3 of 4

১১৬. বৈধমাংসে দোষাভাব—ক্ষত্রিয়ের মাংসভক্ষণবিধি

১১৬তম অধ্যায়

বৈধমাংসে দোষাভাব—ক্ষত্রিয়ের মাংসভক্ষণবিধি

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ইহলোকে মাংসলোলুপ নৃশংসেরা রাক্ষসের ন্যায় মাংসেরই সবিশেষ প্রশংসা করিয়া থাকে; বিবিধ অপূপ, শাক ও খণ্ড প্রভৃতি নানাপ্রকার সুস্বাদু ভক্ষ্যদ্রব্যের প্রতি তাদৃশ প্রীতি প্রদর্শন করে না। তাহাদিগের তাদৃশ ভাব দর্শনে আমার মন মোহে অভিভূত হইতেছে। এক্ষণে আমার বোধ হয় যে, মাংস অপেক্ষা সুস্বাদু বস্তু আর কিছুই নাই। অতএব আপনি অনুকম্পা প্রদর্শনপূর্ব্বক মাংসভক্ষণ ও অভক্ষণের দোষ কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মাংস অপেক্ষা যে সুস্বাদু দ্রব্য আর কিছুই নাই, এ কথা নিতান্ত অলীক নহে। স্বভাবতঃ দূর্ব্বল, কৃশ, স্ত্রীসম্ভোগপরায়ণ ও পথগমনক্লেশক্লিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে মাংস পুষ্টিকর বলিয়া প্রসিদ্ধি আছে। মাংসভক্ষণ করিলে অচিরাৎ বল ও পুষ্টিলাভ হইয়া থাকে। মাংস অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ভক্ষ্য আর কিছুই নাই; কিন্তু মাংসাহার পরিত্যাগ করিলে অনেক উৎকৃষ্ট ফললাভ করা যায়। যে ব্যক্তি অন্যের মাংসদ্বারা স্বীয় মাংস বৰ্দ্ধিত করিতে ইচ্ছা করে, তাহা অপেক্ষা ক্ষুদ্রাশয় নিষ্ঠুর আর নাই। এই জীবলোকে জন্তুগণের প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়তর আর কিছুই নাই, অতএব মনুষ্য আপনার ন্যায় অন্যের প্রিয় প্রাণ সংহার করিতে কদাচ প্রবৃত্ত হইবে না। শুক্র হইতেই মাংস উৎপন্ন হয়, অতএব উহা ভক্ষণ করা নির্ঘৃণের কৰ্ম্ম। মাংসভক্ষণ করিলে সমধিক পাপ ও মাংসাহার পরিত্যাগ করিলে বিপুল পুণ্যলাভ হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই; কিন্তু যদি বেদবিধানানুসারে মাংস ভক্ষণ করা যায়, তাহা হইলে কিছুমাত্র দোষ জন্মে না। বেদে নির্দ্দিষ্ট আছে যে, পশুসকল যজ্ঞের নিমিত্তই সৃষ্ট হইয়াছে; অতএব সেই যজ্ঞ ব্যতীত অন্য কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে পশুহিংসা করিলে রাক্ষসবৎ ব্যবহার করা হয়।

“এক্ষণে ক্ষত্রিয়দিগের পশুহিংসাবিষয়ে, যেরূপ বিধি নির্দ্দিষ্ট আছে, তাহাও কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ক্ষত্রিয়েরা স্বীয় পরাক্রমোপার্জ্জিত মাংস ভক্ষণ করিলে তাহাদিগকে কদাচ পাপে লিপ্ত হইতে হয় না। পূর্ব্বে মহর্ষি অগস্ত্য সমুদয় আরণ্য মৃগকে প্রেক্ষিত করিয়াছিলেন, এই নিমিত্তই মৃগয়া নির্দ্দোষ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকে। মৃগয়াশীল ব্যক্তি প্রাণপণেই মৃগয়ায় প্রবৃত্ত হয়। ‘হয় মৃগেরা আমাকে বিনাশ করুক, না হয় আমি উহাদিগকে সংহার করিব’ মৃগয়াকালে মনুষ্যের অন্তঃকরণে এইরূপ ভাবের উদয় হইয়া থাকে। এই কারণে মৃগয়া দোষাবহ ও পাপজনক নহে বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। যাহা হউক, প্রাণীগণের প্রতি দয়াপ্রকাশ অপেক্ষা ইহলোকে ও পরলোকে উৎকৃষ্ট কার্য্য আর কিছুই নাই। যে জন দয়াবান, তাহার কদাচ ভয় উপস্থিত হয় না। দয়াবান্‌দিগের ইহলোক ও পরলোক উভয়লোকই আয়ত্ত হয়, সন্দেহ নাই।

