৫৩তম অধ্যায়
চ্যবনকর্ত্তৃক রাজার পরিচৰ্য্যাপরীক্ষা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহঃ মহাত্মা চ্যবন অন্তর্হিত হইলে, মহারাজ কুশিক ও তাঁহার ভাৰ্য্যা কি করিলেন, তাহা আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “বৎস! মহর্ষি চ্যবন অন্তর্হিত হইলে মহারাজ কুশিক ভাৰ্য্যাসমভিব্যাহারে নানাস্থানে তাঁহাকে অন্বেষণ করিলেন, কিন্তু কুত্রাপি তাঁহার সাক্ষাৎকার লাভ করিতে পারিলেন না। তখন উভয়ে নিতান্ত লজ্জিত, পরিশ্রান্ত ও বিচেতনপ্রায় হইয়া স্বীয় পুরমধ্যে প্রত্যাগমনপূৰ্ব্বক মনে মনে মহর্ষির কার্য্য চিন্তা করিতে করিতে শয়নমন্দিরে প্রবেশ করিলেন। গৃহে প্রবেশ করিবামাত্র ভৃগুকুলোদ্ভব মহর্ষি চ্যবন তাঁহাদের নেত্রপথে নিপতিত হইলেন। তিনি তৎকালে সেই শয্যার আর একপার্শ্বে শয়ন করিয়া পূৰ্ব্ববৎ নিদ্রাসুখ অনুভব করিতেছিলেন। তাঁহার সেই অলৌকিক ব্যাপার অবলোকন করিয়া রাজা ও রাজ্ঞীর বিস্ময়ের পরিসীমা রহিল না। তখন তাঁহার যথাস্থানে উপবেশনপূর্ব্বক কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিয়া এই আশ্চর্য্য ব্যাপার চিন্তা করিতে করিতে পুনৰ্ব্বার তাঁহার চরণসংবাহন করিতে লাগিলেন।
“অনন্তর পুনরায় একবিংশতি দিবস অতিক্রান্ত হইলে মহর্ষি স্বয়ং প্রবোধিত হইলেন, কিন্তু তাঁহাকে বহুদিনের পর উখিত দেখিয়া রাজা ও রাজ্ঞীর মনে কিছুমাত্র বিকার উপস্থিত হইল না। তাঁহারা এতাবৎকাল উপবাসী থাকিয়া তাঁহার চরণসেবা করিতেছিলেন। অনন্তর মহর্ষি চ্যবন শয্যা হইতে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক কহিলেন, ‘আমার স্নান করিতে বাসনা হইয়াছে, অতএব আমার সৰ্ব্বাঙ্গে তৈল মর্দ্দন করিয়া দাও।’ তখন মহারাজ কুশিক ও তাঁহার মহিষী উভয়ে নিতান্ত ক্ষুধার্ত্ত ও পরিশ্রান্ত হইয়াও তাঁহার বাক্য স্বীকার করিয়া তৎক্ষণাৎ শতপাকবিশুদ্ধ [শরীর পুষ্টিকর ওষধিসহযোগে একশত বার বাস দেওয়ার পরিশুদ্ধ—দেহের বিশেষ উপকারক] মহামূল্য তৈল আনয়নপূৰ্ব্বক তাঁহার সর্ব্বাঙ্গে মর্দ্দন করিয়া দিতে লাগিলেন। এইরূপে বহুক্ষণ অতীত হইলে মহর্ষি চ্যবন যখন দেখিলেন যে, রাজা ও রাজ্ঞী বহুক্ষণ তৈল মর্দ্দন করিয়া কিছুমাত্র বিরক্ত হয়েন নাই, তখন তিনি স্বয়ং সহসা গাত্রোত্থানপূৰ্ব্বক স্নানশালায় প্রবেশ করিলেন। ঐ স্থানে রাজাদিগের স্নানের উপযুক্ত বিবিধ স্নানীয়দ্রব্য প্রস্তুত ছিল। মহর্ষি তৎসমুদয় স্পর্শও না করিয়া নরপতির সমক্ষেই অন্তর্হিত হইলেন। রাজা ও রাজ্ঞী তদ্দর্শনে তাঁহার প্রতি কিছুমাত্র বিরক্ত হইলেন না। কিয়ৎক্ষণ পরে তাঁহারা দেখিলেন, ভগবান্ চ্যবন স্নাত হইয়া সিংহাসনে সমুপবিষ্ট রহিয়াছেন। তখন তাঁহারা নিতান্ত, পরিতুষ্ট হইয়া নিৰ্ব্বিকারচিত্তে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ভগবন্! আপনার অনুমতি হইলে আমি আপনার নিমিত্ত সিদ্ধান্ন আনয়ন করি।’ তখন মহর্ষি চ্যবন কুশিককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! তোমার আলয়ে যে যে দ্রব্য আছে, শীঘ্র আনয়ন কর।’
