3 of 4

১২৪. সামনীতির প্রশংসা—বিপ্র-রাক্ষসসংবাদ

১২৪তম অধ্যায়

সামনীতির প্রশংসা—বিপ্র-রাক্ষসসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সাম ও দান এই উভয়ের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ, আপনি তাহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ইহলোকে কেহ সাম এবং কেহ বা দানদ্বারা প্রসন্ন হইয়া থাকে; অতএব লোকের প্রকৃতি পরিজ্ঞাত হইয়া সাম অথবা দান অবলম্বন করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তৃক। যাহা হউক, আমার মতে ঐ দুইটির মধ্যে সামই উৎকৃষ্ট। সামদ্বারা দুর্দ্দান্ত প্রাণীগণকে বশীভূত করিতে পারা যায়। পূর্ব্বে এক ব্রাহ্মণ অরণ্যমধ্যে সামদ্বারা এক রাক্ষসের হস্ত হইতে যেরূপে মুক্ত হইয়াছিলেন, আমি এই উপলক্ষ্যে সেই পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

“একদা এক বুদ্ধিমান সদ্বক্তা ব্রাহ্মণ কোন নির্জ্জন বনের মধ্য দিয়া গমন করিতেছিলেন, এমন সময়ে এক ভয়ঙ্কর নিশাচর ক্ষুধার্ত্ত হইয়া তাঁহাকে রুদ্ধ করিল। ব্রাহ্মণ রাক্ষসের ভীষণমূৰ্ত্তি দর্শন করিয়াও কিছুমাত্র ব্যথিত বা মুগ্ধ না হইয়া সাত্ত্ববাদদ্বারা বিপদুদ্ধারের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তখন নিশাচর তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ‘ব্রাহ্মণকুমার! আমার শরীর এরূপ পাণ্ডুবর্ণ ও কৃশ হইল কেন? যদি তুমি আমার এই প্রশ্নের সদুত্তর প্রদান করিতে পার, তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারিবে।’

“রাক্ষস এই কথা কহিলে ব্রাহ্মণ চিন্তা করিয়া তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘নিশাচর! আমার বোধ হয়, কোন বিদেশস্থ উদাসীন ব্যক্তি তোমার সমক্ষেই তোমার অতুল সম্পত্তি ভোগ করিতেছে। তোমার মিত্রগণ তোমাকর্ত্তৃক যথোচিত পূজিত হইয়াও আপনাদের দোষে তোমাকে পরিত্যাগ করিতেছে। তুমি গুণবান, বিনীত ও বিজ্ঞ হইয়াও নির্গুণ মূঢ়দিগের সৎকার লাভ করিতে দেখিতেছ। নীচব্যক্তিরা ঐশ্বর্য্যমদে মত্ত হইয়া তোমাকে অবজ্ঞা করিতেছে। তুমি গৌরবনিবন্ধন প্রতিগ্রহাদি নীচকার্য্যে বিরত হইয়া অতিকষ্টে জীবিকানির্ব্বাহ করিতেছ। তুমি স্বীয় মহানুভবতানিবন্ধন স্বয়ং ক্লেশ স্বীকার করিয়াও যাহার উপকার করিয়াছিলে, সে তোমায় পরাজিত জ্ঞান করিতেছে। কামক্রোধপরত কুপথগামী মূঢ়দিগকে ক্লেশভোগ করিতে দেখিয়া তোমার অত্যন্ত কষ্ট হইতেছে। তুমি জ্ঞানবান হইয়াও প্রজ্ঞাবিহীন দুর্ব্বৃত্তগণকর্ত্তৃক তিরস্কৃত হইতেছ। কোন শত্রুপক্ষীয় ব্যক্তি মিত্রভাবে তোমার নিকট আগমনপূর্ব্বক তোমাকে বঞ্চনা করিয়া পলায়ন করিয়াছে। তুমি অর্থফলজ্ঞ [অর্থসিদ্ধিবিষয়ে অভিজ্ঞ], শাস্ত্রকুশল ও কৃতী হইয়াও তোমার গুণজ্ঞ ব্যক্তিদিগের নিকট সম্মানিত হইতেছ না। তুমি অসৎ সমাজে স্বীয় গুণসমুদয় ব্যক্ত করিয়া প্রতিষ্ঠালাভে সমর্থ হও নাই। বল, বুদ্ধি ও বেদজ্ঞানবিহীন হইয়া কেবল তেজস্বিতানিবন্ধন মহৎপদলাডের বাসনা করিতেছ।

‘তুমি বনবাসী হইয়া তপস্যা করিতে ইচ্ছা করিলেও তোমার বান্ধবগণ ঐ কার্য্যের অনুমোদন করিতেছে না। তোমার একজন ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন যুবা কামবিমোহিত প্রতিবাসী আছে, সে পাছে তোমার প্রিয়তমা ভাৰ্য্যাকে হরণ করে, এই আশঙ্কা প্রতিনিয়ত তোমার মনে জাগরূক রহিয়াছে। তুমি ধনবান্ ব্যক্তিদিগের নিকট যথাসময়ে উৎকৃষ্ট বাক্য কীৰ্ত্তন করিলেও ঐ বাক্য গৌরববিহীন হইয়া থাকে। তোমার একজন পরমাত্মীয় স্বীয় মূঢ়তানিবন্ধন অর্থসিদ্ধিরিষয়ে অভিজ্ঞ ক্রোধাবিষ্ট হইয়াছে। কিন্তু তুমি তাহাকে সান্ত্বনা করিতে সমর্থ হইতেছ না। কোন ব্যক্তি তোমাকে প্রথমে তোমার অভিলষিত কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া পশ্চাৎ সতত কার্য্যান্তরে নিযুক্ত করিতে অভিলাষ করিতেছে। তুমি স্বীয় গুণপ্রভাবে লোকসমাজে পূজিত হইলে তোমার বান্ধবগণ তাহাদিগেরই প্রভাবে তোমাকে পূজিত জ্ঞান করিয়া থাকে। তুমি লজ্জাবশতঃ স্বীয় অন্তর্গত অভিপ্রায় ব্যক্ত করিতে শিথিলপ্রযত্ন [যত্নহীন] হইয়াছ। তুমি ভিন্ন ভিন্ন বুদ্ধিসম্পন্ন লোকসমুদয়কে স্বীয় গুণদ্বারা বশীভূত করিতে ইচ্ছা করিতেছ। স্বয়ং অবিদ্বান ও অল্পধন হইয়াও বিদ্যাবিক্রম ও দানলভ্য যশোলাভে তোমার বাসনা হইয়াছে। কখন তুমি চিরাভিলষিত ফললাভে সমর্থ হও নাই।

‘যখন তুমি কোন বিষয়ে কৃতকার্য্য হইবার চেষ্টা কর, তখন অন্যে তোমার সেই বিষয়ের বিঘ্ন করিয়া থাকে। তুমি নিরপরাধ হইয়াও অকারণে অন্যকর্ত্তৃক অভিশপ্ত হইয়াছ। তুমি গুণবিহীন ও নিৰ্দ্ধন হইয়া স্বীয় সুহৃদ্বর্গের দুঃখমোচন করিতে সমর্থ হইতেছ না। তুমি সাধুদিগকে গৃহস্থ, অসাধুদিগকে বনচারী ও মুক্ত পুরুষদিগকে গৃহবাসে আসক্ত দেখিয়াছ। তোমার ধর্ম্ম, অর্থ, কাম ও সময়োচিত বাক্যের স্ফূৰ্ত্তি হইতেছে না। তুমি মনীষী হইয়া কৃপণের দত্ত অর্থদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ করিতেছ। পাপাত্মাদিগের উন্নতি ও পুণ্যবানদিগের অবসাদ দর্শন করিয়া তোমার মনে সর্ব্বদা অনুতাপ হইতেছে। তুমি সুহৃদ্বর্গের অনুরোধে পরস্পরবিরোধী ব্যক্তিদিগের প্রিয়কার্য্যানুষ্ঠানের চেষ্টা করিতেছ অথবা শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণদিগকে কুমাৰ্গশালী ও জ্ঞানবানদিগকে অজিতেন্দ্রিয় দেখিয়া তোমাকে অতিশয় অনুতাপ করিতে হইতেছে। হে নিশাচর! এই সমুদয়ের অন্যতর কারণবশতঃই তোমার শরীর এরূপ কৃশ ও পাণ্ডুবর্ণ হইয়াছে।’

“বুদ্ধিমান ব্রাহ্মণ এই কথা কহিলে রাক্ষস তাঁহার বাক্যে পরম পরিতুষ্ট হইয়া তাঁহার সহিত মিত্ৰতা সংস্থাপনপূর্ব্বক তাঁহাকে যথোচিত সৎকার ও অতুল সম্পত্তি প্রদান করিয়া বিদায় করিল।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *