১৩৯তম অধ্যায়
বিষ্ণুমাহাত্ম কীর্ত্তন
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি আমাদিগের কুলপ্রদীপ। কোন শাস্ত্রই আপনার অবিদিত নাই। আমাদের জ্ঞাতি ও বান্ধবগণ সকলেই বিনষ্ট হইয়াছেন; এক্ষণে আপনিই আমাদিগের একমাত্র উপদেষ্টা। অতঃপর আপনার নিকট ধর্ম্মার্থসংযুক্ত পরিণাম সুখকর আশ্চৰ্য্য বিষয় পরিজ্ঞাত হইতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে, অতএব যদি আমার ও আমার ভ্রাতৃগণের প্রতি আপনার অনুগ্রহ থাকে, তাহা হইলে আপনি আমাদিগের হিতার্থ এই আপনার সম্মানকারী সৰ্ব্বপার্থিবপূজিত মহাত্মা মধুসূদন ও এই সমুদয় নরপতির সমক্ষেই উহা কীর্ত্তন করুন।”
ধর্ম্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে মহাত্মা শান্তনুতনয় সস্নেহবাক্যে তাঁহাকে কহিলেন, “বৎস! পূৰ্ব্বে আমি এই মহাত্মা বাসুদেব ও ভগবান্ ভবানীপতির যেরূপ মাহাত্ম্য শ্রবণ করিয়াছিলাম এবং রুদ্র ও রুদ্রাণীর যেরূপ সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল, এক্ষণে সেই বিচিত্র উপাখ্যান কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“পূৰ্ব্বে কোন পৰ্ব্বতে এই ধৰ্ম্মপরায়ণ বাসুদেব দ্বাদশবার্ষিক কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে নারদ, পর্ব্বত, বেদব্যাস, ধৌম্য, দেবল, কাশ্যপ ও হস্তিকাশ্যপ প্রভৃতি অসংখ্য দীক্ষাসম্পন্ন মহর্ষি এবং সিদ্ধগণ স্ব স্ব শিষ্যগণসমভিব্যাহারে ইঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তথায় সমুপস্থিত হয়েন। ইনি সেই দেবতুল্য মহর্ষিগণকে সমাগত দেখিয়া প্রীতমনে তাঁহাদিগের যথোচিত সৎকার করিলেন। তখন কেহ কেহ ময়ূরপুচ্ছযুক্ত ও কেহ কেহ বা অন্যান্যপ্রকার নূতন আসনে উপবিষ্ট হইয়া পরস্পর প্রীতমনে ধৰ্ম্মবিষয়ের আলোচনা করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে মহাত্মা মধুসূদনের মুখ হইতে হঠাৎ ব্রহ্মচর্য্যজনিত তেজোরাশি বিনির্গত হইয়া তত্ৰত্য রাজর্ষি, মহর্ষি ও দেবগণের সমক্ষেই সেই মৃগপক্ষিশ্বাপদসম্বলিত বৃক্ষলতাদিসমাকীর্ণ পর্ব্বত দগ্ধ করিতে লাগিল। পৰ্ব্ববাসী প্রাণীগণ দারুণ দহনদাহে বিচেতনপ্রায় হইয়া হাহাকার করিতে আরম্ভ করিল।
“অনন্তর সেই সুদারুণ বহ্নি ক্রমে ক্রমে সেই পৰ্ব্বতের শিখরসমুদয় ভস্মীভূত করিয়া শিষ্যের ন্যায় এই বাসুদেবের নিকট সমুপস্থিত হইয়া ইঁহার পাদদ্বয়ে অবনত হইল। তখন ভগবান্ মধুসুদন সেই পৰ্ব্বতকে দগ্ধপ্রায় দেখিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে উহার প্রতি স্নিগ্ধদৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। বাসুদেব দৃষ্টিপাত করিবামাত্ৰ পৰ্ব্বত পূৰ্ব্ববৎপুষ্পিত বৃক্ষলতাতে সমাকীর্ণ এবং পক্ষী, শ্বাপদ ও সরীসৃপ প্রভৃতি জন্তুসমুদয়ে পরিপূর্ণ হইল।
“ঐ সময় মহর্ষিগণ সেই অচিন্তনীয় অত্যাশ্চর্য্য ব্যাপারদর্শনে রোমাঞ্চিত হইয়া বিস্ময়োৎফুল্ললোচনে ভক্তিভাবে অশ্রুমোচন করিতে লাগিলেন। মহাত্মা বাসুদেব তাঁহাদিগকে বিস্ময়াবিষ্ট দেখিয়া মধুরবাক্যে কহিলেন, ‘হে তপোধন! আপনারা নিঃশঙ্ক, নিৰ্ম্মম [মায়া-মমতা-মোহহীন] ও শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন হইয়াও এরূপ বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন কেন?’
“মহর্ষিগণ কহিলেন, ‘প্রভো! আপনা হইতেই লোকসমুদয়ের সৃষ্টি ও সংহার হইতেছে, আপনিই শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষাস্বরূপ এবং ইহলোকে যেসমুদয় স্থাবরজঙ্গম বিদ্যমান রহিয়াছে, আপনিই তৎসমুদয়ের পিতা, মাতা, প্রভু ও উৎপত্তির কারণ, সন্দেহ নাই। এক্ষণে আপনার মুখ হইতে হুতাশন নির্গত হইতে দেখিয়া আমরা নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইয়াছি; অতএব আপনি অগ্রে এই বহ্নির উৎপত্তির কারণ আমাদিগের নিকট কীর্ত্তন করুন; পরে আমরা যাহা দেখিয়াছি ও শুনিয়াছি, তৎসমুদয় আপনার নিকট নিবেদন করিব।’
“তখন বাসুদেব কহিলেন, ‘হে মহর্ষিগণ! প্রলয়কালীন হুতাশনের ন্যায় যে তেজ আমার বদন হইতে নিঃসৃত হইয়া এই পৰ্ব্বতকে দগ্ধ করিল, উহা বৈষ্ণবতেজ। আপনারা জিতক্রোধ, জিতেন্দ্রিয় ও দেবতুল্য হইয়াও ঐ তেজোদর্শনে উদ্বিগ্ন হইয়াছেন। আমি ব্রহ্মচর্য্য আশ্রয় করিয়াছি বলিয়াই আমার মুখ হইতে বহ্নি সমুদ্ভূত হইয়াছে; অতএব, আপনারা উদ্বেগ পরিত্যাগ করুন। আমি আত্মতুল্য পুত্রলাভের বাসনায় এই পৰ্ব্বতে সমুপস্থিত হইয়া কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতেছি। আমার দেহস্থিত আত্মা অগ্নিরূপে বিনির্গত হইয়া সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মার নিকট গমন করিয়াছিল। এক্ষণে তাঁহার নিকট মহাদেবের তেজের অর্দ্ধাংশ আমার পুত্ররূপে পরিণত হইবে শ্রবণ করিয়া আমার সমীপে প্রত্যাগত হইয়া শিষ্যের ন্যায় আমার পাদদ্বয় বন্দনপূর্ব্বক শান্তভাব অবলম্বন করিয়াছে।
‘এই আমি আপনাদের নিকট স্বীয় নিগুঢ় তত্ত্ব সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম; আপনারা উদ্বেগ পরিত্যাগ করুন। আপনারা জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন ও ব্রতপরায়ণ। আপনাদিগের গতি কুত্রাপি প্রতিহত হয় না। অতএব এক্ষণে আপনারা আকাশে বা পৃথিবীতে যে-কোন আশ্চর্য্য বিষয় দর্শন করিয়াছেন, তাহা কীর্ত্তন করুন। আমি আপনাদিগের বদনবিনিঃসৃত বচনসুধা পান করিতে নিতান্ত অভিলাষী হইয়াছি। আমি স্বীয় অপ্রতিহত প্রকৃতিভাবে কি পৃথিবী, কি স্বর্গস্থ সমুদয় অদ্ভূত বিষয়ই অবগত হইতে পারি যথার্থ বটে, কিন্তু আমি আপনার প্রকৃতিভাবে যাহা অবগত হই, তাহা আমার আশ্চর্য্য বলিয়া জ্ঞান হয় না। বিশেষতঃ সাধুব্যক্তিরা যেসমুদয় বাক্য কীর্ত্তন করেন, তৎসমুদয় অতিশয় শ্রদ্ধেয় এবং পাষাণলিপির ন্যায় চিরস্থায়ী হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত আপনাদিগের মুখবিনির্গত বাক্য শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। আমি আপনাদিগের মুখে লোকের নির্ম্মল বুদ্ধিপ্রদ বাক্যসমুদয় শ্রবণ করিয়া উহা লোকসমাজে প্রকাশ করিব, সন্দেহ নাই।
“এই মহাত্মা বাসুদেব তৎকালে মুনিগণকে এই কথা কহিলে তাঁহারা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া কেহ ইঁহার পূজা ও কেহ ইঁহার স্তব করিতে করিতে ইঁহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। অনন্তর তাঁহারা সকলে একবাক্য হইয়া তপোধনাগ্রগণ্য দেবর্ষি নারদকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভগবন্! আমরা তীর্থযাত্রাকালে হিমালয়পর্ব্বতে যে অচিন্ত্যনীয় বিষয় দর্শন করিয়াছি, আপনি আমাদিগের হিতার্থ এই মহাত্মা বাসুদেবের নিকট তাহা আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করুন।’ ”
