১৪১তম অধ্যায়
শিবের চতুর্ম্মুখ ও বৃষারোহী হওয়ার কারণ
“নারদ কহিলেন, ‘শৈলরাজদুহিতা এই কথা কহিলে ভগবান্ ভূতনাথ তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “প্রিয়ে! এক্ষণে তুমি আমাকে যাহা যাহা জিজ্ঞাসা করিলে, তৎসমুদয় কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান্ ব্রহ্মা সমুদয় রত্ন হইতে তিল তিল প্রমাণ সারাংশ গ্রহণ করিয়া তিলোত্তমানামে এক স্ত্রীরত্নের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। একদা সেই অসামান্যরূপলাবণ্যবতী রমণী আমাকে প্রলোভিত করিবার নিমিত্ত আমার চতুর্দ্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিল। তখন আমি তাহাকে দর্শন করিবার নিমিত্ত নিতান্ত অভিলাষী হইলাম; সুতরাং সে যে যে দিকে গমন করিল, যোগবলে সেই সেই দিকে আমার সুচারু বদন বিনির্গত হইল। এইরূপে সেই তিলোত্তমাকে দর্শন করিবার নিমিত্তই আমি চতুর্ম্মুখ হইয়াছি। আমি পূৰ্ব্বমুখদ্বারা ইন্দ্রকে শাসন, উত্তরমুখদ্বারা তোমার সহিত ক্রীড়া, পশ্চিমমুখদ্বারা প্রাণীগণের সুখসমৃদ্ধি সম্পাদন ও এই ভয়ঙ্কর দক্ষিণমুখদ্বারা প্রাণীগণকে সংহার করিয়া থাকি। আমি লোকসমুদয়ের হিতসাধনার্থ জটিল ও ব্রহ্মচারী এবং দেবগণের কাৰ্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত পিনাকপাণি হইয়াছি। পূর্ব্বে দেবরাজ আমার শ্রীলাভের বাসনায় আমার প্রতি বজ্র নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, সেই বজ্রের তেজে আমার কণ্ঠদেশ দগ্ধ হইয়া যায়; এই নিমিত্ত আমি তদবধি নীলকণ্ঠ হইয়াছি।”
“পার্ব্বতী কহিলেন, “হে দেবদেব! হস্তী, অশ্ব প্রভৃতি অসংখ্য উৎকৃষ্টবাহন বিদ্যমান থাকিতে বৃষভ আপনার বাহন হইল কেন?”
‘মহেশ্বর কহিলেন, “হে দেবি! পূৰ্ব্বে সৰ্ব্বলোকপিতামহ ভগবান ব্রহ্মা পয়স্বিনী সুরভীর সৃষ্টি করিবার পর ঐ সুরভীর বংশে অসংখ্য গাভী সমুৎপন্ন হয়। তৎকালে উহাদের সকলেরই বর্ণ একপ্রকার ছিল। অনন্তর একদা ঐ সুরভীর বৎসের মুখবিনির্গত ফেনসমুদয় আমার গাত্রে নিপতিত হওয়াতে, আমি ক্রূদ্ধ হইয়া গোসমুদয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়াছিলাম। তাহাতেই গোসমুদয় আমার ক্রোধানলে দগ্ধ হইয়া বিবিধবর্ণ প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ সময় অর্থতত্ত্বজ্ঞ ভগবান্ ব্রহ্ম আমাকে ক্রূদ্ধ দেখিয়া সান্ত্বনাপূর্ব্বক আমার বাহনের নিমিত্ত এই বৃষভ প্রদান করিয়াছিলেন। সেই নিমিত্তই আমি অন্যান্য বাহন পরিত্যাগপূৰ্ব্বক বৃষে আরোহণ করিয়া থাকি।”
শ্মশানবাসাদি বিরুদ্ধ বিভূতির হেতু কথন
‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! দেবলোকে পরমরমণীয় বাসস্থানসমুদয় বিদ্যমান থাকিতেও আপনি কি নিমিত্ত কপাল, কেশ, অস্থি, মাংস, শোণিত, বসা ও অস্ত্রসমূহে সমাকীর্ণ, গৃধ্র গোমায়ুসঙ্কুল চিতানল-পরিব্যাপ্ত অপবিত্র শ্মশানে বাস করেন?”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! আমি পবিত্রস্থান অন্বেষণ করিয়া অদ্যাপি সমুদয় পৃথিবী পর্য্যটন করিয়া থাকি; কিন্তু শ্মশান অপেক্ষা কোন স্থানই আমার পবিত্র বলিয়া জ্ঞান হয় না। এই নিমিত্ত শ্মশানে বাস করিতে আমি নিতান্ত অভিলাষী হইয়াছি। বিশেষতঃ আমার ভূতগণ ন্যগ্রোধশাখাসমাচ্ছন্ন ছিন্নমাল্যবিভূষিত শ্মশানেই বিহার করিয়া থাকে। তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্থানে বাস করিতে আমার কিছুতেই ইচ্ছা হয় না। ফলতঃ আমার মতে এই শ্মশান অপেক্ষা পবিত্রস্থান নিতান্ত দুর্ল্লভ। পবিত্রস্থানলাভাকাঙ্ক্ষী মহাত্মারা এই পরমপবিত্র মহাশ্মশানেই সৰ্ব্বদা বাস করিয়া থাকেন।”
‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! ধৰ্ম্মের লক্ষণ কি এবং লোকে কিরূপে উহার অনুষ্ঠান করিবে, এই সমুদয় বিষয়ে আমার নিতান্ত সংশয় উপস্থিত হইতেছে; অতএব আপনি আমার ও এই সমুদয় তপানুষ্ঠাননিরত বিবিধবেশধারী মহর্ষিগণের হিতসাধনের নিমিত্ত ঐ বিষয় কীর্ত্তন করুন।”
মহাদেবকর্ত্তৃক বিবিধ গৃহস্থধর্ম্মকথন
‘দেবী পাৰ্ব্বতী এই প্রশ্ন করিবামাত্র আমরা বিবিধ বাক্যদ্বারা তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিলাম। তখন মহেশ্বর পার্ব্বতীকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “দেবি! অহিংসা, সত্যবাক্যপ্রয়োগ, সৰ্ব্বভূতে দয়া, শ্রম ও দান এই সমুদয় গৃহস্থদিগের প্রধান ধর্ম্ম। ঐ গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম, পরদারবিরতি [পরনারী-গ্রহণে বিরক্তি], অর্পিত স্ত্রীর রক্ষা, অদত্তবস্তুর গ্রহণে অভিলাষ ও মধুমাংস পরিত্যাগ এই পঞ্চবিধ ধর্ম্ম সমুদয় ধর্ম্মের মূল। অন্যান্য ধর্ম্মসমুদয় এই পঞ্চবিধ ধৰ্ম্মের শাখাস্বরূপ। ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মারা যত্নসহকারে এই সমুদয় ধর্ম্ম পালন করিবেন।”
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারিবর্ণের ধর্ম্ম পরিজ্ঞাত হইতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। অতএব আপনি উহা কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! ব্রাহ্মণগণ পৃথিবীতে দেবতাস্বরূপ। উপবাসই ইহাদিগের পরমধর্ম্ম। ইঁহারা ধর্ম্মার্থসম্পন্ন হইলে ব্রহ্মের স্বরূপত্ব লাভ করিতে পারেন। শাস্ত্রানুসারে উপনীত হইয়া ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন করা ইঁহাদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। এইরূপ আচরণ ভিন্ন কদাচ ব্রাহ্মণ্যলাভে সমর্থ হওয়া যায় না। অতএব ধর্ম্মপরায়ণ ব্রাহ্মণগণ যত্নপূৰ্ব্বক এই পরমধর্ম্ম প্রতিপালন করিবেন।”
‘তখন উমা কহিলেন, “ভগবন! চারিবর্ণের ধর্ম্মবিষয়ে আমার মহা সন্দেহ আছে, অতএব বিস্তারিত রূপে উহা আপনাকে কীর্ত্তন করিতে হইবে।”
‘মহেশ্বর কহিলেন, “পাৰ্ব্বতি! ধৰ্ম্মরহস্যশ্রবণ, হোমানুষ্ঠান, গুরুকার্য্যসাধন, ভিক্ষাবৃত্তি-অবলম্বন, সতত যজ্ঞোপবীত-ধারণ, বেদাধ্যয়ন ও ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমে অবস্থান করা ব্রাহ্মণের পরমধর্ম্ম। ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচর্য্যসমাপনান্তে সমাবর্ত্তনস্নান করিয়া গুরুর অনুজ্ঞা গ্রহণপূর্ব্বক গৃহে আগমন ও স্বীয় অনুরূপ কামিনীর পাণিগ্রহণ করিবেন। শূদ্ৰান্ন পরিত্যাগ, সৎপথ-অবলম্বন, উপবাস, ব্রহ্মচর্য্যের অনুষ্ঠান, সাগ্নিক হইয়া হুতাশনে আহুতি প্রদান, বেদাধ্যয়ন, ইন্দ্রিয়সংযম, বিঘসান্নভোজন, সত্যবাক্য-প্রয়োগ, অতিথিসেবা, গার্হপত্যাদি অগ্নিত্রয়রক্ষা এবং বিধিপূৰ্ব্বক পশুবন্ধ প্রভৃতি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করা ব্রাহ্মণের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। যজ্ঞানুষ্ঠান, একাহার ও অহিংসা অপেক্ষা ব্রাহ্মণের উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম আর কিছুই নাই। পরিজনগণ ভোজন করিলে পর স্বয়ং ভোজন করা শোত্রিয় ব্রাহ্মণদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। ভাৰ্য্যা ও স্বামীর চরিত্র সমান হইলেই তাহাদের পরমপ্রীতিলাভ হইয়া থাকে। গৃহদেবতাদিগকে নিত্য পুষ্প ও বলিদান এবং নিত্য গৃহে গোময়লেপন, উপবাস এ হোম করা গৃহস্থের প্রধানধৰ্ম্ম। এই আমি তোমার নিকট ব্রাহ্মণগণের গার্হস্থ্যধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলাম।
“অতঃপর ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। প্রজাপালনই ক্ষত্রিয়ের পরমধর্ম্ম। প্রজাপালন করিলেই ক্ষত্রিয়গণ যজ্ঞফললাভে সমর্থ হয়েন। যে নরপতি ধৰ্ম্মানুসারে প্রজাপালন করেন, তাঁহার সেই প্রজাপালনজনিত পুণ্যবলে উৎকৃষ্ট লোকসমুদয় অধিকৃত হয়। জিতেন্দ্রিয়তা, বেদাধ্যয়ন, হুতাশনে আহুতিপ্রদান, অধ্যয়ন, যজ্ঞোপবীতধারণ, ধৰ্ম্মকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান, ভৃত্যগণের ভরণপোষণ, আরদ্ধ কার্য্যে দৃঢ়তর অধ্যবসায়-প্রকাশ, অপরাধানুরূপ দণ্ডবিধান, বেদানুসারে যজ্ঞানুষ্ঠান, সদ্বিচার, সত্যবাক্যপ্রদর্শন এবং আর্ত্তব্যক্তিকে সাহায্যদান করা ক্ষত্রিয়ের অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ক্ষত্রিয় গোব্রাহ্মণের রক্ষাৰ্থ সংগ্রামে নিহত হয়েন, তাঁহার অশ্বমেধযজ্ঞার্জ্জিত স্বর্গলোক লাভ হইয়া থাকে।
“এক্ষণে বৈশ্যের ধর্ম্ম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। সতত পশুপালন, কৃষিবাণিজ্য-সম্পাদন, হুতাশনে আহুতিপ্রদান, দান, অধ্যয়ন, সৎপথে অবস্থান, অতিথিসৎকার, জিতেন্দ্রিয়তা, শান্তিগুণ অবলম্বন এবং ব্রাহ্মণের অভ্যর্থনা করাই বৈশ্যের শাশ্বত ধৰ্ম্ম। বাণিজ্য অবলম্বন করিয়া তিল, গন্ধদ্রব্য ও রস বিক্রয় করা বৈশ্যের কদাচ কর্ত্তব্য নহে।
“অতিথিসকার, ধর্ম্মার্থকামের অনুশীলন ও ব্রাহ্মণাদি বর্ণত্রয়ের শুশ্রূষাই শূদ্রের পরমধর্ম্ম। যে শূদ্র সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, অতিথিসেবাতৎপর, সদাচারপরায়ণ এবং দেবতা ও ব্রাহ্মণের পূজায় তৎপর হয়, তাহার তপঃসঞ্চয় ও অভিলষিত ফললাভ হইয়া থাকে। হে গিরিনন্দিনি! এই আমি তোমার নিকট চারিবর্ণের ধর্ম্ম কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে আর কি শ্রবণ করিতে বাসনা হয়, তাহা কীর্ত্তন কর।”
‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! আপনি চারিবর্ণের পৃথক পৃথক ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিলেন, এক্ষণে যে ধৰ্ম্ম সমুদয় বর্ণের হিতকর, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
‘মহেশ্বর কহিলেন, “প্রিয়ে! সৰ্ব্বলোকশ্রেষ্ঠ বিধাতা এই ভূমণ্ডলে সমুদয়লোকের পরিত্রাণার্থ ব্রাহ্মণদিগের সৃষ্টি করিয়াছেন। উহারা পৃথিবীর দেবতাস্বরূপ; অতএব আমি অগ্রে ব্রাহ্মণদিগের ধৰ্ম্মের বিষয় কিঞ্চিৎ কীর্ত্তন করিয়া পরিশেষে সাধারণ ধর্ম্ম নির্দ্দেশ করিব। ব্রাহ্মণের ধর্ম্মই সর্ব্বোৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম। এই ভূমণ্ডলে মানবদিগের অনুষ্ঠানের নিমিত্ত ভগবান্ স্বয়ম্ভূ বৈদিক, স্মার্ত্ত ও শিষ্টাচারসম্ভূত এই তিন প্রকার ধর্ম্ম নির্দ্দেশ করিয়াছেন। যে ব্রাহ্মণ ত্রিবেদপারদর্শী, যিনি দান, অধ্যয়ন ও যজনকার্য্যে সতত অনুরক্ত থাকেন এবং যিনি কাম, ক্রোধ, লোভের বশবর্ত্তী ও অধ্যয়নজীবী না হয়েন, তিনিই যথার্থ ব্রাহ্মণ। ভগবান্ বিধাতা ব্রাহ্মণদিগের জীবিকানির্ব্বাহের নিমিত্ত যজন, যাজন, অধ্যয়ন, অধ্যাপন, দান ও পতিগ্রহ এই ছয় প্রকার কৰ্ম্ম নির্দ্দেশ করিয়া দিয়াছেন। ঐ ছয় প্রকার কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করাই ব্রাহ্মণের সনাতনধৰ্ম্ম। নিয়ত বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞানুষ্ঠান ও সাধ্যানুসারে দান করিতে পারিলে ব্রাহ্মণ জনসমাজে প্রশংসনীয় ও উৎকৃষ্ট পুণ্যফলভাগী হইতে পারেন।
সর্ব্ববর্ণের সাধারণ ধর্ম্ম
“অতঃপর সাধারণ ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। নিয়ত শান্তিগুণ অবলম্বন ও সাধুসংসর্গ অপেক্ষা গৃহস্থের উৎকৃষ্ট ধর্ম্ম কিছুই নাই। পঞ্চযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া শুদ্ধিলাভ, সত্যবাক্য প্রয়োগ, ঈর্ষাপরিত্যাগ, দান, ব্রাহ্মণের সৎকার, পরিষ্কৃত আবাসে অবস্থান, অভিমান ও কপটতা-পরিত্যাগ, প্রিয়বাক্যবিন্যাস, অতিথিসৎকারে অনুরাগ ও পরিজনদিগের ভোজনের পর ভোজন করা গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। যে ব্যক্তি অতিথিদিগকে পাদ্য, অর্ঘ্য, আসন, শয্যা, দীপ ও আশ্রয় প্রদান করেন, তিনিই পরমধাৰ্ম্মিক। প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান ও আচমনপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করিয়া মধ্যাহ্নকালে তাঁহাকে যথাশক্তি ভোজন করাইয়া কিয়দ্দূর তাঁহার অনুগমন করা গৃহস্থের কর্ত্তব্য কৰ্ম্ম। দিবারাত্রি ধৰ্ম্মাদি ত্রিবর্গের অনুষ্ঠান করিলেই গৃহস্থের পরমধৰ্ম্ম লাভ হয়। যে ধর্ম্মের অনুষ্ঠানদ্বারা স্বর্গাদি লাভ হয়, তাহাকে প্রবৃত্তিলক্ষণ ধর্ম্ম কহে। গৃহস্থগণ ঐ ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে সম্পূর্ণ অধিকারী। ঐ ধৰ্ম্মপ্রভাবে সকলেরই উপকার হইয়া থাকে; সাধ্যানুসারে দান, যজ্ঞানুষ্ঠান, পুণ্যজনক কাৰ্য্যের সাধন ও ধর্ম্মপথ অবলম্বনপূর্ব্বক অর্থ উপার্জ্জন করা প্রবৃত্তিলক্ষণ-ধর্ম্মাবলম্বী গৃহস্থের অবশ্য কর্ত্তব্য। ধৰ্ম্মলব্ধ ধন তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া যত্নপূৰ্ব্বক তাহার একাংশদ্বারা ধৰ্ম্মসঞ্চয়, এক অংশ উপভোগ ও এক অংশের বৃদ্ধিসাধন করা তাঁহার সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।
বিশেষ ধৰ্ম্ম—মোক্ষধৰ্ম্ম
“অতঃপর নিবৃত্তিলক্ষণ-ধৰ্ম্ম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে ধর্ম্মদ্বারা মোক্ষলাভ হয়, তাহাকে নিবৃত্তিলক্ষণ-ধৰ্ম্ম কহে। এক রাত্রির অধিক কাল এক গ্রামে বাস না করা এবং সমুদয় জীবের প্রতি দয়া প্রকাশ ও আশপাশ হইতে মুক্তিলাভ করা নিবৃত্তি ধর্ম্মাবলম্বীদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। কমণ্ডলু, উদক, পরিধেয় বস্ত্র, আসন, ত্রিদণ্ড, শয্যা, অগ্নি ও গৃহে মমতা করা তাঁহাদের কদাপি কর্ত্তব্য নহে। তাঁহারা বীতস্পৃহ, স্নেহাদিবন্ধনবিমুক্ত ও সংযতচিত্ত হইয়া সৰ্ব্বদা বৃক্ষমূল, শূন্যগৃহ ও নদীতীর প্রভৃতি নির্জ্জনস্থানে অবস্থানপূর্ব্বক পরমাত্মতত্ত্ব চিন্তা করিবেন। সন্ন্যাসধর্ম্ম অবলম্বনপূৰ্ব্বক নিরাহার ও স্থাণুস্বরূপ [নিশ্চেষ্ট] হইয়া আত্মচিন্তা করিলে ঝটিতি মোক্ষলাভ হয়। এক গ্রামে বা এক নদীতীরে অনেক দিন অবস্থান করা সন্ন্যাসীর কদাপি কর্ত্তব্য নহে। মোক্ষার্থী সাধুব্যক্তিদিগের পক্ষে এই বেদোক্ত ধৰ্ম্ম অতি সৎপথস্বরূপ। যে ব্যক্তি এই পথে পদার্পণ করেন, তাঁহাকে কখনই সংসারসাগরে মগ্ন হইতে হয় না। মোক্ষধর্ম্মাবলম্বীরা কুটীচক [১], বহুদক [২], হংস [৩] ও পরমহংস [৪]* এই চারি শ্রেণীতে বিভক্ত। ইহাদের মধ্যে কুটীচক অপেক্ষা বহূদক, বহুদক অপেক্ষা হংস ও হংস অপেক্ষা পরমহংস শ্রেষ্ঠ। এই নিবৃত্তিধৰ্ম্ম অপেক্ষা সুখ, দুঃখ, জরা, মৃত্যু নিবারণের শ্রেষ্ঠ উপায় আর কিছুই নাই।”
[* ১-৪। সন্ন্যাসীসম্প্রদায়ের পৃথক পৃথক্ আচারগত পৃথক পৃথক্ নাম। কুটীচক সন্ন্যাসীরা পর্ণশালাপ্রিয়, ভিক্ষাজীবী, কেহ কেহ বা বন্ধুর অন্নে জীবনধারণকারী, শিখা-সূত্ৰ-ওদণ্ড-কমণ্ডলুধারী ও বঙ্কলবস্ত্রপরিধায়ী। ইঁহারা ভস্ম মাখেন, গায়ত্রী জপ করেন এবং শিবলিঙ্গ অর্চ্চনা করিয়া থাকেন। বহুদক—আত্মশুদ্ধির জন্য অনেক জল ব্যবহারে অভ্যস্ত, ইঁহারা অন্নদানে গৃহস্থপীড়নভয়ে সাতঘরে ভিক্ষাগ্রহণ, গোপুচ্ছলোমের রজ্জুদ্বারা নির্ম্মিত কৌপীনধারণ, বেদাধ্যয়নাদি ও বেদবিহিত সন্ধ্যাবন্দনাদি করেন। হংস—কামনা-বাসনাহীন, নির্লিপ্ত, পূর্ব্বাশ্রমচিন্তাত্যাগী, যথাপ্রাপ্ত বস্তুদ্বারা প্রাণধারণকারী। পরমহংস— মহাযোগী, সংযত, শুদ্ধচিত্ত, সমদর্শী, নির্লিপ্ত, নির্ব্বিকার ও ব্রহ্মীভূত।]
ঋষিধৰ্ম্ম—যাগযজ্ঞাদি
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! আপনি জীবলোকের শ্রেয়স্কর পথস্বরূপ গার্হস্থ্য, মোক্ষ ও সজ্জনাচরিত ধর্ম্ম বিশেষরূপে কীর্ত্তন করিলেন, এক্ষণে ঋষিধৰ্ম্ম শ্রবণ করিতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে। মহর্ষিগণের যজ্ঞীয় ধূমের সৌরভে সমুদয় তপোবন। আমোদিত হয়; আমি তদ্দর্শনে নিতান্ত প্রীতিযুক্ত হইয়া থাকি; অতএব আপনি আমার নিকট উহাদিগের ধর্ম্ম সবিস্তর কীর্ত্তন, করুন।”
‘মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! মহর্ষিগণ যেরূপ ধৰ্ম্ম আশ্রয়পূৰ্ব্বক সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকেন তাহা তোমার নিকট কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যাঁহারা সৃষ্টির পূর্ব্বক্ষণে পদ্মযোনিকর্ত্তৃক গীত, যজ্ঞসম্পাদক, পিতৃলোকের তৃপ্তিসাধন জলের ফেন পান করিয়া দিনযাপন করেন, তাঁহারাই ফেনপায়ী বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। অঙ্গুষ্ঠপৰ্ব্ব-পরিমিত দেহসম্পন্ন মহর্ষিদিগকে বালখিল্য বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। উহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ তপঃসিদ্ধ হইয়া সূৰ্য্যমণ্ডলে অবস্থানপূৰ্ব্বক সূর্য্যকিরণ পান ও কেহ কেহ মৃগচর্ম্ম, চীর বল্কল [গাছের বাকলের বস্ত্র] পরিধান করিয়া স্বধৰ্ম্মানুসারে তপানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। ঐ সকল তপানুষ্ঠাননিরত মহাত্মারা সমুদয় লোক আলোকিত করিয়া দেবগণের কার্য্যসিদ্ধির নিমিত্ত দেবতাদিগের স্বরূপত্ব লাভ করিতে পারেন।
‘দয়াধর্ম্মপরায়ণ চক্রচর [চক্রবৎ বিচরণশীল], সোমলোকচারী [চন্দ্রলোকবাসী] ও পিতৃলোক নিবাসী মহর্ষিগণ চন্দ্রকিরণ পান করিয়া থাকেন। জিতেন্দ্রিয়, সংপ্রক্ষাল [ত্রিকালশ্রয়ী], অশ্মকুট্ট ও দম্ভোলুখলিক মহর্ষিগণ স্ব স্ব পত্নীসমভিব্যাহারে উঞ্ছবৃত্তি আশ্রয় করিয়া জীবনধারণ করেন। অগ্নিতে আহুতিপ্রদান, পিতৃগণের অর্চ্চনা ও পঞ্চযজ্ঞের অনুষ্ঠান করাই ইঁহাদিগের পরমধৰ্ম্ম। কামক্রোধ পরাজয় করিয়া আত্মাকে পরিজ্ঞাত হওয়া সমুদয় মহর্ষিরই কর্ত্তব্য। উঞ্ছবৃত্তিলব্ধ অর্থদ্বারা অগ্নিহোত্রযজ্ঞ, ধর্ম্মযজ্ঞ ও সোমযজ্ঞের অনুষ্ঠান, যজ্ঞদক্ষিণা প্রদান, নিত্যজ্ঞ সম্পাদন, ধৰ্ম্মানুষ্ঠান, পিতৃলোক ও দেবগণের অর্চ্চনা এবং অতিথিদিগের সৎকার করা ইহাদিগের অবশ্য কর্ত্তব্য। ইঁহারা গোরসপানের বাসনা পরিত্যাগ, শমগুণ আশ্রয়, স্থণ্ডিলে শয়ন, যোগাবলম্বন এবং শাক, পর্ণ, ফল, মূল, বায়ু, সলিল ও শৈবাল ভোজন করিবেন। এই সমুদয় নিয়মদ্বারা ইহাদের উৎকৃষ্ট গতিলাভ হইয়া থাকে। যখন গৃহ ধূমবিহীন, মুষলধ্বনিবিবর্জ্জিত ও অঙ্গারশূন্য হইবে, পরিজনগণ ভোজন করিয়া ভোজপাত্রসমুদয় পরিত্যাগ করিবে এবং ভিক্ষুকগণ পরিতৃপ্ত হইয়া যথাস্থানে গমন করিবে, সত্যধৰ্ম্মনিরত মহাত্মারা সেই সময়ে অবশিষ্ট অন্ন ভোজন করিবেন। যাঁহারা গৰ্ব্ব ও অভিমানাবিহীন, সতত আহ্লাদিত ও শত্ৰুমিত্রে সমজ্ঞানসম্পন্ন হয়েন, তাঁহদিগকেই যথার্থ ধর্ম্মবেত্তা বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে।”
