৫২তম অধ্যায়
পরশুরামবৃত্তান্ত—কুশিক-চ্যবনসংবাদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! জমদগ্নিনন্দন রামের বৃত্তান্ত জ্ঞাত হইতে আমার একান্ত কৌতুহল উপস্থিত হইয়াছে। তাঁহার কিরূপে জন্ম হইল এবং তিনি ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া কি নিমিত্ত ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মাক্রান্ত হইলেন? আর মহারাজ কৌশিক ক্ষত্রিয় ছিলেন, বিশ্বামিত্র তাঁহার বংশে উৎপন্ন হইয়া কিরূপে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করিলেন? এই বিষয়ে আমার আরও একটি সংশয় হইয়াছে যে, মহর্ষি ঋচীক ও মহারাজ কুশিক স্ব স্ব বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কিন্তু মহর্ষি ঋচীকের পুত্র জমদগ্নির ক্ষত্রিয়ত্ব না হইয়া তাঁহার পৌত্র রামের ক্ষত্রিয়ত্ব এবং কুশিকের আত্মজ গাধি ব্রাহ্মণত্ব না হইয়া তাঁহার পৌত্র বিশ্বামিত্রের ব্রাহ্মণত্ব হইল কেন? আপনি পুরাবৃত্তে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছেন, অতএব এক্ষণে তাহা কীৰ্ত্তন করিয়া আমার এই সংশয় ছেদন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি তোমার এই সংশয় নিরাকরণ করিবার নিমিত্ত কুশিক-চ্যবনসংবাদনামক প্রাচীন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা মহর্ষি চ্যবন কুশিকবংশ হইতেই আপনার বংশে ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মের সঞ্চার হইবে, ইহা অনুধাবন এবং ক্ষত্রিয়ত্বসঞ্চার হইলে আপনার বংশে যে সমস্ত গুণ, দোষ ও বলাবল উপস্থিত হইবে, তাহা অনুমান করিয়া কুশিকের বংশ ভস্মসাৎ করিবার অভিলাষে তাঁহার নিকট সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! তোমার সহিত অবস্থান করিতে আমার অতিশয় অভিলাষ হইয়াছে। এক্ষণে, তোমার মত কি?’ মহারাজ কুশিক মহর্ষি চ্যবনের বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! কন্যাসম্প্রদানকালে এইরূপ নিয়ম নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে যে, কন্যা নিরন্তর ভৰ্ত্তার সহিত একত্র বাস করিবে। ফলতঃ পত্নীই পতির সহিত সতত একত্র বাস করিতে পারে, তদ্ভিন্ন আর কেহই কাহারও সহিত নিরন্তর বাস করিতে পারে না। অতএব এক্ষণে আপনি যেরূপ অভিলাষ প্রকাশ করিতেছেন, তাহা ধৰ্ম্মের অনুমোদিত নহে। যাহা হউক, আপনার যখন আমার সহিত একত্র বাসের ইচ্ছা হইয়াছে, তখন আমি অবশ্যই তদ্বিষয়ে সম্মত হইব।’
“মহারাজ কুশিক এই বলিয়া মহর্ষি চ্যবনকে আসন প্রদান ও ভৃঙ্গারনিঃসৃত সলিলদ্বারা তাঁহার পাদপ্রক্ষালনপূর্ব্বক বিধানানুসারে তাঁহাকে মধুপর্ক প্রদান করিলেন। পরে মহিষীসমভিব্যাহারে অব্যগ্রমনে তাঁহাকে বিধিপূৰ্ব্বক পূজা করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি ও আমার এই মহিষী আমরা উভয়েই আপনার একান্ত অধীন। এক্ষণে আমরা আপনার কোন্ কার্য্য অনুষ্ঠান করিব, আদেশ করুন। আমার রাজ্য, ধন ও ধেনু প্রভৃতি যে যে দ্রব্যে আপনার অভিলাষ হয়, আপনি ব্যক্ত করুন, অবিচারিতচিত্তে আপনাকে তৎসমুদয়ই প্রদান করিব। এই রাজপ্রাসাদ, রাজ্য ও ধৰ্ম্মাসন আপনারই অধিকৃত। আপনি এক্ষণে রাজা হইয়া স্বয়ং এই পৃথিবী শাসন করুন। আমি কেবল আপনার আশ্রিত মাত্র রহিলাম।
সপত্নীক কুশিকের চ্যবনপরিচৰ্য্যা
‘মহীপাল কুশিক এইরূপ বিনয় প্রকাশ করিলে, মহর্ষি চ্যবন প্রীতিপ্রফুল্লচিত্তে তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! আমি রাজ্য, ধেনু, দেশ, যজ্ঞীয় উপকরণ বা স্ত্রীসমুদয় প্রার্থনা করি না। আমার যেরূপ অভিলাষ, তাহা ব্যক্ত করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। এক্ষণে তোমার ও তোমার মহিষীর যদি অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে আমি কোন একটি নিয়মের অনুষ্ঠান করি। ঐ নিয়মানুষ্ঠানকালে তোমাদের উভয়কেই অকুণ্ঠিত মনে আমার পরিচৰ্য্যা করিতে হইবে।’ মহর্ষি এই কথা কহিলে মহারাজ কুশিক ও তাঁহার মহিষী পুলকিতমনে কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি যেরূপ আদেশ করিতেছেন, আমরা অবশ্যই তাহা সম্পাদন করিব। মহীপাল কুশিক পত্নীসমভিব্যাহারে এইরূপে মহর্ষির বাক্যে অঙ্গীকার করিয়া তাঁহাকে এক উৎকৃষ্ট গৃহমধ্যে লইয়া গিয়া তন্মধ্যস্থ ব্যবহারোপযোগী পদার্থসমুদয় প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনার নিমিত্ত এই শয্যা প্রস্তুত আছে, আপনি স্বেচ্ছানুসারে ইহাতে উপবেশন করুন। আমরা উভয়ে যথাসাধ্য আপনার প্রতি উৎপাদনের চেষ্টা করিব।’
“তাঁহারা পরস্পর এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এই অবসরে দিবাকর অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলেন। তখন মহর্ষি চ্যবন অন্নপান আহরণার্থ কুশিককে আদেশ করিলেন। মহারাজ কুশিক তাঁহার আদেশ প্রাপ্তিমাত্র প্রণত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তপোধন! আপনার কিরূপ অন্নপান প্রার্থনীয়, আজ্ঞা করুন, আমি তাহাই আনয়ন করিতেছি।’ তখন মহর্ষি চ্যবন প্রীতমনে তাহাকে কহিলেন, ‘মহারাজ! এক্ষণে তোমার আলয়ে যেরূপ অন্নপান প্রস্তুত আছে, তাহাই আনয়ন কর।’
চ্যবনের অদর্শনাদি যোগবল দর্শন
‘মহর্ষি এই কথা কহিলে মহারাজ কুশিক তাঁহার বাক্য শিরোধার্য্য করিয়া গৃহমধ্যে যে সমস্ত অন্নপান প্রস্তুত ছিল, তাঁহার নিমিত্ত তৎসমুদয় আহরণ করিলেন। মহর্ষি স্বেচ্ছানুসারে ঐ সমস্ত দ্রব্য ভোজন ও পান করিয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, ‘এক্ষণে আমার নিদ্রার সময় সমুপস্থিত হইয়াছে, আমি শয়ন করিব।’ মহর্ষি এই কথা কহিবামাত্র রাজা মহিষীসমভিব্যাহারে তাঁহাকে শয়নগৃহে লইয়া গেলেন। তখন মহর্ষি সেই শয়নগৃহমধ্যে সুপ্রশস্ত রমণীয় শয্যায় শয়ন করিয়া তাঁহাদিগকে কহিলেন, ‘দেখ, আমি নিদ্রিত হইলে তোমরা কদাচ আমাকে জাগরিত করিও না এবং নিরন্তর জাগরিত থাকিয়া আমার চরণ সংবাহন করিও।’ তখন কুশিক অবিচারিতচিত্তে ‘যে আজ্ঞা’ বলিয়া তাঁহার বাক্য শিরোধার্য্য করিয়া লইলেন। অনন্তর মহর্ষি এক পার্শ্বে শয়ন করিয়া গাঢ়তর নিদ্রায় অভিভূত হইলেন। ক্রমে রজনী প্রভাত হইল, তথাচ তিনি জাগরিত হইলেন না। রাজা ও রাজমহিষীও তাঁহাকে জাগরিত করিলেন না। তাঁহারা আহার-নিদ্রা পরিত্যাগপূৰ্ব্বক হৃষ্টান্তঃকরণে তাঁহার আদেশানুসারে পরিচর্য্যা করিতে লাগিলেন।
“এইরূপে একবিংশতি দিবস অতিবাহিত হইলে, তপোধন চ্যবন স্বয়ং শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিলেন এবং তাঁহাদিগকে কিছু না বলিয়াই সেই শয়নগৃহ হইতে নির্গত হইলেন। তখন রাজা ও মহিষী একান্ত ক্ষুধাবিষ্ট ও পরিচৰ্য্যাজনিত পরিশ্রমে নিতান্ত ক্লান্ত হইয়াও তাঁহার অনুসরণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু মহর্ষি চ্যবন তাঁহাদিগের প্রতি একবার দৃষ্টিনিক্ষেপও করিলেন না। কিয়ৎক্ষণ পরে মহর্ষি গমন করিতে করিতে তাঁহাদিগের সমক্ষেই অন্তর্হিত হইলেন। তদ্দর্শনে রাজা কুশিক যারপরনাই দুঃখিত হইয়া ক্ষিতিতলে নিপতিত হইলেন। রাজমহিষী প্রবোধবাক্যে তাঁহাকে আশ্বাস প্রদান করিতে লাগিলেন।”