মাংসভক্ষণ নিবৃত্তির প্রশংসা—প্রবৃত্তির পরিণাম

“ধর্ম্মপরায়ণ মনুষ্যেরা অহিংসাত্মক কার্য্যেরই অনুষ্ঠান করিবেন। যে মহাত্মা দয়াপরায়ণ হইয়া প্রাণীগণকে অভয় প্রদান করেন, সমস্ত প্রাণী হইতে তাঁহার আর কিছুমাত্র ভয় উপস্থিত হয় না। প্রাণীগণ সেই অভয়দাতা ক্ষত, স্খলিত বা আহত হউন, সকল অবস্থাতেই তাঁহাকে পরিত্রাণ করিয়া থাকে। হিংসজন্তু, রাক্ষস বা পিশাচেরাও তাঁহাকে বিনাশ করে না। যিনি অন্যের বিপদে সাহায্য করেন, তাঁহার বিপদ উপস্থিত হইলে অন্যে প্রাণপণে সাহায্য করিয়া থাকে। প্রাণদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট দান আর কখন হয় নাই, হইবেও না। প্রাণ অপেক্ষা প্রিয়তর আর কিছুই নাই। মৃত্যু সকল প্রাণীরই অপ্রীতিকর, মৃত্যুকাল উপস্থিত হইলে সকলেরই কলেবর কম্পিত হইয়া থাকে। প্রাণীগণ এই সংসারমধ্যে জন্ম ও জরাজনিত দুঃখে নিরন্তর ক্লিষ্ট হয়, পরিশেষে আবার মৃত্যু উপস্থিত হইয়া তাহাদিগকে যারপরনাই যন্ত্রণা প্রদান করিয়া থাকে। যাহারা মাংসাহারনিরত, তাহারা প্রথমতঃ কুম্ভীপাক-নরক ভোগ করিয়া পরিশেষে বারংবার তির্য্যগ্‌জাতির গর্ভে অবস্থানপূৰ্ব্বক ক্ষার, অম্ল ও কটুরস এবং মূত্র, শ্লেষ্ম ও পুরীষদ্বারা সিক্ত ও ক্লিষ্ট হয়। তৎপরে ভূমিষ্ঠ হইয়া অন্যের বশীভূত এবং পুনঃ পুনঃ ছিন্ন ও পতিত হইয়া থাকে। তাহাদিগকে বারংবার অন্যকর্ত্তৃক আক্রান্ত ও নিহত হইতে হয়।

“পৃথিবীতে আত্মাপেক্ষা প্রিয়তর আর কিছুই নাই; অতএব সমুদয় প্রাণীর আত্মাতে দয়াবান হওয়া সকলেরই উচিত। যিনি যাবজ্জীবন কোন পশুর মাংস ভোজন করেন না, স্বর্গে তাঁহার সুবিস্তীর্ণ স্থানলাভ হইয়া থাকে। যে দুরাত্মা জীবিতপ্রিয় পশুগণের, মাংস ভক্ষণ করে, তাহারা পরজন্মে সেই সমস্ত নিহতপশুকর্ত্তৃক আবার ভক্ষিত হয়, সন্দেহ নাই। যাহারা পশু বিনাশ করে, পরজন্মে তাহারা অগ্রে এবং যাহারা সেই বিনষ্ট পশুর মাংস ভক্ষণ করে, তাহারা তৎপশ্চাৎ সেই পশুকর্ত্তৃক বিনষ্ট হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি আক্রোশ প্রকাশ করে, তাহাকে পরজন্মে অন্যকর্ত্তৃক আক্রুষ্ট ও যে অন্যের প্রতি দ্বেষ প্রকাশ করে, তাহাকে তৎকর্ত্তৃক দ্বিষ্ট হইতে হয়। যে ব্যক্তি যে অবস্থায় যে কার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহাকে সেই অবস্থাতেই সেই কাৰ্য্যের ফলভোগ করিতে হয়, সন্দেহ নাই। ফলতঃ অহিংসাই মনুষ্যের পরম ধৰ্ম্ম, পরম দান, পরম তপ, পরম যজ্ঞ, পরম বল, পরম মিত্র, পরম সুখ, পরম সত্য ও পরম জ্ঞান। অহিংসাই সমস্ত যজ্ঞের দান ও সমস্ত তীর্থস্নানের তুল্য ফল প্রদান করিয়া থাকে। পৃথিবীস্থ সমুদয় বস্তুদানের ফলও অহিংসার ফল অপেক্ষা উৎকৃষ্ট নহে। অহিংসক ব্যক্তিরা সকলের পিতামাতা স্বরূপ।

“হে ধৰ্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট সামান্যতঃ অহিংসার ফল কীৰ্ত্তন করিলাম, ইহার সমগ্র ফল শত বৎসরেও বলিয়া নিঃশেষ করা যায় না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *