2 of 4

৫৪. চ্যবনের অলৌকিক যোগবলে রাজার বিস্ময়

৫৪তম অধ্যায়

চ্যবনের অলৌকিক যোগবলে রাজার বিস্ময়

ভীষ্ম কহিলেন, “অনন্তর রজনী প্রভাত হইবামাত্র মহারাজ কুশিক শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া প্রাতঃকৃত্যসমুদয় সমাপনপূৰ্ব্বক মহিষীসমভিব্যাহারে সেই চ্যবনাধিষ্ঠিত কাননোদ্দেশে যাত্রা করিলেন। তিনি অনতিবিলম্বে তথায় সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, কোন স্থানে সুবর্ণনির্ম্মিত মণিময় স্তম্ভসুশোভিত গন্ধৰ্ব্বনগরাকার প্রাসাদ, কোন স্থানে রজতশিখর বিরাজিত পৰ্ব্বত, কোন স্থানে কমলদলসমলঙ্কৃত সরোবর, কোন স্থানে বিবিধ গৃহ ও নানাপ্রকার তোরণ এবং কোন স্থানে হরিদ্বর্ণ। তৃণপরিপূর্ণ ভূমিখণ্ড ও কাঞ্চনময় কুসুম শোভা পাইতেছে। কোন স্থানে মুকুলজালমণ্ডিত সহকার [আম্র], কেতক, উদ্দালক [শ্লেষ্মত্মক—বৌহার বৃক্ষ], ধব, অশোক, কুন্দ, পুষ্পিত অতিমুক্ত [মাধবীলতা], চম্পক, তিলক [ঘণ্টাপারুল], পনস [কাঁঠাল], বঞ্জুল [বেতস], পাণি-আমালক [পাণি-আমলা], কর্ণিকার, শ্যাম, পলাশ ও অষ্টপাদিক [হাপরমালী] প্রভৃতি পাদপসমুদয় বিরাজিত রহিয়াছে। কোন স্থানে বৃক্ষে পদ্ম ও উৎপলসমুদয় প্রস্ফুটিত হইয়াছে। কোন স্থানে সুশীতল সলিল, কোন স্থানে উষ্ণজল, কোন স্থানে সুবর্ণনির্ম্মিত রত্নখচিত উৎকৃষ্ট আস্তরণশোভিত পর্য্যঙ্ক, বিচিত্র আসন ও শয্যা, কোন স্থানে বিবিধ ভক্ষ্য ভোজ্য এবং কোন স্থানে বাণীবাদ, শুক, সারিকা, ভৃঙ্গরাজ, কোকিল, শতপত্র, কোষষ্টিক [কোড়াপাখী], কুক্কুভ [কুখুয়াপাখী], ময়ূর, কুক্কুট, দাত্যুহ, জীবঞ্জীরক, চকোর, হংস, সারস ও চক্রবাক প্রভৃতি পক্ষিগণ রহিয়াছে। কোন স্থানে বানরেরা তুমুল কোলাহল করিতেছে। কোন স্থানে প্রিয়দর্শন অপ্সরা ও গন্ধৰ্ব্বেরা সমাগত হইয়া প্রীতমনে বিহার করিতেছে। এই সমস্ত বস্তু মহারাজ কুশিকের একবার দৃশ্য ও অদৃশ্য হইতে লাগিল। তিনি কখন সুমধুর গীতধ্বনি ও হংস সারস প্রভৃতি জলচর পক্ষিগণের তুমুল কোলাহল ও কখন বা অধ্যাপনধ্বনি শ্রবণ করিতে লাগিলেন।

“মহারাজ কুশিক এইরূপ অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপার অবলোকনপূৰ্ব্বক যারপরনাই বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, আমি কি এক্ষণে স্বপ্ন সন্দর্শন করিতেছি, না আমার চিত্তবিভ্রম উপস্থিত হইয়াছে, অথবা এই ঘটনা যথার্থ! আমি কি সশরীরে পরমগতি লাভ করিলাম কিংবা উত্তরকুরু বা অমরাবতীতে উপস্থিত হইলাম? যাহা হউক, আমি যে এক্ষণে এই সমস্ত অত্যাশ্চর্য্য ও রমণীয় বস্তু প্রত্যক্ষ করিতেছি, এ সমুদয় কি? মহারাজ কুশিক এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতেছেন, ইত্যবসরে মণিময় স্তম্ভসমলঙ্কৃত সুবর্ণনির্ম্মিত গৃহমধ্যে মহামূল্য শয্যায় শয়ান ভৃগুনন্দন চ্যবনকে সহসা নিরীক্ষণ করিলেন। মহারাজ কুশিক তাঁহাকে দর্শন করিবামাত্র পুলকিত হইয়া মহিষীর সহিত তাঁহার সন্নিহিত হইলেন। নৃপদম্পতি সন্নিহিত হইবামাত্র মহর্ষি তৎক্ষণাৎ অন্তর্দ্ধান হইলেন এবং তাঁহার সেই রমণীয় শয্যাও অন্তর্হিত হইল। তখন মহারাজ কুশিক অন্য এক কাননমধ্যে মহর্ষি চ্যবনকে কুশাসনে উপবিষ্ট ও ধ্যানপরায়ণ নিরীক্ষণ করিলেন। ক্ষণকালমধ্যে অপ্সরা, গন্ধৰ্ব্ব ও বৃক্ষলতা প্রভৃতি সমস্ত অদ্ভুত পদার্থ তিরোহিত হইয়া গেল; গঙ্গার উপকূল পুনরায় পূৰ্ব্ববৎ কুশভূয়িষ্ঠ, বাল্মীলাঞ্ছিত ও নিঃশব্দ হইল।

“মহারাজ কুশিক মহর্ষির যোগবলে এইরূপ অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণপূর্ব্বক যারপরনাই বিস্মিত হইয়া হৃষ্টান্তঃকরণে মহিষীকে কহিলেন, প্রিয়ে। মহর্ষির অনুগ্রহে এই সমস্ত অদৃষ্টপূর্ব্ব বিস্ময়কর পদার্থ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলাম। এক্ষণে বোধ হইতেছে, তপোবল অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আর কিছুই নাই। যে সমস্ত বিষয় কল্পনায় উপনীত হয়, তপোবলে তৎসমুদয় অধিকার করা যায়, সন্দেহ নাই। তপোবলপ্রাপ্তি বিশ্বরাজ্যলাভ অপেক্ষা শ্রেয়স্কর। তপস্যা সুন্দররূপে অনুষ্ঠিত হইলে মুক্তি অনায়াসেই হস্তগত হইয়া থাকে। মহর্ষি চ্যবনের কি আশ্চর্য্য প্রভাব। ইনি ইচ্ছা করিলেই তপোবলে অন্য লোকসমুদয় সৃষ্টি করিতে পারেন। ইহা অপেক্ষা এই সমস্ত কার্য্যে দক্ষতা আর কেহই প্রকাশ করিতে সমর্থ হয়েন না। এই ভূমণ্ডলে ব্রাহ্মণগণই পবিত্র বাক্য, পবিত্র বুদ্ধি ও পবিত্র কৰ্ম্মানুষ্ঠানতৎপর হইয়া থাকেন। ইহলোকে রাজ্যলাভ করা সুলভ, কিন্তু ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হওয়া নিতান্ত সহজ নহে। দেখ, আমরা এক ব্রাহ্মণেরই প্রভাবে অশ্বাদির ন্যায় রথে যোজিত হইয়াছিলাম।’

“এইরূপে মহারাজ কুশিক মহিষীর সহিত যে সমস্ত কথা কহিলেন, মহর্ষি যোগবলে তৎসমুদয় অবগত হইলেন। অনন্তর তিনি নয়ন উন্মীলনপূর্ব্বক অদুরে মহারাজকে মহিষীর সহিত আগমন করিতে দেখিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি শীঘ্র আমার নিকট আগমন কর। কুশিক মহর্ষির কথা শ্রবণ করিবামাত্র সত্বর তাঁহার সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া তাহার পাদবন্দন করিলেন। তখন মহর্ষি তাঁহাকে যথোচিত আশীর্ব্বাদ করিয়া তথায় উপবেশন করাইয়া কহিলেন, মহারাজ! তুমি পাঁচ কৰ্ম্মেন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মনকে সম্যক্ আয়ত্ত করিয়াছ। সেই নিমিত্তই তোমার কোন দুরবস্থা ঘটে নাই। তুমি প্রাণপণে আমার সেবা করিয়াছ। তদ্বিষয়ে তোমার কোন অংশেই ত্রুটি হয় নাই। এক্ষণে তুমি আমাকে অনুজ্ঞা কর, আমি স্বস্থানে প্রস্থান করি। আর আমি তোমার পরিচৰ্য্যায় যারপরনাই প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছি, তন্নিবন্ধন তোমাকে বর প্রদান করিব। অতএব তুমি অচিরাৎ আমার নিকট বর প্রার্থনা কর।

“মহর্ষি এই কথা কহিলে, মহারাজ কুশিক তাঁহাকে যথোচিত বিনয় প্রদর্শনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘তপোধন! আমি অগ্নির মধ্যবর্ত্তী হইয়াও যে দগ্ধ হই নাই, এই আমার পরম লাভ আর আপনি আমার পরিচর্য্যায় যে প্রীত হইয়াছেন এবং আপনার ক্রোধানলে আমার কুল যে নির্ম্মূল হয় নাই, এই আমার সর্ব্বোৎকৃষ্ট বর এবং জীবন, রাজ্যশাসন ও তপস্যার শ্রেষ্ঠ ফল। যাহা হউক, যদি এক্ষণে আপনি আমার প্রতি প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তাহা হইলে আমার যে একটি সংশয় উপস্থিত হইয়াছে, তাহা নিরাকরণ করুন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *