিলাম যে, তোমরা আমার অহঙ্কারদর্শনে রোষাবিষ্ট হইবে, কিন্তু তুমি অবিকৃতচিত্তে তাহাও সহ্য করিলে। তখন আমি রথারোহণপূর্ব্বক তোমাকে রাজ্ঞীর সহিত রথ বহন করিতে কহিলাম। তুমি তাহাতেও পরাঙ্মুখ হইলে না। তখন আমি তোমাকে ক্রূদ্ধ করিবার মানসে অজস্র ধনদানপূৰ্ব্বক তোমার ধনক্ষয় করিতে লাগিলাম। কিন্তু তাহাতেও তোমার ক্রোধের লেশমাত্রও দেখিলাম না।
‘হে মহারাজ! এইরূপে যখন আমি দেখিলাম, তোমার ও তোমার পত্নীর কিছুতেই ক্রোধোদয় বা বিরক্তি হইতেছে না, তখন আমি তোমাদের প্রতি যারপরনাই প্রীত হইয়া তোমাদিগের আনন্দবর্দ্ধনাৰ্থ এই তপোবনমধ্যে তোমাদিগকে স্বর্গসন্দর্শন করাইলাম। তোমরা যে তপোবনমধ্যে বিবিধ উৎকৃষ্ট পদার্থ সন্দর্শন করিয়া ক্ষণকাল সশরীরে স্বর্গসন্দর্শনসুখ অনুভব করিয়াছ, তাহা কেবল আমার ধর্ম্মানুষ্ঠান ও তপস্যার প্রভাবেই হইয়াছে। আমি তোমাদিগকে তপানুষ্ঠান ও ধর্ম্মের বল জানাইবার নিমিত্তই ঐ সমুদয় পদার্থ প্রদর্শন করিয়াছি। ঐ সমুদয় পদার্থ দর্শনসময়ে তুমি যে ইন্দ্ৰত্বলাভ তৃণতুল্য বোধ করিয়া ব্রাহ্মণ্যলাভের বাসনা করিয়াছ, তাহা আমি অবগত হইয়াছি। তুমি যে ব্রাহ্মণ্য নিতান্ত দুর্ল্লভ বিবেচনা করিয়াছ, তাহা মিথ্যা নহে। প্রথমতঃ ব্রাহ্মণ্যলাভ হইলে ঋষিত্বলাভ এবং ঋষিত্বলাভ হইলে আবার তপস্বিতালাভ হওয়া নিতান্ত সুকঠিন। যাহা হউক, তোমার অভিলাষ অবশ্যই পূর্ণ হইবে। তুমি স্বয়ং ব্রাহ্মণ হইতে পারিবে না বটে, কিন্তু অস্মদ্বংশীয়দিগের তেজঃপ্রভাবে তোমার পৌত্র ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিবে। তোমার ঐ পৌত্র তপস্বী ও হুতাশনসদৃশ তেজস্বী হইয়া স্বীয় তেজঃপ্রভাবে ত্রিলোক সশঙ্কিত করিবে, সন্দেহ নাই। এক্ষণে তুমি অন্য কোন অভিলষিত বর প্রার্থনা কর, আর কালবিলম্ব করিও না; আমি তোমাকে অচিরাৎ বরপ্রদান করিয়া তীর্থপর্য্যটনে গমন করিব।
“তখন নরপতি কুশিক মহর্ষি চ্যবনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আমি এই বর প্রার্থনা করি যে, আপনার বাক্য মিথ্যা না হইয়া যেন আমার বংশীয় ব্যক্তিগণের ব্রাহ্মণত্বলাভ হয়। এক্ষণে কি প্রকারে আমার বংশে ব্রাহ্মণত্বলাভ হইবে, তাহা আপনি বিস্তারিতরূপে কীৰ্ত্তন করুন।”
