3 of 4

১২০. দানধৰ্ম্মের প্রাধান্য—মৈত্রেয়-ব্যাসসংবাদ

১২০তম অধ্যায়

দানধৰ্ম্মের প্রাধান্য—মৈত্রেয়-ব্যাসসংবাদ

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! বিদ্যা, তপস্যা ও দান এই তিনটির মধ্যে কোন্‌টি অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি এই উপলক্ষ্যে মৈত্রেয়-বেদব্যাসসংবাদনামক এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। একদা মহর্ষি বেদব্যাস ছদ্মবেশে বারাণসীমধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে মুনিবংশসম্ভূত মৈত্রেয়ের নিকট সমুপস্থিত হইয়া আসনপরিগ্রহ করিলে মুনিবর মৈত্রেয় তাঁহাকে অর্চ্চনা করিয়া অতি উৎকৃষ্ট আহারদ্রব্য প্রদান করিলেন। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সেই উৎকৃষ্ট সামগ্রীসমুদয় ভোজনপূৰ্ব্বক তথা হইতে গমন করিবার সময় নিতান্ত আহ্লাদিত হইয়া হাস্য করিতে লাগিলেন। ঐ সময়ে মৈত্রেয় তাঁহাকে তদবস্থ অবলোকন করিয়; সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! আমি অতি বিনীতভাবে আপনাকে অভিবাদন করিয়া এই জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, আপনি তপস্বী ও ধৈর্য্যশীল হইয়াও এরূপ আহ্লাদিতচিত্তে, হাস্য, করিতেছেন কেন? এক্ষণে আপনাকে এরূপ আহ্লাদিত দেখিয়া নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, আপনি জ্ঞানচক্ষুঃপ্রভাবে আমার তপস্যার মহাফল দর্শন করিয়াছেন। আপনি জীবন্মুক্ত ও আমি সামান্য তপস্বী; কিন্তু এক্ষণে আপনাকে এতাদৃশ হৃষ্ট দেখিয়া আমার জ্ঞান হইতেছে যে, আপনার সহিত আমার অধিক বিভিন্নতা নাই।’

“তখন বেদব্যাস কহিলেন, ‘মহাত্মন্‌! বেদপ্রমাণানুসারে একশত যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিলে যে গতি লাভ হয়, তুমি সামান্য অন্নাদি দান করিয়াই সেই গতি লাভ করিবে বিবেচনা করিয়া আমি এতাদৃশ আহ্লাদিত হইয়াছি। বেদে অদ্রোহ, দান ও সত্যবাক্য প্রয়োগ এই তিন কার্য্যই পুরুষের অতি উৎকৃষ্ট ব্ৰত বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। পূর্ব্বতন ঋষিগণ এই বেদোক্ত বাক্যানুসারে কার্য্য করিয়াছেন; এক্ষণে আমাদিগেরও এই বাক্যানুসারে কার্য্য করা কৰ্ত্তব্য। ক্ষুধার্ত্ত ব্যক্তিকে ভোজনদান করা অপেক্ষা মহাফলপ্রদ কার্য্য অতি অল্পই আছে। তুমি অকপট হৃদয়ে আমাকে এই উৎকৃষ্ট ভোজনদ্ৰব্য প্রদান করিয়া মহাযজ্ঞসাধ্য লোকসমুদয় জয় করিয়াছ। আমি তোমার পবিত্র দান ও তপস্যায় পরম প্রীত হইয়াছি। কেবল দানপ্রভাবেই তোমার শরীর ও গাত্রগন্ধ অতিপবিত্র হইয়াছে। তোমাকে দর্শন করিলেও পুণ্য জন্মে।

‘দান, তীর্থস্নান ও তীর্থমৃত্তিকালেপন প্রভৃতি সমুদয় পবিত্র কার্য্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও শুভফলপ্রদ। বেদে যেসকল কার্য্যের প্রশংসাবাদ কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, দান সেসমুদয় অপেক্ষাও উৎকৃষ্ট, তাহার আর সন্দেহ নাই। পণ্ডিতগণ দাতাদিগের পথই অবলম্বন করিয়া থাকেন। দাতা ব্যক্তিরাই যথার্থ প্রাণদাতা, তাঁহাদিগের উপরেই ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। দান সুন্দররূপে বেদাধ্যয়ন, ইন্দ্রিয়সংযম ও সৰ্ব্বত্যাগের ন্যায় অতি উৎকৃষ্ট কার্য্য। হে বৎস! তুমি এই দানধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া অসাধারণ বুদ্ধিমানের ন্যায় কার্য্য করিয়াছ, অতঃপর তুমি সমধিক সুখলাভে সমর্থ হইবে।

বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই যে দান, যজ্ঞ, সম্পত্তি ও অশেষ সুখলাভে অধিকারী হয়, ইহা আমরা অনেকবার প্রত্যক্ষ করিয়াছি। যে ব্যক্তি বিষয়সুখে আসক্ত হয়, সে নিশ্চয়ই পরিণামে দুঃখ এবং যে ব্যক্তি তপস্যাদি কষ্টসাধ্য বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়, সে নিশ্চয়ই পরিণামে সুখভোগ করিয়া থাকে।

এই ভূমণ্ডলে যেসমুদয় মনুষ্য দৃষ্টিগোচর হয়, তাহাদের মধ্যে কতকগুলি পুণ্যশীল, কতকগুলি পাপপরায়ণ ও কতকগুলি পাপপুণ্যবিবর্জ্জিত। যাঁহারা যজ্ঞ, দান ও তপস্যাদি সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারা পুণ্যশীল বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হয়েন। যাহারা অন্যের বিদ্রোহাচরণ প্রভৃতি অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহারা পাপপরায়ণ বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকে এবং যাঁহারা যজ্ঞাদি সকার্য্য ও পরদ্রোহাদি অসৎকার্য্য পরিত্যাগপূৰ্ব্বক কেবল ব্রহ্মজ্ঞানানুষ্ঠানে যত্নবান হয়েন, তাঁহাদিগকেই পাপপুণ্যবিবর্জ্জিত বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। কতকগুলি লোক পাপপুণ্য নাই মনে করিয়া অনায়াসে পরদ্রব্যহরণাদি পাপকাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হয়। তাহাদিগকে কখনই পাপপুণ্যবিবর্জ্জিত বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায় না। ঐ দুরাত্মারা নিতান্ত পাপপরায়ণ। উহাদিগকে নিশ্চয়ই দেহান্তে ঘোরতর নরকে নিপতিত হইতে হইবে। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি পুণ্যলাভে অধিকারী হইয়াছ, অতএব পরমাহ্লাদিতচিত্তে যজ্ঞানুষ্ঠান ও দান প্রভৃতি সকার্য্যদ্বারা পুণ্য বৃদ্ধি কর।’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *