3 of 4

১৫০. সাবিত্ৰীমন্ত্র ও পুণ্যশ্লোকগণের নামকীর্ত্তন

১৫০তম অধ্যায়

সাবিত্ৰীমন্ত্র ও পুণ্যশ্লোকগণের নামকীর্ত্তন

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি সমুদয় শাস্ত্ৰপারদর্শী ও বিজ্ঞতম। অতএব কোন মন্ত্র জপ করিলে ধর্ম্মলাভ হয়? যাত্রা, গৃহপ্রবেশ, কাৰ্য্যারম্ভ ও শ্রাদ্ধকালে কোন মন্ত্র জপ করা কর্ত্তব্য এবং কোন্ মন্ত্র জপ করিলে শান্তি, পুষ্টি, রক্ষা, শত্রুবিনাশ ও ভয়নাশ হয়, আপনি তাহা কীর্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, মহারাজ! আমি বেদব্যাসকীৰ্ত্তিত মন্ত্র কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। সাবিত্রী দেবী ঐ মন্ত্রের সৃষ্টি করিয়াছেন। উহা পাঠ ও শ্রবণ করিলে পাপের লেশমাত্র থাকে না। যে ব্যক্তি দিবাভাগে ও রাত্রিকালে ঐ মন্ত্র জপ করেন, তিনি নিস্পাপ এবং যিনি ঐ মন্ত্র শ্রবণ করেন, তিনি দীর্ঘজীবী, কৃতার্থ ও উভয় লোকে সুখী হয়েন। সত্যধর্ম্মপরায়ণ ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মনিরত রাজর্ষিগণ প্রতিদিন প্রাতঃকালে ঐ মন্ত্র পাঠ করিলে অতি উৎকৃষ্ট শ্রীলাভ করিয়া থাকেন। ঐ মন্ত্র এই—‘মহাব্রতধারী বশিষ্ঠদেব, বেদনিধি পরাশর, মহাসর্প অনন্ত, অক্ষয় সিদ্ধগণ, ঋষিগণ এবং দেবাদিদেব বরদাতা সহস্ৰশীর্ষ ও সহস্রনামধারী জনার্দ্দনকে নমস্কার। অজ, একপাদ, অহিব্রধ্ন, পিনাকী, ঋত, পিতৃরূপ, এ্যম্বক, বৃষাকপি, শম্ভ, হবন ও ঈশ্বর এই একাদশ রুদ্র, ইঁহারাই আবার শতরুদ্র নামে কীৰ্ত্তিত হয়েন। অংশ, ভগ, মিত্র, জলেশ্বর বরুণ, ধাতা, অর্য্যমা, জয়ন্ত, ভাস্কর, ত্বষ্টা, পুষা, ইন্দ্র ও বিষ্ণু এই দ্বাদশ আদিত্য ইঁহারা সকলেই কশ্যপতনয়। ধর, সোম, সাবিত্র, অনিল, অনল, প্রত্যুষ ও প্রভাস এই আট মহাত্মা বসুনামে অভিহিত হইয়া থাকেন। নাসত্য, দস্র, ইঁহারা উভয়ে অশ্বিনীকুমার। উঁহারা সূর্য্যের ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া অশ্বরূপধারিণী সূৰ্য্যপত্নী সংজ্ঞার নাসা হইতে নির্গত হইয়াছিলেন। এই ত্রয়স্ত্রিংশৎ দেবতা সর্ব্বভূতের অধীশ্বর।

“অতঃপর লোকদিগের যজ্ঞ, দান প্রভৃতি সৎকর্ম্ম ও চৌর্য্যাদি দুষ্কর্ম্মের সাম্যদাতা মহাত্মাদিগের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ঐ মহাত্মারা জীবমণ্ডলে অদৃশ্যভাবে অবস্থান করিয়া শোকের শুভাশুভ কাৰ্য্য সমুদয় প্রত্যক্ষ করেন। মৃত্যু, কাল এবং বিশ্বদেব, পিতৃলোক, তপোধন ও সিদ্ধমহর্ষিগণ ইঁহারাই কাৰ্য্যের সাক্ষ্যদাতা। ইঁহাদিগের নামকীর্ত্তন করিলে ইঁহারা শুভফল প্রদান করিয়া থাকেন। ইঁহারা প্রযতভাবে বিধাতৃবিহিত দিব্যলোকসমুদয়ে অবস্থান করেন। নিত্য এই মহাত্মাদিগের নাম কীর্ত্তন করিলে ত্রিবর্গ ও পুণ্যলোক সমুদয় লাভ হয়। পূর্ব্বোক্ত ত্রয়স্ত্রিংশৎ দেবতা, নন্দীশ্বর, মহাকায়, গ্রামণী, বৃষভধ্বজ, গণপতি, বিনায়কগণ, সৌম্যগণ, রুদ্রগণ, ভূতগণ, জ্যোতিষ্কগণ, সরিদ্‌গণ, আকাশ, মুপর্ণ, পন্নগেশ্বর, সিদ্ধগণ, স্থাবর, জঙ্গমগণ, হিমালয় পর্ব্বত, চারি সমুদ্র, মহাদেবের অনুরূপ পরাক্রমযুক্ত অনুচরগণ, বিষ্ণু, জিষ্ণু, স্কন্দ এবং অম্বিকা ইঁহাদিগের নাম কীর্ত্তন করিলে পাপের লেশমাত্র থাকে না।

“অতঃপর ঋষিশ্রেষ্ঠগণের নাম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যবক্রীত, রৈভ্য, অৰ্ব্বাবসু, পরাবসু, কাক্ষীবান্, আঙ্গিরার পুত্রবর্গ। এবং মেধাতিথির পুত্র কণ্ব, এই সপ্ত মহর্ষি পূৰ্ব্বদিকে বাস করিতেছেন। ইঁহারা সকলেই ব্ৰহ্মতেজোময়, ইন্দ্রের গুরু এবং রুদ্র, অনল ও বসুর ন্যায় প্রভাসম্পন্ন। ইঁহারা ভূমণ্ডলে শুভকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়া এক্ষণে স্বর্গে দেবগণের সহিত একত্র অবস্থান করিতেছেন। ঐ সকল মহর্ষিদিগের নাম কীর্ত্তন করিলে ইন্দ্রলোকে সম্মানলাভ করা যায়। উন্মুচু, প্রমুচু, স্বশ্চাত্রেয়, দৃঢ়ব্য, ঊর্দ্ধবাহু, তৃণসোমাঙ্গিরা ও মিত্রাবরুণের পুত্র প্রতাপশালী অগস্ত্য ইঁহারা দক্ষিণদিকে অবস্থান করিতেছেন। এই মহাত্মারা ধৰ্ম্মরাজের পুরোহিত। দৃঢ়েয়ু, ঋতেয়ু, পরিব্যাধ, একত, দ্বিত, ত্রিত এবং মহর্ষি অলির পুত্র সারস্বত ইঁহারা পশ্চিমদিকে অবস্থান করিতেছেন। এই মহাত্মারা বরুণের পুরোহিত। অলি, বশিষ্ঠ, কশ্যপ, গৌতম, ভরদ্বাজ, কুশিকবংশোদ্ভব বিশ্বামিত্র ও ঋচীকতনয় জমদগ্নি ইঁহারা উত্তরদিকে অবস্থান করিতেছেন। এই মহাত্মারা কুবেরের গুরু। এই সমুদয় ভিন্ন আর সাতজন মহর্ষি আছেন তাঁহারা সমুদয় দিকে অবস্থান করিয়া থাকেন। এই সমুদয় মহর্ষির নাম কীর্ত্তন করিলে মানবগণের কীর্ত্তি ও মঙ্গললাভ হয়।

সাবিত্ৰীমন্ত্রাদি পাঠের ফল

“ধৰ্ম্ম, কাম, কাল, বসু, বাসুকি, অনন্ত, কপিল, এই সাত মহাত্মা পৃথিবী ধারণ করিতেছেন। ইঁহারা দিক্‌পালনামে কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকেন। ইঁহারা যে যে দিকে অবস্থান করেন, সেই সেই দিকের অভিমুখীন হইয়া ইঁহাদিগের শরণাগত হওয়া উচিত। পরশুরাম, বেদব্যাস, দ্রোণাচাৰ্য্যপুত্র অশ্বত্থামা, লোমশ ও পূর্ব্বোল্লিখিত ঋষিগণ ইঁহারা সকলেই লোকপাবন বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়া থাকেন। ইঁহারা তপঃপ্রভাবে সমুদয় লোকের সৃষ্টি করিতে পারেন। সংবর্ত্ত, মেরু, সাবর্ণ, মার্কণ্ডেয়, সাঙ্খযোগ, নারদ ও মহর্ষি দুর্ব্বাসা ইহারা তপঃপ্রভাবে ত্রিলোকমধ্যে বিখ্যাত হইয়াছেন। এই সমুদয় এবং ব্রহ্মলোকনিবাসী রুদ্রতুল্য প্রভাবশালী অন্যান্য মহর্ষিদিগের নাম কীর্ত্তন করিলে লোকে ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও পুত্রলাভে সমর্থ হয়।

“মানবগণ প্রতিদিন প্রাতঃকালে ও সায়ংকালে পৃথিবীর পিতা বেশরাজতনয় মহারাজ পৃথু, ইলার গর্ভে বুধের ঔরসে সমুৎপন্ন সূৰ্য্যবংশোদ্ভব মহাত্মা পুরূরবা, ত্রিলোকবিশ্রুত মহারাজ ভরত, সত্যযুগে গোমেধ-যজ্ঞের অনুষ্ঠাতা মহাত্মা রন্তিদেব, বিশ্বজিৎ যজ্ঞকর্ত্তা তপোবলসমন্বিত দ্যুতিমান্ রাজর্ষি শ্বেতমহাদেবের প্রসাদে গঙ্গার আনয়নকর্ত্তা অন্ধকবধের হেতুভূত সগরবংশের উদ্ধারকরণ রাজর্ষি ভগীরথ এবং হুতাশনের ন্যায় তেজঃপুঞ্জকলেবর অন্যান্য কীর্ত্তিমান দেবতা, ঋষি ও ভূপতিদিগের নাম কীর্ত্তন করিবে। সাংখ্যযোগ, হব্যকব্য ও সৰ্ব্বতির আশ্রয় পরব্রহ্ম। এই সমুদয় শব্দ সায়ং ও প্রাতঃকালে উচ্চারণ করিলে মনুষ্যের মঙ্গললাভ, ব্যাধিনাশ ও সকল কার্য্যে উন্নতি হইয়া থাকে। অতএব প্রতিদিন প্রাতঃকালে ও সায়ংকালে পূর্ব্বোক্ত মহাত্মাদিগের নাম কীর্ত্তন করা অবশ্য কর্ত্তব্য। উহারা সৃষ্টি পালনকর্ত্তা এবং বারিবর্ষণ ও বায়ুবহনের কারণ। ঐ মহাত্মারা শ্রেষ্ঠ, কার্য্যদক্ষ, ক্ষমাশীল ও জিতেন্দ্রিয়। উঁহারা মনুষ্যের সমুদয় দুরদৃষ্ট দূর করিতে পারেন। উহারা পাপপুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ। যাঁহারা প্রাতঃকালে, গাত্রোত্থান করিয়া উহাদিগের নাম কীর্ত্তন করেন, তাঁহাদিগের পথ অবিরুদ্ধ থাকে এবং তাঁহারা অগ্নিভয়, চৌরভয় ও দুঃস্বপ্নদর্শন প্রভৃতি সমুদয় অমঙ্গল হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া থাকেন। যে সমুদয় ব্রাহ্মণ যজ্ঞদীক্ষাসময়ে সংযত হইয়া এই সমুদয় পবিত্র নাম পাঠ করেন, তাঁহারা ন্যায়বান, আত্মনিরত, ক্ষমাশীল, জিতেন্দ্রিয়, অসূয়াবিহীন, সৰ্ব্বপাপবিমুক্ত ও স্বস্তিমান্ হইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিতে সমর্থ হয়েন। রোগার্ত্ত ব্যক্তিরা উহা পাঠ করিলে সমুদয় রোগ হইতে বিমুক্ত হইতে পারে। গৃহমধ্যে উহা পাঠ করিলে কুলের মঙ্গল, ক্ষেত্ৰমধ্যে পাঠ করিলে শস্যসম্পত্তি ও বিদেশগমনসময়ে পাঠ করিলে পথিমধ্যে মঙ্গললাভে সমর্থ হওয়া যায়। অতএব স্ত্রী, পুত্র, ধন, বীজ, ওষধি ও আপন হিতের নিমিত্ত উহা পাঠ করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ক্ষত্রিয় সংগ্রামকালে ঐ সমুদয় নাম জপ করেন, তিনি নিশ্চয়ই শত্রুবর্গকে পরাজিত করিয়া অক্ষতশরীরে স্বীয় গৃহে প্রত্যাগমন করিতে সমর্থ হয়েন।