“মহর্ষি এই কথা কহিবামাত্র নরপতি ভাৰ্য্যাসমভিব্যাহারে সত্বর সিদ্ধান্ন, বিবিধ মাংস, শাক, রসাল পুপ [রসে ভিজান পিষ্টক রসবড়া, রসগোল্লা ইত্যাদি], বিচিত্র মোদক [নাড়ু, মোয়া প্রভৃতি], নানা প্রকার রস এবং মুনিভোগ্য ও গৃহস্থভোগ্য রাশি রাশি ফল আহরণপূর্ব্বক তাঁহার নিকট সংস্থাপিত করিলেন। তখন মহর্ষি চ্যবন স্বয়ং শয্যা, আসন ও মহার্য্য বস্তুসমুদয় আনয়নপূর্ব্বক ঐ সকল ভোজ্যদ্রব্যের সহিত একত্র করিয়া তৎসমুদয়ে অগ্নি প্রদান করিলেন। মহারাজ কুশিক ও তাঁহার মহিষী তদ্দর্শনে কিছুমাত্র ক্রূদ্ধ হইলেন না। তখন চ্যবন তাঁহাদিগের সমক্ষে পুনৰ্ব্বার অন্তর্হিত হইলেন। নরপতি ও তাঁহার ভাৰ্য্যা তাহাতেও কিছুমাত্র বিরক্ত না হইয়া নিৰ্ব্বিকারচিত্তে সেই রাত্রি যাপন করিলেন। পরদিন প্রাতঃকালে মহর্ষি পুনরায় রাজার সমীপস্থ হইলেন এবং তাঁহার আজ্ঞাক্রমে পুনৰ্ব্বার সেই স্থানে বিবিধ স্নানীয় দ্রব্য, অন্ন, শয্যা ও বস্ত্র সমাহৃত হইল। এইরূপে ঊনপঞ্চাশৎ দিবস অতিক্রান্ত হইল; কিন্তু ভগবান্ চ্যবন কোনরূপেই নরপতির কিছুমাত্র রন্ধ্র প্রাপ্ত হইলেন না।
“পঞ্চাশৎ দিবসে মহর্ষি চ্যবন কুশিকের নিকট আগমনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি পত্নীসমভিব্যাহারে অচিরাৎ আমাকে রথারূঢ় করিয়া বহন কর। আমি যে স্থানে গমন করিতে বাসনা করিব, তোমাদিগকে সেই স্থানে রথ লইয়া যাইতে হইবে।’ মহর্ষি এই কথা কহিবামাত্র মহারাজ কুশিক নিঃশঙ্কচিত্তে তাঁহার বাক্য স্বীকার করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আমার ক্রীড়ারথ [বেড়াইবার রথ] ও সাংগ্রামিক রথ বিদ্যমান আছে, আজ্ঞা করুন, কোন্ রথ আনয়ন করিব?’ চবন কহিলেন, ‘মহারাজ! তুমি অবিলম্বে বিবিধ আয়ুধসম্পন্ন, কনক্যষ্ঠি [সোণার লাঠি] সমন্বিত, তোরণসুশোভিত [স্তম্ভযুক্ত দ্বারশোভিত], কিঙ্কিণীজালজড়িত [ঘণ্টাসমূহে শোভিত] সাংগ্রামিক রথ আনয়ন কর। তখন মহারাজ কুশিক মহাত্মা চ্যবনের আজ্ঞামাত্র স্বীয় সাংগ্রামিক রথ সুসজ্জিত করিয়া আনয়ন করিলেন এবং ঐ রথের বামভাগে ভাৰ্য্যাকে যোজিত করিয়া স্বয়ং উহার দক্ষিণভাগে যোজিত হইলেন।
“মহারাজ কুশিক ভাৰ্য্যার সহিত এইরূপে রথে যোজিত হইলে মহাত্মা চ্যবন রথারূঢ় হইয়া ত্রিদণ্ডযুক্ত হীরকনিৰ্ম্মিত সূক্ষ্মাগ্র প্রতোদ [চাবুক] ধারণ করিলেন। তখন নরপতি তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! এক্ষণে রথ লইয়া কোন্ স্থানে গমন করিতে হইবে, আজ্ঞা করুন। আপনি যে স্থানে গমন করিতে বাসনা করিবেন, আপনার রথ সেই স্থানেই উপনীত হইবে, সন্দেহ নাই।’ মহারাজ কুশিক এই কথা কহিলে মহর্ষি চ্যবন তাঁহাকে কহিলেন, মহারাজ! তুমি মৃদুগতি অবলম্বনপূৰ্ব্বক সৰ্ব্বজনসমক্ষে আমার রথ বহন কর। আমি যেন পরিশ্রান্ত না হইয়া পরমসুখে গমন করিতে পারি। আর পথিমধ্যে যেসমুদয় পথিক আমার নিকট উপস্থিত হইবে এবং যেসমুদয় ব্রাহ্মণ আমার নিকট ঐশ্বর্য্য প্রার্থনা করিবেন, আমি তাঁহাদিগকে অপরিমিত ধন-রত্ন প্রদান করিব। যাহাতে আমার এই অভিলাষ পূর্ণ হয়, তুমি অচিরাৎ তাহার ব্যবস্থা কর। তখন মহারাজ কুশিক ভৃত্যগণকে আহ্বানপূর্ব্বক কহিলেন, ‘এই মহর্ষি যখন যাহা প্রার্থনা করিবেন, তোমরা নিঃশঙ্কচিত্তে তৎক্ষণাৎ তাহা প্রদান করিবে।’ ভূপতি এইরূপ আদেশ করিলে ভৃত্যগণ অবিলম্বে অসংখ্য রত্ন, স্ত্রী, বাহন, ছাগমেষাদি পশু, সুবর্ণালঙ্কার, সুবর্ণমুদ্রা ও পৰ্ব্বতাকার হস্তীসমুদয় লইয়া তাঁহার অনুগমনে প্রবৃত্ত হইল। অমাত্যগণও তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। তখন মহর্ষি চ্যবন তীক্ষ্ণাগ্র প্রতোদদ্বারা সহসা সেই দম্পতিকে [১] প্রহার করিয়া তাঁহাদিগের পৃষ্ঠ ও গণ্ডস্থল ক্ষতবিক্ষত করিলেন। তদ্দর্শনে নগরের সমুদয় লোক কাতরস্বরে হাহাকার করিতে লাগিল। কিন্তু তৎকালে রাজা ও রাজ্ঞীর মনে কিছুমাত্র ক্রোধ উপস্থিত হইল না। তাঁহারা পঞ্চাশৎ দিন উপবাসী থাকিয়াও মহর্ষির প্রহার সহ্য করিয়া কম্পিতকলেবরে অতিকষ্টে তাঁহাকে বহন করিতে লাগিলেন।
“অনন্তর মহর্ষি চ্যবন পুনৰ্ব্বার সেই প্রতোদদ্বারা তাঁহাদিগের সর্ব্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করিলেন। তাঁহারা মহর্ষির কশাঘাতে রুধিরাক্ত কলেবর হইয়া পুষ্পিত কিংশুকবৃক্ষের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন, কিন্তু তৎকালে তাঁহাদের মন কিছুমাত্র বিকৃত হইল না। পৌরবর্গ তাঁহাদিগের সেইরূপ দুরবস্থাদর্শনে যারপরনাই। শোকাকুল হইয়াও অভিশাপভয়ে মহর্ষিকে কিছুমাত্র কহিতে সমর্থ হইল না। ঐ সময় তাঁহারা পরস্পর পরস্পরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘দেখ দেখ, মহাত্মা চ্যবনের কি আশ্চর্য্য তপোবল! আমরা ক্রূদ্ধ হইয়াও উঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে সমর্থ হইতেছি না। আর রাজা ও রাজ্ঞীর ধৈর্য্যও সামান্য নহে। উহারা পরিশ্রান্ত হইয়াও মহর্ষিকে বহন করিতেছেন, কিন্তু মহর্ষি উহাদের কিছুমাত্র বিরক্তি ভাব প্রদর্শনে সমর্থ হইতেছেন না।’
পরিচৰ্য্যা-পরিতুষ্ট চ্যবনের প্রসন্নতা
“ঐ সময় ভৃগুনন্দন চ্যবন সেই রাজদম্পতিকে বিকারশূন্য অবলোকন করিয়া দরিদ্রদিগকে কুবেরের ন্যায় অজস্র ধনদান করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। নরপতি কুশিক তাহাতেও কিছুমাত্র বিরক্ত না হইয়া তাঁহার আদেশানুসারে পূৰ্ব্ববৎ রথবহন করিতে লাগিলেন। তখন মহর্ষি যারপরনাই প্রীত হইয়া রথ হইতে অবতরণপূৰ্ব্বক সেই দম্পতিকে রথ হইতে মুক্ত করিয়া, মধুরবাক্যে কহিলেন, “হে মহারাজ! আমি তোমার ও তোমার পত্নীর কার্য্যদর্শনে অতিশয় প্রীত হইয়াছি। এক্ষণে তোমরা যে বর প্রার্থনা করিবে, আমি তোমাদিগকে তাহাই প্রদান করিব।’ মহর্ষি এই বলিয়া স্নেহভরে অমৃততুল্য করবিক্ষেপদ্বারা [হস্তামর্ষণদ্বারা—হাত বুলাইয়া দিয়া] তাঁহাদিগের বেদনাযুক্ত কোমল কলেবর স্পর্শ করিলেন। তখন নরপতি তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মহর্ষে! আপনার প্রসাদে আমাদিগের শ্রান্তি দূর হইয়াছে, আর আমাদিগের কিছুমাত্র ক্লেশ নাই। নরপতি কুশিক এই কথা কহিলে মহর্ষি চ্যবন মহা আহ্লাদিত হইয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! এই গঙ্গাতীর পরমপবিত্র ও রমণীয় স্থান; আমি ব্রত অবলম্বন করিয়া কিছুকাল এইস্থানে বাস করিব, এক্ষণে তোমরা স্ত্রীপুরুষে বিশ্রামার্থ স্বভবনে প্রতিগমন কর। কল্য এই স্থানে আগমন করিলেই আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে। তুমি কিছুমাত্র দুঃখিত হইও না। এক্ষণে তোমার সৌভাগ্যের সময় সমুপস্থিত হইয়াছে, তুমি যাহা যাহা বাসনা করিয়াছ, তৎসমুদয় পরিপূর্ণ হইবে।’
“মহর্ষি চ্যবন এই কথা কহিলে, নরপতি কুশিক মহা আহ্লাদিত হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, ‘ভগবন্! আমরা কিছুমাত্র দুঃখিত হই নাই। আপনার অনুগ্রহে আমরা দিব্য শরীর, অসাধারণ শক্তি ও পবিত্ৰতা লাভ করিয়াছি। আপনার প্রতোদপ্রহারে আমাদিগের শরীরে যে ব্রণ উৎপন্ন হইয়াছিল, এক্ষণে তাহার চিহ্নমাত্রও দেখিতেছি না। আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়াছি। পূর্ব্বে আমি এই দেবীকে যেরূপ অপ্সরার ন্যায় রূপলাবণ্যসম্পন্ন দেখিয়াছিলাম, এক্ষণেও তদ্রূপ দেখিতেছি। এই সমুদয় ঘটনা আপনার অনুগ্রহেই হইয়াছে। আপনি অনুকূল থাকিলে সকলই হইবার সম্ভাবনা।’
“নরপতি কুশিক এই কথা কহিলে, মহর্ষি চ্যবন তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাজন্! এক্ষণে তুমি গৃহে গমন কর। কল্য ভাৰ্য্যার সহিত এই স্থানে আগমন করিও।’
“তখন মহারাজ কুশিক মহর্ষি চ্যবনকে অভিবাদনপূর্ব্বক অমাত্য, পুরোহিত, সৈনিকপুরুষ ও বন্দী, বারবিলাসিনী ও প্রজাবর্গে পরিবেষ্টিত হইয়া ইন্দ্রের ন্যায় নগরমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক যামিনীযোগে ভাৰ্য্যার সহিত একশয্যায় শয়ান হইলেন। ঐ সময় আপনাদিগকে জরাবিহীন অমরের ন্যায় শ্রীমান্ ও নবযৌবন সম্পন্ন দেখিয়া তাঁহাদিগের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না। এদিকে ভৃগুকুলকীৰ্ত্তিবর্দ্ধন মহর্ষি চ্যবন তপোবলে সেই গঙ্গাতীরস্থ রমণীয় তপোবন বিবিধ রত্নে বিভূষিত করিয়া ইন্দ্রালয় হইতেও সমধিক সমৃদ্ধিশালী করিলেন।”
