১৪৬তম অধ্যায়
নারীগণের ধর্ম্মনিরূপণ
নারদ কহিলেন, “ভগবন! ভূতভাবন প্রিয়তমা পার্ব্বতীকে এইরূপ কহিয়া স্বয়ং কিঞ্চিৎ জ্ঞাত হইবার বাসনায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘প্রিয়ে। তুমি উৎকর্ষ ও ধর্ম্মবিষয় বিলক্ষণ অবগত আছ। এই তপোবনই তোমার প্রধান বাসস্থান। তুমি সার্ধ্বী, সুকেশী, কাৰ্য্যদক্ষ, দম ও শান্তিগুণযুক্ত, মমতাপরিশূন্য এবং ধর্ম্মানুষ্ঠাননিরত। ব্রহ্মার পত্নী সাবিত্রী, ইন্দ্রের শচী, মার্কণ্ডেয়ের ধুমোৰ্ণা, কুবেরের ঋষি, বরুণের গৌরী, সুর্য্যের সুবর্চ্চলা, চন্দ্রের রোহিণী, অগ্নির স্বাহা এবং কশ্যপের পত্নী অদিতি; ইঁহাদের সকলেরই সহিত তোমার সাক্ষাৎকার ও সহবাস হইয়াছে। কি ধৰ্ম্ম, কি শীলতা, কি ব্রত, কি সারাংশ, কি বীর্য্য, কোন বিষয়েই তুমি আমা অপেক্ষা ন্যূন নহ। তুমি অবলাগণের একমাত্র গতি। ভূমণ্ডলস্থ ধৰ্ম্মানুষ্ঠাননিরত কামিনীগণ তোমারই চরিত্রের অনুসরণ করিয়া থাকে। তোমার অর্দ্ধশরীরদ্বারা আমার অর্দ্ধশরীর নির্ম্মিত হইয়াছে। তুমি দেবতা ও মনুষ্যদিগের মঙ্গলসাধন করিয়া থাক। স্ত্রীজাতির শাশ্বত ধর্ম্মবিষয় তোমার অবিদিত নাই। অতএব তুমি এক্ষণে উহা সবিশেষ কীর্ত্তন কর। কারণ, তুমি যাহা কীর্ত্তন করিবে, তাহা অবশ্যই এই জগতে প্রমাণ বলিয়া পরিগণিত হইবে।
“ভগবান্ ভূতভাবন এই কথা কহিলে, পার্ব্বতী তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ভগবন্! আপনি সমুদয় জীবের ঈশ্বর। ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্ত্তমান আপনা হইতেই উদ্ভূত হইয়া থাকে। আপনার প্রসাদবলেই আমার বাক্তি প্রতিভাসিত [১] হইয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে আপনার জ্ঞানার্থ সরিদ্বরা, সরস্বতী, বিপাশা, বিতস্তা, চন্দ্রভাগা, ইরাবতী, শতদ্রু, দেবিকা, সিন্ধু, কৌশিকী, গোমতী এবং স্বর্গ হইতে সমাগত সমুদয় তীর্থে পরিবেষ্টিত দেবনদী গঙ্গা, ইহাদের সহিত পরামর্শ করিয়া আনুপূর্ব্বিক স্ত্রীধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিব। স্ত্রীজাতিরা স্বজাতিরই অনুধাবন করিয়া থাকে। বিশেষতঃ আমি নদীসমুদয়ের সহিত পরামর্শ করিলে উহাদের সম্মান পরিবর্দ্ধিত হইবে; অতএব উহাদের সহিত পরামর্শ করা আমার অবশ্য কর্ত্তব্য।’ ভগবতী মহাদেবকে এই কথা কহিয়া হাস্যবদনে খ্রীধৰ্ম্মকুশল সরিদগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে নদীগণ! ভগবান ভূতপতি আমাকে স্ত্রীধৰ্ম্মবিষয়ক যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি তোমাদিগের সহিত পরামর্শ করিয়া উহাকে তাহার উত্তর প্রদান করিবার বাসনা করি। এই ভূমণ্ডলে বা স্বর্গমধ্যে কেহই একাকী বিজ্ঞানবিষয় স্থির করিতে পারে না। এই নিমিত্তই আমি তোমাদিগকে এই বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছি।
“ভগবতী পার্ব্বতী অতি পবিত্র সরিদ্গণকে এইরূপ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহাদিগের মধ্য হইতে স্ত্রীধৰ্ম্মজ্ঞা সুরতরঙ্গিণী গঙ্গা আহ্লাদে পুলকিত হইয়া হাস্যবদনে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মজ্ঞে! তুমি জগন্মান্যা হইয়াও নদীদিগকে ধর্ম্মবিষয় জিজ্ঞাসা করাতে আমি কৃতার্থ ও অনুগৃহীত হইয়াছি। যে ব্যক্তি স্বয়ং অভিজ্ঞ হইয়াও অন্যকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়া তাঁহার সম্মাননা করেন, তিনিই যথার্থ পণ্ডিত বলিয়া পরিগণিত হয়েন। যে ব্যক্তি তর্ক-বিতর্কপারদর্শী, জ্ঞানবিজ্ঞান সম্পন্ন বক্তার নিকট প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, তাঁহাকে কখন বিপগ্রস্ত হইতে হয় না। আর যে ব্যক্তি আত্মাভিমাননিবন্ধন অন্যকৃত সাহায্যনিরপেক্ষ হইয়া সভায় বক্তৃতা করে, সে বুদ্ধিমান হইলেও তাহার বাক্য দুর্ব্বল বলিয়া প্রতীয়মান হয়। দেবি! তুমি দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন ও স্বর্গমধ্যে প্রধান বলিয়া পরিগণিত; অতএব তুমি স্বয়ং স্ত্রীধৰ্ম্ম কীর্ত্তন কর।
“সুরতরঙ্গিণী ভগবতী পার্ব্বতীকে সমাদরপূর্ব্বক এই কথা কহিলে তিনি বিস্তারিতরূপে স্ত্রীধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিতে প্রবৃত্ত হইয়া কহিলেন, ‘আমি স্ত্রীধৰ্ম্ম যতদুর অবগত আছি, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, সকলে অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। পিতা, মাতা প্রভৃতি বন্ধুবর্গের অনুমতি-অনুসারে অগ্নিসমক্ষে উপযুক্ত পাত্রের সহিত পরিণীত হওয়া কামিনীগণের প্রধান কৰ্ম্ম। যে স্ত্রী সচ্চরিত্রা, প্রিয়বাদিনী, সদ্ব্যবহারনিরতা ও প্রিয়দর্শনা হয়েন এবং স্বামীর মুখদর্শনে পুত্রবদনদর্শনজনিত আহ্লাদের ন্যায় আনন্দ অনুভব করেন, তিনিই যথার্থ ধৰ্ম্মচারিণী ও সাধ্বী। যিনি দম্পতিধৰ্ম্মশ্রবণে অনুরাগিণী, ভর্ত্তৃতুল্য ব্রতচারিণী ও ধর্ম্মানুরক্তা হয়েন এবং স্বীয় স্বামীকে দেবতুল্য জ্ঞান ও দেবতুল্য পরিচর্য্যা করেন, যিনি একান্তচিত্তে স্বামীর বশীভূত হইয়া ব্ৰতানুষ্ঠান করিয়া থাকেন, যাঁহার মন স্বামীচিন্তা ভিন্ন অন্য চিন্তা হইতে নিবৃত্ত হয়, স্বামী দুর্ব্বাক্যপ্রয়োগ বা ক্রোধনেত্রে দৃষ্টিপাত করিলেও যিনি তাঁহার নিকট প্রসন্নবদনে অবস্থান করেন, অন্য পুরুষের কথা দূরে থাকুক, যিনি চন্দ্র, সূৰ্য্য বা বৃক্ষকেও অবলোকন করেন না, স্বামী দরিদ্র, ব্যাধিপীড়িত, কাতর বা পথশ্রান্ত হইলে যিনি তাঁহার প্রতি অকপটভাবে সমাদর প্রকাশ করেন, যিনি কার্য্যদক্ষা, প্রযতা, পতিপরায়ণা ও পুত্রবতী, যিনি অবিকৃতচিত্তে স্বামীর শুশ্রূষা করেন, যাঁহার মন স্বামীর প্রতি সততই প্রসন্ন থাকে এবং যিনি প্রতিনিয়ত অনুদান দ্বারা কুটুম্বগণের ভরণপোষণ করেন, যিনি বিষয়কামনা, বিষয়ভোগ, ঐশ্বৰ্য্য বা সুখে বিশেষ যত্ন না করিয়া কেবল স্বামীর প্রতি যত্ন করেন, যিনি প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া গৃহমার্জ্জন, গৃহে গোময়লেপন, স্বামীর সহিত মিলিত হইয়া হোমানুষ্ঠান, বলিপ্রদান এবং দেবতা, অতিথি ও ভৃত্যগণকে আহার প্রদান করিয়া থাকেন, পরিবারবর্গ ভোজন করিলে পর যিনি ভোজনে প্রবৃত্ত হয়েন, যাহা দ্বারা লোকসকল সন্তুষ্টও পরিতুষ্ট হয় এবং যিনি শুক্র ও শশুরের সন্তোসাধন, পিতামাতার প্রতি ভক্তিপ্রকাশ করেন, তাঁহার অতি উৎকৃষ্ট ধনলাভ হয়। যিনি ব্রাহ্মণ, দরিদ্র, অনাথ ও অন্ধ প্রভৃতি কৃপাপাত্রদিগকে অন্ন প্রদান করেন এবং স্বামীর প্রতি একান্ত অনুরক্ত ও তাহার হিতসাধনে নিরত হয়েন, তাঁহার পাতিব্ৰত্যধর্ম্মের ফললাভ হইয়া থাকে। পতিভক্তিই স্ত্রীলোকের প্রধান ধর্ম্ম, তপস্যা ও সনাতন স্বর্গস্বরূপ। পতিই স্ত্রীলোকের পরম দেবতা, পরম বন্ধু ও পরম গতি। অবলাগণের পক্ষে পতির প্রসন্নতা স্বর্গ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। হে নাথ! আপনি অপ্রীত থাকিলে আমার কখনই স্বর্গলাভে কামনা হয় না। পতি দরিদ্র, ব্যাধিত, বিপন্ন, রিপুর বশবর্ত্তী বা ব্রহ্মশাপগ্রস্ত হইয়া যদি প্রাণবিয়োগকর অকাৰ্য্য বা অধর্ম্মের অনুষ্ঠান করিতে অনুমতি প্রদান করেন, তাহা হইলে অবিচারিতচিত্তে তৎক্ষণাৎ তাহা সাধন করা কর্ত্তব্য। হে দেবাদিদেব! এই আমি আপনার নিকট স্ত্রীধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলাম। যে স্ত্রী এইরূপ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করেন, তিনি পাতিব্ৰত্য ধৰ্ম্মভাগিনী হয়েন।’
“হে ধৰ্ম্মরাজ! ভগবতী পার্ব্বতী এই কথা কহিলে ভগবান্ মহাদেব তাঁহাকে যথোচিত প্রশংসা করিয়া স্বীয় অনুচর ও অন্যান্য ব্যক্তিদিগকে তথা হইতে বিদায় করিলেন। তখন যাবতীয় গন্ধৰ্ব্ব, অপ্সরা, ভূত ও নদীগণ তাঁহাকে প্রণাম করিয়া স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন।”