“যে ব্যক্তি দৈব ও পিতৃকাৰ্য্য উপলক্ষ্যে উহা পাঠ করেন, দেবতা ও পিতৃগণ তাঁহার যজ্ঞে হব্যকব্য ভোজন করিয়া পরম পরিতৃপ্ত হয়েন। তাঁহাকে কখনই ব্যাধি, হিংস্ৰজন্তু, তস্কর হইতে ভীত হইতে হয় না এবং তিনি সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হয়েন। যাঁহারা অর্ণবযান, যান, প্রবাস ও রাজগৃহে এই সাবিত্রীমন্ত্র পাঠ করেন, তাঁহারা পরম সিদ্ধি লাভ করিতে পারেন; তাঁহাদের বালকগণ কখনই অকালে কালকবলে নিপতিত হয় না এবং তাঁহাদিগকে ভূপতি, পিশাচ, সর্প, রাক্ষস, অগ্নি, জল, পবন ও হিংস্র জন্তু হইতে কখনই ভীত হইতে হয় না। ফলতঃ সাবিত্রীমন্ত্র পাঠ করিলে চারিবর্ণেরই শান্তিলাভ হইয়া থাকে। যাঁহারা পরমপবিত্র সাবিত্রীমন্ত্র শ্রবণ করেন, তাঁহারা সমুদয় দুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া চরমে পরমগতি লাভ করিতে পারেন। যাঁহারা গোসমূহের মধ্যে এই মন্ত্র পাঠ করেন, তাঁহাদিগের গাভীগণ বহুবৎসা হয়। কি বিদেশযাত্রা, কি প্রবাসে অবস্থান, সমুদয় সময়েই এই মন্ত্র পাঠ করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। জপহোমপরায়ণ প্রতাত্মা মহর্ষিগণের উহার তুল্য পরম জপ্য মন্ত্র আর কিছুই নাই। পূৰ্ব্বে মহর্ষি পরাশর এই সনাতন মন্ত্র ইন্দ্রের নিকট সবিস্তর কীর্ত্তন করিয়াছিলেন; এক্ষণে আমি উহা তোমার নিকট কীর্ত্তন করিলাম। ঐ মন্ত্রকে সৰ্ব্বভূতের হৃদয় ও পুরাতন শ্রুতিস্বরূপ বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়।

“চন্দ্র ও সূৰ্য্যবংশোদ্ভব ভূপতিগণ পবিত্র হইয়া প্রাণীগণের পরমগতিস্বরূপ ঐ মন্ত্র পাঠ করিয়া থাকেন। সৰ্ব্বদা দেবগণ, সপ্তর্ষি ও মহাত্মা ধ্রুবের নাম কীর্ত্তন করিলে মনুষ্য স্বয়ং সমুদয় বিপদ্‌ হইতে মুক্তিলাভ ও অন্যের অমঙ্গল নিবারণ করিতে পারে। কাশ্যপ, গৌতম, ভৃগু, অঙ্গিরা, অত্রি, শুক্র, অগস্ত্য ও বৃহস্পতি প্রভৃতি বৃদ্ধ ব্রহ্মর্ষিগণ সর্ব্বদা সাবিত্রীমন্ত্রের উপাসনা করিয়া থাকেন। পূৰ্ব্বে মহর্ষি ঋচীকের পুত্রগণ ভগবান্ বশিষ্ঠের নিকট ঐ মন্ত্র লাভ করিয়াছিলেন। ইন্দ্রাদি দেবগণ ঐ সাবিত্রীমন্ত্র আশ্রয় করিয়াই দানবগণকে পরাজিত করিয়াছেন। যে ব্যক্তি বেদবেত্তা জ্ঞানবান ব্রাহ্মণকে সুবর্ণশৃঙ্গসম্পন্ন শত গাভী প্রদান করেন আর যিনি লোকসমাজে দিব্য-ভারতকথা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন, তাঁহারা উভয়েই তুল্যফল লাভ করিতে সমর্থ হয়েন, সন্দেহ নাই। মহাত্মা ভৃগুর নাম কীর্ত্তন করিলে ধর্ম্মলাভ, বশিষ্ঠকে নমস্কার করিলে সৌন্দৰ্য্যবৃদ্ধি, মহারাজ রঘুকে নমস্কার করিলে সংগ্রামে জয়লাভ এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের নামকীর্ত্তনে রোগ হইতে মুক্তিলাভ হইয়া থাকে। হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট সাবিত্রীমন্ত্র সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম, এক্ষণে অন্য যাহা শ্রবণ করিতে বাসনা থাকে, ব্যক্ত কর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *